বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-আবিষ্কারের খোঁজখবর-রাজীব কুমার সাহা-বর্ষা ২০১৬

bigganabishkar01 (Medium)

পাথরের যন্ত্রপাতি (খ্রিষ্টপূর্ব ৩,৩০০,০০০ – ২,৬০০,০০০)

এই নীলগ্রহের আদিম মানবেরা যে জিনিসটা সর্বপ্রথম সফলভাবে ব্যবহার করতে শিখেছিল সেটা হচ্ছে একটা পাথর। সে কী! একটা সাধারণ পাথর! সে তো হামেশাই আমরা রাস্তাঘাটে পড়ে থাকতে দেখি!

জেনে রেখ, এই পাথরই ছিল একটা অত্যাধুনিক সভ্যতায় প্রবেশের প্রথম পদক্ষেপ। তারপর খেলার ছলে নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়ে আস্তে আস্তে তৈরি হল নানান প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। বনের ফলমূল আর পোকামাকড় খাওয়া আদিম জাতি এই পাথরের টুকরোয় শান দিয়ে অস্ত্র বানিয়ে পশুপাখি শিকার করতে শিখল।

ধীরে ধীরে এই এক টুকরো পাথরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল সমগ্র মানব জাতি। অনেক অসাধ্য কাজ এই পাথরের সাহায্যে সাধন করা সম্ভব হল। যেমন, পশু শিকার থেকে আরম্ভ করে, চামড়া ছাড়ানো, মাংস কাটা, গাছের ডালপালা কাটা আর আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসেবে পাথরের কদর বেড়ে উঠল ক্রমশ। শুধু তাই নয়, এই পাথরের ব্যবহারবিধি নির্ণয় করেই মানুষ পশুর চামড়া ছাড়িয়ে পাথরের সাহায্যে পরিষ্কার করে পোশাক বানিয়ে গায়ে দিতে শিখল। সূচনা হল পুরাপলীয় যুগের।

প্রথমে ১৯৬৯ সালে কেনিয়ায় আদিম মানবের ব্যবহৃত পাথরের অস্ত্র খুঁজে পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা এগুলো প্রায় ২,৬০০,০০০ বছরের পুরনো বলে ধারণা করেন। তারপর ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কেনিয়ারই লেক তুর্কানা-তে যেসব পাথরের যন্ত্রপাতি পাওয়া যায় সেগুলোর বয়স প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন বছর বলে ঘোষণা করা হয়। “The best materials…include obsidian (a form of natural glass), chert, flint and chalcedony.” – Floyd Largent, writer.

নিয়ন্ত্রিত আগুন (খ্রিষ্টপূর্ব ১,৪২০,০০০)

আদিম জাতি (হোমো ইরেক্টাস) যে জিনিসটির হাত ধরে আক্ষরিক অর্থে সভ্যতার জগতে পা রাখে তা হল আগুন।  আগে খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০,০০০ এর আশেপাশে জীবিত লোকদের আগুনের ব্যবহারকারী হিসেবে ধারণা করা হলেও শেষে ১৯৮১ সালে কেনিয়া এবং ১৯৮৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রমাণ পাওয়া যায় যে প্রায় ১৪,২০,০০০ বছর আগেও মানুষ আগুনের ব্যবহার জানত। হার্ভার্ডের নৃতত্ত্ববিদ রিচার্ড র‍্যাংহ্যাম মনে করেন, রান্না করা খাবার-দাবার মানুষের মস্তিষ্ককে উর্বর করে তোলে। আর আগুন ব্যবহার করে রান্না করা খাবার খেয়ে আদিম জাতি কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের পর বর্তমান হোমো সেপিয়েন্স-এ রূপান্তরিত হয়েছে।

bigganabishkar02 (Medium)প্রশ্ন হচ্ছে, আগুন এল কোত্থেকে? কীভাবে আবিষ্কৃত হল? কী করেই বা খোঁজ মিলল? এই জটিল প্রশ্নের ব্যাখ্যা আজও তেমন সঠিকভাবে মেলেনি। তবে নানা মুনির (বিজ্ঞানীর) নানা মত মিশিয়ে মোটামুটি সর্বজনস্বীকৃত যে ব্যাখ্যা দাঁড়ায় তা হল, আগুন সৃষ্টি হয়েছে প্রাকৃতিকভাবেই। আদিম মানুষ সন্ধান পেয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। তারপর নিজেদের উষ্ণ রাখতে, খাবার-দাবার তৈরি করতে আগুনের ব্যবহার করায়ত্ত করে ফেলে ধীরে ধীরে। এছাড়াও শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে বা হিংস্র জীবজন্তু থেকে নিজেদের রক্ষা করতে আগুনের ব্যবহার শুরু করে। তারপর এক সময় ঘন বনজঙ্গল পরিষ্কার করে রাস্তা তৈরির কাজে, কৃষিকাজে, বিভিন্ন ধাতুর গলিয়ে জিনিসপত্র তৈরির কাজে আগুনের যথাযথ ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত হয়ে পড়ে। আগুন আদিম মানুষকে প্রস্তরযুগ থেকে চিরতরে মুক্তি দেয়। “Seek wood already touched by fire. It is not then so very hard to set alight.” – African proverb.

নিরাপদ আশ্রয় (খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০,০০০)


“…next to agriculture, shelter is the most necessary to man. One must eat, one must have shelter.” – Philip Johnson, architect.

মনে করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০,০০০ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০,০০০ পর্যন্ত ইউরোপে একটা আদিম জাতি বসবাস করত। তাদের সপক্ষেই প্রথম ঘর-দুয়ার বানিয়ে থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই জাতিকে হোমো হেইডেলবারজেনসিস নামে আখ্যা দেওয়া হলেও তারা হোমো সেপিয়েন্স না হোমো নিয়ানডারথ্যালেনসিস প্রজাতির পূর্বসূরি ছিল তা নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে। ফ্রান্সের টেরা আমাটা অঞ্চলে bigganabishkar03 (Medium)প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রায় ৪০০,০০০ বছর পুরনো এক ধরনের ডিম্বাকৃতি কুঁড়েঘরের ভিতের হদিশ পান। তেমনি ২০০০ সালে জাপানেও ৫০০,০০০ বছরেরও বেশি পুরনো এই ধরনের আদিম জাতি দ্বারা তৈরি আশ্রয়ের সন্ধান মেলে। উত্তর টোকিওর চিচিবু-এর পাহাড়ি অঞ্চলে এই ধরনের কুঁড়েঘরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয় যেগুলোর আশেপাশে মোট ত্রিশটা আদিম মানব ব্যবহৃত পাথরের যন্ত্রপাতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়।

আমরা সবাই জানি যে, আমাদের পূর্বপুরুষরা গুহার ভেতরে বাস করতেন। আর সেগুলো তাঁরা জল, খাবার-দাবার যেখানে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত সেখানেই তৈরি করতেন।

পোশাক-পরিচ্ছদ (খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০,০০০) —

bigganabishkar04 (Medium)খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৪০০,০০০ বছর আগে হোমো সেপিয়েন্স নিজেদের অনাবৃত শরীর আবৃত করার পন্থা উদ্ভাবন করে। নৃতত্ত্ব এবং প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মনে করেন, আদিম মানুষ গাছের ছাল, বড় বড় পাতা ও শিকার করা পশুদের চামড়া দিয়ে নিজেদের পোশাক-আশাক তৈরি করত। ফলে এরা প্রচণ্ড শীত, বৃষ্টি বাদল আর বাতাস থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়। যদিও এই আবিষ্কারের সঠিক দিনক্ষণ বের করা খুবই কঠিন, তবুও প্রত্নতত্ত্ববিদেরা ১৯৮৮ সালে রাশিয়ার কোস্টেনকির কাছাকাছি প্রায় ৩০,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের প্রাচীন কিছু হাড়ের তৈরি সেলাই করার সূচ খুঁজে পান। র‍্যালফ কিটলার, ম্যানফ্রেড ক্যায়সার এবং মার্ক স্টোনকিং – এই তিন নৃতত্ত্ববিদ কিছু উকুনের জিনগত পরিকাঠামো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখতে পান যে এদের জিনের বয়স প্রায় ১০৭,০০০ বছর পুরনো। আবার কিছু সংখ্যক বিশ্লেষক অন্য আরেকটি বিশ্লেষণায় উকুনের জিনকে ৫৪০,০০০ বছর পুরনো বলেও দাবি করেন। যেহেতু আদিম জাতির সারা শরীর রোমাবৃত ছিল এবং উকুনকে বাঁচতে গেলে পোশাক-আশাকের সাহায্য নিতে হয় তাই উকুনের জিনের বয়স নির্বাচন করে আদিম জাতির প্রথম পোশাক তৈরির কাল নির্ণয় করা হয়। “Clothes make the man. Naked people have little or no influence in society.” – Mark Twain, More Maxims of Mark (1927)

বর্শা (খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০,০০০) —

bigganabishkar05 (Medium)সেনেগালের কেডৌগৌ নামক স্থানে শিম্পাঞ্জিদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণকালে দেখা যায়, ওরা গাছের শক্ত ডাল ভেঙে নিয়ে ছাল আর শাখাপ্রশাখা ছাড়িয়ে নিজেদের দাঁতের সাহায্যে ডালের একপ্রান্ত ছুঁচলো করে নিয়ে বেশ বিপজ্জনক ধরনের বর্শা বানিয়ে ফেলে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে এই ধরনের বর্শা প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০,০০০ বছর আগে ব্যবহৃত হত। জার্মানির ব্রেমেন-এর কাছাকাছি অঞ্চলেও শিকারিরা ঠিক এই ধরনের বর্শার সাহায্যেই শিকার করত বলে প্রমাণ রয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০,০০০ বছর আগে এই গাছের ডালের বর্শাগুলো আগুনে সেঁকে আরও শক্ত করে নেওয়া হত বলে ধারণা করা হয়। তারও আগে খ্রিষ্টপূর্ব ২৮০,০০০-এর আশেপাশের সময়ে গাছের ডালের একপ্রান্তে ছুঁচলো পাথর বেঁধে বর্শা তৈরি করে শিকার করত আদি মানব। এই দিয়ে এরা গোটা একটা ম্যামথ শিকার করতেও পিছপা হতো না। জার্মানির ব্রেমেন অঞ্চলে ঠিক এই জাতীয় বর্শাবিদ্ধ ম্যামথের কঙ্কাল আবিষ্কার তাই প্রমাণ করে। সাহারা আর মধ্য আমেরিকাতেও এই ধরনের বর্শার সাহায্যে শিকারের প্রমাণ পাওয়া যায়।

তারপর ধীরে ধীরে মানুষ যখন ধাতুর ব্যবহার শিখল তখন শিকারের ক্ষেত্রে পাথরের বদলে ধাতুর ফলা কাজে লাগাতে লাগল। শিকার করার সুবিধাও বেড়ে গেল অনেকখানি।

এরপর পরের সংখ্যায়