বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-মহাবিশ্বে মহাকাশে-পিঙ্গল বামন-কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়-বর্ষা ২০১৬

মহাবিশ্বে মহাকাশে-আগের এপিসোডগুলো একত্রে

bigganmohabiswe02 (Medium)

মহাকাশে ছড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল গ্যাসীয়পুঞ্জ। এতে সঞ্চিত থাকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস ও ধূলিকণা। এগুলি থেকেই জন্ম হয় নক্ষত্রের। প্রথমে এই বিশাল আয়তনের গ্যাস ও ধূলিকণা এক জায়গায় জড়ো হয় এবং অনুকূল অবস্থায় নিজের মহাকর্ষীয় বলের প্রভাবে সংকুচিত হতে থাকে এবং নক্ষত্রের প্রাথমিক অবস্থায় আসে। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘আদি-নক্ষত্র’ (Protostar)। ক্রমশ সংকোচনের ফলে অভ্যন্তরীণ চাপ ও তাপমাত্রা দুটোই বাড়তে থাকে। এইভাবে আদি-নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ উষ্ণতা দশ লক্ষ ডিগ্রি কেলভিন [(106 )0 K]-এর বেশি এবং ঘনত্ব জলের ঘনত্বের প্রায় একশ গুণ হলে নিউক্লীয় বিক্রিয়া শুরু হয়। ধীরে ধীরে আদি-নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়তে বাড়তে এমন একটা অবস্থায় এসে পৌঁছায় যখন এর মহাকর্ষীয় সংকোচন (Gravitational Contraction) বন্ধ হয়ে যায়। এরপরেই আদি-নক্ষত্রটি পরিপূর্ণ নক্ষত্রে বা তারায় পরিণত হয়। এই নতুন নক্ষত্রে হাইড্রোজেন পরমাণু নিয়ত হিলিয়াম পরমাণুতে রূপান্তরিত হয়ে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়। এর ফলেই নক্ষত্রের পৃষ্ঠ থেকে বিকিরণ হতে থাকে তাপ ও উজ্জ্বল আলো।

এখন প্রশ্ন হল, সব আদি-নক্ষত্রই কি পরিপূর্ণ নক্ষত্র হয়ে উঠতে পারে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৃহস্পতিগ্রহের চেয়ে ভারী কিন্তু সূর্যের দশমাংশ ভরের চেয়ে কম যাদের ভর তাদের আর নক্ষত্র হয়ে ওঠা হয় না। এই বস্তুপিণ্ডগুলিই আদি-নক্ষত্র ও পরিপূর্ণ নক্ষত্রের মাঝের যোগসূত্র। এদের বলা হয় ‘পিঙ্গল বামন’, যেন এক ব্যর্থ নক্ষত্র-জনম।

মহাকাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বহু নক্ষত্র আমরা খালি চোখেই দেখতে পাই। দূরের নক্ষত্রগুলিকে দেখার জন্য অবশ্য দূরবিনের সাহায্য নিতে হয়। অতিকায় লাল দানব থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রকায় শ্বেত বামন, নিউট্রন নক্ষত্রের কথা আমাদের জা্না থাকলেও পিঙ্গল বামনের অস্তিত্ব সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের কাছে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছিল না। এগুলি লাল রঙের সমীপবর্তী অবলোহিত তরঙ্গ (near infrared) বিকিরণ করে ঠিকই কিন্তু অত্যন্ত অনুজ্জ্বল হওয়ায় মহাকাশে এদের শনাক্ত করা কঠিন। এই কারণেই মহাকাশে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বিজ্ঞানীরা বহুদিন এই হারানো যোগসূত্রের (Missing link) সন্ধান পাননি।

পিঙ্গল বামনের অস্তিত্ব সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের প্রথম ধারণা হয় ১৯৬০ এর দশকের প্রথমদিকে। তবে প্রায় দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের মধ্যে তাঁরা তাঁদের ধারণার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ দাখিল করতে পারেন নি। ১৯৯৫ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশে সর্বপ্রথম পিঙ্গল বামন শনাক্ত করতে সমর্থ হন। এখনও পর্যন্ত বহু পিঙ্গল বামনের খোঁজ পাওয়া গেছে। সূর্য থেকে মাত্র ১২ আলোকবর্ষ দূরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দুটো পিঙ্গল বামন খুঁজে পেয়েছেন। এদের নাম রাখা হয়েছে এপসিলন ইন্ডি বিএ এবং বিবি (Epsilon Indi Ba and Bb)।

