বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-অংকের বিচিত্র জগত-বৈজ্ঞানিক-বর্ষা ২০১৬

এই লেখার আগের সমস্ত এপিসোড এই লিংকে একত্রে

জ্যোতির্বিদ্যার এলাকায় ব্রহ্মগুপ্তের একটা প্রধান অবদান ছিল সূর্যগ্রহণ আর চন্দ্রগ্রহণ কখন কখন ঘটবে তার গাণিতিক হিসেব বের করা। সেইসঙ্গে, আকাশে নানান গ্রহতারার কখন উদয়-অস্ত ঘটবে তা নির্ণয় করবার অংকও তৈরি করেছিলেন তিনি। কিন্তু জ্যোতির্বিদ্যায় তার চেয়েও বড়ো একটা কাজ আছে ব্রহ্মগুপ্তের। সেইটা বলি এবারে।

ধরো তুমি মঙ্গলগ্রহে মহাকাশযান পাঠাবে। ২০১৬ সালের ১৫ জুন তোমার মহাকাশযান রকেতে চেপে আকাশে উঠল, তারপর ১৭ জুন পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতেঘুরতে নিজের যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক করে নিয়ে সে রওনা দিল মঙ্গলগ্রহের দিকে তাক করে। মঙ্গলগ্রহটা তখন আছে ধরো একটা নির্দিষ্ট অবস্থানে, তার নাম ‘ক’। তারপর বেশ ক’মাস চলে সে যখন ‘ক’তে পৌঁছুলো মঙ্গলগ্রহ তখন ঘুরতে ঘুরতে চলে গেছে আরেক জায়গায়। মহাকাশযান পৃথিবীতে খবর পাঠাল এখানে আকাশ ফাঁকা। মঙ্গলটঙ্গল কিচ্ছু নেই। তাহলে এর সমাধান কী? সমাধান হল একটা হিসেব। সেই গেছোদাদার গল্পের মতন। তোমার যানকে তাক করতে হবে যেখানে এখন মঙ্গল আছে সেইখানে নয়। তার বদলে তাকে তাক করা হবে, সে যখন মঙ্গলের কাছাকাছি পৌঁছোবে তখন আকাশের যে জায়গাটায় মঙ্গলের থাকবার কথা সেইখানটাতে। সেইজন্যে যে হিসেবটা খুব জরুরি তা হল, বিভিন্ন সময়ে একটা মহাজাগতিক বস্তু কোন কোন অবস্থানে থাকে সেটা।

মহাকাশযান যখন আমাদের কল্পনারও বাইরে ছিল সেই সময়ে বসে সে হিসেবটা কষেছিলেন ব্রহ্মগুপ্ত। ভাবো একবার!

বেদে বলা ছিল সূর্যের চেয়ে চাঁদ নাকি আমাদের থেকে দূরে আছে। মুনিঋষিদের দোষ নেই। তাঁরা তো আর অংকটংক কষেননি! চোখে দেখেন সূর্যের বেজায় তেজ, অতএব সে কাছে আছে ধরে নিয়েছিলেন। সে বিশ্বাসকে ভেঙে দিয়েছিলেন ব্রহ্মগুপ্ত। তিনি ব্যাখ্যা দিলেন, চাঁদের যে আলো, তা সূর্যের থেকে ধার করা।

ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্তের সপ্তম অধ্যায়ের নাম চন্দ্রকলা। এইখানে তিনি যে যুক্তি সাজালেন সেটাকে অনেকটা এইভাবে লেখা যায়-

চাঁদ আসলে সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়।

যদি চাঁদ সূর্যের থেকে ওপরে থাকত তাহলে তার দৃশ্যমান অংশ (বা চন্দ্রকলা। ইংরিজিতে crescent) বাড়ত কমত না। শুধু তার নীচের দিকটাই সবসময়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে থাকত।

সূর্যের নীচে (মানে সূর্য আর ভুপৃষ্ঠের মাঝে) একটা থালা ধরলে ঠিক যেমন তার সূর্যমুখী দিকটা উজ্জ্বল হয় আর তার উল্টোদিকটা অন্ধকার থাকে চাঁদেরও ঠিক তেমন হয়।

bigganongko01 (Medium)এবারে ধরো থালাটা সূর্যের সঙ্গে সমান্তরালভাবে আছে। তাহলে তখন তার একটা দিকে সূর্যের পুরো আলোটা সমানভাবে পড়বে। থালাটাকে এঁকিয়ে বেঁকিয়ে ধরলে তার যেদিকটা সূর্যের কাছে সেদিকে খানিকটা করে (মানে চন্দ্রকলার মতন) বেশি আলো পাবে। চাঁদও ঠিক সেইভাবে সূর্যের নীচে থাকলে তার আর সূর্যের আপেক্ষিক অবস্থানের মধ্যে কতটা কোণ হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন দিনে চন্দ্রকলার হ্রাসবৃদ্ধি হবে।

