বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-আবিষ্কারের কাহিনি রাজীব কুমার সাহা শীত ২০১৬

আগের পর্বগুলো

এই নীলগ্রহের জন্মলগ্ন থেকেই ঘটে চলেছে কতই না আজব কাণ্ডকীর্তি। বিশেষত মানুষ বা তার পূর্ব প্রজাতির সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন আবিষ্কার। আদিযুগ থেকে বিভিন্ন খোঁজ আর আবিষ্কারের যথাসম্ভব তথ্য ক্রমানুসারে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে এই বিভাগে।

bigganabishkar1

বর্শা ছোঁড়ার কল (Atlatl) (খ্রিস্টপূর্ব ২৩,০০০)

পঞ্চদশ শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে স্পেনের আদিবাসীরা যখন মধ্য মেক্সিকোর আদিবাসী অ্যাজটেকদের সান্নিধ্যে এল তখন এদের বর্শা ছোঁড়ার কৌশল দেখে স্পেনীয়রা হয়রান হয়ে গেল। অ্যাজটেকরা প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২৩,০০০-এর সময়কার উদ্ভাবিত বর্শা ছোঁড়ার কলের সাহায্যে লম্বা দূরত্বে থাকা শিকারকে অনায়াসে লক্ষ্যভেদ করতে পারত। মাত্র দুই ফুট লম্বা একটা বিশেষভাবে তৈরি কাঠের টুকরোর সাহায্যে ছয় ফুট লম্বা পাথরের ফলক লাগানো একটা তীক্ষ্ণ বর্শাকে অসাধারণ কৌশলে দ্রুতগতিতে ছুঁড়ে দিতে পারত এরা। খালি হাতে বর্শা ছোঁড়ার চেয়ে এই কৌশলে শক্তি অনেকগুণ বেশী প্রয়োগ করা যেত বলে অস্ত্রটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে শিকারকে আঘাত করত। আগায় লাগানো পাথরের ফলকটার ওজনের তারতম্য ঘটিয়ে আর শিকারের আপাত-দূরত্ব মেপে নিয়ে এই কৌশল প্রয়োগ করা হত। শিকার অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী হলে পাথরের ফলকের ওজন বাড়িয়ে দেওয়া হত। এতে অনেক সময় কল থেকে নির্গত বর্শার গতি ঘণ্টায় ১৬০ কিমিও ছাড়িয়ে যেত। এই কলের আবিষ্কারের প্রায় ২৫,০০০ বছর পরেও কেউ কেউ সখের বশবর্তী হয়ে এই কৌশলে বর্শা ছোঁড়া অনুশীলন করেন এখনও।

     “The atlatl is the tool ancient peoples used to ‘bring home the bacon’.” – Robert ‘Atlatl Bob’ Perkins, (Primitive Technologist)

 

তির-ধনুক (Bow and Arrow) (খ্রিস্টপূর্ব ২০,০০০)

bigganabishkar5শৈশবে বা প্রাক-কৈশোরে তির ধনুক নিয়ে রাম রাবণের যুদ্ধে মেতে ওঠেনি এমন লোকের সংখ্যা বোধহয় হাতে গোনা যায়। কিন্তু আদিমজাতি এই তির ধনুকের ব্যবহার করতে শিখেছিল সেই পুরাতন প্রস্তর যুগে প্রায় ২০,০০০ খ্রিস্টপূর্বে। পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকায় কিছু গুহাচিত্রে আদিম মানব কর্তৃক ব্যবহৃত তির ধনুকের প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্শা দিয়ে শিকার করার চেয়ে তির ধনুকের ব্যবহার সহজতর হওয়ার সুবাদে অচিরেই তা গুহামানবদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে। তিরন্দাজের পেশির শক্তি ছিলার টানের সাথে সাথেই ধনুকের মধ্যে সংরক্ষিত হওয়ার ফলে এটা পৃথিবীর সর্বপ্রথম শক্তি সংরক্ষক কল হিসেবে সমাদৃত হয়। ছিলা টেনে তির ছেড়ে দিলে তা বর্শার চেয়ে অনেক বেশী দূরত্ব অতিক্রম করার ফলে এই পদ্ধতি শিকারের ক্ষেত্রে বর্শার প্রয়োজনীয়তাকে দূর করে দেয়। বায়ু-গতিবিদ্যার ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আদিমানব তিরকাঠির পেছনে পাখির পালক লাগিয়ে তা ব্যবহার করত।

