ভূতের আড্ডা-ভূতের গল্প-খুলির আর্তনাদ-শেষপর্ব-ইন্দ্রশেখর-বর্ষা ২০১৬

আগের পর্ব

“যাকগে সে কথা। গল্পটা বলি। ট্রেনহ্যামের থেকে চোয়ালটা নিয়ে এসে আমি খুলিটার সঙ্গে লাগিয়ে দেখি একেবারে মিলে গেছে।  দেখবেন? দেখাব, দেখাব। তবে তাড়া কীসের? সবে তো সাড়ে নটা বাজে মশাই। খাওয়া দাওয়া শেষ। একটু পাইপ টেনে নিই প্রথমে।

যা বলছিলাম, খুলিতে চোয়ালটা মাপে মাপে বসাতে গিয়ে হঠাৎ একটা আজব ব্যাপার ঘটল। ওর দাঁতগুলো আমার আঙুলটাকে কামড়ে ধরল যেন। সত্যিকথা বলব মশাই, আচমকা কামড় খেয়ে চমকে একটু লাফ দিয়ে উঠেছিলাম আমি। খেয়াল হয়নি নিজেই চোয়ালটাকে চাপ দিয়ে ধরে আছি। উঁহু। নার্ভাস হইনি। বাইরে তখন ফটফটে দিনের আলো।  জানালা দিয়ে সূর্যের আলো পড়ছিল ঘরে। ভয় পাইনি, তবে লিউকের মৃত্যু নিয়ে করোনারের কথাগুলো হঠাৎ মনে পড়ে গিয়েছিল, “মৃত্যুর কারণ, অজানা কোনো জন্তুর হাত বা দাঁত—”

যাক গে, বাক্সটা নিয়ে আসি বরং। আপনাকে খুলিটা দেখাই। দেখুন তো ওর ভেতরে খটখট শব্দ করে যে জিনিসটা সেটা সত্যিই একটা সিসের টুকরো না অন্যকিছু? যদি দেখেন ওটা একদলা শুকনো মাটি, বা একটুকরো পাথর, তাহলে আমার বুকের থেকে একটা ভার সরে যাবে মশাই। ওখুলির কথা তারপর আমি আর জীবনে ভাবব না। কী বললেন? উঁহু, আমি নিজে কখনো জিনিসটা বের করে দেখবার সাহস পাই না। কেমন যেন অস্বস্তি হয়।

দাঁড়ান। আমি গিয়ে নিয়ে আসি। কী বললেন? আপনি আমার সঙ্গে যাবেন? হা হা। ভাবছেন আমি ভয় পাচ্ছি? ধুস!

কী? বলছেন লন্ঠনটা সঙ্গে নিয়ে যেতে? না মশায়। হাত থেকে কখনো জ্বলন্ত লন্ঠন খসে পড়েনি আমার। পড়লে বিপদ হতে পারে, তাও বোঝেন না? আমি বরং মোমবাতি নিয়ে যাই একটা। ওতে ভয় কম।

নাঃ এবারে সত্যিই যাব। নইলে আপনি আবার ভেবে বসবেন যে কথা বলে বলে আমি ওপরে যাওয়াটা এড়িয়ে যাচ্ছি কেবল। আপনি পানীয়টা শেষ করতে থাকুন, আমি এলাম বলে—

******

এই যে। নিয়ে এসেছি বাক্সটা। খুব সাবধানে ধরে এনেছি। আহা বেচারা! নাড়াচাড়া হলে চোয়ালটা খুলে আসতে পারে তো! তাহলে ও রেগে যাবে, আমি নিশ্চিত। আনতে আনতে মোমবাতিটা নিভে গিয়েছিল। না না কোন অলৌকিক কারণ নেই। হাওয়া –হাওয়া—অন্ধকারের মধ্যে একটা চিৎকার শুনেছিলেন না? আমাকে একটু ফ্যাকাশে লাগছে? ধুর মশাই? তা কেন লাগবে? চিৎকারটা ওই বাক্স থেকে বেরোয়নি। আমি হলফ করে বলতে পারি। বাক্সটা হাতে নিয়ে যখন আসছি তখনই তো বাইরে থেকে চিৎকারটা উঠল। তাহলে সেটা বাক্স থেকে আসবে কী করে, অ্যাঁ? বোধহয় দেয়ালের কোন ফুটো দিয়ে হাওয়া চলবার শব্দ হয়েছে। একদিন ঠিক খুঁজেপেতে এই চিৎকারের মত শব্দগুলোর কারণটা আমি বের করে নেব দেখবেন। তার মানে, কী বুঝলেন? খুলিটা চিৎকার করে না? তাইতো? প্রমাণ হয়ে গেল? ব্যস।

