বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

টেকনো টুকটাক

গুহাবাসী মানুষ আজ আকাশবাসী

কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়

biggantechno01 (Small)ছোটবেলা একটা গল্প পড়েছিলাম। একটা দেশ ছিল যেখানে জমি বিক্রি হত দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, এবং উচ্চতা মেপে। ঐ জমি কিনে কেউ বাড়ি করতে চাইলে ঐ মাপ অনুযায়ী বাড়ি করতে হত। কারণ বাড়িটির ছাদ এবং তার উপরের আকাশ বিক্রি করার অধিকার জমির প্রথম মালিকের থাকত। এইভাবে আকাশ বিক্রি করে করে জমির প্রথম মালিকের যেমন রোজগার হত তেমন বাড়ির তলা বাড়তে থাকত। তবে প্রতি তলার মালিক হত আলাদা আলাদা। গল্পটার মধ্যে ফ্ল্যাট বাড়ির ধারণা রয়েছে। যদিও গল্পটা যখন পড়েছিলাম তখন ফ্ল্যাট বাড়ির তেমন চল ছিল না। তখন অধিকাংশ বাড়ি হত একতলা অথবা দু’তলা। কারও তিন বা চারতলা বাড়ি থাকলে তার পাশ দিয়ে যাবার সময় সাধারণ মানুষ উপরদিকে তাকিয়ে মনে মনে বলত, ‘বাব্বা, কী বিশাল বাড়ি’।

দিন পাল্টেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনেক এগিয়ে গেছে। মানুষ এখন বানাচ্ছে আকাশছোঁয়া বাড়ি। আর সেইসব বাড়ির কাছে আগেকার দিনের বড় বাড়িগুলি যেন লিলিপুট। দেশে দেশে এখন আকাশছোঁয়া বাড়ি বানানোর যেন প্রতিযোগিতা চলছে। আজ কোনো দেশ একশতলা বাড়ি বানাচ্ছে তো কাল অন্য আরেকটি দেশ তার চেয়েও উঁচু বাড়ি বানাচ্ছে। এর শেষ কোথায় কে জানে? ভবিষ্যতে দু’শো তলা বাড়িও লিলিপুট হবে কি না কে বলতে পারে? এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আয়ত্ত্ব করতে মানুষকে পেরিয়ে আসতে হয়েছে দীর্ঘ পথ।

আদিম মানুষের ঘরবাড়ি

পৃথিবীতে মানুষ এসেছিল প্রায় কুড়ি লক্ষ বছর আগে। এরা দেখতে আমাদের মত ছিল না। আকারে ছিল অনেক বড়। হাত দুটো ছিল লম্বা- হাঁটুর নীচ পর্যন্ত ঝুলে থাকত। কপালের হাড় ছিল নীচু। সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটত। অনেকটা বড় বানরের মত দেখতে। তবে বুদ্ধি ছিল বানরের চেয়ে কিছুটা বেশি। এই যুগের মানুষকে বলা হয় ‘নিয়ান্ডার্থাল’। এর পরে মানুষ অনেক বদলে গেছে। পরের পর্বের মানুষকে বলা হয় ‘হোমো স্যাপিয়েনস’। আমরা এদেরই ধারা। এদের মগজ আরও উন্নত ছিল। তবে এখনকার মানুষের মত নয়।

আদিম মানুষ ছিল বন্য। পশুদের মতই জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত। এক জঙ্গলের খাবার ফুরিয়ে গেলে অন্য জঙ্গলে চলে যেত। তবে মগজে বুদ্ধি থাকায় সেটাকে কাজে লাগিয়ে সবসময় চেষ্টা করত উন্নত জীবনযাপনের পথ খুঁজে বের করতে। আদিমকালে মানুষের মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই ছিল না হিংস্র পশুর আক্রমণের ভয়, ঝড়-বৃষ্টিতে ভেজার ভয়, হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় কষ্ট পাওয়ার ভয় সবসময় তাদের তাড়া করে বেড়াত। বনে-জঙ্গলে, পাহাড়-পর্বতে ঘুরতে ঘুরতে তারা লক্ষ করল পাহাড়ের গায়ে ছোট, বড় অনেক গুহা আছে। সেখানে থাকলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে যেমন বাঁচা যায় তেমন হিংস্র পশুর আক্রমণ অনেক সহজে মোকাবিলা করা যায়। কারণ তখন চারদিকে দৃষ্টি রাখার বদলে একদিকে দৃষ্টি রাখলেই হয়। অতএব গুহাই হল মানুষের আদিম বাসস্থান।

গুহা কিন্তু মানুষের বাসস্থানের সমস্যা পুরোপুরি মেটাতে পারল না। পার্বত্য এলাকায় গুহা পাওয়া গেলেও সমতলের গভীর জঙ্গলে তো গুহা পাওয়া যায় না? তাহলে তারা থাকবে কোথায়? এছাড়াও মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় গুহার অভাব দেখা দিল। কাজেই তখন সে নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিজেই তৈরি করার কথা ভাবতে শুরু করল। কিন্তু কীভাবে? সে তো শুধু পাথর চেনে। অতএব পাথরকেই তারা বাড়ি তৈরির উপাদান biggantechno02 (Small)হিসেবে প্রথম বেছে নিল। বড় বড় পাথর নীচে দিয়ে তার উপর অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট পাথর সাজিয়ে মানুষ তৈরি করল নকল গুহার মত এক ধরনের আশ্রয়স্থল। এগুলি দেখতে হত উলটানো মৌচাকের মত। ভিতরে ঢোকার জন্য দরজার মত একটা ফোকর থাকত। জানালা-টানালা কিছু থাকত না। ফলে ভিতরে কোনো আলো ঢুকতো না। ফলে বাসার ভিতরে ঢুকলে রাত না দিন কিছুই বোঝা যেত না। রাতে ঘুমানোর সময় হিংস্র পশুর আক্রমণ ঠেকাতে দরজার সামনে একটা বড় পাথরের চাঁই বসিয়ে রাখত। সকালে তা সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসত। এই ধরনের আশ্রয়স্থলকে বলা হয় ‘বি-হাইভ-হাট’। মানুষ দেখল পাথরগুলি গোলাকার না সাজিয়ে যদি চৌকো আকারে সাজানো যায় তাহলে ঘরের ভিতরের জায়গা অনেক বেশি পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে ঘরের biggantechno03 (Small)ছাদ ঢাকার জন্য তারা শিকার করা পশুর দেহের চামড়া বা গাছের বড় বড় পাতা ব্যবহার করতে শুরু করল। এইভাবে মানুষ বাসা বানানোর জন্য পাথর ছাড়াও অন্যান্য উপকরণের ব্যবহার শিখল। মানুষের তৈরি স্থাপত্যের প্রথম পদক্ষেপ।

