ভূতের আড্ডা-ভূতের গল্প

পূর্বপ্রকাশিতের পর

মারিয়ন ক্রফোর্ড

অনুবাদঃমহাশ্বেতা, ইন্দ্রশেখর

ও যখন পড়ে গেছিল, বা ওকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল—সে যাই ঘটে থাকুক- বাক্সটা বালিতে পড়ল, ঢাকনাটা খুলে এল, আর জিনিসটা বেরিয়ে এল, তারপরে তো তার গড়িয়ে পড়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু সে তা যায়নি। সেটা তার মাথার একদম ধারে প্রায় ছুঁয়েই বসে ছিল লক্ষ্মী হয়ে, মুখটা তার দিকেই ঘোরানো ছিল। লোকটার মুখে শুনে ব্যাপারটা আমার বিশেষ অদ্ভুত ঠেকেনি; কিন্তু আমি সেটা নিয়ে চিন্তা না করে আর পারলাম না, বারবার ভাবতে লাগলাম। শেষে চোখ বুজলেই গোটা দৃশ্যটা ভেসে উঠত আমার সামনে। আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম আপদটা নিচের দিকে গড়িয়ে যাওয়ার বদলে উপর দিকে উঠে কেন এসেছিল? আর অন্য কোথাও থামার বদলে ঠিক লিউকের মাথার ধারেই কেন বসেছিল এসে?

আপনি নিশ্চয়ই জানতে চান শেষমেষ এই ব্যাপারে কী উত্তর পেলাম আমি। গড়িয়ে যাওয়াটার কোনই ব্যাখ্যা পাইনি, মশাই। কিন্তু এই সময় আমার মাথায় আরেকটা চিন্তা বাসা বাঁধল, আর এতে আমার অশ্বস্তি বাড়ল বৈ কমল না। না, না, অলৌকিক কিছু নয়! ভুত থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। যদি থেকে থাকে্‌ তাহলে আমি মনে করি না যে সে কোনভাবেই জ্যান্ত মানুষের কোন ক্ষতি করতে পারে, শুধু একটু আধটু ভয় দেখানো বাদে। আর আমার ব্যক্তিগত মতামত এই যে সমুদ্রের গভীরে ঘন কুয়াশার বদলে আমি যেকোন ধরণের ভুতের সাক্ষাৎ করতে রাজি। না, আমার মনে খচখচানিটা ঘটাচ্ছিল একটা হাস্যকর চিন্তা, আর আমি জানিনা সেটা কীভাবে শুরু হয়েছিল, আর কীভাবেই বা নিজের মত বেড়ে উঠে সেটা একরকম ধ্রুবসত্যে পরিণত হল, তা আমি সত্যিই জানি না।

এক সন্ধেবেলা আমি লিউক ও তার বেচারি বউয়ের কথা ভাবছিলাম পাইপ টানতে টানতে, হাতে একটা একঘেঁয়ে বইও ছিল। হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা খুলিটা তো লিউকের বউয়েরই হতে পারে, আর তারপর থেকে এই চিন্তাটার হাত থেকে নিস্তার পাইনি আমি। আপনি নিশ্চয়ই বলবেন যে চিন্তাটার মাথামুন্ডু নেই কোন, মিসেস প্র্যাটকে যে কোন ক্রিশ্চানের মতই কবরখানায় কবর দেওয়া হয়েছে। আর তার বর কিনা তার মুন্ডুটা শোয়ার ঘরের আলমারিতে একটা বাক্সে ভরে রেখেছে! এই ভাবনাটাই তো ভয়ানক! কিন্তু সে যাই হোক, অনেক ভেবে, যুক্তি, সাধারণ বুদ্ধি ও সম্ভাব্যতার মুখোমুখি হয়ে আমি তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সে ঠিক এইটাই করেছিল। অবশ্য ডাক্তাররা তো কতই এরকম অদ্ভুতুরে কাজ করে টরে থাকে, তাতে আমার আপনার মত মানুষের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়।

তাহলে—বুঝতে পারছেন তো, খুলিটা যদি তার বউয়েরই হয় তাহলে সেটা লিউকের আলমারিতে আসবার একটাই উপায়-লিউকের তার বউটাকে খুন করেছিল, ঠিক যেভাবে আমার গল্পের বউটা খুন করেছিল তার স্বামীকে। আর খুনটা করে সে নিশ্চয় ভয় পেয়েছিল যে হয়ত একদিন ব্যাপারটা নিয়ে তদন্ত হবে, আর তাতে তার ধরা পড়বার সম্ভাবনা আছে। তাই মাথাটাকে—

