বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

বিচিত্র জীবজগত->পোকারা ফেলনা নয়

অপূর্ব চট্টোপাধ্যায়

bigganjibjogot01 (Small)এক চীনদেশি গল্প

সে অনেক কাল আগের কথা। আমাদের দেশের উত্তরে হিমালয় পেরিয়ে,তিব্বত টপকে যে চীন দেশ সে দেশের ঘটনা। সেটা ১২৩৫ সাল, ওদেশের একজন নাম তার সুং সু। তিনি একটি বই লিখলেন। দীর্ঘকাল পরে ১৯৮১ সালে সে বইটির  ইংরাজি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হল। সেটি লিখলেন বি ই ম্যাকনাইট। অনুবাদ গ্রন্থটির নাম “দি ওয়াশিং অ্যাওয়ে অফ রংস।” প্রতিদিন তো কত বই প্রকাশ হচ্ছে তা হলে এই বইটির কথাই বা এত ঘটা করে বলা কেন। কি লেখা রয়েছে এই বইটাতে।

সে কালে সুং সু-র কাজ ছিল যেখানে অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটত সেগুলির খোঁজখবর করা। তাঁর লেখা বইয়ে তিনি একটি খুনের ঘটনার কথা লিখেছেন। চীন দেশের একটি গ্রামে একটি মানুষকে কুপিয়ে খুন করা হয়। সেই স্থানের প্রশাসকের মনে হল এই খুনটি কাস্তের সাহায্যে করা হয়েছে। চীন দেশের মত আমাদের দেশেও খেতখামারে কাজ করার জন্য বাঁকানো কাস্তের ব্যবহার চাষিরা করে থাকে। এর সাহায্যে ফসল কাটা হয়। কাস্তের এক দিকে বেশ ধারালো ছোট ছোট দাঁত থাকে। তাই কাস্তের সাহায্যে মানুষকে আহত বা খুন করা খুব সহজ।

ওই খুনের সাক্ষী যারা ছিল তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বা অন্য ভাবে চেষ্টা করেও খুনের কিনারা করা যায় নি। শেষকালে ওখানের প্রশাসক গ্রামের সব পুরুষ মানুষদের এক জায়গায় জমায়ের হতে নির্দেশ দিলেন এবং সঙ্গে করে নিজের কাস্তেটিকে আনার কথাও বললেন। পুরুষেরা জমায়েত হলে, প্রত্যেকের কাস্তেটা মাটিতে নামিয়ে রাখতে আদেশ দিলেন। প্রশাসকের মনে হয়েছিল, যে কাস্তের সাহায্যে খুন করা হয় সেটাতে নিশ্চয় রক্ত বা ছোট মাংসের টুকরো লেগে থাকবে। আর সেই গরমকালে (খুনটি করা হয় গরমকালে) মাছিরা রক্ত-মাংসের আকর্ষণে চলে আসবে নিশ্চয়। প্রশাসকের চিন্তাশক্তির প্রশংসা করতেই হয়। সেদিন খুনী ব্যক্তির কাস্তেতে এবং তার হাতলে আপাত অদৃশ্য রক্ত-মাংসের আকর্ষণে মাছিরা এসে জড় হয়েছিল। সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করায় সে খুনের স্বীকারোক্তি দেয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে সেকালে ওই অসাধারণ ব্যক্তিটি (প্রশাসক) মাছিদের ক্রিয়াকলাপ সম্বন্ধে কত ওয়াকিবহাল ছিলেন।

 সুং সু তাঁর বইতে বিশেষ ধরণের মাছি যারা মৃতদেহে ডিম পাড়ে, তাদের সম্বন্ধে বিশদভাবে লিখে গেছেন। এই মাছিরা দেহের যে সব প্রবেশদ্বার রয়েছে (যেমন নাকের ছিদ্র, মুখ, ইত্যাদি) সেখানে বা ক্ষতস্থানে এসে ভিড় করে। তিনি এই সব মাছির শূককীট, পূর্ণাঙ্গ দশা ইত্যাদি সম্বন্ধে বিবরণ দিয়েছেন। বর্তমান কালের কীটতত্ত্ববিদেরা লক্ষ্য করেছেন, কোন মৃতদেহের কাছে বিভিন্ন ধরণের পতঙ্গ এসে ভিড় করে। এদের মধ্যে এক ধরণের মাছি, ইংরাজিতে যাদের ব্লো ফ্লাই বলে, মৃত্যুর কয়েক মিনিটের মধ্যের এসে হাজির হয়। মৃতদেহ থেকে নির্গত গ্যাস এরা সহজেই চিনতে পারে। আমাদের দেশেও এই সব মাছির অভাব নেই। আম কাঁঠালের সময় সাধারণ মাছির চেয়ে একটু বড় নীল বা সবুজ রঙের মাছি, পাকা আম কাঁঠালের ওপর এসে বসে। এগুলোই ব্লো ফ্লাই। মৃতদেহে এসে ভিড় করা মাছি এবং অন্য পতঙ্গদের গতিপ্রকৃতি লক্ষ করে অপরাধের কিনারা করা সম্ভব হচ্ছে। এই বিষয় সম্বন্ধে বিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা গড়ে উঠেছে, এর নাম ফরেনসিক এন্টোমোলজি। বিজ্ঞানের এই বিশেষ শাখাটি সম্বন্ধে আবার পরে আলোচনা করা হচ্ছে।

