বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-আমাদের বৈজ্ঞানিক

একালের জীবক রসায়নবিদ অসীমা চট্টোপাধ্যায়

সংহিতা

bigganbiggani (Medium)জীবকের শিক্ষা সমাপনে তাঁর গুরু তাঁকে বলেছিলেন একটা গাছ খুঁজে আনতে যা মানুষের কোনো কাজে, কোনো অসুখের উপশমে লাগে না। জীবক ফিরেছিলেন খালি হাতে। রসায়নবিদ অসীমা চট্টোপাধ্যায় জীবকের উত্তরসূরী। তিনি প্রচলিত ভেষজের রস থেকে চিনে নিতে চেয়েছিলেন কোন পদার্থগুণে কোন গাছের কোনো কোনো রোগ উপশমের ক্ষমতা তৈরি হয়। জৈব রসায়নের ছাত্র ও সাধক হিসেবে তিনি প্রাণ আর অপ্রাণের সেতুটা বাঁধার চেষ্টা করেছিলেন।

জন্মসূত্রে অসীমা মুখোপাধ্যায় মেধাবী ছাত্রী ছিলেন।  অবিভক্ত বাংলায় তাঁর জন্ম হয়েছিল ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯১৭ সালে। কলকাতাতেই তাঁর ছাত্রজীবনের শুরু। ইস্কুলের পালা চুকিয়ে তিনি রসায়ন পড়তে শুরু করেন স্কটিশ চার্চ কলেজে। তখন সে কলেজ ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায়। ১৯৩৬ সালে তিনি রসায়নে সাম্মানিক স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ১৯৩৮ এ স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছিলেন জৈব রসায়নে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। সেখানেই শুরু হয় তাঁর সাধনার পরবর্তী অধ্যায় জৈব রসায়নের গবেষণা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অধ্যাপকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং বৈজ্ঞানিক সত্যেন্দ্রনাথ বোস।

তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র ছিল উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক দ্রব্যাদি ও কৃত্রিম জৈব যৌগ। তাঁর সামগ্রিক গবেষণার মধ্যে সবচেয়ে চর্চিত গবেষণাগুলি নয়নতারা জাতীয় গাছ থেকে পাওয়া উপক্ষার নিয়ে। তাছাড়াও তাঁর মৃগী ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী ওষুধের উদ্ভাবন-সংক্রান্ত গবেষণাগুলিও বিশেষভাবে চর্চিত।

সে সময় ভারতবর্ষের ডক্টরেট উপাধি পাওয়া মহিলা বিজ্ঞানীর সংখ্যা ছিল মাত্র একজন। জানকি আম্মাল। ১৯৩১ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সে উপাধি দেয়। ১৯৪৪ সালে প্রথম কোন ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মেয়েদের বিজ্ঞানচর্চাকে স্বীকৃতি দিল। অসীমা চট্টোপাধ্যায় ডক্টরেট করলেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। প্রকাশিত হল ভারতীয় ভেষজ নিয়ে তাঁর বহুচর্চিত গবেষণাপত্র “ Indol-Alkaloids and Coumarin of Indian Medicinal Plants

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে তাঁর গবেষণা পৌঁছেছিল ম্যাডিসনের ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন ক্যাম্পাসে এবং পাসাডিনার ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিট্যুট অফ টেকনোলজিতে। লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের হাতে, ১৯৪০ সালে। সেখান থেকে, ১৯৫৪ সালে তিনি যোগ দিয়েছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স কলেজে।

সারা জীবনে নানান বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানিত করেছে সাম্মানিক ডক্টর অফ সায়েন্স ডিগ্রি দিয়ে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি থেকে শুরু করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের খয়রা অধ্যাপক পদ,ভারত সরকারের শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার  – সবই তিনি অর্জন করেছিলেন। এমনকি তিনি রাজ্যসভায় রাষ্ট্রপতি মনোনীত সদস্যও ছিলেন।

ভারতবর্ষ বিজ্ঞানের এই সাধককে হারায় ২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর। কৃত্রিম জৈব রাসায়নিক এবং উদ্ভিজ্জের রাসায়নিক ও নানান রোগ নিরাময়ে সেগুলির ভূমিকা নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন তাঁদের কাছে অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণাগুলি গুরুত্বপূর্ণ পাথেয়।