মজা হল, এই কথাটাও আমি লিউককে বলেই এসেছিলাম। পঞ্চাশ ষাট বছর আগে, সেই মহিলার ঘটনাটা প্রকাশ্যে আসবার পর তার স্বামীদের কবর খুঁড়ে তিনটে করোটিও তুলে আনে পুলিশ। তাদের প্রত্যেকটার ভেতরে একটা করে সিসের ছোট্ট দলা টকাটক শব্দ করছিল।  ওইতেই তো মহিলার ফাঁসি হল! কথাটা লিউক মনে রেখেছিল নিশ্চয়। বউয়ের কানে সিসে ঢালবার পর এই কথাটা যখন তার মনে পড়ল তখন সে কী করেছিল? না মশায়। অত নারকীয় একটা দৃশ্য কল্পনা করতেও আমার রুচিতে বাধবে। আপনারাও নিশ্চয় ওসব দৃশ্যের কথা শোনবার জন্য গল্পটা পড়ছেন না? নাকি-চাইছেন? চাইলে পড়ে গল্পের এইখানটাতে নিজেই লিখে নিন না, সে দৃশ্যটা ঠিক কেমন ছিল? নিশ্চয় খুব ভয়ংকর দৃশ্য ভাবছেন, তাই না? ঠিক তাই। কেন যে আমি ছবির মত সবকিছু দেখতে পাই ব্যাপারটার  কে জানে? কাজটা লিউক করেছিল তার বউকে কবর দেবার আগের রাত্তিরে। কফিনের ডালা তখন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, বাড়ির কাজের মেয়েটাও ঘুমিয়ে, ঠিক তখন—

আমি বাজি ধরে বলতে পারি, মুণ্ডুটা কেটে নেবার পর তার জায়গায় লিউক একটা কিছু রেখে দিয়েছিল যাতে বোঝা না যায় মুন্ডুটা নেই। কী দিয়ে থাকতে পারে?

bhooteraddagalpo01 (Medium)আমায় পাগল ভাবছেন? তাতে আপনাদের দোষ নেই। নিজেই প্রথমে বললাম ওসব ভয়ানক দৃশ্য লেখবার রুচি আমার নেই। তারপর এমনভাবে বর্ণনাটা দিয়ে যাচ্ছি যেন সেখানে ঘটনার সময় আমি সশরীরে হাজির ছিলাম। যেমন ধরুন, বউয়ের মাথার জায়গায় লিউক কী দিয়েছিল সেটা আমি বলে দিতে পারি। দিয়েছিল মেয়েটার সেলাইয়ের ব্যাগটা। ব্যাগটা আমার পরিষ্কার মনে আছে, কারণ প্রত্যেকদিন সন্ধেবেলাই ব্যাগটা তার সঙ্গে থাকত। মখমল কাপড়ে তৈরি, ঠেসে জিনিসপত্র ভরলে সেটাকে দেখতে অনেকটা-বুঝতেই পারছেন। ঐ যে। আবার ভুরু কোঁচকাচ্ছেন। হাসুন, হাসুন, আপনি তো আর লিউককে গলানো সিসের গল্পটা শোনাননি, আর যে বাড়িটায় কাজতা করা হয়েছিল সেখানে আমার মত একলা একলা থাকেনও না। আমি নার্ভাস মানুষ নই। তবে মাঝে মাঝে আমি বুঝতে পারি কেন কোন কোন মানুষ এত নার্ভাস হয়। একা একা রাতে বসে এই সমস্ত কথা আমি ভাবতে থাকি, স্বপ্নও দেখে ফেলি মাঝেমধ্যে। আর, বস্তুটা যখন চিল্লায়, তখন তো—যাক গে!

