বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-জার্নি টু দি সেন্টার অব দ্য আর্থ?! ঋজু গাঙ্গুলী শীত ২০১৬

bigganriju03

সেদিন কলেজ স্ট্রিট ঘুরে বাড়ি ফিরেই দেখি, শনিচক্র একেবারে সরগরম।

প্রত্যেক শনিবার সন্ধেয় আমাদের বাড়িতে আমার মেয়ে মেঘনা, বোন মধুরিমা, মেয়ের টিচার তোষালি, আর আমার বউয়ের যে জমাটি আড্ডার আসরটা বসে, সেটাকে বোঝানোর জন্যে রেবন্ত গোস্বামীর লেখা থেকে নেওয়া এই নামটা আমি ব্যবহার করে থাকি। আড্ডার বিষয়বস্তু হিসেবে সচরাচর যেসব টপিক থাকে সেগুলো নিয়ে বিশেষ ভাবে অজ্ঞ হওয়ায় এই আড্ডায় যোগ দেওয়ার সুযোগ আমার হয় না।

কিন্তু সেদিন বাড়ি ফেরা মাত্র যেভাবে সবাই হই-হই করে আমাকে “অভ্যর্থনা” জানাল তাতেই বুঝলাম, আজকে ‘চক্র-বর্তী’ হতেই হচ্ছে।

ফ্রেশ হয়ে এসে বসার সঙ্গে-সঙ্গে গরম চা পাওয়া গেল, সঙ্গে সদ্য ভাজা পকোড়া। যখন সবে ভাবতে শুরু করেছি লেটেস্ট সিনেমা বা সিরিয়ালের কোনো গল্পে এমন কী প্যাঁচ আছে যা খোলার জন্যে আমাকে দরকার, তখনই মেয়ের প্রশ্নটা শুনে ময়দানের ভাষায় ‘ভ্যাবচ্যাক’ হয়ে গেলাম।

“আচ্ছা বাবা, মাটির তলায় কি কোনো সমুদ্র আছে, আর সেই সমুদ্রে কি নানা রকম প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী থাকা সম্ভব?”

একটু সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “হঠাৎ এই প্রশ্নটা কেন? টিভিতে ‘জার্নি টু দ্য সেন্টার অফ দ্য আর্থ’ দেখেছিস নাকি এর মধ্যে?”

সমস্বরে যা শোনা গেল তা গুছিয়ে বললে এই রকম দাঁড়ায়ঃ

কাগজে একটা খবর বেরিয়েছে, যাতে বলা হয়েছে যে বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, মাটির অনেক-অনেক নিচে যে স্তরগুলো আছে, তাদের মধ্যে এত জল জমে আছে যা পৃথিবীর সব সমুদ্রের মোট জলের চেয়েও বেশি।

যেহেতু কোনো গ্রহ বা উল্কাপিণ্ডে জলের উপস্থিতির চিহ্ন পেলেই বিজ্ঞানীরা সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে নানা রকম মন্তব্য করেন, তাই ‘এত-এত জল’ থাকার মানে নিশ্চই এই যে আমাদের এই পৃথিবীতেই মাটির নিচে প্রাণীদের অস্তিত্বও থাকাসম্ভব।

বুঝলাম, এক কথায় এই তর্কের নিষ্পত্তি করা যাবে না। তাই একটা লম্বা-চওড়া বক্তৃতা দিতে হল, যার শুরুটা করতে হল পৃথিবীর গভীরে অদেখা-অজানা প্রাণিজগতের অস্তিত্ব নিয়ে বিভিন্ন চিন্তাভাবনার পরিচয় দিয়ে।

