ভ্রমণ-আন্দামানে আনন্দ-অলোক গাঙ্গুলী-শরৎ ২০২০

আন্দামানে আনন্দ

অলোক গাঙ্গুলী

ফেলুদা কোনও রহস্য সমাধানের জন্য আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে যায়নি অথবা জটায়ুর কাহিনিতেও আন্দামানে তার উপন্যাসের নায়ক প্রখর রুদ্রকে নিয়ে কোনও রহস্য-রোমাঞ্চকর উপন্যাসের উল্লেখ নেই। তবে কাকাবাবু গিয়েছিলেন আন্দামানে। এক রহস্য সমাধান করে এসেছিলেন জাড়োয়াদের বাসভূমিতে পৌঁছে। গল্পে অবশ্য বলা আছে জাড়োয়ারা এক অন্য দ্বীপে থাকে, কিন্তু বাস্তবে তারা পোর্টব্লেয়ার থেকে কিছুটা দূরে জিরকাটাং বলে এক জায়গা আছে যেখানে ওদের বাস। জিরাকাটাং এখন কিন্তু জাড়োয়া রিজার্ভড। কাকাবাবু ফিরেছিলেন পোর্টব্লেয়ারের সেলুলার জেল থেকে ব্রিটিশদের খপ্পর থেকে পালানো বন্দি গুণদা তালুকদারের সন্ধান নিয়ে।

আজ ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে আমরা যখন পোর্টব্লেয়ারে এলাম তখন অনেক ইতিহাসই জানা হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও এখানে অনেক এমন দ্বীপ আছে যেখানে কোনও মানুষ পা রাখেনি। তাই ওসব দ্বীপে কী আছে এখনও সেটা এক রহস্য। আমাদের কাছে এখন না আছে ফেলুদা, আর না আছে কাকাবাবু যে এই রহস্যের সমাধান করবে। আমরা এখানে এসেছি এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশের আনন্দ পেতে কেবল। কিন্তু কে জানত যে এই আনন্দ-ভ্রমণের পর এইভাবে বন্দিদশা কাটাতে হবে। এখন এই লকডাউনের মধ্যে কেবলমাত্র স্মৃতিরোমন্থন করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই, পুরনো অ্যালবাম ঘেঁটে ছবি দেখে মনে আনন্দ পাওয়া।

কলকাতা থেকে উড়ানে ঠিক দু’ঘণ্টার মধ্যে পোর্টব্লেয়ারের বীর সাভারকার বিমানবন্দরে অবতরণ করা যায় সব কিছু ঠিকঠাক চললে। প্রথমদিন হোটেলে পৌঁছেই স্নান আহার সেরে নিয়ে আমরা প্রস্তুত হয়ে নিলাম ভারতবর্ষের বিখ্যাত জাতীয় ঐতিহ্য দর্শন করার জন্য, সেলুলার জেল,  যার নাম শুনলে এখনও শিরদাঁড়া বেয়ে এক মারাত্মক কম্পন অনুভব করা যায়।

সেই সময় আমাদের বিপ্লবীদের ব্রিটিশ প্রশাসকদের হাতে কীরকম নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হত তা এখানে মডেল বানিয়ে প্রদর্শিত করা রয়েছে। দেশকে বিদেশি শাসনের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য আমাদের বিপ্লবীরা যখন বিভিন্ন আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে ব্রিটিশ শাসকদের হাতে ধরা পড়তেন, তাঁদের সাজা হত আন্দামানের দ্বীপান্তর। তখনকার আন্দামান আর আজকের আন্দামান এক নয়। তাদের স্থান হত সেলুলার জেলে, যা নরক থেকেও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। জেলের ছোটো খুপরিগুলোতে কীরকম শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে তাঁদেরকে বছরের পর বছর দিনযাপন করতে হয়েছে সেটা দেখলেই অনুমান করা যায়। কেউ সেই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বেছে নিয়েছিলেন আত্মহত্যার পথ, কেউ পাগল হয়েছেন আর কেউ সারাজীবনের জন্য পঙ্গু। সন্ধেবেলা এখানেই লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো হয়। তাতে আন্দামানের ইতিহাসের বিবরণ দেওয়া আছে। কীভাবে মানুষ এখানে প্রথম বসতি গড়ে, কীভাবে ব্রিটিশরা দখল করে, বিপ্লবীদের ‘শিক্ষা’ দেবার তরে জেল প্রতিষ্ঠা আর ব্রিটিশদের বিপ্লবীদের ওপর অমানবিক অত্যাচার—সবই তুলে ধরা হয় এখানে। জেলের কুঠুরির ভেতর বন্দিদের আর্তনাদ, প্রতিটি বেত্রাঘাতের সঙ্গে তাঁদের ‘বন্দেমাতরম’ চিৎকার মনকে ভারাক্রান্ত করে। আমরা আজ আনন্দ পাওয়ার জন্য এঁদের এই যন্ত্রণার স্থান দেখতে আসি। এই স্থানে ভ্রমণ কোনও তীর্থযাত্রা থেকে কম নয়।

