বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-মহাবিশ্বে মহাকাশে-সৌরকলঙ্ক কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় শীত ২০১৬

মহাবিশ্বে মহাকাশে সব পর্ব একত্রে->

bigganmohabishwe01    

শৈশবে আমরা অনেকেই ঠাকুমা-দিদিমার কোলে শুয়ে ‘চাঁদের চরকা কাটা বুড়ি’-র গল্প শুনেছি। শুনতে ভালোও লাগত, মজাও পাওয়া যেত। বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এখন আমরা প্রায় সকলেই জানি চাঁদে কোনো প্রাণ নেই। থাকবে কী করে? সেখানে তো কোনো জল-বাতাস নেই। পুরো উপগ্রহটা শুষ্ক-পাথুরে অবস্থায় পৃথিবীর চারপাশে পাক খাচ্ছে। তাহলে চাঁদের গায়ে ওই কালো কালো দাগগুলি কী যেগুলিকে গল্পে ‘চরকা কাটা বুড়ি’ বলা হয়ে থাকে? আসলে ওগুলি চাঁদের পাহাড়ের কোলে বড় বড় খাদ বা গর্ত। ওখানে সূর্যের আলো পৌঁছোয় না। পৃথিবী থেকে ওই জায়গাগুলিই কালো বা ছায়ার মতো দেখতে লাগে। এগুলিকে বলা হয় চাঁদের কলঙ্ক। এবারে অবাক হওয়ার মতো একটা কথা বলি। সূর্যেরও কলঙ্ক আছে। তবে চরিত্রের দিক থেকে একটার সঙ্গে অন্যটা মেলে না। চন্দ্র-কলঙ্ক স্থির, আর সৌরকলঙ্ক সূর্যের গায়ে ঘুরে বেড়ায়। খুব অদ্ভুত ঘটনা, তাই না? চাঁদের নিজের কোনো আলো নেই। সূর্যের আলোয় সে আলোকিত। সূর্য একটি জ্যোতিষ্ক। নিজস্ব আলো আছে। তাই চাঁদের গায়ে কালো কালো দাগের কারণ আর সূর্যের গায়ে কালো কালো দাগের কারণ সম্পূর্ণ আলাদা।

প্রাচীনকালে জ্যোতির্বিদদের সৌরকলঙ্ক সম্পর্কে ধারণা থাকলেও এর উৎপত্তি সম্পর্কে তাঁদের কিছুই জানা ছিল না। তাই নানা কাল্পনিক গল্পের আশ্রয় নিয়ে তাঁরা এর উৎপত্তির কারণ খুঁজতেন। যেমন, ২৮ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে লেখা একটি প্রাচীন চৈনিক গ্রন্থে সৌরকলঙ্কের কারণ ব্যাখ্যায় আকাশে উড়ন্ত পাখিদের দায়ী করা হয়েছে। ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে গ্যালিলিও তাঁর নির্মিত দূরবীনের সাহায্যে লক্ষ করেন যে সূর্যের পৃষ্ঠদেশে দেখতে পাওয়া কালো দাগগুলি স্থির নয়। ওগুলি পূর্ব দিক থেকে ক্রমশ পশ্চিম দিকে সরে আসতে আসতে এক সময় মিলিয়ে যাচ্ছে। এই ঘটনা থেকে তিনি স্থির সিদ্ধান্তে আসেন যে ওই কালো দাগগুলি সূর্যের নিজস্ব, বাইরের কোনো কিছুর ছায়া নয়।

সৌরকলঙ্ক সম্পর্কে এখনও আমাদের অনেক কিছু অজানা। এর উৎপত্তি সম্পর্কে নানা রকম মত আছে। যেমন—  অনেকে মনে করেন যে সূর্য গ্যাসীয় বস্তু হওয়ায় নিজের অক্ষের চারপাশে ঘূর্ণনের সময় এই গ্যাসীয় বস্তুর মধ্যে বিপুল আলোড়নের সৃষ্টি হয় যার ফলে নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন ঘটে। সূর্যের বাইরের দিকের স্তরের এই চৌম্বক ক্রিয়ার ফলেই সৌরকলঙ্কের সৃষ্টি। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, সূর্যের নিরক্ষরেখার উপরের অংশ নিজের অক্ষের চারপাশে একবার ঘুরতে সময় নেয় চব্বিশ দিন ষোলো ঘন্টা, চল্লিশ ডিগ্রি উত্তর বা দক্ষিণ অক্ষাংশ সময় নেয় সাতাশ দিন আর মেরু অঞ্চলের একবার ঘুরতে সময় লাগে পয়ত্রিশ দিন। সূর্যের বিভিন্ন অংশের ঘূর্ণনের এই বিভিন্ন সময় দেখেই বিজ্ঞানীরা স্থির সিদ্ধান্তে আসেন যে সূর্য কোনো ঘনীভূত বস্তু নয়, উত্তপ্ত গ্যাসীয় বস্তু।

