বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-পেটপুরাণ ইমন চ্যাটার্জি শীত ২০১৬

সেদিন রিনি হঠাৎ বায়না ধরল যে সে বিকেলে মেলায় যাবে। প্রত্যেক বছর ঠিক ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিকে তাদের বাড়ির পাশের মাঠে বিশাল মেলা বসে। কোনও বছরই সে পরীক্ষার জন্য যেতে পারে না। কিন্তু এবারে তার পরীক্ষা আগেভাগে শেষ হয়ে যাওয়ায় সে একদম মুক্ত। মায়ের কাছে খুব বেশি কাকুতি মিনতি করতে হল না, তিনি রাজী হয়ে গেলেন রিনিকে নিয়ে মেলায় যাবার জন্য। রিনি মেলায় গিয়ে বাদাম ভাজা, পাপড়ি চাট এবং মোমো খেয়ে একঘন্টা ঘুরে বাড়ি ফিরল। সে বুঝতে পারল, আনন্দের বশে সে একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছে।

রাতের খাবারের যখন ডাক পড়ল তখনও তার খাবার হজম হয়নি। তাই ঠিকমতো খেতেও পারল না, সবটাই বমি করে উগরে দিল। তারপর থেকেই রিনির মনে খালি খালি প্রশ্ন জাগে যে আমরা প্রতিদিন যে খাবার, জল খাই সেগুলো যায় কোথায়? হজম হয় কীভাবে আমাদের শরীরে? আর কেনই বা বেশি তেল-মশলা খেলে আমাদের শরীর থেকে তা বমির আকারে বেরিয়ে আসে?

আচ্ছা, রিনির মতো তোমাদের মনেও কী কখনও প্রশ্ন জাগে না যে আসলে আমাদের শরীর নামক যন্ত্রটা কী দিয়ে তৈরি? তা কীভাবে চলে? তোমরা হয়তো পাঠ্যবইতে অনেক কিছুই পড়ে থাকবে, তা নিয়ে এখানে কোনও কথাই হবে না। আমি শুধু আমাদের এই শরীর নামে যন্ত্রটার ছোটো ছোটো গল্প বলব।

আমাদের পাচনতন্ত্রঃ

প্রথমেই আসি, আমাদের শরীরে যাবতীয় খাবার হজম হয় যেখানে, সেখানকার কথায়। হজমকে ভাল অর্থে পাচন বলা হয় এবং পাচন হয় যে যন্ত্রে তাই হল পাচনযন্ত্র বা পাচনতন্ত্র। আমাদের শরীরটা একটা বিশাল দুর্গের মতো, যার কর্মচারীর সংখ্যা অগুনতি এবং তারা যে গতিতে কাজ করে তা করা কোনওদিনই কোনও মানুষ কর্মচারী কেন পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন যন্ত্রের দ্বারাও করা সম্ভব নয়।

বিশাল দুর্গের প্রবেশদ্বারের অংশ হল এই পাচনতন্ত্র (Digestive System)। পাচনতন্ত্র দেখতে এক বিশাল নলের মতো যা লম্বায় প্রায় ৮ – ১০ মিটার। তবে আমাদের দেহের মুখ থেকে কোমরের একটু নীচে অবস্থিত পায়ুদ্বার পর্যন্ত এটি বিস্তৃত হওয়ায় নলটি কিছু কিছু জায়গায় খানিক পেঁচিয়ে থাকে। আমাদের পৌষ্টিকতন্ত্রের প্রথম অংশ হল মুখগহ্বর অর্থাৎ, যেখানে খাদ্যবস্তু খেয়ে আমরা ভালোমন্দের স্বাদ বুঝতে পারি। এইস্থানেই খাবার খানিকটা হজম হয়ে যায়। তোমরা বলতে পার, এ কী! আমরা তো জানি খাবার পেটে গেলে তবে হজম হয়! কিন্তু তোমরা যখন খাবার খাও সঙ্গে সঙ্গে মুখটা যে তরলে ভরে যায়, তাকে আমরা লালা বা লালারস (Salivary Juice) বলি।

