বৈজ্ঞানিকের দপ্তর- মহাবিশ্বে মহাকাশে-কৃষ্ণগহ্বর- কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

bigganmohabishwe02 (Medium) 

পৃথিবীকে ঘিরে আছে বায়ুস্তর। তাই পৃথিবীর মাটি থেকে মহাকাশের যেটুকু অংশ দেখা যায় তা খুব পরিষ্কারভাবে দেখা যায় না। বিজ্ঞানীরা তাই পৃথিবীর বায়ুস্তরের বাইরে মহাকাশে একটি দূরবীন বসিয়েছেন। এই দূরবীনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘হাবল্‌ স্পেস টেলিস্কোপ’। বর্তমানে মহাকাশে এই ধরনের একাধিক দূরবীন রয়েছে। যাবতীয় মহাজাগতিক বস্তু এখন আমরা এই ধরনের দূরবীনের সাহায্যে দেখে থাকি। বায়ুস্তরের বাধা না থাকায় মহাকাশে বহু দূরের বস্তু এখন আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই।

এই দূরবীনের সাহায্যে মহাকাশে চোখ রেখে বিজ্ঞানীরা তো অবাক। যে দিকে দু’চোখ যায় শুধু গ্যালাক্সি আর গ্যালাক্সি। প্রতিটি গ্যালাক্সিতে রয়েছে হাজার কোটি নক্ষত্র। কোনো কোনো নক্ষত্রকে ঘিরে ঘুরছে একাধিক গ্রহ। এই গ্রহ, নক্ষত্র ছাড়া যে মহাজাগতিক বস্তুটি বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে সেটা হল ‘ব্ল্যাক হোল’ বা ‘কৃষ্ণগহ্বর’।

মহাকাশে কৃষ্ণগহ্বর? চলতি কথায় বলা যেতে পারে কালো গর্ত। কেমন যেন হেঁয়ালি কথা, তাই না? মহাশূন্যে আবার গর্ত হবে কী ভাবে? এমন একটি জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমে জানতে হবে নক্ষত্রের অর্থাৎ তারার জন্ম-মৃত্যুর রহস্য।

মহাবিশ্ব সৃষ্টির ব্যাপারে বিজ্ঞানী মহলে দুটি তত্ত্ব নিয়ে বহুদিন ধরে তর্ক-বিতর্ক চলছে। এই তত্ত্ব দুটির প্রথমটি হল ‘বিগ ব্যাং থিওরি’ বা মহাবিস্ফোরণ মতবাদ যার প্রবক্তা হলেন বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী জর্জ লেমেইতার ও আমেরিকার বিজ্ঞানী জর্জ গ্যামো। আর দ্বিতীয়টি হল ‘স্টেডি স্টেট থিওরি’ বা স্থিতাবস্থাশীল তত্ত্ব। সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে এই মতবাদটির প্রবক্তা ইংল্যান্ডের তিন বিজ্ঞানী— ফ্রেড হয়েল, থমাস গোল্ড ও হার্মান বন্ডি। এই দুটি তত্ত্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত বিগ ব্যাং থিওরি। এই মতবাদ অনুসারে প্রায় তেরশো সত্তর কোটি বছর আগে এই বিশ্ব্রব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছিল। সৃষ্টির পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত কোনো আলো ছিল না,কোনো শব্দ ছিল না। সত্যি বলতে কি, মহাকাশটাই ছিল না তখন। সময় বলেও কিচ্ছু ছিল না। শক্তির সমস্ত উপাদান একটি বিন্দুতে ঘনীভূত ছিল। এই অনন্য বিন্দুতেই বীজরূপে আবদ্ধ ছিল সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। বীজরূপী এই বস্তুপিন্ডকে বলা হয় ‘কসমিক এগ’ বা ‘মহাডিম্ব’। কীভাবে সৃষ্টির আগের সেই কিচ্ছু নেই অবস্থাটার মধ্যে এই মহাডিম্ব তৈরি হয়েছিল,তার মধ্যে ধরে রাখা বিপুল শক্তি কোথা থেকে এসে এক জায়গায় জড়ো হয়েছিল তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে নানান মত রয়েছে যদিও তার মধ্যে সঠিক মত কোনটা সে নিয়ে ধন্দ আজও কাটেনি।

