বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-সহজ বিজ্ঞান-বৃষ্টি বৃত্তান্ত-রবি সোম-বর্ষা ২০১৬

সহজ বিজ্ঞান আগের পর্বগুলো

biggansohoj57 (Medium)বৃ্ষ্টি নিয়ে ছোটোবেলা থেকে মনে-জমে-থাকা কঠিন প্রশ্নের  উত্তরটা যে দর্জিলদার দৌলতে হঠাৎ এভাবে পেয়ে যাব,ভাবিনি কখনো।

খেয়াল করে দেখেছি, বৃষ্টি শুরুর প্রথমদিকের ফোঁটাগুলোর আকার হয় বেশ বড়োসড়ো। ফার্স্ট ব্যাচের এইসব ফোঁটা এতই হৃষ্টপুষ্ট যে ছাদে বা উঠোনে আছড়ে পড়ার সময় চড়বড় করে আওয়াজ পর্যন্ত হয়। বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম না,তাই আকাশ থেকে নামার দৌড়ে বড়ো ফোঁটারা কেন সর্বদাই চ্যাম্পিয়ন হয় তা নিজের বুদ্ধিতে বুঝে উঠতে পারিনি। বিজ্ঞান-পড়া বন্ধুদের শুধিয়েও লাভ হয়নি। কেউ কেউ বিস্তর আঁক-টাক কষে আর প্রবলভাবে হাত-পা নেড়ে ব্যাখ্যান দিতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু সহজ করে বোঝাতে পারেনি কোনো বান্দাই। প্রশ্নটা তাই মনেই পুষে রাখতে বাধ্য হয়েছি। যাই হোক, ফোঁটার দৌড় রহস্যের সমাধান কীভাবে হল, এবার বরং সেই গপ্পোটাই বলি।

বেঙ্গালুরুতে সুজিত ও আমার দিন কাটছে পরমানন্দে। দর্জিলদা কাছেই থাকে। ছুটিছাটার দিনে আমরা তিন বঙ্গসন্তান একসাথে মিলিত হই। ঘটনাটা এক শুক্রবারের। গুডফ্রাইডের ছুটি থাকায় দর্জিলদা ছিল আমাদের এখানেই। প্রাতরাশ সমাধা হয়েছে,লাঞ্চ কোথায় হবে তা নিয়ে চলছে আলোচনা। সুজিতের প্রবল বাসনা,কোশি’জ রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করার। প্রস্তাব নাকচ করে দর্জিলদা বলল,“বাইরে কেমন মেঘ করেছে দেখেছিস? ঝেঁপে বৃষ্টি এলে লাঞ্চ কিন্তু হয়ে যাবে লাঞ্ছনা! তার চেয়ে মোড়ের অন্ধ্র হোটেলই ভালো। ওখানে তো মাছ-টাছও পাওয়া যায়।”

আমি মিন মিন করে প্রতিবাদ করলাম,“ওরা খাবারে বড্ড বেশি ঝাল দেয়। নাকের জলে চোখের জলে হতে হয় আমাকে। বরং কাছাকাছি অন্য কোথাও চল।” সুজিত ও দর্জিলদা ঝাল খাবার খেতে পছন্দ করে খুব। ওদের পাল্লায় পড়ে আমিই যাই ফেঁসে!

আমার আপিলের ফয়সালা হওয়ার আগেই বৃষ্টি পড়ার আওয়াজ শোনা গেল। মরশুমের প্রথম বারিপাতের আকর্ষণে মুহূর্তে সবাই ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম। ঢিমে তালে বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি পড়া সবে আরম্ভ হয়েছে। মনে পুষে রাখা প্রশ্নটা দর্জিলদাকে করার এটাই সুবর্ণ সুযোগ!

প্রশ্ন শুনে দর্জিলদা মুচকি হেসে বলল, “ভালো প্রশ্ন। জবাব দেব,তবে একটা শর্ত মানতে হবে। কথাগুলো শুনতে হবে খুব মন দিয়ে। বৃষ্টিতে না ভিজে চল্ এবার ভেতরে যাই।”

আমি মজা করে বললাম, “ওকে বস্,আমি কান খাড়া করলাম।”

ঘরে ঢুকে সোফায় জাঁকিয়ে বসলাম সবাই।   এরপর দর্জিলদা যা বলল তার সারকথা এইরকম :

