যৌথ উপন্যাস ইতি রুদ্রট শরৎ ২০১৮

প্রথম অধ্যায়
খ্রিস্টপূর্ব চার হাজার শতাব্দী। অভিষেক পর্বত

সন্ধ্যার ঘন অন্ধকারে, মশালের আলোয় দ্রুত হাত চালাচ্ছিল সৈনিকদের দলটা। পাহাড়ের মাথা থেকে নিঃশব্দে সেদিকে নজর রাখছিলেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ দেবতাপুরুষ। তাদের নেতার সতর্ক নজরদারিতে পাহাড়ঘেরা নির্জন উপত্যকার বুকে তারা যে ওলটানো বাটির চেহারার মন্দিরটা গড়ে তুলেছে আজ সারাদিন ধরে, তার ব্যবহার তিনি জানেন। অভিষেকযন্ত্র। ব্রহ্মাণ্ডান্তরে যাতায়াতের ক্ষমতা অর্জনের জন্য ঈশ্বরভূমির নবজাতকদের মস্তিষ্ককে একত্রে জাগিয়ে তোলা হয় সে-যন্ত্রকে দিয়ে।

আট শতাব্দীর ব্যবধানে, অবশেষে অভিজিৎ নক্ষত্রের দিক থেকে বিসর্পিণী ধূমকেতুর আসবার সময় হয়েছে। আজ মাঝরাতে দুই দণ্ড ধরে তা উল্কাবৃষ্টি করবে। সেই উল্কাপাতের অতিজাগতিক শক্তিকে বুকে জমা করতে পারে ওই যন্ত্র। তারপর তারই সাহায্যে তাকে ঘিরে জড়ো হওয়া ঈশ্বর-তরুণদের মস্তিষ্ককে বদলে দেয় একসঙ্গে।

তবে এ-যন্ত্র তুলনায় আধুনিক। এর আবিষ্কারের আগে প্রতিস্মৃতিবিদ্যা নামের ওই প্রাগৈতিহাসিক বিজ্ঞানই এ-কাজের একমাত্র উপায় ছিল। কিন্তু তার সাহায্যে মস্তিষ্ককে পুরোপুরি জাগিয়ে তুলে সমান্তরাল ব্রহ্মাণ্ডগুলোতে যাতায়াতের ক্ষমতা পেতে দীর্ঘ সাধনা ও উন্নত মেধা দরকার হয়। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া এর মন্ত্রগুলোকে উচ্চারণ করলে তার শব্দের বিপুল শক্তি উচ্চারণকারীকে ধ্বংস করে। ফলে দূর অতীতে ঈশ্বরভূমিতেও ত্রিদেব ও অন্য কয়েকজন দেবতা ছাড়া আর কোনও দেবতার সাধ্য ছিল না সে বিদ্যাকে শেখবার। এই যন্ত্রের আবিষ্কার ঈশ্বরভূমির প্রত্যেক সদস্যকে এখন সে শক্তি দিয়েছে।

অর্জুন! ধূর্ত অর্জুন। প্রতিস্মৃতিবিদ্যার সাধনায় মস্তিষ্ককে জাগিয়ে তুলে নিজের জন্য ঈশ্বরভূমির দরজা খুলে নিয়েছিল সে। তারপর সেখানে শিক্ষা চলবার সময় এই অভিষেকযন্ত্রের প্রযুক্তিকে চুরি করেছিল। কেউ জানত না। এমনকি এই বিশ্বের নজরদার কৃষ্ণকেও অন্ধকারে রেখেছিল সে। দিগ্বিজয়ের সাধ! হাঃ! ঈশ্বরহেন শক্তির মালিক হয়েও কী তুচ্ছ স্বপ্ন! অথচ এই আটজন মানুষকেই ঈশ্বরের আসনে বসিয়েছে  আর্যাবর্ত! একটা মলিন হাসি ছড়িয়ে পড়ল তাঁর মুখে। ইতিহাস সবসময় বিজয়ীর কলমে লেখা হয়। ভবিষ্যতও এই পঞ্চপাণ্ডব, কর্ণ, কুন্তি ও দ্রৌপদীকেই ঈশ্বরের আসনে বসাবে।

অন্ধকার সমান্তরালগুলোর বাসিন্দাদের আক্রমণ থেকে ঈশ্বরভূমিকে বাঁচানোর জন্যই সেইসব দিব্যাস্ত্রের আবিষ্কার। দিগ্বিজয়ের জন্য নয়। অথচ তারই শিক্ষা নিয়ে ফিরে এসে সামান্য একটা রাজত্বের লোভে নিজের ভাই-বন্ধু-পরিজনকে হত্যা করতে ওদের বাধল না!

হ্যাঁ, মহামতি কৃষ্ণকে অর্জুন ঈশ্বর বলে মানে। সমান্তরাল ঈশ্বরভূমির এই কৃষ্ণাঙ্গ দূতের পরামর্শকে গুরুত্ব দিতে সে চুক্তি-অনুযায়ী বাধ্য। দিব্যাস্ত্র লাভের শর্ত সেটাই ছিল। অথচ কী সুকৌশলেই না যুক্তির সুক্ষ্ম পথে তাঁকে সে হার মানিয়েছিল কুরুক্ষেত্রের প্রাঙ্গণে!

সময়ের পথে কিছুটা এগিয়ে নিয়ে গিয়ে ভবিষ্যতকে তার সামনে খুলে ধরেছিলেন কৃষ্ণ। বলতে চেয়েছিলেন, ওরা সাধারণ মানুষ। কালের ধারা বেয়ে খানিক পথ এগিয়েই প্রাণ হারাবে। তুমি সাধারণ নও। শুধু একটু ধৈর্য ধরো, অর্জুন।

অথচ চতুর অর্জুন তার অর্থ করল, কৃষ্ণ তাদের আগেই হত্যা করে রেখেছেন। সে নিমিত্তমাত্র। প্রচার করল, কৃষ্ণই তাকে এদের নিয়তি হয়ে ওঠবার আদেশ দিচ্ছেন। আর তারপর তার রক্তলোলুপ দিব্যাস্ত্র দিয়ে অসংখ্য আত্মীয়বন্ধুকে খুন করে….

এক বিশ্বের জীবনে অন্য বিশ্বের প্রতিনিধির জোর খাটাবার অধিকার নেই। তাই নীরবে সব অন্যায় সহ্য করে যেতে হয়েছে কৃষ্ণকে। সহ্য করতে হয়েছে এদের লেখা ইতিহাসের বিকৃতি। প্রথমে দুর্যোধনকে দুর্বল করবার জন্য বিশ্বাসঘাতক কর্ণ নিজের মৃত্যুর কথা প্রচার করেছে। তারপর গদাযুদ্ধে দুর্যোধনের হাতে হেরে যাওয়া ভীম তাকে হত্যা করার মিথ্যা ইতিহাস তৈরি করেছে। তারপর, বিজয়ী পাণ্ডবদের দীর্ঘ রাজত্বকালে তিনি দেখেছেন একটা দেশের মানুষের ন্যূনতম স্বাধীনতাটুকু কেড়ে নিয়ে তাদের দাস করে রাখবার মর্মান্তিক ইতিহাস।

অবশেষে এই বিশ্বের ভোগলিপ্সা তৃপ্ত করে, বিসর্পিণীর আসবার সময় হলে যখন তারা স্বর্গের পথে মহাপ্রস্থানের সূচনা করেছে তখন একটা ক্ষীণ সান্ত্বনা পেয়েছিলেন তিনি। জানতেন, তারা প্রতিস্মৃতিবিদ্যার প্রয়োগ করে ঈশ্বরভূমিতে ঢুকবে। জানতেন, সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে সমান্তরাল নরক-পৃথিবীতে চিরনির্বাসনের শাস্তি।

শুধু  জানতেন  না, চতুর  অর্জুন  বহু আগে  থেকেই এর জন্য তৈরি

হয়েছে। মহাপ্রস্থান নয়। তারা চলেছে দিগ্বিজয়ের পথে। আর সেইজন্যই গোপনে এই উপত্যকায় সে দীর্ঘদিন ধরে সে তিল তিল করে জমিয়ে তুলেছে ওই তিন অক্ষৌহিণী সেনা। স্থানীয় মানুষরা তাদের নাম দিয়েছে জিহুগা। মৃত্যুদূত! হাঃ! সঠিক নাম।

