বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সহজ বিজ্ঞান-দুর্লভ ইলিশ অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় বসন্ত ২০১৭

সহজ বিজ্ঞান সব পর্ব একত্রে

bigganilish-mediumইলিশ মাছ খেতে তোমাদের নিশ্চই খুব ভাল লাগে? বাঙালিদের অন্যতম প্রিয় মাছ ইলিশ। কিন্তু আজকাল বাজারে সে মাছের দাম দেখে হাত দেবে কার সাধ্য। চিরকাল এমনটি ছিল না। বাংলায় বর্ষার ভরা নদীতে ইলিশের প্রাচুর্য ছিল। ইলিশ খেতে খেতে তাতে অরুচি হয়ে যেত। সাধারণ গরীব মানুষ পান্তা ভাত আর ইলিশ ভাজা দিয়ে ভর পেট খেয়ে কাজে বেরিয়ে পরত। আজ মানুষ সংখ্যায় বেড়ে গেলেও ইলিশের সংখ্যা বিপদজনক ভাবে কমে আসছে।

ইলিশ মাছের বায়োলজিকাল নাম, Tenualosa Ilisha. তেলেগু ভাষায় এর নাম ‘পোলাসা’, তামিলরা আবার বলে ‘উল্লাম’। এই মাছ খাবার জন্য বাঙালিরা পাগল, আর অন্য প্রদেশের লোকেও একে পছন্দ করে। মাছের বিশেষজ্ঞরা ইলিশকে ‘shad’ জাতীয় বলে বিবৃত করে থাকেন। তার মানে এরা সামুদ্রিক মাছ এবং এরা সাধারণত সমুদ্রে থাকলেও, ডিম পাড়ার জন্য মিষ্টি জলের সন্ধান করে। কাঁটা থাকলে বাঙালিদের বয়ে গেল। এই জাতীয় মাছে আবার প্রচুর কাঁটাও থাকে। কিন্তু কাঁটা বাছতে বাঙালি, অহমীয়া বা ওড়িয়াদের কোন জুড়ি নেই। রাশিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্ট্যালিন নাকি ইলিশ বেজায় পছন্দ করতেন। ইলিশ মাছ খাওয়ার প্রচলন আছে ভারতের বাইরেও, যেমন ইরাক, ইরান, মায়ানমার, পাকিস্তান ইত্যাদি। ভাবছ বাংলাদেশেও তো আছে। আছে বই কী? বাংলাদেশের মানুষেরা সবাই বাঙালি যে। তাই তাদের কথা আলাদা ভাবে উল্লেখ না করলেও চলে। যেহেতু বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, পদ্মা নদীর মিষ্টি জলে তাই সেখানেকার ইলিশ খুবই সুস্বাদু হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গে বাজারে বাজারে বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা অনেক।

