বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-বিচিত্র জীবজগত

তারা-নাক মোল

bigganjeebjagat01 (Medium)কী ভাবছ? ভিনগ্রহী?

উঁহু সেসব কিছু নয়। একেবারেই পৃথিবীর জীব। ওর নাম ‘তারা’নাক মোল বা স্টার নোজড মোল।

তার ভালো নাম Condylura cristata। মাত্রই বিশ সেন্টিমিটার লম্বা, পঞ্চাশ গ্রাম মতন ওজনের এই ইঁদুর জাতের জীবের নাকের চারপাশে গোটা বাইশেক সরু সরু মাংসল আকর্ষী থাকে। সেইটেকে একখানা তারার মতন খুলে ধরে সে পথ চলে।

আকর্ষীগুলো সাংঘাতিক সংবেদনশীল। মানুষের হাতের অতবড়ো তালুতে যেখানে আছে মাত্র সতেরো হাজার সংকেত সংগ্রাহক রিসেপটর সেখানে ওই খুদে খুদে ২২টা আকর্ষির মধ্যে আছে পঁচিশ হাজারেরও বেশি রিসেপটর। মানুষের হাতের চেয়ে ছ গুণ বেশি সংবেদনশীল ওই আকর্ষীদের দিয়ে সে তার খাদ্য খোঁজে। তবে শুধু খাবারদাবারই নয়। ও দিয়ে সে ভূমিকম্পের পূর্বাভাষও টের পেয়ে যায়।

আসলে প্রাণীটা প্রায় সম্পূর্ণ অন্ধ। ওই নাকের গায়ের আকর্ষীগুলো তার চোখের কাজটা করে দেয়, এবং তা করে বেজায় ভালোভাবে। কতটা শক্তিশালী তার নাক? দেখা গেছে, চারপাশে ছড়ানোছটনো নানান বস্তুর মধ্যে পছন্দের খাদ্য পোকাটির গায়ে আকর্ষী ঠেকলে সেটাকে খাদ্য হিসেবে চিনে নিতে তার সময় লাগে এক সেকেন্ডের একশোভাগের হাজার ভাগের আট ভাগ বা আট মিলিসেকেন্ড। যেকোন জীবের নিউরোন বা নার্ভকোষের তথ্য পরিবহনের ওইটেই সর্বোচ্চ গতি। ওর চেয়ে বেশি গতিতে আর কোন প্রাণীর নিউরোন তথ্য পরিবহন করতে পারে না যে শুধু তাই নয়, গঠনগতভাবে কোন নিউরোনের তথ্য পরিবহনের গতি ওর চেয়ে বেশি সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে মানুষ তার কাছে একেবারে শামুকের মতই ধীরগতির জীব। একই কাজ করতে মানুষের মস্তিষ্ক সময় নেয় এক সেকেন্ডের ষাট শতাংশ, বা ছশো মিলিসেকেন্ড।

bigganjeebjagat02 (Medium)বুঝতেই পারছ, শুধু দ্রুতগতির নিউরোন দিয়ে এ কাজটা হবে না। নিউরোনের বয়ে আনা খবরকে বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবার জন্য মস্তিষ্ককেও বেজায় গতিতে কাজ করতে হবে, তাইতো? পরীক্ষা করে দেখা গেছে এদের মস্তিষ্কের অর্ধেকের বেশি শুধুমাত্র ওই আকর্ষীদের কাজ করাবার জন্য নিযুক্ত থাকে সবসময়।

খাবার হিসেবে আন্দাজ করতে পারবার সঙ্গেসঙ্গে সে তার আকর্ষীদের মধ্যে এগারো নম্বর জুটিটাকে শিকারের গায়ে ঠেকিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে। মানুষের চোখের ভেতর যেমন একটা সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল বিন্দু থাকে যাকে বলে পীতবিন্দু বা ইয়েলো স্পট, ঠিক তেমনই এদের এই এগারো নম্বর আকর্ষী জুটি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল হয়ে থাকে। মজার কথা হল, এই এগারো নম্বর জুটিতে রিসেপটরের সংখ্যা কিন্তু অন্য আকর্ষীগুলোর চেয়ে কম। কিন্তু তবুও এর শক্তি বেশি হয় কারণ এই এলাকার রিসেপটরগুলোর প্রত্যেকটার সঙ্গে অনেক বেশি সংখ্যায় নিউরোন জোড়া থাকে খবর আনানেওয়ার জন্যে।

আর সে কাজটি করবার পর খাবারটিকে ধরে মুখে চালান করে চুয়াল্লিশখানা দাঁতে তাকে চিবিয়ে গিলে ফেলতে সে সময় নেয় এক সেকেন্ডের বারো ভাগের এক ভাগ বা একশ কুড়ি মিলিসেকেন্ড। নেচার  পত্রিকা তাই তাকে দুনিয়ার সবচেয়ে দ্রুত খাইয়ে-র শিরোপা দিয়েছে। দ্রুততম খাইয়ের স্বীকৃতি দিয়েছে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডও।  

bigganjeebjagat04 (Medium)শুধু কি তাই? জলেস্থলে চড়ে বেড়ানো এই সাংঘাতিক খাইয়েটির আরো একটা গুণ আছে। সে জলের তলায় গন্ধ শুঁকবার কৌশল আবিষ্কার করে ফেলেছে। জানোই তো, গন্ধ বস্তুটা হল বাতাসে ভাসমান কোন বস্তুর কণা। সেইটে নাকের ভেতর এসে ঠেকলে গন্ধধরা কোষেরা মস্তিষ্কে তার ব্যাপারে খবর পাঠালে আমরা কোন জিনিসের গন্ধ পাই। জলের তলায় বাতাস নেই, তাই গন্ধও পাওয়া যাবে না। তা, ‘তারা’নাক মোল বেজায় চালাক। জলের নীচে ঘোরাফেরা করবার সময় কোনো জিনিসের গন্ধ শুঁকতে চাইলে সে করে কি? একটা ঢেঁকুর তোলে। সেটা জলের ভেতর একটা বুদবুদের মত বের হয়ে আসে। বুদবুদটা লক্ষ্যবস্তুর গায়ে ঠেকবার পর সে ফের সেটাকে ওপরের দিকে উঠে যাবার আগেই সুড়ুত করে টেনে নেয় মুখের ভেতর। গন্ধমাখা হাওয়া থেকে এইবার গন্ধকে বুঝে নিতে কোন অসুবিধে হয় না তার নাকের কোষদের।

এরা থাকে সাধারণত সঙ্গে দেয়া মানচিত্রের রঙ করা অংশটায় বিভিন্ন ভেজা জলাজমি এলাকায়।

bigganjibjogot03 (Medium)শীতের জন্যে চর্বির সঞ্চয় তৈরি করে লেজের ভেতর। পেঁচা আর পাইক মাছ সাধারণত এদের প্রধান শত্রু হয়।