“বহু-বহু যুগ ধরে মানুষ একথা ভেবে এসেছে যে মাথার ওপর দিনে নীল আর রাতে তারাভরা চাঁদোয়া হয়ে থাকা আকাশের মতো, তাদের পায়ের নিচের এই পৃথিবীও নিশ্চই লুকিয়ে রেখেছে অনেক রহস্য। যেহেতু স্বর্গ, মানে দেবতাদের বাসভূমি হিসেবে মাথার ওপরের আকাশকে কল্পনা করা হয়েছে, তাই তার উল্টোটা, মানে নরক বা আমাদের পুরাণ-অনুযায়ী পাতাল হিসেবে ভাবা হয়েছে মাটির তলার জগৎটাকে।

গ্রিক, কেল্টিক, মেক্সিকান, নেটিভ আমেরিকান, ভারতীয় নাগা, আর সাইবেরিয়ান অজস্র কিংবদন্তী সেসব দেশের বিভিন্ন গুহা-কেই শুধু ‘নরকের দরজা’ হিসেবেই চিহ্নিত করে নি, সঙ্গে উপহার দিয়েছে মাটির নিচে গুহায় বা দেশে, এমনকি মহাদেশের বাসিন্দা নানা উপজাতির গল্প, যাদের কেউ ভালো, কেউবা ভীষণ খারাপ।

এসবের পাশাপাশি একটি মধ্যযুগীয় জার্মান কিংবদন্তী বলে যে, জার্মানির কয়েকটা পাহাড়ের মধ্যে নাকি আছে ‘ভেতরের পৃথিবী’-তে পৌঁছনোর রাস্তা। এই কিংবদন্তী, আর তার সঙ্গে সপ্তদশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী এডমন্ড হ্যালির পেশ করা এক থিওরিই আজও লেখকদের কল্পকাহিনির খোরাক জুগিয়ে চলেছে।”

“এডমন্ড হ্যালি?”, ভুরুটা কুঁচকে জিজ্ঞেস করল মধুরিমা, “মানে কি…?”

“হ্যাঁ,” আমি বললাম, “সপ্তদশ শতাব্দীর সবথেকে ব্রিলিয়ান্ট বিজ্ঞানী তথা চিন্তাবিদদের মধ্যে অগ্রণী সেই জ্যোতির্বিদ, যিনি একটি বিশেষ ধূমকেতুর কক্ষপথ বিশ্লেষণ করে বলেন যে সেটিই একমাত্র ধূমকেতু যা প্রতি ৭৬ বছরে একবার পৃথিবী থেকে খালি চোখেই দেখা যায়। আর তাই সেটিকে আমরা হ্যালি’জ কমেট নামেই চিনি।

এই এডমন্ড হ্যালি ১৬৯২-এ বলেন যে পৃথিবীর ভেতরটা অনেকটা এরকমঃ

হ্যালি বলেন যে পৃথিবীর বাইরেটা, মানে ছবিতে দেখানো সবথেকে বাইরের গোলকটার নিচে রয়েছে একটা  গোলাকার ফাঁপা জায়গা, যেটা প্রায় ৮০০ কিলোমিটার চওড়া। তার নিচে আছে দুটো গোলাকার স্তর, যাদের মধ্যেও আছে ফাঁপা জায়গা। সবার ভেতরে, মানে পৃথিবীর কেন্দ্রে আছে একটা নিরেট ‘কোর’। ভেতরের দুটো সমকেন্দ্রিক গোলাকার স্তরের নিজস্ব চৌম্বক মেরু আছে, যাদের উপস্থিতির জন্যেই কম্পাসের আচরণে নানা অসংগতি পাওয়া যায়।

হ্যালি এও বলেন যে বাইরের স্তর, যেখানে মানুষ বসবাস করে, ছাড়া ভেতরে যে ফাঁপা জায়গা আছে সেগুলোতেও বায়ুমণ্ডল, এবং সেখানে প্রাণীদের অস্তিত্ব আছে। ওই ফাঁপা জায়গায় বন্দি বায়ুমণ্ডল থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাস-ই মেরু অঞ্চলের আকাশে মেরুজ্যোতি বা বোরিয়ালিস সৃষ্টির কারণ।”

“কী জটিল ব্যাপার!” অনেকক্ষণ চুপ করে সব শোনার পর বলে উঠল তোষালি, “এরকম কিছু যাঁর মাথায় আসে, তিনি যে জিনিয়াস এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই থিওরিটা কি সত্যি হতে পারে?”