তারপর, সে-প্রস্তুতি সমাধা হতে সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে নির্দিষ্ট লগ্নে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে তারা নিজেরাও। একেবারে চূড়ান্ত মুহূর্তে পৌঁছে গড়ে তুলছে ওই অভিষেকযন্ত্রকে…

*****

…মধ্যরাত্রির আকাশে মরা আলো ছড়াচ্ছিল বহু উঁচুতে স্থির হয়ে ঝুলে থাকা  ধূম্রবর্ণা বিসর্পিণী। একদৃষ্টে সেদিকে চোখ ধরে যেন ধ্যানস্থ হয়েছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ দেবতাপুরুষ। তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে, বিসর্পিণীকে ঘিরে হঠাৎ জেগে ওঠা আলোর প্রায় অদৃশ্য বিন্দুগুলো ধরা পড়েছে এবার…  ঝড়ের বেগে তারা ধেয়ে আসছিল পৃথিবীকে লক্ষ করে। মন্দিরটাকে ঘিরে বিরাট উপত্যকার মাটি তখন ঢাকা পড়ে গেছে অগুনতি সৈনিকের ভিড়ে। তাদের সবার চোখ, কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকা অর্ধগোলকাকার অভিষেকযন্ত্রের দিকে।

তারপর, হঠাৎ গোটা প্রান্তরটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল একটা অপার্থিব আলোয়। অসংখ্য উল্কা একযোগে শক্তিমান আঘাত হেনেছে মন্দিরের শরীরে।

শক্তির তীব্র বিচ্ছুরণে এক মুহূর্তের জন্য সূর্যের মতো জ্বলে উঠল মন্দিরের শরীর। তারপর তার দেহ থেকে নীলাভ আলোর একটা ঢেউ উঠে এসে ছড়িয়ে পড়ল গোটা প্রান্তরটার ওপর। সেই আলোয় ছায়া ছায়া অগণিত শরীর থরথর করে কাঁপে, যন্ত্রণায় গড়াগড়ি যায়। তাদের মস্তিষ্ক তখন পূর্ণশক্তিতে জেগে উঠছে সে আলোর স্পর্শে।

কয়েকটি মুহূর্তমাত্র। তারপরেই হঠাৎ উঠে দাঁড়াল তারা। সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো সেই বিপুল বাহিনীর সামনে বেজে উঠেছে অর্জুনের দেবদত্ত শঙ্খের রণধ্বনি। তারপর বাতাসে তীব্র আলোড়ন তুলে ভেসে উঠল সেই সুবিশাল সৈন্যদল। একঝাঁক অন্ধকার শকুনের মতো ধেয়ে গেল উত্তরের দিকে। তাদের সদ্য শক্তিমান হয়ে ওঠা মস্তিষ্ক ইচ্ছা হলে আকাশের নক্ষত্রদেরও হেলায় স্থানচ্যূত করতে পারে এখন। সামান্য মানুষের মতো পায়ে হেঁটে পাহাড় অতিক্রম করার প্রয়োজন তাদের ফুরিয়েছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন মহামতি কৃষ্ণ। আজ এদের হাতে ঈশ্বরভূমি পদানত হবে। এই নিয়তিকে রোখবার সাধ্য তাঁর নেই। এ ভাগ্যলিপি সেদিন লেখা হয়েছিল যেদিন মহেশ্বর অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধে তৃপ্ত হয়েছিলেন। সেদিন ইন্দ্র সাদরে ওই কালসাপকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ঈশ্বরভূমিতে।

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন কৃষ্ণ। আজ থেকে ঈশ্বরভূমির কেবল একজন সদস্যই স্বাধীনতার আস্বাদ জানবেন। সে তিনি। এক নিচুস্তরের বিশ্বে নির্বাসিত হয়ে…

নাহ্‌। এ জীবন বয়ে চলবার কোনও প্রয়োজন নেই আর। এত যন্ত্রণার স্মৃতি নিয়ে তিনি আর নিজের চেতনাকে জাগ্রত রাখতে চান না। শুধু একটাই কাজ বাকি রয়ে গেছে। একটা প্রতিকার। সুদূর ভবিষ্যতে…

*****

দুই দণ্ডব্যাপী আলোকবৃষ্টি থেমে গেছে এইবার। নিভে গেছে মন্দিরের আলো। খাঁ খাঁ করতে থাকা মাঠটার মধ্যে একজন মানুষ শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছিল। সেদিকে তাকিয়ে একটা প্রসন্ন হাসি ছড়িয়ে গেল কৃষ্ণের মুখে। কিছু রহস্য ওই চতুর অর্জুনের এখনও অজানা রয়ে গেছে। না হলে সম্পূর্ণ দুই দণ্ড সে তার সৈনিকদের ওই আলোকধারায় স্নান করবার জন্য অপেক্ষা করত। সম্পূর্ণ স্নান মানুষকে অমর করে। অন্তহীন শক্তির অধীশ্বর করে। সম্পূর্ণ জাগিয়ে তোলে তার মস্তিষ্ককে।

নিজের মনকে একলা মানুষটার দিকে ছড়িয়ে দিলেন তিনি। এখন সে তাঁর মনোপ্রক্ষেপণ শুনতে পাবে। সৈন্যদলের মধ্যে গোপনে মিশে সেও ওই আলোকধারায় স্নান করেছে। তবে তার সে স্নান ওদের মত অসম্পূর্ণ নয়।

“প্রিয় দুর্যোধন!”
“প্রভু।”

মুহূর্তের মধ্যে মাঠের বুক থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল একাকী ছায়ামানুষ। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই তাঁর পাশে এসে পুণরাবির্ভূত হল সে।

“আদেশ করুন।”
“আজ ঈশ্বরভূমি ওই ধূর্ত রাজ্যলোভীদের পদানত হবে। তোমায় আমি অন্তহীন জীবন দিয়েছি। অনন্ত শক্তি দিয়েছি। বিশ্বের চার প্রান্তে ঈশ্বরভূমির চারটি প্রবেশদ্বারের প্রহরী নিযুক্ত হলে তুমি।”
“যথা আদেশ। কিন্তু কী লাভ?”
“লাভ আছে, দুর্যোধন। স্থান-কাল তোমার সামনে আর কোনও বাধা নয়। ভবিষ্যতের দিকে চোখ ফেলে দেখো। একদিন এই সামান্য বিশ্বে এক অসামান্য মানুষের আবির্ভাব হবে। ঈশ্বরভূমির স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্ব দেবেন তিনি। তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসবার দায়িত্ব রইল তোমার হাতে। তোমার অনন্ত শক্তিকে তুমি জমিয়ে রাখবে শুধু তাঁর সহায়তার জন্য।”

কয়েক মুহূর্ত চোখদুটি বুজে ধ্যানস্থ থেকে দুর্যোধন হঠাৎ জেগে উঠলেন যেন। একটা নির্মল হাসি ফুটে উঠেছে তাঁর মুখে।

“আমি জানি। কালের পথ বেয়ে সুদূর ভবিষ্যতের অঙ্গনে আমি তাঁকে দেখেছি।”
 “সুদূর ভবিষ্যৎ! কালনিরপেক্ষ ঈশ্বরসভ্যতার কাছে সে আর কতটুকু!” মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন কৃষ্ণ, তবে এইবার আমায় বিদায় দাও বার্তুকল্য। আমার কর্তব্য শেষ।”
“বার্তুকল্য?”
মৃদু হাসলেন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ। “ঈশ্বরভাষায় ওর অর্থ প্রহরী। আজ থেকে ওই হোক তোমার নতুন নাম।”
“কোথায় যাবেন আপনি?”
“অনন্তযাত্রায় যাব বার্তুকল্য। পরিচিত বিশ্বে আমার কর্তব্য ফুরিয়েছে এইবার। অনন্ত আমায় ডাক দিয়েছে। এইবার সেই পথে…”

কয়েক মুহূর্ত বাদে মাটিতে প্রণত মানুষটা যখন মুখ তুলে তাকাল, তখন সেখানে আর কেউ ছিল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল সে। তারপর একটুকরো স্বপ্নের মতোই সেই পাহাড়ের বুক থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। এখন সে তার কর্তব্য জানে।

দ্বিতীয় অধ্যায়
দ্বাদশ  শতাব্দী। রূপনগর, পঞ্চনদ
এক

“মহারাজ।”

নির্জন এই মন্ত্রণাকক্ষের জানালা দিয়ে দূরে ছড়ানো পাহাড়শ্রেণী দেখা যায়। গভীর শীতে কুয়াশার ঢাকনা নেমে এসেছে তাদের শরীরে। মহারাজ রূপসেন সেদিকেই চোখ ধরে রেখে বসেছিলেন।

“বলো, বসুমিশ্র। কোনও খবর?”

