বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-টেকনো টুকটাক

উড়ব এবার আকাশে (১)

কিশোর ঘোষাল

biggantechno01 (Medium)biggantechno02 (Medium)

মানুষের আকাশে ওড়ার ইচ্ছে বহুদিনের। ঠিক কবে থেকে এই ভাবনার শুরু বলা সম্ভব নয়। তবে পাখিদের সাবলীল ডানা মেলে উড়তে দেখে মানুষেরও ওড়ার সাধ হয়েছিল হয়ত সেই সভ্যতার শুরু থেকেই। আর সেই ইচ্ছা, স্বপ্ন বা কল্পনা হয়ে বারবার উপস্থিত হয়েছে আমাদের প্রাচীন কাহিনীতে, শাস্ত্রে এবং পুরাণে। কখনো সে এসেছে খুব ফিনফিনে সুন্দর ডানার সুন্দরী পরী হয়ে, কখনো বা দেবদেবীদের বিশিষ্ট বাহন হয়ে। যেমন মা সরস্বতীর বাহন রাজহংস, কিংবা মা লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা। আবার কখনো ভগবান বিষ্ণুর বাহন, গরুড়ের মতো বিশাল শক্তিশালী পাখি হয়ে। এই গরুড় পাখির মহিমা এবং গৌরবের যেন শেষ নেই, তার দুই পাখায় নাকি ঋক ও সাম দুই বেদের আশ্রয়। মহাভারতে বলা হয়েছে, সোনার মতো উজ্জ্বল এই পাখি জন্মের পরেই অত্যন্ত ক্ষুধার্ত হয়ে, বিশাল এক হাতি আর বিশাল এক কচ্ছপকে নাকি পায়ের নখে তুলে নিয়েছিলেন ক্ষুধার নিবৃত্তির জন্যে।

এসব ছাড়াও আমাদের প্রাচীন পুরাণে বারবার পাওয়া যায় পুষ্পক রথ এবং বিমানের উল্লেখ। ধনসম্পদের রাজা কুবেরের যে পুষ্পক রথ ছিল, সেটিই সব থেকে বিখ্যাত। লঙ্কার রাজা রাবণ, কুবেরকে যুদ্ধে পরাজিত করে পুষ্পক রথটি নিজের অধিকারে নিয়েছিলেন। এই পুষ্পক রথেই তিনি সীতাদেবীকে হরণ করে লঙ্কায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

খুব স্বাভাবিকভাবেই এই সব বাহন পাখি-পক্ষী অথবা পুষ্পক রথ নিয়ে যুগ যুগ ধরে তর্ক বিতর্কের শেষ নেই, কারণ আকাশে উড়তে গেলে যে অত্যন্ত জটিল কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন হয়, তার কোন আভাস বা ইঙ্গিত, এই সমস্ত প্রাচীন শাস্ত্রে বা পুরাণে আজ পর্যন্ত মেলেনি।

যিশুখৃস্টের জন্মের প্রায় ৪০০ বছর আগে গ্রিসে, আর্কিটাস নামে একজন ব্যক্তি নাকি পাখির মতো দেখতে একটি উড়ানযান বানিয়ে খুব বিখ্যাত হয়েছিলেন। এই উড়ানযান খুব সম্ভবত বাষ্পের সাহায্যে চালানো হয়েছিল এবং বলা হয় ২০০মি. (৬৬০ফিট) উড়তে সফল হয়েছিল।

কোন ইঞ্জিন ছাড়াই হাল্কা উড়ানের নাম গ্লাইডার, একটু উঁচু জায়গা বা ছোটোখাটো পাহাড়ের ধার থেকে লাফ দিয়ে, বড়ো বড়ো ডানায় ভর করে, হাওয়ায় ভেসে চলাকে গ্লাইডিং বলে। নবম শতাব্দিতে আরবের কবি ও বিজ্ঞানী আব্বাস ইব্‌ন্‌ ফিরনাসের বইয়ে এমন একটি গ্লাইডিংয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়, এছাড়া একাদশ শতাব্দিতে ম্যাল্মেসবুরি অ্যাবের মংক (সন্ন্যাসী), ইলমারও গ্লাইডিংয়ের চেষ্টা করেছিলেন। তবে দুটি ক্ষেত্রেই চালক গুরুতর আঘাত পাওয়ার ফলে, এই প্রচেষ্টায় কিছুদিনের মতো বিরতি পড়েছিল।

biggantechno03 (Medium)তারপর, ১৫০২ সালে বিখ্যাত শিল্পী ও বিজ্ঞানী লিওনার্ডো দা ভিন্সির “কোডেক্স অন দি ফ্লাইট অফ বার্ডস” নামক একটি গ্রন্থে, পাখির ডানা নিয়ে কিছু গবেষণার কথা এবং সেই পদ্ধতিতেই, মানুষের শক্তিতে চলতে পারে এমন একটি উড়ানযানের নকশা পাওয়া গেছে।

