ভ্রমণ অন্যভ্রমণ রজত চক্রবর্তী বসন্ত ২০২০

অন্যভ্রমণ

রজত চক্রবর্তী

উৎসঃ আশ কথা পাশ কথা” গ্রন্থ থেকে লেখকের অনুমতিক্রমে প্রকাশিত।
প্রকাশকঃ রূপালী পাবলিকেশন
২০৬, বিধান সরণি, কলকাতা ৭০০০০৬

পায়ে পায়ে হরিপদ

টিকিট-হোটেল বুকিংময় বেড়ানোর প্রয়োগবিধি জানে না হরিপদ। একটা মাঝারি ব্যাগ কাঁধে তুলেই ব্যস। চোখে তখন দৃশ্যের বানভাসি, পাহাড়-সমুদ্র-জঙ্গল-মন্দির-নদী-ঝরনা সব সবকিছু ওলটপালট খাচ্ছে। হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ছে মাথায় অচেনা দেশ, অচেনা মানুষ। অচেনা পথ ডাকছে। আয়, আয়। অস্থির হয়ে ওঠে হরিপদ। সুতোর রঙে গোলমাল হয়, জট পাকিয়ে যায় নানা রঙের সুতোয়। তাতের সুতো রং করা, তাঁতের কাজ করাই হরিপদর পেশা। হরিপদ চক্রবর্তী। জন্ম বর্ধমান জেলার সমুদ্রগড়ের বিদ্যানগর গ্রামে। যুবক হরিপদ চলে আসে শান্তিপুরে। কারণ, শান্তিপুরে তাঁতের কাজের মজুরি বেশি। সুতোয় জট পাকানো মানেই সব হিসাবে গণ্ডগোল। মহাজনি ব্যাপার। কিন্তু হরিপদ এলে-বেতোল হয়ে গিয়েছে। বাউল-মনে জট পেকেছে। ভোরে সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে চুপ করে। রাতে গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদের সাথে কথা বলে।। ব্যাগে গেলাস-বাটি-থালা-চাদর-গামছা-ধুতি-দু-বোতল জল। কোথায় যাচ্ছে? জানে না। কোনদিকে তার পথ? তাও অজানা। শিক্ষা তার ফাইভ-সিক্স পর্যন্ত। ভূগোল বইটা ছিল প্রিয়। হরেক দেশের নাম তার জানা ওখান থেকেই। এই রাজ্য দেখব বলে ঠিক করে বেরিয়ে পড়ে কখনও একবছরের জন্য, কখনও তা দুই থেকে ছ’বছর। হরিপদ হাঁটতে থাকে। প্রকৃতির রকমফের, অপার সৌন্দর্য। দেখতে দেখতে চলে। কোনও তাড়া নেই। ফেরার টিকিটও সঙ্গে নেই। ঝপ ঝপ করে ‘আমি এসেছিলুম’ মার্কা ছবি তুলেই ধাঁ, আর তাতে দেখা হয়ে গেল লছমনঝোলা-চেরাপুঞ্জি-কাজিরাঙ্গা—এরকম হরিপদর ভ্রমণ নয়। সে বেড়ায় দেখবার জন্য, দেখাবার জন্য নয়।