এই লালারসের মধ্যে উৎসেচক (Enzyme) থাকে যা আমাদের যাবতীয় খাবারকে হজম করে। একটু ছোট করে হজম বা পাচন প্রসঙ্গে বলে নিই, আমরা যেসব শাকসবজি, ভাত, ডাল প্রভৃতি খাই, সেগুলো আপাতদৃষ্টিতে খুব ক্ষুদ্র মনে হলেও সেগুলো শরীরের পক্ষে খুবই জটিল আণবিক গঠন। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা খাদ্যকে মোট ৬টি ভাগে ভাগ করলেন, যেগুলি হল কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ (Minerals) এবং জল। এই প্রত্যেকটি হল জটিল আণবিক গঠন। যেমন কার্বোহাইড্রেটকে যদি ভেঙে ভেঙে খুব ছোট করা যায় তাহলে পাব গ্লুকোজ (Glucose), ফ্রুকটোজ (Fructose) ও গ্যালাকটোজ (Galactose) নামক সবচেয়ে সরল আণবিক গঠন, উৎসেচক এই ভেঙে সরল করে নেওয়ার কাজটিই পালন করে। একইরকমভাবে প্রোটিনকেও ভেঙে অ্যামাইনো অ্যাসিড করে নেওয়ার কাজটিও করে। দুটি অ্যামাইনো অ্যাসিড মাঝখানে একটি পেপটাইড বন্ধনী (-CONH) দিয়ে যুক্ত হয়ে প্রোটিন গঠন করে।

 আমাদের মুখের লালার মধ্যেও এরকম কিছু উৎসেচক থাকে, যেমন — টায়ালিন উৎসেচক কার্বোহাইড্রেটকে ভেঙে খানিক সরল করে নেয় এবং বহুশর্করাকে দ্বিশর্করা মলটোজ-এ (Moltose) পরিণত করে। টায়ালিন যেহেতু অ্যামাইলেজ (Amylase) বা কার্বোহাইড্রেটকে ভাঙে, তাই একে বিজ্ঞানের পরিভাষায় স্যালাইভারি অ্যামাইলেজ-ও (Salaivery Amylase)  বলা হয়।

কার্বোহাইড্রেট ছাড়াও ফ্যাট বা লিপিড নামক আরেক খাদ্যোপাদানও মুখের লাইপেজ নামক উৎসেচকের দ্বারা সরলীকৃত হয়ে ফ্যাটের সরল রূপ ফ্যাটি আসিড (Fatty Acid) ও গ্লিসারল (Glysarol) তৈরি করে।

biggandigestiveতাই আমরা যখন ভাত বা তেলজাতীয় খাবার খাই তখন কিছুক্ষণ চিবোনোর পর সেটি একটা মন্ডের ন্যায় হয়ে যায়। কিন্তু আমরা যখন ডিম বা মাংস খাই তখন কিন্তু চিবোনোর পরেও সেগুলো লালা মেশানো মণ্ডে পরিণত হয় না, বেশ কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খন্ডে ভাগ হয়ে যায়। এর কারণ হল মুখগহ্বরে প্রোটিনকে ভাঙার মত কোনও উৎসেচকই থাকে না।

খাদ্য মুখগহ্বরে খানিকটা পাচিত হবার পরে নেমে আসে পরবর্তী অংশ গলবিল-এ (Golbil) এবং এরপর নেমে আসে গ্রাসনালী (Oesofagus) নামক নলাকার অংশে। এই অংশদুটিতে কোনও হজম প্রক্রিয়া সংঘটিত হয় না। গ্রাসনালীর পরবর্তী অংশই হল পাকস্থলী (Stomach)।