জানা যায় যে মোট ৫৫৬টি দ্বীপ নিয়ে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ গঠিত, যার মধ্যে কেবল ৩৭টি দ্বীপ বসবাসযোগ্য। তার মধ্যে কিছু অত্যন্ত আক্রমণাত্মক আদিবাসী সম্প্রদায় আছে, যেমন সেন্টিনেল—তারা সভ্য মানুষদের তাদের দ্বীপের কাছেই আসতে দেবে না। বারাটাং যাওয়ার পথে পড়ে জিরকাটাং, যেটা এখন জাড়োয়া রিজার্ভড বলে চিহ্নিত। গাড়ি চলার সময় এই রাস্তায় ক্যামেরা, মোবাইল ফোন বাইরে বের করে রাখা আইনত দণ্ডনীয়। জাড়োয়াদের ছবি তোলা বা তাদের দিকে কোনোরকম আকার ইঙ্গিত করলে দশ বছরের কারাবাস এবং দশ হাজার টাকা জরিমানা বা দুটোই হতে পারে। অতএব সাবধানের মার নেই। আমরা যথেষ্ট ভাগ্যবান যে রাস্তায় এক জাড়োয়া দম্পতি দেখতে পেয়েছিলাম। জাড়োয়া মহিলার কোলে এক শিশু আর পুরুষের হাতে তির-ধনুক ও একটা বল্লম। সম্ভবত তারা বেরিয়েছে কোনও কাজে আর পথে যদি শিকার মেলে তবে সেটাও উপভোগ্য। শোনা যায় আজকাল এদের শিক্ষিত করার কাজ চলছে বিভিন্ন এনজিওর তরফ থেকে। প্রতি সপ্তাহে একবার করে চিকিৎসা কেন্দ্র খোলা হয় এদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য। জাড়োয়া শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ও আছে। এদের আর আগের মতো নগ্ন অবস্থায় দেখা যায় না। রীতিমতো জামাকাপড়ে সজ্জিত। তবুও সেই বাল্যকালে দেখা ছবি ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’, তপন সিংহের ছায়াছবিতে যে জাড়োয়া দেখানো হয়েছিল, সেই আক্রমণাত্মক মনোভাব আর ওদের মধ্যে নেই। কিন্তু আমাদের সভ্য সমাজের মানুষদের কৌতূহল অপরিসীম।

পোর্টব্লেয়ার

আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী পোর্টব্লেয়ার অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম শহর। রাস্তাঘাট পরিষ্কার, মানুষ, গাড়ি সবকিছু বিধি মেনেই চলে। ১৭৮৯ সালে ব্রিটিশ নৌ সেনা অফিসার লেফটেন্যান্ট আর্চিবাল্ড ব্লেয়ার এখানে স্থাপত্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর নামেই এই প্রধান বন্দর শহরের নামকরণ। এখন অবশ্য অনেক দ্বীপের নতুন করে ভারতীয় নাম দেওয়া হয়েছে। এই শহরে বেশ কিছু জাদুঘর ও প্রদর্শশালা রয়েছে এখানকার সামুদ্রিক জীবদের ওপরে যা দেখতে গিয়ে এই দ্বীপপুঞ্জের সামুদ্রিক সমস্ত প্রাণীর সম্বন্ধে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। পোর্টব্লেয়ার থেকে সবথেকে কাছের দ্বীপ হল রস দ্বীপ। এখানকার অ্যাবার্ডিন ফেরিঘাট থেকে নিয়মিত স্পিডবোট ছাড়ে রস দ্বীপ যাওয়ার জন্য।

এই অ্যাবার্ডিন ডকে নানারকম জলক্রীড়ার বন্দোবস্ত রয়েছে। এই ডকের আরেক নাম রাজীব গান্ধী ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স। পোর্টব্লেয়ারের প্রধান বাজারের নামও অ্যাবার্ডিন বাজার। তপন সিংহের ছবিতে পুরাতন অ্যাবার্ডিন বাজারের কিছু দৃশ্য রয়েছে।

পোর্টব্লেয়ার থেকে প্রায় ২৫ কিমি দূরে এক অপূর্ব স্থান চিড়িয়া টাপু। এই স্থানকে মুন্ডা পাহাড়ও বলা হয়। টাপু নাম থেকেই বোঝা যায় যে এক স্থলস্থান যার চারপাশে জল, অর্থাৎ একটা উঁচু দ্বীপ। আর চিড়িয়া বলতে অবশ্যই আর বিশদ বিবরণের প্রয়োজন নেই। হ্যাঁ, এই জায়গাটি পক্ষিপ্রেমিকদের জন্য আদর্শ। পর্যটকেরা আসে এখানকার নির্মল নির্জনতা ও সায়াহ্নে সূর্যাস্ত দেখার জন্য। এখানে সমুদ্র ভীষণ শান্ত, ঢেউ নেই বললেই চলে। দূরে ছোটো ছোটো পাহাড় রয়েছে, যাকে টাপু বলা যেতেই পারে আর ওই পাহাড়ের পেছনে যখন সূর্য ঢলে পড়ে তখন এই স্থানের দৃশ্য হয়ে ওঠে নৈসর্গিক।

পোর্টব্লেয়ার শহরে আমার তো কেবল মনে হত একটা দু’চাকার বাহন নিয়ে ঘুরে বেড়াই এদিক ওদিক। এমনিতেই রাস্তাঘাট ফাঁকা, মানুষজন নিয়মবিধি মেনে চলে, তাই গাড়ি চালানোর পক্ষে যথেষ্ট নিরাপদ। পথের একদিকে সবুজ গাছপালা, আরেকদিকে নীল সমুদ্র। এখানকার স্থায়ী বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, ওরা বেশ আনন্দেই থাকে। কোনও ঝগড়াঝাঁটি, দলবাজি নেই, রয়েছে অপরিসীম শান্তি। এখানে থেকে গেলে মন্দ হয় না। কিন্তু আমার আবার একটা অন্য ভয় আছে মনে। আমি ঝড়কে ভীষণ ভয় করি। আর এখানে সামুদ্রিক ঝড় যেকোনও সময় আছড়ে পড়তে পারে, যেমন বঙ্গোপসাগরে উৎপত্তি হয়েছিল আমফান ঘূর্ণিঝড়ের। যদিও বা সেই ঝড় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে তেমন ক্ষয়ক্ষতি করেনি। এখানকার নেতিবাচক দিকগুলো হল, এখানে বারোমাস জুড়েই গ্রীষ্ম থাকে। দ্রব্যমূল্য অত্যধিক দেশের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায়। তাই কোনও দ্রব্য ক্রয় করার আগে অবশ্যই ভেবে নিতে হবে যে সেই দ্রব্যটা কেবলমাত্র এখানেই পাওয়া যায়।