“আপনার অনুমান নির্ভুল ছিল দেব। মহারাজাধিরাজ লক্ষ্মণসেনের স্বপ্ন সফল হয়েছে অবশেষে। কাট্যুরিদের লুপ্ত সাম্রাজ্যের রাজধানী বিথিমাল্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে গুপ্তচরের দল ফিরে এসেছে। সেখানে পরিত্যক্ত রাজমন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে উদ্ধার করা গেছে রুদ্রট রচিত প্রতিস্মৃতিবিদ্যার পুঁথি।”

সারা শরীরে একটা রোমাঞ্চ খেলে গেল মহারাজ রূপসেনের। ওই সতেরো অশ্বারোহীর হাতে চরম অপমানের পরাজয় স্বীকার করে তাঁর প্রপিতামহ যে অনুসন্ধানের সূচনা করেছিলেন, অবশেষে আজ তা সফল।

চন্দ্রবংশের গোপন ইতিহাসে এই প্রতিস্মৃতিবিদ্যার উল্লেখ আছে। অমিত শক্তির উৎস তা। তারই শক্তিতে তাঁর সুদূর পূর্বপুরুষ তৃতীয় পাণ্ডব একদিন ঈশ্বরভূমি অভিযানে গিয়েছিলেন।

লক্ষণসেনের সে অনুসন্ধানের সূচনা হয়েছিল দেশ জুড়ে সেই গ্রন্থের সামান্যতম ইঙ্গিতবাহী যেকোনও শ্লোকের খোঁজের মধ্যে দিয়ে। সদুক্তিকর্ণামৃতের দেবপ্রবাহে তাদের খানিক একত্র করবার কাজ করতে করতেই তাঁর আয়ু শেষ হয়ে যায়।

তারপর গত তিন পুরুষ ধরে বিক্রমপুরের কয়েকটা তুচ্ছ গ্রামের ক্ষমতাহীন শাসক হয়ে বাংলার বুকে শত্রুর সাম্রাজ্যবিস্তার দেখেছেন তাঁরা অসহায় চোখে। দেখেছেন আর একই সঙ্গে চালিয়ে গিয়েছেন গভীর অনুসন্ধান। দেবপ্রবাহের শ্লোকগুলোর ওপর ভিত্তি করে তাঁদের দূতেরা সারা আর্যাবর্তে অনুসন্ধান চালিয়েছে। তিলে তিলে নতুন তথ্য সংগ্রহ করে এনেছে। বংশপরম্পরায় সেই তথ্য একত্র করবার পর অবশেষে এই তৃতীয় পুরুষে এসে, সে বিদ্যার বিবরণী ধরে রাখা এই প্রাচীন পুঁথির সংবাদ যখন তিনি পেলেন, রূপসেন আর দেরি করেননি। তুচ্ছ বিলাসের নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে সসৈন্যে আর্যাবর্ত পার হয়ে হাজির হয়েছিলেন চন্দ্রবংশের আদিভূমি এই পাহাড়ি অঞ্চলে। আজ সেই ঝুঁকি ফল দিয়েছে।

বসুমিশ্রের অনুচরেরা একটা লোহার বাক্স এনে নামিয়ে রাখছিল তাঁর সামনে। নীরব ইশারায় তাদের সবাইকে বিদায় করে দিয়ে বাক্সটা খুলে ফেললেন তিনি। তারপর সাগ্রহে তার ভেতরে রাখা কাঠের পাতলা পাটাগুলো বের করে আনলেন। এককোণে দাঁড়ানো দীপদানে আলো জ্বলছিল। আলোটাকে কাছে টেনে আনলেন তিনি। তারপর ডুবে গেলেন পুঁথির পাতায়।

দুই

“পিতা।”

“এসো, বীরসেন। সব কুশল তো?”

“আপনার আশীর্বাদে সব কুশল। সুকেত নগরী লক্ষ্মীর কৃপায় ধনধান্যে ভরে উঠেছে। প্রজারা তৃপ্ত। আপনার আদেশ গত তিন বছরে আমি সম্পূর্ণ পালন করেছি। আমার অনুরোধ, এইবার আপনি এই নির্জনবাস ছেড়ে সেখানে গিয়ে সিংহাসন গ্রহণ করে আমায় দায়িত্বমুক্ত করুন।”

রূপসেন তাঁর প্রিয় পুত্রটির দিকে একবার সস্নেহ দৃষ্টি দিলেন। “না, বীরসেন। তুচ্ছ রাজসিংহাসনের মোহ আর আমার নেই। গিরিসেন ও হামিরসেন নিজের নিজের বাহুবলে কেওন্থল আর কাষ্ঠোয়াল জয় করেছে। আমি তাদের সেখানকার সিংহাসন দিয়েছি। সুকেতের সিংহাসনেও তুমিই বসবে।”

“আর আপনি?”

“এইবার আমাকে দীর্ঘ যাত্রায় যেতে হবে যে!”

“পিতা, আপনি কি সন্ন্যাস…”

মৃদু হাসলেন রূপসেন। এই প্রৌঢ়ত্বে এসেও তাঁর শরীর যথেষ্ট সবল। এখনও ঘোড়ার পিঠে বসে তলোয়ার ধরলে তাঁর সামনে দাঁড়াবার ক্ষমতা আর্যাবর্তে খুব বেশি বীরের হবে না।

“না, বীরসেন। সন্ন্যাস রাজার ধর্ম নয়। রাজার ধর্ম নিজের অধিকার ফিরিয়ে নেয়া। আমি এইবার সেই কাজে যাব।”

“অর্থাৎ…”

“তুর্কি দস্যু! আমাদের চন্দ্রবংশের সম্মান তারা একদিন ধুলোয় লুটিয়ে দিয়েছিল। তার প্রতিশোধ নিতে হবে না?”

“কিন্তু পিতা…”

“তোমরা তিন ভাই এখন এই পার্বত্য প্রদেশের তিন রাজ্যের রাজা। আমি নই। আমি এখনও নিজেকে বঙ্গভূমির দেশান্তরী রাজা হিসেবেই মনে করি। একজন রাজা হিসেবে আরেকজন রাজার কাছে তাই আমার অনুরোধ, আমাকে কিছু সৈন্য দিয়ে সাহায্য করো।”

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন বীরসেন। এই বৃদ্ধের মৃত্যুর ইচ্ছা হয়েছে। নামেই রাজা। আসলে পার্বত্য কয়েকটি ছোটো ছোটো গ্রামের  শাসক তাঁরা। কতটুকু বা সামর্থ্য তাঁদের! তার ভরসায় শক্তিমান তুর্কিদের বিরুদ্ধে রণাঙ্গনে শক্তিপরীক্ষার স্বপ্ন দেখছেন ইনি।

তাঁর মনের কথাটা বুঝি পড়তে পারলেন রূপসেন। মাথা নেড়ে বললেন, “তুমি যা ভাবছ তা সত্য নয়, বীরসেন। আমার অন্য পরিকল্পনা আছে। তবে সে-যুদ্ধ আমার। আমি তা একাই লড়ব। তোমাদের কাছে রাজা হিসেবে, পিতা হিসেবে আমার একটাই অনুরোধ। সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু সৈন্য দিয়ে সাহায্য করো আমাকে।”

মাথা নিচু করে চুপ করে রইলেন বীরসেন। রূপসেনের কূটবুদ্ধিকে খাটো করে দেখবার মানুষ তিনি নন। কিছু একটা পরিকল্পনা তাঁর রয়েছে। সুদূর বিক্রমপুর ছেড়ে এই ভিনদেশে এসে তিন পুত্রকে তিনটে অঞ্চলের রাজসিংহাসন যিনি দিতে পারেন, তিনি কোনও ইচ্ছা প্রকাশ করলে তা যতই অবাস্তব হোক, তাঁকে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস করতে তিনি নারাজ।

“আপনার পরিকল্পনাটা একটু খুলে বলবেন, পিতা?”