এরপর স্যার জর্জ কেলি, ১৭৯৯ সালে আধুনিক উড়োজাহাজ (Airplane) বানানোর ধারণা সামনে আনলেন। এই উড়ান যন্ত্রের ডানাদুটি ফিক্সড। বাতাসে ভেসে ওঠার জন্যে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্যে এবং নিয়ন্ত্রণের জন্যে আলাদা আলাদা ব্যবস্থা ছিল। ১৮০৩ সালে কেলি সায়েব এরকম একটি মডেল প্রথম বানিয়েছিলেন। তারপর ১৮৫৩ সালে প্রথম যাত্রীবাহী গ্লাইডার বানাতেও সফল হয়েছিলেন। এরপর ১৮৫৬ সালে ফ্রান্সের জাঁ মেরি লা ব্রিস প্রথম শক্তিচালিত গ্লাইডার বানিয়েছিলেন। তার নাম ছিল ‘গ্লাইডার লা আলবাট্রস আর্টিফিসিয়েল’। এটিকে ঘোড়ায় টানত, এবং সমুদ্রের তীরে আলবাট্রস (Albatross) পাখির মতোই উড়তে পারত!

biggantechno04 (Medium)১৯০৩ সালে আমেরিকান দুই ভাই অরভিল আর উইলবার রাইট, যাঁরা রাইট ব্রাদার্স নামে বিখ্যাত, প্রথম শক্তিচালিত উড়োজাহাজ বানাতে সফল হয়েছিলেন। ১৯০৫ সালে তাঁদের বানানো রাইট ফ্লায়ার৩ (Wright Flyer III), সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে, বেশ অনেকটা সময় খুব সাবলীলভাবে উড়তে সক্ষম হয়েছিল। ১৯০৫ সালের ৪ঠা অক্টোবর, অরভিল রাইট নিজেই পাইলট হয়ে, ৩৩ মিনিট ১৭ সেকেণ্ডে প্রায় ২০.৭৫ মাইল উড়েছিলেন এই উড়ানযন্ত্রে। একটি ইঞ্জিন লাগানো এই উড়ানের ভেসে উঠতে (take off), ডান বা বাঁ দিকে (right or left turn) মোড় নিতে এবং মাটিতে নেমে আসতে (landing) খুব অসুবিধে হয় নি।  

আধুনিক উড়ান বিদ্যায় প্রোপালশান (propulsion) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রোপালশান মানে কোন বস্তুকে হাওয়া বা জলের মধ্যে সামনের দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া। যে যন্ত্র বা পাখা এই প্রোপালশানের কাজটি করে, তার নাম প্রোপেলার। প্রো (pro) মানে সামনের দিকে, আর পেলার (peller) মানে চালানো। তার মানে, যে যন্ত্র সামনের দিকে চালায়, তাকে বলে প্রোপেলার, আর এই ঘটনাটাকে বলা হয় প্রোপালশান।

তোমাদের মধ্যে যারা নিউটনের তৃতীয় নিয়মের কথা শোনোনি, তাদের জন্যে সংক্ষেপে বলি, যে কোন ক্রিয়ার একটি বিপরীতমুখী ও সমান প্রতিক্রিয়া থাকে। জন্মদিনের সময় বাড়িতে নিশ্চয়ই বেলুন ফোলাও। সে সময় তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ যে একটা বেলুন পুরোপুরি ফোলানোর পর, বেলুনের মুখটা বন্ধ করার আগে, হাত ফস্‌কে বেরিয়ে গেলে, বেলুনের থেকে হাওয়াটা সজোরে বেরিয়ে যায়, আর বেলুনটা চুপসে যেতে যেতে, পিছনের দিকে, এদিক সেদিক দৌড়োতে থাকে। এই ঘটনা নিউটনের তৃতীয় নিয়ম এবং প্রোপালশান ব্যাপারটা বোঝার খুব সুন্দর একটা উদাহরণ। ফোলানো বেলুনের মধ্যে জমে থাকা হাওয়াটা, খোলা মুখ দিয়ে সামনের দিকে হুশ হুশ করে যে গতিতে বের হয়, তার উল্টোদিকেও একটা সমান ধাক্কা তৈরি হয়, আর সেই ধাক্কায় বেলুন পিছনের দিকে দৌড়োতে থাকে। যতবড়ো বেলুন হবে, যত বেশি হাওয়া ভরবে, খোলা মুখ পেলে, বেলুনটা পিছনের দিকে তত বেশি জোরে এবং দূরে দৌড়োবে।