পিঙ্গল বামন ও পরিপূর্ণ নক্ষত্র সৃষ্টির শুরুটা হয় প্রায় একই ভাবে। অর্থাৎ, আন্তঃনক্ষত্র গ্যাস ও ধুলোর মেঘপুঞ্জ সংকোচন থেকে। হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামে সমৃদ্ধ এই বিশালায়তনের মেঘপুঞ্জে সামান্য পরিমাণ ডিউটেরিয়াম ও লিথিয়াম থাকে। নক্ষত্রের কেন্দ্রস্থল মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে সঙ্কুচিত হতে থাকায় চাপ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। কম চাপ ও তাপমাত্রা থাকাকালীন তাপকেন্দ্রকীয় বিক্রিয়ায় ডিউটেরিয়াম পরমাণুকেন্দ্রক সংযোজিত হয়ে তৈরি হয় হিলিয়াম-৩। এর ফলে যে শক্তি উৎপন্ন হয় তা পিঙ্গল বামনের সঙ্কোচন রুখে দেয়। সমস্ত ডিউটেরিয়াম নিঃশেষিত হতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ বছর সময় লাগে। শক্তি উৎপাদন বন্ধ হতেই পুনরায় মাধ্যাকর্ষণজনিত সংকোচন শুরু হয়। এরফলে কেন্দ্রস্থলে পুনরায় তাপমাত্রা বাড়তে থাকে এবং নতুন পর্যায়ের তাপকেন্দ্রীয় বিক্রিয়া শুরু হয়। এক্ষেত্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় লিথিয়াম। এমনটি হওয়ার জন্য তরুণ নক্ষত্র ও পিঙ্গল বামনের ভর হতে হবে বৃহস্পতির ভরের ৬০ গুণের বেশি। তা না হলে নক্ষত্রের কেন্দ্রে লিথিয়াম পরমাণুকেন্দ্রকের সংযোজন সম্ভব নয়। হাইড্রোজেন পরমাণুকেন্দ্রকের সংযোজন শুরু হওয়ার জন্য যে তাপমাত্রার প্রয়োজন এক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম তাপমাত্রা হলেই চলে। পিঙ্গল বামনে লিথিয়াম ধাতুর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বিজ্ঞানী রাফায়েল রেবেলো (Rafael Rebelo) এবং তাঁর সহযোগীরা নক্ষত্র থেকে নির্গত বিকিরণের বর্ণালি বিশ্লেষণ করে লিথিয়াম ধাতুর বর্ণালিরেখা শনাক্ত করে মহাকাশে পিঙ্গল বামন চিহ্নিত করেছেন। তাই বলা যায় কম ভরের নক্ষত্রদের মধ্য থেকে পিঙ্গল বামনকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার জন্য লিথিয়াম ধাতুর অস্তিত্ব প্রমাণ অবশ্যই প্রয়োজন।

bigganmohabiswe01 (Medium)

অন্তিম সময়ে পিঙ্গল বামনের ব্যাস বৃহস্পতির ব্যাসের প্রায় সমান হয়। এদের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা খুব কম থাকে— মাত্র ১০০০ ডিগ্রি কেলভিনের মতো। বৃহস্পতিগ্রহের ভরের ১ থেকে ১০ গুণ বেশি ভরের মহাজাগতিক বস্তুপিণ্ড বা গ্রহগুলির আকার মূলত কুলম্বীয় চাপের (coulomb pressure) দরুণ স্থিতাবস্থায় থাকে। অন্যদিকে বৃহস্পতির ভরের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ গুণ বেশি ভরের পিঙ্গল বামনগুলির আকার স্থিতাবস্থায় থাকে অবক্ষয়িত ইলেকট্রন চাপের (degenerate electron pressure) দরুণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পিঙ্গল বামনের কেন্দ্রস্থলের ও পৃষ্ঠস্থলের তাপমাত্রা কমতে থাকে, ফলে এর ঔজ্জ্বল্যও কমে যায়। তখন মহাকাশে নক্ষত্রের ভিড়ে এদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

বৃহস্পতিগ্রহ ও পিঙ্গল বামনের তুলনা

 bigganmohabiswecomparison (Medium)

নাম বস্তুর পরিচয় ভর(বৃহস্পতির সাপেক্ষে) ব্যাসার্ধ(কিমি) তাপমাত্রা(কেলভিন) হাইড্রোজেন জ্বালানি ডিউটেরিয়াম জ্বালানি
বৃহস্পতি গ্রহ(গ্যাসীয়) ৭১,৫০০ ১০০ না না
GLESE 229B পিঙ্গল বামন ৩০-৪০ ৬৫,০০০ ১০০০ না হ্যাঁ
TEIDEI পিঙ্গল বামন ৫৫ ১,৫০,০০০ ২৬০০ না হ্যাঁ
GLIESE 229A লাল বামন ৩০০ ২,৫০,০০০ ৩৪০০ হ্যাঁ

হ্যাঁ