“উহুঁ”, চা শেষ করার ফাঁকে আমি বলি, “এই থিওরি নিয়ে যে এগোনো যাবে না, এটা তথাকথিত ‘হলো আর্থ’ বা ‘ফাঁপা পৃথিবী’ তত্ত্বের সমর্থকরাও জানতেন। তাঁদেরই কয়েকজন দাবি করেছেন যে এই থিওরি নাকি সংশোধন করেন অষ্টাদশ শতাব্দীর আরেক বিস্ময়কর রকম প্রতিভাধর এবং বিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখায় অবদান রাখা চিন্তাবিদঃ লিওনার্ড অয়লার। তাঁদের দাবি অনুযায়ী বলতে হয়, অয়লার নাকি পৃথিবীর গভীরে প্রায় ১০০০ কিলোমিটার ব্যাসের একটি অভ্যন্তরীণ সূর্যের অস্তিত্ব কল্পনা করেছিলেন, যা পৃথিবীর গভীরে নানা অত্যুন্নত সভ্যতার বিকাশ ঘটতে সাহায্য করেছে। তবে অয়লার আদৌ এরকম কোনো থিওরি দেন নি, সেটা এখন জানা গেছে।”

“তারপর?”, সমস্বরে প্রশ্নটা থেকে বুঝলাম, মাটির তলায় অন্য পৃথিবী, মায় অন্য সূর্যের সম্ভাবনা এই আলোজ্বলা কলকাতার সন্ধ্যাতেও শনিচক্রকে দস্তুরমতো ভাবিয়ে তুলেছে। তাই আমি আবার শুরু করলাম।

“ঊনবিংশ শতকের গোড়ায় জন ক্লিভস সিমস, জুনিয়র, হ্যালির থিওরিকেই আরো প্যাঁচালো করে পেশ করেন। সিমস বলেন যে পৃথিবীর ভেতরে ঢুকতে গেলে প্রথমেই পড়বে একটা প্রায় ১৩০০ কিলোমিটার পুরু ফাঁপা স্তর, যার দুটো খোলা দিক আছে দুই মেরুতে প্রায় ২৩০০ কিলোমিটার ব্যবধানে। এই ফাঁপা স্তরের পর একে-একে আছে মোট চারটে স্তর, যাদের সবগুলোই খোলে মেরু অঞ্চলে। সিমস-এর এই থিওরি এতই জনপ্রিয় হয় যে তিনি উত্তর মেরুতে এই থিওরির স্বপক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ করার জন্যে অভিযানে যেতে চাইলে সেই সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট অবধি তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা করতে রাজি হয়ে যান। শেষে অবশ্য সেই অভিযান আর হয় নি।

কিন্তু সিমস-এর থিওরির প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে সমকালীন সাহিত্য জগতে। এর আগে মাটির নিচের পৃথিবী, এবং ঘটনাচক্রে সেখানে গিয়ে পৌঁছনো মানুষদের কার্যকলাপ নিয়ে নানা ধরনের কাহিনি বা রোমান্স লেখা হলেও ১৮৩৮-এ প্রকাশিত এডগার অ্যালেন পো’র উপন্যাস “দ্য ন্যারেটিভ অফ আর্থার গর্ডন পিম অফ নানটুকেট” পাঠকদের মধ্যে আলোড়ন তৈরি করে এই বিষয়ে।