আমাদের সবার প্রিয় এই ইলিশের আকাল কেন পড়ল, আর আমরা কতখানি দায়ী এজন্য, সেই নিয়ে আজ আমরা আলোচনা করব। মাছের চরিত্র দেখে মৎস বিজ্ঞানীরা মাছকে দু ভাগে ভাগ করেছেন, পরিযায়ী ও অপরিযায়ী। ইলিশ মাছ পরিযায়ী মাছ। অর্থাৎ, এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় পাড়ি দেয়। সমুদ্রের নোনা জলে এরা ডিম পাড়ে না বলে, সমুদ্র থেকে উজান বেয়ে নদীর মিষ্টি জলের তল্লাসে পাড়ি দেয়। উল্টো স্রোতে গা ভাসিয়ে এরা সাঁতার কেটে হাজার মাইল চলে যেতে পারে। ইলিশের এই নদী পথে জলস্রোতের বিপরীত গমন হতে থাকে জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত।  ইলিশ মাছ  জলের ২০০ বা ৩০০ মিটার নিচে সাঁতার কাটে। জলের উপর ভাগে আসে না। তাই নদীর উৎস মুখে যখন জলের গভীরতা কমে আসে, তখন তারা কোন উপযুক্ত স্থান দেখে ডিম পাড়ে আর ফিরতি পথ ধরে সমুদ্রের দিকে। এই সময়ে নদীর মিষ্টি জলের প্রভাবে ইলিশের স্বাদ খুব ভাল হয়। নদীতে এসেই ইলিশ গায়ে গতরে বৃদ্ধি পায়। ঠিক তখনি তারা মাছ ধরাদের জালে ধরা পড়ে। ডিম দেওয়ার আগেও ধরা পড়তে পারে। ডিম ফুটে বাচ্চা ইলিশ জন্মেই স্বাভাবিক নিয়মে নদী থকে সাগরের দিকে সাঁতার কাটতে থাকে। এটা সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে হয়। বাচ্চা ইলিশদের এই অবরোহণ হতে থাকে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ পর্যন্ত। কিন্তু আমরা লোভী মানুষের দল, নদীতে জাল ফেলে,  সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝেই নব্য যুবা ইলিশের দলকে ধরে শহরের বাজারে চড়া দামে বিক্রি করে দিই। ঠাকুমা বা দিদিমারা বলতেন, দুর্গা পুজো থেকে সরস্বতী পুজো অবধি ইলিশ খেতে নেই। এটা কুসংস্কার মোটেই নয়। এ সময়ে ইলিশের দল ডিম পাড়তে সাগর থেকে নদীতে পাড়ি দেয় বংশ বৃদ্ধির তাগিতে। তাই তাদের এ সময়ে ধরলে তাদের জীবন চক্র সম্পূর্ণ হয় না, মাছের ওজোন কম হয়, আকারেও ছোট হয়। ইলিশের আর একটা দ্বিতীয় দল সাগর থেকে নদীর উজান পথে চলতে থাকে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত। বর্ষাকালে তারা আবার সাগরে ফিরে আসে। প্রথম দলটির সাথে এদের এখানেই পার্থক্য।

আমরা সভ্য মানুষেরা সেচের ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ তৈরি করবার জন্য নদীতে বাঁধ দিই। সেই বাঁধে বাধা পায় মাছের মুক্ত চলাফেরা। ফ্রান্সিস হ্যামিল্টন নামে এক ব্রিটিশ সাহেবকে ইংরেজ সরকার ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদের সমীক্ষা ও পরিমাপের কাজে নিযুক্ত করে। পেশায় একজন চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও, হ্যামিল্টন সাহেবের প্রভূত উৎসাহ ছিল জীবন বিজ্ঞানে। তাই তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই কাজ সম্পন্ন করেন। তার সমীক্ষার ফল স্বরুপ ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার মৎস সম্পদের উপর গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল প্রকাশিত হয়। তাতে তিনি বাঁধ নির্মাণ এবং মাছ ধরবার ফাঁদগুলোকে দায়ী করেন মাছের স্বাভাবিক চলাফেরায় প্রতিবন্ধক হবার জন্য। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে তারের জাল আর বাঁধে ধাক্কা খেয়ে দলে দলে ইলিশ মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যায় এবং এই কারণে মাছের ফলনও কমে যায়।

bigganilish02-medium

সম্প্রতি বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিবিদেরা বাঁধ বানাবার সময় ‘ফিশ ল্যাডার’ বানাচ্ছেন, যাতে মাছেদের স্বাভাবিক চলাফেরা প্রতিহত না হয়। ফিশ ল্যাডার হচ্ছে একধরনের বৈকল্পিক পথ, জলের মুল ধারার থেকে পৃথক। এটি এমনভাবে তৈরি করা হয় যে বাধাহীন ভাবে মাছ স্রোতের উল্টো দিকে সাঁতার কাটতে পারে। ফারাক্কা বাঁধ বানাবার আগে নাকি ইলিশ মাছ পাটনা ছাড়িয়ে এলাহাবাদ পর্যন্ত পাওয়া যেত। আজ সেই ইলিশ গঙ্গায় পাওয়া দুর্লভ হয়ে উঠেছে। তাই সাগর ও গঙ্গার সঙ্গম স্থল ডায়মন্ড হারাবারের ইলিশেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। আশা করা যায় ফিস ল্যাডারের সাহায্যে ইলিশ মাছের সংখ্যা বাড়ানো যাবে। সেই সাথে অসময়ে ইলিশ মাছ জালে ধরাও বন্ধ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s