বৈজ্ঞানিকের দপ্তর মহাবিশ্বে মহাকাশে-নক্ষত্রের শেষ দিন কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ষা ২০২০

মহাবিশ্বে মহাকাশে সব পর্ব একত্রে

নক্ষত্রের শেষ দিন

কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্ম-মৃত্যুর খেলা সর্বত্রই। পৃথিবীতে যেমন জন্মালে একদিন মরতে হবেই, মহাকাশেও তাই। বিস্তীর্ণ মহাকাশে রাতের অন্ধকারে যে নক্ষত্রগুলোকে দেখা যায় তাদেরও একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে। তবে কোনো একটি নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যু দুটোই আমাদের চোখে ধরা পরে না। পড়ার কথাও নয়, কারণ আমাদের জীবনকালের তুলনায় ওদের জীবনকাল বহুগুণ বড়। জন্মের পর কোনো একটি নক্ষত্রের মৃত্যু আসতে পৃথিবীতে কোটি কোটি বছর পার হয়ে যায়।

নক্ষত্রের জন্ম নিয়ে আগের সংখ্যায় আলোচনা করেছিলাম। এবারে তাদের মৃত্যু  বা জন্মের পর বিবর্তন নিয়ে দু-চার কথা বলব।। কোনো নক্ষত্রের জীবনকাল নির্ভর করে তার জ্বালানী অর্থাৎ কেন্দ্রে সঞ্চিত হাইড্রোজেনের উপর। এই সময়ে পারমাণবিক সংযোজন প্রক্রিয়ার দ্বারা  ৪টি হাইড্রোজেন পরমাণু ১টি হিলিয়াম পরমাণুতে রূপান্তরিত হতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু শক্তি উৎপাদন হয়। স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে এই শক্তি কোথা থেকে আসে। একটা হিলিয়াম পরমাণুর ভর চারটে হাইড্রোজেন পরমাণুর ভরের চেয়ে কিছুটা কম। ফলে চারটে হাইড্রোজেন পরমাণু একটা হিলিয়াম পরমাণুতে রূপান্তরিত হওয়ার সময় অতিরিক্ত ভরটুকু আইনস্টাইনের সূত্র  E = mc2  অনুসারে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই শক্তি তাপ, আলোক এবং বিকিরণরূপে ছড়িয়ে পড়ে। নক্ষত্রের জীবনের এটাই হল দীর্ঘতম দশা। এই সময়টাকেই বলা হয় নক্ষত্রের যৌবনকাল। আমাদের সূর্য এখন এই পর্বেই আছে। ৪টি হাইড্রোজেন সংযুক্ত হয়ে ১টি হিলিয়ামে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে ফিউশন বলে। হাইড্রোজেন বোমায় প্রচণ্ড শক্তির সৃষ্টির মূলে রয়েছে এই ফিউশন প্রক্রিয়া। তাই বলা যেতে পারে যে নক্ষত্রগুলোর মধ্যে প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটি হাইড্রোজেন বোমার বিস্ফোরণ ঘটছে।

এবারে শুরু হয়ে যায় দুটি বলের মধ্যে দড়ি টানাটানি- একটি বহির্মুখী চাপ আর অপরটি অভিকর্ষজ আকর্ষণ। বহির্মুখী চাপের সৃষ্টি নক্ষত্রটির কেন্দ্রে পারমাণবিক সংযোজন প্রক্রিয়া্র সময় উৎপন্ন তাপ ও অন্যান্য বিকিরণ থেকে। এই চাপ এবং অভিকর্ষজ আকর্ষণ বা বল নক্ষত্রটির ভারসাম্য রক্ষা করে। এই ভারসাম্যের জন্যই নক্ষত্রটি স্থায়ী পর্যায় চলে আসে। এই পর্যায়ের স্থায়িত্ব নির্ভর করে নক্ষত্রটির ভরের পরিমাণ এবং অন্যান্য গুণের উপর। সাধারণভাবে নক্ষত্রের এই পর্যায়কেই বলা হয় তার যৌবনকাল। এই যৌবনকালই হল নক্ষত্রের দীর্ঘতম পর্যায়। স্বাভাবিকভাবে মনে হতে পারে, যে নক্ষত্রের ভর যত বেশি সেই নক্ষত্রের যৌবনকাল তত বেশি হবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে হয় ঠিক তার উল্টো। অধিক ভরের অর্থাৎ বড় নক্ষত্রগুলোর শক্তি উৎপাদনের হার বেশি। ফলে জ্বালানী অর্থাৎ নক্ষত্রের অভ্যন্তরে সঞ্চিত হাইড্রোজেন পরমাণুর খরচও অনেক বেশি। তাই এদের যৌবনকাল কয়েক লক্ষ বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে আমাদের সূর্যের মতো মাঝারি আকারের নক্ষত্র বা তারাগুলোর যৌবনকাল অর্থাৎ স্থায়ী পর্যায় কয়েক শত কোটি বছর ধরে চলে।