বাস্তবে দেখা যায় যে চন্দ্রকলার হ্রাসবৃদ্ধি হচ্ছে। অতএব চাঁদ, পৃথিবীর সাপেক্ষে সূর্যের নীচে (মানে সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে) আছে। অতএব, চাঁদ সূর্যের তুলনায় পৃথিবীর কাছে।

এইখানে একটা আকর্ষণীয় বিষয় বলি। আমাদের ভারতীয়দের কাছে যেমন বেদ হচ্ছে বেজায় পবিত্র জিনিস, খ্রিস্টানদের কাছে তেমনই পবিত্র বই যে বাইবেল সে তো জানো। তেরো শতাব্দি আগে ব্রহ্মগুপ্ত যখন অংক কষে বেদের একটা বিশ্বাসকে ভাঙলেন তখন কিন্তু তাঁকে কেউ বলেনি ব্যাটা বদমাশ বিধর্মী, তোকে ভীষণ পেটাব।বরং তাঁকে সম্মান করেছে, তাঁর গণিতকে সশ্রদ্ধায় স্বীকৃতি দিয়েছে।

অথচ, আজ থেকে মাত্রই চার-পাঁচ শতাব্দি আগে গ্যালিলিও আর ব্রুনো যখন মহাজাগতিক বস্তুদের নিয়ে বৈজ্ঞানিক সত্যকে উদঘাটন করলেন তখন তাঁদের খ্রিস্টান চার্চ কী করেছিল জানো? ব্রুনোকে পুড়িয়ে মেরেছিল আর গ্যালিলিওকে জেলে আটকে অত্যাচার করে বলতে বাধ্য করেছিল, যা বলেছি সব ভুল। আমায় ক্ষমা কর।

ভারতের মানুষ হিসেবে তাই ভীষণ গর্ব হয় আমাদের। আমাদের মানুষেরা ইউরোপিয়ানদের মতন অমন হিংস্র কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন না।

ফিরে আসা যাক গণিতের এলাকায়। ব্রহ্মগুপ্তের একটা বিরাট অবদানের কথা বলব এবারে। তার আগে একবার ফের আগে বলা ডায়োফান্টেন সমীকরণের কথা ঝালিয়ে নেয়া যাক। (এ অংশটা কিন্তু যারা ইশকুলে বিজোগণিত শিখতে শুরু করেছ তাদের জন্য)

কোন বহুরাশিক  (পলিনোমিয়াল) সমীকরণ, যাতে যতগুলো অজানা রাশি তার চেয়ে কম সংখ্যক সমীকরণ আছে এবং যার অজানা রাশিদের পূর্ণসংখ্যার সমাধানই খোঁজা হচ্ছে শুধু তাদের অংকের ভাষায় ডায়োফান্টেন সমীকরণ বলে। তৃতীয় শতাব্দিতে আলেকজান্দ্রিয়ার ডায়োফ্যান্টাস নামে এক গণিতজ্ঞ এই ধরণের সমীকরণের ওপরে গবেষণা করেছিলেন। তাঁর নামেই এ ধরণের সমস্যার এই নাম।

এই জাতের এক ঘাত সমীকরণ (মানে যাতে এ স্কোয়ার বি স্কোয়ার এইসব নেই। যেমন ax+by=c) সমাধান করবার জন্য আর্যভট তাঁর বিখ্যাত হামানদিস্তা বা কুটক পদ্ধতিবানিয়েছিলেন সে আগেই লিখেছি। এখন প্রশ্ন হল, সমীকরণটা যদি দ্বিঘাত হয় তাহলে কী করা হবে?

মানে ধর সমীকরণটা যদি হয় x2+ny2=1  যেহেতু এখানে দুটো অজানা রাশি আর একটাই সমীকরণ, তাই এখানে অগুন্তি সমাধান সম্ভব(দু এক পর্ব আগে আর্যভটের কুটক পদ্ধতির আলোচনা দেখ। নীচে লেখাটার লাইব্রেরি লিংক পাবে)। প্রশ্ন হল তাদের মধ্যে পুর্ণসংখ্যার সমাধান কী কী হবে? পেল নামের অনেক পরবর্তীকালের এক ইউরোপীয় গণিতজ্ঞের নামে এ জাতের ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণের নাম হয়েছে পেল-এর সমীকরণ। সে-ও এক মহা ভুল। গণিতজ্ঞ অয়লার ভুল করে ভেবেছিলেন এ সমীকরণ নিয়ে প্রথম কাজ বৃটিশ গণিতজ্ঞ পেল করেছেন। তাই তিনি একে এই নামে ডাকা শুরু করেন।