পাহাড়ের কাছাকাছি যারা থাকত তাদের পক্ষে পাথর দিয়ে বাসা বানানোর সুবিধা ছিল। কিন্তু যারা পাহাড় থেকে অনেক দূরে গভীর জঙ্গলে থাকত তাদের পক্ষে দূর থেকে ভারী পাথর বয়ে নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না। তারা বাসা বানানোর জন্য অন্য উপকরণের কথা ভাবতে শুরু করল। জঙ্গলে গাছ প্রচুর। তাই তারা বাসা বানালো ছোট ছোট গাছ ও গাছের ডাল দিয়ে। মানুষ ততদিনে আগুনের ব্যবহার ও পাথর দিয়ে অস্ত্র বানাতে শিখে গেছে। এই অস্ত্রকেই সে কাজে লাগালো। ঝোপঝাড় পরিস্কার করে, মাটি খুঁড়ে, কেটে আনা গাছগুলো গোলাকার করে পুঁতে দিল। এরপর গাছের মাথাগুলিকে এক জায়গায় টেনে এনে বেঁধে দেওয়া হল। তৈরি হল বাসার কাঠামো। গাছের বড় বড় পাতা বা পশুর চামড়া দিয়ে কাঠামোর গা ঢেকে দিয়ে তৈরি হল নতুন এক ধরনের বাসা। বড় ঝুড়ি উল্টো করে বসিয়ে দিলে যেমন দেখতে হয় এই গোলাকার বাসাগুলি দেখতে তেমনই হল। এক্ষেত্রেও বাসায় বা ঘরে ঢোকা বা বেরোনোর জন্য শুধু একটি দরজা থাকত, কোনো জানালা থাকতো না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা হিংস্র পশুর আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচানোই তখন তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। জানালার ধারণা তখনও তাদের মাথায় আসে নি। যাই হোক, অন্য এক উপায়ে বাসা তৈরি করতে তো মানুষ শিখল?

এই প্রসঙ্গে অন্য আরেক ধরনের বাসার কথা বলি। পশু শিকার করে মানুষ তার মাংস খেত। চামড়াটা শুকিয়ে নিয়ে নিজেদের গা ঢাকার কাজে লাগাত। হাড়গোড়গুলো ফেলে দিত। এক সময় তারা লক্ষ করলো যে এই হাড়গোড়গুলো জলে ভিজলেও সহজে নষ্ট হয় না। মাথায় এল বাসা বানানোর অন্য এক চিন্তা। শিকার করা পশুর হাড়, শিং, চামড়া, গাছের ডাল ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হল নতুন এক ধরনের বাসা। এগুলিও দেখতে উল্টিয়ে বসানো গোলাকার ঝুড়ির মত হত। মস্কোর ইতিহাসের জাদুঘরে এরকম একটা ঘরের ছাঁচ আছে।       

প্রথম দিকে গোলাকার বাসা বানানোর প্রবণতা বেশি ছিল। পরে অবশ্য বর্গাকার বা আয়তাকার বাসা বানানোর দিকে মানুষ বেশি ঝুঁকে পড়ে। এসব ক্ষেত্রে বাসার উপরের ছাউনিটা অনেক বড় করতে হয়। প্রথমে একচালা পরে দোচালা, চারচালার প্রবর্তন হয়। ঘরের দেওয়ালও অনেক বড় হওয়ায় সেগুলো শক্তপোক্ত করার জন্য মাটির প্রলেপ লাগানো হয়। এধরনের বাড়ি এখনও গ্রামেগঞ্জে দেখতে পাওয়া যায়।

জল ছাড়া তো বাঁচা যায় না। তাই মানুষ চেষ্টা করত কাছাকাছি কোনো জলের উৎস আছে এমন জায়গায় থাকতে। তবে শিকার ফুরিয়ে গেলে অন্যত্র চলে যেত। কিছু মানুষ লক্ষ করল বড় বড় জলাশয়ে মাছ পাওয়া যায় প্রচুর। ডাঙার অন্যান্য শিকারের মত তা চট করে ফুরিয়ে যায় না। দীর্ঘদিন এক জায়গায় থাকা যায়। যাযাবর জীবন ছেড়ে স্থায়ী বসবাসের ভাবনা মানুষের মাথায় এল। এরা হ্রদের জলের মধ্যে বড় বড় কাঠের গুঁড়ি পুঁতে তার উপর ঘর বানালো।     

নিওলিথিক আমলের মানুষ কৃষিকাজ জানত। এরা সাধারণত মাটির ঘর বানিয়ে বসবাস করত। এরা দল বেঁধে থাকত। ফলে গ্রামের ধারণা তখন এসে গিয়েছিল। এই সময়ে হ্রদের কাছাকাছি যারা থাকত তারা জলের উপর কাঠের বাসা বানাত। এই হ্রদবাসীরা কর্মঠ ও কর্মকুশল জাতি ছিল। এরা মাছ শিকারের পাশাপাশি পশু পালনও করত। 1851-54  সালের শীতকালে জুরিক হ্রদের জল অস্বাভাবিক কমে যায়। সেই সময় এই হ্রদের তীরে অপ্রত্যাশিতভাবে খুঁজে পাওয়া যায় পুরো একটি প্রাগৈতিহাসিক নিওলিথিক গ্রামের ধ্বংসাবশেষ। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই প্রাগৈতিহাসিক আমলের সুইস্‌ হ্রদবাসীরা জলের উপর বাসা বানাতে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। সুইজারল্যান্ডের নিউ শাতেল হ্রদে প্রায় পঞ্চাশটা এরকম হ্রদবসতির নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গেছে। আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, নিউগিনি এলাকাতেও নিওলিথিক হ্রদবাসীদের এই ধরনের বাসা বানানোর কয়েকটি নিদর্শন পাওয়া গেছে।biggantechno05 (Small)


স্থায়ী ঘরবাড়ি   

আদিম যুগের মানুষেরা ছিল যাযাবর। যেখানে যতদিন খাবার পাওয়া যেত ততদিন সেখানেই থাকত। খাবার ফুরিয়ে গেলে অন্যত্র চলে যেত। ফেলে রেখে যেত লতাপাতা দিয়ে বনানো বাসা। নতুন জায়গায় আবার তারা নতুন বাসা বানাত। আগের বাসাটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে থাকতে কালের নিয়মে নষ্ট হয়ে যেত। চাষবাস শেখার পর মানুষের জীবনের ধারাটাই পাল্টে গেল। যাযাবর জীবন ছেড়ে তারা স্থায়ী বসবাসের কথা ভাবতে শুরু করল। ততদিনে তারা আরও অনেকটা সভ্য হয়েছে। আগুনের ব্যবহার শিখেছে। গোরু, ঘোড়ার মত পশুকে পোষ মানাতে পেরেছে। সমাজবদ্ধ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