একটু হাসলেন রূপসেন। যে বিপজ্জনক অজানা পথে তিনি এগোতে চলেছেন তাতে দুটো মাত্র পরিণতি হতে পারে। সাফল্য, নতুবা মৃত্যু। প্রতিস্মৃতিবিদ্যার নিবিড় পাঠ তাঁকে এটুকু বুঝিয়েছে, যেটুকু পড়েছেন তার চেয়ে অনেক বেশি কথা অকথিত রয়ে গেছে সেই পুঁথিতে। কিছু ভয়াল ইঙ্গিত সেখানে দিতে গিয়েও থেমে গেছেন রুদ্রট। বিপজ্জনক একটা ঝুঁকি নিতে চলেছেন তিনি। তাতে এই তরুণদের জড়িয়ে ফেলা অনুচিত হবে। ওরা সুখে থাক।

“না, বীরসেন। আমি একাই এই পথে যাব। যদি সফল হই তাহলে

ওই তুর্কিদের ধ্বংস করে নবজন্ম দেয়া সেন সাম্রাজ্যে তোমাদের সসম্মানে আহ্বান জানাব। আর যদি বিফল হই, তাহলে মৃত্যুর আগে এইটুকু জেনে যাব যে তোমরা সুখে আছ। নিরাপদে আছ।”

“তাই হোক, পিতা।” বলে ফের একবার তাঁর পা ছুঁয়ে উঠে দাঁড়ালেন বীরসেন। “গিরিসেন ও হামিরসেনের সঙ্গে আমি নিজেই কথা বলব। এক পক্ষকালের মধ্যে পাঁচ সহস্র অশ্বারোহী সৈনিক আপনার সেবায় হাজির হবে।”

“বেশ। তবে একটা কথা। সৈনিকদের উপযুক্ত শীতবস্ত্র সঙ্গে নেবার আদেশ দেবে।”

“কিন্তু পিতা, আর্যাবর্তের সমতলভূমিতে এই হেমন্তে…”

“আহ্‌, বীরসেন! আমার পরিকল্পনাকে প্রশ্ন কোরো না। এখন যাও।”

তিন

বহিরকুটি।

উত্তরকাশীর অদূরে ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটি এমনিতে বড়ো নির্জন। কিন্তু আজ সেখানে উৎসবের হাওয়া উঠেছে। পশ্চিমের কোনও এক রাজা চলেছেন দিগ্বিজয়ে। আজ এখানে তাঁর শিবির পড়েছে। সারি সারি তাঁবু, ঘোড়ার দল, বর্মসজ্জিত সৈনিকের দলকে দূর থেকে দেখে গ্রামবাসীরা। তাদের শান্ত জীবনে এমন ঘটনা খুব বেশি ঘটে না।

তবে এই গ্রামের খানিক দক্ষিণপূর্বে উত্তরকাশী ছাড়া আর কোনও জনপদ নেই। বাহিনী সেদিক থেকেই এখানে এসে পৌঁছেছে। সেক্ষেত্রে তারা কোথায় রাজ্যজয়ে যাবে? গ্রামের মানুষজন সেই নিয়ে নিজেদের মধ্যেই আলোচনা চালায়। সৈনিকদের ভাষা আলাদা। হাবভাবও বড়ো কঠোর। তাদের জিজ্ঞাসা করবার সাহস তাদের নেই।

প্রশ্নটা বসুমিশ্রেরও। প্রতিস্মৃতিবিদ্যার পুঁথিতে ঠিক কী পড়েছেন মহারাজ তা তিনি তাঁর কাছেও ভাঙেননি। তাহলে কি পশ্চিমের ওই দুর্গম বরফঢাকা পাহাড়শৃঙ্গগুলোর মধ্যে কোথাও কোনও শক্তিশালী গুপ্ত দেশের সন্ধান আছে? সেদিন সকালে যখন রাজার তাঁবুতে তাঁর ডাক পড়ল, মনে মনে তাই বড়ো আশা নিয়ে তিনি সেখানে গিয়ে ঢুকেছিলেন।

হয়ত মহারাজাধিরাজ তাঁর কাছে সেই গোপন তথ্য এবার খুলে বলবেন।

শিবিরে ঢুকে অবশ্য তাঁর ভুল ভাঙতে দেরি হল না। মহারাজ রূপসেনের আসনের পাশে দুটি আলাদা আলাদা পেটিকা রাখা। বসুমিশ্র এসে ঢুকতে তিনি সামনের আসনটা দেখিয়ে দিয়ে বললেন, “আজ তোমার কাছ থেকে আমার বিদায় নেবার সময় হয়েছে বন্ধু।”

কথাটা শুনে একটু চমকে উঠলেন বসুমিশ্র। তারপর ভাঙা গলায় বললেন, “কোন অপরাধে আমাকে আপনার পাশ থেকে নির্বাসন দিচ্ছেন, রাজা?”

“নির্বাসন নয়। একটা বড়ো দায়িত্ব দিয়ে পাঠাচ্ছি তোমাকে। একমাত্র তোমাকেই ভরসা করে সে-কাজ দেয়া যায়।”

“আদেশ, মহারাজ।”

পাশে রাখা পেটিকাদুটোর দিকে এইবার ইঙ্গিত করলেন মহারাজ রূপসেন। “শোনো। পুঁথিটি মহামূল্যবান। এই যুদ্ধ থেকে আমি ফিরে আসব কি না আমার জানা নেই। তাই এর দায়িত্ব আমি তোমাকে দিয়ে যেতে চাই।”

“কিন্তু দুটি পেটিকা?”

“সাবধানতা, বসুমিশ্র। এই পুঁথি মহামূল্যবান। মানুষকে সর্বশক্তিধর বানাবার কৌশল আছে এতে। এ আমার বংশের সম্পত্তি। অনধিকারীর হাতে গেলে এর অপপ্রয়োগ হতে পারে। এখন শোনো। পুঁথিটাকে দুটো ভাগে ভাগ করেছি আমি। এদের দুটো আলাদা আলাদা জায়গায় গুপ্তভাবে সংরক্ষণ করবে তুমি। স্থানদুটি আমি আগেই নির্বাচন করে রেখেছি। ঠিক চার পক্ষকালের মধ্যে এই কাজ সমাধা করতে হবে তোমাকে। আমি ফিরে এলে তা তুমি ফের আমার হাতে এনে দেবে। আর এই অভিযানে আমার মৃত্যু হলে এর উত্তরাধিকার অর্শাবে আমার তিন পুত্রের ওপর।”

“আমি প্রাণপণে আপনার আদেশ পালন করব, মহারাজ।”

“বেশ। কাছে এসো। স্থানদুটির নাম শুনে নাও তুমি।”

কয়েকমুহূর্ত বাদে কথা শেষ করে হাততালি দিলেন মহারাজ রূপসেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দুটি পানীয়ের পাত্র সোনার থালায় রেখে একজন অনুচর এসে তাঁবুতে ঢুকল। তার একটি স্ফটিকখচিত, আর অন্যটি সাধারণ রূপার।

স্ফটিকখচিত  পানপাত্রটা  হাতে  তুলে  নিয়ে  এক  মুহূর্ত ভাবলেন

রূপসেন। তারপর সেটা বসুমিশ্রের হাতে তুলে দিয়ে সাধারণ পানপাত্রটা নিজে তুলে নিয়ে বললেন, “তুমি শুধু আমার প্রধান উপদেষ্টাই নও, প্রিয় বন্ধুও। আজ বিদায়ের দিনে আমার পাত্রে পান করবে তুমি বন্ধু। এসো।”