হ্যাভলক (স্বরাজ দ্বীপ) ও রাধানগর সমুদ্রসৈকত

আমার হাতে মাত্র সাতদিনের সময় ছিল যা আন্দামান বেড়ানোর জন্য একদমই উপযুক্ত নয়। আমরা কেবল দক্ষিণ আন্দামানের কিছু দ্বীপে ঘুরেছি, তাতেই ভীষণ আনন্দ পেয়েছি। সময় সুযোগ হলে আবার পরে একবার লিটল আন্দামান বেড়িয়ে আসার ইচ্ছে থাকল।

সকাল ন’টায় পোর্টব্লেয়ারের হ্যাডো ডক থেকে হ্যাভলক দ্বীপ যাওয়ার জাহাজ ছাড়ে। আমাদের দলের টিকিট ম্যাকরুজ নামের এক জাহাজে আগেই কেটে রাখা ছিল আর ওখানে থাকার বন্দোবস্ত এল-ডোরাডো নামের এক হোটেলে করা ছিল। এল-ডোরাডো নাম শুনেই তো আমার দারুণ উৎসাহ হচ্ছিল, কী জানি ওখানে কেমন সোনার শহর দেখতে পাব। এই প্রথম আমি সমুদ্রযাত্রা করলাম এক বড়ো জাহাজে, প্রায় দু’ঘণ্টা লাগে পোর্টব্লেয়ার থেকে হ্যাভলক দ্বীপ পৌঁছতে। আমার একটুও সমুদ্রপীড়া লাগেনি আর আমার অন্যান্য যাত্রীদের দেখেও একইরকম লেগেছে। সকলেই বেশ উপভোগ করতে করতে চলেছে এই জলযাত্রা। মাঝেমধ্যেই দেখা যাচ্ছে ছোটোবড়ো দ্বীপ, কোথাও আবার উঁচু পাহাড়ও রয়েছে, জঙ্গলে মোড়ানো যেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এখানে কোনও দ্বীপেই বন্য পশু নেই। কিছু হাতি রয়েছে, তাও বন্য নয়। রয়েছে অজস্র পাখি আর আছে সরীসৃপ জাতীয় কিছু ভয়ানক জীব। তাছাড়া আন্দামানের জঙ্গল নিরাপদই বলা চলে।

হ্যাভলক পৌঁছে নির্দিষ্ট গাড়িতে আমরা একে একে পৌঁছলাম এল-ডোরাডোতে। এ সত্যিই এক স্বপ্ননগরী! অপূর্ব সাজানো-গোছানো, আর সবথেকে বড়ো ব্যাপার হল এই হোটেলের সামনেই অপূর্ব সমুদ্রতট। দিনেরবেলা সমুদ্র এখানে বেশ দূরে, তখন মৃত কোরালগুলো সব বেরিয়ে পড়ে, বড়ো বড়ো পাথরের চাঁইয়ের মতো। আবার সন্ধেবেলা শোনা যায় সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন। কিন্তু এই সমুদ্রতট স্নান করার জন্য একবারেই উপযুক্ত নয় কেবল এই পাথরের মতো গজিয়ে থাকা মৃত কোরালের জন্য। ছবি তোলার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। ভোরবেলার সূর্যোদয় এই সমুদ্রতটের এক নৈসর্গিক দৃশ্য যা দেখতে হলে ভোর সাড়ে চারটের মধ্যে অবশ্যই বিছানা পরিত্যাগ করতে হবে। হ্যাভলক তো আর বারবার আসা যাবে না, এইটুকু কষ্ট না হয় একটু মেনেই নিলাম।

সমুদ্রে স্নান করার জন্য এখানে রয়েছে আরেক তট বা সমুদ্রসৈকত, রাধানগর সমুদ্রসৈকত যা পৃথিবীর নামকরা সমুদ্রসৈকতের মধ্যে পড়ে। আমাদের এল-ডোরাডো থেকে গাড়িতে দশ মিনিটের পথ। এই সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের জন্য সব ব্যবস্থা রয়েছে, কেবল এর খুব কাছে থাকার কোনও জায়গা করা হয়নি। এখানে স্নানের পর ভেজা জামাকাপড় ছেড়ে কলের জলে নিজেকে শোধন করে নিয়ে পোশাক পরিবর্তন করার ব্যবস্থা আছে। এ এক অদ্ভুত সুন্দর সমুদ্রসৈকত, অনেকটা ইংরেজি অক্ষর ‘C’-এর মতো বাঁকানো। সামনে গাঢ় নীল সমুদ্র আর পেছনে ঘন গাছের বন। বহু মানুষের সমাগম, কেউ সমুদ্রে ডুব দিচ্ছে, কেউ পাকা সাঁতারু, অনেকটা ভিতরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে। আমি ভিতু মানুষ, সাঁতার জানি না, আর সমুদ্রে কোনোরকমে ডুব দিয়ে পোশাক পালটে ছবি তুলতে লেগে গিয়েছি। এর মধ্যেই আমি পেয়ে গেছি এক হিমালয়ের পক্ষি, একধরনের নীলকণ্ঠ পাখি, ইংরেজি নাম ‘ডলার বার্ড’ (Dollar Bird)। এই পাখিকে আংশিক পরিযায়ী বলা চলে। হিমালয়ের পাদদেশ ছাড়া আন্দামান দ্বীপপুঞ্জেও এর উপস্থিতি লক্ষণীয়।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা উল্লেখ না করে থাকতে পারছি না। দক্ষিণ আন্দামানের অন্তত এই অংশকে আমি লক্ষ করেছি হিমালয়ের সঙ্গে একটা অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। মনে হয় যে হিমালয়ের কোনও এক পাদদেশেই ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমি জেনেছি যে পুরাণে আছে হিমালয়ের পুত্র মৈনাকের ডানা ছিল এবং সে উড়তে পারত। ইন্দ্রদেব বায়ুর সাহায্যে মৈনাকের ডানা ছেঁটে ফেলে, ফলে সে সাগরে ডুবে যায়। কথিত আছে হনুমান যখন সীতার খোঁজে লঙ্কার দিকে ঝাঁপ দিয়েছিল, তখন বায়ু মৈনাককে আদেশ করে জলের ভিতর থেকে ওপরে ভেসে উঠতে যাতে হনুমান যাত্রাপথে বিশ্রাম নিতে পারে। পুরাণে বলা আছে বায়ু হল হনুমানের পিতা। সেই থেকেই এটা লোকমুখে প্রচারিত যে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ আসলে মৈনাক পর্বত যে সাগরে জলমগ্ন অবস্থায় রয়েছে। সেই থেকে আমিও অনুমান করলাম, এই সাদৃশ্যের কারণেই হয়তো হিমালয়-কুলের পক্ষিদের এখানে দেখা মেলে।