এবারে বাক্সটা খুলি? আলোর নীচে ধরে জিনিসটাকে দেখি একবার? সত্যি ভাবতে বড়ো কষ্ট হয় বুঝলেন? ঠিক এই আলোটার নীচে, আপনি যে চেয়ারটায় বসে আছেন সেইখানটাতেই দিনের পর দিন বসে থাকতে দেখেছি মেয়েটাকে আমি—আরে আরে, জানালাটা বন্ধ করুন শিগগির—কী সাংঘাতিক হাওয়ার ঝাপটা! গেল গেল— যাঃ। আলোটা নিভেই গেল। ঠিক আছে। অসুবিধে নেই। ফায়ার প্লেসের আলোতেই দেখাই আপনাকে। তবে আগে জানালাটা—

ব্যস।আর চিন্তা নেই। জানালাটা ভালো করে এঁটে দিয়েছি। আগেও আঁটাই ছিল। কী করে যে অতবড়ো ছিটকিনিটা খুলে গেল হাওয়ার ধাক্কায়! নিন, আর খুলবে না। একেবারে ভালো করে–একী? খুলির বাক্সটা? ওটা কোথায় গেল? হাওয়ার ধাক্কায় পড়ে গেল বুঝি? অন্ধকারে কিছু দেখাও তো যাচ্ছে না ছাই!আ-আপনি বাক্সটা খুঁজুন তো! আমি ততক্ষণে লন্ঠনটা জ্বালাই—

বাক্সটা পেয়েছেন? ঠিক আছে। টেবিলের ওপর রাখুন। জানালাটা আমার দোষেই ওভাবে খুলে গেছিল, বুঝলেন? নিশ্চয় ভালো করে আঁটিনি আগের বার। হ্যাঁ হ্যাঁ। দরাম করে খুলে যাবার আগে ওর বাইরে চিৎকারটা আমি শুনেছি। গোটা বারি ঘুরে ঘুরে এসে তারপর জানালার গায়ে আছড়ে পড়ল যেন। তাতে কী প্রমাণ হয় মশাই? হাওয়া! আর কিচ্ছু না। কিচ্ছু না।

বাক্সটা—দাঁড়ান। ঠান্ডা লেগে গেছে। আগে একটু পানীয় নিই, খানিক পাইপ টেনে সুস্থির হই-শেষের চিৎকারটা যে দুজনেই শুনতে পেয়েছি তাতে আমি বড্ড খুশি হয়েছি মশাই। বড্ডো খুশি—খুলিটা টেবিলের ওপর আর চিৎকারটা বাইরে। তার মানে খুলিটা চিৎকার করেনি! তার মানে ওটা হাওয়ার আওয়াজ!! আঃ! প্রমাণটা পেয়ে ভারী স্বস্তি লাগছে। আপনিও সাক্ষি।

দাঁড়ান, বাক্সে আঁটা দড়ির গিঁটটা খুলি। সিলটা ভাঙি আগে! আজ্ঞে হ্যাঁ। পাছে ট্রেনহ্যাম বা অন্য কেউ জিনিসটায় হাত দেয় সেই ভয়ে বাক্সটা দড়ি বেঁধে সিল করে রাখি আমি। দেখাশোনা হলে ফের খুলিটা ওতে ভরে নতুন করে সিল করে দেব। আসলে ট্রেনহ্যাম, অনেক কিছু জানে তো! মুখে যা বলে তার চেয়ে অনেক বেশি। ও খুলিটা দেখুক আমি চাই না। এইযে—এই যে –দেখুন—