biggantechno05 (Medium)একই নীতিতে প্রপেলারের ভিতর দিয়ে যত বেশি হাওয়া, যত দ্রুত পিছনের দিকে ঠেলতে পারা যায়, উড়োজাহাজ তত দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

বিভিন্ন ধরনের উড়ানের জন্যে, এই প্রোপালশানের এখনো পর্যন্ত চারটে প্রধান পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।  প্রথমটি, প্রোপেলার, দ্বিতীয় টারবাইন (turbine) বা জেট (jet), তৃতীয় র‍্যামজেট (ram jet) এবং চতুর্থ রকেট (rocket)।

গরমের দিনে আমাদের ঘরে ঘরে যে সিলিং ফ্যান ঘুরে আমাদের হাওয়া দেয়, সেই ফ্যানও কিন্তু খুব সহজ ধরনের প্রপেলার। একটু লক্ষ করে দেখবে, পাখার ব্লেডগুলো সামান্য বাঁকা(twisted) হয়। পাখার সুইচ অন করলে, মোটরের সঙ্গে পাখার ব্লেড ঘুরতে থাকে এবং পাখার ওপরের দিকের হাওয়াকে নিচের দিকে ঠেলতে থাকে। ঠিক একই নিয়মে উড়োজাহাজের সামনে এবং ডানায় লাগানো পাখা যখন ইঞ্জিনের সাহায্যে প্রচণ্ড জোরে ঘোরানো হয়, সামনের হাওয়াকে প্রচণ্ড বেগে পিছনের দিকে ঠেলতে থাকে। তখন উড়োজাহাজ সামনের দিকে এগোতে থাকে, এবং সামনের দিকে হাওয়ার চাপ কম হওয়ার কারণে উপরের দিকে উঠতে থাকে। যত বেশি পরিমাণ হাওয়া পিছনের দিকে ঠেলতে পারা যাবে, ততই উঁচুতে উঠবে এবং সামনের দিকে এগোতে থাকবে উড়োজাহাজ।       

রাইট ভাইদের সাফল্যের পর, উড়ান ব্যাপারটা আর অসম্ভব বলে মনে হল না বিজ্ঞানীদের কাছে। সমস্ত ইউরোপে এবং আমেরিকার বিজ্ঞানীরা জোরকদমে শুরু করে দিলেন উড়োজাহাজ তৈরির চর্চা। প্রচণ্ড শক্তিশালী ইঞ্জিন আর প্রপেলার সিস্টেমের পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে, দিন দিন উন্নত হতে থাকল উড়ান যাত্রা। ১৯০৯ সালে ২৫শে জুলাই, লুই ব্লিরিও উড়োজাহাজে ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে জিতে নিলেন ১০০০ পাউণ্ড পুরস্কার এবং রাতারাতি সারা বিশ্বে তিনি এবং তাঁর উড়োজাহাজ বিখ্যাত হয়ে উঠল।      

