ভ্রমণ-দূরের মাটির ধুলো (প্যারিস) অরুন্ধতী রায়চৌধুরি শীত ২০১৬

bhromon02১৯৬০ সালের ৬ই অক্টোবর। সন্ধ্যে ৭-৩০ মিঃ। আমরা আকাশের ওপরে দূর থেকে দেখছি প্যারিসকে। রাত্রের অন্ধকারে শহরটাকে দেখাচ্ছে ঠিক আলোর বিন্দু দিয়ে আঁকা নকশার মত সারা দিগন্ত জুড়ে। ঠিক যেন মাকড়সার জালের গোল গোল সুতো ছড়িয়ে পড়ে আছে। লম্বা রাস্তাগুলো সোজা বেরিয়ে গেছে দূরে অন্য আর এক শহরের দিকে। নিয়ন আলোর নীলাভ সৌন্দর্যে ঝক্‌ঝক্‌ করছে। শহরের ওপরে এলাম, মনে হল নীচে এক প্রকাণ্ড নীহারিকা ঘুরছে অসংখ্য তারকাপুঞ্জকে নিয়ে। আলোগুলো জ্বলছে-নিবছে, কিছু লাল কিছু নীল,  কিছু বা সবুজ – যেন দামি পাথর বসানো জড়োয়ার গয়না থেকে আলো ঠিকরে পড়ছে। জানো, ঈফেল টাওয়ার’কে পর্যন্ত দেখতে পেলাম আমরা ঠিক একটি ছোট্ট এক ইঞ্চি মাথা উঁচু কালো পিনের মতো ! বল তো, মনটা আমাদের কতদূর উদ্‌গ্রীব ? কখন নাবব, কখন দাঁড়াব প্যারিসের বুকে পা রেখে।

bhromon03দাদা-বৌদি আমাদের নিতে এসেছিলেন। সঙ্গে নাচতে নাচতে এসেছিল ওঁদের দুই ছেলে মীতু আর সীতু। ঠিক তোমাদের মত, কী দুষ্টু, কী দুষ্টু ! ওঁদের বাড়ি যেতে পথে অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম রাস্তার দৃশ্য। নদীর উপরের সেতু পার হতে মনে হল কোন রাজার বাড়ির প্রবেশপথ বুঝি বা। দুধারে বড়ো বড়ো থামের ওপর সাদা ধপ্‌ধপে অতি সুন্দর সব পাথরের মূর্তি, দেব-দেবী, সুন্দর পুরুষ ও সুন্দরী নারীর, — যেন তারা এক্ষুণি নেমে এল প্রাচীন মহাকাব্য থেকে।

 সকাল হল। বৃষ্টি পড়ছিল। দিনটা মেঘলা – তাও বেরোলাম।  এক ঘন্টাও বসে থাকার সময় আছে কি?  বেশ শীত শীত করছে। একেবারে জমে যাওয়ার মতো। নাকের ডগায় ব্যথা করতে লাগলো। নিঃশ্বাস নেওয়া যায় না হাওয়া এত ঠাণ্ডা ও ভারী। সমস্ত গা ঢাকা আছে ওভারকোটে কিন্তু মুখটুকু ঢাকি কী করে বল? এ সময় কিন্তু এত শীত পড়ার কথা নয়। এখন পাতাঝরার দিন, ওরা বলে  Fall। এ সময় সমস্ত গাছের সবুজ সুন্দর পাতা হলুদ, কমলা। গেরুয়া ও লাল পাতায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। ঝুর্‌ঝুর্‌ করে ঝরে পড়ে ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটায়। যেন আমাদের চলার পথের উপর কেউ ফুল ছিটিয়ে দিল। পাতা যে এতো টকটকে লাল হ’তে পারে, আগে দেখেছি কি?