পাকস্থলীতেই প্রধানত কার্বোহাইড্রেট ব্যতীত যাবতীয় খাদ্যোপাদান পাচিত হয়। সে গল্প না হয় পরে কোনও সময় বলব। আগে আমরা দেখি যে এই পাকস্থলীর আসলে কী কী অংশ রয়েছে। পাকস্থলীর পূর্বে গ্রাসনালী যে স্থানে এসে শেষ হয়েছে সেই প্রবেশদ্বারকে বলা হয় হৃৎপ্রান্ত (Cardius) এবং পাকস্থলী যে স্থানে এসে শেষ হয় তাকে বলা হয় পাইলোরিক প্রান্ত (Pylorus)। এই হৃৎপ্রান্তের ঠিক পরেই বডি (Body) নামক একটি অংশ আছে এবং এই বডি ও পাইলোরিক প্রান্তের মাঝখানে সামান্য ফোলা মতন যে অংশটি থাকে, তাকে ফান্ডাস (Fandus) বলা হয়।

এ তো গেল পাকস্থলীর কথা। পাকস্থলীর ঠিক পরেই আসে ক্ষুদ্রান্ত্র (Small Intestine)। পাকস্থলীর পাইলোরিক প্রান্ত এবং অগ্ন্যাশয় (Pancreas) নামক আরেকটি পাতার মতো দেখতে গ্রন্থির প্রান্তভাগ একত্রিত হয়ে ক্ষুদ্রান্ত্রে যুক্ত হয়। এই ক্ষুদ্রান্ত্র পৌষ্টিকতন্ত্রের সবচেয়ে লম্বা অংশ। অর্থাৎ এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৬১০ সেমি দীর্ঘ এবং এটি প্রচুর কুন্ডলী পাকিয়ে অবস্থান করে। এই ক্ষুদ্রান্ত্রেরও তিনটি ভাগ আছে।

প্রথমটি হল গ্রহণী বা ডিওডেনাম (Deodinum) এবং শেষ প্রান্তটি হল ইলিয়াম (Ilium), এদের মাঝখানে অবস্থান করে কুন্ডলীকৃত জেজুনাম (Jejunum)। আমরা যত খাবার খাই সকল খাদ্যোপাদানই সবচেয়ে সরলীকৃত হয় এই ক্ষুদ্রান্ত্রেই এবং অবশেষে রক্তের সঙ্গে মিশে যায়, যাকে শোষণ (Absorption) বলা হয়। শোষণের গল্প তোমাদের যখন বলব, শুনলে আশ্চর্য হবে যে কীভাবে আমাদের খাওয়া সুস্বাদু খাবারগুলো রক্তে মিশছে। ক্ষুদ্রান্ত্রের ঠিক পরেই অবস্থান বৃহদন্ত্রের (Large Intestine)। বৃহৎ নাম হলে কী হবে দৈর্ঘ্যে কিন্তু সে ক্ষুদ্রান্ত্রের চেয়ে ছোট, মাত্র ১৫০ সেমি। এই বৃহদন্ত্রের যে স্থানে ক্ষুদ্রান্ত্র এসে শেষ হয়, তাকে সিকাম বলে। তোমরা অনেকেই হয়তো অ্যাপেনডিক্সের নাম শুনে থাকবে, এটি সিকামের ঠিক পরেই থাকে, যা প্রাচীনকালে আদিম মানুষ যখন কাঁচা মাংস খেত তখন সক্রিয় ছিল, ধীরে ধীরে ব্যবহারের অভাবে বিবর্তিত হয়ে এটি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। বৃহদন্ত্রকে কোলনও বলা হয়, এই কোলনের আবার চারটে ভাগ আছে।

 সিকামের উপরেই থাকে আরোহী কোলন (Ascending Colon)। আরোহীর পর থাকে অনুপ্রস্থ কোলন (Transverse Colon)। অনুপ্রস্থ কোলন ক্রমশ নিম্নগামী হয়ে অবরোহী কোলন (Descending Colon) গঠন করে। বৃহদন্ত্রের বিপরীত পার্শ্বের কোলনটিকে সিগময়েড কোলন বলে। অবরোহী কোলনের পরেই থাকে মলাশয় (Rectum) যেখানে খাদ্যের অপ্রয়োজনীয় বস্তু সাময়িকভাবে বর্জ্য আকারে সঞ্চিত থাকে এবং পায়ুদ্বার দিয়ে নির্গত হয়ে যায়।

পৌষ্টিকনালীর সুদীর্ঘ ব্যপ্তি এখানেই শেষ হয়।    

 বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s