উড়োজাহাজের সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গেই, যুদ্ধের সঙ্গে তার সংযোগ ঘটে গেল। উড়োজাহাজকে প্রথম যুদ্ধের কাজে লাগাল ইটালি। ইটালি-তুর্কির যুদ্ধে, ১৯১১ সালের ২৩শে অক্টোবর, ইটালি প্রথমে উড়োজাহাজ পাঠিয়েছিল শত্রুপক্ষের যুদ্ধের শক্তি পর্যবেক্ষণের জন্য; কোথায় কোথায় আঘাত হানলে, শত্রুপক্ষকে সহজেই দুর্বল করে ফেলা যাবে। এরপর ১লা নভেম্বর, ১৯১১ থেকে ইটালি বোমা ফেলার জন্যে তুর্কিতে উড়োজাহাজ পাঠাতে শুরু করেছিল। সেই দেখে প্রথম বল্‌ক্যান যুদ্ধে (১৯১২-১৩), বুলগেরিয়াও পর্যবেক্ষণ ও বোমা ফেলার জন্যে উড়োজাহাজের সাহায্য নিয়েছিল। তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৮) মিত্রশক্তি ও অক্ষশক্তি উভয় পক্ষই আক্রমণ, আত্মরক্ষা এবং পর্যবেক্ষণের জন্য উড়োজাহাজের ব্যাপক ব্যবহার করেছিল। সত্যি বলতে কী, যেসব দেশ যুদ্ধের জন্যে উড়োজাহাজকে সবথেকে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করতে পেরেছিল, তাদের পক্ষেই যুদ্ধ জয় করা সহজ হয়েছিল।

biggantechno06 (Medium)

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সব থেকে সফল উড়োজাহাজ ছিল ফকার ডি.আর.-১ (Fokker DR 1)। প্রথম যুদ্ধবিমানের মধ্যে এই মডেলটিকেই সবচেয়ে সফল বলে ধরা হয়। ১৯১৭ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে এই বিমান বিশ্বযুদ্ধের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হয়েছিল। শত্রুপক্ষের ঘাঁটি লক্ষ করে বোমা ফেলা, বিমান থেকে হালকা কামানের সাহায্যে বিপক্ষের বিমান ধ্বংস করা, চট করে ওঠানামা এবং উড়তে উড়তে এদিকে সেদিকে ঘোরাফেরা করার ব্যাপারেও সেই সময়কার অন্যান্য বিমানের থেকে এই বিমান অনেক সাবলীল ছিল। ১৯১০ সালে, মাত্র ২০ বছর বয়সে জার্মানিতে পড়তে গিয়ে, অ্যান্টনি ফকার নামে একজন ডাচ যুবক প্রথম একটি বিমানের মডেল তৈরি করেন। তারপর ১৯১২ সালে জার্মানির বার্লিন শহরে ‘ফকার এয়ারপ্লেনবু’ নামে নিজের বিমান নির্মাণের কোম্পানি খুলেছিলেন।   

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিমানের ব্যবহার সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল সন্দেহ নেই। ইউরোপ, আমেরিকা তো বটেই, বিশ্বের অন্যান্য প্রধান প্রধান দেশগুলিও বিমানপ্রযুক্তির উন্নতির জন্যে উঠে পড়ে লেগে গেল।  ১৯১৯ সালের জুন মাসে, জন অ্যালকক আর আর্থার ব্রাউন নামে দুই ব্রিটিশ, একবারও না থেমে অ্যাটলান্টিক মহাসাগর পার হয়ে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন। তাঁদের বিমানটি ছিল ব্রিটিশ বিমান ‘ভাইকারস ভিমি’ মডেল, এই বিমান প্রথম ও পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও ভারি বোমারু বিমান হিসাবে সফল হয়েছিল। কানাডার নিউফাউণ্ডল্যাণ্ডের সেন্ট জনস শহর থেকে ১৪ই জুন দুপুর ১.৪৫-এ রওনা হয়ে এই বিমান পরের দিন ১৫ই জুন, সকাল ৮.৪০-এ আয়ারল্যাণ্ডের গলওয়ে শহরে পৌঁছেছিল। মাত্র ১৫ ঘন্টা ৫৭ মিনিটে (দুটো দেশের কালক্ষেত্র অর্থাৎ time-zone কিন্তু আলাদা) ওই বিমান ৩০৪০ কিমি পাড়ি দিয়েছিল, সমুদ্রতল থেকে ৩৭০০মি উচ্চতায় এবং গড় গতি ছিল ঘন্টায় ১৮৫ কিমি। এই বিপুল সাফল্যের পরেই, ছোটো হাল্কা যুদ্ধ বিমানের পাশাপাশি শুরু হয়ে গেল, নিয়মিত যাত্রী পরিবহনের জন্যে ভারী আর বড়ো বিমান বানানোর প্রচেষ্টা। সে কথা বলবো পরের সংখ্যায়।

[পরবর্তী সংখ্যায় আরো অনেক বিমানের কথা]