পাত্রটি তুলে ধরলেন যখন বসুমিশ্র তখন তাঁর ঠোঁটদুটো আবেগে কাঁপছিল। মাথা নত করে বললেন, “এই সম্মান বসুমিশ্র ভুলবে না। আমি প্রাণ দিয়েও আপনার দেয়া কাজ সমাপ্ত করব।”

একরাশ উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন রূপসেন। তারপর সরে গিয়ে এক চুমুকে নিজের পাত্রটা নিঃশেষ করে দিয়ে বললেন, “তাহলে বিদায়, বন্ধু। ফের দেখা হবে।”

“বিদায়, মহারাজ। ভগবান বিষ্ণু আপনার সহায় হোন।”

তাঁর চলে যাবার পথটার দিকে তাকিয়ে একটা বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠছিল রূপসেনের মুখে। এ অভিযান থেকে তিনি আর ফিরে আসবেন কি না কেউ জানে না। যদি না ফিরে আসেন, যদি ওই পুঁথির ক্রিয়াকর্ম পালন করতে গিয়ে পুঁথিতে যে অকথিত বিপদের আভাস দিয়েছেন রুদ্রট তেমন কোনও দুর্ভাগ্য ছেয়ে আসে তাঁর ওপরে, সেক্ষেত্রে এ-পুঁথি তাঁর সন্তানদের হাতে পড়ুক তা তিনি চাননি। আর সফল হলে এ-পুঁথি তাঁর অনেক কাজে আসবে।

এদের গুপ্তস্থান শুধু তাঁরা দু’জন জানেন। যে ধীরগামী বিষ আজ তিনি নিজের স্ফটিকপাত্রে মিশিয়ে তাঁর প্রিয়বন্ধুর হাতে তুলে দিয়েছেন তা চার পক্ষকালের সামান্য বেশি সময় নেবে কার্যকরী হতে। কোনও লক্ষণ থাকবে না। সামান্য একটু জ্বরভোগে মৃত্যু হবে বসুমিশ্রের।

চার পক্ষকাল পরে এ-পুঁথির দুটি ভিন্ন ভিন্ন অংশের ঠিকানা একমাত্র তিনি ছাড়া আর কেউ জানবে না। কেউ না!

একটা অপরাধবোধ কাজ করছিল তাঁর মনে। বসুমিশ্র বিশ্বাসী মানুষ। তাঁকে ঈশ্বরের চেয়েও বেশি ভক্তি করে। তাকে এভাবে…

পরক্ষণেই ভাবনাটাকে ঝেড়ে ফেলে দিলেন তিনি। রাজার কর্তব্য বড়ো কঠোর। সেখানে আত্মপর ভেদ করা যায় না।

চার

“বার্তুকল্য।”
“বলুন, জিহুগাপতি।”
“কেউ আসছে।”
“জানি।”

বলতে বলতেই বার্তুকল্যের হাতের ইশারায় তাঁদের সামনের বাতাসে একটা ছবি গড়ে উঠছিল। পাহাড়ের তীক্ষ্ণ ঢাল বেয়ে পাঁচ হাজার অশ্বারোহীর একটা দল এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে।

“এদের নেতৃত্বে রয়েছে আমারই উত্তরসূরি।”

সামনের ছবিটা বদলে গেছে। সেখানে সৈন্যদলের সামনে একটা সাদা ঘোড়ার পিঠে বসা একজন বীর যোদ্ধার ছবি বড়ো হয়ে উঠেছে তখন।

“এরা আমার তৈরি অভিষেকযন্ত্রের কাছে এসে পৌঁছেছে। আজ রাত্রে বিসর্পিণীর উল্কাপাতের তিথি। আজ তারা শক্তিমান হবে। তুমি কি…”

“উপযুক্ত শক্তি নিয়ে এখানে এসে পৌঁছোলে তাদের বাধা দেয়ার সামর্থ্য আমার নেই জিহুগাপতি, তা আপনি জানেন।”

বলতেবলতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বার্তুকল্য। বিষধর সর্পের উত্তরাধিকারীও বিষধর সর্পই হয়। ঐ যোদ্ধার নাম রূপসেন। তিনি তার মনের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখেছেন আগেই। সেখানকার কোনো স্মৃতিই এখন আর বার্তুকল্যের অজানা নেই। রূপসেনের জ্ঞান অসম্পূর্ণ। প্রতিস্মৃতিবিদ্যার পাঠই শুধু সে নিয়েছে। কিন্তু তার জন্য নিজের মস্তিষ্ককে দীর্ঘ সাধনায় প্রস্তুত করেনি সে। সেখানে কেবলই দিগ্বিজয়ের লোভ। অথচ অভিষেকযন্ত্রের প্রভাব তাকেও আজ উপযুক্ত শক্তিধর করে তুলবে।

একটা বিদ্রূপ মাখানো হাসির শব্দে তাঁর চমকটা ভেঙে গেল। “তুমি কী ভাবছ তা অনুমান করতে পারি বার্তুকল্য। কিন্তু অভিষেকযন্ত্রের কথা তো এ জানে না!”

“পরিহাস করবেন না, জিহুগাপতি। স্বর্গভূমির দ্বার পেরিয়ে আপনার সৈন্যদলের এই জগতে আসা আমি আটকাতে পারি। কিন্তু আপনি আমার সমান শক্তিধর। আপনার ইচ্ছামত ঘোরাফেরায় আমি বাধা দিতে পারি না। অভিষেকযন্ত্রের কাছে পৌঁছে আজ নিজের বংশধরকে আপনি এর খবর জানাবেন বলাই বাহুল্য। সে অধিকার আপনার আছে।”

“ভুল, বার্তুকল্য। আমি তাদের কিছুই জানাব না। একজন রাজার সবচেয়ে ভয়ের জায়গা তার সমশক্তিধর বংশধর, তা কি তুমি জান না?”

“তাহলে?”

“নিয়ম তো তুমি জানো! অযোগ্য মানুষ দরজায় এসে মন্ত্রোচ্চারণ করলে, ঈশ্বরভূমির শাসক হিসাবে তার শাস্তিদানের অধিকার একমাত্র আমার। তাকে তুমি রক্ষা করতে পারবে না।”

“আপনি আপনার নিজের বংশধরকে…”

“রাজার কর্তব্য বড়ো কঠোর। সেখানে আত্মপর ভেদ করা যায় না, বার্তুকল্য। তবে ভেবো না। তাদের আমি নিশ্চিহ্ন করব না। অন্য কাজ আছে তাদের। আমি চলি। নির্দিষ্ট সময়ে দেখা হবে।”

একটা তীব্র ঘূর্ণি তুলে বার্তুকল্যের সামনে থেকে হঠাৎ ভেঙেচূরে মিলিয়ে গেল ভাসমান বালিতে গড়ে ওঠা শরীরটা। তারপর হ্রদের বুকে জ্বলন্ত অগ্নিস্তম্ভের গায়ে ফুটে ওঠা দরজাটার দিকে ধেয়ে গেল সেই বালির ঝড়। একমুহূর্ত বাদে সেখানে দরজা বা বালির ঝড়ের কোনও চিহ্নও রইল না আর। সেদিকে তাকিয়ে একটু মাথা নাড়লেন বার্তকুল্য। জিহুগাপতি অর্জুন নির্দয় হতে পারেন, কিন্তু রাজনীতিতে তাঁর জ্ঞানকে বার্তুকল্য নিজেও অস্বীকার করতে পারেন না।

পাঁচ

“মহারাজ!”

পাহাড়ের সঙ্কীর্ণ ঢাল বেয়ে নেমে প্রশস্ত মাঠটার একপাশে শিবির পড়েছে। মাঠের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ওলটানো বাটির মতো মন্দিরটাকে সন্ধ্যার মুখমুখ একঝলক দেখেছিলেন রূপসেন।

সৈন্যাধ্যক্ষ বরুণপাল শিবির স্থাপনের পর সেখানে গিয়ে দেখে এসে জানিয়েছেন, জায়গাটা একটা পাথরের তৈরি বিশেষত্বহীন ঘর। সম্ভবত এখানকার অনার্য বাসিন্দাদের তৈরি কোনও আদিম পূজাক্ষেত্র হবে। ও নিয়ে তাই আর কোনও আগ্রহ বাকি ছিল না রূপসেনের।

“কে? বরুণপাল? এত রাত্রে? বাইরে এত আলো কীসের?”