  স্থায়ী বসবাসের জন্য দরকার শক্তপোক্ত বাসা। লতাপাতা দিয়ে বানানো বাসা বেশিদিন টেঁকে না। ঝড়জলে তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। কীভাবে বাসা টেঁকসই করা যায়, ভাবতে biggantechno06 (Small)ভাবতে একদিন মানুষ গাছের ডালপালা দিয়ে বানানো বাসার দেওয়ালে মাটি লেপে দিল। বাঃ, ঝড়জলে তো বাসা তাড়াতাড়ি নষ্ট হচ্ছে না? তাহলে মাটি দিয়ে বানানো বাসা আরও অনেক টেঁকসই হবে? শুরু হল মাটি দিয়ে বাসা তৈরি। ছাদের ছাউনি দিতে গাছের পাতার বদলে ব্যবহার হল খড়। মানুষ তখন ধান ফলাতে শিখে গেছে। জল যাতে তাড়াতাড়ি গড়িয়ে নীচে পড়ে যেতে পারে তাই চালে ঢাল রাখা হল। প্রথমে একদিকে; হল একচালা ঘর। পরে দু’দিকে বা চারদিকে ঢাল রেখে মানুষ তৈরি করল দোচালা বা চারচালা ঘর। দেওয়াল মাটির হওয়ায় ঝড়জলের সময় জলের ঝাপটা বা শীতকালে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ঘরে ঢুকতে পারল না। এধরনের বাড়ি এখনও আমরা গ্রামেগঞ্জে দেখতে পাই। সাধারণভাবে এগুলিকে আমরা কুঁড়ে ঘর বলে থাকি। এই ধরনের মাটির বাড়ি শুধু যে একতলা হয় তা নয়; দোতলাও হয়। ঘরের ভিতরে যাতে আলো, বাতাস খেলতে পারে তাই জানালাও বসানো হল। এভাবেই শুরু হল মানুষের স্থায়ী বাসা বানানোর প্রথম প্রচেষ্টা।

ধীরে ধীরে মানুষ মাটির আরও ব্যবহার শিখল। হাঁড়ি-কলসি বানাতে শিখল। ইট তৈরির কলাকৌশল শিখল। কিছু ধাতুর ব্যবহারও শিখে ফেলল। তা দিয়ে তারা নানারকম যন্ত্রপাতি বানাল। এবার মাটির বদলে ইট দিয়ে বাড়ি তৈরির কায়দা রপ্ত করে ফেলল। প্রথম প্রথম কাঁচা ইট ব্যবহার হত। পরে পোড়া ইটের ব্যবহার শিখল। এতে বাড়ি আরও টেঁকসই হল। ইতিমধ্যে সামাজিক জীবনেও পরিবর্তন এল। এতদিন ছিল গ্রামীণ জীবন। বন-জঙ্গল কেটে মানুষ এবার নগর পত্তন করল। প্রাচীন ভারতে এর নিদর্শন পাওয়া গেছে সিন্ধু সভ্যতায়। সে কথায় পরে আসছি। ইটের ব্যবহার শেখার পর উঁচু বাড়ি তৈরির প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়তে লাগল। একতলা, দোতলা বাড়ি তো ছিলই; সেইসঙ্গে তৈরি হতে লাগল প্রাসাদ, দুর্গ, মন্দির ইত্যাদি। মানুষ আগের তুলনায় অনেক সভ্য হল ঠিকই তবে পরস্পর হানাহানি কমলো না। গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে লড়াই, রাজায় রাজায় যুদ্ধ লেগেই থাকত। নিজেদের সুরক্ষার জন্যই তৈরি করতে হয়েছিল দুর্গ, নানারকম অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি। সাধারণ ঘরবাড়ির তুলনায় দুর্গ, মন্দির, রাজাদের থাকার প্রাসাদ হত অনেক বেশি উঁচু ও বড়। এইভাবেই মানুষ আকাশের দিকে হাত বাড়াল তার বাসস্থানকে বা স্থাপত্যকে ক্রমশ উঁচু এবং গরিমাময় করে তোলার জন্য।

ভারতে প্রাচীন নগরকেন্দ্রিক সভ্যতাঃ মহেঞ্জোদরো-হরপ্পা

মানুষের সামাজিক জীবন তখন অনেকটাই পাল্টে গিয়েছিল। গুহা ছেড়ে সে যেমন ঘরবাড়ি বানাতে শিখেছিল তেমন গ্রামীণ জীবনের পাশাপাশি সে নগরকেন্দ্রিক জীবন গড়ে তুলতে শুরু করেছিল। প্রাচীন ভারতে নগরকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থার নিদর্শন পাওয়া গেছে সিন্ধু সভ্যতায়। প্রাচীন সভ্যতাগুলি গড়ে উঠেছিল মূলত নদীকে কেন্দ্র করে। ভারতে যেমন সিন্ধু নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতা তেমন নীল নদের তীরে মিশরীয়, টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় মেসোপটেমিয়া ইত্যাদি সভ্যতাগুলি biggantechno07 (Small)গড়ে উঠেছিল। মহেঞ্জোদরো-হরপ্পায় দুটি উন্নত ও পরিকল্পিত নগরের ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছে। এখানকার রাস্তাগুলি ছিল সোজা, লম্বা ও চওড়া। একটা রাস্তার সঙ্গে আর একটা রাস্তার সংযোগ হত সমকোণে। পোড়া ইটের তৈরি এক কামরা থেকে চার কামরার ঘরবাড়িগুলি এক তলা থেকে তিন তলা পর্যন্ত উঁচু হত। উপরে ওঠার সিঁড়ি থাকত। মহেঞ্জোদরোতে একটা বিরাট স্নানাগারের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া দেছে। এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ছিল যথাক্রমে 180 ফুট ও 108 ফুট। হরপ্পাতে 169 ফুট × 135 ফুট মাপের একটা বিশাল আকারের ঘর পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান এই ঘরে শস্য মজুত করে রাখা হত। সিন্ধু সভ্যতার মানুষ লোহার ব্যবহার না জানলেও ব্রোঞ্জের ব্যবহার জানতো।

সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস হয় আনুমানিক 1500-1400 খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এরপরে শুরু হয় আর্য সভ্যতা। এই সভ্যতা ছিল মূলত গ্রামীণ। তাই এই সময়ে বসবাসের জন্য উঁচু বাড়ি তৈরির তেমন চেষ্টা ছিল না। বাড়ি তৈরির উপাদান হিসেবে ইট, কাঠ, বাঁশ, মাটি ইত্যাদি্র ব্যবহার বেশি ছিল। পাথরের ব্যবহার শুরু হয়েছিল আরও কিছুটা পরে।