মহাবিস্ফোরণের পর মহাডিম্বে সঞ্চিত বিপুল শক্তি মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়ে,সেইসঙ্গে প্রসারিত হতে থাকে মহাবিশ্ব। বিস্ফোরণের অব্যবহিত পরেই মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে ফোটন-কণা, কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা এবং অন্যান্য মৌলকণা। তাই বলা যায় এই কণাগুলিই ছিল মহাবিশ্ব গঠনের প্রাথমিক উপাদান। এই সময় প্রচন্ড তাপীয় অস্থিরতার দরুন এই কণাগুলি দূরন্ত বেগে ছুটতে থাকে এবং পারস্পরিক সংঘাতে যুগপৎ বিভিন্ন মৌলকণা ও তাদের প্রতিকণা সৃষ্টি এবং ধ্বংস হতে থাকে। উষ্ণতা কিছুটা হ্রাস পেলে মৌলকণাগুলির সংযোজনে প্রোটন, নিউট্রন, মেসন ইত্যাদি কণার সৃষ্টি হতে থাকে। মহাবিস্ফোরণের এক সেকেন্ড থেকে কুড়ি মিনিটের মধ্যে মহাকাশ ছেয়ে যায় প্রোটন,ইলেকট্রন ও হিলিয়াম কেন্দ্রকের মেঘে। এই অবস্থায় প্রায় দশ লক্ষ বছর অতিবাহিত হয়। এরপর প্রোটন ও হিলিয়ামের কেন্দ্রকের সঙ্গে ইলেকট্রনের সংযোজনে হাইড্রোজেন পরমাণু ও হিলিয়াম পরমাণু গঠিত হতে শুরু করে।

bigganmohabishwe (Medium)


যে গ্যাসপিণ্ডটি নক্ষত্র হবার দিকে এগোতে থাকে সেটি প্রথম অবস্থায় ঠান্ডা থাকে। আয়তনও থাকে বিশাল। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের দৈর্ঘ্য এক একটার কয়েক আলোকবর্ষ পর্যন্ত হতে পারে। এই সময় গ্যাসপিণ্ডটির ভিতরে চাপ থাকে খুব কম। গ্যাসপিন্ডের এই অবস্থাকে প্রাক-নক্ষত্র অবস্থা বলা যেতে পারে। অভ্যন্তরীন চাপ কম হওয়ায় মহাকর্ষের দরুন এটি সংকুচিত হতে শুরু করে। একে ‘কেলভিন হেলমথোল্টৎজ’ সংকোচন বলা হয়। এই সংকোচনের ফলে মহাকর্ষীয় শক্তি তাপশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ফলে প্রাক-নক্ষত্রের উষ্ণতা বাড়তে থাকে। এক সময় নক্ষত্রের ভিতরের উষ্ণতা বাইরের উষ্ণতার তুলনায় অনেক বেশি হয়। এই আসম উষ্ণতার জন্য ভিতরের গরম গ্যাসের কণা বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে আর বাইরের ঠান্ডা গ্যাসের কণা ভিতরে যাবার চেষ্টা করে। ফলে গ্যাসীয় কণার স্রোত তৈরি হয়। সময়ের সাথে সাথে নক্ষত্রটির অন্তর্মুখী মহাকর্ষ বল বাড়তে থাকে, সেইসঙ্গে কমতে থাকে গ্যাসীয় কণার স্রোতের হার। অবশেষে একসময় নক্ষত্রটির অন্তর্মুখী মহাকর্ষ বল এত বেড়ে যায় যে কণাগুলি আর বাইরে আসতে পারে না। ফলে শুরু হয়ে যায় কণাগুলির মধ্যে মহা-সংঘর্ষ।
মহাবিস্ফোরণের পর মহাকাশ জুড়ে যে হালকা মহাজাগতিক মেঘের (cosmic cloud)  সৃষ্টি হয়েছিল কিছুকাল পরে কোনো অভ্যন্তরীন অস্থিরতার দরুণ তা খন্ড খন্ড হয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। এরা মহাকাশের সব জায়গায় সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। কোথাও খুব পাতলা হয়ে আছে, আবার কোথাও ঘন হয়ে আছে। যেখানে এরা পাতলা হয়ে আছে সেখান দিয়ে আলো চলাচল করতে পারে বলে সেই জায়গাগুলি ফাঁকা বলে মনে হয়। আর যেসব জায়গায় এরা ঘন হয়ে আছে সেখানে আলো যাতায়াত করতে বাধা পায় বলে জায়গাগুলি অস্বচ্ছ পদার্থের মত দেখতে লাগে। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলা হয় নীহারিকা। এই নীহারিকা থেকেই নক্ষত্রের জন্ম হয়। একটি নীহারিকা থেকে একাধিক নক্ষত্রের জন্ম হতে পারে। তবে সব নীহারিকা থেকে নক্ষত্রের জন্ম হয় না। মহাকর্ষের প্রভাবে যেসব নীহারিকার সংকোচন শুরু হয় সেগুলি ক্রমশ ঘন ও উত্তপ্ত হয়ে নক্ষত্রের রূপ নেয়।

