বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-কেম্যাজিক-পান্নালাল গোস্বামী-বর্ষা ২০১৬

এই লেখার আগের পর্বগুলো

জাদুদণ্ড চায়ের প্লেটে আগুন ধরিয়ে দেয়

“ওস্তাদ, আপনার মন্ত্রের বাহাদুরি দেখিয়ে দিন। মন্ত্র গেয়ে জাদুদণ্ড দিয়ে এই চায়ের প্লেটে আগুনের নাচ দেখিয়ে দিন।”

এই বলে এক শাগরেদ একটা চায়ের প্লেট এনে টেবিলের ওপর রাখল।

“হেই ব্যাটা,প্লেটে দেখি জল! এই জাদুদণ্ড দিয়ে জলে আগুন লাগানো যাবে?”

“প্রভু, আপনি ইচ্ছে করলে সব পারেন। মন্ত্র গেয়ে দিলেই চায়ের প্লেটে আগুন জ্বলে উঠবে।”

“ঠিক আছে। তাহলে দেখাই যাক।” এই বলে জাদুকর একটা কাচদণ্ড নিয়ে টেবিলের নীচে একটুক্ষণ রেখে সেটা ওপরে এনে প্লেটের ওপর সুন্দর করে নাচের ভঙ্গীমায় ঘুরিয়ে আবারও টেবিলের নীচে নিয়ে গেলেন। এরকমভাবে দুতিনবার করতে হঠাৎ ওই কাচদণ্ডের মাথাটা যেই প্লেটে থাকা তরলে ছুঁইয়ে দিলেন অমনি  ওই প্লেটের মধ্যে পাতলা বেগুনি আভাযুক্ত আগুন জ্বলতে শুরু করল।

ঘটনাটা কী?

প্লেটে যে জলের মত একটা তরল রাখা ছিল সেটা আসলে কার্বন ডাই সালফাইড (CS2) এই (CS2) খুবই উদ্বায়ী। আর এর জ্বলনাংকও অত্যন্ত কম। জাদুকর যে বারবার কাচদণ্ডটাকে টেবিলের নীচে নিয়ে যাচ্ছিলেন সেটা দর্শকের চোখের আড়ালে একটা জ্বলন্ত বার্নারের শিখায় দণ্ডটাকে গরম করার জন্য। এই কাচদণ্ডের তপ্ত মাথাটা যেইমাত্র প্লেটে থাকা (CS2)র সংস্পর্শে এল অমনি তা পাতলা বেগুনি রঙের আভাযুক্ত শিখা নিয়ে জ্বলতে শুরু করল।

CS2 + 3O2 (batas) à (তাপ) à CO2+ 2SO2 + পাতলা বেগুনি শিখার আগুন

সাবধানতা

SO2 অতি বিষাক্ত। আগুন জ্বলার আধ মিনিটের মধ্যেই আগুন নিভিয়ে প্লেটটা বাইরে বের করে দেবে। হলঘরে ভালো এগজস্ট ফ্যানের ব্যবস্থা না থাকলে এই খজেলা বাইরে খোলা জায়গায় দেখাবে।

সবুজবরণ অগ্নিশিখা

bigganchemagic (Medium)অগ্নিশখার বর্ণ কেমন? উজ্জ্বল হলদে আর লাল। আরেক ধরণের অগ্নিশিখা হল দীপ্তিহীন আর খুবই পাতলা, নীলবর্ণের।  এই অগ্নিশিখা তোমরা ঘরের গ্যাস স্টোভে দেখতে পাবে। কার্বন থাকা যেকোন ইন্ধনেরই অসম্পূর্ণ দহনের ফলে দীপ্তিসমৃদ্ধ শিখার উদ্ভব ঘটে। ওই শিখায় কার্বনের যথেষ্ট ভুসাও থাকে। সেইজন্য এই শিখাকে বিজারণক্ষম শিখা বলা হয়ে থাকে। আর দীপ্তিহীন শিখাকে বলে জারণক্ষম শিখা। এই দুই ধরনের শিখাই একটা গ্যাসবার্নারের সাহায্যে খুব ভালোভাবে দেখতে পাবে। বার্নার জ্বালিয়ে ওর তলার দিকের বাতাস ঢোকবার ছিদ্রটা যদি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দাও তখন দীপ্তিযুক্ত উজ্জ্বল হলদে রঙের বিজারণক্ষম শিখা (reducing flame) বেরোতে থাকবে। অন্যদিকে ছিদ্রটা যদি যম্পূর্ণ খুলে দাও তাহলে পর্যাপ্ত পরিমাণ বাতাস তথা অক্সিজেন ঢুকে সম্পূর্ণভাবে গ্যাসের দহন ঘটিয়ে পাতলা নীলবর্ণের দীপ্তিহীন জারণক্ষম শিখা (oxydising flame) তৈরি হবে।দীপ্তিহীন শিখার তাপমান দীপ্তিযুক্ত শিখার চেয়ে অনেক বেশি।

“সবুজ শিখার আগুন তোমরা দেখেছ কি? সেটাই এখন তোমাদের দেখাব,” এই বলে জাদুকর একটা ওয়াশ বটল থেকে কিছু তরল নিয়ে পাকা মেঝের ওপর বড়ো করে ILU লিখে তার চারপাশে মস্তবড়ো একটা হার্ট-চিহ্ন এঁকে এক বেড়া দিয়ে দিলেন।

এরপর আরম্ভ হল জাদুকরের মন্ত্র, “হে কেম্যাজিকেশ্বর, তোমার লীলা দেখাও। সবুজ আগুন বের করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দাও,” এইধরণের কথা বলতে বলতে যেই একটা দেশলাইকাঠি জ্বালিয়ে ওই ড্রয়িংটাতে ছোঁয়ালেন, অমনি সারা ড্রয়িংটা সবুজ শিখা উঁচিয়ে নাচতে লাগল।

 কী ছিল ওই তরলে?

তরলটা ছিল মিথানল দ্রাবকে মিথাইল বোরেট নামক এক জৈবযৌগের দ্রবণ। এর বাষ্পীভবন তাপ খুবই কম, আর এটি খুব দাহ্য। পুড়তে শুরু করলেই এটা সবুজ রঙের অগ্নিশিখা তৈরি করে।

মিথাইল বোরেট হল বোরিক অ্যাসিডের মিথাইল এস্টার। মিথানলে (মিথাইল অ্যালকোহল) পর্যাপ্ত পরিমাণে বোরিক অ্যাসিড মিশিয়ে খুব কম পরিমাণে সালফিউরিক অ্যাসিড (গাঢ়) মিশিয়ে তাপ দিয়ে বানানো হয়। সালফিউরিক অ্যাসিড এইখানে অণুঘটকের কাজ করছে।

 সাবধানতা

মিথানল খুবই দাহ্য। আর এর উতলাংকও যথেষ্ট কম। তাই মিথাইল বোরেট প্রস্তুত করবার সময় তাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে খুবই সাবধানী হতে হবে। এটা বানানোর সময় অতি অবশ্য শিক্ষকের সাহায্য নেবে।

ক্রমশ