বলতে বলতেই পাশে রাখা তলোয়ারটাকে হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন রূপসেন। রাত সবে দ্বিপ্রহর। অথচ একটা অপার্থিব আলোয় তখন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তাঁর তাঁবু।

তাঁবুর বাইরে তখন তাঁর গোটা সৈন্যদল আতঙ্কিত মুখে এসে জড়ো হয়েছে। বের হওয়ামাত্র তাদের দৃষ্টিকে অনুসরণ করে  মাঠের মাঝখানে চোখ চলে গেল রূপসেনের।

অকল্পনীয় এক জাদু ঘটে চলেছে সেখানে! অন্ধকার আকাশে এসে স্থির হয়েছে একটা ধূমকেতু। তার থেকে ছুটে আসা লক্ষ লক্ষ আলোককণা তখন মাঠের মাঝখানের সেই মন্দিরটার গায়ে ক্রমাগত আছড়ে পড়ছে।

তার আঘাতে সূর্যের মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মন্দিরটা থেকে বের হয়ে আসা একটা ভূতুড়ে নীলাভ আলো তখন মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পড়তেই এগিয়ে আসছিল তাঁর শিবিরের দিকে।

দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেন রূপসেন। অজ্ঞাত অঞ্চলে গভীর রাতে জেগে ওঠা এই জাদুকরী আগুন কখনও শুভ হতে পারে না। সৈন্যদের দ্রুত কিছু নির্দেশ দিয়ে নিজের ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে উঠলেন তিনি। যন্ত্রচালিতের মতো গোটা সৈন্যদলটাও তাই করেছে।

তারপর ছুটে আসা তরল সেই নীলাভ অগ্নিশিখার আগে আগে ঘোড়া ছুটিয়ে যখন তাঁরা পাহাড়ের ঢালের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছোলেন তখন পায়ের নীচে সূর্যের মতো জ্বলতে থাকা মন্দিরকে ঘিরে গোটা মাঠটাকেই ঢেকে দিয়েছে সেই নরকের আগুন।

ছয়

ছোট্ট হ্রদটি। তাকে ঘিরে বরফে ঢাকা পর্বতচূড়ার দল মৌন হয়ে থাকে। তার জলে তাদের সুন্দর ছায়া মাঝেমাঝেই অদৃশ্য হয়ে যায়। এই মুহূর্তে তার পাড়ের বালুচরে দাঁড়িয়ে সেই অদৃশ্য হয়ে যাবার কারণটিকেই মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন রূপসেন। তাঁর পেছনে তাঁর সৈন্যদলও ভীত চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। হ্রদের ঠিক মাঝখানে হঠাৎ জলরাশি থেকে মুখ জাগাচ্ছে বাষ্প আর আগুনের একটা স্তম্ভ। প্রতি দুই দণ্ড অন্তর অন্তর ওই অগ্নিস্তম্ভ মাথা তোলে। তারপর খানিকক্ষণ তাণ্ডব করে ফের মিলিয়ে যায় জলের তলায়। সম্ভবত পাতালের নরকাগ্নির সঙ্গে তার সরাসরি কোনও যোগাযোগ রয়েছে। এখানে এসে পৌঁছোবার পর সারাদিন ধরে বারে বারে ওই দৃশ্য দেখেছে তারা। দিনের বেলা সেই আগুনের পরিপূর্ণ রূপ দেখা যায় না। কিন্তু এখন, এই গভীর রাত্রের অন্ধকারে তার আবির্ভাব এক ভীষণ অথচ মোহময় রূপ ধরছে ধীরে ধীরে।

“কিন্তু মহারাজ, ওই নরকের অগ্নিস্তম্ভ কী করে কোনও স্বর্গভূমির দ্বারপথ হতে পারে? এখান থেকেই ওর তীব্র উত্তাপের ছোঁয়া পাছি আমরা। তাছাড়া কোনও জলযান ছাড়া ওর কাছে…”

বালির ওপর পূজার সামগ্রী ছড়ানো রয়েছে। কুলদেবতাদের পূজা সাঙ্গ হয়েছে খানিক আগে। পাশে রাখা একটি বালিঘড়ি সংকেত দিচ্ছিল, আর কিছু মুহূর্ত। তারপরেই ওই অগ্নিশিখা চূড়ান্ত উচ্চতায় পৌঁছাবে। রুদ্রটের নির্দেশ সঠিক হলে সেই সময়টাতে…

সেদিকে চোখ আটকে রেখে মহারাজ রূপসেন নিচু গলায় বললেন, “আমি তার উত্তর জানি না। শুধু জানি, আমার পূর্বপুরুষ অর্জুন এই পথেই স্বর্গভূমির দ্বার খুলেছিলেন দিব্যাস্ত্রের সন্ধানে। আমিও এইবার সেই পথে যাব। তবে একা নয়। তুমি সৈন্যদলকে তৈরি করো। আমার উচ্চারিত প্রত্যেকটা শব্দ যেন তারা নিখুঁতভাবে…”

“তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত, মহারাজ।” তাঁদের পেছনে সার বেঁধে দাঁড়ানো সৈন্যদলটার দিকে ইশারা করে দেখালেন সেনাপতি বরুণপাল।

“সময়ও এসে গেছে, বরুণপাল।”

বালিঘড়ির দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন রূপসেন। তাঁর সমস্ত শরীর শক্ত হয়ে উঠেছে। সামনে হ্রদের বুকে লেলিহান হয়ে ওঠা অগ্নিস্তম্ভের দিকে মুখ করে শান্ত গম্ভীর কন্ঠে তিনি উচ্চারণ করলেন প্রথম শ্লোকটি-

“অর্বুদং নক্ষত্রতেজা নমামি ভো স্বর্গপথে…”

পাঁচ হাজার গলায় বেজে উঠেছে প্রাচীন এক পুঁথির পুনরুদ্ধার করা রহস্যময় শ্লোকের দল। তার গম্ভীর শব্দ চারপাশের অন্ধকার পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে ফিরে আসছিল।

সাত

“মহারাজ!”

মন্ত্রপাঠ শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। শেষ শ্লোকটা উচ্চারণ করতে করতেই বরুণপালের ভয়ার্ত গলাটা শুনতে পেয়ে চোখ খুললেন রূপসেন।

অগ্নিস্তম্ভ থেকে আগুনের একটা শিখা ছিটকে বের হয়ে এসে বিদ্যুতের গতিতে ধেয়ে আসছিল তাঁদের দিকে। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই বালুচরের একপাশে দাঁড়ানো গুহাটা থেকে বরফমাখা একটা তীব্র ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝলক উঠে এসে ছুটে গেল শিখাটার দিকে। একে অন্যকে ঘিরে পাক খেতে খেতেই তারা আস্তে আস্তে দু’জন ভাসমান মানুষের রূপ নিচ্ছিল। শ্বেতবস্ত্র পরিহিত এক সন্ন্যাসী আর অগ্নিবর্ণ সোনার বর্মে সাজা এক যোদ্ধাপুরুষ।

প্রায় একই সঙ্গে তীব্র একটা জ্বালায় ছটফট করে উঠলেন রূপসেন। হঠাৎ যেন তাঁর শরীরের ভেতরে কোনও অগ্নিকুণ্ড জেগে উঠেছে। তরল ধাতুর মতো শিরা উপশিরা দিয়ে বয়ে চলা সেই আগুনের স্রোত তাঁর শরীরটাকে উজ্জ্বল করে তুলছিল। তাঁর সম্পূর্ণ সৈন্যদলও একসঙ্গে জ্বলন্ত সোনার মূর্তির মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে তাঁকে ঘিরে।

একটা দানবিক ইচ্ছাশক্তিতে নিজের যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে অবাধ্য জিভে শ্লোকের শেষটুকু উচ্চারণ করলেন রূপসেন।

“স্বর্গপথোন্মোচনার্থং  নিবেদাম্যাত্মনম্বয়ম।”

আর সঙ্গে সঙ্গেই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল তাঁদের শরীর। সেই তীব্র জ্বালার মধ্যেও প্রত্যেকটি ইন্দ্রিয় তাঁদের তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছিল বহুগুণ। শুনতে পেয়েছিলেন মেঘমন্দ্র গলায় বলে ওঠা কয়েকটা কথা, “প্রস্তুতিবিহীন  মানুষের  অযোগ্য  জিহ্বায় উচ্চারিত  এই  শব্দের  শক্তি

উচ্চারণকারীকেই ধ্বংস করে, সে শিক্ষা তুমি পাওনি রূপসেন।”

তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে জ্বলন্ত শরীরটা একবার উচ্চারণ করল, “ক্ষমা প্রভু, প্রাণভিক্ষা!”