এ কী? ভেতরে খুলিটা নেই তো? কিন্তু আমি তো গত বসন্তে ওটাকে শেষবার বের করবার পর ফের ঢুকিয়ে রেখে নিজেহাতে সিল করেছিলাম বাক্সটা। সিল ঠিকই আছে—এ হতে পারে না। অসম্ভব–

ব্যাপারটা আমার একেবারে ভালো ঠেকছে না মশাই। না না অলৌকিওটিক কিছু  ভাববেন না। কেউ নিশ্চয় সিলটার ওপর কারিকুরি করে খুলিটা চুরি করেছে। বাগানে কাজ করতে যাই যখন, ট্রেনহ্যাম তখন কখনো হয়ত ফাঁকা ঘরে ঢুকে–

কিন্তু—তা যদি না হয়?? না না বলবেন না, বলবেন না। ওটা নিজেনিজে বাক্স থেকে বেরিয়ে—যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে এ বাড়ির কোথাও না কোথাও অন্ধকারে ঘাপটি মেরে রয়েছে ওটা। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে—তারপর কাছে গেলেই অন্ধকারের ভেতর থেকে ওটা চিল্লিয়ে উঠবে—ও আমায় ঘেন্না করে—ঘেন্না করে–

আরে! বাক্সটা উলটোতে গিয়ে মেঝের ওপর কিছু একটা পড়ে গেল না? দেখুন তো, আপনার পায়ের কাছেই তো– হ্যাঁ। একটা সিসের টুকরো। শব্দ শুনেই বুঝতে পেরেছিলাম আমি। তার মানে লিউক সত্যিসত্যিই—

–মেয়েটাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে—ভেবে দেখুন—ফুটন্ত সিসের একটা ধারা আপনার খুলির মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে—ওঃ! কী ভীষণ যন্ত্রণা হয়েছে মেয়েটার! চিৎকার করে ওঠবারে আগেই বোধ হয় প্রাণটা বেরিয়ে গিয়েছিল ওর—ওই যে , বাইরে ফের চিৎকার করছে ও—ঠিক দরজাটার বাইরে—ওঃ–

একী? আপনি যে একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে গেছেন মশাই? উঁহু, অমন করলে চলবে না। আজ রাতে যদি একটুও ঘুমোতে হয় তাহলে ওটাকে খুঁজে এনে বাক্সে ঢোকাতে হবে ফের। বুঝতে পারছেন না কেন, ও বাক্সে ফিরে আসতে চাইছে—ও নিজের বাড়িতে ফিরতে চাইছে—তাই আজ এত চিৎকার করছে ওটা—সেই প্রথমবারের পর আর কখনো এত জোরে—প্রথমবার—হ্যাঁ হ্যাঁ, প্রথমবার। সেবার আমি ওটাকে মাটিতে—হ্যাঁ। আজ ফের তাই করব। ওটাকে খুঁজে বের করে ছ ফুট মাটির নিচে গোর দিয়ে দেব আমরা। সেখানে যতই চিৎকার করুক, আমরা কেউ শুনতে পাব না দেখবেন! লন্ঠনটা নিন দেখি। বেশি দূর যেতে পারেনি বোধ হয়। জানালাটা খুলে ঢুকে আসবার চেষ্টা করেছিল, আমি সেটা বন্ধ করে দিয়েছি তখন।

চলুন-চলুন—লন্ঠনটা হাতে- থামুন। চুপ-চুপ—দরজায় ঠকঠক করছে শুনতে পাচ্ছেন? ওটোকা আমি চিনি। পরপর তিনবার। একটু থেমে ফের তিনবার—ও দরজার বাইরে এসে গেছে। ঘরে ঢুকতে চাইছে এখন। আর খুঁজতে হবে না। গোর? আরে ধুস। মজা করছিলাম তো। ও গোর দেয়া একদম পছন্দ করে না। একদম না।

