ভূতের আড্ডা- ভূতের বাড়ি-অভিশপ্ত ভানগড়- ইন্দ্রশেখর

bhuteradda01 (Medium)মাসুম ভার্গবের গল্প

ন বছর বয়স তখন আমার। আলোয়ারে থাকি। কাছেই ভানগড় দুর্গ। একদিন বাবা-মার সঙ্গে দুর্গের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি তখন হঠাৎ একটা বুড়ো লোক আমাদের সঙ্গ নিল। একাএকাই বিড়বিড় করে কথা বলছিল সে। কৌতুহল হতে আমি তার দিকে এগিয়ে যেতেই হঠাৎ বাবা আমার হাত ধরে টান মেরে সরিয়ে নিয়ে এল। লোকটাকে একটু খাবার দিয়ে আমরা অন্যদিকে চলে গেলাম। সে শুধু আমায় একপলক দেখল ঘুরে।

ফেরবার পথে দেখি সে আবার আমাদের সঙ্গ ধরেছে।ঠিক আমার পাশে পাশে হাঁততে হাঁটতে সে দুর্গের ব্যাপারে একটা ভয়ানক গল্প বলতে শুরু করে দিল। বাবা যত আমাকে টেনে সরায় তত সে আমার কাছে ঘেঁষে আসে আর গল্পটা বলতে থাকে। শেষমেষ বাবা আমাকে জোর করে কোলে তুলে নিয়ে বড়ো বড়ো পায়ে সেখান থেকে চলে এল। খানিক দূর এগিয়ে পেছন ফিরে দেখি কেউ কোথাও নেই। পেছনে খানিক দূরে একটা লোক হেঁটে আসছিল তাকে জিজ্ঞাসা করতে সে অবাক হয়ে বলে, কই , আমি তো অনেকক্ষণ ধরেই আপনাদের পেছন পেছন আসছি। কই সেরকম কোন বুঈধ লোককে আপনাদের সঙ্গে দেখিনি তো!

ভানগড় হল দিল্লি থেকে জয়পুর যেতে পথের পাশে একটা ছোট্ট গ্রাম। রাজস্থানের আলোয়ার জেলায়।

সেখানে যে দুর্গটা রয়েছে তাতে সূর্যাস্তের পরে যাওয়া মানা। দুর্গের দরজায় এ নিয়ে সরকারী নোটিসও রয়েছে একখানা।

এককালে এখানে বালু নাথ নামে এক সাধুর আস্তানা ছিল। রাজা মাধো সিং এইখানে একটা দুর্গ বানাতে চাইলে বালু নাথ তাঁকে এই শর্তে অনুমতি দেন যে দুর্গের ছায়া যেন কখনো তাঁর আশ্রমকে না ছোঁয়। কখনো তা ঘটলে সে বসতি ধ্বংস হয়ে যাবে।

শর্ত মেনে রাজা দুর্গ গড়তে শুরু করেন। প্রথমে ছোটো দুর্গই ছিল। কিন্তু তারপর তার আকার বাড়তে বাড়তে একদিন সত্যিসত্যিই দুর্গের ছায়া এসে ছুঁয়ে দিল বালু নাথের আশ্রমকে। এর পরেই সেই দুর্গ আর তার সংলগ্ন শহর দুর্ভাগ্যের এক বিচিত্র আঘাতে ধ্বংস হয়ে যায়। আজও সেখানে নাকি নতুন কোন বাড়ি তুলতে গেলেই তা ভেঙে পড়ে।

কোন দুর্ভাগ্যের আঘাতে দুর্গের এই পরিণতি ঘটেছিল তা নিয়েও একটা গা ছমছম গল্প চলে ও এলাকায়। সে হল রূপবতী রাজকন্যা রত্নাবলী আর তান্ত্রিক সিংগিয়ার গল্প। রাজকন্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে সিংগিয়া চেয়েছিল তাকে বিয়ে করতে। কিন্তু সোজা পথে তা হবার নয় বুঝে সে বাঁকা পথ নিল। একদিন রাজকন্যা দাসীকে সঙ্গে নিয়ে শহরের পথে বেরিয়েছেন। পথে পড়ল বাজার। রাজকন্যা দাসীকে পাঠালেন খানিক চুলে মাখবার গন্ধতেল কিনতে। সিংগিয়া ছায়ার মতন রাজকন্যার ঘোড়াকে অনুসরণ করছিল। দাসীকে তেল কিনতে যেতে দেখেই সে ও তেলের দোকানে গিয়ে হাজির। গন্ধতেলের পাত্রে সে জাদুমন্ত্র পড়ে দিয়ে এল, যাতে সে তেল চুলে দিলেই রাজকন্যা তার বশ মানবে।