আর তারপর, ১৮৬৪-তে জুল ভের্ন পাঠকদের উপহার দেন তাঁর অবিস্মরণীয় ক্লাসিকটি, যা নিয়ে আমাদের আজকের এই গল্পগাছা শুরু। সেই উপন্যাসে তিনি অ্যাডভেঞ্চার ঘরানার সব উপাদান মিশিয়ে আমাদের বলেন এমন এক পৃথিবীর কথা, যেখানে অভিযাত্রীদল পৌঁছেছিল এক মৃত আগ্নেয়গিরির মুখ দিয়ে নিচে নেমে, আর তারপর বিশাল সমুদ্র, সেই সমুদ্রের বাসিন্দা নানা প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী, ম্যামথ, এমনকি দৈত্যাকৃতি মানুষদের দেখা পেয়ে শেষে প্রাণ হাতে করে ফিরেছিল ওপরের পৃথিবীতে, কিন্তু যেখান থেকে তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেখান থেকে অনেক-অনেক দূরে।”

এই অবধি বলে এদিক-ওদিক চাইছিলাম, কারণ আরেক কাপ চা আর কিছু পকোড়া না পেলে দমে ঘাটতি হচ্ছিল। কিন্তু আশেপাশে সহানুভূতিশীল কাউকে পেলাম না। বরং মেঘনা আবার প্রশ্ন করল, “কিন্তু বাবা, তার মানে কি এগুলো সত্যিই হওয়া সম্ভব? মানে আমাদের পৃথিবী কি তাহলে ফাঁপা?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার শুরু করলাম, “না। এতদিনে একেবারে কঠোরভাবে প্রমাণ হয়ে গেছে যে ‘হলো আর্থ’ থিওরি গালগল্পের উপজীব্য হলেও বাস্তবে আমাদের পৃথিবী মোটেই এরকম নয়। আর সেই প্রমাণও এক-আধটা নয়, অনেক রকম।”

“যেমন?” জানতে চাইল মধুরিমা, “মানে পৃথিবীর গভীরে কি সত্যিই কোনো অভিযান চালিয়ে দেখা হয়েছিল এরকম কিছু আছে কি না?”

“আরে না-না!”, বলে উঠি আমি, “পৃথিবীর গভীরে পৌঁছনোর জন্যে অনেক রকম চেষ্টা হয়েছে, যাদের কোনোটা স্রেফ তোর প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে, কোনোটা আবার তার থেকেও দরকারি জিনিস খুঁজতে।

মানুষ মাটি খুঁড়ছে বহু যুগ ধরে, কখনও খনিজ সম্পদের আশায়, কখনও জলের জন্যে, কখনও বা তেলের জন্যে।

তবে ১৯৭০ সালে সেই সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের কোলা পেনিনসুলা-তে একটা সায়েন্টিফিক ড্রিলিং শুরু হয় যেটা নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ১৯৮৯-এ, তার যেটা প্রধান গর্ত সেখান থেকে শাখা হিসেবে বেরিয়ে যাওয়া একটা বোরহোল-এর মাধ্যমে মাটির নিচে ১২,২৬২ মিটার গভীরতায় পৌঁছয়। পরে, ২০১১-য় শাখালিন-এর কাছে হওয়া অফশোর ড্রিলিং-এ বোরহোলের মোট দৈর্ঘ্য ১২,৩৪৫ মিটার হলেও আজ পর্যন্ত মাটির নিচে সবচেয়ে গভীরে বলতে ওই ১২,২৬২ মিটার অবধিই যাওয়া গেছে।”

আমার ক্রমশ নেতিয়ে পড়া গলা থেকে ব্যাপারটা আন্দাজ করতে গৃহকর্ত্রীর সময় লাগেনি, তাই ঠিক সেইসময় দেবদূত হয়ে আমার সামনে আবির্ভূত হল এক কাপ গরম চা। আমি ফর্মে ফিরে এলাম।