 আর একটি খুনের গল্প

bigganjibjogot02 (Small) bigganjibjogot03 (Small)এবার চলে আসি আধুনিক কালের একটি ঘটনায়। ঘটনার সূত্রপাত গত শতাব্দীর মধ্যভাগে; আরও সঠিক ভাবে বললে ১৯৫৯ সালের শেষের দিকে। কানাডার অন্টারিও প্রদেশের ক্লিনটন শহরের ১২ বছরের একটি স্কুল ছাত্রীর উপর অত্যাচার এবং খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত মেয়েটির সহপাঠী ১৪ বছরের স্টিভেন মারে ট্রাসকট।

আদালতের একটি হল ঘর। অন্যদের সঙ্গে স্টিভেন মামলার রায় শোনার জন্য উদগ্রীব। মহামান্য জজ সাহেব রায় পড়ে শোনাচ্ছেন। জজ সাহেব জানালেন, লিনে হারপারের উপর অত্যাচার করা এবং তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করার অপরাধে স্টিভেন মারে ট্রাসকটকে দোষী সাব্যস্ত করা হল এবং এই অপরাধের জন্য তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হল। মৃত্যু দণ্ডাদেশ কার্যকর করা হবে ৮ ডিসেম্বর ১৯৫৯ তারিখের মধ্যে। স্টিভেন সহ অনেকেই স্বপ্নেও ভাবতেই পারেনি এমন সাজা হবে। পুলিসকে এবং আদালতে স্টিভেন বরাবরই বলে এসেছে সে দোষী নয়। অথচ কেউই তার কথা বিশ্বাস করে নি। শুধু তাই নয়, একজন ১৪ বছরের বালককে পূর্ণবয়স্ক মানুষ হিসেবে আদালতে দেখা হল।

এই ঘটনার কয়েক দিন পর, স্টিভেন জেলের ঘরে বসে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন কাটায়। কেঁদে বুক ভাসায়, কূলকিনারা পায় না কিছুতেই। ৮ ডিসেম্বর যতই এগিয়ে আসে আতঙ্ক ততই বাড়ে। মনে হয় আজই বুঝি তার জীবনের শেষ দিন। রাত্রে জেলখানায় কোন আওয়াজ হলে চমকে উঠে বসে, ভাবে তাকে ফাঁসি দেবার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এখনই তাকে নিয়ে যাওয়া হবে!

সে দিনটা ২০শে নভেম্বর ১৯৫৯, স্টিভেনকে জানানো হল তাকে আরও কয়েকটা দিন বেশি বাঁচার সুযোগ দেওয়া হল। ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ৮ ডিসেম্বর, তার বদলে পরের বছর ১৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯৬০ তারিখের মধ্যে ফাঁসি হবে। ১৪ বছরের ছেলেটার মনে যে বিশেষ কোন ছাপ পড়ল তা নয়। তাকে তো এবার যেতেই হবে। সেই শেষ যাত্রার জন্য যতটা প্রস্তত থাকা যায়।

জীবনে অভাবনীয় কিছু ঘটনা ঘটে, তেমনটাই ঘটল স্টিভেনের জীবনে। তারিখটা ছিল ২২শে জানুয়ারি ১৯৬০। স্টিভেনের ফাঁসির আদেশ রদ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হল। সেদিন স্টিভেন নতুন জীবন ফিরে পেল। তারপর জেলখানায় প্রায় এক দশক কেটে গেল। শান্তভাবেই এ জীবনকে মেনে নিয়েছিল স্টিভেন।

