বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-দেশ ও বিজ্ঞান

জর্মানির “জাদুকর”  

অমলেশ রায়

পশ্চিম ইউরোপের প্রসিদ্ধ ও শক্তিশালী একটি দেশের নাম ডয়েচল্যান্ড (Deutschland)। আমরা যাকে জর্মানি বলে চিনি এদেশের মানুষ এদের ভাষায় এটাকে ডয়েচল্যান্ড বলে থাকে। এদের ভাষা হ’ল ডয়েচ্‌ (Deutsch) এবং এই ভাষাতেই এরা পড়াশুনা করে। সরকারী ভাষা যেহেতু ডয়েচ্‌ তাই ভাষাটা না জানা থাকলে একটু অসুবিধা হয় এখানে চলাফেরা করতে।

দক্ষিণে আল্পস্‌ পর্বতমালা উত্তরে উত্তর সাগর আর রাইন, দানিউব, এলবে নদী সমৃদ্ধ এদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার মত। বছরে চারটি ঋতুর দেখা মেলে যথা, শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম ও হেমন্ত। আলাদা করে বর্ষাকাল এখানে নেই তবে সারা বছরই বৃষ্টি হতে থাকে। বিশেষত শীতকালে এখানে প্রায়ই বৃষ্টি হয়। শোনা যায় ভুপারটাল্‌ এখানের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল এলাকা।

বৃষ্টিভেজা শীতকালে এদেশে দিনের আলো ফোটে প্রায় সকাল ৯ টায় আর সন্ধ্যা নেমে আসে বিকাল ৪:৩০ নাগাদ। সূর্যের দেখা মেলা তখন ভাগ্যের ব্যাপার। পর্ণমোচী বৃক্ষের শাখায় একটিও পাতা না থাকায় প্রকৃতির রূপ হয় ধূসর-কালো, মন খারাপ করা। তবে তুষারপাত হলে সাদা-কালো ছবি ফুটে ওঠে চারিদিকে।

শীতের শেষে বসন্ত নিয়ে আসে নানা রঙের ফুল, পাতার বাহার। এখানকার মানুষ গ্রীষ্মকালটা খুব উপভোগ করে যেমন আমরা আমাদের গরমের দেশে শীতকালটা কাটাই। শীতকালের বিপরীত দেখা যায় গ্রীষ্মকালে, তখন সকালের আলো ফোটে ভোর ৫  টার আগেই আর সন্ধ্যা নামে প্রায় রাত্রি ১১ টায়। 

biggangermany (3) (Medium)

চিত্র ১: গ্রীষ্ম কাল ও শীত কালের চিত্র, মুলহাইম, জর্মানি।

এখানকার রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আর শহরগুলি বেশ সাজানো গোছানো ও সুন্দর। তার প্রধান কারণ এখানকার মানুষ ও তাদের সত্যিকারের দেশাত্মবোধ। প্রত্যেকেই নিজের দেশের ও কাজের প্রতি সৎ ও নিষ্ঠাবান। সোম থেকে শুক্রবার এরা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে। কাজের সময় এরা কোন রকম ফাঁকি দেয় না এমন কি মোবাইল ফোনও ব্যবহার করে না। আর যতক্ষন কোন কাজ নিখুঁত না হচ্ছে ছাড়েনা, লড়ে যায়।  এটাই দেখার ও শেখার মত বিষয়। এর ফলস্বরূপ তৈরি হয়েছে সুন্দর ও শক্তিশালী একটি দেশ।

শনি ও রবি দু’দিন অফিস বন্ধ থাকে। আর রবিবার সবার ছুটি, কোন দোকান বা বাজার খোলা থাকে না। এইদিন সবাই মজা করে, বিশ্রাম নেয়। এরা প্রত্যেকে নিজের কাজ নিজে করে, সাধারণত কোন বাড়িতেই ঝি বা চাকর থাকে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন জর্মানি হেরে গেল তখন এদের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। এক ব্রিটিশ মেজরের (ইভান হির্‌স্ট) চেষ্টায় এদের একটি গাড়ি তৈরির কারখানা কোনরকমভাবে বোমাবর্ষণ থেকে বেঁচে যায়। আর বেঁচে থাকা সেই একটি গাড়ি কারখানা থেকে আস্তে আস্তে গড়ে উঠতে থাকে এক নতুন জর্মানি। সেই কারখানার নাম ফোল্‌ক্সভাগেন (Volkswagen)। বর্তমানে ভারী যন্ত্রপাতি তৈরির জন্য বিখ্যাত এই দেশ, যেখানে বিশ্বের সব নামী দামী মোটর গাড়ি ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি তৈরি হয় নিজস্ব প্রযুক্তিতে।

biggangermany (4) (Medium)

????????????????????????????????????

