ভ্রমণ পৃথিবী,জল ও ভালবাসা সুজয় রায় শীত ২০১৭

সুজয় রায় -এর সব লেখা একত্রে

 

যেখানে আকাশ, পৃথিবী, জল ও ভালোবাসা মেশে লক্ষ একর অরণ্যে

সুজয় রায়

Henry David Thoreau, আমেরিকার সুবিখ্যাত নিসর্গ-বিলাসী, চিন্তানায়ক ও লেখক   বলেছিলেন, অরণ্য সভ্যতাকে বাঁচাবে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ম্যাসাচুসেটস-এর Concord শহরে পেন্সিল তৈরি করে আড়ম্বরহীন জীবনযাপন করতেন। আজ নগরায়ন বেড়ে গ্রাস করে নেয় তৃণভূমি ও শ্যামল বন। তাই এই মনিষীর বাণী স্মরণ করা হয়। বর্তমান জগতে পরিবেশ সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত জরুরি ঠেকছে। আমেরিকার Appalachian National Scenic Trail ২১৭৫ মাইল লম্বা সরকার সংরক্ষিত দীর্ঘতম ভ্রমণপথ। দেশের দক্ষিণে জর্জিয়াতে Springer Mountain থেকে শুরু করে ১৪টি রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে উত্তর-পূর্বে Maine-এ Mount Katahdin গিয়ে শেষ হয়। একে চলতি কথায় public footpath বলা হয়। Appalachian পর্বতমালা কিন্তু Maine অতিক্রম করে কানাডাতে প্রবেশ করে হয়েছে একটা আন্তর্জাতিক ভ্রমণপথ। আমেরিকার প্রাকৃতিক সম্ভার অপার।

আমি গিয়েছিলাম যেখানে জল, আকাশ, ও মাটি মেশে লক্ষ একর জঙ্গলে। আমেরিকার ত্রিশ শতাংশ মানুষ পৃথুল, তারা  অমিতাহারী; হট ডগ, আলু ভাজা ও কোক প্রিয় তাদের। খাওয়া প্রচুর, অপচয় না হলে তারা সচ্ছন্দ বোধ করে না। জোরে বলে কথা, উচ্চগ্রামে হাসে, জীবনযাত্রা বড়ো মাপের। গ্রীষ্মে একবার long weekend, অর্থাৎ সপ্তাহে তিনদিন ছুটি পাওয়া গেল। হাইওয়ে ও ইন্টার-স্টেট রাস্তা ধরে গাড়ি চলেছে গটর গটর। অসংখ্য গাড়ি কিন্তু অবাধ গতি তাদের। রাস্তার প্রসারতা আমরা কল্পনা করতে পারি না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি আগ্রাসী পন্থা নিয়ে ইউরোপে প্রতিবেশী রাষ্ট্রদের গ্রাস করেছিল জার্মান নাগরিকদের বাসযোগ্য যথেষ্ট জমি (‘Lebansurum’, i.e, living space) সংকুলান করবার প্রধান প্রয়োজনে। আমেরিকার মেদিনী এতটাই যে মানুষ সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে পারে।

গাড়িতে সস্ত্রীক চলেছি Illinois, Iowa, Wisconsin, Michigan ইত্যাদি রাষ্ট্রের এপার ওপার করে। পালা করে গাড়ি চালাচ্ছে পুত্র ও পুত্রবধু, সঙ্গে আছে ছোটো নাতিটি। বিশেষভাবে রাস্তায় চোখে পড়ে সারিবদ্ধ চলেছে Recreational Vehicle (RV)। গাড়ি টেনে নিয়ে চলেছে চার চাকার বসবাসযোগ্য একতল বা দ্বিতল ভ্যানকে। আমোদ-প্রমোদ, খেলা, শ্রান্তি-বিনোদনের সব উপাদান ও উপকরণ ভ্যানে আছে। বেশি বয়সের মানুষেরা বিষয়-সম্পত্তি বিক্রী করে এই বন্ধনহীন জীবনযাত্রা বেছে নিয়ে সুখী। পথকে তারা প্রমোদ উদ্যান করে নিয়েছে।

Iowa-কে ‘Food capital of the world’ গণ্য করা হয়। প্রধানত গম ও আখ এখানে উৎপন্ন হয়। কৃষিজীবিদের গড়ে হাজার একর জমি আছে। মেদিনী কতটা চাই! John Deeree কোম্পানি গত একশো আশি বছর যাবত ক্রমান্বয়ে অত্যাধুনিক উন্নত যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করে চলেছে যা কৃষিকে বড়ো মানের সফলতা দিয়েছে। Moline (Illinois) শহরে এর কেন্দ্র ও সাঁইত্রিশটা ভিন্ন দেশে এর কার্যনির্বাহি শাখা রয়েছে। আমেরিকাতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রায় নিত্য সঙ্গী। Iowa-তে বছরে প্রায় পঁয়ত্রিশটা টর্নেডো হানা দেয়। শহরের মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় থাকে মলে। আর থাকে পর্যাপ্ত খাবার ও বিছানা, কন্বল।

