বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-প্রতিবেশী গাছ

ডুমুর

অপূর্ব চট্টোপাধ্যায়

biggandumur04 (Medium)ঘুরে ঘুরে বাজার করতে কার না ভাল লাগে। চারিদিকে সবুজের সমাহার, সবুজ আর সবুজ। প্রায় সব জায়গাতেই রাস্তার ধারে বাজার বসে। মানুষের হাঁটার জায়গাতেই ঝুড়ি নিয়ে বসে ব্যাপারীরা। যেখানে সবজি বাজার করি সেই বাজারটি একেবারে স্টেশনের পাশে। মালগাড়ি থেকে মাল নামিয়ে যে’সব বড়ো বড়ো গুদামঘরে রাখা হয় সেই গুদামঘরে যাওয়ার রাস্তার ধারেই এই বাজারটি বসে। রাস্তাটি পাথরের। ইটের মাপের পাথরগুলি রাস্তায় সাজানো। তাই রাস্তাটি কিছুটা এবড়োখেবড়ো। বর্ষাকালে জলকাদায় প্রায় অগম্য হয়ে পড়ে। মাঝেমাঝে যখন মালবোঝাই লরিগুলি চলাচল করে, মনে হয় যেন মূর্তিমান বিভীষিকা। দু’দিকে বাজার বসার ফলে রাস্তা সরু হয়ে গেছে, তাই লরি এলেই মনে হয় এই বুঝি চাপা পড়লাম।

biggandumur02 (Medium)বাজারের শুরুতেই অবাঙালি ফড়েরা বসে। চালানিনী মাল যা আসে সেগুলি পলিথিন বিছিয়ে তার ওপর ঢেলে বিক্রি করে। আর বাজারের অপর প্রান্তে গ্রাম থেকে যে সব মেয়েরা ঝুড়ি করে শাকসবজি নিয়ে আসে তাদের স্থান হয়। আমার লক্ষ্য থাকে এদের কাছে পৌঁছান। কেউ হয়ত মোচা বা থোড় আনে, কেউ শাক। মাঝে মাঝে মিলে যায় ডুমুর। ডুমুর আমার প্রিয়, কিন্তু সেটি আনার অসুবিধা রয়েছে। আনলে সেটি কাটবে কে, রান্নার মেয়েটির সময় নেই। ঝড়ের গতিতে রান্না করে চলে যায়। বাজারের থলিতে ডুমুর দেখলেই তার মুখ ভার।

biggandumur01 (Medium)ছোটো ঝুড়িতে করে ডুমুর আনে গ্রামের মেয়েরা। একটা ছোটো পলিথিন বিছিয়ে এক পাশে নিজে বসে আর বাকি অংশে ডুমুরগুলি কয়েকটি ভাগ করে সাজিয়ে রাখে। বেশির ভাগ সময়ে ওজন করতে হয় না, এক একটি অংশের মূল্য ঠিক করা থাকে। তবে বেশি পরিমাণ ডুমুর নেবার প্রয়োজন হলে ওজন করে নিতে হয়। ডুমুরের সাইজ বড়ো হলে সেগুলি শক্ত হয়, তাই মাঝারি মাপটাই রান্নার পক্ষে সুবিধাজনক। পাকা ডুমুর আনা চলবে না, সেগুলি রান্নার পক্ষে অযোগ্য তবে পাখি আর হনুমানের বড়ই প্রিয়।

