বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-আগামীকালের বিজ্ঞান-ইন্দ্রশেখর-বর্ষা ২০১৬

ম্যামথরা আসছে–

bigganashcorjo01 (Medium)

৪০০০ বছর আগে রোমশ ম্যামথরা অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল পৃথিবীর বুক থেকে। তাদের ছিল পাহাড়ের মত চেহারা,বিরাট বিরাট দাঁত আর সারা গায়ে মোটা কম্বলের মতন লোম। তুষারযুগের ভয়াল ঠান্ডাকে আটকে দিত তাদের গায়ের সেই লোমের চাদর।

আমাদের বিজ্ঞান তখন সবে হাঁটতে শিখছে। প্রকৃতি সেই ম্যামথদের কয়েকটির শরীর নানান জায়গায় গভীর বরফের তলায় সংরক্ষণ করে রেখে দিয়েছিলেন আমরা যখন বড়ো হব তখন আমাদের দেবেন বলে।

একুশ শতকে এসে বিজ্ঞান পরিণত হল। আমরা বড়ো হলাম। তার আগেই বরফের তলা থেকে খুঁজে পাওয়া গেছে সেই ম্যামথদের শরীর। আমরা জেনেছি, কোষের মধ্যে যে নিউক্লিয়াস থাকে তার মধ্যে থাকে একধরণের প্রোটিন যার নাম ডি এন এ। সেই ডি এন এ সহজে নষ্ট হয় না। তাই দিয়ে তৈরি হয় জিন। এই জিনের মধ্যে রাসায়নিক সংকেতে লেখা থাকে একটা প্রাণী দেখতে কেমন হবে, কেমন হবে তার হাত পা, চেহারা, তার দেহের নানান যন্ত্রপাতি।

উত্তরমেরুর বরফ থেকে তুলে আনা এমনই একজন বরফে জমাট ম্যামথের শরীরের চামড়ার কোষ থেকে  এবারে হার্ভার্ডের বিজ্ঞানি জর্জ চার্চ বেছে নিয়েছেন চোদ্দোখানা বাছাই করা জিন, যে জিনেদের মধ্যে লেখা আছে ম্যামথের বিরাট চেহারা, তার দীর্ঘ দাঁত কুলোর মতন কান, রক্তের হিমোগ্লোবিনের আধিক্য আর তার শরীরের কম্বলের মতন লোমের ঢাকনা তৈরির সংকেত।

এইবারে একটা সাধারণ এশিয়ান হাতির চামড়ার একটা কোষ বেছে নিয়ে তার নিউক্লিয়াসের মধ্যে এই জিনগুলোকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। কোষগুলো বেঁচে রয়েছে তার পরেও।

সামনে বিজ্ঞানিদের এখন অনেক কাজ। এই কোষদের টিকিয়ে রাখা, তা থেকে সাধারণ হাতি আর ম্যামথের মিশ্রণের ভ্রূণ তৈরি করে তাকে কৃত্রিমভাবে যন্ত্র পেটের ভেতর বড়ো করে জন্ম দেয়া, তারপর তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে উত্তরের শীতল অঞ্চলে বাঁচতে শেখানো—অনেক কাজ তাঁদের হাতে।

মানুষকে তো সবাই বদনাম করে যে প্রকৃতি যা বানান মানুষ তা ধ্বংস করে। এইবারে তার উল্টোটা হবার আশা দেখা দিয়েছে। প্রকৃতি যাদের ধ্বংস করেছেন নিজের হাতে, মানুষ তাকে ফিরিয়ে আস্নবে বলে কোমর বেঁধেছে। এতে প্রকৃতি মা বোধ হয় খুশি হবেন, কী বলো?

অন্ধজনে দেহ আলো

সেলুলার ডাইনামিকস ইনটারন্যাশনাল নামে একটা কোম্পানি একটা স্টেম সেল-এর ফ্যাক্টরি বানিয়েছে। স্টেম সেল কাকে বলে? তুমি যখন প্রথম সৃষ্টি হলে তখন কিন্তু তুমি ছিলে মাত্রই একখানা কোষ। আমরা সবাই তাই ছিলাম। সেই একখানা কোষের মধ্যে ছিল তোমার দেহের বিভিন্ন ধরণের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কোষের বৈশিষ্ট্যের সংকেত লেখা সমস্ত জিনের দল। এইবারে সেই কোষ যখ বিভাজিত হয়ে দলে দলে কোষ তৈরি করতে শুরু করল, তখন এক এক দল কোষের মধ্যে এক এক অঙ্গের কোষের বৈশিষ্ট্যের সংকেত লেখা জিনেরা জেগে রইল আর বাকিরা ঘুমিয়ে পড়ল। একদল কোষের মধ্যে জেগে রইল স্নায়ুকোষ তৈরির জিনেরা, বাকিরা ঘুমিয়ে গেল। আবার আর এক দল কোষের মধ্যে জেগে রইল হাড় তৈরির জিনেরা, বাকিরা ঘুমিয়ে গেল। এইবারে যাদের মধ্যে যে জিনেরা জেগে রইল সেই কোষের দল সেইভাবে বদলে বদলে গিয়ে শরীরের নানা অঙ্গ তৈরি করল, আর তাদের মিলিয়ে তুমি তৈরি হলে আর জন্ম নিলে।

কিন্তু শুরুর কোষটা? তার মধ্যে কিন্তু সমস্ত সংকেতের জিনেরাই একসঙ্গে জেগে ছিল। তেমন একটা কোষ পেলে তা থেকে প্রকৃতির এই পদ্ধতিটা অনুসরণ করে একটা গোটা প্রাণীকেই গড়ে ফেলা যায়।

এই ধরণের সম্পূর্ণ জেগে থাকা জিনের দলওয়ালা কোষকে স্টেম সেল বলে। অনেক সময় দেহের যেকোন জায়গা থেকে একটা কোষকে তুলে নিয়ে যদি তার মধ্যের ঘুমন্ত জিনগুলোকে জাগিয়ে তোলা যায় তাহলে সেইটেই বদলে গিয়ে স্টেম সেল এ পরিণত হতে পারে।

bigganashcorjo02 (Medium)

কারখানার পাত্রে সৃষ্টি হচ্ছে রড ও কোন কোষেরা (বিবর্ধিত ছবি)

এমনই স্টেম সেল-এর কারখানা গড়েছে ওপরে নাম বলা কোম্পানিটা। সেই থেকে তারা তৈরি করছে মানুষের চোখের ভেতরে থাকা আলো আর রঙ টের পাবার কোষ রড আর কোন কোষদের। রড আর কোন কোষ নষ্ট হয়ে গিয়ে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। পৃথিবীতে বহু মানুষ বয়স বা অন্য রোগে এইভাবে অন্ধ হয়ে বেঁচে থাকে। এই কারখানায় বানানো কোষদের নিয়ে তাঁদের অক্ষিপটে বসিয়ে দিলে তাঁরা আর অন্ধ থাকবেন না। এই মুহূর্তে মানুষের ওপরে এই কোষগুলো নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চলেছে। সফল হলে পরে পৃথিবীতে আর কাউকে অন্ধ হয়ে থাকতে হবে না।