বৈজ্ঞানিকের দপ্তর

ভারতের বৈজ্ঞানিক->উদ্ভিদ সংকর ও জানকী অম্মল  সংহিতা

bigganjanakiammal (Small)গন্ধলেবু আর গন্ধরাজ ফুল একই গাছে হলে সে গাছ কেমন গাছ হবে? কিংবা একই জাতের গাছ আলু আর টোম্যাটোকে একই গাছে যে পোম্যাটো বলে ফলানো হয়েছিল সেটা কী করে সম্ভব হয়েছিল? সম্ভব হয়েছিল জেনেটিসিস্ট, বা বংশগতি বিশেষজ্ঞদের নিরন্তর গবেষণার ফলে। উদ্ভিদ সংকর নিয়ে যেসব যুগান্তকারী গবেষণায় মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও বস্ত্র সুলভে নিয়মিত যোগানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে তার মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি গবেষণার কান্ডারি ছিলেন জানকী অম্মল।

কেরালার তেল্লিচেরি অঞ্চলে জানকী জন্মেছিলেন ১৮৯৭ সালের ৪ঠা নভেম্বর। তাঁদের থিয়্যা পরিবারটিতে তাঁকে নিয়ে বারোটি ভাইবোন ছিল। ছয় ভাই, ছয় বোন। তাঁর বাবা দেওয়ান বাহাদুর এড়াওলাথ কক্কত কৃষ্ণান ছিলেন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির সাবজজ। জানকীর পরিবারে মেয়েদের বৌদ্ধিক চর্চা্র অনিবার ব্যবস্থা ছিল। বিশেষত ললিতকলা চর্চায় বিশেষ উৎসাহ দেওয়ার চল ছিল। তবে জানকী পড়াশোনার বিষয় হিসেবে পছন্দ করেছিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞান।

তেল্লিচেরিতে ইস্কুলের পড়াশোনার পাট শেষ করে জানকী পাড়ি দিয়েছিলেন মাদ্রাজ। সেখানে তিনি জোড়া স্নাতক সম্মান অর্জন করেছিলেন কুইন মেরিস্‌ কলেজ থেকে আর প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে। প্রেসিডেন্সি কলেজের থেকেই অর্জন করেছিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানে সাম্মানিক স্নাতক ডিগ্রি। সেখানেই অধ্যাপকদের প্রভাবে উদ্ভিদকোষের বংশবিস্তারের প্রক্রিয়াতে তাঁর অপার কৌতূহল তৈরি হয়েছিল।

সেই কৌতূহল মেটাতেই জানকী উচ্চতর গবেষণা ও সেই সংক্রান্ত পঠনপাঠনে নিয়োজিত হয়েছিলেন। বারবার বৃত্তিতে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে করেছিলেন স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে পঠনপাঠন ও গবেষণা। প্রথমে সেখান থেকেই অর্জন করেন মাস্টার্স ডিগ্রি ও পরে ডি.এসসি ডিগ্রি। এরপরেই ১৯৩২ সালে তাঁর সুবিশাল কর্মজীবনের শুরু। আজকের থিরুভানন্তপুরমের মহারাজা কলেজ অব সায়েন্স-এ উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপিকা হিসেবে কাটিয়েছিলেন ১৯৩৪ সাল অবধি। তারপর যোগ দিয়েছিলেন কোয়েম্বাটোরের সুগারকেন ব্রিডিং ইন্সটিটিউটে। পরবর্তী পাঁচবছর সেখানেই কাজ করেন জিন বিশেষজ্ঞের পদে। তারপর কাজ করেছিলেন ইংল্যান্ডে, লন্ডনের জন ইনেস হর্টিকালচারাল ইন্সটিটিউসনে সহকারী কোষবিদের পদে ১৯৪০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। তারপরে ওয়াসলির রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটিতে কাজ করেছিলেন কোষবিদের পদে। ১৯৫১ সালে ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর নিমন্ত্রণে দেশে ফিরে বটানিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ায় বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পরে তিনি ঐ সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল পদেও কাজ করেছিলেন।