আবার অনেকের মতে সূর্যের কেন্দ্রে যে শক্তির (জলন্ত বাষ্প) উৎপত্তি হয় তা আলোকমণ্ডলের উপরিতলে পৌঁছোতে সময় নেয় দশ লক্ষ বছরের মতো। সেখানকার উচ্চ তাপে জ্বলন্ত বাষ্পে বিস্ফোরণ ঘটে এবং তা এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে আলোকমণ্ডলের ফাঁক দিয়ে সূর্যের ছটায় কালো কালো দাগ ফুটে ওঠে। এগুলিও সৌরকলঙ্ক। 

কেউ কেউ আবার মনে করেন সূর্যের যে অঞ্চলগুলিতে কালো কালো দাগগুলি দেখা যায় সেই অঞ্চলগুলিতে তার আশেপাশের উজ্জ্বল অংশের তুলনায় উষ্ণতা কম থাকে। 

bigganmohabiswe02সৌরকলঙ্কগুলিকে দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়— ‘পোরস্‌’(Pores) এবং ‘সানস্পট গ্রুপ’(Sunspot Group)। যে সৌরকলঙ্কগুলির বিস্তৃতি এক হাজার কিলোমিটারের কম অঞ্চল জুড়ে সেগুলিকে বলা হয় ‘পোরস্‌’ আর অনেকগুলি সৌরকলঙ্ক একসঙ্গে সমষ্টিবদ্ধভাবে থাকলে তাদের বলা হয় ‘সানস্পট গ্রুপ’। এরা সাধারণত এক লক্ষ কিলোমিটারব্যাপী বিস্তৃত হয়ে থাকে। সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৫৫০০ সেলসিয়াস কালো অঞ্চলগুলির উষ্ণতা সাধারণত ৪৬০০সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকে। সৌরকলঙ্কগুলির আয়ু কয়েক ঘন্টা থেকে আঠারো মাস পর্যন্ত হতে পারে। দেখা গেছে এদের মধ্যে চৌম্বকশক্তি আছে এবং প্রতি এগারো বছর অন্তর এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তাই এদের পর্যায়বৃত্ত-কাল এগারো বছর ধরা হলেও তা আট বা নয় বছর থেকে তেরো বা চোদ্দ বছরও হতে পারে।

সৌরকলঙ্কগুলি অর্থাৎ কালো কালো দাগগুলি সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় থাকে। প্রতিটি জোড়ার চৌম্বকত্ব বিপরীতধর্মী হয়। কখনও কখনও দেখা গেছে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের সবচেয়ে বড় সৌরকলঙ্ক তথা কালো দাগ বা গহ্বর দু’টির একটির চৌম্বকত্ব অপরটির বিপরীত।

 ১৯৭৯-৮০ সালে সৌরকলঙ্কের দাগগুলি সংখ্যায় সর্বাধিক ছিল। ওই বছর আমেরিকার পূর্বাঞ্চলে শীতকাল ছিল অতি মনোরম। এর কয়েক বছর আগে যখন সৌরকলঙ্কের দাগগুলি সংখ্যায় কম ছিল তখন এই অঞ্চলের শীতকাল এত উপভোগ্য ছিল না। সৌরকলঙ্কের দাগগুলির কমা বাড়ার সঙ্গে পৃথিবীতে গরমের দাপট কমে বাড়ে। এই ঘটনা থেকে বিজ্ঞানীদের ধারণা হয় যে সৌরকলঙ্কের সঙ্গে আবহাওয়ার একটা সম্পর্ক আছে। 

bigganmohabiswe03নাসা-র জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডেভিড হাথওয়ে ১৯৯৮ সাল থেকে সৌরকলঙ্ক নিয়ে গবেষণা করে আসছেন। সম্প্রতি তিনি এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। সাধারণত ‘সোলার মিনিমাম’ (Solar Minimum) এবং ‘সোলার ম্যাক্সিমাম’ (Solar Maximum)-এর মাঝের সময়ের ব্যবধান এগারো বছর। জ্যোতির্বিজ্ঞানী হাথওয়ে বলছেন সৌরচক্র সর্বদা এগারো বছর অন্তর হবে এমন কোনো বাধাধরা নিয়ম নেই। তাঁর মতে সৌরচক্রের আবর্তনকাল সর্বনিম্ন নয় বছর এবং সর্বোচ্চ চোদ্দ বছর হতে পারে। হাথওয়ে এবং তাঁর সহযোগী বব উইলসন নাসা-র ‘মার্শাল স্পেস ফ্লাইট সেন্টার’-এ দীর্ঘদিন গবেষণার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে সোলার মিনিমাম ঘটার আগে সূর্য থাকে কলঙ্কহীন।