পঞ্চাশ বছর ধরে সারা ভারত চষে বেড়িয়েছে হরিপদ চক্রবর্তী। পায়ে পায়ে। পথে পথে। তার দরকার হয় না স্থানমাহাত্ম্য জানার। পথ তাকে পথ চেনায়। পথে যা পড়ে, নতুন নদী, নতুন মানুষ, পাহাড়-ঝরনা-মন্দির-গাছ-রং সবই তাকে টানে। ঘর থেকে বের করে। বিয়ে করেছে একটাই শর্তে, ‘আমি মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়ি, হেঁটে-হেঁটেই একবছর-দু’বছরের জন্য, তখন ঘরসংসার সামলাতে হবে।’ সংসারী হরিপদকে প্রশ্ন করলে শহুরে স্মার্টনেসের সামনে পড়ে একটু তোতলামো এসে যায়, হঠাৎ চুপ হয়েও যায়। তবে গল্প পেলে তুবড়ি ফোটে। একদমে বলে চলে, সন্ধের আগে গ্রাম না পেয়ে উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে গাছের ডালে নিজেকে বেঁধে নিশ্চিন্ত ঘুমের কথা। মধ্যপ্রদেশে দু’জন পিস্তল ধরেছিল হরিপদর মাথায়। সামনে চেকপোস্ট। গুণ্ডা দু’জন হরিপদর ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল প্যাকেট। হরিনামের সাথে হরিপদ পেরিয়ে গেল চেকপোস্ট। অন্য একটা লোক এসে ব্যাগ হাঁটকে নিয়ে গেল সে প্যাকেট। উত্তরপ্রদেশের গ্রামের রাস্তায় সাধু ভেবে সবাই গোছা গোছা ধূপ দিয়ে যাচ্ছিল, ‘আর ইদিকে প্যাটে খিদা।’ মাঠের মাঝে সব ধূপ জ্বালিয়ে বসে থাকল। কিছুক্ষণ পরে গ্রামের মাতব্বরের লোকেরা তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে টাকা-পয়সা-কাপড়-চোপড়-খাবার-দাবার বোঁচকা বেঁধে দিয়ে দেয়। হরিপদ মহানন্দে আবার পথে। হারিয়ে যাওয়া স্বামী ভেবে নাছোড় মহিলার হাত থেকে পালানো, আর বাঘের থাবা থেকে বেঁচে ফেরা। সমান আকর্ষণ হরিপদর কাছে। ওড়িশায় চোর ভেবে পাবলিকের মার এবং থানার হেপাজতে। পুলিশ সব শুনে ছেড়ে দেয় এবং থানার স্ট্যাম্প মেরে শংসাপত্রও দেয়। সেই থেকে হরিপদ থানা, সরকারি অফিসার, স্টেশন মাস্টার যেখানে যায় একটা সার্টিফিকেট নিয়ে নেয়। সাদা কাগজে নিদেনপক্ষে একটা স্ট্যাম্প। ব্যাগভর্তি কাগজ। নোংরা পলিথিনে স্টেপল করা। হিন্দি-ইংরেজিতে অজস্র সার্টিফিকেট। ভারতের নানা নাম-না-জানা থানার অস্পষ্ট স্ট্যাম্প। শহুরে কেতায় বিশ্বাসহীন চোখে ঘাঁটাঘাঁটি করি এক ব্যাগ কাগজ। কাঁপা কাঁপা কাঁচা হাতের লেখায় ছেঁড়া কাগজে লিখেছে রাজ্যগুলোর নাম, যেগুলো সে দেখেছে। কাশ্মীর আর হিমাচলপ্রদেশ দেখতে বেরোবে এবার। তিয়াত্তর বছর বয়সে। দড়ি পাকানো শক্ত শরীর। পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি।

“এখনও বাকি আছে?”

চুপ হরিপদ।

“একটা বিড়ি হবে?” সম্বিৎ ফেরে হরিপদর।

শুধু, শুধুমাত্র দেখার ইচ্ছাই একজনকে ভ্রামণিক করে। ছোটো ছোটো উজ্জ্বল চোখের তারায় তারায় সহস্র অযুত ছবি। সে হারিয়ে যায় প্রকৃতির টানে। যে হারিয়ে যেতে পারে সে কি ‘হেরো’? জীবনযুদ্ধে হয়তো বা, কিন্তু হরিপদ চক্রবর্তী কোথাও যেন ‘হিরো’।

“আরও কত কী দেখার পইড়ে থাইকল!” উদাস তাকিয়ে থাকে হরিপদ আকাশের দিকে। মেঘ ভেসে যায় তার চোখের তারায় তারায়।

ভ্রমণ সব লেখা একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s