বৈজ্ঞানিকের দপ্তর মহাবিশ্বে মহাকাশে-চাঁদের ভবিষ্যৎ- কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎ ২০২০

মহাবিশ্বে মহাকাশে সব পর্ব একত্রে

চাঁদের ভবিষ্যৎ

কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

  1. চন্দ্রের বা চাঁদের অপর নাম সোম। সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনটি চন্দ্রের নামেই উৎসর্গীকৃত। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই সোমবার হল সপ্তাহের কাজ শুরুর দিন। ইংরাজিতে এই বারের নাম ‘Monday’ বা ‘Day of the Moon’। নামটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘Lunse Dies’ থেকে। ফরাসিতে এই বারের নাম ‘Lundi’, ইতালি ভাষায় বলা হয় ‘Lunedi’ এবং স্পেনীয় ভাষায় ‘Lunes’। আবার জার্মানিতে এই বারের নাম ‘Montag’।

    যে চন্দ্রের নামে এই নামকরণ সে আমাদের বহু পরিচিত চাঁদমামা, পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ। লক্ষ-কোটি বছর ধরে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে। অমাবস্যার দিন বাদে প্রতিদিনই রাতে আমরা একে আকাশে দেখতে পাই। ছোটো বয়সে ঠাকুরমা-দিদিমার কোলে বসে আমরা কতই না গল্প শুনেছি। কিন্তু ভবিষ্যতে চাঁদের বুড়িকেও আর দেখা যাবে না, গল্পও আর শোনা হবে না। হবে না পূর্ণিমা, সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণের মতো মহাজাগতিক ঘটনা। পৃথিবী ডুবে যাবে অমাবস্যার অন্ধকারে। কারণ আকাশে চাঁদই থাকবে না। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদ পৃথিবী থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। হ্যাঁ, শুনতে অবাক লাগলেও ভবিষ্যতে এমনটাই হবে। তখন চাঁদ আর পৃথিবীর চারদিকে ঘুরবে না। নিজস্ব নতুন কক্ষপথে সরাসরি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে।

    চাঁদের কক্ষপথ পৃথিবীর নিরক্ষরেখা বরাবর কিছুটা হেলানো অবস্থায় আছে। চাঁদ তার নিজের অক্ষের উপর একবার ঘুরতে সময় নেয় ২৭ দিন ৭ ঘন্টা ৪৩ মনিট। আবার পৃথিবীর চারপাশে একবার ঘুরতে চাঁদ ওই একই সময় নেয়। এই কারণেই আমরা সবসময় চাঁদের একটা পিঠই দেখি। উলটো পিঠ আমরা কোনোদিনই দেখতে পাই না। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে পৃথিবী চাঁদকে সঙ্গে নিয়ে তার নিজের কক্ষপথে খানিকটা এগিয়ে যায়। এতে সূর্যের যে আলো চাঁদের উপর পতিত হয় তার প্রায় দশ দিক পরিবর্তন ঘটে প্রতিদিন। তাই এক পূর্ণিমা থেকে আরেক পূর্ণিমা হতে সময় লাগে ২৯ দিন ১২ ঘন্টা ৪৪ মিনিট ১১.৬ সেকেন্ড।

    আমাদের সৌরজগতে অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহের জোটের থেকে চাঁদ-পৃথিবীর জোটের চালচলন অনেকটাই আলাদা। এর কারণ চাঁদ ও পৃথিবীর মধ্যে একটা সাধারণ মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র আছে, যা অন্য গ্রহ-উপগ্রহগুলির মধ্যে নেই। এই মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্রটি পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে তার ব্যাসার্ধের ২/৩ ভাগ দূরে অবস্থিত। চাঁদ আর পৃথিবী এই সাধারণ মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্রের চারপাশে ঘোরে। সূর্য পৃথিবীর কেন্দ্র ও চাঁদের কেন্দ্রকে আলাদা আলাদা আকর্ষণ না করে সাধারণ মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্রটিকেই নিজেদের দিকে আকর্ষণ করে। ফলে সূর্য পৃথিবীকে যত জোরে আকর্ষণ করতে পারে চাঁদকে তত জোরে পারে না। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে চাঁদকে পৃথিবীর উপগ্রহ না ভেবে চাঁদ-পৃথিবীকে একসঙ্গে দ্বৈত গ্রহ হিসেবে ভাবা যেতে পারে।

    আমরা জানি চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন ব্যাপারটা অত সরল নয়, বরং বেশ জটিল। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে শুধু চাঁদ নয়, সূর্য এবং পৃথিবীও জড়িত। একসময় চাঁদ পৃথিবীর আরও কাছে ছিল। তখন পৃথিবীতে দিনরাত্রি হত ৫ ঘণ্টায়। অর্থাৎ, পৃথিবী নিজের অক্ষের চারপাশে একবার ঘুরতে পাঁচ ঘণ্টা সময় নিত। নিউটনের মহাকর্ষীয় সূত্র অনুযায়ী দুটি বস্তু পরস্পর পরস্পরের দিকে আকর্ষণ করে। সেইমতো পৃথিবী যেমন চাঁদকে আকর্ষণ করে, তেমন চাঁদও পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। এছাড়াও পৃথিবী ও চাঁদের উপর সূর্যের টান তো আছেই। ভূ-পৃষ্ঠের কোনও একটি বিন্দু একবার পাক খেয়ে আগের জায়গায় ফিরে আসতে সময় নেয় ঠিক ২৪ ঘণ্টা। সেই সময় চাঁদ তো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে না। পৃথিবী যেদিকে পাক খায় সেই একই দিকে চাঁদও পৃথিবীর চারদিকে পাক খেতে খেতে নিজের অক্ষের চারপাশে ঘোরে। এর ফলে চাঁদ প্রায় ৫১ মিনিট সময় পিছিয়ে পড়ে। তাই প্রতিদিন চন্দ্রোদয়ের সময় ৫১ মিনিট করে পিছিয়ে যায়।

    জোয়ারকে সমুদ্রের দুটি প্রকাণ্ড ঢেউয়ের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এর একটি চূড়া থাকে চাঁদের দিকে অর্থাৎ সুবিন্দুতে (Zenith) আর অপর চূড়াটি থাকে ঠিক তার বিপরীত দিকে অর্থাৎ কুবিন্দুতে (Nadir)। পৃথিবীর নিজ অক্ষের চারপাশে পাক খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জোয়ারের চূড়া দুটি পৃথিবীকে ঘিরে পাক খেতে থাকে। পৃথিবী পাক খায় পশ্চিম থেকে পূর্বে আর জোয়ারের চূড়া দুটি বা স্রোত পাক খায় পূর্ব থেকে পশ্চিমে। যেহেতু পৃথিবীর স্থলভাগ বা সমুদ্রের তলদেশ মসৃণ নয়, তাই জোয়ারের স্রোত তার চলার পথে ঘন ঘন বাধা পায়। এর ফলে পৃথিবীর নিজ অক্ষের চারপাশে পাক খাওয়ার সময় কিঞ্চিৎ কমে যায়। কিন্তু চাঁদের তেমন হয় না। বলবিদ্যার নিয়মানুসারে চাঁদ তখন সামান্য হলেও দূরে সরে যায়। এইভাবেই চাঁদ একটু একটু করে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

    তথ্য সূত্র:

    • The Universe: Ian Nicolson, 1996 Horus Editions.
    • Space Encyclopedia: Heather Couper and Nigel Henbest, 1999 Dorling Kindersley.
    •       মহাবিশ্বের বিস্ময় (প্রথম খণ্ড): অরুণাভ চক্রবর্তী, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।

বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s