“তা তুমি পাবে, রূপসেন। তোমার ধমনীতে আমার, স্বয়ং জিহুগাপতি অর্জুনের রক্ত বইছে। তোমায় প্রাণভিক্ষা আমি দেব। ঈশ্বরভূমির দরজা তোমার জন্য খুলবে না। তার বাইরে, এই পাহাড়ে আমার প্রহরী হয়ে তুমি চিরকাল সসৈন্যে বাস করবে।”

একসময় নিভে এল আগুনের স্রোত। পশ্চিম আকাশে সদ্য ওঠা চাঁদ মরা আলো ছড়াচ্ছিল। সেই আলোতে ভাসমান মূর্তিদুটির সামনে নতজানু হয়ে বসল পাঁচ হাজার প্রেতছায়া। তাদের পোশাকগুলো মানুষের অবয়ব দেখায়। কিন্তু সে পোশাকের ভেতরে রক্তমাংসের কোনও শরীর নেই। তাদের নেতার নতজানু হয়ে থাকা পোশাকটার অদৃশ্য মাথায় তখনও ঝলমল করছে তার উত্তপ্ত রাজমুকুট।

“আদেশ, প্রভু অর্জুন।”

“অপেক্ষা করো, প্রিয় রূপসেন।  এই  নির্জন পাহাড়ের ছায়ায় মিশে

থেকে অপেক্ষা করো। যথাসময়ে ডাক পাবে।”

“কবে আসবে সেই ডাক?”

“আট শতাব্দী বাদে। যে বিসর্পিণীর অগ্নি-আশীর্বাদকে অসীম মূর্খতায় তুচ্ছ করেছিলে, সে ফিরে আসবার সময় ফের তোমাদের ডাক পড়বে।”

তৃতীয় অধ্যায়
১৯৮৪। কলকাতা

আরেকটু হলেই পা পিছলে যাচ্ছিল কাশীবাবুর। নভেম্বরের শেষ, এসময়ে বৃষ্টি তো অসময়ের বৃষ্টিই বলা যায়। তার ওপর মেট্রো রেলের কাজ এদিকটাতে এখনও শেষ হয়নি। রাস্তার ওপর বড়ো বড়ো লোহার স্ল্যাব পাতা রয়েছে যার ওপরে মাটি ফেলে পিচ ঢালাই হবে। লোহার মস্ত পাটাতনের ওপরেই বাস থেকে নামতে হল। সেগুলোর ওপরেই জল জমে ছিল আর সেটাই বিপজ্জনক হতে পারত। সন্ধের পরে আঁধার-আলোয় মিশে লোহার পাতের ওপর জলটা ঠিক ঠাহর হয়নি। রাস্তার মরা হলদে আলো পড়ে চিকচিক করছিল ঠিক, কিন্তু বাস থেকে নামার সময় কাঁধের ঝোলা সামলাতে গিয়ে আর তত মনোযোগ দেয়া যায়নি। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোডের ওপর আশুতোষ কলেজ ছাড়িয়ে কালীঘাট-রাসবিহারী অংশের কাজ প্রায় শেষের মুখে এখন। ভবানীপুর থেকে এসপ্ল্যানেড অবধি পাতালরেল গতমাসের চব্বিশ থেকে চলাচল শুরু হয়েছে। এদিকটাও হল বলে।

কালীঘাটের হকার্স কর্নার ছাড়িয়ে এস.পি.মুখার্জি রোড ধরে রাসবিহারীর দিকে তিরিশ-চল্লিশ পা এগিয়েই ডানহাতি দ্বারিক গাঙ্গুলি স্ট্রিটে ঢুকে পড়েন কাশীবাবু। এ-রাস্তার ও-মুড়োয় সদানন্দ রোড। এ দুয়ের ক্রসিংয়ে ডানহাতে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। তাতে খালি নীল রঙের ড্রাম সার সার দিয়ে ডাঁই করে রাখা। ওগুলো মূলত রঙের আর অ্যাসিডের ড্রাম। খালি হবার পর এখানে চলে আসে। ভেতরটা পরিষ্কার করে আবার হাতবদল হয়।

এ অবধি এসে বাঁদিকে ফুটপাথে উঠে একটু এগিয়ে বাঁহাতি তিন নম্বর বাড়িতে ঢুকে পড়লেন উনি।

তিনতলা বাড়ি। গেট দিয়ে ঢুকে বাড়ির একপাশে বাঁধানো  উঠোন।

উঠোনের উত্তরদিকে বাড়ি-লাগোয়া চার ধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে বাড়ির সদর দরজা। ভারী এবং কাঠের। সেটা খোলাই ছিল। ঢুকে ডানদিকের আরেকটা বন্ধ দরজায় কড়া নাড়লেন কাশীনাথ সেন।

“বাবা আছেন?”

প্রশ্নটা পরিতোষ ঠাকুরের ছেলে শিশিরকে করলেন কাশীবাবু। ওকে তিনি চেনেন। সেইই দরজা খুলে দিয়েছে।

“হ্যাঁ। আপনি ভেতরে এসে বসুন।”

ভেতরের বারান্দায় রাখা মেহগনি কাঠের টেবিলের পাশেই একটা চেয়ার টেনে বসলেন কাশীবাবু। খানিক পরেই পরিতোষ এলেন। একটা হাফ হাতা ফতুয়ার ওপর খদ্দরের চাদর। ধুতিটা লুঙ্গির মতো করে পরা। সামনের দিকে চুল উঠে বেশ চকচকে হয়ে গেলেও পেছনের দিকে আঁচড়ানোর মতো খানিকটা রয়েছে এখনও।

এই মানুষটিকে সবসময়ই হাসিখুশি দেখেছেন কাশীনাথ, চোখে একটা প্রচ্ছন্ন কৌতুক যেন লেগেই রয়েছে। এসেই জিজ্ঞেস করলেন , “পাতালপুরী দেখতে গেলেন নাকি?”

ভ্রূ একবার কুঁচকেই কাশীনাথ একগাল হেসে বললেন, “আজ্ঞে না। এখনও নামা হয়নি। সবে চালু হল, আর ক’দিন যাক।”

ইঙ্গিতটা ধরে ফেলে হা হা করে হেসে উঠলেন পরিতোষবাবু। “বেশ বেশ। তা প্রুফটা এনেছেন তো?”

“হ্যাঁ। এই যে।”

“আপনাকে পান্ডুলিপি দেবার সুবিধে এই যে প্রুফে কাটাকুটি কম করতে হয়। এই বয়েসে আর এত সংশোধন ভালো লাগে না।”

কাশীবাবু হাসলেন। ওঁর নিজের ছাপ্পান্ন পেরিয়েছে এ-বছর। প্রেসের মালিক হলেও কয়েকটা বইয়ের কম্পোজ নিজের হাতেই করেন কাশীনাথ, সেটা ওঁর ভালোলাগা থেকেই। কপি দেখে দেখে টাইপ রাখার কাঠের বাক্স থেকে একটা একটা অক্ষর নিয়ে গ্যালিতে সাজানো। একটু একটু করে অক্ষর গড়ে তোলা। বাড়তি পাওনা বইখানা সক্কলের আগেই পড়ে ফেলা।

নবীন ধর লেনের কাশীবাবুকে শুধু ছাপাখানার মালিক বলেই লোকে চেনে তা নয়, একজন গভীর পড়ুয়া হিসেবেও চেনে। মুক্তোর মতো হাতের লেখা। নির্ভুল বানান। সে সুবাদেই পরিতোষবাবুর সঙ্গে তাঁর লেখক ও মুদ্রকের বাইরে একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বেশ

খানিকটা বয়সের পার্থক্য আছে যদিও। তথাপি।

বৌদি চা নিয়ে এসেছিলেন। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পরিতোষ কাশীবাবুকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি তো পড়লেন, তা কেমন লাগল?”

