বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সহজ বিজ্ঞান-শ্লথপ্রসারণ সমাচার সুজিতকুমার নাহা শরৎ ২০১৬

সহজ বিজ্ঞান আগের এপিসোডগুলো

biggansohoj1 (Medium)

শ্লথপ্রসারণ সমাচার

                                                                সুজিতকুমার নাহা 

‘শ্লথপ্রসারণ’ শব্দটা কোনো অভিধানেই নেই! ইংরেজি ‘creep’ নামের বস্তুধর্ম-সূচক কথাটা বাংলা হরফে লিখে পরিভাষা গঠনের হ্যাপা এড়ানোর সহজ রাস্তাটা আমার পছন্দ নয় বলে শব্দটা বানাতে হল! কষ্টদায়ক নতুন জুতো ব্যবহারের সাথে ধীরে ধীরে আরামদায়ক পাদুকায় রূপান্তরিত হওয়া, পুরনো ট্রাউজারের হাঁটুর কাছটা বেড়ে গিয়ে বেঢপ দেখানো বা টান-টান ক­­­­­­রে টাঙানো কাপড় শুকানোর দড়ি কিছুদিন ব্যবহারের পরেই ঢিলে হয়ে ঝুলে যাওয়া — এসব রহস্যময় কাণ্ডের পেছনে আসলে আছে শ্লথপ্রসারণের হাতযশ।

শ্লথপ্রসারণের কারণে ব্যাপক ভুগতে হতো আদ্যিকালের গ্রিসের লোকদের। সেই আমলের একমাত্র যান ছিল ঘোড়ায়-টানা রথ আর প্রধান অস্ত্র ছিল তির-ধনুক। ঠিকভাবে দেখ্‌ভাল না করলে অদ্ভুত ধরনের সমস্যা দেখা দিত দুটোতেই। রথে শুরু হত বিচিত্র দুলুনি, ধনুকের কার্যকারিতা যেত দারুণ কমে। ব্যাপারগুলো কেমন হত তা একটু খোলসা করে বলি।      

প্রাচীন গ্রিসের অমসৃণ , পাথুরে পথে চলার জন্য দরকার হত বিশেষ ধরনের চাকা । ভারী , অনমনীয় (রিজিড) চাকা লাগালে এবরো-খেবরো রাস্তায় সাংঘাতিক ঝাঁকুনিতে রথ ও আরোহী উভয়েরই প্রচন্ড ক্ষতি হত। ঝামেলা কমানোর জন্য উইলো , এলম বা সাইপ্রেস কাঠের নমনীয়, হাল্কা চাকা লাগানোই ছিল দস্তুর । ওজন পড়লে চাকাগুলো ধনুকের মতো সামান্য বেঁকে স্প্রিং-এর ন্যায় আচরণ করে ঝাঁকুনি দিত কমিয়ে । তবে এই ধরনের চাকার একটা অসুবিধে ছিল। স্প্রিং-সুলভ গুণের পাশাপাশি ছিল স্থায়ীভাবে বাঁকবার প্রবণতার দোষ। একভাবে দীর্ঘক্ষণ বেঁকে থাকলে চাকা গোলত্ব খুইয়ে ডিমের মতো আকার নিতে চাইতো। রথ স্থির থাকলে চাকা একভাবেই বেঁকে থাকে। তাই দিনের শেষে চাকার ওপর রথের ভার হঠাতে খুলে ফেলা হত রথচক্র। যতই হ্যাপা হোক না কেন, চাকা খোলা ও পরানো ছিল নিত্যকর্মের অন্তর্ভুক্ত।

রথের চাকার যোগ-বিয়োগের মতো ধনুকের ছিলার সংযুক্তি-বিযুক্তিও ছিল অবশ্যকরণীয়। গ্রিকরা দেখেছিল, ছিলা সর্বক্ষণ পরিয়ে রাখলে  কমে যায় ধনুকের কার্যকারিতা। হ্রাস পায় ধনুক থেকে ছোঁড়া তিরের পাল্লা (রেঞ্জ)। অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাই তারা  শুধুমাত্র ব্যবহারের সময়ই ধনুকে ছিলা পরাতো। ধনুকের কাজ মিটে গেলে ছিলা খুলে রাখতে ভুলতো না কখনও।

এবার শ্লথপ্রসারণ সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক। আমরা জানি, বলপ্রয়োগে পদার্থের আকারগত পরিবর্তন হয়, আবার বল হটালে পদার্থ আগের আকারে ফিরে আসে। অবশ্য বল একটি বিশেষ মান অতিক্রম করলে আকারে স্থায়ী পরিবর্তন আসে, এমনকী পদার্থ ভেঙেও যেতে পারে। এই সাধারণ নিয়মের ব্যত্যয় হতে দেখা যায় কাঠ , চামড়া , কাপড় , দড়ি এসবের বেলায় । বিশেষ মানের চেয়ে অনেক কম বলপ্রয়োগেও স্থায়ী প্রসারণের কারণে আকারগত পরিবর্তন আসতে পারে এসব জিনিসে। তবে এটা চটজলদি হয় না , এর জন্য লাগে বেশ কিছুটা সময়।  বিচিত্র এই গুণপনাকেই বলা হয় creep বা শ্লথপ্রসারণ।

ধাতব বস্তুতে শ্লথপ্রসারণ সচরাচর পরিলক্ষিত না হলেও পরিস্থিতিভেদে (দীর্ঘসময় ধরে অধিক বল প্রযুক্ত হলে, বিশেষত উচ্চ উষ্ণতায়) এটা ঘটতে পারে।

ক্রমপ্রসারণের দরুন আমাদের সুবিধে কিংবা অসুবিধে দুই-ই হতে পারে। উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে ।

প্রথমে নেওয়া যাক অসুবিধে হওয়ার দৃষ্টান্ত। বহুদিন-ব্যবহার-করা পোশাক ঢিলেঢালা হয়ে  নষ্ট হতে পারে ‘ফিটিং‘। বছর কয়েক চুটিয়ে পরিধানের পর  প্রায়শই দেখা যায়, পছন্দের ট্রাউজারের হাঁটুর কাছের কাপড় বেড়ে গিয়ে বেঢপ  লাগছে । পুরনো গাড়ির স্প্রিং ‘বসে যাওয়ায়‘ পাল্টাতে হয় ওগুলোকে।

এবার দেওয়া যাক শ্লথপ্রসারণ-জনিত সুবিধের উদাহরণ। পুরনো জুতো আরামপ্রদ হয়ে ওঠার পেছনে আসলে আছে শ্লথপ্রসারণ। ব্যাপারটা একটু খুলে বলি। নতুন জুতো পায়ের কোনও স্থানে আঁট হলে জুতোর চামড়ার সেই অংশে  টান পড়ে এবং এর প্রভাবে সেই জায়গার চামড়া ধীরে ধীরে প্রসারিত হতে শুরু করে। এভাবে জুতোর চামড়ার আকারগত পরিবর্তনের কারণে নতুন জুতোর অসুবিধেগুলো ক্রমশ দূর হয়ে যায়। কষ্টদায়ক নতুন জুতো সময়ের হাত ধরে  তাই কালক্রমে হয়ে ওঠে আরামপ্রদ পাদুকা !

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s