সূর্যের জন্মের আগের নেবুলা–শিল্পীর কল্পনায়

গ্যাসীয় কণাগুলির নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে নক্ষত্রটির ভিতরের উষ্ণতা অসম্ভব বেড়ে যায়। এই প্রচন্ড তাপে সেখানে শুরু হয় তাপ পারমাণবিক সংযোজন প্রক্রিয়া। এই সময় নক্ষত্রটির কেন্দ্রে চারটি হাইড্রোজেন পরমাণু জুড়ে গিয়ে তৈরি হয় একটি হিলিয়াম পরমাণু। এর ফলে নক্ষত্রটির কেন্দ্রে বিপুল হারে শক্তির সৃষ্টি হতে থাকে। নক্ষত্রটি জ্বলে ওঠে। প্রচন্ড তাপের সঙ্গে আলোর বিকিরণ শুরু হয়ে যায়।

bigganbholeএই প্রচন্ড তাপে কোনো পদার্থ গ্যাসীয় অবস্থায় থাকতে পারে না। থাকে আয়নিত প্লাজমা অবস্থায়। এই সময় নক্ষত্রের বিকিরণজনিত বহির্মুখী চাপ ও মহাকর্ষজনিত অন্তর্মুখী চাপ সমান হওয়ায় সংকোচন বন্ধ হয়ে যায়। নক্ষত্রটি স্থির ঔজ্জ্বল্য নিয়ে জ্বলতে থাকে। এটাই হল নক্ষত্রের যৌবনকাল।

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। মহাকাশে গ্রহ-নক্ষত্রদের আমরা দিনের পর দিন একই ভাবে দেখতে পাই বলে মনে হয় এরা যেন অক্ষয় অমর। আসলে এদের পরিবর্তন এত ধীর গতিতে হয় যে আমাদের চোখে তা ধরা পরে না। এর কারণ সময়কাল। মহাবিশ্বের সময়কাল বিশাল। তুলনায় একজন মানুষের জীবনকাল খুবই অল্প। তাই মহাবিশ্বের সবকিছুই আমাদের কাছে অপরিবর্তনীয় বলে মনে হয়।