স্টিভেন মারে ট্রাসকটের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ঘটনায় কানাডার জনমানসে যথেষ্ট প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। ওদেশের সাংবাদিক ইসাবেল লির্বোডেইস এই বিষয়ে যথেষ্ট গবেষণা করে ১৯৬৬ সালে একটি বই লিখলেন, দি ট্রায়াল অফ স্টিভেন ট্রাসকট। ওনার মতে স্টিভেনকে অন্যায়ভাবে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং তা করা হয়েছে তাড়াহুড়া করেই। বহু তথ্য আদালতে পেশ করে হয়নি। এই বইটি সরকারকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করল। স্টিভেনকে প্যারোলে ছাড়া হল ২১শে অক্টোবর ১৯৬৯। শুরু হল নতুন ভাবে বাঁচা, নতুন নামে। জীবনসঙ্গী হিসেবে খুঁজে পেল এমন একজনকে যে সব সময়েই মনে করেছে স্টিভেন নির্দোষ। প্যারোলের বিধিনিষেধ উঠে গেল ১৯৭৪ সালের ১২ই নভেম্বর।

 সেই বিশেষ দিনটি – ৯ জুন ১৯৫৯

ফেরা যাক সেই ঘটনা বহুল দিনটিতে, ৯ জুন ১৯৫৯ মঙ্গলবার। রয়্যাল ক্যানাডিয়ান এয়ারফোর্সের একটি বেস, অন্টারিও প্রদেশের দক্ষিণ পশ্চিমের একটি শহর, ক্লিনটনে। সময়টা শেষ বিকাল। বছর ১২ বয়েসের একটি ফুটফুটে মেয়ে সেরিল লিনে হার্পার। ৬ টা নাগাদ  রাত্রের খাবার খেতে খেতে বাবা-মার অনুমতি চেয়েছিল সন্ধেবেলা সাঁতার কাটতে যাবার। অনুমতি মেলেনি। তাই কিছুটা ক্ষুণ্ণ মনেই বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। স্কুলে কিছুক্ষণ কাটিয়ে সহপাঠী বন্ধু বছর ১৪-র স্টিভেন মারে ট্রাসকটকে বলেছিল তাকে যেন সাইকেলে চাপিয়ে বড়োরাস্তায় পৌঁছে দেয়। এক জনের বাড়িতে ছোট্টো ঘোড়া (পনি) আছে, তা দেখতে যাবে সে।

স্টিভেন সেরিলকে সাইকেলে চাপিয়ে পৌঁছে দিয়েছিল হাই রোডে। তারপর পুনরায় স্কুলে ফিরে আসে রাত্রি ৮ টা নাগাদ। ওর বন্ধুরা তা দেখেছিল। কিন্তু সেরিল লিনে হার্পার আর কোন দিন ফিরে আসেনি। দুদিন পরে তার মৃতদেহ পাওয়া যায় হাইরোডের কাছে জঙ্গলের মধ্যে। তার ওপর অত্যাচার করা হয়েছে এবং শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে। মারার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে পরিধেয় বস্ত্রটি। সেটির সাহায্যে গলায় ফাঁস দেওয়া হয়েছে। জীবিত অবস্থায় সেরিলকে শেষবারের মত দেখা যায় স্টিভেনের সঙ্গে, যখন স্টিভেন তাকে সাইকেল চাপিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। পুলিস তাই স্টিভেনকে ধরেছে সন্দেহের বশে।

আদালতের রায়

মৃত্যুর সঠিক কাল নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক বিজ্ঞানীদের সাহায্য নেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর সময় নির্ধারণের জন্য যে বিষয়গুলি দেখা হয়েছিল সেগুলি – ১)  মৃতের পাকস্থলীতে খাদ্যের পরিমাণ, ২) খাদ্য কতটা হজম হয়েছিল, ৩) মৃত্যুর পর দেহে কতটা পরিবর্তন হয়েছিল (রিগর মর্টিস), ৪) দেহে কতটা পচন ধরেছিল, এবং ৫) দেহের ভিতরের অঙ্গগুলির (থাইমাস, যকৃৎ, ফুসফুস, ইত্যাদি) কতটা পরিবর্তন হয়েছিল। উপরোক্ত বিষয়গুলির বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা করে তৎকালীন ফরেনসিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মৃত্যুর সময় নির্ধারণ করে জানান যে সেরিলের মৃত্যু ঘটেছে ৭ টা থেকে ৭-৪৫ মিনিটের মধ্যে।