ধর্মীয় স্থাপত্যে পাথরের ব্যবহার

শুধু আমাদের দেশেই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধর্ম প্রাচীন স্থাপত্যের উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। সু-উচ্চ মন্দির, মসজিদ, গির্জা, চৈত্য, বিহার ইত্যাদি স্থাপত্যগুলি তারই নিদর্শন। ধর্ম আলোচনার জন্য বৌদ্ধরা নির্মাণ করতেন ‘চৈত্য’। চৈত্য দু’ধরনের হত- গৃহ-চৈত্য ও গুহা-চৈত্য। গৃহ-চৈত্য হত বড় হল ঘরের মত যেখানে অনেকে একসঙ্গে বসে ধর্ম আলোচনা করতে পারতেন। আর গুহা চৈত্য তৈরি হত পাহাড়ের পাথর কেটে। যেমন, অজন্তা, কার্লি ইত্যাদি। বৌদ্ধরা ধর্ম ও শিক্ষা প্রসারের জন্য যেসব আবাসিক বিদ্যায়তন biggantechno07 (Small)তৈরি করতেন সেগুলিকে বলা হত ‘বিহার’। পোড়া ইটের তৈরি এরকমই এক বিহার ছিল নালন্দাতে যা ‘নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে খ্যাত।

চৈত্য ও বিহার ছাড়াও আরও তিনটি নিদর্শন আছে বৌদ্ধ স্থাপত্যের। এগুলি হল স্তম্ভ, স্তূপ এবং বেষ্টনী। স্তম্ভ হল একধরনের উঁচু থাম। এর গায়ে বৌদ্ধ ধর্মের বানী খোদিত করা হত। এই থামগুলি সাধারণত ইট বা পাথর দিয়ে তৈরি হত। স্তূপ দেখতে অর্ধগোলাকার। সাধারণত ইট বা মাটি দিয়ে তৈরি হত। ভিতরটা হত নিরেট। এর চারদিকে ঘিরে থাকত পাথরের তৈরি বেষ্টনী। চারদিকে চারটি প্রবেশ পথে চারটি পাথরের তৈরি সু-সজ্জিত তোরণ থাকত। স্তূপের মাথায় থাকত একটি ছাতা। তার নীচে রাখা হত একটি পেটিকা। কথিত আছে এই পেটিকার মধ্যে পুরে রাখা হত গৌতম বুদ্ধের দেহের হাড়ের টুকরো বা নখ বা তাঁর ব্যবহৃত কোনো-দ্রব্যসামগ্রী।

মন্দিরঃ প্রাচীন ভারতে উঁচু স্থাপত্যের নিদর্শন

সারা ভারতে অসংখ্য মন্দির ছড়িয়ে আছে। সাধারণ ঘরবাড়ি খুব উঁচু না হলেও মন্দিরগুলি হত খুবই উঁচু এবং সেগুলি তৈরি হত মূলত পাথর দিয়ে। ইটের তৈরি মন্দির যে ছিল না, তা নয়। তবে সেগুলি খুব উঁচু হত না। প্রথমদিকে পাথরের মন্দিরও ছোট হত। দেখতেও তেমন সুন্দর হত না। খন্ড খন্ড পাথর একটার উপর একটা বসিয়ে মন্দির তৈরি হত।biggantechno08 (Small) 350 খ্রিস্টাব্দে তৈরি মধ্যপ্রদেশের তিগাওয়ার ছোট্ট মন্দিরটি তারই নিদর্শন। সম্ভবত এটাই সবচেয়ে পুরোনো মন্দির।

গর্ভগৃহের উপরের ছাদকে বলা হয় ‘শিখর’। সময়ের সাথে সাথে শিখর ক্রমশ উঁচু হতে থাকে। খাজুরাহো, ওড়িশার কোনার্ক, জগন্নাথ, লিঙ্গরাজ, রাজারানি প্রভৃতি মন্দিরগুলি শুধু সুউচ্চই নয়, স্থাপত্যের এক ধ্রুপদী রূপ। ভারতবর্ষে এমন সুন্দর সুষম বিন্যাসের মন্দির খুব কমই আছে।

দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলি উত্তর ভারতের মন্দিরগুলির মত দেখতে নয়। এগুলির নির্মাণ-শৈলী আলাদা। এখানকার বিখ্যাত মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম কাঞ্চির কৈলাসনাথ মন্দির, বৈকুন্ঠ পেরুমল মন্দির, তাঞ্জোরের শিবমন্দির, ত্রিমূর্তি মন্দির, মাদুরাই-এর মীনাক্ষী মন্দির ইত্যাদি। তাঞ্জোরের শিবমন্দিরের শিখর 190 ফুট উঁচু। প্রথমদিকে মন্দিরের প্রবেশপথে কোনো তোরণ তৈরির প্রথা ছিল না। পরবর্তীকালে তা শুরু হয়। এগুলিকে বলা হয় গোপুরম। এগুলি খুব উঁচু। এগুলির ভিতরে কোনো ঘর নেই। পুরোটাই নিরেট। মাথায় অর্ধবৃত্তাকার লম্বাটে ছাদের উপর ছুঁচলো শিখা দেখতে পাওয়া যায়। কয়েকটি গোপুরম আছে যেগুলি প্রায় ন-তলা বাড়ির সমান উঁচু। এগুলিকে বহুতল তৈরির প্রথম পদক্ষেপ বলা যেতে পারে।

ভারতে মুসলিম ও পাশ্চাত্য স্থাপত্য

মুসলিম আমলে স্থাপত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল খিলান ও গম্বুজ। পরবর্তীকালে এই স্থাপত্যের সঙ্গে হিন্দু স্থাপত্যের কিছু উপাদানের মিলন ঘটে। এই যুগে সবচেয়ে চমকপ্রদ স্থাপত্য হল তাজমহল যা সপ্তম আশ্চর্যের একটি।

ফরাসি, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, ইংরেজ প্রভৃতি দেশের বণিকদের ভারতে যাতায়াত শুরু হওয়ার পর তাদের হাত ধরে এদেশে পাশ্চাত্য স্থাপত্যের প্রবেশ ঘটে। তবে এদের কারুরই স্থাপত্য তেমন উচ্চমানের ছিল না। মূলত উঁচু গির্জা তৈরিতেই এদের বেশি আগ্রহ ছিল। গোয়াতে পর্তুগিজদের তৈরি কয়েকটি দর্শনীয় গির্জা আছে। ভারতবর্ষে ইংরেজদের শাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পর তাদের প্রথম রাজধানী ছিল কলকাতা। তাই কলকাতাতেই তাদের দেশীয় স্থাপত্যের অনুকরণে গির্জা, আদালত, রাইটার্স বিল্ডিং, জিপিও, গভর্নরের বাড়ি, হাইকোর্ট, টাউন হল, ইত্যাদি গড়ে ওঠে। জমিদার ও ধনী ব্যবসায়ীদের বসত ও বাগান বাড়িগুলি ছিল প্রাসাদোপম। তাই কলকাতাকে বলা হত প্রাসাদনগরী।

বিদেশে প্রাচীন স্থাপত্য

biggantechno09 (Small)বিদেশে প্রাচীন স্থাপত্যগুলির মধ্যে অন্যতম মিশরের ‘পিরামিড’। এই অতিকায় পিরামিডগুলি আজও বিশ্বের বিস্ময়। সেই সঙ্গে বিশাল স্ফিংক্‌স আর মন্দিরগুলিও সমান বিস্ময়কর। বিরাট আকারের চিওপ্‌সের পিরামিডের ভূমি 756 ফুট বাহু বিশিষ্ট একটি বর্গ ক্ষেত্র। এটি 480 ফুট অর্থাৎ, প্রায় 48 তলা বাড়ির সমান উঁচু। আধুনিক যুগে এত উঁচু বাড়িকে স্কাইস্ক্রেপার বা বহুতল বালা হয়। কিন্তু পিরামিড অত উঁচু হয়েও বহুতলের মর্যাদা পাবে না। এর কারণ এর ভিতরে ঘর আছে মাত্র তিনটি—একটি ফারাওয়ের ঘর, একটি রানির ঘর আর মাটির নীচে আরেকটি ঘর। এই ঘরে সম্ভবত মৃত ফারাও ও রানির উদ্দেশ্যে কিছু ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র রাখা হত। পিরামিডের বাকি অংশ নিরেট। যে সময়ে এই প্রকান্ড স্থাপত্যগুলি তৈরি হয়েছিল সেই সময়ে আধুনিক যুগের মত ক্রেনের ব্যবহার ছিল না। অত বড় বড় পাথর অত উঁচুতে কীভাবে তুলেছিল সেটা একটা বিস্ময়। বিশেষজ্ঞদের অনুমান মাটি বা বালি দিয়ে নত তলের মত নীচু থেকে ক্রমশ উঁচু ঢালু রাস্তা তৈরি করে পাথরের চাঁইগুলি অনেকে মিলে ঠেলে ঠেলে উপরে তুলতো। প্রাচীনকালে পিরামিডই ছিল সবচেয়ে উঁচু স্থাপত্য।

টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস এই দুই নদীর মাঝখানের ভূভাগে গড়ে উঠেছিল এক প্রাচীন সভ্যতা। নাম তার মেসোপটেমিয়া। বর্তমান নাম ইরাক। এখানকার প্রাচীন উঁচু স্থাপত্যের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় মন্দিরের কথা। মন্দিরগুলি তৈরি হত, হয় পিরামিডের আকারে নয়তো পাহাড়ের আকারে। জিগুরাত ছিল এদের মন্দিরের নাম। এগুলি বেশ উঁচু হত। যেহেতু মেসোপটেমিয়ার দু-দিক দিয়ে দুটি  নদী বয়ে গেছে তাই এখানে মাটি পাওয়া যেত অঢেল। এদেশের মানুষদের ইট তৈরির প্রযুক্তি জানা ছিল। তাই এখানকার ঘর-বাড়ি-প্রাসাদ-মন্দির সবই তৈরি হত পোড়া বা কাঁচা ইট দিয়ে। ‘ঝুলন্ত বাগান’ মেসোপটেমিয়ার এক বিস্ময়কর স্থাপত্য। এখানকার উঁচু ও বড় বাড়িগুলিতে থাকতো লম্বা লম্বা বারান্দা। তাতে তৈরি হত বাগান। দেখে মনে হত বাগানগুলি যেন ঝুলছে।

ইউরোপ ও এশিয়ার প্রায় সংযোগস্থলে অবস্থিত গ্রিস উন্নত প্রাচীন সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। তিনদিক সমুদ্রে ঘেরা এই দেশে উঁচু বা বড় আকারের কোনো প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন নেই বললেই চলে। ছোট আকারের হলেও সেসময়কার বাড়িঘর বা মন্দিরের শিল্প-সৌন্দর্য অতুলনীয়। মন্দিরগুলি তৈরি হত মূলত শ্বেতপাথর দিয়ে। পৃথিবী বিখ্যাত পার্থেনান মন্দিরটি (449-440 খ্রি.পূ.) দেবী অ্যাথেনার নামে। এই দেবীর নামেই শহরের নাম হয়েছে অ্যাথেন্স। পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত এই মন্দিরটি লম্বায় 228 ফুট এবং চওড়ায় 101 ফুট 4 ইঞ্চি। এই মন্দিরটির কাছাকাছি অ্যাথেনা দেবীর নামে আরও একটি মন্দির ছিল। তার নাম অ্যারেকথিওন (421-405 খ্রি.পূ.) এছাড়াও শিল্প-সৌন্দর্যের বিখ্যাত অন্যান্য মন্দিরগুলি হল অ্যাপোলো, আটেমিস, ইলিজাস, থোজিয়ান ইত্যাদি।

এতদিন বাড়িঘর, মন্দির, পিরামিড ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হত হয় পাথর নতুবা ইট। স্থাপত্য শিল্পে রোমানরাই প্রথম কংক্রিটের ব্যবহার শুরু করে। ইট বা পাথরের কুচি, চুন এবং পোজোলানা (আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গে বেরিয়ে আসা এক ধরনের মাটি) দিয়ে তৈরি কংক্রিটের সাহায্যে এরা মস্ত বড় বড় ঘরবাড়ি তৈরি করতে সমর্থ হল। 25 খ্রিস্ট পূর্বাব্দে তৈরি রোমের প্যানথিওন মন্দিরের সামনের দিকটা আয়তাকার হলেও পিছনের biggantechno10 (Small)দিকটা হত গোলাকার। এই গোলাকার অংশটিই মন্দির। মাথাটা হত গম্বুজাকৃতির। আয়তাকার অংশটির মাপ প্রায় 110 ফুট × 85 ফুট এবং গোলাকার বা বৃত্তাকার অংশটির ব্যাস 142 ফুট  6 ইঞ্চি। থামগুলির উচ্চতা 46 ফুট 5 ইঞ্চির মত। গম্বুজাকৃতি মাথার উপরে 27 ফুট ব্যাসের একটি খোলা অংশ দিয়ে ভিতরে আলো ঢোকার ব্যবস্থা করা হত।

 দু-লক্ষ পঁচাশি হাজার বর্গফুট আয়তনের (750 ফুট × 380 ফুট)  কারকাল্যা স্নানাগারে প্রায় 1600 মানুষের স্নানের ব্যবস্থা ছিল। রোমের এই স্নানাগারটি প্রাসাদসম যে অট্টালিকায় ছিল তার মাঝখানে 183 ফুট × 79 ফুট মাপের একটি বিরাট হলঘর ছিল। কংক্রিটের তৈরি এই ছাদের উচ্চতা মেঝে থেকে 108 ফুট ছিল।

বিশাল আকারের স্নানাগার রোমে আরও অনেকগুলি ছিল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্নানাগারগুলি হল টাইটাস, ফোরাম, পম্পেইয়ের স্টেবিয়ান, অ্যাগ্রিপ্যা ইত্যাদি।

biggantechno11 (Small)রোমের আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য হল অ্যামফিথিয়েটার। এই ইনডোর স্টেডিয়ামগুলিতে নানা ধরনের খেলা হত। এমনকী বাঘ-সিংহের মত হিংস্র পশুর সঙ্গে মানুষের লড়াইও হত। রোমের বিখ্যাত কলোসিয়াম এরকমই একটি ইন্ডোর স্টেডিয়াম। চার তলা সমান উঁচু কলোসিয়ামে দর্শকাসন ছিল পঞ্চাশ হাজারের মত। উপবৃত্ত আকারের এই কলোসিয়ামটি লম্বার দিকে 620 ফুট ও চওড়ার দিকে 513 ফুটের মত। এর ভিতরের এরিনা, অর্থাৎ খেলার জায়গাটি দৈর্ঘ্যে 287 ফুট এবং প্রস্থে 150 ফুট। রোমে গেলে এখনও একে দেখা যাবে। তবে কোনো খেলাধুলা এখন আর এখানে হয় না। রোমের বাইরে পম্পেই ও ভেরোনাতে এই ধরনের অ্যামপিথিয়েটার আছে।

খ্রিস্টপূর্ব যুগের স্থাপত্য শিল্পের ধারা যেন অনেকটাই পালটে গেল খ্রিস্ট-উত্তর যুগে চতুর্থ শতক থেকে নবম শতক পর্যন্ত গির্জা স্থাপত্যেরই প্রাধান্য ছিল। নবম শতকের পর থেকে গির্জার সঙ্গে ঘন্টাঘর (বেল-টাওয়ার) নির্মাণ শুরু হয়। এগুলি বেশ উঁচু হত। যেমন ইতালির পিসাতে হেলে-পড়া ঘন্টাঘরটি প্রায় আটতলা সমান উঁচু। দ্বাদশ শতাব্দী থেকে ইউরোপে গির্জার পাশাপাশি বড় বড় প্রাসাদ ও দুর্গ গথিক স্থাপত্যের রীতিতে তৈরি হতে শুরু করে। এরকম কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রাসাদ ও দুর্গ হল- ইংল্যান্ডের সলিসবেরি ক্যাথিড্রাল, ক্যান্টারবেরি ক্যাথিড্রাল, পিটার বরো ক্যাথিড্রাল, ইয়র্ক মিনিস্টার, ডিল ক্যাসেল, স্টোকাসে ক্যাসেল, টাটারশ্যাল ক্যাসেল ইত্যাদি। কলকাতা হাইকোর্ট ও সেইন্ট পল্‌স গির্জা এই রীতিতে তৈরি।

আধুনিক স্থাপত্য- আকাশছোঁয়া বাড়ি

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ঘটেছে শিল্প-বিপ্লব। এর পরেই সামাজিক জীবনে এসেছে এক বিরাট পরিবর্তন। কলকারখানাকে ঘিরে গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক শহর। কৃষিভিত্তিক গ্রাম্যজীবন ছেড়ে মানুষ দ্রুত প্রবেশ করে শহর-কেন্দ্রিক যন্ত্রসভ্যতার যুগে। ফলে একই জায়গায় বহু লোকের বাসস্থানের প্রয়োজন দেখা দিল। একেই কলকারখানার জন্য প্রয়োজন প্রচুর জমি, এরপরে বিশাল এলাকা জুড়ে যদি বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হয় তাহলে অত জমি পাওয়া যাবে কোথায়? পৃথিবীতে যে হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে সকলের বাসস্থানের প্রয়োজন মেটাতে বনাঞ্চল বা কৃষিজমির দিকে হাত বাড়াতে হবে। কৃষিজমি কমে গেলে মানুষের অন্ন জুটবে কোথা থেকে? আর বনাঞ্চল ধ্বংস হলে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা হবে তো? তাহলে উপায় কী? সমুদ্রে যদি বাসস্থান তৈরি করা যায় তাহলে সমস্যার কিছু সমাধান হতে পারে। কোনো কোনো দেশে সমুদ্রে বা নদীতে হাউসবোটে থাকার প্রচলন আছে ঠিকই, তবে তা ভবিষ্যতের সমাধান সূত্র হতে পারে না। ভবিষ্যতে সমুদ্রের বুকে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেছে এর মধ্যেই। তবে সেই প্রযুক্তি আয়ত্ত্ব করার আগেই মানুষ অন্য একটি প্রযুক্তি আয়ত্ত্ব করে ফেলেছিল। সেটা হল ‘রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট’(R.C.C.)প্রযুক্তি। এটা কী ধরনের প্রযুক্তি? মানুষ দেখল কংক্রিটের মধ্যে লোহার দন্ড ঢুকিয়ে দিলে কাঠামোয় যেমন জো্র বাড়ে তেমন টেকেও বেশিদিন।

কংক্রিট আবিষ্কারের আগে দোতলা বড়জোর তিনতলার বেশি উঁচু বাড়ি বানানো সম্ভব হত না। রোমান আমলে এই বস্তুটির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর আগের চেয়ে উঁচু স্থাপত্য বা ঘরবাড়ি তৈরি সম্ভব হলেও তা পিরামিডের উচ্চতাকে কখনই ছাপিয়ে যেতে পারেনি। কংক্রিটের সঙ্গে লোহার বা ইস্পাতের হাত ধরাধরির পরেই স্থাপত্যই হোক বা মাথা গোজার ঠাই হোক তা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখি হতে থাকে। কারণ আকাশের তো কোনো সীমারেখা নেই? সেইসঙ্গে উঁচু স্থাপত্য হিসাবে পিরামিডের চার-সাড়ে চার হাজার বছরের গৌরব ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

উনবিংশ শতাব্দী থেকেই বহুতল বাড়ির চাহিদা বাড়তে থাকে। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এর উচ্চতাও ক্রমশ বাড়তে থাকে। দশ-বারো তলা বাড়ি বানিয়েই মানুষ থেমে গেল না। আরও আরও উঁচু বাড়ি চাই। একটি গ্রামে বা ছোটখাট শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বাস করা মানুষদের যদি একটা বাড়িতে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তাহলে মন্দ কী? তাহলে অনেকটা জমি বাঁচানো যায়। 1854 সালে আমেরিকান প্রযুক্তি বিজ্ঞানী এলিমা গ্রেভস ওটিস আবিষ্কার করলেন লিফ্‌ট (lift)। এরপরে এল চলমান সিঁড়ি (escalator)। ব্যাস, মানুষকে আর পায় কে?

বিংশ শতাব্দী থেকেই দেশে দেশে উঁচু বাড়ি তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। এখন আর মানুষ পঞ্চাশ বা একশ তলায় সন্তুষ্ট নয়। সে চায় আরও উঁচু বাড়ি- আকাশছোঁয়া বাড়ি। খুব উঁচু বাড়ি বানানোর জন্য শক্ত ভিতের প্রয়োজন। এরজন্য দরকার ‘পাইলিং’। এটা কী বস্তু? বাড়ি যাতে বসে না যায় সেজন্য ভিত্তিদন্ড খুব ভারী কোনো ওজনের সাহায্যে হাতুড়ির মত ঠুকে ঠুকে মাটির অনেক নীচে পর্যন্ত ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। উচ্চতার বিচারে আকাশছোঁয়া বাড়িগুলি পিরামিডকে হারিয়ে দিলেও গঠন কাঠামো অনেকটা পিরামিডের মতই রাখা হয়। অর্থাৎ ভূমি যথেষ্ট চওড়া থাকে, তারপর কাঠামো যত উপরে উঠতে থাকে তত সরু হতে থাকে।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে 300 মিটারের (1000 ফুট) বেশি উঁচু বহু বাড়ি। আকাশছোঁয়া বাড়ির পথ চলা শুরু হয়েছিল 1871 সালে। চিকাগো (Chicago) শহর এক বিধ্বংসী অগ্নিকান্ডে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। নতুন করে শহর গড়ে তোলার সময় মাথা তুলে দাঁড়ালো 42 মিটার (138 ফুট) উঁচু একটি বাড়ি (হোম ইনসিওরেন্স বিল্ডিং)। biggantechno12 (Small)দশ তলা এই বাড়িটিতে 1890 সালে আরও দুটি তলা যোগ হয়। আধুনিক আকাশছোঁয়া বাড়িগুলির পাশে এই বাড়িটি লিলিপুট ঠিকই তবুও এই বাড়িটিই প্রথম উঁচু বা বহুতল বাড়ি হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সেসময় এটাই ছিল মানুষের নির্মাণ বিদ্যার  (construction engineering) বড় সাফল্য। বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই বাড়ির তলা যেমন বাড়তে থাকে ছাদও তেমন উপরে উঠতে থাকে। অবশেষে একসময় তা আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। শুরু হয় আকাশছোঁয়া বাড়ির যুগ। 1920 সালে 241 মিটার (792 ফুট) লম্বা 55 তলার উলওয়ার্থ বিল্ডিং (Woolworth Building) তৈরি হল নিউ ইয়র্ক শহরে। না, এরপরে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয় নি। মাত্র আট বছর পরেই অর্থাৎ, 1928 সালে আমেরিকায় তৈরি হল 77 তলার ক্রিসলার বিল্ডিং (Chrysler Building)। বাড়িটি 319.5 মিটার (1048 ফুট) লম্বা। 1930 সালে অর্থাৎ দু-বছর পরেই এখানেই তৈরি হল দ্য এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং (The  Empire State Building)। 102 তলা এই বাড়িটি 381 মিটার (1,252 ফুট) উঁচু। 35-40 বছর বাদে তৈরি হল দ্য ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার (The World Trade Centre)। আমেরিকাবাসীদের গর্বের এই বাড়িটি তৈরি হয়েছিল 1966-1970  সালের মধ্যে। 110  তলা এই বাড়িটি  412 মিটার  (1,353 ফুট)  উঁচু। বাড়িটি সন্ত্রাসবাদীদের হামলায় 2001 সালের 11 সেপ্টেম্বর ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৭৩ সালে দ্য সিয়ারস টাওয়ার নামে আরেকটি বাড়ি তৈরি হয়েছিল। বাড়িটি ১১০ তলার হলেও দ্য ওয়ার্ল্ড ট্রেড-এর থেকে উঁচু (৪৪২ মিটার/১,৪৫০ ফুট) ছিল। বাড়িটির বর্তমান নাম উইলিস টাওয়ার।

প্রথম দিকে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলিতেই আকাশছোঁয়া বাড়ি তৈরি হত। প্রথম দশটি উঁচু বাড়ি আমেরিকাতেই তৈরি হয়েছিল। বাড়িগুলির অধিকাংশই ছিল চিকাগো এবং নিউইয়র্ক শহরে। 1998 সাল পর্যন্ত দ্য সিয়ার্স টাওয়ারই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বাড়ি। 1999 সালের অগাস্ট মাসে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়ে মালয়সিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে মাথা তুলে দাঁড়ালো পেত্রোনাস টাওয়ার (Petronas Tower)। আর এরই সাথে সবচেয়ে উঁচু বাড়ির শিরোপা চলে এল এশিয়ায়। একই রকম দেখতে দুটি বাড়ির প্রত্যেকটি 452 মিটার (1,482 ফুট) উঁচু। 88 তলার এই বাড়ি দুটিকে 44 তলায় একটি সেতুর সাহায্যে যুক্ত করা হয়েছে। পেত্রোনাস টাওয়ার-এর সবচেয়ে উঁচুতে আকাশ ছোঁয়ার রেকর্ড পাঁচ বছর পরে ভেঙে দিল তাইপেই-101 (Taipei-101)।  তাইওয়ানের এই 101 তলা বাড়িটি 509 মিটার (1,670 ফুট) উঁচু। দেশে দেশে তখন শুরু হয়ে গেছে আকাশছোঁয়া বাড়ি তৈরির প্রতিযোগিতা। তাই সবচেয়ে লম্বা বাড়ির তকমা তাইপেই-101 এর ঝুলিতে বেশিদিন রইল না। ছয় বছর পরেই সবকটি আকাশছোঁয়া বাড়ির গৌরব ম্লান করে দিয়ে দুবাইয়ে মাথা তুলে দাঁড়ালো বার্জ খলিফা বা বুর্জ খলিফা (Burj Khalifa) স্কাইস্ক্রেপার। 160 তলারও বেশি উঁচু এই বাড়িটি আকাশকে আলিঙ্গন করে যেন বলতে চাইছে, ‘হে বিশ্ববাসী, দেখ স্থাপত্য-নির্মাণ শিল্পের সর্বোত্তম নিদর্শন’। সত্যই 828 মিটার (2,717 ফুট) উঁচু এই বাড়িটি বিশ্বের এক নয়া বিস্ময়। সে সময় বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল যে এর চেয়ে উঁচু বাড়ি আর তৈরি করা সম্ভব নয়। সেই ধারণা অচিরেই ভুল প্রমাণিত হতে চলেছে। পৃথিবীর মানুষ খুব শীঘ্রই দেখতে পাবে ‘স্কাই সিটি’ (Sky City) ও ‘কিংডম টাওয়ার’ (Kingdom Tower) নামে দুটি আকাশছোঁয়া বাড়ি। প্রথমটি চিনের হুয়াং (Huang) প্রদেশে তৈরি হবে, আর দ্বিতীয়টির নির্মাণ-কাজ সৌদি আরবের জেড্ডা (Jeddah) শহরে 2013 সালের 1 এপ্রিল শুরু হয়ে গেছে। 167 তলার এই বাড়িটি পুরো 1 কিলোমিটার, অর্থাৎ 1000 মিটার (3,281 ফুট) উঁচু হবে। ইঞ্জিনিয়ারদের অনুমান বাড়িটির নির্মাণ-কাজ আনুমানিক 2019 সালের মধ্যে শেষ হবে। তখন এটাই হবে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বাড়ি। হুয়াং প্রদেশের স্কাই সিটি বাড়িটি 838 মিটার (2,749 ফুট) উঁচু হবে এবং এতে থাকবে 202 টি তলা (floor)। উচ্চতার বিচারে এই বাড়িটি কিংডম টাওয়ারের পরে থাকলেও তলার হিসাবে জেড্ডার বাড়িটিকে পিছনে ফেলে দেবে। অন্যান্য আকাশছোঁয়া বাড়িগুলি যে প্রযুক্তিতে তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে স্কাই সিটি সেভাবে তৈরি হবে না। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবে এক নতুন প্রযুক্তি। প্রথমে নির্মাণ-কাজের জায়গাতেই প্রতিটি তলা আলাদা আলাদা ঢালাই করে তৈরি করে নেওয়া হবে। এরপরে সেগুলি অর্থাৎ প্রিফ্যাব্রিকেটেড ব্লকগুলি (prefabricated blocks) একটার উপরে আরেকটা বসিয়ে বসিয়ে কাঠামোটা তৈরি করা হবে এবং সেগুলি ইন্টারলকের (interlocked) সাহায্যে আটকে রাখা হবে। অর্থাৎ বলা যেতে পারে মূল কাঠামোটা তৈরি হবে অ্যাসেম্বলিং পদ্ধতিতে। ইঞ্জিনিয়ারদের আশা ব্লকগুলি (floors) তৈরি করতে মাস চারেক (120 দিন) সময় লাগবে। আর মূল কাঠামোটি অর্থাৎ বাড়িটি তৈরি করতে সময় লাগবে আর তিন মাসের (90 দিন) মত। সব ঠিকঠাক চললে কিংডম টাওয়ার শেষ হওয়ার আগেই স্কাই সিটি আকাশে মাথা তুলে দাঁড়াবে এবং কিছুদিনের জন্য বিশ্বের সর্বোচ্চ বাড়ির সম্মান আদায় করে নেবে।