চেষ্টাচরিত্র করে খেটেখুটে নানান মান বসিয়ে বসিয়ে পরীক্ষা করে এর একটা দুটো মান বের করা যায়। n=2, এইক্ষেত্রে, মানে x2+2y2=1 এই সমীকরণের জন্য যেমন বৌধায়ন বহু খেটেখুটে খুঁজে পেয়েছিলেন দুটো সমাধান= x = 17, y = 12 and x = 577, y = 408 

২৫০ খ্রিস্টাব্দে ডায়োফ্যান্টাস a2x2 + c =y2 এই চেহারার একটা সমীকরণ ধরে a আর c এর  (1,1), (1,−1), (1,12), (3,9) এই মানগুলোর জন্য মহা খাটাখাটুনি করে, নানান সংখ্যা দিয়ে পরীক্ষা করে করে পূর্ণসংখ্যার সমাধান বের করেছিলেন কয়েকটা। দশম শতকে পারস্যের গণিতজ্ঞ আল কারাজি, তিনিও এ জাতের একটা সমীকরণের কিছু সমাধান বের করেছিলেন। 

কিন্তু আরো তো অসংখ্য পূর্ণসংখ্যার উত্তর হতে পারে এ জাতের সমীকরণের! সেগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে কী করে?

উত্তর সহজঃ কমপিউটারে একটা প্রোগ্রাম বানিয়ে দাও। সে দিনরাত খেটেখুটে একের পর এক উত্তর দিয়ে যাবে। কিন্তু কমপিউটার মানুষের কল্পনাতে আসবার বহু আগে ব্রহ্মগুপ্ত কিন্তু এর যত উত্তর সম্ভব সেই সবকটাকে বেশি খোঁজাখুঁজি না করে একটা গাণিতিক যন্ত্র বের করে ফেলেছিলেন। যন্ত্র মানে লোহালক্কর নয়। একখানা ফরমুলা। এ জাতের যেকোন সমীকরণের মাত্র দুখানা উত্তর যদি কেউ খেটেখুটে বের করে ফেলতে পারে তাহলে ব্রহ্মগুপ্তের যন্ত্রে ফেলে তার আরো যতখুশি উত্তর সে বের করে ফেলতে পারবে শুধু যোগবিয়োগগুণ করেকরেই। সেইটা এইবার বলব।

ব্রহ্মগুপ্ত একটা অভেদ বা identity তৈরি করলেন প্রথম।

সেটা এই রকমঃ

 x2-ny2  এইভাবে যে সংখ্যাদের লেখা যায় তাদের যেকোন দুটোকে যদি গুণ কর তাহলে গুণফলটাকেও এইভাবে লেখা যাবে। আর সেই গুণফলের চেহারাটা হবে এইরকম

(x12-ny12)( x22-ny22) =[x1x2-ny1 y2]2 – n[x1y2-y1x2]2

দেখা যাক কথাটা কতটা সত্যিঃ

ধরো ১৭–>   ১৭ = ১-(-৪)x ২

আবার ধরো ৪০–> ২-(-)৪x ৩

এই দুটো সংখ্যার গুণফল হল ৬৮০à [1×2-(-4)x2x3]2 –(-)4x[1×3-2×2]2

অংকের ভাষায় বললে সেটা এইরকম দাঁড়ায়ঃ

ধরো সমীকরণটা হল x2-ny2=1

বহু খেটেখুটে ধর তার দু সেট সমাধান বের হলঃ x1,y1, এবং x2,y2

তার মানে

 (x12-ny12)( x22-ny22) = 1 x 1 =1

ব্রহ্মগুপ্তের অভেদ কাজে লাগালে

(X12-ny12)( X22-ny22) = [x1x2-ny1 y2]2 – n[x1y2-y1x2]2

তাহলে [x1x2-ny1 y2]2 – n[x1y2-y1x2]=1

সেক্ষেত্রে সমীকরণটার আর এক সেট সমাধান বের হলà

x= x1x2-ny1 y2  ,   y= x1y2-y1x2

এইবারে এর যেকোন দুটো সমাধানকে ধরে নিয়ে ফের একই কায়দা করে যেতে থাকলে যত ইচ্ছে তত সমাধান মিলবে সমীকরণের।

কায়দাটা ইউরোপে ফার্মা, লেগ্রাঞ্জ ইত্যাদিদের হাতে পুণরাবিষ্কার হতে এর পর সময় লেগে গিয়েছিল প্রায় এক হাজার বছর।

ক্রমশ