আমাদের জীবনে যেমন যৌবনের পর আসে বার্ধক্য নক্ষত্রদের জীবনেও তেমনটিই ঘটে।     একটি নক্ষত্রের যৌবনকাল কতদিন চলবে তা নির্ভর করে নক্ষত্রটির ভিতরে জমা হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের পরমাণের উপর। পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফলে হাইড্রোজেন হিলিয়ামে রূপান্তরিত হয়। ফলে হাইড্রোজেনের পরিমাণ কমতে থাকে। বাড়তে থাকে হিলিয়ামের পরিমাণ। এই সময় কিছু ভরের বিলুপ্তি ঘটে। কারণ চারটি হাইড্রোজেন পরমাণুর মোট ভর একটি হিলিয়াম পরমাণুর ভরের চেয়ে বেশি। এই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ভরই শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এইভাবে চলতে চলতে যখন হিলিয়ামের পরিমাণ নক্ষত্রটির মোট ভরের শতকরা দশ ভাগের কাছাকাছি পৌঁছায় তখন বিকিরণজনিত বহির্মুখী চাপ কমতে থাকে,পাশাপাশি মহাকর্ষজনিত অন্তর্মুখি চাপ বাড়তে থাকে। ফলে নক্ষত্রটি আবার সংকুচিত হতে শুরু করে। এর ফলে নক্ষত্রটির অভ্যন্তরের উষ্ণতা বেড়ে যায়। এই উষ্ণতা বাড়তে বাড়তে যখন দশ কোটি কেলভিনে পৌঁছায় তখন আবার পারমাণবিক সংযোজন শুরু হয়। এই র্যায়ে তিনটি করে হিলিয়াম পরমাণু যুক্ত হয়ে একটি কার্বন পরমাণু তৈরি হয়। এইভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে অক্সিজেন, নিয়ন, ম্যাগনেসিয়াম প্রভৃতি পরমাণু তৈরি হয় এবং শেষে লোহার কেন্দ্রক তৈরি হয়। এই অবস্থাকে বলা হয় নক্ষত্রের বৃদ্ধকাল। এই অবস্থায় নক্ষত্রটির বাইরের গ্যাসীয় আবরণের উষ্ণতা অত্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে নক্ষত্রটি বিস্ফোরিত হয়ে ফুলে ওঠে। এরপর নক্ষত্রটির কেন্দ্রের উষ্ণতা কমতে থাকে। তখন সেটা দেখতে হয় লাল রঙের। এই অবস্থায় নক্ষত্রটিকে বলা হয় ‘লাল দানব’ বা ‘রেড জায়ান্ট’। এরপরেই আসে নক্ষত্রের অন্তিমকাল বা মৃত্যুর সময়। বিস্ফোরণের পর নক্ষত্রের অবশিষ্ট অংশ নিজ মহাকর্ষের প্রভাবে সংকুচিত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত এর পরিণতি কী হবে তা নির্ভর করবে তার অবশিষ্ট ভরের উপর।

bigganmohabishwe06 (Medium)

এই ভর যদি সূর্যের ভরের তুলনীয় হয়

তবে সেটা সাদা বামনে  পরিণত হবে।  ভরের তুলনায় সাদা বামনের আয়তন খুব ছোট হয়। ধরা যাক, সূর্যকে চেপে পৃথিবীর আয়তনের সমান করে দেওয়া হল। তাহলে কী হবে? সূর্যের ঘনত্ব অবিশ্বাস্য রকম বেড়ে যাবে। সাদা বামনের ক্ষেত্রে ঠিক তেমনই ঘটে। এদের উপাদানের ঘনত্ব এত বেশি থাকে যে এদের এক চামচ ভরের ওজন এক হাজার কিলোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। এদের উষ্ণতা সূর্যের উষ্ণতার চেয়েও বেশি হয় বলে এদের সাদা দেখায়।

bigganmohabishwe03 (Medium)

এই ভর যদি সূর্যের চেয়ে বেশি হয়

    সাদা বামনে পরিণত হওয়া তারার অবশেষ ভর সর্বোচ্চ সৌরভরের 1.44  গুণ পর্যন্ত হলে সেটি সাদা বামন পর্যায়েই এসে থেমে যাবে ও আস্তে আস্তে ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে অন্ধকার মৃত তারায় বদলে যাবে। এই সীমারেখাকে বলা হয় ‘চন্দ্রশেখর সীমা’ (Candrasekhar Limit)। ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী সুব্রাহ্মনিয়ম চন্দ্রশেখর এই তত্ত্বটি দেন।

অবশেষ ভর যদি চন্দ্রশেখর সীমার চেয়ে বেশি হয় তখন কী হবে? নক্ষত্রটিতে অন্তর্মুখী মহাকর্ষ টান এতটাই বেড়ে যাবে যে তারাটি সাদা বামনের চেয়েও ঘনতর হয়ে চলবে। এক্ষেত্রে প্রোটন ও ইলেকট্রন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নক্ষত্র-দেহে নিউট্রন গঠন করবে। ফলে এটি নিউট্রন নক্ষত্রে পরিণত হবে। নিউট্রন নক্ষত্রের ভরের সর্বোচ্চ পরিমাণ ‘টোলম্যান-ওপেনহাইমার-ভলকফ সীমা’দিয়ে নির্দিষ্ট হয়।

যদি এই দেহাবশেষের ভর টোলম্যান-ওপেনহাইমার-ভলকফ সীমা’ ছাড়িয়ে যায়, বা অন্যভাবে বললে, যদি তা  সূর্যের ভরের তিনগুণ হয় তবে মহাকর্ষজনিত অন্তর্মুখী বল এতটাই বেশি হবে যে নক্ষত্রটি ছোট হতে হতে একসময় একটি বিন্দুতে পরিণত হবে। গণিতের ভাষায় একে বলে অনন্যবিন্দু (Singularity)। সংকোচনের সময় নক্ষত্রের ঘনত্ব যত বাড়তে থাকে নক্ষত্র থেকে নিঃসৃত আলোকরশ্মি তত বেঁকে যেতে থাকে। নক্ষত্রটি অনন্যবিন্দুতে পৌঁছালে মুক্তিবেগের মান আলোর বেগের সমান হয়। এই অবস্থায় নক্ষত্রটি থেকে কোনো আলোকরশ্মি বা ফোটন-কণা বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে না। নক্ষত্রটিকে ঘিরে ঘুরপাক খেতে থাকে। অনন্যবিন্দু থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে যে তলে মুক্তিবেগের মান আলোর বেগের সমান হয় তাকে ঘটনা-দিগন্ত (even horizon)  বলে। এই তল একমুখী। এখান দিয়ে বাইরের যে কোনো বস্তু ভিতরে যেতে পারে, কিন্তু কোনো কিছুই বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে না। এ যেন এক চক্রব্যুহ।  সূর্যের তিনগুণ ভরবিশিষ্ট কৃষ্ণগহ্বররূপী একটি মৃত নক্ষত্রের এই ঘটনা-দিগন্তের ব্যাস সাধারণত ১৭ কিলোমিটারের মতো হয়ে থাকে। এর আয়তন হয় ‘সোয়ার্জচাইল্ড ব্যাসার্ধ’ (Schwarzschild Radius)-এর সমান*। পদার্থবিজ্ঞানী কার্ল সোয়ার্জচাইল্ড-এর নামানুসারে এর নাম রাখা হয়েছে। যেহেতু এই অতিঘন নক্ষত্র থেকে কোনো আলোকরশ্মি বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে না তাই একে কালো দেখায়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এই কৃষ্ণবস্তুকে বলা হয় ‘কৃষ্ণগহ্বর’ বা ‘ব্ল্যাক হোল’। মার্কিন বিজ্ঞানী জন হুইলার এর নাম দিয়েছেন ‘কৃষ্ণবিবর’। ঘূর্ণায়মান কৃষ্ণগহ্বরগুলি অনেক বেশি জটিল। এতে একটি আর্গোস্ফিয়ার ও অতিরিক্ত একটি অভ্যন্তরীণ ঘটনা-দিগন্ত থাকে। এদের অনন্যতা দেখতে অনেকটা আংটির মতো হয়।

[* কোনো বস্তুর ব্যাসার্ধ তার মুক্তিবেগের সঙ্গে আলোর গতিবেগের সমান হলে তাকে সোয়ার্জচাইল্ড ব্যাসার্ধ বলে]

কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে স্টিফেন হকিং কয়েকটি চমকপ্রদ কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ধরা যাক একটি ধনাত্মক আধানযুক্ত এবং আরেকটি ঋণাত্মক আধানযুক্ত দু’টি কণিকা মহাশূন্যে ভাসছে ও মিলিয়ে যাচ্ছে। আসলে ক্ষণস্থায়ী কণিকা দু’টি একে অপরকে ধ্বংস করছে। এই ঘটনাটি যদি কোনো কৃষ্ণগহ্বরের কাছে ঘটে তাহলে কী হবে? ঋণাত্মক আধানযুক্ত কণিকাগুলি কৃষ্ণগহ্বরে পতিত হবে, আর ধনাত্মক আধানযুক্ত কণিকাগুলি ছিটকে কৃষ্ণগহ্বর থেকে দূরে সরে যাবে। মনে হবে যেন কৃষ্ণগহ্বর থেকে এরা বেরিয়ে আসছে। ঋণাত্মক কণিকাগুলি কৃষ্ণগহ্বরে পতিত হয়ে কৃষ্ণগহ্বরের ভর ও শক্তি দুটোই ক্ষয় করবে। এরফলে কোনো এক সময় কৃষ্ণগহ্বরে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

মানুষ এখন পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশ ভ্রমণের কথা ভাবতে শুরু করেছে। দু’একজন ইতিমধ্যেই মহাকাশে বেড়িয়েও এসেছেন। স্বয়ং স্টিফেন হকিংও মহাকাশ ভ্রমণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বিজ্ঞানীরা নানা কাজকর্মের জন্য প্রায়শই মহাকাশ-গবেষণাগারে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে মহাকাশযানে চড়ে মানুষ হয়ত মহাকাশে ঘুরে বেড়াবে। চলে যাবে সুদূর মহাকাশে ছুটি কাটাতে। কল্পনার আশ্রয় নিয়ে ধরা যাক কোনো এক ভ্রমণার্থী মহাকাশে ভ্রমণ করার সময় কৃষ্ণগহ্বরের দেখা পেলেন। উৎসুক হয়ে কাছে যেতেই পড়ে গেলেন তাতে। কী ঘটবে তখন? বাস্তব কালের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। মাথা এবং পায়ের দিকে মহাকর্ষীয় বলের পার্থক্যের দরুণ তাঁর দেহ ক্রমশ লম্বা হতে থাকবে। শেষে সরু সুতোর মতো হয়ে ছিঁড়ে যাবে। অর্থাৎ সে সিঙ্গুলারিটির দিকে এগিয়ে যাবে। ঘটনা যদি বাস্তব কালের না হয়ে কাল্পনিক কালের হয়,তাহলে এমনটি হবে না। তাই বলা যায়, মহাবিশ্বে বাস্তব কাল বলে কিছু নেই। সেখানে সব কিছুই কাল্পনিক কালের প্রেক্ষিতে বিচার করতে হবে।

স্টিফেন হকিং কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে আরও একটি চমকপ্রদ কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কৃষ্ণগহ্বর পুরোপুরি কালো নয়। এখান থেকে কণিকা ও বিকিরণ নিঃসৃত হতে পারে। তিনি অঙ্ক কষে দেখিয়েছেন যে কৃষ্ণগহ্বরের তাপীয় বিকিরণ মাপা সম্ভব। এই বিকিরণ কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সূত্র মেনেই হয়। এখন কথা হল, কৃষ্ণগহ্বর থেকে কণিকা এবং বিকিরণ বেরিয়ে এলে সেটার কী অবস্থা হবে? হকিং বলেছেন, কৃষ্ণগহ্বরটির ভর কমতে থাকবে এবং সেটা ছোট হতে হতে এক সময় মিলিয়ে যাবে। যদি এমনটা ঘটে তাহলে যেসব বস্তু ইতিমধ্যে ওই কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে পড়েছিল তারা নিজস্ব একটি শিশু মহাবিশ্বে চলে যাবে যার স্থান-কাল সবই কাল্পনিক।

উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কৃষ্ণগহ্বর

নাম ভর সঙ্গী নক্ষত্রের ভর
MGROJ 1655-40 ৫.৫ সূর্য ভর ১.২ সূর্য ভর
LMCX-3 ৬.৫ সূর্য ভর ২০ সূর্য ভর
J0422432 ১০ সূর্য ভর ০.৩ সূর্য ভর
A0620-00 ১১ সূর্য ভর ০.৫ সূর্য ভর
V404 cygn ১২ সূর্য ভর ০.৬ সূর্য ভর
CygnusX-1 ১৬ সূর্য ভর ৩০ সূর্য ভর

মহাবিশ্বে মহাকাশে–সবকটি পর্ব একত্রে এই লিংকে–>