এইভাবে চলতে চলতে নক্ষত্রটির কেন্দ্র স্থলের সমস্ত হাইড্রোজেন হিলিয়ামে রূপান্তরিত হয়ে যায়। তখন অভিকর্ষজ বলের আকর্ষণ সামলাবার জন্য যথেষ্ট বহির্মুখী চাপ থাকে না। ফলে নক্ষত্রটির কেন্দ্র সংকুচিত হতে থাকে এবং কেন্দ্রাঞ্চলের তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। আগে তাপমাত্রা বেড়েছিল পারমাণবিক সংযোজন প্রক্রিয়ার জন্য আর এবারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে নক্ষত্রটির কেন্দ্রের সংকোচনের কারণে- নক্ষত্র সৃষ্টির প্রথম মুহূর্তটির মতো। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পেতে এমন একটা পরিমাণে পৌঁছোয় যখন নক্ষত্রটির কেন্দ্রে সঞ্চিত হিলিয়ামে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয় এবং কার্বন ও অক্সিজেন তৈরি হয়। এই সময় শক্তি উৎপাদনের হার কেন্দ্রে হাইড্রোজেন পারমাণবিক প্রক্রিয়ার সময়ের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। তাই নক্ষত্রটি আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই সময় নক্ষত্রটির পৃষ্ঠ থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি বাইরের দিকে প্রবাহিত হতে থাকে, যার ফলে নক্ষত্রটির বাইরের হাইড্রোজেন-সমৃদ্ধ এবং অদাহ্য স্তরটি প্রসারিত হয়ে এক অতিকায় আকৃতি নেয়। এর কারণ নক্ষত্রটির পৃষ্ঠ-স্তর ঠাণ্ডা হয়ে ওঠে এবং তাপমাত্রা দাঁড়ায় ৩৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো। এই সময় নক্ষত্রটি লাল বর্ণের দেখতে হয়। এই অবস্থায় কম ভরের নক্ষত্রগুলোকে বলা হয় লোহিত দানব বা লাল দানব (Red Giant) আর বেশি ভরের নক্ষত্রগুলোকে বলা হয় হলুদ বা লোহিত মহাদানব।

নক্ষত্রের জীবনের এটাই হল শেষের পর্যায়। অন্তিম পরিণতি নির্ভর করে জন্মের সময়কার ভরের পরিমাণের উপর। যাদের ভর ৮ সৌরভরের কম তাদের তাদের জীবনের সমাপ্তি ঘটে গ্রহোপম নীহারিকা (Planetary Nebula) আকারে নির্গমনের মাধ্যমে, আর যাদের বেশি থাকে তাদের জীবন শেষ হয় প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে। বিস্ফোরণের সময় নক্ষত্রের বাইরের অংশটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মূল দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হয়ে যায়। এই বিধ্বংসী পরিস্থিতিকে বলা হয় সুপারনোভা (supernova)। গ্রহোপম নীহারিকার নক্ষত্রের অবশেষকে বলা হয় শ্বেতবামন এবং সুপারনোভা বিস্ফোরণে নক্ষত্রের অবশেষকে বলা হয় নিউট্রন নক্ষত্র (Neutron Star) বা কৃষ্ণগহ্বর (Black hole)।   

তথ্য সূত্রঃ

  1. The Universe: Iain Nicolson। 1996 Horus Editions.
  2. The Life and Death of a star:  Donald A. Co
  3. https://socratic.org › Astronomy › Life and Death of Stars
  4. universetoday.com › how-does-a-star-die
  5. space.com› 6638-supernova

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s