চিত্র ২: রাইন নদী ও ঐতিহ্যবাহী কোলন চার্চ, জর্মানি

কলা, দর্শন, গণিত ও বিজ্ঞানের মত বিষয় গুলিতে জর্মানির অবদান  অনস্বীকার্য। পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে বিজ্ঞানীদের নামের তালিকা ও অবদান খুব কম নয়। সবচেয়ে বেশি নোবেল পুরস্কারপ্রাপক দেশগুলির মধ্যে জর্মানির স্থান বেশ উপরে। আইনস্টাইনের নাম সবাই শুনেছ তোমরা, এছাড়াও হাইসেনবার্গ, অটোহান্‌, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, হাবের, বেয়র নামগুলি খুবই পরিচিত বিজ্ঞান উৎসুক পাঠকের কাছে। এমন অজস্র জ্ঞানী-গুণী মানুষ জ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে গেছেন যা মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে আজও। তেমনই এক মানুষের গল্প শোনাই আজ।

????????????????????????????????????

এমিল ফিশার (Emil Fischer) একজন প্রতিষ্ঠিত কাঠ ব্যবসায়ীর ছেলে। জন্ম ১৯৫২ সালের ৯ অক্টোবর জর্মানির পশ্চিমে কোলন শহরে।  বাবার ইচ্ছা ছেলে তাঁর মত কাঠ ব্যবসায়ী হবে কিন্তু এমিল চায় পড়াশুনা করতে। কিছুদিন ব্যাবসার কাজ করে এমিল যখন বিশেষ খুশি করতে পারলো না তার বাবাকে, তখন তার বাবা ভাবলেন, এই ছেলেকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। তার চেয়ে বরং ও লেখাপড়া করুক।

যদিও এমিলের ঝোঁক ছিলো পদার্থবিদ্যায় কিন্তু স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে এডল্‌ফ ফন্‌ বেয়র এর সংস্পর্শে রসায়নবিদ্যাতে মন প্রাণ সঁপে দিলেন। শুরু হল অধ্যাবসায় ও গবেষণা। কিছু দিনের মধ্যেই ফিনাইল হাইড্রাজিন নামের এক ক্ষার আবিষ্কার করেন তিনি এবং ল্যারেটরিতে তা তৈরিও করে ফেলেন। পরবর্তী গবেষণায় এই ক্ষার বিশেষ কাজে ব্যবহার করে “সুগার” বা “শর্করা”র রসায়ন উৎঘাটন করেন।

তোমরা সকলেই চিনি, গ্লুকোজ খেয়েছ। কী সুন্দর মিষ্টি মিষ্টি স্বাদ! এইগুলি হল শর্করা গোত্রভুক্ত। কিন্তু এদের একটি অণু কেমন দেখতে অর্থাৎ তাদের মধ্যে থাকা কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পরমাণুগুলি ঠিক কেমন ভাবে সাজানো আছে তা জানা বড় মুশকিলের কাজ কারণ এগুলিকে সাধারণ চোখে বা শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও দেখা সম্ভব নয়। এ দু’টি ছাড়াও আরও অনেক রকমের শর্করা আছে। এমিল ফিশারের গবেষণায় আমরা একাধিক একক শর্করার ত্রিমাত্রিক গঠন সঠিকভাবে জানতে পারি। শুধু তাই নয়, এদের সম্ভাব্য প্রতিসম অণুগুলির ত্রিমাত্রিক গঠনও তিনি ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মত উল্লেখ করেছেন।