উদ্ভিদবিজ্ঞানী জানকী অম্মল মূলত আখের সাথে ভুট্টা ও অন্যান্য ঘাসের সংকর প্রজাতির সৃষ্টি করেন। তারমধ্যে যুগান্তকারী সংকর হিসেবে বিবেচিত হয় আখের সাথে বাঁশের প্রজাতির সংকর। তাঁর এইসব গবেষণা উচ্চফলনশীল শস্য আবিষ্কারের সাথে জড়িত। অর্থাৎ তাঁর গবেষণা পৃথিবীতে প্রয়োজনীয় খাবারের চাহিদা মেটানোর চেষ্টার একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।

তবে গবেষক জীবনের শুরুতে ইংলন্ডে তাঁর কাজ ছিল মূলত বাগানের গাছেদের নিয়ে। এই সময়ে তিনি চাষ করা হয় এমন গাছেদের কোষের ক্রোমোজোমের মানচিত্র প্রস্তুত করেন যাতে এই সমস্ত গাছের দেহকোষের ক্রোমোজোমের সংখ্যা আর তাদের জোড় বিন্যাসগুলি বর্ণনা করেছিলেন। এই গবেষণাপত্রটি তৈরিতে তাঁর সঙ্গী ছিলেন সি ডি ডার্লিংটন। এই সময়েই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন যে নানান পুষ্পল বৃক্ষ যেমন ম্যাগনোলিয়ার উপর কোলচিসাইন নামের রাসায়নিকের প্রভাবে দীর্ঘস্থায়ী ফুল ফলানো সম্ভব। তাঁর অন্যান্য অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আলু ও টম্যাটো গাছের প্রজাতি, ধুতুরা, পুদিনা, লেবুগন্ধী ঘাস এবং খামালু।

তাঁর গবেষণাই প্রথম আলোকপাত করেছিল যে উত্তরপূর্ব হিমালয়ের ঠান্ডা কিন্তু আর্দ্র আবহাওয়া এই অঞ্চলে উদ্ভিদের নতুন নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হওয়ার মূলে এবং সে কারণেই অপেক্ষাকৃত শুকনো জলবায়ুর পশ্চিম হিমালয়ের তুলনায় আর্দ্র পূর্ব হিমালয়ে উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা অনেক বেশি। চিন ও মালয়ের আবহাওয়া ও সেখানকার ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের প্রভাবে পূর্ব হিমালয়ে প্রচুর প্রাকৃতিক সংকর প্রজাতির উদ্ভিদের সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে বলেও তাঁর গবেষণায় প্রকাশ পায়।। তাছাড়াও তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ভেষজ উদ্ভিদ ও লোকজীবনে নানান গাছের ব্যবহার।

তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে জানকী ভারত সরকারের অধীনস্থ উদ্ভিদ ও ভেষজ গবেষণায় নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থায় বিভিন্ন পদে কাজ করেছিলেন। ১৯৭০ সাল থেকে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ ইন বটানিতে ইমারিটাস বৈজ্ঞানিক পদে যোগ দিয়েছিলেন। এই সংস্থারই ফিল্ড ল্যাবরেটরি ছিল মাদুরাভয়ালে। ১৯৮৪ সালে দেহাবসান হওয়া অবধি বাকি জীবন সেখানেই কাটান জানকী।

তিনি ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স ও ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমির সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ভূষিত করেছিল সাম্মানিক এল.এল. ডি উপাধিতে। ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানেও ভূষিত করেছিল। উদ্ভিদবিজ্ঞান গবেষকের দীর্ঘজীবনে জানকী যেমন নানান সংস্থার সদস্য সম্মান, ও পুরস্কার অর্জন করেছিলেন, তেমনই উদ্ভিদবিজ্ঞানের গবেষণার প্রসারে তাঁর অবদানকে স্মরণ করে ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও পরিবেশ মন্ত্রক ২০০০ সাল থেকে চালু করেছেন ট্যাক্সোনমি গবেষণার ক্ষেত্রে ই. কে. জানকী অম্মল পুরস্কার। এইভাবে উদ্ভিদবিজ্ঞানের সংকর ও প্রজাতির গবেষণায় জানকীর উজ্জ্বল অবদান অম্লান থেকে যাবে।

আগের এপিসোডগুলোর লিংক এইখানে পাবে