সমুদ্রস্নান সেরে আমরা ফিরে এলাম আমাদের হোটেল এল-ডোরাডোতে। এখানে আহার সেরে নিয়ে আমরা এলাম এখানকার সমুদ্রসৈকতে। প্রথমে দূর থেকে দেখে আমি অবাক হলাম যে সমুদ্র কই? সব বড়ো বড়ো পাথরের ঢ্যালা পড়ে আছে, ওখানে যাব কী করে? কাছে যেতেই আমার ভুল ধরিয়ে দিল স্থানীয় যুবক। ওগুলো নাকি সব মৃত কোরাল। আমি স্তম্ভিত। এইরকমও কোরাল হয় আমার জানা ছিল না। সৈকতের কিছুটা অংশ বালি, আর তারপরেই যেন সিমেন্টে বাঁধানো চত্বর, যার মধ্যে রয়েছে অজস্র ছোটো ছোটো গর্ত। এই গর্তে রয়েছে নোনা জল যার মধ্যে খেলে বেড়াচ্ছে নানারকমের সামুদ্রিক জীব, রঙিন মাছ, কাঁকড়া, আরও কত কী। চোখের সামনে এক জীবন্ত অ্যাকোয়ারিয়াম। সকলেই বলেছিল একটু সমুদ্রসৈকতে ঘুরে এসে ঘরে বিশ্রাম নেওয়ার কথা। বিশ্রামের কথা সকলেই বেমালুম ভুলে গেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে চোখের সামনে পেয়ে সকলেই নিজ নিজ ক্লান্তি ভুলে গেছে।

সমুদ্রের একদিকে সারি সারি বড়ো বড়ো গাছ। সেই গাছের ডাল সব প্রায় মাটির সঙ্গে লেগে রয়েছে। ইচ্ছে করলে সেই ডালের ওপরেই গা এলিয়ে শুয়ে পড়ে বিশ্রাম নেওয়া যায়। অনেকেই তাই করছিল। অনেকেই ঝিনুক ও অন্যান্য সামুদ্রিক সামগ্রী কুড়িয়ে বেড়াচ্ছিল, আমিও তাদেরই একজন। হোটেল থেকে বলল যে এখানকার সূর্যোদয় দেখতে ভুলবেন না। ভোর সাড়ে চারটেতে সৈকতে চলে আসতে বলল। তাই ঠিক করলাম, রাতের আহার তাড়াতাড়ি সেরে আমরা শুয়ে পড়ব।

রাতে ভোজনের পর আবার ইচ্ছে হল একবার সমুদ্র দেখতে যাই। হোটেল থেকে প্রচুর আলোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তাই আর অসুবিধা হয়নি। সমুদ্রের কাছে গিয়ে আবার অবাক হওয়ার পালা। জল যে একবারে নাকের ডগায়! সব কোরাল জলের নিচে, জোয়ারের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র কাছে চলে এসেছে। আবার সকালবেলা পিছিয়ে যাবে।

ভোর ঠিক সাড়ে চারটেতে আমরা জনা আটেক মানুষ সমুদ্রসৈকতে এসে দাঁড়ালাম। তখনও বেশ অন্ধকার। আমরা বালির ওপরে হাঁটতে থাকলাম। আর কিছু হোক না হোক সমুদ্রতটে প্রাতঃকালীন পদব্রজে ভ্রমণ হয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন একঘণ্টা সময় বেমালুম বেরিয়ে গেল বুঝতেও পারলাম না। এদিকে ভোরের আভা প্রায় ফুটে উঠেছে অথচ সুয্যিমামার দেখা নেই। পুবের আকাশে একটা মেঘের প্রলেপমতো মনে হচ্ছে যেন। মনটার মধ্যে কেমন একটা খচখচ ভাব। যদি সূর্যোদয় দেখা না যায়! অধীর আগ্রহে একমনে তাকিয়ে আছি দূরে সমুদ্রের সঙ্গে মিশে যাওয়া আকাশের দিকে। একটা হালকা লাল আভা ছেয়ে গেল সেই সাগর আর আকাশের মিশে যাওয়ার সন্ধি-রেখায়। এবার ধীরে ধীরে অর্ধচন্দ্র আকারে সূর্যের উদয় হতে আরম্ভ করল। জল আর আকাশ লাল, গোলাপি, কমলা, বেগুনি রঙের ছটায় ছেয়ে গেল। আমরা যারা উপস্থিত সেখানে, সকলেই প্রায় বাকরুদ্ধ। একদৃষ্টিতে প্রকৃতির মহিমা দেখে চলেছি। বহুবার সমুদ্রতটে আমি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখেছি কিন্তু এই রঙের ছটা বোধহয় আর কোথাও দেখতে পায়নি। জল তখন অনেক দূরে, প্রায় সেই প্রান্তে যেখান থেকে সূর্যোদয় হল। আমরা আমাদের মনে ও ক্যামেরার লেন্সে সেই দৃশ্যকে বন্দি করে ফিরে এলাম এল-ডোরাডোতে। সেদিন এখান থেকে আমাদের আরেক দ্বীপে গমন, নীল দ্বীপ। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি যে এখন আন্দামানের দ্বীপের দেশি নামকরণ করা হচ্ছে। হ্যাভলক এখন স্বরাজ দ্বীপ নামে পরিচিত, তেমনই নীলের নতুন নামকরণ শহীদ দ্বীপ।