কিন্তু আমার তো নার্ভাস হওয়া উচিত নয়। আমি একবার একটা ভূতুড়ে জাহাজে সওয়ারিও করেছি। জাহাজাটার মাস্তুলে একটা মানুষ দেখা দিয়েছিল, আর নাবিকদের বেশির ভাগই তারপর বন্দরে পৌঁছোবার দশদিনের মধ্যেই জ্বর হয়ে মারা পড়ে। কিন্তু আমার কিচ্ছুটি হয়নি সেবারে। আপনাদের মত আমিও কিছু কিছু ভয়ানক দৃশ্য দেখেছি জীবনে, যেমন সকলেই দেখে। কিন্তু তার কোনটাই এই খুলিটার মতন আমাকে চমকে দিতে পারেনি। অনেকবার—বুঝলেন, অনেকবার জিনিসটাকে বিদেয় করবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেটা তা মোটেই পছন্দ করে না। যেখানটায় সে আছে সেইখানটাতেই বসে থাকতে চায়। সেরা বেডরুমটাতে কাবার্ডের ভেতর মিসেস প্র্যাটের বাক্সটার মাথায়। অন্য কোথাও গিয়ে তার সুখ নেই। কেমন করে জানলাম? কারণ, আমি সে চেষ্টা করে দেখেছি। ভাবলেন কী করে যে আমি ওটাকে সরাবার চেষ্টা করিনি? ওখানে যদ্দিন ধরে ওটা আছে, মাঝেমাঝেই হঠাৎ হঠাৎ চিল্লিয়ে ওঠে, বিশেষ করে বছরের এই সময়টায়। কিন্তু জায়গা থেকে সরালে সে একটানা চিৎকার করে চলবে। চাকরবাকর কাজ ছেড়ে পালায় মশায়। একা হাতে ওই চিৎকার সয়ে দশ পনেরোদিন সব সামলাতে হয় তখন আমাকে। গ্রামের একটা লোক ও বাড়ির ছাদের নীচে এক রাতও কাটাতে চায় না এখন। বিক্রি করা বা ভাড়া দেয়া তো কল্পনারও অতীত। গ্রামের লোকজনের বক্তব্য ওখানে থাকলে আমার পরিণতিও খুব খারাপ হবে একসময়।

আমি অবশ্য তাতে ভয় পাই না। যত্তসব ননসেন্স। খালি একটা শব্দ। ও নিয়ে অত ভাববার কী আছে? চেয়ারের পাশে ভূত তো এসে দাঁড়াচ্ছে না আর ঘাড় মটকাবার জন্য! তাছাড়া খুলিটার ব্যাপারে আমি যেসব কথা ভাবছি সে সবই যে একেবারে ঠিক তাই বা কে বলল? মনে হয় ভুলই ভাবি, তাই না? হয়ত লিউক অনেক দিন আগে কোনোখান থেকে একটা সুন্দর নমুনা হিসেবে ওটা জোগাড় করে নিয়ে এসেছিল। আর ওটাকে নাড়ালে ভেতরে যে ঠকঠক করে শব্দ হয় সেটা একটা মাটির ড্যালা—হতেই পারে। অনেকদিন মাটির তলায় থাকা খুলির মধ্যে ওরকম মাটি  বা পাথরের নুড়ি তো ঢুকে যায়ই, তাই না? উঁহু। জিনিসটা আমি কখনো বের করে দেখবার চেষ্টা করিনি। কারণ ওটা যে ঠিক কী সেটা আমি জানতে সাহস পাই না। যদি ওটা সিসে হয় তাহলে তো আমিই ওর খুনটা করিয়েছি। তার সঙ্গে নিজে হাতে মারবার আর কী তফাৎ? তাই যতক্ষণ খুলিটার মধ্যে ঠিক কী রয়েছে সেটা না জানছি ততক্ষণ আমি আমার সন্দেহটাকে একটা ফালতু বাতিক বলেই চালিয়ে দিতে পারি নিজের কাছে। ভেবেই নিতে পারি যে মিসেস প্র্যাটের মৃত্যু একেবারেই স্বাভাবিক কোন কারণে ঘটেছিল আর লিউক যখন লন্ডনে ডাক্তারি পড়ছে তখন থেকেই খুলিটা ওর সঙ্গে ছিল, এইটেও ভেবে নিতে কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু—আমি সে ব্যাপারে খুব একটা নিশ্চিত নই।

সে যাই হোক, সবচেয়ে ভালো বেডরুমটাতে আরাম করে শোবার চেষ্টা আমাকে ছাড়তে হয়েছে। হ্যাঁ। আপনি বলতেই পারেন জ্বালানিপোড়ানিটাকে একটা পুকুরের জলে ছুঁড়ে ফেলে দিলেই তো ল্যাঠা চোকে। বলতেই পারেন! বলুন। কিন্তু প্লিজ ওই জ্বালানিপোড়ানি গালাগালটা দেবেন না। ও গালাগাল একদম সইতে পারে না।

ওই যে ফের শুরু হল। ভগবান! কী বিশ্রি আওয়াজ! বলেছিলাম আপনাকে, গাল দেবেন না! হল তো? নিন, পাইপে তামাক ঠাসুন দেখি ভালো করে! আর চেয়ারটা আগুনের কাছে ঠেলে নিন আরেকটু। কিছু পান করবেন নাকি? বাইরে আজ রাতটা বেজায় ভেজা আর ঠান্ডা তো, তাই বলছিলাম আর কি! বাতাস কেমন গোঁ গোঁ করছে শুনতে পাচ্ছেন?

ছবিঃ মৌসুমী

ক্রমশ