বৈজ্ঞানিকের দপ্তর-সহজ বিজ্ঞান-পিৎজা কেনার গল্প রবি সোম শীত ২০১৬

 সহজ বিজ্ঞান সব পর্ব একত্রে

biggansohojবেঙ্গালুরুতে সুজিত ও আমার দিন কাটছে ভালোই। দর্জিলদা কাছেই থাকে। আমরা একসাথে হই ছুটিছাটার দিনে। হৈচৈ, জমাটি আড্ডা, ঘুরে বেড়ানো, বাইরে খাওয়া-দাওয়া এসবের মধ্য দিয়ে কীভাবে যে ছুটির দিনগুলো কেটে যায়, টের পাই না।

স্পষ্ট মনে আছে, ঘটনাটা এক শনিবারের। ঘনিষ্ঠ বন্ধু সজলদাকে সাথে নিয়ে দর্জিলদা সেদিন আমাদের এখানে এসেছিল সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ। ছুটির দিনে আমরা যে ন’টার আগে বিছানার মায়া কাটাতে পারি না, সেটা বিলক্ষণ জানত দর্জিলদা। সজলদা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। দর্জিলদার বন্ধু হিসেবে আমাদেরও খুব কাছের মানুষ। তবে দেখা-সাক্ষাত হয় কমই, কারণ, সজলদা ভীষণ কাজপাগল লোক, অফিসই ধ্যানজ্ঞান! অধিকাংশ ছুটির দিনই কাটে অফিসের চৌহদ্দির ভেতরে।

দর্জিলদা মুচকি হেসে বলল, “সজলকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এলাম। সাতসকালেই চান-টান করে অফিস যাওয়ার যা তাল করছিল তাতে একটু দেরি হলে আমাকে তালার সাথে দেখা করেই ফিরতে হত!”

অফিস যেতে না পেরে সজলদাকে কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ দেখাচ্ছিল। তবে আমাদের মতো হুল্লোড়বাজদের পাল্লায় পড়ে মিইয়ে পড়া ভাব উবে যেতেও দেরি হল না। চা পান করতে করতে সবাই বসে দিনের কর্মসূচি ছকে ফেলা হল। আমি প্রস্তাব দিলাম, সন্ধের পর বাড়ি ফিরে পিৎজা আর ব্ল্যাক কফি দিয়ে সারাদিনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলা হোক। পানীয়টা সজলদা যে দারুণ বানায় তার পরিচয় আগেই পেয়েছি। সবাই সায় দেওয়ায় প্রস্তাব গৃহীত হল সহজেই।

যাই হোক, সেদিনের সমগ্র কর্মকাণ্ডের খুঁটিনাটিতে না গিয়ে বরং সরাসরি পিৎজার প্রসঙ্গেই আসি। আসলে, দর্জিলদার পিৎজা কেনার অদ্ভুত স্টাইল দেখে আমি বেজায় অবাক হয়েছিলাম। সুজিতও যে ঘাবড়ে গিয়েছিল তা ওর মুখ দেখেই বুঝেছিলাম। এমনিতে দর্জিলদা সব কাজই করে খুব গুছিয়ে, ভেবেচিন্তে। অযৌক্তিক কোনও কাজের সাথে দর্জিলদাকে জড়াতে দেখিনি কখনও। তাই ধরতে পারছিলাম না, শুধুমাত্র বড়ো সাইজের পিৎজা কেনার জন্যই দর্জিলটা কেন জেদ ধরল। আরও আশ্চর্য ব্যাপার, আমাদের যৎপরোনাস্তি ধন্দ  দেখেও সজলদা এই বিষয়ে দিল না কোনও মতামতই! শুধুই মৃদুমন্দ হাসতে থাকল।