     “Whose arrows are sharp, and all their bows bent, their horses’ hoofs shall be counted like flint…” – Isaiah 5:28

বুম্যর‍্যাং (Boomerang) (খ্রিস্টপূর্ব ১৮,০০০)

bigganabishkar3bigganabishkar4
কার্টুন ‘জঙ্গল বুক’-এর মোগলির কথা মনে আছে তো? যে কিনা একটা ঈষৎ বাঁকানো কাঠের টুকরো বিশেষ দক্ষতায় ছুঁড়ে মারত গাছগাছালিতে লুকিয়ে থাকা শত্রুর গায়ে আর কাঠের টুকরোটাও শত্রুকে ঘায়েল করে মুহূর্তেই আবার ফিরে আসত মোগলির হাতে? হ্যাঁ, এই ধরনের অস্ত্রকেই বুম্যর‍্যাং বলে যেগুলো লক্ষ্যভেদ করে আবার ফিরে আসে নিক্ষেপকের হাতে। আদিমানব কিন্তু প্রায় ১৮,০০০ খ্রিস্টপূর্বেই এই বিদ্যা রপ্ত করে ফেলেছিল। তবে এই অদ্ভুত অস্ত্রটি অ্যাবরিজিনীজ (অস্ট্রেলিয়ার আদিমজাতি) সম্প্রদায়ের আবিষ্কার বলে গণ্য করা হয়। ভৌগোলিক উৎপত্তি এবং কর্ম-উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে এরা বিভিন্ন আকার এবং ধরনের বুম্যর‍্যাং বানাত। জানা যায়, ইউরোপে এক ধরনের আদিমজাতি বুম্যর‍্যাং হিসেবে কুড়োল ছুঁড়ে মারত শিকার বা শত্রুপক্ষের গায়ে। এই পর্যন্ত পোল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত কার্পেথিয়ান পর্বতমালার গুহায় আবিষ্কৃত বুম্যর‍্যাংকেই প্রাচীনতম বলে ধরা হয়। পরীক্ষাগারে এই বুম্যর‍্যাংয়ের বয়স খ্রিস্টপূর্ব ১৮,০০০-এর কাছাকাছি বলে প্রমাণিত হয়।

 

 বিনুনি দড়ি (Braided Rope) (খ্রিস্টপূর্ব ১৭,০০০)

bigganabishkar6মানবজাতির সভ্যতার অগ্রগতির ক্ষেত্রে দড়ি-কাছির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা বলাই বাহুল্য। আর এই দড়ি পাকিয়ে বিনুনির মতো আকৃতি দিয়ে মানুষ যে খ্রিস্টপূর্ব ১৭,০০০-এর নিকটবর্তী সময়েই এর ব্যবহার করতে শিখে গিয়েছিল তা দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের ল্যাস্কক্স-এর গুহাগুলোয় আবিষ্কৃত প্রমাণ তার সাক্ষ্য বহন করে। ধারণা করা হয়, গাছগাছড়ার শেকড় বা শক্তপোক্ত লতা দিয়ে পাকানো মজবুত এই দড়ির সাহায্যে আদিমানব শিকারের যন্ত্রপাতি, ভারী পাথরখণ্ড বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একস্থান থেকে অন্যস্থানে পরিবহণ করত। পরবর্তীকালে মিশরীয়রা প্রায় ৪০০০ খ্রিস্টপূর্ব কালে উন্নতধরনের দড়ি-দড়ার জন্ম দেয়। এরা ওয়াটার রীড নামে একপ্রকার ঘাস, চামড়া আর পশুদেহের চুল দিয়ে একধরনের মজবুত দড়ি তৈরি করত। এই দড়ির সাহায্যেই তারা বিশালাকৃতির পিরামিডগুলো তৈরি করেছিল যা আজও নিজস্ব মহিমায় ভাস্বর। ২৮০০ খ্রিস্টপূর্বে চীনারা হেম্প গাছের তন্তু দিয়ে দড়ি তৈরি করতে শেখে যা ধীরে ধীরে সারা এশিয়া মহাদেশে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