biggandumur03 (Medium)বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতজনকে দীর্ঘ দিন না দেখতে পেলে তাকে উদ্দেশ্য করে আমরা বলে থাকি “কীরে, তুই ডুমুরের ফুল হয়ে গেলি নাকি?” ডুমুর গাছে ফুল আমরা দেখতে পাই না তাই বাংলায় এই প্রবাদ বাক্যটির চল হয়েছে। তবে ডুমুরের ফুল হয়। ডুমুর কাটলেই তার ভিতরে ফুল এবং বীজ দেখতে পাওয়া যায়। এই ধরণের পুষ্পবিন্যাসের নাম উদুম্বর পুষ্পবিন্যাস। গাছের গুঁড়িতেই ডুমুর ধরে থোকা থোকা। ফল পাকলে হলুদ হয়ে যায়, আর ভিতরটা লাল। গাছের পাতাগুলি খসখসে। মনে পড়ে ছোটবেলায় মাঠেঘাটে ছুটে বেড়ানোর সময় হাতে পায়ে শুঁয়ো লেগে গেলে সেগুলি ছাড়ানোর জন্য ডুমুর গাছের পাতা ঘসতাম।  শুঁয়োগুলি উঠে গেলেও চুলকুনি কমত না।

ডুমুর গাছের রস ঘন দুধের মত, সাদা রঙের আঠালো। আয়ুর্বেদের ভাষায় এই জাতীয় গাছকে ক্ষীরীবৃক্ষ বলে। বট অশ্বত্থ পাকুড় এই জাতীয় গাছ। ডুমুর গাছের দুধের মত ঘন রসের ভেষজ গুণের কথা আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য লিখেছেন, “শরীরের কোন জায়গায় গ্রন্থিস্ফীতিতে লাগিয়ে দিলে প্রদাহ বা ব্যথা কমে যায় এবং বসেও যায়, গ্রামাঞ্চলে এটা লাগিয়ে দিলে তার উপর লবন ছড়িয়ে দিতে দেখেছি এবং অর্শরোগে ও অতিসারে খাওয়ার জন্য একে ব্যবহার করা হয়, এটা লেখা আছে ওয়াট সাহেবের সংগ্রহ গ্রন্থে।”

biggandumur04 (Medium)গ্রামাঞ্চলে ডুমুরের ঔষধীরূপে ব্যবহারের কথা উল্লিখিত হয়েছে বইয়েতে। কয়েকটি ব্যবহারের কথা এখানে উল্লেখ করা হল।

  • সরু ডাল সমেত কচিপাতার রস বোলতা ভীমরুলের হূল বা অন্য কোন পোকার কামড়ে ব্যবহার করা হয়।
  • কুকুর বিড়ালের আঁচড় কামড় সহ আঘাতজনিত ব্যাথা ফোলায় এই রস উপকারী।
  • কোন জায়গা কেটে রক্তপাত হলে কচিপাতা ও সরু ডালের রস ফুটিয়ে ঘন করে [ঘনসার] ক্ষতস্থানে দিলে রক্তপাত বন্ধ হয়।
  • গলার ব্যাথা বা মুখের ক্ষতে ঘনসারের সঙ্গে জল মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়।
  • দাঁতের গোড়া বা মাড়ি ফোলা, দাঁতের দুর্গন্ধ রোধে ঘনসারে জল মিশিয়ে তরল করে কুলকুচি করলে রোগের উপশম হয়।  

biggandumur06 (Medium)এদেশে বেশ কয়েক ধরণের ডুমুর গাছ দেখা যায়। তবে আমরা যে গাছের ফল রান্নায় ব্যবহার করি তার বিজ্ঞান সম্মত নাম Ficus cunia . এই গাছটি Moraceae পরিবারভুক্ত।

সাধারণ ডুমুরের তুলনায় একটু বড়ো ফল ধরে এমন এক ধরণের ডুমুর গাছ রয়েছে যার নাম যজ্ঞডুমুর। এই যজ্ঞডুমুরের পল্লব ‘সূতিকা হোমে’ অর্থাৎ সূতিকাগৃহে যে হোম করা হয়, সেখানে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া যজ্ঞডুমুরের ব্যবহার রয়েছে অন্নপ্রাশন, উপনয়ন, বিবাহ ইত্যাদি অনুষ্ঠানের হোমাগ্নিতে আহুতি দেওয়ার জন্য। পারলৌকিক শ্রাদ্ধ এবং  বৃষোৎসর্গে এই বৃক্ষের ব্যবহার রয়েছে।