আমাদের গাড়ি চলেছে দুরন্ত গতিতে। না, জানতে চেয়ো না পথ কত বাকি। G.P.S. (Global Positioning System) যন্ত্রের সাহায্যে নির্ণয় করে নিই এখন এলাম কোথায়, রাস্তার ম্যাপ, গ্যাস অর্থাৎ পেট্রল স্টেশন, মাঝপথে আহারের প্রয়োজনে MacDonald’s, Starbuck-এ ফাস্টফুড, কোন সরাইখানায় রাতের বিশ্রামটা পাওয়া যাবে – নানান জরুরি জানকারি।

Moline (Illinois) থেকে যাত্রা শুরু করা হয়েছে। গলা শুকিয়ে গেলে গ্যাস স্টেশনে energy drinks তুলে নেওয়া যায়। আমরা ছুটে চলেছি যেন যাযাবর। উত্তর আমেরিকার Prairie ঘাসে ঢাকা সামান্য ঢেউ খেলানো বহু দূর প্রান্তর। অন্যত্র Savannah অর্থাৎ গাছপালাবিহীন ন্যাড়া প্রান্তর। যে অঞ্চলে পথের ধারে ঘন ঘাস, সে যেন ঠাস বুনোনে দিগন্তজুড়ে golf course। আমাদের চোখে কালো চশমা, গাড়িতে একটা কোমল বাজনা মন বিবাগী করে তুলছে।

Madison এক ঝকঝকে শহর। Wisconsin-এর রাজধানী। এটা অবস্থিত Lake Superior আর Mississippi নদীর মাঝখানে। Governor House-এ আছে সেখানকার Supreme Court আর আইনসভা। Supreme Court-এ দর্শকদের যাওয়া চলে। এর কারুকার্যখচিত ভেতরকার দৃশ্য চোখ কেড়ে নেয়।

এর পরে যাত্রায় বলার কথা Lake Superior, যা  Michigan-এ অবস্থিত। এটা এ দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল। এখানে শীত বেশি। এই লেক আমেরিকার চার National Lake-এর মধ্যে একটি। এটি পৃথিবীর সবচাইতে দীর্ঘ fresh water লেক। এর জল এতই গভীর যে জল ছাড়া পেলে আমেরিকার ৪৮ রাজ্য হাঁটু পর্যন্ত ভরে যাবে। প্রসঙ্গত, Yellowstone, Grand Canyon, Shenandoah ও Smoky Mountains-কে দেশের National Park ধরা হয়। এই সমস্ত এই দেশে প্রকৃতির সম্ভার। Lake Superior সৃষ্টি হয়েছিল glacier বা হিমবাহ গলে। সেই বরফ গলা জল এসে পড়ে কানাডার Ontario প্রদেশ থেকে।

এই দিগন্তবিস্তৃত লেকের জলরাশি সরবে মথিত করে স্টীমার টুরিস্টদের নিয়ে বিহার করে। এর জল স্বচ্ছ। নীল আকাশ লেকের জলে মুগ্ধ হয়ে আপনার মুখ দেখছে। পাড়ে প্রায় কয়েকশো ফুট উঁচু sandstone pictured rocks নামে খ্যাত । লেকের এই রঙিন পাড় ২৭ কিমি দীর্ঘ। তাদের রঙের বৈচিত্র চিত্রকারের খামখেয়ালি ছবি যেন। লক্ষ বছর আগেকার কথা। হিমবাহ পিছু হটেছিল, রেখে গিয়েছিল জলরাশি। সেইভাবে লেকের সৃষ্টি। Ontario-তে বেশ কয়কটি kettle lake রয়েছে যা হিমপুষ্ট নদীর অববাহিকার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছে। জলযানে আমরা দেশবিদেশের টুরিস্ট চলেছিলাম জোর গতিতে। হিমশীতল বাতাসে মুখ, কান অসাড় হয়ে যাচ্ছে। ঐ হাওয়ায় মাথার টুপিটা যেন ডানা মেলে উড়ে গেল।  স্টীমারের গাইড উষ্ণ গলায় বন্ধুত্বের ঢঙে বিবরণ দিয়ে চলেছে। তা এমনই মজার যেন বাড়তি লাভ এবং তথ্যবহুলও বটে। আমরা চিৎকার করে আমোদ করছি। কিন্তু হাওয়ার গর্জনে তা শুনবার উপায় নেই। সমুদ্রের বেলাভূমিতে জলোচ্ছ্বাস কোলাহল ছাপিয়ে যাচ্ছে যেন। সামনে উধাও দিগন্ত। প্রকৃতির মুক্তাঙ্গন।

তাই তো রবি ঠাকুর বলেছেন, রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ  ইন্দ্রিয়ের সবক’টা দ্বার খুলে দিয়ে অনুভব করতে হবে – ‘fullest utterance of nature’।

সমস্ত জয়ঢাকি ভ্রমণ একসাথে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s