“কেন কোলা বোরহোল প্রোজেক্ট আর এগোতে পারেনি, সেটা বুঝতে গেলে আগে এটা বোঝা দরকার যে ঠিক কী কী প্রমাণের ভিত্তিতে ‘হলো আর্থ’ থিওরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

পৃথিবীর ভেতরটা ঠিক কেমন, সেটা আমাদের বুঝতে সাহায্য করেছে সিজমিক ওয়েভস, বা সেই সব তরঙ্গ যারা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত অবধি চলাচল করে। তাদের চলাফেরা লক্ষ্য করে এটা বোঝা গেছে যে আমাদের পায়ের নিচের জায়গাটায়, যাকে ক্রাস্ট বলা হয়, আছে সলিড পাথর। তারপর আছে একটা বিশাল পুরু স্তর বা ম্যান্টল, এটাও তৈরি হয়েছে পাথর দিয়ে। তারপর আছে আউটার কোর, যার উপাদান হল লিকুইড নিকেল-আয়রন। আর সবার শেষে তথা ভেতরে আছে ইনার কোর, যা সলিড নিকেল-আয়রন দিয়ে তৈরি।

এর থেকে যে ছবিটা পাওয়া গেছে সেটা এরকমঃ

bigganriju02

পৃথিবীর ভেতরে যে কোনো ফাঁপা অংশ থাকা অসম্ভব সেটা বোঝা গেছে পৃথিবীর ঘনত্ব থেকে। পৃথিবীর গড় ঘনত্ব যেখানে প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে প্রায় সাড়ে পাঁচ গ্রাম, সেখানে আমাদের ঠিক পায়ের নিচে থাকা ক্রাস্টের ঘনত্ব তার অর্ধেক মাত্র!

এবার তোরাই ভাব। যদি আমাদের ক্রাস্টের নিচের জায়গাটা ফাঁপা হত, তাহলে তো পৃথিবীর গড় ঘনত্ব ক্রাস্টের থেকেও কম হওয়ার কথা ছিল। সেটা না হয়ে তার উল্টো হয়েছে, এর থেকেই তো বোঝা যায় যে ক্রাস্টের নিচেই বরং জমে আছে সবথেকে ভারী আর নিরেট জিনিসপত্র।”

“তাছাড়া”, মন্তব্য করল আমার বউ, “ফাঁপা জিনিস বেশিদিন টেঁকে না। পৃথিবী এতদিন বেশ ঠিকঠাক আছে, এটাই বুঝিয়ে দেয় যে এর ভেতরটা বেশ সলিড।”

মুগ্ধ দৃষ্টিতে বউয়ের দিকে চেয়ে ছিলাম, কিন্তু ভবি ভুলল না। বরং কড়া গলায় শুনতে হল, “এখন আর পকোড়া নয়। বরং গল্পটা চটপট শেষ কর।”

এমন একটা তথ্যনিষ্ঠ আলোচনার ‘গল্প’ বিশেষণ শুনে মর্মাহত হলেও বাকি তিন শ্রোতা সমস্বরে তালে তাল মেলানোয় আমি আবার শুরু করলাম।

“ক্রাস্ট যেখানে সবচেয়ে পাতলা সেখানেও তার পুরুত্ব ৫ কিলোমিটার, যেটা বাড়তে-বাড়তে ৭০ কিলোমিটার অবধি হতে পারে। বাল্টিক সমুদ্রতীরে, যেখানে ক্রাস্ট প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পুরু, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খুঁড়ে ফেলেছিল কোলা বোরহোল।

ক্রাস্ট যেখানে বায়ুমণ্ডলকে ছোঁয়, সেখানের গড় তাপমাত্রা আমরা ০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ধরতে পারি। আর ক্রাস্টের শেষে, যেখান থেকে ম্যান্টল শুরু হয়, সেখানেই কিন্তু তাপমাত্রা পৌঁছে যায় প্রায় ৪০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে! পারদ বা মার্কারি এই তাপমাত্রায় বাষ্প হয়ে যায়।