সেরিল লিনের মৃতদেহে মাছির ম্যাগট পাওয়া যায়। পরীক্ষার জন্য সেগুলি কীটতত্ত্ববিদ এলগিন ব্রাউনের কাছেও পাঠানো হয়েছিল কিন্তু বিজ্ঞানী ব্রাউনের পাঠানো রিপোর্ট আদালতে পেশ করা হয় নি। সেই সময় আরও অনেক তথ্য সংগৃহীত হয়েছিল কিন্তু পুলিস সেদিকে নজর দেয়নি। স্টিভেন ট্রাসকটকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পোস্টমর্টেম রিপোর্টের ভিত্তিতেই আদালতের রায় দেওয়া হয়েছিল – ট্রাসকটের ফাঁসি। শেষ হয়ে যাচ্ছিল স্টিভেনের জীবন।

শুধুই ভুলে ভরা

শুরু হয়েছে নতুন শতাব্দি, হয়েছে বিজ্ঞানের অগ্রগতি। ট্রাসকট দম্পতি মনে মনে তৈরি হয়েছেন শেষ চেষ্টা করার – খুনী ছাপটি কি মুছে ফেলা যায় না?  ২০০০ সালের ২৯ শে নভেম্বর, তাঁরা দরখাস্ত করলেন ১৯৫৯ সালের কেসটির পুণর্বিবেচনার জন্য। ইতিমধ্যে চার দশক কেটে গেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনেক উন্নতি হয়েছে। নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীরা আবার নির্ধারণ করতে বসলেন সেরিল লিনের মৃত্যুর সঠিক সময়। পোস্টমর্টেম রিপোর্টের সঙ্গে পুণঃ বিবেচিত হল মাছির শূককীটের বিষয়টি।

যে কজন ডাক্তার বিজ্ঞানীর মতামত নেওয়া হয়েছিল তাঁরা সকলেই জানালেন, যে পোস্টমর্টেম রিপোর্টের ভিত্তিতে সেরিল লিনের মৃত্যুর সময় নির্ধারিত হয়েছিল ৭-০০ থেকে ৭-৪৫ মিনিট, তা সঠিক নয়। তৎকালীন বিজ্ঞানীদের অজ্ঞতা এবং বর্তমান কালের বিজ্ঞানের অগ্রগতি, এই দুটি রিপোর্টের মধ্যে ফারাক ঘটিয়েছে। সেরিলের মৃত্যু সন্ধ্যা ৭-৪৫ মিনিটের মধ্যে হয়েছে – এই ভ্রান্তির জন্যই হয়েছে স্টিভেনের ফাঁসি হতে চলেছিল। পাকস্থলীতে খাবারের স্থায়িত্ব সাধারণভাবে দেড় থেকে দু’ঘণ্টা হলেও, আরও অনেক বিষয়ের উপর স্থায়িত্ব নির্ভরশীল। অনেকক্ষেত্রে খাবারের স্থায়িত্ব ৬ ঘণ্টা বা তার বেশি হয়ে থাকে। তাই ১৯৫৯ সালে, সেরিলের মৃত্যুর সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনেক যত্নবান হওয়া উচিৎ ছিল বলে বর্তমান প্রজন্মের ডাক্তার বিজ্ঞানীরা মনে করেছেন। তাছাড়া লিনের দেহের যথেষ্ট পচন না ধরা এবং আভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলির স্বল্প পরিবর্তনের বিষয়টির কথা ভেবে ডাক্তাররা মনে করেন লিনের মৃত্যু ৯ জুন ১৯৫৯ সন্ধ্যা ৭-৪৫ মিনিটের পর এমনকি ১০ জুন তারিখেও হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে স্টিভেন ট্রাসকটকে দোষী করা যায় না।  

কীটতত্ত্ববিদের শরণাপন্ন হওয়া

স্টিভেন ট্রাসকটকের পক্ষ থেকে বিখ্যাত কীটতত্ত্ববিদ মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির ডঃ রিচার্ড মেরিটের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। উনি লিনের দেহে যে ব্লো ফ্লাইয়ের ম্যাগটগুলি পাওয়া গেছিল (/ মিলিমিটার লম্বা) তার পরিমাপ, জুন মাসের তাপমাত্রা এবং ব্লো ফ্লাই শূককীটের পূর্ণাঙ্গ মাছিতে রূপান্তরের গতিপ্রকৃতির উপর নির্ভর করে জানান যে ৯ জুন ১৯৫৯ তারিখে ব্লো ফ্লাইগুলি মৃতদেহে ডিম পাড়লে, তার থেকে উৎপন্ন লার্ভা বা ম্যাগটগুলি ১১ জুন তারিখে অত ছোট (/ মিলিমিটার) হত না। লার্ভাগুলির দৈর্ঘ্য আরও বেশি হত।