ঘোড়ায় বসে দোকানের বাইরে থেকে রাজকন্যা ঠিকই দেখেছিল সিংগিয়ার কাজ। এইবার ভীষণ রেগে উঠল সে। তেলের পাত্র হাতে দাসী ফিরে আসতেই উলটো মন্ত্র পড়ে তেলের হাঁড়ি পথের ওপর ঢেলে দিল রাজকন্যা রত্নাবলী। অমনি তেল শুষে নিয়ে পায়ের নীচের সেই মাটি বিরাট এক পাথরের চাঁই হয়ে গিয়ে ধেয়ে গেল সিংগিয়ার দিকে। পালাতে পারেনি সিংগিয়া। পাথরের তলায় পিষে গিয়েছিল তার শরীর। মরবার আগে সে অভিশাপ দিয়ে যায়, রাজকন্যার প্রাণ যাবে অকালে, আর ভানগড়ের বুকেও নেমে আসবে অকালমৃত্যুর ছায়া। কেউ আর তাতে বাস করবে না কোনদিন।

সিংগিয়ার অভিশাপ ফলতে দেরি হয়নি। কয়েকদিনের মধ্যেই প্রতিবেশী রাজ্য আজবগড় আক্রমণ করল ভানগড়কে। ভানগড়ের মানুষ লড়াই দিল, কিন্তু আজবগড়ের সৈন্যদের হাতে মারা পড়ল তাদের প্রত্যেকে। রাজকন্যা নিজেও ঘোড়ার পিঠে যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ দিলেন।

শহর জ্বালিয়েপুড়িয়ে খাক করে দিলেও তাকে দখল করতে পারেনি আজবগড়ের সেনারা। কোন অদৃশ্য শক্তি তাদের বাধা দিয়েছিল। সে ছিল ভানগড়ের মৃত মানুষদের ভূতের দল।

bhuteradda02 (Medium)এখনও সেই আত্মার দল ভানগড়কে পাহারা দিয়ে চলেছে নাকি। তাদের আশা, রাজকুমারী রত্নাবলী একদিন না একদিন পুণর্জন্ম নিয়ে ফের ফিরে আসবেন ভানগড় দুর্গে। সেদিন তাঁর হাতে ভানগড়ের শাসনভার ফিরিয়ে দিয়ে তবে তাদের মুক্তি হবে।

বশু শতাব্দি কেটে গেছে তারপর। ভানগড় এখনো নিঃশব্দে তার শীতল, হিংস্র পরিত্যক্ত চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে আরাবল্লীর কোলে। দেশবিদেশ থেকে পর্যটকেরা আসেন তাকে দেখতে। সবাই একটা বিষয়ে একমত হন, ওর বাতাসে একটা তীব্র আতংকের স্পর্শ মেলে। সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় অবধি ওর ভেতরে মানুষের পা দেয়া মানা।

বারদুয়েক কিছু দুঃসাহসী সেখানে রাতের অন্ধকারে ঢোকবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার ফল ভালো হয়নি। দুই স্থানীয় দুঃসাহসী তরুণ কিছুকাল আগে সন্ধের পর সে দুর্গের ভেতরে গিয়ে ঢুকেছিল তার পাঁচিল টপকে। তারা আর ফিরে আসেনি। না, তারা মারা গেছে কিনা তা কেউ বলতে পারে না। শুধু, তাদের আর কোনদিন দেখা যায়নি। একেবারে উধাও হয়ে গেছে দুই তরুণ কোন চিহ্ন না রেখে।

কিছুদিন আগে আরো একটা দল ব্যাটারি আর আলোটালো নিয়ে গিয়ে ঢুকেছিল ভানগড় দুর্গে। ঢোকবার কিছুক্ষণের মধ্যেই দুর্ভাগ্য তাদের আঘাত করে। তাদের নেতাকে হঠাৎ করেই গিলে নেয় দুর্গের উঠোনের একটা কুয়ো। বাকি দলবল সঙ্গেসঙ্গে সেখানে আলো জ্বালিয়ে আলোর বৃত্তে তাদের পড়ে যাওয়া সঙ্গীকে ধরে রেখে দড়িদড়া নিয়ে তাকে উদ্ধার করে গাড়িতে চাপিয়ে দুর্গ থেকে বেরিয়ে রওনা দিতে যাবে তখনই নেমে আসে দ্বিতীয় আঘাত। তাদের ছুটন্ত গাড়িটা দুর্গ ছাড়াতে না ছাড়াতেই কোনকিছুতে ধাক্কা খেয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। ভানগড়ের রাতের রহস্য তারা কী দেখেছে তা বাইরের দুনিয়াকে জানাবার জন্য একজনও বেঁচে ফেরেনি। নিজের রহস্যকে নিজের বুকের ভেতরেই গোপন রেখে মৌন অহমিকায় আজও তাই আরাবল্লীর বুকে তেমনই দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই ধ্বংসস্তূপ। তার প্রিয় রাজকন্যা রত্নাবলীর পুণরাগমনের অপেক্ষায়? কে জানে?

পরের বার রাজস্থানে গেলে অবশ্যই দেখে এসো ভানগড়ের দুর্গ।