এরপর শুরু হয় ম্যান্টল। একেবারে ওপরেই এর তাপমাত্রা থাকে প্রায় ৫০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, যেটা ভেতরে ঢোকার সঙ্গে-সঙ্গে বাড়তে থাকে। ক্রাস্ট থেকে প্রায় ২৯০০ কিলোমিটার নেমে গেলে যেখানে ম্যান্টল শেষ হয়, সেখানে তাপমাত্রা পৌঁছয় প্রায় ৩৭০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে! দামি ধাতু বলতে আমরা যাদের বুঝি সেই সোনা আর রুপো ওই অবধি পৌঁছনোর আগেই ফুটতে শুরু করে।

এর পর শুরু হয় আউটার কোর, তবে সেখানে গড় তাপমাত্রা প্রায় ৪০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, যার অর্থ মলিবডেনাম, টাংস্টেন, এবং ইউরেনিয়ামের মতো হাতে-গোনা কিছু ধাতু ছাড়া প্রায় সব কিছুই বাষ্প হয়ে যায় এই স্তরে। মাটির লেভেল থেকে প্রায় ৫১৪০ কিলোমিটার গভীরতা অবধি চলে আউটার কোর।

এরপর, ৬৩৭০ কিলোমিটার গভীরতায় পৃথিবীর কেন্দ্রে পৌঁছনো অবধি চলে ইনার কোর, যার গড় তাপমাত্রা ৭০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড! এর অর্থঃ এই জায়গাটা সূর্যের পৃষ্ঠতলের চেয়েও বেশি গরম!

তাপমাত্রা বাড়তে থাকার এই ব্যাপারটা ভালো বোঝা যায় এই ছবি থেকেঃ

“এজন্যেই, কোলা বোরহোল যে গভীরতায় মাত্র ১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছিল, সেখানে বিজ্ঞানীরা ১৮০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা পান। তাঁরা হিসেব করে দেখেন যে ১৫০০০ মিটার গভীরতায় তাপমাত্রা পৌঁছবে ৩০০ ডিগ্রিতে, যখন ড্রিল বিট, মানে যা দিয়ে গর্তটা খোঁড়া হচ্ছিল, আর কাজই করবে না! তাই, ১৯৯২-এ প্রোজেক্টটাই পরিত্যক্ত হয়।

তবে এই প্রোজেক্ট একটা খুব ইন্টারেস্টিং জিনিস সবার সামনে তুলে ধরে। যে পাথরের স্তর অবধি ড্রিলিং করা গেছিল সেটা ২৫০ কোটি বছরেরও বেশি পুরোনো। তার মধ্যে প্রায় ৭ কিলোমিটার গভীরতায়, বিজ্ঞানীরা সিজমিক ওয়েভের চলাচলে একটা ব্রেক থেকে আন্দাজ করেছিলেন, ক্রাস্টের ওই বিশেষ জায়গায় হয়তো গ্র্যানাইট পাথর শেষ হয়ে গিয়ে ব্যাসল্ট পাওয়া যাবে। বাস্তবে দেখা যায়, সিজমিক ওয়েভের বেগের পরিবর্তন হয়েছে গ্র্যানাইট পাথর ওই বিশেষ জায়গাটায় দারুণ চাপে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়ে তার ফাঁকে প্রচুর পরিমাণে জল ঢুকে পড়ায়।”

জলের প্রসঙ্গ ওঠামাত্র শ্রোতাদের মধ্যে চনমনে ভাবটা বেড়ে উঠল। তাই আমি আমার কথা চালু রাখলাম।

“মাটির এত গভীরে জল ওপর থেকে চুঁইয়ে আসা সম্ভব নয়। তাই বিজ্ঞানীরা বলেন যে এই জল এসেছে ক্রাস্টের অনেক গভীরে বিভিন্ন খনিজের মধ্যে বন্দি জল থেকে, যারা নিচ থেকে আসা প্রচণ্ড চাপের ফলে ওপরে উঠতে চাইলেও একেবারে নিরেট পাথরের স্তরে বাধা পেয়ে উঠতে পারে নি।

“কিন্তু মাটির নিচে,” প্রশ্ন করে মধুরিমা, “যেখানে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে হু-হু করে, সেখানে জল আসবে কীভাবে?”