চান্দ্র পঞ্জিকা (Lunar Calendar) (খ্রিস্টপূর্ব ১৫,০০০)

bigganabishkarlunarচন্দ্রের বিভিন্ন কলা বা দশার ওপর ভিত্তি করে আদিম মানব প্রতি ২৯.৫৩০৫৮৮ দিনে একমাস হিসেবে চন্দ্র পঞ্জিকা তৈরি করত। প্রথম মাস ২৯ দিনে এবং পরবর্তী মাস ৩০ দিনের পালা করে মাসের হিসেব করা হত যাতে চন্দ্রের দশা বা কলার সাথে সমঞ্জস্য রক্ষা করা যায়। প্রাচীনতম চন্দ্র পঞ্জিকাটি দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের ল্যাস্কক্স-এর গুহায় আবিষ্কৃত হয় যার বয়সকাল খ্রিস্টপূর্ব ১৫,০০০ বলে অনুমিত হয়। আবিষ্কর্তা জার্মান গবেষক Dr. Michael Rappenglueck-এর ভাষায়, “They were aware of all the rhythms of nature. Their survival depended on them…”

“Day is pushed out by day, and each new moon hastens to its death…” – Horace, Odes, Book II

 সুরা (Alcoholic Drink) (খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০)

প্রাগৈতিহাসিক যুগে দৈবাৎ জল এবং ফল-ফলাদির মিশ্রণ প্রখর সূর্যতাপে গেঁজিয়ে ওঠে প্রথম সুরা আবিষ্কৃত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সময় ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০। কারণ, নিওলিথিক যুগে আদিমানব যে সুরা তৈরি করতে শিখে গিয়েছিল, সেই সময়কার বিয়ার জাগ আবিষ্কার তার সাক্ষ্য বহন করে। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায়ও পানীয় হিসেবে সুরার প্রচলনের দৃঢ় প্রমাণ মেলে। খ্রিস্টপূর্ব ৭,০০০-এর কাছাকাছি সময়ে চিনে এবং ৩,০০০ থেকে ২,০০০ খ্রিস্টপূর্ব হতেই ভারতবর্ষে সুরা প্রচলিত ছিল। ২,৭০০ খ্রিস্টপূর্বের সমসাময়িকে ব্যবিলনিয়রা এক মদ্যদেবীর আরাধনা করত।

মৃৎশিল্প (Pottery) (খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০)

bigganabishkar8মৃৎশিল্প হচ্ছে পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম মানবসৃষ্ট কোনও কৃত্রিম উপাদান। মৃৎশিল্পের প্রাচীনতম উদাহরণ মেলে জাপানের ওডাই ইয়ামামোতো নামক স্থানে। মতান্তরে, ১৯৬০ সালে জাপানের নাসুনাহারা-এর কিউসু দ্বীপে পাওয়া যায় মাটির তৈরি প্রাচীন বাসনকোসন। ধারণা করা হয়, তৎকালীন সময়ের যাযাবর শ্রেণীর রাখালজাতীয় আদিম মানব দ্বারা এগুলো নিজেদের গুহায় সংরক্ষিত হয়েছিল। প্রায় ১৩,০০০ বছর আগে জাপানের জোমোন শ্রেণীর লোকেরা কারুকার্য করা মৃৎপাত্র নিজেদের খাবারদাবার তৈরি করতে ব্যবহার করত বলে জানা যায়।

