বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-সহজ বিজ্ঞান-ওড়াউড়িকথা-রুচিস্মিতা ঘোষ-বর্ষা ২০১৬

সহজ বিজ্ঞান আগের এপিসোডগুলো

biggansohojruchi01 (Medium)

পাখি আর নানাধরনের পোকামাকড়দের উড়তে দেখেই মানুষেরও একদিন ওড়ার খুব ইচ্ছে হয়েছিল। কিন্তু মানুষের তো আর তাদের মত ডানা নেই। তাই তারা কল্পনার ডানা মেলে দিত ইচ্ছেমত। রূপকথায় দেখনি, তারা ঘোড়ার পিঠে ডানা লাগিয়ে দিল আর হয়ে গেল পক্ষী্রাজ ঘোড়া। মানুষের পিঠে ডানা লাগিয়ে দিল, হয়ে গেল পরী। একবার হল কি, পারস্য দেশের রাজা একদিন ভাবলেন তিনি আকাশ জয় করবেন। আর যেই না সেই কথা ভাবা, তাঁর রথের সঙ্গে তিনি জুড়ে দিলেন চারচারটে বাজপাখি। আর তাদের চোখের সামনে ঝুলিয়ে দিলেন মাংসের টুকরো। মাংসের লোভে বাজপাখিরা ওড়া শুরু করল। রাজার রথও সঙ্গে সঙ্গে উড়ছে। বাজপাখিরা পরে বুঝতে পারল, মাংসের নাগাল আর পাবে না তারা। তখন ক্লান্ত হয়ে নেমে পড়ল মাটিতে। আর রাজার রথও নেমে এল মাটিতে।

আবার গ্রিক দেশের রূপকথায় আরো সুন্দর একটা গল্প আছে। ক্রিটের রাজামশাই তখনকার এক মস্ত কারিগর ডেডালাসকে তাঁর প্রাসাদ গড়ার কাজ দিলেন। কী এক কারণে ডেডালাসের ওপর রাজামশাই চটে গেলেন ভয়ানক। ডেডালাস আর তার ছেলে ইকারাসকে তিনি বন্দি করলেন কারাগারে। ডেডালাস তখন করল কী, পাখির পালক মোম দিয়ে এঁটে ডানা বানিয়ে জুড়ে নিল তার পিঠে আর ছেলের পিঠেও জুড়ে দিল। ডেডালাস বারবার সাবধান করে দিল ছেলেকে, ‘বেশি উঁচুতে উড়িস নে যেন। আমার পিছু পিছু আসবি।’ তারপর তারা দুজনে উড়ে পালাল। ওপরে নীল আকাশ, নিচে নীল সমুদ্র। ওড়ার আনন্দে ইকারাস বাবার উপদেশ ভুলে গেল। যত ওপরে উঠছে, সূর্যের তাপে মোম গলে যাচ্ছে। তার পিঠের থেকে তাই খুলে গেল ডানা। ইকারাস সমুদ্রে ডুবে মরে গেল। ডেডালাস কিন্তু পৌঁছে গেল সিসিলিতে।

এবার বুঝলে তো, পাখিদের দেখেই মানুষ কিন্তু ওড়ার চেষ্টা করেছে বরাবর। ডানা জুড়ে কেউ হাত নাড়িয়েছে ঘন ঘন, কেউ বা পা চালিয়েছে। কিন্তু উড়তে পারেনি।

এবার তোমাদের ইতালির গল্প শোনাই। স্কটল্যান্ডের রাজা চতুর্থ জেমসের সভাসদ ছিলেন জন ডেমিয়ান। তিনি একদিন ঠিক করলেন ফরাসি দেশে যাবেন। তিনিও পাখির পালক জুড়ে ডানা তৈ্রি করলেন। তারপর দুর্গের প্রাচীর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আর আছাড় খেয়ে পা ভাঙলেন। তবু তিনি হার মানলেন না। বললেন, মোরগের পালক লাগিয়েছিলাম। মোরগ তো বেশিদূর উড়তে পারে না। ঈগলের পালক লাগালে নিশ্চয়ই আমি উড়তে পারতাম।