আদালতে গৃহীত পূর্ব সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত

bigganjibjogot04 (Small)১৯৫৯ সালের পোস্টমর্টেম রিপোর্টগুলি পুনর্বার বিবেচনা করে ডাক্তার বিজ্ঞানীরা যে নতুন রিপোর্ট আদালতে জমা দেন সেগুলি এবং নতুনন তথ্যের (ডঃ মেরিটের রিপোর্ট) ভিত্তিতে অন্টারিও কোর্ট অফ অ্যাপিল, ২০০৭ সালের ২৮ শে আগস্ট লিনে হার্পারকে খুনের জন্য স্টিভেন ট্রাসকটকে দোষী সাব্যস্ত করবার সিদ্ধান্তটি “আদালতের ভুল” (Miscarriage of Law)বলে স্বীকার করে নেন। ট্রাসকটকে খুনের দায় থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ২০০৮ সালের ৭ ই জুলাই অন্টারিও সরকারের তরফ থেকে স্টিভেন ট্রাসকটকে ৬.৫ মিলিয়ন ডলার (বর্তমান মূল্যে ৩৩ কোটি ৮৭ লক্ষ টাকা) ক্ষতিপূরণ বাবদ দেওয়া হয়।

 বিজ্ঞানের একটি নূতন শাখা – মেডিকো-লিগ্যাল এন্টোমোলজি

 মানুষ সহ অন্যান্য প্রাণীর মৃত্যু ঘটলে কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশেষ ধরণের মাছি সহ কিছু পতঙ্গ মৃতদেহের কাছে এসে হাজির হয়। উদ্দেশ্য ডিম পাড়া। এই সব মাছিদের (হাউস ফ্লাই নয়) ডিম পাড়ার আদর্শ জায়গা হচ্ছে মুখ, নাক এবং কানের ছিদ্র। মানুষের মৃতদেহ খুব তাড়াতাড়ি সৎকার করা হয় বা কবর দেওয়া হয়। তাই মাছি বা অন্যান্য পতঙ্গদের ক্রিয়াকলাপ সাধারণ মানুষদের চোখে পড়ে না। কিন্তু যে সব মৃতদেহ মাঠেঘাটে বা জঙ্গলে পড়ে থাকে সেই সব ক্ষেত্রে মাছি এবং শূককীটের উপস্থিতি সহজেই চোখে পড়বে। কীটপতঙ্গের ডিম থেকে শূককীট এবং শেষে পূর্ণাঙ্গে রূপান্তর নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই ঘটে থাকে। তা তাপমাত্রা এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতির উপর নির্ভরশীল। ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গে রূপান্তরের সময় সঠিক ভাবে নির্ধারণ করতে পারলে সেই তথ্য নানাভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। এই জাতীয় তথ্যের সাহায্যে কীটতত্ত্ববিদেরা বহু অপরাধের কিনারা করেছেন। আদালতে সেই তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীর সাজা হয়েছে।

পরিতাপের বিষয় এই যে আমাদের দেশে এই বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত। যদিও চীন দেশে প্রায় ৮০০ বছর আগে খুনীকে ধরার জন্য কীটপতঙ্গের ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ আজও আমরা এই ধরণের ভাবনাচিন্তা করিনা। এদেশে চিকিৎসাশাস্ত্রে ফরেনসিক এন্টোমোলজির স্থান হয় নি। জীবনবিজ্ঞানের ছাত্রদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। শুনলে অবাক হতে হবে, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা বা অঙ্কের অধ্যাপকদের কেউ কেউ উপরোক্ত বিষয় তিনটিকে “পিওর সায়েন্স” বলে মনে করেন, অবশ্যই তা তাঁদের চরম অজ্ঞতাবশত। অথচ নিত্য নতুন জীবন বিজ্ঞানের শাখার উদ্ভব হচ্ছে। আশার কথা এই যে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শী বিজ্ঞানীরা মানব কল্যাণে একসঙ্গে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। আমাদের মত মানুষেরা সব সময়েই স্বপ্ন দেখছেন, এদেশেও ফরেনসিক এন্টোমোলজি, মেডিকো-লিগ্যাল এন্টোমোলজি, ইত্যাদি বিষয়ে নতুন নতুন গবেষণা হবে। সাধারণ মানুষ এই বিজ্ঞানের মানব কল্যাণমুখী দিক সম্বন্ধে অবহিত হবেন।

আগের এপিসোডগুলোর লিংক এইখানে পাবে