সকালের নাস্তা সেরে নিয়ে আমাদের নির্দিষ্ট গাড়িতে স্থান নিয়ে আমরা রওনা হলাম জেটির দিকে, আমাদের জাহাজ ম্যাকরুজের উদ্দেশে। ভোরের সূর্যোদয় দেখার পর আমার মনে হয়েছিল যে এই হোটেলের নাম এল-ডোরাডো কেন।

নীল (শহীদ) দ্বীপ

স্বরাজ অর্থাৎ হ্যাভলক দ্বীপ থেকে শহীদ (নীল) দ্বীপ যেতে একঘণ্টার কম সময় লাগে। জাহাজ থেকে নেমেই চোখ জুড়িয়ে যায় সাগরের নীল জলের দিকে তাকিয়ে। এখানে আকাশ ও জলের রঙ একইরকম নীল, তাই বোধহয় এর নীল নাম সার্থক। একদিকে স্বরাজ দ্বীপ সবুজে ঢেকে রয়েছে, আর রয়েছে আরও অন্য নাম না জানা দ্বীপ। আয়তনের দিক থেকে নীল খুবই ছোটো। দ্বীপের সবচেয়ে চওড়া অংশের দৈর্ঘ্য খুব বেশি হলে পাঁচ কিলোমিটার। লোকসংখ্যা পাঁচ-ছয় হাজারের মধ্যে। সারা দ্বীপ জুড়ে রয়েছে নানান ধরনের গাছগাছালি। নারকেল, সুপারি থেকে শুরু করে আম-জাম-কাঁঠালগাছও রয়েছে। গাছগাছালির বৈচিত্র্যের জন্যে নীল আইল্যান্ডকে বলা হয় আন্দামানের ‘সবজির পাত্র’ বা ‘ভেজিটেবল বৌল’। যাঁরা ট্রেক করায় উৎসাহী তাঁরা বিচ ট্রেক করে দু-আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই অনায়াসে গোটা দ্বীপটা একটা চক্কর দিয়ে দিতে পারবেন। আর এই ট্রেক করার মধ্যে দিয়েই আপনার দেখা হয়ে যাবে রামায়ণের প্রধান পৌরাণিক চরিত্রগুলোর নামে নামাঙ্কিত বিচগুলো—ভরতপুর, লক্ষ্মণপুর, সীতাপুর এবং রামনগর বিচ।

আমাদের এখানে থাকার কোনও পরিকল্পনা ছিল না, তাই বিশেষ কিছু জায়গা আমরা বেছে নিয়েছিলাম দেখার জন্য যার মধ্যে রয়েছে লক্ষ্মণপুর বিচ বা সমুদ্রতট যাকে ‘কোরাল রিফ আইল্যান্ড’ও বলা হয়ে থাকে। এখানে রয়েছে দুটি চমৎকার প্রাকৃতিক কোরাল ব্রিজ যাকে স্থানীয়রা নাম দিয়েছে ‘হাওড়া ব্রিজ’।

সম্পূর্ণ তটটাই কোরাল দিয়ে বাঁধানো যেন। একইরকম জায়গায় জায়গায় রয়েছে ছোটো পুলের মতো জমানো জল, একটা আস্ত অ্যাকোয়ারিয়াম, যার মধ্যে খেলা করছে অজস্র নাম না জানা রঙিন মাছ, নানারকমের কাঁকড়া, বড়ো ধরনের সামুদ্রিক গলদা চিংড়ি, স্টার ফিশ আরও কত কী। একটা জ্যান্ত প্রাকৃতিক অ্যাকোয়ারিয়াম চোখের সামনে, শুধু শুধু সমুদ্রের জলের মধ্যে ডুব দিয়ে কী আর দেখব, কিছু জীবিত কোরাল ছাড়া?

 তাও এখানেই পেয়ে গেলাম অন্য এক জলের পুলে। কোরাল রিফ দিয়ে গড়ে ওঠা এই বিচে হাওড়া ব্রিজ ছাড়াও স্থানীয় গাইডের সাহায্য নিয়ে কোরাল রিফের ওপর ঘুরে বেড়িয়ে দেখে নিতে পারেন সি কিউকাম্বার, সি আর্চিন, নিয়ন টেট্রা, বার্ব, সামুদ্রিক শঙ্খ, স্টার ফিশ, স্পাইডার ক্র্যাব, ফিঙ্গার কোরাল, স্পঞ্জ কোরাল, জ্যাকফ্রুট কোরাল, রঙ বদল করা ফ্লাওয়ার কোরাল ও আরও অনেক কিছু।