“উত্তরটা লুকিয়ে আছে”, আমি বলি, “মাটির নিচে থাকা এক বিশেষ খনিজের গঠনের মধ্যে। ক্রাস্টের নিচে ম্যান্টল অংশটা এতটাই পুরু, যে সেটার মধ্যেও দুটো স্তর আছে বলে মনে করেন ভূতত্ত্ববিদরা। এর মধ্যে বাইরের দিকের কম গরম আউটার ম্যান্টল অংশটা চলে প্রায় ৪১০ কিলোমিটার গভীরতা অবধি। এই স্তরে সবচেয়ে বেশি পরিমানে পাওয়া যায় একটি বিশেষ খনিজ, যার সাধারণ নাম হল অলিভিন।

আউটার ম্যান্টল শেষ হয়ে ভেতরের বেশি গরম ইনার ম্যান্টল শুরু হওয়ার জায়গাটা, যেটা চলে প্রায় ৬৬০ কিলোমিটার অবধি, ট্র্যানজিশন জোন বলে পরিচিত। ম্যাগনেশিয়াম, সিলিকন, আর অক্সিজেন দিয়ে তৈরি অলিভিন-এর যে বিশেষ রূপটি মাটির ওই গভীরতায় সব থেকে বেশি পাওয়া যায় সেটার নাম হল, আবিষ্কারক বিজ্ঞানীর নামানুসারে, রিংউডাইট।

রিংউডাইট যে পরিমাণ চাপে তৈরি হয় সেটা ১৮ থেকে ২৩ গিগাপাস্কাল, মানে স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় চাপের প্রায় ২,০০,০০০ গুণ, তাই ক্রাস্টে সেটা পাওয়া যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এতদিন পর্যন্ত ওই খনিজটি পাওয়া গেছিল শুধু বিভিন্ন উল্কাপিণ্ডে। কিন্তু এবার…”

“এবার?” প্রশ্নটা তিনটে গলায় এল বলে আমি বুঝতে পারলাম, শ্রোতারা আমাকে এখনও ছেড়ে যায় নি।

“এবার, মানে ২০০৮ সালে পশ্চিম ব্রেজিলের মাতো গ্রসো এলাকায় জুইনা নদীর খাতে শ্রমিকরা একটা ক্ষতবিক্ষত হিরে পায়।

হিরেটা দেখতে এতই কুশ্রী যে মণি হিসেবে ওটার দাম হত বড়োজোর বিশ ডলার। কিন্তু ওটাকে নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, মাটির প্রায় ৫০০ কিলোমিটার গভীরতায় তৈরি হয়ে ওই হিরেটা একটা সাংঘাতিক ভলক্যানিক ইরাপশনের ফলে ঘন্টায় প্রায় ৭০ কিলোমিটার বেগে ক্রাস্ট ফুঁড়ে ওপরে উঠে আসে। এর ফলে ওটার চেহারা আক্ষরিক অর্থেই ‘খারাপ’ হয়ে যায়।”

“আচ্ছা,” প্রশ্ন করে মেঘনা, “গয়নার সঙ্গে বা আংটিতে যে হিরে দেখি, সেগুলোও কি পাওয়া যাওয়ার সময় ওই রকম চেহারায় থাকে?”

