ভূতের আড্ডা-ভূতের বাড়ি

ভূতের বাড়ি

কুলধারা

bhuteradda5502 (Medium)

আজ থেকে ৫ শতাব্দি আগে জয়শলমির শহরের ১৭ কিলোমিটার পশ্চিমে কুলধারা নামে একটা গ্রাম ছিল। সমৃদ্ধ গ্রাম। প্রায় দেড় হাজার লোক থাকত সেখানে। তারা মূলত পালিওয়াল শ্রেণীর ব্রাহ্মণ। তাদের জমিদারের মেয়েটি ছিল ভারী সুন্দর। তার দিকে চোখ গেল জয়শলমিরের বদমাশ মন্ত্রী সালিম সিং-এর।খবর পাঠালেন সে মেয়েকে তিনি জোর করে বিয়ে করে নিয়ে যাবেন। তা না হলে জ্বালিয়ে দেয়া হবে গোটা গ্রাম।

পালিওয়ালরা এমন আদেশ মানতে রাজি হল না। সবাই মিলে একত্র হয়ে একটা সভা করল তারা। তারপর কী যে হল, এক রাত্রে হঠাৎ করে মিলিয়ে গেল গোটা গ্রামের সব লোকজন।  আর কোন চিহ্ন পাওয়া গেল না তাদের। একফোঁটা রক্তের দাগ, একটা মৃতদেহ, কিচ্ছু নেই সেখানে। ঘরগুলো ফাঁকা, তার ভেতরের সোনাদানা গয়নাগাঁটি, গোহালে গরু, ক্ষেতে ঝলমলে ফসল সব যেমন কে তেমনই রয়ে গেছে, শুধু মানুষগুলোই নেই। যাবার আগে তারা সে গ্রামের ওপর রেখে গেল এক ভয়ানক অভিশাপ।

ব্যাপারটা রহস্যময় কিন্তু লোভি মানুষদের কাছে এ ছিল মস্ত এক সুযোগ। কদিন বাদেই দখা গেল গুটি গুটি তেমন মানুষজন এসে ঢুকছে ফাঁকা গ্রামের চত্বরে। ফেলে যাওয়া বাড়ি, জমিজিরেত, পশুপক্ষীদের দখল নেবে তারা এমনটা তাদের মতলব।

দিনের বেলা কয়েকটা তেমন লোক এসে ঢুকেছিল গ্রামে। তাদের কোমরে তলোয়ার, পিঠে ধনুর্বাণ, হাতে বর্শা। ঘোড়ায় চড়ে এসেছিল তারা। কেউ তাদের বাধা দেয়নি।

কুলধারা গ্রামে ঢুকে ভালো ভালো ঘরগুলো বেছে নিল তারা। চলল খানাপিনা উৎসব। এমনি করে রাত হল। চাঁদ উঠল। আশপাশের অন্য গ্রামের মানুষেরা শুতে গেল। কুলধারা গ্রামের মাঝখানের চত্বরে তখনও দখলদার দুঃসাহসীদের হুল্লোড়ের শব্দ উঠছে।

মাঝরাতের পর হঠাৎ করেই গ্রামের ভেতর থেকে ভেসে এল রক্ত জল করা ভয়ংকর আর্তনাদ। প্রথমে একটা, তার পর একটার পর একতা সেই শব্দ উঠছিল সেখান থেকে। আর, সেইসঙ্গে কারা যেন হাসছিল, আনন্দ করছিল। কিন্তু তাদের গলা এই পৃথিবীর মত নয়। হাড়ে কাঁপুনি ধরায় তা।

সকালবেলা আশপাশের গ্রামের লোকজন গিয়ে দেখল, গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে দখলদারদের দেহ। ভয়ংকরভাবে খুন হয়েছে তারা। কিন্তু খুনি বা খুনের অস্ত্রের চিহ্নও নেই কোনখানে।

এর পর থেকে সহজে কেউ সেই অভিশপ্ত গ্রামে রাত কাটাতে সাহস করত না। মাঝেমধ্যে পঞ্চাশ একশো বছরে কোন দুঃসাহসী যদি সেখানে ঢুকে রাত কাটাতে গেছে, সে আর জীবন্ত ফিরে আসেনি।

এখনও গ্রামটা সেই পাঁচ শতাব্দি আগের মতই অবিকৃত আছে। ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব সর্বেক্ষণ তার দেখভাল করে। তবে হ্যাঁ, সেখানে তাদের কোন কর্মচারীও রাত কাটায় না।

bhuteradda5501 (Medium)২০১৩ সালে দিল্লি প্যারানর্মাল সোসাইটির আঠারো সদস্যের একটা দল সে গ্রামে রাত কাটাতে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ভূতটুত কিছু নয়, নেহাতই মনের ভুল সে সব সেই কথাটা যন্ত্রপাতি আর নিজেদের সাহস দিয়ে প্রমাণ করে দেয়া। এর আগে ভারতবর্ষের বহু ভূতুড়ে বাড়ির ভূতুড়ে তকমা ঘুচেছে তাঁদের হাতে।

পরীক্ষার জন্য দলটার নেতা গৌরব তিওয়ারি বেছে নেন একটা শনিবারের রাত। সে রাতে ১৮ জন দিল্লি থেকে আসা অভিযাত্রীর সঙ্গে যোগ দিলেন ১২ জন স্থানীয়। তাঁদের সঙ্গে ছিল-

১। ঘোস্ট বক্স (একধরণের রেডিও। চালিয়ে রাখলে এটা ক্রমাগত কিছু এলোমেলো শব্দের টুকরো আর নানা রেডিও স্টেশনের ব্রডকাস্টের টুকরোটাকরা শব্দ স্পিকারে দিতে থাকে। ভূতেরা সেগুলোকে সাজিয়ে নিজেদের কথাবার্তা তৈরি করে লোকেদের শোনায়।)

২। কে-২ মিটার ডিভাইস (এটি ক্রমাগত চারপাশের তাপমাত্রা বাড়াকমার পরিমাপ করতে থাকে)

৩। কমশক্তির লেজার আলো।

সারারাত ধরে সেই গ্রামে তাদের বেজায় উৎপাত সহ্য করতে হয়েছে। যেমন ধর, লেজারের আলো এখানে সেখানে ছড়াতে তাতে ধরা পড়েছে বিচিত্র সব চলমান ছায়া, তাদের গাড়ির কাচে নিজেনিজেই ফুটে উঠেছে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের হাতের ছাপ, যেন অদৃশ্য বাচ্চারা কৌতুহলী হয়ে গাড়ির কাচে হাত রেখেছে। কে-২ ডিভাইসে ধরা পড়েছে পাঁচ হাত দূরের দুটো স্পটে তাপমাত্রার বিরাট তফাৎ। ঘোস্ট বক্সে থেকেথেকেই ভেসে এসেছে অজানা বিকট গলায় বলা কিছু নাম। একজনকে তো দুই কাঁধে ধরে কে যেন এক রামঝাঁকুনিও দিয়ে ফেলেছিল হঠাৎ। সে ঘুরে অবশ্য কিছু দেখতে পায়নি।

সোসাইটির লোকজন এখন অবধি ভারতের পাঁচশো ভূতবাড়িতে রাত কাটিয়েছেন।, কিন্তু এই প্রথম এতবড়ো দলটা বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে কুলধারা থেকে পরদিন সকালে উঠেই তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়েছেন। কুলধারার রহস্য সমাধান হয়নি।