এই বিচের উপরি পাওনা হল সূর্যাস্তের দৃশ্য। তবে আমাদের কাছে অত সময় ছিল না সূর্যাস্ত দেখার জন্য। নীল দ্বীপে পৌঁছেই আমরা একটা ছোটো স্পিড বোট ভাড়া করলাম। এই স্পিড বোটের বিশেষত্ব হল এর পাটাতন বা মেঝেটা কাচের তৈরি, তাই বোটকে ‘গ্লাস বটম বোট’ বলা হয়। এই বোটে করে সমুদ্রের কিছুটা গভীরে যাত্রীদের নিয়ে দাঁড় করানো হয়। সেখানেই রয়েছে জলে তলার আশ্চর্য জগত। রঙিন সব কোরাল, নানাধরনের মাছ যেটা বেশ স্পষ্টই এই গ্লাস বটম বোট দিয়ে দেখা যায়।

আন্দামান বেড়ানো যেন সার্থক হল। সমুদ্রের ওপরে, গভীরে ও চারপাশে সবকিছুই নির্বিঘ্নে দেখা হল। নির্বিঘ্ন এইজন্যেই বলছি যে আমার প্রকৃতি ভগবানকে নিয়ে খুব ভয় ছিল। আন্দামানেও শুনেছি ঠিক হিমালয়ের মতো যখন তখন বৃষ্টি নামে আর তার সঙ্গে যদি সাগরে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা! যাই হোক, ঈশ্বরের কৃপায় কোনও কিছুই ঘটেনি, আর আমাদের আন্দামান ভ্রমণ বেশ আনন্দের সঙ্গে নির্বিঘ্নেই কেটেছে।

রস (নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু) দ্বীপ ও নর্থ বে দ্বীপ

 Look around abandoned Ross Island that was once used as a prison ...

পোর্টব্লেয়ারে ফিরে আমরা হ্যাভলক ও নীলের যাত্রার স্মৃতিরোমন্থন করছিলাম হোটেলের চাতালে চায়ের আড্ডায় বসে। এখানেও অনেক বাঙালির সমাগম একসঙ্গে, আর বাঙালি মানেই আড্ডা। এখানে সান্ধ্যভোজনে সুস্বাদু সামুদ্রিক মাছের একটা রোস্টেড আহার পরিবেশন করা হয়। এই খাদ্যের পদটি অনেকদিন ধরে জিহ্বায় লেগে থাকবে।

আমাদের পরের দিনের ভ্রমণ তালিকায় রয়েছে রস আইল্যান্ড, যার নতুন নামকরণ করেছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৩০ নভেম্বর ২০১৮ সালে, ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু’র নামে। একবারে পরিকল্পিত, সুন্দর গোছানো একটা দ্বীপ। অনায়াসে হেঁটেই ঘুরে নেওয়া যায়। দ্বীপের মধ্যেই ভাড়া পাওয়া যায় ব্যাটারিচালিত গাড়ি, ছয়জন সওয়ারি নিয়ে দর্শনীয় সব স্থান ঘুরে দেখার জন্য। রস হল একটি ছোটো পাহাড়ি টিলামতো। তাই গাড়ি ভাড়া করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। প্রায় পুরো দ্বীপটাই ব্রিটিশ স্থাপত্যে ভরা, এখন সবই ভগ্নদশায় পড়ে আছে। দ্বীপে প্রচুর হরিণ এবং ময়ূর আছে। ময়ূরের ডাক সমানে শোনা যায়। একবারে ওপরে উঠে পুরো দ্বীপটাই দেখা যায় আর সঙ্গে একদিকে নর্থ বে আর অন্যদিকে পোর্টব্লেয়ারও দেখা যায় এখান থেকে। পোর্টব্লেয়ারের অ্যাবার্ডিন ডক থেকে স্পিড বোটে করে দশ মিনিটে পৌঁছে যাওয়া যায় রস দ্বীপে।

দশজন যাত্রী নিয়ে বোট দশ মিনিটে রসে পৌঁছে দিল। রসে প্রবেশ করতে গেলে আলাদা করে টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে নিতে হয়। ব্যাটারি গাড়ি ভাড়া করতে হলে এখানেই দাম আলাদা করে দিয়ে দিতে হবে। এই টিলার ওপর থেকে চারপাশে নীল সমুদ্রের জল আর দু’দিকে দুটো সবুজ দ্বীপ দেখতে গিয়ে চোখ জুড়িয়ে আসে।

রস দ্বীপ থেকে নর্থ বে আরও দশ মিনিট মতো। কিন্তু সেদিনের জল-ভ্রমণ ছিল আমাদের কাছে এক দুঃস্বপ্নের মতো। নৌকা তো রওনা দিল রস দ্বীপ থেকে, বেশ ভালোই চলছিলাম। মাঝসমুদ্রে পৌঁছে হঠাৎ জলের ঢেউ গেল বেড়ে। নৌকা দোলনার মতো একবার করে ঢেউয়ের ওপর ওঠে আবার তার সঙ্গে নিচে নেমে যায়। আমাদের সঙ্গে বসে থাকা গঙ্গার সাঁতারুও চমকে উঠছিল, আর আমরা বাকিরা তো রীতিমতো ভয়ে কাবু, এই বুঝি নৌকা গেল উলটে। নৌকার মাঝি বাঙালি। সে ক্রমাগত আমাদেরকে অভয় দিয়ে যাচ্ছিল যে ভয়ের কোনও কারণ নেই। সে আমাদের নিরাপদেই পৌঁছে দেবে নর্থ বেতে, এরকমটি নাকি জোয়ারের জন্য হয়েই থাকে। কিন্তু আমাদের কি আর মন মানে? সমুদ্রে নৌকায় করে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমাদের মধ্যে শুনলাম কারও আগে হয়নি।