এর বেশ কিছুদিন পর একজন ফরাসি বললেন, আমি পাখায় ভর দিয়ে ভেসে যাব। তিনি ঠিক করলেন, বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে নদীর ওপারের বাগানটায় যাবেন ভেসে। পিঠে শক্ত ডানা জুড়ে তিনিও দিলেন ঝাঁপ। মাঝনদীতে একটা নৌকোর ওপর পড়ে তিনিও হলেন খোঁড়া।

মানুষ এবার বুঝতে পারল, ডানা লাগিয়ে আকাশে উড়তে গেলে অনেক বড় ডানা লাগবে, আর সেই বড় ডানা নাড়াতে যতখানি শক্তির দরকার মানুষের তা নেই। তখন ইতালির বিশ্ববিখ্যাত মনীষী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ভাবলেন আকাশযানের কথা। তিনি ভেবেছিলেন আকাশযানটি পা দিয়ে biggansohojruchi02 (Medium)চালানো যাবে। কিন্তু তাঁর এই ভাবনা কোনো কাজে লাগেনি। এরপরে ফ্রানসেসকো লানা একটা উড়োজাহাজ তৈ্রি করবে ঠিক করলেন। তামার পাতের বেশ বড় চারটে গোলক জুড়ে দিলেন একটা ঝুড়ির সঙ্গে। গোলকগুলোর থেকে সমস্ত হাওয়া বের করে নিলেন। তারপর তার সঙ্গে মাস্তুল আর পাল জুড়ে দিলেন। ভাবলেন, জাহাজ যেমন জলে ভাসে, তাঁর উড়োজাহাজটাও হাওয়ায় ভাসবে। কিন্তু ওই জাহাজ আর হাওয়ায় ভাসেনি। অত পাতলা তামার গোলক থেকে হাওয়া বের করে নিলে তা তো চুপসেই যাবে।

বাতাসের চেয়েও হালকা কোনো গ্যাসের কথা তখন জানা ছিল না। আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে একজন ইংরেজ কেমিষ্ট ক্যাভেন্ডিস এমন একটা গ্যাস আবিষ্কার করলেন যার ওজন সাধারণ বাতাসের থেকে অনেক কম। এগারো ভাগের একভাগ মাত্র। এই গ্যাসের নাম তোমরা সকলেই জানো। যারা জানো না, একটু বড় হলেই জানতে পারবে। এই গ্যাসের নাম হাইড্রোজেন গ্যাস। এক বছর পরে আর একজন বৈজ্ঞানিক ডঃ জোসেফ ব্ল্যাক বললেন, হাইড্রোজেন গ্যাস বেলুনে ভরলে সেটা হাওয়ায় উড়বে। যদিও আকাশে ওড়া প্রথম বেলুনে কিন্তু হাইড্রোজেন গ্যাস পাওয়া যায়নি।

biggansohojruchi03 (Medium)এর কয়েকবছর পরে একদিন শীতের রাতে মঁগলফিয়েদের বাড়িটা ধোঁয়ায় ভরে গেল। পড়শিরা প্রথমে ভাবল আগুন লেগেছে। গিয়ে দেখে দুই ভাই জোসেফ আর স্টিফেন পাতলা ট্রের ওপর জ্বলন্ত কাঠের টুকরো রেখে তার ওপর কাগজের ঠোঙায় ধোঁয়া ভরে ঘরের মধ্যে ছেড়ে দিচ্ছে। ঠোঙাগুলো এক-আধ ফুট ওপরে ভেসে থাকছে। আবার পড়ে যাচ্ছে। পড়শীদের মধ্যে একজন বলল, ধোঁয়াটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে বলেই মাটিতে পড়ে যাচ্ছে ঠোঙাগুলো। তখন দু’ভাই ট্রে-টাই ঠোঙার নিচে বেঁধে দিল। ধোঁয়াভর্তি ঠোঙাটা এবার ছাদে গিয়ে ঠেকল।

এরপর জোসেফ আর স্টিফেন অনেকগুলো বেলুন নিয়ে অনেক রকমের পরীক্ষা করল। একটা মস্তবড় লিনেনের বেলুনে ধোঁয়া দেয়া হল উল আর খড়ের আগুনে। দিব্যি আকাশে উঠে গেল বেলুনটা, মাইলদেড়েক ইচ্ছেমত বেড়িয়ে এল।