ভয়ানক শীত করছে দেখে আমরা দুজন মাটির তলাকার সুড়ঙ্গতে নেমে পড়লাম। সেখানে হুস্‌-হুস্‌ শব্দে ট্রেন চলে যাচ্ছে, যেন অন্ধকার পাতালপুরীর সব দানব। এখানে সিঁড়ির ধাপে ধাপে নেমে গেলে শীত অনেক কম। খুব আরাম লাগতে লাগলো আমাদের। তাছাড়া শহর দেখতে হচ্ছে। যদি বাসে, ট্যাক্সিতে ঘুরতে হয় তাহলে সময় যে কত বেশি খরচ হবে ভাবলেও আশ্চর্য হতে হয়। এই মাটির নীচের রেলগাড়িতে নিমেষে পৌঁছে যাবো যেখানেই যেতে চাই।

আর মাটির তলাকার স্টেশন থেকে কুট্‌ কুট্‌ করে সিঁড়ি বেয়ে আবার ওপরে উঠে রোদ্দুরে দাঁড়ালেই দেখতে পাব সামনেই আমাদের সেই দ্রষ্টব্য জায়গাটি। কেমন মজা বল তো ? ওরা এই মাটির তলাকার ট্রেনের বন্দোবস্তকে বলে ‘মেট্রো’। 

ইটালীর ‘মিলান’ শহরে দেখেছি মাটি খোঁড়া শুরু হয়ে গেছে, ট্যাক্সি ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতেই একগাল হেসে বলল , ‘মেট্রো’। আমাদের কলকাতাতেই বা হবে না কেন, বলো তো ? আমাদের দেশেও চেষ্টা হয়েছিল। ফরাসি দেশ থেকে, ঐ প্যারিস থেকেই ইঞ্জিনিয়াররা এসেছিলেন পরীক্ষা করে দেখতে মাটি। হল না কেন জানো ? মাটি যে বড়ো নরম, আমাদের বাংলা যে গঙ্গার পলিমাটির ওপর বসে আছে, তার তলে পাথুরে জমি কোথায় ? আর পাথরের মত শক্ত জমি না হলেতো আর তা কেটে, শহরটিকে বাঁচিয়ে, সুড়ঙ্গ করা যায় না। কাজেই কলকাতার রাস্তায় মানুষে, গাড়ীতে ধাক্কাধাক্কি লেগেই থাকবে, কি বলো ? *

এই টিউব-ট্রেনের সুড়ঙ্গের এক ভারী অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল।  এদের শহরের ওপরের রাস্তাঘাট যেমন ঝক্‌ঝকে তক্‌তকে, নোংরা নেই, ভিখিরী নেই, তেমনি মেট্রোর ভেতরে কিন্তু অসংখ্য অন্ধ-আতুরজন। এরা ভিক্ষে করে। কেউ মাউথ অরগ্যান, কেউ পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়ান বাজিয়ে চলেছে আপন মনে। ভারী করুণ সে সুর। সামনে রাখা টুপি বা টিনের পাত্রে অনায়াসেই জমে উঠছে পয়সা একটি, দুটি করে, মুখ তুলে এরা তাকায় না। ঘাড় গুঁজে বাজিয়ে চলে, যেন বৈরাগী !

একটি মেয়েকে আমার খুব ভালো লেগেছিল। এ ছিল অন্ধ। চুপ করে বসে থাকত, আর হাত দুটো খেলা করতো অ্যাকর্ডিয়ানের চাবিগুলোর ওপর। টিউব-এর অলিতে গলিতে দূরে দূরে ছড়িয়ে পড়ত তার গ্রাম্য-মেঠো মনমাতানো সুর, ভাঙা ভাঙা ছন্দে। সত্যিই ভাল বাজাতে জানত। প্রতিবারেই মনে ভারী একটা করুণ ভাব জাগিয়ে তুলত। আমাদের দেশের মিষ্টি ভাঁয়রোর সুরে সে সুর ছিল গাঁথা। আর একটি ভিখিরী হাতে হাতলের মতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভাঙা বাজনার বাক্স থেকে সুর বার করত। এদের নিয়ে ঠাণ্ডা নীলচে আলো-ভরা সুড়ঙ্গের একটি আলাদা জগৎ – যেটা শুধুই ভালবাসায় ভরা। ইংল্যাণ্ডেও ম্যানচেস্টারে বাস-স্টেশনে ঠিক এমনি সুর বাজাত বেহালায় আর একটি ভিখিরী। সে ছিল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ভক্ত। তার হাতে বেহালার ছড়িতে ‘বিটোফেন’, ‘মোৎসার্ত’-এর ছোট ছোট অংশ ভাঙা ভাঙা সুরে বেজে চলত। গভীর রাত্রিতে যখন ট্রেনের শেষ যাত্রীদের তুলে নেবার জন্য বাস অপেক্ষা করত তখন আরোহীদের কানে ঘরছাড়া এক উদাস করা সুর ছড়িয়ে দিত সে আকাশভরা মেঘ আর বৃষ্টিভেজা হাওয়ার সঙ্গে।

হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে পড়লাম শিল্পীদের পাড়া ‘মোপারনাসে’। রং-এর দোকান, রাস্তার ধারে ধারে কাফে, ছোটো ছো্টো টেবিলের চার দিকে রংবেরং-এর চেয়ার পাতা। ওখানকার বিখ্যাত এক কাফেতে কফি খেতে চললাম। কেন এর এত নাম জানো ? এই কাফেতে যত গরিব শিল্পীরা দিনের পর দিন এক কাপ কফি সামনে নিয়ে ছবি এঁকে কাটিয়েছেন। তখন হয়তো তাঁরা ছেলেমানুষ, সবে ছবি আঁকায় হাত দিয়েছেন। আজ তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগেরই জগৎ-জোড়া নাম। তোমরাও নিশ্চয় জান কিছু কিছু – ‘রেনোয়া, আঁরি-মাতিস, মানে, মনে, দেগা, — আরও কত !

এই বিখ্যাত কফি-খানার ঠিক সামনে এক ত্রিকোণ জমিতে বালজাকের এক মূর্তি আছে – শিল্পী ‘রোদ্যাঁর’ ভাস্কর্য। এর এক ভারী সুন্দর গল্প আছে। ‘রোদ্যাঁ’কে গভর্ণমেন্ট থেকে ঐ মূর্তি গড়তে দেওয়া হল। তিনি ছিলেন সত্যিকারের শিল্পী। তিনি এমনই অদ্ভুতভাবে তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে এই মূর্তিটির সৃষ্টি করলেন যে কর্তারা সবাই হতভম্ব হয়ে পড়লেন। তাঁরা অত্যন্ত অপছন্দের সঙ্গে এই ভাস্কর্যটিকে বাতিল করে দিলেন। অন্য আর এক শিল্পীকে দিয়ে নতুন করে মূর্তি গড়িয়ে মহা-সম্মানে এক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থাপন করলেন।

কিন্তু তখনকার তরুণ শিল্পীরা এর প্রতিবাদ করল। তাদের সকলের অতি সামান্য দানে ভরে-ওঠা থলির টাকায় তারা এই মূর্তিটিকে ঐ তিন কোণা জমিটুকুতে মহা-সমারোহে স্থাপিত করল। জমিটুকু তারা চেয়ে নিয়েছিল, এর দাম জোগাবার টাকাও তাদের ছিল না। তোমাদের এর আগেই যে যে শিল্পীর নাম বলেছি, তাঁরা সবাই এর মধ্যে ছিলেন। তাঁরা ঐকান্তিক আগ্রহ দিয়েই এই অসাধ্য সাধন করলেন। ঐ মূর্তির যেদিন স্থাপনা হল সেদিন দারুণ উত্তেজনা ও উৎসবে সমস্ত পাড়া গম্‌গম্‌ করতে লাগল। সেই তিনকোণা জমির ধারের কাফেগুলো আলোয় আলোময় করে সাজানো ছিল সাত দিন ধরে। তরুণ শিল্পীদের ছবি ঝুলতে লাগল দিনের পর দিন কাফের রেলিং-এর প্রদর্শনীতে। সেই মূর্তির তলে শিল্পীরা লিখলেন শুধু একটি ছত্র — “ ‘বালজাক’কে, ‘রোদ্যাঁ’কে আমাদের সম্মান – শিল্পীবৃন্দ।”   

 bhromon01অতি অনাড়ম্বর এদের আত্মপ্রকাশের ভঙ্গি, অতি সুন্দর বন্ধুত্বপূর্ণ এদের পরস্পরের আত্মার সম্বন্ধ। সে প্যারিসকে এখন আর চেনা যায় না। উগ্র আধুনিকতার ‘ছাপ’ এর সমস্ত দেহে ছড়িয়ে পড়েছে। দোকানে, রাস্তায়, সাজে-পোশাকে সেই সুন্দর অতীতের ছোঁয়া আজ আর পাওয়া যায় না। সবই যেন বড়ো বেশি সাজানো, বড়ো বেশি স্বাধীন, সচেতন। আগেকার সেই স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেছে। এখনকার ছেলেমেয়েরা আর সেই প্যারিসকে দেখতে পায় না – যা ছিল শিল্পীর স্বর্গপুরী, কল্পনার আনন্দলোক।