এইভাবেই ভয়ে দুলতে দুলতে অবশেষে এসে পৌঁছলাম নর্থ বে দ্বীপে। নৌকা থেকে নেমে পেছনে সাগরের দিকে তাকিয়ে দেখি সে আবার কী ভদ্র হয়ে গেছে। শান্ত নীল জল, তাতে আরও কত নৌকা ভেসে চলেছে। মনেই হচ্ছে না এই একই সমুদ্র খানিক আগেই আমাদের রীতিমতো পর্যদুস্ত করে ছেড়েছে আতঙ্কে। ঈশ্বরের কৃপায় আমরা অক্ষত অবস্থায় পৌঁছতে পেরেছি। এখানে সবরকম জল-ক্রীড়ার ব্যবস্থা রয়েছে, যেমন স্কুবা ডাইভিং, স্নর কেলিং প্রভৃতি। যেহেতু আমার জলে ভয়, তাই আর কোনও ক্রীড়াতেই অংশ নিইনি। গ্লাস বোটে করে নীলে সবই দেখা হয়ে গেছে। নর্থ বেতে আছে একটি বাতিঘর অথবা ইংরেজিতে বলে ‘লাইট হাউস’, যেটা পোর্টব্লেয়ারের সেলুলার জেল থেকে বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। আর সবথেকে বিশেষ তথ্য এই বাতিঘরের সম্বন্ধে হল যে আমাদের কুড়ি টাকার নোটে এই বাতিঘরের ছবি দেওয়া আছে। শোনামাত্রই পকেট থেকে পার্স বের করে একটা পুরনো কুড়ি টাকার নোট পেলাম। হ্যাঁ, ঠিক তাই। একই ছবি রয়েছে এই টাকার গায়ে। আগে কখনও চিন্তাই করিনি যে এই ছবি বাস্তবে কোথাও থাকতে পারে। সেদিন যেমন আনন্দ হয়েছিল, তেমন গর্বও এর সাক্ষী থাকতে পেরে।

বিকেলে আবার অ্যাবার্ডিন ডক হয়ে ফিরে এলাম আমাদের হোটেলে। সেখানে অপেক্ষা করছিল গরম চা, সঙ্গে সামুদ্রিক মাছের টিক্কা। আহা, কী সুন্দর স্বাদ, এখনও জিভে লেগে রয়েছে যেন।

বারাটাং ও জারোয়া রিজার্ভ

আন্দামানের অন্যতম আকর্ষণ বারাটাং। সেখানে যাওয়ার রাস্তা গিয়েছে জারোয়া বসতির মধ্যে দিয়ে। আমরা রাত তিনটের সময় হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। গাড়ি জিরকাটাংয়ে গিয়ে অন্য গাড়ির লম্বা লাইনের পিছনে দাঁড়াল। এখান থেকে চারটে কনভয়ে পুলিশ পাহারায় গাড়িগুলি নিয়ে যাওয়া হয় জারোয়াদের জন্য সংরক্ষিত এলাকার মধ্য দিয়ে। গাড়ি ছাড়ে সকাল ছ’টা, সাড়ে ন’টা, দুপুর সাড়ে বারোটা এবং বিকেল তিনটেয়।

এই রাস্তায় গাড়ি যাওয়ার কিছু নিয়ম আছে। যেমন গতি ঘণ্টায় ৪০ কিমির মধ্যে থাকবে, কোনও কারণেই গাড়ি দাঁড় করানো যাবে না, ফটো বা ভিডিও করা যাবে না ইত্যাদি। আমাদের গাড়ি ভোর ছ’টার কনভয়ে জারোয়া রিজার্ভে ঢোকে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে প্রায় ৫৫ কিমির মতো পথ। গাড়ি এগোতে থাকে। সঙ্গে চলে সন্ধানী দৃষ্টিতে জারোয়া খোঁজা। আগেই লিখেছি যে পথে এক জারোয়া দম্পতি দেখেছিলাম কোলে শিশু নিয়ে, তবে সেটা ফেরার পথে। যাওয়ার পথে একা এক জারোয়া শিকারি বর্ষা হাতে নিয়ে রাস্তার ধারে বসে ছিল। তপন সিংহের ছবিতে যে জারোয়াদের পরিচয় আমরা পেয়েছিলাম, বর্তমানে ওরা বোধহয় সেরকম ভয়ংকর আর নেই। সভ্যতার ছোঁয়াতে ওরাও এখন পোশাক পরে রীতিমতো ধোপদুরস্ত।

প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর যেখানে পৌঁছলাম, সেখানে বিশাল এক বার্জ অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। দু-তিনটে বাস, গোটা চারেক সুমো গাড়ির সঙ্গে প্রায় শ’দুয়েক মানুষ উঠে পড়লাম বার্জে। একসময় বার্জ থামল গিয়ে বারাটাং দ্বীপে।

এখান থেকে স্পিড বোটে করে যেতে হয় চুনাপাথরের গুহা দেখতে ম্যানগ্রোভের অরণ্য আর ব্যাকওয়াটারের মধ্যে দিয়ে। বোট থেকে নেমে প্রায় দেড় কিলোমিটার হেঁটে গুহায় পৌঁছতে হয়। যাত্রাপথ কষ্টকর ছিল ঠিকই, কিন্তু সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতা ছিল দারুণ। এই জলযাত্রার সঙ্গে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের মধ্যে দিয়ে ভ্রমণ অনেকটাই প্রায় মিল আছে, কেবল এখানে সুন্দরবনের ম্যান ইটার নেই। জলে কুমির থাকা অসম্ভব নয়, সাপও রয়েছে আর আছে অজস্র পক্ষি। সব মিলিয়ে জলযাত্রা অত্যন্ত মনোরম। অনেকগুলো স্পিড বোট প্রায় একত্রেই চলে। বোটে আমাদের সঙ্গে একজন গাইডও ছিল। আমাদের বোটের একটা নাম আছে যা দিয়ে চিহ্নিত করা যেতে পারে, সঞ্জনা বেবি। বেশ সুন্দর নাম, মনেও থাকে।