আমার সঙ্গে একটু আসবেন? ওটাকে নিয়ে আসি। একলা একলা একটু অস্বস্তি হয় কিনা! আসলে আজ সিসের টুকরোটা দেখে ইস্তক একটু দুর্বল হয়ে পড়েছি।

চুপ চুপ—ঐ শুনুন—দরজায় কেমন ঠুকঠুক করছে–জিনিসটা জানে আমরা আসছি। সাবধানে এগিয়ে আসুন। লন্ঠনটা ধরে থাকবেন ঠিক করে- আমি দু হাতে ওটাকে—

খুলছি কিন্তু দরজাটা—আলোটা নিচু করে ধরুন। না না ওটা নিজে নিজে লাফ দেবে কেন? হাওয়ার ধাক্কায় উড়ে আসবে—আরেঃ—ফসকে গেল—ও মশাই, ধরুন, ধরুন ওটাকে—

দাঁড়ান আমি দরজাটা বন্ধ করে আসছি। আপনি ততপক্ষণে ওটাকে ওর বাক্সে—

একী? অত জোরে ছুঁড়ে ফেললেন যে? ও রেগে যায় ওরকম করলে—কী বললেন, আপনার হাতে দাঁত বসিয়ে দিয়েছে? যত বাজে কথা। রক্ত বের করে দিয়েছে কামড়ে? হতেই পারে না। খুব জোরে চেপে ধরেছিলেন বোধ হয়। এ হে হে চামড়াটা ছড়ে গেছে একটুখানি। দাঁড়ান ওষুধ লাগিয়ে দি।কংকালের দাঁত তো! বিষিয়ে উঠতে পারে। 

চলুন, যাওয়া যাক। লন্ঠনটা জ্বলুক। বাক্সটা আমি নিচ্ছি। এ হে খুলিটার মুখে রক্ত লেগে রয়েছে যে! দাঁড়ান, চোয়ালটা টেনে খুলে দাঁঅতগুলো মুছে দিই একটু। বিচ্ছিরি লাগছে দেখতে। না না সাবধানেই করব। ভয় নেই। আমায় কামড়াতে দেব না। এই যে নিন। হয়ে গেছে। এবারে বাক্সটাকে সিল করে কাবার্ডে ঢুকিয়ে—নিন, শুয়ে পড়া যাক। কী আশ্চর্য ব্যাপার বলুন তো? এখনো এ ঘরটার মধ্যে মেয়েদের জামাকাপড়ের হালকা গন্ধ রয়ে গেছে! পাশের ঘরেই আপনার বিছানা করা আছে।  গুড নাইট। আলোটা নিয়ে যান, কেমন?

নীচের খবরটা স্থানীয় কাগজে কয়েকদিন বাদে বের হয়েছিলঃ

bhooteraddagolpo (Medium)অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেনের রহস্যময় মৃত্যু

অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন চার্লস ব্র্যাডকের রহস্যময় মৃত্যু নিয়ে ট্রিডকোম্ব গ্রামে প্রবল উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। পঁয়ষট্টি বছরের নীরোগ, সবলদেহ এই বৃদ্ধকে তাঁর বিছানায় গত মঙ্গলবার রাতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কোন রহস্যময় আততায়ী তাঁর গলায় কামড়ে শ্বাসনালীটিকে গুঁড়িয়ে দেয়।

করোনারের জুরিরা ক্ষত পরীক্ষা করে রায় দিয়েছেন কোন অমিত শক্তিশালী মহিলা, যাঁর নীচের দুপাটি দাঁত নেই, এ কাজটি ঘটিয়েছেন। দাঁতের দাগের আকার থেকেই খুনি যে মহিলা সে সিদ্ধান্ত করা গিয়েছে। ঘরে ধ্বস্তাধ্বস্তির কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কেমন করে বন্ধ বাড়িতে খুনি ঢুকল বা সেখান থেকে বের হয়ে গেল তারও কোন হদিশ করা সম্ভব হয়নি এখনো। পুলিশ খুনির সন্ধান করছে—-