          প্যারিসের বিখ্যাত ফুলের বাজার থেকে কিছু অর্কিড কিনে আমরা ‘সেইন’ নদীর ছোট্ট দ্বীপের ওপরে ‘নোতরদাম’ গির্জায় গেলাম। তোমরা এর নাম নিশ্চয়ই জানো। ‘হাঞ্চব্যাক অব নোতরদাম’ মনে আছে তো ? এ সেই গির্জা। অপূর্ব কারুকার্য-করা পাথরের বিরাট উঁচু উঁচু দরজা, থাম, চূড়া – পৃথিবীতে যার তুলনা নেই। ভেতরে ঢুকলাম। হাতে ছোটো ঘন্টা নেড়ে গান গাইছেন পাদ্রী সাহেব। হুবহু আমাদের দেশের মন্দিরের স্তোত্র পাঠের মতো। পূজার উপকরণ ও পদ্ধতিতে ক্যাথলিকদের খুব বেশি প্রভেদ নেই আমাদের সঙ্গে।

অনেকক্ষণ বসলাম ভেতরে। কত ছেলেমেয়ে প্রার্থনা করছে। বুড়োদের তো কথাই নেই। তারা আধো অন্ধকারে স্থির হয়ে বসে আছে কাঠের বেঞ্চির ওপর। অতি শান্তিপূর্ণ আবহাওয়া, যেন পবিত্রতায় ভরা।

পরদিন সকালে গেলাম আমাদের এক মাস্টারমশাই-এর সঙ্গে। তিনি তখন প্যারিসে ছিলেন কিছুদিনের জন্য। সুন্দর সুন্দর ঐতিহাসিক গল্প বললেন জায়গাগুলো দেখাতে দেখাতে। কোথায় ফরাসী বিপ্লবের সময় ‘মেরী আঁতোয়ানেত’কে গিলোটিন করা হয়েছিল, — এখন সেখানে এক স্তম্ভ খাড়া করা আছে। কোথায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ফরাসী সেনাধ্যক্ষদের গুলি করেছিল জার্মানরা গত যুদ্ধে, সেখানে এখন উঁচু ঢিপির মত হ’য়ে আছে এক বাগানের মধ্যে। পুঁতেও ফেলেছিল মৃতদেহগুলো – এখনও হয়তো হাড়-গোড় কিছু খুঁড়লে পাওয়া যেতে পারে। শুনে শিউরে উঠলাম।

এই মাস্টারমশাই-এর সঙ্গেই গেলাম ‘লুভ্‌র’ মিউজিয়াম দেখতে। এর নামও তোমরা জানো। ভালভাবে এখানকার সমস্ত জিনিস দেখতে বছরের পর বছর কেটে যায় একটি মানুষের। আমরা চার ঘন্টায় তা কী করে দেখি বলো তো ? কত যে মূর্তি, ছবি, কত যে শিল্পকর্ম, কত যে জানবার, দেখবার আর বোঝবার জিনিস তা কল্পনাও করা কঠিন। পৃথিবীর অতীত ইতিহাস থেকে বর্তমান, কোনো কিছুই যেন একে ফাঁকি দিতে পারেনি। সব এসে ধরা দিয়েছে একে একে – ভরে তুলেছে এই প্রাসাদের ঘরের পর ঘর। যখন বেরিয়ে এলাম তখন আমার দাঁড়ানোর ক্ষমতা আর নেই। পা-দুটো যেন অবশ হয়ে এসেছে, চুপচাপ বসে রইলাম অবাক বিস্ময়ে।