“না”, আমি উত্তর দিই, “মাটির নিচে মোটামুটি ১৩০ থেকে ২০০ কিলোমিটার গভীরতায়, প্রায় ১০০ কোটি বছর ধরে একটু-একটু করে যে হিরে তৈরি হয়, সেগুলোই গয়নায় ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ৪১০-৬৬০ কিলোমিটার গভীরতার ওই ট্র্যানজিশন জোন-এ ‘সুপারডিপ’ হিরে তৈরি হয় খুব তাড়াতাড়ি, আর ওইভাবে ক্রাস্ট ফুঁড়ে উঠে আসতে গিয়ে তাদের চেহারা তো ক্ষতবিক্ষত হবেই।”

“বুঝলাম, কিন্তু”, অধৈর্য হয়ে শুধোয় তোষালি, “এর সঙ্গে জলের কী সম্পর্ক?”

“এই বিশেষ হিরেটা নিয়ে অ্যালবার্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী কাজ করছিলেন মাটির গভীরে কী-কী খনিজ পাওয়া যেতে পারে সেটা বোঝার আশায়। স্রেফ ঘটনাচক্রে তাঁরা ওই হিরের মধ্যে এক দানা রিংউডাইট আবিষ্কার করেন। বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে ওইটুকু রিংউডাইটের ওজনের প্রায় ১.৫% জল।

সাধারণ ভাবে এটা কম শোনাতে পারে, কিন্তু পৃথিবীর গোটা ট্র্যানজিশন জোনে রিংউডাইট এতটাই বেশি আছে, যে তার মধ্যে আটকে থাকা জলের পরিমাণ সত্যিই বিরাট, ১০০ কোটি কোটি টন-এর চেয়েও বেশি!

এটাই খবরের কাগজে বেরিয়ে তোদের সবার মাথায় এইসব প্রশ্ন তৈরি করেছে। কিন্তু যেটা কাগজে স্পষ্ট করে লেখেনি সেটা হল, এই বিপুল পরিমাণ জল সমুদ্রের আকারে নেই, বরং মানুষ তো বটেই, এমনকি যন্ত্রেরও অগম্য একটা জায়গায় পাথরের বুকে আটক হয়ে আছে।”

মাথার ওপর ফ্যানের আওয়াজ আর দূরে রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। শ্রোতাদের নিস্তব্ধতা থেকে বুঝতে পারছিলাম, ‘গল্প’টা ঠিক এই জায়গায় শেষ হয়ে যাওয়া তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।

“কিন্তু তাহলে”, তোষালি বলল, “মাটির নিচের অজানা পৃথিবী নিয়ে যে কথাগুলো চলে আসছে, সেগুলো কি শুধুই গল্প?”

“মোটেই না”, আমি সোৎসাহে বলে উঠি, “আমি শুধু বলেছি যে ওই রিংউডাইট যেখানে পাওয়া যায় সেখানে আমাদের কল্পনামাফিক প্রাণের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব।

তার মানে এই নয় যে আমাদের পায়ের নিচে, এই ক্রাস্টের ভেতরেই তেমন কোনো অজানা জায়গা নেই যেখানে হয়তো লুকিয়ে আছে অদ্ভুত প্রাণী, অজানা সভ্যতা, বা একদম অন্য রকম কোনো জগৎ।

একাধিক অভিযাত্রী বিভিন্ন গুহা এক্সপ্লোর করতে গিয়ে এমন কিছু-কিছু জিনিস দেখেছে যেগুলো থেকে এটাই মনে হয় যে…”

“যে…?”

সমস্বরে প্রশ্নটা আসায় আমি বুঝলাম, আবার শ্রোতাদের অন্তত একাংশ কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। আমিও নতুন উৎসাহে কথা শুরু করতে যাচ্ছিলাম, তবে সেটা আর হল না, কারণ সেই মুহূর্তেই দৈববাণী হল, “পাতাল প্রবেশ হয়ে গিয়ে থাকলে এবার সব্বাই টেবিলে আসুক। নইলে বিরিয়ানি ঠান্ডা হয়ে যাবে।”

এরপর আর কথা চলে না!

 বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s