২০০৫ সালের ১৪ জানুয়ারি দিনটি ছিল মকর সংক্রান্তি। পুণ্য লাভের আশায় অনেকেই সেদিন গঙ্গা-স্নান করছিলেন। হঠাৎ-ই তাদের চোখে পড়ে, সূর্যের গায়ে একটা কালো টিপ। নাসার এক বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা গেল এই কালো টিপটি আসলে সূর্যের বুকে সৃষ্টি হওয়া এক অতিকায় সৌরকলঙ্ক। এটা এতটাই বড় ছিল যে খালি চোখে কালো টিপের মতো দেখা যাচ্ছিল। এর ব্যাস পৃথিবীর ব্যাসের সাত গুণ ছিল। এটি ছিল ‘বিটা-ডেল্টা’ নামক এক ধরনের সৌরকলঙ্ক। এরা অতিকায় সৌরশিখা সৃষ্টি করতে সক্ষম। মেরু অঞ্চলে এর প্রভাবে রেডিও ট্রান্সমিশন এবং টেলিযোগাযোগ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। শুধু তাই নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও মেরু অঞ্চলগুলিতে অনেকদিন ধরে মেরুজ্যোতি দেখা গিয়েছিল।  সূর্যের বুকে এত বড় সৌরকলঙ্ক সৃষ্টি হওয়া এক বিরল ঘটনা। নাসা এটিকে ‘নং ৭২০’(No. 720) নামে চিহ্নিত করেছিল।

     সৌরকলঙ্কের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সৌরশিখা (Solar Flare) এবং সৌরঝড় বৃদ্ধি পায়। এই সৌরশিখাগুলি সৃষ্টি হয় সম্ভবত সৌরকলঙ্কের চৌম্বকক্ষেত্র বিলয়নজনিত বিস্ফোরণের কারণে। এই সময় যে উষ্ণ গ্যাসের স্রোত (Super Hot Gas) বইতে থাকে তাকে বলা হয় ‘করোনাল মাস ইজেকশান’ (সি.এম.ই)। এর প্রভাবে পৃথিবীর ম্যাগনেটোস্ফিয়ারে চৌম্বক ঝড়ের সৃষ্টি হয় যার ধাক্কায় পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে কমিউনিকেশন ব্ল্যাক আউট হতে পারে।

   সৌরকলঙ্কের সঙ্গে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা আমাদের কাছে বিস্ময়কর। যেমন,

  • প্রতি জোড়া সৌরকলঙ্কের যেটি দর্শকের ডানদিকে থাকে তার চৌম্বকক্ষেত্র চৌম্বক শলাকার উত্তর মেরুর গুণসম্পন্ন এবং অপরটি অর্থাৎ বামদিকেরটি বিপরীত গুণসম্পন্ন।
  • সৌরকলঙ্কের উৎপত্তিস্থল উত্তর ও দক্ষিণ উভয় সৌর-গোলার্ধের মাঝামাঝি অঞ্চল। এগারো বছর ধরে সৌরবিষুবের দিকে সরে যেতে যেতে একসময় সেগুলি মিলিয়ে যায়। আবার নতুন সৌরকলঙ্কের সৃষ্টি হয়।
  • সৌরকলঙ্ক না থাকায় ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে এত ঠাণ্ডা পড়েছিল যে টেমস নদীর জল জমে কঠিন বরফে পরিণত হয়েছিল।
  • ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কোনো সূর্যের গায়ে কোনো কলঙ্ক দেখা যায় নি। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে এ ই ডগলাস (A.E.Douglass) প্রথম লক্ষ করেন যে এই সত্তর বছর পৃথিবীর আবহাওয়া অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা ছিল যা গাছের বৃদ্ধির সহায়ক ছিল না। তিনি আরও লক্ষ করেন যে গাছের বৃদ্ধির হারে কোনো পরিবর্তন না ঘটায় কাণ্ডের বলয়গুলির আকার-আকৃতিতেও কোনো পরিবর্তন আসেনি। এই পর্যবেক্ষণ থেকে বিজ্ঞানীদের ধারণা হয় যে  সৌরকলঙ্কের সঙ্গে গাছের কাণ্ডের বলয়ের (Ring) একটা সম্পর্ক আছে। পরবর্তীকালে গবেষণায় জানা গেছে যে সৌরকলঙ্কের সংখ্যার হেরফেরের সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের কার্বন আইসোটোপ (Carbon Isotope) C14-এর পরিমাণের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। সাধারণত বায়ুমণ্ডলে C14-এর পরিমাণ নির্দিষ্ট। কিন্তু মহাজাগতিক রশ্মির (Cosmic Rays) নিরন্তর আঘাতে তা কমতে থাকে। দেখা গেছে C14-এর পরিমাণ কমতে থাকলে গাছের গুঁড়ি এবং কাণ্ডের বলয়গুলিতে তার প্রভাব পড়ে। সৌরকলঙ্কের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে সৌরঝটিকা প্রবল বেগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আঘাত করে। এরফলে মহাজাগতিক রশ্মির পরিমাণ ও প্রতিক্রিয়া হ্রাস পায়। ফলে বায়ুমণ্ডলে C14-এর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। তখন গাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হওয়ার সঙ্গে বলয়গুলির আকার-আকৃতিরও পরিবর্তন ঘটতে থাকে।

bigganmohabiswe04

 বৈজ্ঞানিকে দপ্তর সব লেখা একত্রে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s