বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-কে-ম্যাজিক

মোনালিসার আত্মাহুতি

       “এই সেই মোনালিসা, যার ভুবনমোহিনী হাসিতে সমগ্র বিশ্ব আলোড়িত। অপূর্ব এক রূপলাবণ্য, নিষ্পাপ সহজ সরল মুচকি হাসিতে দর্শককে এক অচেনা জগতে নিয়ে চলে যায়। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন সাহিত্য, গল্প, কবিতা ও গানে কতবার যে এই অপরূপ সৃষ্টির কথা বিধৃত হয়েছে তার সীমাসংখ্যা নেই। এক বিমূর্ত চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তার স্রষ্টা সৃষ্টি করলেন সেই স্বর্গীয় হাস্যমধুর রূপকল্প- এক মুখচ্ছবি–”

       জাদুকর এভাবে বলতে থাকার সময় এক শাগরেদ মোনালিসার ছবি আঁকা একটা ক্যালেণ্ডারের সমান কাগজ এনে একটা স্ট্যান্ড-এ আটকে দিয়ে টেবিলের ওপর রেখে দিল। এদিকে যাদুকরের বক্তৃতা চলছে-

       “কে ছিলেন এই ছবিটির স্রষ্টা? কে সেই ঈশ্বরের বরপ্রাপ্ত শিল্পী,যাঁর জাদুকরী হাতের স্পর্শে প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো এক অপরূপা নারী? তিনি হলেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। একধারে শিল্পী ও বিজ্ঞানী। তাঁর অবদানকে বর্তমানের চিকিৎসকরাও মাথা নুইয়ে স্বীকৃতি জানায়। দিনের পর দিন লাশকাটা ঘরে দুর্গন্ধময় পরিবেশে থেকে নিরলস সাধনায় আঁকতে থাকলেন শরীরের বিভিন্ন শিরা-উপশিরার পুংখাণুপুংখ অবস্থান, মাংসপেশীর স্তরে স্তরে থাকার দৃশ্য, যার পরিণামে চিকিৎসা জগতে এল বিপ্লব।”

       বলছেন আর বারবারই খুব ভলো করে ফটোটাকে নিরীক্ষণ করছেন জাদুকর। আবারও আরম্ভ করলেন, “শুধু কি তাই? প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন এক মহান গবেষক। বাতাসে অনায়াসে উড়ে বেড়ানোয় পাখিদের ডানা এবং পালকের যে একটা মস্তবড়ো ভুমিকা আছে সেটা উপলব্ধি করে দিনের পর দিন বিভিন্ন পাখিদের তির্যকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলেন। আঁকতে থাকলেন অসংখ্য পাখির ডানার আকৃতির বিশেষত্ব। ডানার ওপর দিয়ে জোরে বয়ে যাওয়া বাতাস ডানাদুটির ঠিক ওপরে সৃষ্টি করে নিম্নচাপ। ফলে তলার থেকে উচ্চচাপ বিশিষ্ট বাতাসই যে পাখিকে উড়িয়ে নিয়ে যায়, সেটা আবিস্কৃত হল। সৃষ্টি হল “এরোডাইনামিক্স” তত্ত্বের। এরই ওপর ভিত্তি করে এঁকে ফেললেন অনেক উড়োজাহাজের নক্সা।”

       বলতেবলতেই দেখা গেল যে মোনালিসার ছবি আঁকা ওই কাগজ থেকে অল্প অল্প ধোঁয়া বেরোচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে জাদুকর তার বক্তৃতা অন্যভাবে শুরু করলেন।

       “আমাদের মোনালিসার মনে এখন ভীষণ দুঃখ। একটু আগেই খবর পেয়েছেন যে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি আর ইহজগতে নেই। স্রষ্টাই যেহেতু নেই, সেক্ষেত্রে বেঁচে থেকে কী লাভ? তিনি আত্মাহুতির পথটাই বেছে নিলেন।”

       এ-রকম বলতে বলতেই দেখা গেল যে ফটোটা আপনা আপনি দাউ দাউ করে আগুনে জ্বলছে। দর্শকরাও প্রচণ্ড হাততালিতে পুরো হলঘর কাঁপিয়ে তুলল।

bigganchemagic (Medium)

ফটোটায় আগুন জ্বললো কী ভাবে?

 কাগজের ফটোটির অর্ধেকমতো একটা বিশেষ দ্রবণে চুবিয়ে এনে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই বিশেষ দ্রবণ হল সাদা ফসফরাস দ্রবীভূত করা কার্বন ডাই- সালফাইডের। কার্বন ডাই- সালফাইড এক অতিশয় উদ্বায়ী তরল। জাদুকর বক্তৃতা দিতে থাকার সময় ওই কাগজ থেকে কার্বন ডাই-সালফাইড উবে গিয়ে সাদা ফসফরাসকে উন্মুক্ত করে দিলে ওটা তখন বাতাসে থাকা অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া আরম্ভ করে দেয়। এই বিক্রিয়া সাংঘাতিক ধরনের তাপবর্জী (Exothermic)। এই তাপে বাতাসের অক্সিজেনের সাহায্যে কাগজে আগুন ধরে যায়। এটাও একধরনের জারণ বিক্রিয়া (Oxidation reaction)

        P4+5O2 —à 2P2O5+তাপ

    কাগজ+তাপ+O2(বাতাস)à আগুন।

এই আগুন জ্বলায় কাগজে রয়ে যাওয়া স্বল্প পরিমানের কার্বন ডাই-সালফাইডও দায়ী, কেননা এটাও এক অতিশয় দাহ্য পদার্থ।

সাবধানতা

  • সাদা ফসফরাস যাতে কখনও উন্মুক্ত না থাকে। এটাকে সবসময় জলের নীচে রাখতে হবে।
  • কার্বন ডাই-সালফাইডে করা দ্রবণের ওপর আধ থেকে এক সেন্টিমিটারের মতো একটা জলের স্তর সবসময় থাকতে হবে। জল আর কার্বন ডাই-সালফাইড অমিশ্রণীয়, উপরন্তু জলের ঘনত্ব কার্বন ডাই-সালফাইড-এর চেয়ে অনেক কম হওয়ার ফলে জল দ্রবণের ওপরে থেকে দ্রবণটিকে বাষ্পীভবন তথা অক্সিজেন থেকে রক্ষা করবে।
  • ফটোর কাগজ থেকে কার্বন ডাই- সালফাইড উড়ে যাওয়ার সময়টা রিহার্সাল দিয়ে ঠিক করে নেবে যাতে জাদুকরের বক্তৃতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়।

                  চলবে