জঙ্গলের ভিতর দিয়ে হাঁটা আরম্ভ হল এবং আমার মনে হল সকলেই বেশ আনন্দ ও আগ্রহের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে একটা নতুন কিছু দেখার জন্য। এইরকম গুহা আমি দেখেছি মেঘালয়, দেরাদুন ও মধ্যপ্রদেশের পাচমাঢ়ীতে। এখানে জঙ্গলে রয়েছে এক বিশেষ গাছ, নাম পাড়ুক। এই গাছের কাঠ দিয়ে নানারকমের আসবাবপত্রাদি বানানো হয়ে থাকে। পেয়েছি নানারকমের ফুল। এই পথেই পড়ে একটি গ্রাম যেখানে রয়েছে ছোটো ছোটো কুটির, গবাদি পশু, হাঁস, মুরগি ইত্যাদি। সেই গ্রামে সারাবছর ধরে থাকে ৮টি পরিবার, মোট ৪৫জন মানুষ। এই গ্রামের নাম নয়া ডেরা। নাম থেকেই বোঝা যায়, নতুন বসতি। এই পরিবারের লোকজন এখানে ত্রিপল দিয়ে তাঁবু খাটিয়ে পর্যটকদের জন্য লেবুর শরবত বানিয়ে বিক্রয় করে। এতে ওদের কিছু রোজগারও হয় আর পথিকদের ক্লান্তিও দূর হয়।

শরবতে চুমুক দিতে দিতে আমি ওদের একজনের সঙ্গে কথা বললাম। এমনিতে ওরা ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী। এরাই প্রথম পুরুষ, আন্দামানের আধিকারিকদের থেকে এখানে বসবাসের জন্য অনুমতি পেয়েছে। তবুও সব কিছুর জন্যই এদের আসতে হয় বারাটাং আর ওখানে সেই সু্যোগ না পেলে যেতে হয় পোর্টব্লেয়ার। বাচ্চাদের স্কুল, কলেজ এবং চিকিৎসার জন্য বারাটাং সবথেকে কাছের সদর। আর যাত্রা স্পিড বোট ছাড়া উপায় নেই।

বারাটাং আমাদের সফরের শেষ গন্তব্য।    পরেরদিন আবার ফিরে যেতে হবে নিজ নিজ গৃহে, আবার যোগ দিতে হবে নিজেদের কাজে, যেটাকে বাংলা প্রবাদে বলা হয়ে থাকে ‘থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়’, অর্থাৎ জীবনের দশা আগে পরে একইরকম, বৈচিত্র্যহীন। তবুও ক’টা দিন নির্মল অক্সিজেন পেলাম, সবুজের মধ্যে একটু প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়া গেল। কিন্তু কে জানত এই শ্বাসপ্রশ্বাস আর কিছুদিনের মধ্যেই বন্দিদশা হয়ে হাঁসফাঁস করতে আরম্ভ করবে? যে বন্দিদশা কাটাতে আন্দামানের ভ্রমণ, ফিরে গিয়ে একবারেই বন্দি হয়ে যাব কে কল্পনা করতে পেরেছে? দৈনন্দিন নতুন নতুন ইংরেজি শব্দের ব্যবহার আমাদের জীবনে প্রধান ভূমিকা নেবে? যারা কোনোদিন ইংরেজি শব্দের ব্যবহার করেনি, তারাও আজ পরিচিত তার সঙ্গে—মাস্ক, স্যানিটাইজেশন, লকডাউন ইত্যাদি। একটা সুফল অবশ্যই পাওয়া গেছে, প্রকৃতি তার সাবেক রূপ ফিরে পেয়েছে। অক্সিজেনের মাত্রা এখানেও বেড়েছে। কমেছে বায়ুদূষণের পরিমাণও, পরিছন্ন হয়েছে নদী, বিল ও খাল। পৃথিবীব্যাপী এক মারাত্মক জীবাণু নভেল করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে মানুষের জীবনের ছন্দ নষ্ট করে দিয়েছে, যার ফলে আমাদের থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড় জীবনযাপন করতে হল না। আমরা সকলেই যার যার গৃহে বন্দি। এর ফলে মানুষ হল অবসাদপ্রবণ আর প্রকৃতি ফিরে পেল তার হারিয়ে যাওয়া রূপ। আমরা নিশ্চয়ই একদিন সবকিছু কাটিয়ে উঠে আমাদের সেই থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড় জীবন আরম্ভ করতে পারব, আর তখন কিন্তু সেই জীবন নিয়ে আমাদের আর কোনও অভিযোগ থাকবে না। বরং আমরা তখন আমাদের কাজে অনেক বেশি আনন্দ পাব। আমার ইচ্ছে থাকল সব কাটিয়ে ওঠার পর আবার আন্দামান যাব। বেশি সময় নিয়ে, অনেক বেশি করে প্রকৃতিকে কাছে পাব বলে।

বীর সাভারকার বিমানবন্দর থেকে আবার দু’ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম আমাদের কল্লোলিনী কলকাতায়। সেই ‘হুল্লোড় হইচই মাথাব্যাথা, চিৎকার চেঁচামেচি ব্যস্ততা’ শহর জুড়ে। গাড়িতে বাড়ি ফেরার পালা আর চোখের সামনে ভাসছে নীল সমুদ্র, জারোয়া দম্পতি, স্পিড বোট, কোরাল, রঙিন মাছ, কাঁকড়া, ম্যানগ্রোভ, বারাটাংয়ের চুনাপাথরের গুহা। কিছুতেই ভুলতে পারছি না কিছু। ক্যামেরার লেন্সবন্দি রয়েছে সমস্ত স্মৃতি, বারবার টিভির পর্দায় দেখি, প্রায় প্রতিদিন। এইভাবেই এখনও আন্দামান লকডাউন হয়ে থেকে গেছে আমার মধ্যে।

ভ্রমণ সব লেখা একত্রে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s