ধরা যাক মেঘ থেকে একসাথে দু’টি বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করল। একটি ফোঁটা ছোটো, অন্যটি বড়ো। কে আগে পড়বে মাটিতে? আসলে,পতনশীল ফোঁটাকে নিয়ে যেন দড়ি টানাটানি খেলা শুরু হয়।নীচে টানে অভিকর্ষীয় বল আর ওপরে ঠেলে বাতাসের প্রতিরোধ বল। অভিকর্ষীয় বলের সম্বন্ধ শুধুমাত্র ফোঁটার ভরের সাথে। বেশি ভরওলা ফোঁটার ওপর অভিকর্ষীয় বল বেশি, কম ভরের ওপর কম।ব্যাপারটা সোজাসাপটা, সরাসরি।

তুলনায় বাতাসের প্রতিরোধ বলের হালচাল কিছুটা জটিল। আসলে, প্রতিরোধ বলের সম্বন্ধ

১)ফোঁটার আকৃতি 

২)ফোঁটার পতন বেগ,

এই দুই-এর সাথেই। বাতাস ফুঁড়ে নামতে হয় বলে বড়ো ফোঁটার ওপর বাতাসের প্রতিরোধও স্বাভাবিকভাবেই বেশি। সম্বন্ধ এখানেও সরাসরি মানে, ফোঁটার প্রস্থচ্ছেদ (ক্রস সেকশনাল এরিয়া) দ্বিগুণ হলে প্রতিরোধ বলও হবে ডবল। অন্যদিকে প্রতিরোধ বলের সম্বন্ধ পতন বেগের বর্গের সাথে। বেগ ডবল হলে প্রতিরোধ বল চারগুণ, বেগ তিনগুণ হলে বল নয়গুণ,ব্যাপারটা এরকম।

ওপর থেকে ছেড়ে দিলে বস্তু ক্রমবর্ধমান বেগে পড়তে থাকে। কাজেই ফোঁটার ওপর বাতাসের প্রতিরোধ বল বাড়তেই থাকে। বাড়তে বাড়তে বেগের একটা বিশেষ মানের জন্য প্রতিরোধ বল হয়ে পড়ে অভিকর্ষীয় বলের সমান। দুটি বল কাটাকাটি হয়ে যাওয়ায় ফোঁটার ওপর আর কোনও বলই ক্রিয়াশীল থাকে না। কাজেই বেগ আর বাড়ে না,সেই বিশেষ বেগ নিয়েই ফোঁটাটা পড়তে থাকে। এই বিশেষ বেগকে বলে প্রান্তিক বেগ বা টার্মিনাল ভেলসিটি।

বোঝা যাচ্ছে,যে ফোঁটার প্রান্তিক বেগ বেশি,দৌড়ে সে-ই জিতবে। এবার দেখা যাক,ছোটো না বড়ো, কোন্ ফোঁটার প্রান্তিক বেগ বেশি।

মাপ বাড়ার সাথে সাথে ফোঁটার আয়তন এবং প্রস্থচ্ছেদ সবই বাড়ে। কিন্তু আয়তন বৃদ্ধির সাথে প্রস্থচ্ছেদ সমান তালে বাড়ে না। মাপ দ্বিগুণ হলে আয়তন আটগুণ বৃদ্ধি পায় কিন্তু প্রস্থচ্ছেদ বাড়ে চারগুণ। আকারের সাথে যেহেতু জলের ঘনত্ব পাল্টায় না, তাই ‘আয়তন’ কথাটার বদলে ‘ভর’ বসালেও ভুল হবে না। মোদ্দা কথা, সাইজ বাড়লে ফোঁটার ভর যত বাড়ে, প্রস্থচ্ছেদ বাড়ে না সেই অনুপাতে।

একটু ভাবলেই বোঝা যাবে পতনের প্রথমাবস্থায় তুলনামুলক বিচারে ছোটো ফোঁটার চেয়ে বড়ো ফোঁটার নীচের দিকের টান ওপরের দিকের রোধের থেকে অধিকতর। সহজ কথায়,বড়োটি ছোটোটিকে হারিয়ে দেবে দৌড়ের প্রাথমিক পর্বেই। কাজেই প্রান্তিক বেগ বড়োটির বেশি হওয়ায় আগে মাটিতে পড়বে বড়ো ফোঁটাই।

ব্যাখ্যান শেষ করে দর্জিলদা শুধালো, “ব্যাপারটা বোধগম্য হল?”

সুজিত ও আমি দু’জনই প্রবলভাবে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লাম।

“যাক্,লম্বা ভাষণটা তাহলে মাঠে মারা যায়নি!” দর্জিলদা খুশি হয়ে বলল, “বৃষ্টিটা ধরেছে। লাঞ্চটা তাহলে কোশি’জ-এই করা যাবে।”

সুজিত আনন্দে গদগদ হয়ে বলেই ফেলল, “থ্যাঙ্ক ইউ, দর্জিলদা।”

অন্ধ্র হোটেলের ভয়ঙ্কর ঝাল খাবার খেতে হবে না জেনে আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম!