বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

টেকনো টুকটাক

এতটুকু বাসা->কিশোর ঘোষাল

biggantechno13 (Small)

আজ থেকে প্রায় হাজার দশেক বছর আগেকার কথা। গভীর জঙ্গলে একদল আদিম মানুষের তাড়া খেয়ে, এক পশু প্রাণভয়ে ঢুকে পড়ল পাহাড়ের এক গুহায়। গুহায় ঢুকেও সে পশু কিন্তু নিস্তার পেল না। সমবেত মানুষের ভারি ও ধারালো পাথুরে অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারাল সেই পশু।  শিকারকে হত্যা করে, সেই দলের মেয়ে ও পুরুষ, প্রায় সবাই আনন্দে চিৎকার ক’রে, সেই পশুর চামড়া ছাড়াতে বসে গেল। কিন্তু সেই দলের কর্ত্রী, বয়স্ক মহিলা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন গুহার ভেতরটা। তিনি দেখলেন, এই গুহার তিনদিকে নিরেট পাথরের দেয়াল আর মাথার ওপর পোক্ত ছাদ। ঝড়-বৃষ্টি, প্রচণ্ড রোদ, ভীষণ ঠাণ্ডা, হিংস্র প্রাণীদের আক্রমণ, অন্য দলের আদিম মানুষদের আক্রমণ। এই সমস্ত বিপদ থেকেই এই গুহা বেশ নিরাপদ, একথা বুঝতে বয়স্ক সেই আদিম মহিলার অসুবিধে হল না। এতদিন তাঁরা জঙ্গলের বড়ো বড়ো গাছতলায়, গাছের উপরে, কিংবা ঘন ঝোপের মধ্যে বাস করতেন। সেখানে সারাক্ষণই বিপদের আশঙ্কায় সন্ত্রস্ত থাকতে হয়। কিন্তু পাহাড়ের এই গুহায় মিলতে পারে অনেক বেশি নিরাপদ আশ্রয়! এখন থেকে তাঁরা এই গুহাতেই থাকবেন। সেই বয়স্ক মহিলা, তার দলের দুই পুরুষকে বললেন, তাদের অপেক্ষায় থাকা দলের বুড়ো-বুড়ি আর শিশুদেরকেও এখানে নিয়ে আসতে। আজ থেকে প্রশস্ত এই গুহাই হবে তাঁদের আশ্রয়, তাঁদের বাসা। আর সেই থেকে শুরু হল মানুষের বাসা বানানোর, মাথা গোঁজার একটু আশ্রয় বানানোর প্রক্রিয়া।

পাহাড়ের সেই গুহায় নিশ্চিন্তে চলতে লাগল, তাদের জীবনযাপন। রাত্রে শোবার আগে গুহার মুখটা বড়ো বড়ো পাথর আর মোটা মোটা গাছের ডাল ঘিরে বন্ধ করে দিলে, সারা রাত নিশ্চিন্তে ঘুমোনো যায়। গুহার মধ্যে যথেষ্ট খাবার সঞ্চয় করে রাখলে, প্রচণ্ড বর্ষাতেও গুহার মুখে বসে উপভোগ করা যায় সামনের জঙ্গলে বৃষ্টি পড়ার দৃশ্য ও শব্দ। বাচ্চারা, অশক্ত বুড়ো-বুড়িরাও গুহার মধ্যে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারে বর্ষার দিনে-রাতে। প্রচণ্ড শীতে গুহার মুখে আগুন জ্বালিয়ে রাখলে উষ্ণ হয়ে ওঠে গুহার ভেতর, সব্বাই ভীষণ আরাম বোধ করে। এইভাবেই সেই গুহার বাসায় গভীর জঙ্গলের মধ্যেও জীবন অনেক সহজ হয়ে উঠল।

কিন্তু এমনটা বেশিদিন চলল না। প্রশস্ত গুহা ঠিকই, কিন্তু দলে মানুষ যে বেড়েই চলেছে। কয়েকবছরের মধ্যেই দলের লোকসংখ্যা এত বেড়ে গেল, গুহার ভিতরে জায়গার অভাব হতে লাগল। নিজেদের মধ্যেই ঝগড়াঝাঁটি শুরু হতে লাগল। আশে পাশে এমন আরো গুহার খোঁজ তারা করেছিল কিন্তু পায় নি। সেই বয়স্কা মহিলাও, এখন বার্ধক্যের মুখে। একদিন তাঁর তিন মেয়েকে নিয়ে আলোচনায় বসলেন, গুহা না পেলেও আরো বাসা চাই। কিন্তু কি উপায়? নতুন গুহা ছাড়া অন্য আর কোন উপায় হতে পারে, এ কথা তখন দলের সকলের চিন্তায়। সেই বয়স্কা মহিলার এক নাতি সামনে এল, বলল, সে বানাতে পারবে। এত পোক্ত হয়তো হবে না, কিন্তু সেই বাসাতেও চারদিকে দেয়াল থাকবে, থাকবে মাথার উপর ছাদ। তাকে কাছে ডেকে বয়স্কা মহিলা তার সঙ্গে কথা বললেন, অনেকক্ষণ। তাঁর এই যুবক নাতিটি খুব শক্তিমান শিকারী নয়, কিন্তু বেশ বুদ্ধিমান। নানান ধরনের নতুন নতুন অস্ত্রশস্ত্র সে বানিয়েছে অনেক, তাতে করে শিকার করা আগের থেকে অনেকটাই সহজ হয়েছে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, বেশ, বানা দেখি একটা বাসা, দেখি সে বাসা কেমন হয়?

পরদিন থেকেই গুহার সামনে, সেই যুবক শুরু করল মানব সভ্যতার প্রথম বাসাটি বানাতে। তার সঙ্গী হল আরো চার পাঁচজন শক্তিমান যুবক। জঙ্গল থেকে গাছের মোটা মোটা ডাল কেটে আনল। দুই সারিতে মাটি খুঁড়ে শক্ত করে পুঁতে দিল সেই মোটা মোটা ডাল। দুই সারি ডালের মাথায় চাপিয়ে, শক্ত লতা দিয়ে কষে বেঁধে দিল একটু হালকা গাছের ডাল। তারপর লম্বার দিকে আরো কিছু গাছের ডাল চাপিয়ে, লতা দিয়ে বেঁধে বানিয়ে ফেলল একটা কাঠামো। এবার সকলে মিলে জঙ্গল থেকে কেটে আনল বড়ো বড়ো পাতা, সেই সব পাতা বিছিয়ে দিল কাঠামোর ছাদে, চারপাশের দেওয়ালে, লতা দিয়ে আর সরু গাছের ডাল দিয়ে বেঁধে দিল, মোটা ডালের কাঠামোর সঙ্গে। তৈরি হয়ে গেল মানুষের প্রথম বাসা। কিন্তু বর্ষার সময়, পাতার ফাঁক দিয়ে ছাদ থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে যে! গুহার মধ্যে বড়োবড়ো পশুর বাড়তি চামড়া ছিল অনেক। ছাদে সেই চামড়াগুলি বিছিয়ে, টানটান করে বেঁধে দিলে, বন্ধ হয়ে গেল ঘরের ভিতর জল পড়া।

দলের অনেকের এই নতুন বাসা মনঃপূত না হলেও, নেত্রী মহিলার কিন্তু ভারি পছন্দ হল। তার কারণ তাঁর মাথায় ছিল আরো অনেক চিন্তা। নতুন বাসার সামনে তিনি তাঁর যুবক নাতির কাঁধে হাত রেখে, বললেন, আমাদের এই দলটা এখন অনেক বড়ো হয়ে গেছে। গুহাতে থাকার জায়গা তো হচ্ছেই না, তাছাড়াও ফুরিয়ে আসছে এই জঙ্গলের পশুকুল। সবার খাবার মতো ফলমূলও সবসময় আর পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের সকলের খাবার যোগাড়ের জন্যে এই জঙ্গল ছেড়ে, অনেক দূরের অন্য কোন জংগলে যদি যেতেই হয়, তুই এমন অনেক বাসা বানাতে পারবি তো? যুবক নাতি খুব বিশ্বাসের সঙ্গে বলল, পারবো, ঠাকুমা। এর চেয়ে অনেক ভালো শক্ত পোক্ত বাসা বানাতে পারবো। কারণ এই বাসা বানাতে গিয়েই অনেক কিছু শিখে নিয়েছি। যে ভুল ভ্রান্তি আছে, সেগুলো সব শুধরে নেব। নাতির উপর ভরসা করে, নেত্রী মহিলা দলের সকলকে নির্দেশ দিলেন, পরের দিনই খুব ভোরে এই গুহা ছেড়ে তাঁরা চলে যাবেন। অন্য কোন জঙ্গলে, যেখানে পাওয়া যাবে অনেক ফলমূল, শিকার করার মতো অনেক পশু, আর পর্যাপ্ত খাবার জল।

সেই নতুন বাসা, পাহাড়ের গুহার নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছেড়ে, দলটি পরের দিন ভোরেই রওনা হল, নতুন জীবনের দিকে। নদীর ধারে, নিজেদের প্রয়োজন মতো তারা বানিয়ে তুলবে অনেক নতুন বাসা, গড়ে তুলবে গ্রাম। শুরু হয়ে যাবে মানব সভ্যতার নতুন দিশা।

biggantechno14 (Small)নদীর ধারে জঙ্গলের মধ্যে অনেকটা জায়গা সাফ করে গড়ে উঠল প্রথম মানব বসতি। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠতে লাগল বসতি, বেড়ে উঠতে লাগল নানান প্রয়োজন। মানুষ শিখে ফেলল চাষবাস, পশুপালন। পশুরা আর মানুষের সঙ্গে এক বাসায় থাকে না, তাদের জন্যে তৈরি হল আস্তাবল, গোশালা। চাষের ফসল সঞ্চয় করে রাখার জন্যে তৈরি হল শস্যের গোলা। দিন-কে-দিন নতুন নতুন প্রয়োজনে ভাবনা চিন্তা করতে করতে উন্নত হতে লাগল ঘরদোর বানানোর নানান প্রযুক্তি। কাঠের খুঁটির কাঠামো আর গাছের পাতায় ছাওয়া দেওয়ালের ঘরের স্থায়িত্ব কম। ঝড়ে উড়ে যায়, বর্ষার জলে পচে যায়, বড়োসড় জন্তুদের ধাক্কায় উলটে যায়, আগুন লাগলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় সব কিছু।

নতুন ভাবনায় এল আরো বেশি নিরাপত্তা, আরো বেশি আরাম, আরো বেশি সৌন্দর্য। জটিল হয়ে উঠতে লাগল বাসা বানাবার প্রযুক্তি। শুধু গাছের ডাল, আর পাতা নয়, উন্নতি এল ঘর বানাবার উপাদানেও। অঞ্চল অনুযায়ী সহজে পাওয়া যায় এমন উপাদানে তৈরি হতে লাগল শক্ত পোক্ত ভিত, দেওয়াল। সে দেওয়াল কোথাও পাথরের, কিংবা কোথাও বা মাটির। রোদে পোড়ানো মাটির ইট, পাথরের মতো সাজিয়ে, মাটি, চুন আর সুরকি দিয়ে গেঁথে তোলা হতে লাগল দেওয়াল। কোথাও আবার গাছের সরু ডালের ঘন বুনোট কিংবা বাঁশের চালির উপর মাটির প্রলেপ দিয়েও হালকা দেওয়াল বানানো চালু হয়ে গেল। আর কাঠের কাঠামোর উপর ধান বা অন্য শস্যের খড় পুরু করে বিছিয়ে দেওয়া হল, দুপাশে ঢালু করে – দোচালা, চারদিকে ঢালু – চারচালা, ছাউনি দেওয়া ঘর তৈরি হতে লাগল সর্বত্র।

আরো পরে আগুনে পোড়ানো ইট, খাপরা, টালি ব্যবহার করে ঘরদোর হয়ে উঠল অনেক নিরাপদ ও আরামদায়ক এবং আগের প্রযুক্তির থেকে অনেক বেশি টেকসই আর সুন্দর। আজ থেকে ছ-সাত হাজার বছরের পুরোনো প্রযুক্তির এই রকম ঘর বাড়ি আমাদের দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে আজও দেখতে পাওয়া যায়। এই ঘরগুলির বিশেষত্ব হল, প্রচণ্ড গরমের সময় তুলনামূলক ভাবে ঠাণ্ডা, আবার প্রচণ্ড শীতে অনেকটাই উষ্ণ। স্থানীয় উপাদান থেকে গ্রামের মানুষরাই এইরকম ঘর চটপট বানিয়ে নিতে পারে, সে কারণে খরচও অনেক কম।   

জনসংখ্যা বাড়তে লাগল, বড়ো হতে হতে অনেক গ্রাম শহরের আকার নিতে শুরু করল। জটিল হয়ে উঠতে লাগল আমাদের সামাজিক কাঠামো। রাজা, মন্ত্রী, আমলা, বণিক শ্রেণীরা হয়ে উঠল সমাজের অনেক বেশি প্রভাবশালী ও বিত্তশালী, সমাজে ধর্মের প্রাধান্য বাড়তে লাগল। সেই অনুযায়ী উন্নতি হতে লাগল ঘর বানানোর প্রযুক্তিরও। গ্রামের ঘরবাড়ির থেকে সম্পূর্ণ বদলে গেল শহরের ঘরবাড়ি। সে সব বাড়ির দেওয়াল পাথরের কিংবা আগুনে পোড়ানো শক্ত ইটের। কাঠের কড়িবরগার কাঠামোর উপর পোড়ামাটির কিংবা পাথরের পাতলা টালি বিছিয়ে চুনসুরকি-খোয়ার পুরু প্রলেপে ঢালাই করে সুন্দর সমতল হয়ে উঠল বাড়ির ছাদ। সমতল ছাদের উপর আরো ঘর বানিয়ে দোতলা, তিনতলা বাড়ি বানাতেও আর বাধা রইল না। যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় ২৬০০ বছর আগে biggantechno15 (Small)(2600 BC), এরকমই অজস্র ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছিল হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতার শহরগুলিতে।

আগেই বলেছি প্রয়োজন অনুযায়ী ঘরবাড়ির আকার, সৌন্দর্য আর জটিলতা বাড়তেই থাকল শহরের বাসিন্দাদের চাহিদা অনুযায়ী। সে সব পুরোনো বাড়িগুলির আজ আর কোন নিদর্শনই  পাওয়া যায় না। কিছু কিছু মন্দির, আজও টিকে আছে, সেই সব দিনের প্রযুক্তির অদ্ভুত নমুনা হয়ে। মিশরের নাইল নদীর তীরে থিবস শহরের লাক্সর মন্দির মোটামুটি ১৩৯২ বি.সি.তে নির্মাণ হয়েছিল, যার ধ্বংসাবশেষ আজও আমাদের বিস্মিত করে।

সারা বিশ্বে ঘরবাড়ি বানানোর প্রযুক্তিতে চুন-সুরকির ব্যবহার বহু প্রাচীন এবং ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল জানা যায় না। কিন্তু ১৮১৭ সালে ইউরোপে সিমেন্ট আবিষ্কারের পর থেকেই ঘরবাড়ি বানানোর প্রযুক্তিতে এসে গেল আমূল পরিবর্তন। ফরাসী বিজ্ঞানী লুই ভাইক্যাট ১৮১৭ সালে চক (chalk – CaCO3) আর ক্লে পুড়িয়ে প্রথম সিমেন্ট বানিয়েছিলেন।  ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জোসেফ অ্যাস্পডিন ১৮২৪ সালে ভাইক্যাটের পদ্ধতিতে আরও কিছু পরিবর্তন করে বেশি  উত্তাপে (প্রায় ১৪৫০ সেন্টিগ্রেড) পুড়িয়ে এবং কিছু পরিমাণে জিপসাম মিশিয়ে তৈরি করলেন পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট। দক্ষিণ ইংল্যাণ্ডের পোর্টল্যাণ্ড স্টোন, সে সময় বড়ো বড়ো প্রাসাদ বানাতে খুবই জনপ্রিয় ছিল, এই সিমেন্টের রঙ আর ওই পাথরের রঙ প্রায় একই রকম ছিল বলে অ্যাস্পডিন সায়েব সিমেন্টের নাম দিয়েছিলেন পোর্টল্যাণ্ড। আগেকার চুন-সুরকির থেকে সিমেন্ট, ইট ও পাথরের গাঁথনির জোর অনেক বাড়িয়ে দিল, তাড়াতাড়ি জমে যাওয়ার দরুন কাজের গতিও বেড়ে গেল। আর চুন-সুরকির চেয়ে সিমেণ্টের জোড় অনেক পোক্ত হওয়ায়, অনেক স্থায়ী হয়ে উঠল বাড়ির কাঠামো।

আধুনিক সিমেন্ট তৈরি হতেই, বদলে গেল কংক্রিট (Concrete) (যাকে আমরা বাংলায় ঢালাই বলি)। প্রাচীন কাল থেকেই ইট-ভাঙা খোয়া অথবা পাথরকুচি, সুরকি কিংবা বালির সঙ্গে চুন মিশিয়ে ঢালাই হত। এখন পাথরকুচি, বালি আর সিমেন্টের ঢালাই হয়ে উঠল আরও শক্তপোক্ত, আর অনেক বেশি স্থায়ী। তবে কংক্রিটে কিন্তু একটা অসুবিধে বরাবরই ছিল, কংক্রিটের compressive stress অর্থাৎ চাপ সহ্য করার দারুণ ক্ষমতা থাকলেও, টান সহ্য করার শক্তি (Tensile stress) অথবা বাঁকা চাপ নেবার শক্তি (bending stress) খুব কম। নতুন প্রযুক্তিতে কংক্রিটের মধ্যে হিসেব মতো লোহার রড (Steel bar) ঢুকিয়ে দিয়ে, কংক্রিটকে আরো শক্তিশালী করে তোলা হল। নতুন ধরনের এই ঢালাইয়ের নাম হল রি-ইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট (Reinforced Cement Concrete), বাংলায় বলা যায় বর্ধিতশক্তি ঢালাই। সংক্ষেপে বলা হয় আর.সি.সি. (R.C.C)। এই আর.সি.সি., ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে সব নির্মাণেই এনে দিল আমূল পরিবর্তন।

আগেকার দিনে, ইটের বা পাথরের মোটা মোটা ভিত বা গাঁথনি করে, মোটা মোটা লোহার বিমের কড়ি-বরগার ওপর ছাদ ঢালতে যেমন সময় লাগত, তেমনি খরচও হতো বিরাট। এখন আর.সি.সি.র ভিত, কলাম, বিম, ছাদের কাঠামো অনেক হালকা হয়েও অনেক বেশি শক্তপোক্ত হয়ে উঠল। দেওয়ালের জন্যে ইটের ব্যবহার আজও রইল, কিন্তু সে শুধু দুই কলমের মধ্যে ফাঁক ভরাট করার জন্যে, সে দেওয়াল আগেকার তুলনায় অনেক পাতলা। অতএব খরচ অনেক কমে গেল। ভূমিকম্পেও এই আর.সি.সি. কাঠামোর বাড়ি সহজে ভেঙে যায় না, অথবা হুড়মুড় করে ভেঙেও পড়ে না। আর সব থেকে যেটা সুবিধে হল বহুতল বাড়ি বানানো সহজ হয়ে গেল, আজকের প্রযুক্তিতে খুব সাধারণ লোকেও তিন-চার-পাঁচতলা বাড়ি বানিয়ে ফেলছে বিস্তর, আর আকাশছোঁয়া বাড়ির কথা তো এই বিভাগে আগেই বলেছি।

biggantechno16 (Small) biggantechno17 (Small)ওপরে আধুনিক দোতলা একটি ছিমছাম বাড়ির ছবি দেখলেই বুঝতে পারবে, প্রাচীন কালের গুহার আবাস থেকে আমরা কোথায় এসে পৌঁছেছি, আর সেইসঙ্গে বাহাই হাউস অফ ওয়ারশিপের লোটাস টেম্পলের ছবি। দিল্লিতে অবস্থিত এই মন্দিরটির  নির্মাণ ১৯৮৬ সালে সম্পূর্ণ হয়েছিল। আধুনিক আর.সি.সি কাঠামোর এক অনবদ্য সুন্দর নির্মাণ নিদর্শন।

তবে আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে মোটামুটি ১৬৪৩ সালে পোড়ামাটির ইট, টেরাকোটা-টালি আর চুনসুরকির গাঁথনি করে নির্মিত বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের শ্যামরাই-পঞ্চরত্ন মন্দিরের শিল্প সুষমা, আজকের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়েও গড়ে তোলা আর হয়তো সম্ভব নয়। সেই সময়কার অত্যন্ত সীমিত প্রযুক্তি দিয়েও এমন অদ্ভুত শিল্প নির্মাণের কৃতিত্বের কথা আমরা ন ভুলে না যাই।  আমাদের সকলের উচিৎ এই মন্দিরগুলিকে খুব যত্নে সংরক্ষণ করা, আর সেটাই হবে সেই সময়কার নাম না জানা বাস্তুবিদ-শিল্পীদের প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন।

আগের এপিসোডগুলোর লিংক এইখানে পাবে