প্যারিসে আমাদের আর একটি দিন। কাল বিকেলেই ছেড়ে চলে যাব ইংলণ্ডের বুকে। আজ আর অন্য কোনো চিন্তাই আমাদের নেই। কতটুকু দেখেছি, কতটুকু আর দেখা বাকি? শুনলাম নদীপথে শহরের অন্য এক রূপের কথা। আমরা ছুটলাম ‘সেইন’ নদীর সুন্দর বাঁধানো স্টিমারঘাটে। নদীটি শহরের বুকের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে চলেছে ঠিক একখানি ধনুকের মত। তার দুপাশে আকাশচুম্বী বড়ো বড়ো প্রাসাদ, তাদের ছায়া কাঁপে জলে। আর বুকের উপর দিয়ে অপরূপ ন-খানি সেতু, যাদের উপর দিয়ে হুড়োহুড়ি করে গাড়ি আর মানুষ ছুটছে। ‘লঞ্চ’এ উঠে বসলাম। ওরা একে বলে ‘বাতো-মুশ্‌’ – প্রমোদ-তরণী। পুরো কাচে ঢাকা ডেকের ওপর চেয়ারে বসে কফি, শরবৎ খেতে খেতে দুধারের শহরকে চিনে নেওয়া যায়। আমরা আগ্রহের আতিশয্যে একেবারে লঞ্চের ছাতের রেলিং-এর ধারে উঠে এলাম। সামনে শহরের ম্যাপখানা খুলে ধরে মিলিয়ে দেখতে দেখতে হঠাৎ আমরা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম বোধ হয়, দেখি সুড়সুড় করে সব ফরাসী ছেলেমেয়েরা হাত ধরাধরি করে উঠে আসছে, ভাবছে নিশ্চয় এক মহা মজার কিছু ঘটেছে ! নোত্‌রদামের পাশ দিয়ে, ‘লুভ্‌র’কে বাঁ দিকে রেখে আমরা ভেসে চলেছি। দূরে ‘ঈফেল’ টাওয়ার দেখা যাচ্ছে। আরে ! এতো উঁচু ? আমাদের আগের দেখা সেই কালো-পিন কোন্‌ মন্ত্রবলে আজ এমন অতিকায় দানব হয়ে উঠল ? খুব তাড়াতাড়ি খাতায় স্কেচ্‌ করে ফেললাম। লঞ্চ যতই এগুতে লাগলো ‘তুর্‌-ঈফেলে’র চেহারাও ততই অন্য রকম হতে লাগলো। যেন কালো অসংখ্য রেখায় টানা এক আশ্চর্য ভাস্কর্য, দাঁড়িয়ে আছে উঁচুর থেকেও আরও উঁচু এক গাম্ভীর্যে মাথা তুলে। মুগ্ধ হয়ে গিয়ে কতগুলো যে ছবি আঁকলাম ভাবলেও অবাক লাগে। প্রত্যেকটি লোক হাত তুলে চেঁচিয়ে অভিনন্দন জানালো ‘ঈফেল’কে। সে যে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য !

এবার ‘প্যারিস’ ছাড়তে হবে। মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেছে। এয়ারপোর্টে যাব। পথে দেখলাম ‘লেস্যাঁভালিদ’ সম্রাট নেপোলিয়ানের সমাধি। সে বিশাল প্রাসাদ আর তার সামনেকার ফুলে ফুলে ভরা বাগান, ফোয়ারা হাতছানি দিয়ে ডাকল যেন। বার বার তাই পিছু ফিরে চাইতে হল। শহরকে দূরে ফেলে আমরা ধূ ধূ প্রান্তরের মধ্য দিয়ে ছুটে গেলাম এয়ারোড্রোমের দিকে। মনের ভেতর অনেক দেখার অভিজ্ঞতা যেন শান্ত বৈরাগীর মত বসে। ছুটে ছুটে নতুনকে দেখার, জানার উত্তেজনা এখন উচ্ছ্বাস হারিয়ে গভীর প্রীতিতে জমে জমে উঠছে। ‘প্যারিস’কে বোধহয় ভালবেসে ফেলেছি। খুবই বেশি রকম, তাই না?

 *সম্পাদকীয় সংযোজনঃ ফরাসি এঞ্জিনিয়ারদের পর ফের কলকাতায় আসেন আরেক ইঞ্জিনিয়ারের দল । রাশিয়ান ও পূর্ব জার্মান এই ইঞ্জিনিয়ারদের পরিকল্পনা সফল হয়। তার ফল আজকের কলকাতা মেট্রো।

জয়ঢাকের ভ্রমণ লাইব্রেরি

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s