গগনচু্ম্বী বাড়িগুলি লক্ষ করলে দেখা যাবে যে বাড়িগুলি যেন একই ধাঁচে তৈরি। মাটির উপরের অংশটি অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকলেও যত উপরে উঠেছে তত সরু হয়ে গেছে। কেন এমন হয়েছে? সেটাই আমরা এবার খুঁজে দেখব। বাড়ি যত উঁচু হবে তত তার ওজন বাড়বে। উচ্চতা দ্বিগুণ হলেই বাড়ির ওজন বেড়ে যায় চার থেকে আট গুণ। এছাড়াও আছে বায়ু প্রবাহ। বাড়ি যত উঁচু হবে হাওয়ার ধাক্কা বা ঝাপটা তত বেশি লাগবে। এক্ষেত্রেও বাড়ি দ্বিগুণ উঁচু হলেই হাওয়ার ধাক্কা চার গুণ বেড়ে যায়। তাই অতি উঁচু বাড়ির নক্সা করার সময় উপরের বাধাগুলি মাথায় রাখতে হয়। বাড়ির উপরের অংশ যদি ক্রমশ সরু হয় তাহলে বাইরের দিকের ক্ষেত্রফল কমে যাবে ফলে বাড়ির উপর বায়ুর চাপ কম পড়বে। সেইসঙ্গে বাড়ির ওজন কমে যাবে এবং চাপ চারদিকে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এই কারণেই আকাশছোঁয়া বাড়িগুলির নক্সা প্রায় একই রকম হয়ে থাকে অর্থাৎ বাড়ি যত উঁচু হয় উপরের অংশ তত সরু হয়। এই প্রসঙ্গে বলি সব দেশের মাটির চরিত্র একই রকম নয়। বায়ুপ্রবাহও একই ধরনের হয় না। তাই কোনো দেশ ইচ্ছে করলেই যত খুশী উঁচু বাড়ি করতে পারে না। শুধু তাই নয়, দেশের যেকোনো জায়গায়ও আকাশচুম্বী বাড়ি করা যায় না। আকাশছোঁয়া বাড়ির নক্সা করার আগে নক্সাকার যেখানে বাড়িটি হবে সেখানকার বায়ুচাপ, বৃষ্টিপাত, মাটির চরিত্র ইত্যাদি সংক্রান্ত 100 বছরের নানা তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করে নেন। কারণ সামান্যতম ভুলের জন্য পুরো কাঠামো তথা বাড়িটা ভেঙে পড়তে পারে।

দেশে দেশে এখন আকাশছোঁয়া বাড়ি তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে। কোনো দেশে কোনো একটি বাড়ি আকাশে মাথা তুলে দাঁড়ানোর কয়েক বছরের মধ্যেই অন্য কোনো দেশের অন্য একটি বাড়ি তৈরি হয়েছে তার চেয়েও উঁচু। এই প্রতিযোগিতার শেষ কোথায়? জানা নেই। ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা যেভাবে দ্রুতলয়ে বাড়ছে তাতে এখনি আকাশে বাড়ির মাথা তোলার সীমারেখা টানা যাচ্ছে না। অদূর ভবিষ্যতে জেড্ডার কিংডম টাওয়ার পৃথিবীর সর্বোচ্চ বাড়ির সম্মান পেতে চলেছে। কিন্তু এই সম্মান সেই দেশের মানুষ বেশিদিন ধরে রাখতে পারবেন কি? কারণ দুবাইতে ইতিমধ্যে যে গগনচুম্বী বাড়িটি তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তার নির্মাণ-কাজ 2025 সাল নাগাদ শেষ হলে এতদিনের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে যাবে। 400 তলার এই বাড়িটি 2·4 কিলোমিটার অর্থাৎ 2400 মিটার (7874 ফুট) উঁচু হবে। কিংডম টাওয়ারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি উঁচু। ভাবা যায়? বাড়িটির নাম হবে ‘সিটি টাওয়ার। এখানেই কি শেষ? উত্তর জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

শেষের কথা

আকাশছোঁয়া বাড়িগুলির আকাশে মাথা তোলার সত্যিই কি কোনো সীমারেখা নেই? আকাশ কি এতই উদার? এখনও জানা নেই। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সেই অন্তিম রেখাটির সন্ধান পাওয়া পর্যন্ত। যদি পাওয়া যায়, তখন মানুষ কী করবে? মাটি ছেড়ে কি আকাশে ভাসমান বাড়ি বানাবে? বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে মানুষ যে অসাধ্য সাধন করছে তাতে মনে হয় না তার পক্ষে কোনো কিছুই অসম্ভব। আজ যা কল্পনায় ভবিষ্যতে তা বাস্তব রূপ নিয়েছে এমন উদাহরণ পৃথিবীতে অনেক আছে? তবে কারিগরি বিদ্যার উন্নতির ফসল যেন সকলের কাজে লাগে।

আগের এপিসোডগুলোর লিংক এইখানে পাবে