মাছ, মাংসে যে প্রোটিন আছে সে তো সকলেই জানে। আর এগুলি আমাদের শরীরের অপরিহার্য অঙ্গ। এই প্রোটিন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অণু দিয়ে তৈরি যাদের অ্যামাইনো অ্যাসিড বলা হয়। ঠিক যেমন বাড়ি তৈরি করতে ইট লাগে তেমন। এগুলিও (অ্যামাইনো অ্যাসিড) অতি ক্ষুদ্র অণু যাদের চোখে দেখা বা অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখা সম্ভব নয়। এমিল ফিশার এই সকল অ্যামাইনো অ্যাসিডগুলির পৃথকীকরণ ও চিহ্নিতকরণের কাজটি নির্ভুল ভাবে করেন। এছাড়াও পেপটাইডের বন্ধন (প্রোটিনের টুকরো অংশকে পেপটাইড বলে, দুই বা ততোধিক অ্যামাইনো অ্যাসিড মুক্তোর মালার মত পরস্পর হাত ধরাধরি করে যুক্ত থাকে, তাদের মধ্যকার যে বন্ধন তাকেই ‘পেপটাইড বন্ধন’ বলে) নিয়েও বিশেষ আলোকপাত করেন।

আমাদের শরীরে যে DNA আছে তা ATGC-র সমন্বয়ে তৈরি। A হ’ল অ্যাডিনিন ও G হ’ল গুয়ানিন। তোমরা হয়তো এটাও শুনে থাকবে আমরা যে কফি খাই তাতে ক্যাফিন থাকে। আর প্রাণীদেহের একটি বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ হল ইউরিক অ্যাসিড যার তারতম্যে নানান অসুবিধা দেখা দেয় আমাদের শরীরে। কিন্তু মজার ব্যাপার হ’ল এগুলির (অ্যাডিনিন, গুয়ানিন, ক্যাফিন ও ইউরিক অ্যাসিড ইত্যাদি) আণবিক গঠন একে অন্যের থেকে সামান্যই আলাদা এবং এগুলির মূল মূলক হল পিউরিন নামক গুরুত্বপূর্ণ যৌগ। এ তথ্যটা ফিশার প্রথম প্রকাশ করেন এবং পিউরিন রসায়নাগারে প্রস্তুত করেন।

biggangermany (2) (Medium)

উপরের ছবিটি (চিত্র ৩) দেখে সহজেই বোঝা যায় এরা একে অন্যের থেকে গঠনগত ভাবে সামান্য আলাদা (লাল রঙের পিউরিন বলয় সবার মধ্যে বিদ্যমান)। কিন্ত এই স্পষ্ট ছবিটি যিনি প্রথম দেখতে পান তিনি এমিল ফিশার। তাঁর গবেষণার গুণেই এগুলির গঠনসংকেত আজ আমাদের কাছে অনেক সহজ হয়েছে।

এই কাজগুলি কতটা কঠিন তা আন্দাজ করতে একটা উপমার সাহায্য নেওয়া যাক। ধর, পাঁচ জন আলাদা দেশের মানুষকে একটি সারিতে পাশাপাশি বসিয়ে দেওয়া হ’ল এবং একজন শিল্পীকে চোখে কাপড় বেঁধে হুবহু তাদের ছবি আঁকতে বলা হল, একটি মাত্র শর্ত যে শিল্পী ওই পাঁচজনকে আগে কখনও দেখেননি।

শর্করা, প্রোটিন, ফ্যাট এবং নিউক্লিক অ্যাসিড হল জীবের চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান। জীবনের মূলে এই চারটি জৈব রাসায়নিক যৌগ অপরিহার্য অঙ্গ রূপে বিবেচিত হয়। এমিল ফিশারের অনবদ্য অবদানে এই চারটি শাখা ক্ষুদ্র ঝরনা থেকে চারটি বৃহৎ নদীতে রূপান্তরিত হয়েছিল এবং পরবর্তী গবেষণায় এরা এক একটি মহাসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই শাখাগুলির প্রাথমিক পাঠ শুরু হয় এমিল ফিশারের কাজ থেকেই।  তাঁর জীবনকালে বিজ্ঞানচর্চার জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন, পৌরোহিত্য করেছেন বিজ্ঞান প্রসারে এবং মানব কল্যানমূলক বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত আবিষ্কারের।

১৯০২ সালে “সুগার সংক্রান্ত কাজ ও পিউরিন প্রস্তুতির জন্য” তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। অসম্ভব স্মৃতিশক্তির অধিকারী এই মানুষটি যদিও খুব ভালো বক্তা ছিলেন না। তোমরা যখন বড় হয়ে তাঁর কাজগুলো পড়বে ও জানবে, আমাদের মতই তাঁকে তোমাদেরও জৈব রসায়নের “জাদুকর” বলে মনে হবে।