সাসপেন্সে না রেখে পুরো বিষয়টা খুলেই বলি। সন্ধের মুখে পিৎজা সংগ্রহের জন্য যে রেস্তোরাঁয় আমরা উপনীত হলাম, খাসা পিৎজা বানানোর ব্যাপারে সেটার যথেষ্ট নামডাক। নানান ধরনের পিৎজার সম্ভার – ছোটো, মাঝারি ও বড়ো, এই তিনটি সাইজে উপলব্ধ এই রেস্তোরাঁয়। প্রদর্শিত তালিকা অনুসারে তিনটি সাইজের মাপ (ব্যাস) যথাক্রমে ৮, ১২ ও ১৬ ইঞ্চি। ছোটোর তুলনায় মাঝারির দাম দেড় গুণ আর বড়োর তিন গুণ। সুজিত আট ইঞ্চি সাইজের চারটে পিৎজার কথা বলতেই দর্জিলদা গম্ভীরভাবে নির্দেশ দিল চারটে ছোটোর বদলে মাত্র একটা বড়ো পিৎজার অর্ডার দিতে। বাড়ি গিয়ে ভাগ করে নিলেই চলবে।

মনঃপূত না হলেও সুজিত অগত্যা একটা বড়ো পিৎজারই অর্ডার দিল। আমিও অখুশি – হোক না বড়ো সাইজ, চার টুকরো করলে মাথাপিছু পরিমাণটা কী হবে তা তো বোঝাই যাচ্ছে! কিন্তু দর্জিলদার কথার প্রতিবাদ করার সাহস হল না বলে রইলাম চুপ করেই।

দর্জিলদার অদ্ভুত আচরণের কারণ জানা গেল বাড়ি ফেরার পর। জিজ্ঞেস করার আগে খোলসা করল দর্জিলদা নিজেই। বুঝিয়ে দিল, বড়ো পিৎজা কেনাই কেন বুদ্ধিমানের কাজ। দর্জিলদা যা বলেছিল তার সারকথা এইরকম –

পিৎজা বিক্রি হয় সাইজ হিসেবে। ইঞ্চি বা সেন্টিমিটার আসলে দৈর্ঘ্য পরিমাপের একক। দৈর্ঘ্য অনুসারে বেচাকেনা হলেও খাওয়া হয় কিন্তু আয়তন বা ভল্যুম-এ। পিৎজার আয়তন পাওয়া যায় পুরুত্ব এবং ক্ষেত্র বা এরিয়ার গুণফল থেকে। পুরুত্বের হেরফের না হলেও সাইজের সাথে পাল্টে যায় পিৎজার ক্ষেত্র। গোলাকার পিৎজার ক্ষেত্রের সম্পর্ক ব্যাসের বর্গের সাথে। কাজেই ব্যাস দ্বিগুণ হলে ক্ষেত্র বাড়বে চারগুণ। অতএব, ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের পিৎজার ক্ষেত্র ৮ ইঞ্চি ব্যাসের পিৎজার ক্ষেত্রের চেয়ে চারগুণ বেশি। কিন্তু দাম তুলনায় কম, মাত্র তিনগুণ। দেখা যাচ্ছে, চারটি ৮ ইঞ্চি পিৎজার সমান পরিমাণ খাদ্যবস্তু মিলছে একটিমাত্র ১৬ ইঞ্চি পিৎজায়, তুলনামূলকভাবে কম দামেই। তাই বড়ো সাইজের পিৎজা কেনা যে লাভজনক হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।

কালো কফি সহযোগে পিৎজার সদ্‌ব্যবহার করতে করতে হঠাৎ একটা কথা মাথায় এল। রেস্তোরাঁর বদলে বাড়িতে কফি-পিৎজা দিয়ে সারাদিনের কর্মসূচি শেষ করার প্রস্তাবটা রেখেছিলাম আমি এবং সবাই রাজি হয়েছিল। অন্যথায় পিৎজা কেনার সঠিক পন্থা আমার কাছে থেকে যেত অজানাই!

 বৈজ্ঞানিকের দপ্তর সব লেখা একত্রে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s