কী করে হল বল তো? আসলে কিন্তু ধোঁয়া বেলুনকে ওপরে তোলেনি। আগুনে ভেতরের হাওয়া গরম হয়ে অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছিল আর বাইরের বাতাসের চেয়ে অনেক হালকা হয়ে গিয়েছিল। ঠান্ডা হয়ে গেলে মাটিতে বেলুনটা নেমে এল। এই হল প্রথম উড়ন্ত বেলুন। দু’ভাই তার নাম দিল ‘আগুনে বেলুন’।

প্যারিসে যখন ‘আগুনে বেলুনে’র খবর পৌঁছোল, তখন রবার্ট পরিবারের দু’ভাই একটা বেলুন গড়লেন সিল্ক দিয়ে। তারপর বেলুনটায় ভরলেন হাইড্রোজেন গ্যাস। একটা মাঠে গিয়ে তারা বেলুনটা ছেড়ে দিলেন। ১৫ মাইল আকাশে উড়ে দিব্যি নেমে এল বেলুনটা মাটিতে।

তারপর শুরু হল ‘আগুনে বেলুন’ আর ‘গ্যাস বেলুনে’র প্রতিযোগিতা। জোসেফ মঁগলফিয়ে ফরাসিদের রাজবাড়ির সামনে একটা বেলুন ওড়ালেন। একটা ভেড়া, মোরগ আর হাঁসকে নিয়ে বেলুনটা দেড় হাজার ফিট ওপরে উঠল। এরাই কিন্তু আকাশপথের প্রথম যাত্রী। সকলেই খুব ভয় পেয়ে গেল। ভাবল ওরা আর মাটিতে নামতে পারবে না। কিন্তু সকলকে অবাক করে দিয়ে বেলুনটা ওদের নিয়ে মাটিতে নেমে এল।

biggansohojruchi04 (Medium)ওদের ফিরে আসতে দেখে মানুষ এবার সাহস পেল। তারা ঠিক করল দুজন খুনের আসামীকে বেলুনে চাপিয়ে ওপরে পাঠানো হবে। এমনিতেই তো ওদের মরার কথা। পিলেৎর্ দ্য রোজিয়ে কিছুতেই তা সহ্য করতে পারলেন না। আকাশপথে প্রথম যাত্রী হলেন তিনি। মাটির সঙ্গে দড়ি বেঁধে একটা বেলুনে উঠলেন। তারপর আরও কিছু পরীক্ষা করার পর মারকুইস দ্য আরল্যান্দেসকে নিয়ে মাটির সঙ্গে দড়ি না বেঁধে একটা বেলুনে চেপে শূন্যে পাড়ি দিলেন। প্যারিসের আকাশে ২০ মিনিটে ৫ মাইল বেড়ালেন। প্রফেসর চার্লস আর রবার্ট ভাইদের একজন প্যারিস থেকে নেসলে প্রায় ২৭ মাইল পাড়ি দিলেন। প্রফেসর চার্লসই কিন্তু প্রথম বেলুনে ‘কোল গ্যাস’ ব্যবহার করলেন। ইচ্ছেমত বেলুনকে ওপর-নিচ করার উপায়ও তিনিই বের করলেন। কিন্তু ইচ্ছেমত বিশেষ কোনোদিকে নিয়ে যেতে পারলেন না।

এরপর নানা দেশে বেলুনকে ইচ্ছেমত চালানোর চেষ্টা চলতে লাগল। বেলুনে মোটরের সাহায্য নিয়ে স্ক্রু-প্রপেলার চালিয়ে ইচ্ছেমত বিশেষ কোনোদিকে চালানোর চেষ্টা চলতে লাগল। এই ব্যাপারে গিফার্ড কিন্তু জিতে গেলেন। আজ থেকে প্রায় একশো তিরিশ বছর আগে লা-ফ্রাঁস বেলুন যেখান থেকে উড়েছিল, চালকের ইচ্ছেমত সেখানেই ফিরে এল। আর আমরাও আকাশজয় করার পথে অনেকটা এগিয়ে গেলাম।