গুলতি (Sling) (খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০)

bigganabishkar11গুলতি জিনিসটা দেখেনি বা শোনেনি এমন লোক হয়তো মেলা ভার। হ্যাঁ, ছুঁড়েনি বা ওটা নিয়ে খেলেনি এমন মানুষ অনেকেই আছেন। জিনিসটা দেখতে ছোট্ট একটা আদিম অস্ত্র যা পৃথিবীর বুকে প্রায় ১০,০০০ খ্রিস্টপূর্বেই জন্ম নিয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা একমত। বাইবেলের ডেভিড ও গোলিয়াথের বিখ্যাত গল্পগাঁথাতেও প্রাচীন গুলতির উল্লেখ পাওয়া যায়। পেরুর উপকূলে আমেরিকার প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ দ্বারা উদ্ধারকৃত গুলতিই এই অবধি প্রাচীনতম হিসেবে ধরা হয়। পরীক্ষাগারে রেডিও কার্বন পরীক্ষা দ্বারা এর বয়স ২৫০০ খ্রিষ্টপূর্ব বলে স্থির করা হয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বিশ্বাস করেন এর থেকে অনেক প্রাচীনতর নিদর্শনও মিলবে একদিন। তাছাড়া তুতনখামেনের সমাধিতেও ১৩২৫ খ্রিস্টপূর্ব সময়কার গুলতি আবিষ্কৃত হয়।

তেলের প্রদীপ (Oil Lamp) (খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০)

bigganabishkaroillampsআদিম মানব কৃষিকাজে উন্নতির পাশাপাশি ধাপে ধাপে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার্য যেসব জিনিসের আবিষ্কার করতে থাকে সেগুলোর মধ্যে তেলের প্রদীপ অন্যতম। কিছু কিছু প্রত্নবিজ্ঞানীরা এর আবিষ্কার খ্রিস্টপূর্ব ৮০,০০০ থেকে ৭০,০০০-এর মধ্যে অনুমান করলেও মানুষ খ্রিস্টপূর্ব ১৫,০০০ থেকে ১০,০০০-এর মধ্যেই এর ব্যবহার শুরু করে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফ্রান্সের দোরদোনিস অঞ্চলের লাসসিউ নামক স্থানে এক গুহায় প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রদীপ আবিষ্কৃত হয় ১৯৪০ সালে। ধারণা করা হয়, খাঁজবিশিষ্ট পাথর অথবা পাথর কেটে খাঁজ তৈরি করে তাতে বিভিন্ন পশুপাখির শরীরের চর্বি জমিয়ে এই প্রদীপ জ্বালানো হত। সলতে হিসেবে শুকনো কোনও শস্যের গাছের টুকরো ব্যবহার করা হত। পরবর্তীকালে কৃষিকাজের উন্নতির সাথে সাথে এতে চর্বির বদলে অলিভ অয়েল ব্যবহৃত হতে শুরু করে আর পাথরের বদলে টেরাকোটা কাজযুক্ত পোড়ামাটির প্রদীপ বানাতে শেখে মানুষ। ধর্ম যাই হোক না কেন, বিভিন্ন পুজোপাঠ, উপাসনা প্রভৃতির ক্ষেত্রে একটা প্রদীপের শিখা যে অনন্ত পবিত্রতার পরিচায়ক হিসেবে আমাদের মনে শ্রদ্ধা ভক্তির উন্মেষ ঘটায় তার ধারণাটা কিন্তু সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই চলে আসছিল।

খামার (Granary) (খ্রিস্টপূর্ব ৯৫০০)

আদিম মানুষ ফসল উৎপাদন শিখল। কিন্তু এগুলো সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা চাই। নয়তো ঝড় বৃষ্টি পশুপাখির হাত থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না। তৈরি হল খামারবাড়ি। আর আদিমানব দ্বারা সৃষ্ট এক খামারবাড়ির আবিষ্কার করলেন ইন্ডিয়ানার নট্রে ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানথ্রপোলজির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ল্যান কুইজ। জর্ডন উপত্যকার ধ্রা অঞ্চলে একটা শুষ্ক মালভূমিতে প্রায় নয় বর্গফুট আয়তনবিশিষ্ট এবং দুই ফুট গভীর এক ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন তিনি। পাশাপাশি আরও কিছু ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয় যা মানবসৃষ্ট বাসস্থান ছিল বলে মনে করা হয়। তবে ওই বিশেষ ধ্বংসাবশেষটি ছিল বাকিগুলোর থেকে স্বতন্ত্র। এতে দুই ধাপে মানুষ খাদ্যশস্য মজুত করত বলে প্রফেসর দাবি করেন।

এর পর আগামী সংখ্যায়

 বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s