“চমৎকার। সত্যি বলতে কী, আমি তো শুধু এ-বইয়ের নামটুকুই শুনেছিলাম।”

“হ্যাঁ। সদুক্তিকর্ণামৃত প্রথম সংকলিত হয় ১২০৫ সালে সেন রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায়। শ্রীধরদাসের হাতে। অবশ্য তাঁর বইয়ের নাম কিন্তু ছিল ‘শ্রীসুক্তিকর্ণামৃত’। নিজের লেখাতে তিনি নিজেই তার নাম বদলে দেন। বহু পরে বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় এটার গোটা দুই খণ্ড প্রকাশ হয়। পুরো বইটা ১৯৩৩ সালে লাহোর থেকে প্রথম প্রকাশ করা হয়। শ্রীরামাবতার শর্মার সম্পাদনায়।

“সে বইটাই কিছু ত্রুটি সংশোধন করে অধ্যাপক সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন বছর কুড়ি আগে ১৯৬৫ সালে। তবে দুটোই ছিল সংস্কৃতে।  বাংলায় অনুবাদ… উঁহু, মনে তো

পড়ে না পূর্ণাঙ্গ কোনও অনুবাদ আছে।”

“এরকম কোষকাব্য নিশ্চয়ই আরও আছে?”

“নিশ্চয়ই। কতটুকুই আর জেনেছি আমরা? যা জানা গেছে তার বহু

কিছুই ছাপা হয়নি। সে যাক, বাংলা অনুবাদটি আপনার কেমন লাগল?”

“নতুনরকম। আর হ্যাঁ, বলতে দ্বিধা নেই, কোথাও কোথাও বেশ আধুনিকও বটে। কিন্তু এ তো কয়েকখানা শ্লোকমাত্র।”

“হ্যাঁ। পুরো বই ছাপার সামর্থ্য কি আর আমার আছে? তাই দুধের সাধ ঘোলে মেটানোর চেষ্টা। কয়েকটা শ্লোক নিয়ে একটা চটি পুস্তিকা যদি প্রকাশ করতে পারি আপাতত। তারপর যদি কেউ উদ্যোগী হন, আগ্রহ দেখান, তখন বাকি অনুবাদে হাত দেয়া যাবে’খন।”

কাশীবাবুর মনটা একটু খারাপ লাগলেও সেটা প্রকাশ করলেন না। আজও এমন বিদ্বান লোকেদের ভালো কাজ বেশিরভাগ সময়েই লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়। বড়ো প্রকাশনা সংস্থা বা ধনী ব্যক্তির দাক্ষিণ্যটুকু পাওয়া নাগালের বাইরেই থাকে।

“আরে, আপনি যে মুষড়ে পড়লেন মশায়!”

পরিতোষবাবুর কথায় কাশীনাথ ম্লান হেসে তড়িঘড়ি নিজের কাপের চাটুকু শেষ করেন। তারপর বলেন, “আমি সাতদিন বাদে এসে কারেকশন প্রুফ নিয়ে যাব’খন।  আজ উঠি।  একবার  সুবলবাবুর বাড়ি ঘুরে যাব।”

“ও, তাই বুঝি! সুবলের ওখানে? তা বেশ। আসুন। সাবধানে যাবেন।”

তিনতলা বাড়িটা থেকে কাশীনাথ বেরিয়ে ফুটপাথে এসে দাঁড়াতেই বাতাসে একটা হালকা শিরশিরানি ভাব টের পেলেন। শীতটা এইবারে জাঁকিয়ে বসবে। কাঁধের ঝোলা থেকে ভাঁজ করা চাদরটা বার করে গায়ে জড়িয়ে নিলেন উনি।

সুবলচন্দ্র ভট্টাচার্য পরিতোষের বন্ধুলোক। বয়েসে দু-তিন বছরের ছোটোই হবেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। এখন অবসর নিয়েছেন। পত্রপত্রিকায় বিচিত্র সব বিষয় নিয়ে লেখেন।

কালীঘাট পার্কের পেছনেই বাড়ি। কোনও নতুন কাজ-টাজ থাকলে পেতে পারেন ভেবে সোজা গলি পার হয়ে বড়ো রাস্তা টপকে কালীঘাটের গ্রিক চার্চের পাশের রাস্তায় ঢুকে পড়লেন কাশীনাথ সেন।

এদিক দিয়ে শর্টকাট হবে। সুবলচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করে দক্ষিণে হেঁটে রাসবিহারী অ্যাভিনিউতে গিয়ে দাঁড়ালেই বাস পেয়ে যাবেন।

সুবলচন্দ্রের  বাড়ি  গিয়ে  হতাশ   হতে   হল  কাশীবাবুকে।  তিনি বাড়িতে নেই। মল্লিকপুরে গিয়েছেন, পৈতৃক বাড়িতে। একটা হাতচিঠিতে আসার কারণ দু’লাইন লিখে রেখে এলেন। মনে মনে ঠিক করলেন, সাতদিন বাদে যেদিন পরিতোষবাবুর বাড়ি আসবেন ওইদিন আরও একবার খোঁজ নেবেন। বাড়ি ফেরার সময় কলেজ স্ট্রিট থেকে আগে কালীঘাট হয়ে তারপর বিজয়গড়।

সাতদিন পর অবশ্য আসা হল না কাশীনাথ সেনের। যেদিন পরিতোষ ঠাকুরের বাড়ি গিয়েছিলেন, তার পরদিন বাড়ি ফেরার সময় বেকায়দায় গর্তে পড়ে পা ভেঙে গেছিল ওঁর।

ব্যাপারটা ঘটেছিল এরকম – শেয়ালদার ডাউন ট্রেন থেকে যাদবপুর স্টেশনে নেমে বাইরে আসতেই লোডশেডিং। হঠাৎ করে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় না দেখতে পেয়ে বেকায়দায় পা পড়ল রাস্তার খন্দে আর যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলেন কাশীবাবু।

কোনওমতে রিক্সা ডেকে দশ টাকা ভাড়া দিয়ে বাড়ি ফিরে নিজের স্ত্রীকে চুন-হলুদ গরম করতে বললেন। যদি কোনও উপকার হয়! রাতে অবশ্য ব্যথা সাময়িক কমলেও ভোরের দিকে খুব বাড়ল। ফলে হাসপাতাল, এক্স-রে, পায়ে প্লাস্টার এবং সোজা একমাস বিছানায়।

কাশীনাথ অবশ্য হাসপাতাল থেকে প্লাস্টার করিয়ে বাড়িতে এসেই পরিতোষবাবুকে একখানা পোস্টকার্ড লিখে বিস্তারিত জানিয়ে দিয়েছিলেন। পাণ্ডুলিপিটার কাজ আর এগোয়নি স্বভাবতই।

চতুর্থ অধ্যায়
২০১৪। সতুরি গ্রাম, গাড়োয়াল হিমালয়

সালুর ঠাকুমা অনেক গল্প বলেন। রোদে পিঠ দিয়ে বসে। উল বুনতে বুনতে। এখন বুড়ি হয়েছেন বলে আর ঘাস কাটতে যান না। সালুর মা যায়। কখনও কখনও সালুও যায়। শীত পড়বার আগে বাড়িতে ঘাস, খড়, কাঠ সব মজুত করে রাখতে হয়। তবে সালু এখনও ছোটো বলে সবসময় যেতে হয় না। শীতের আগে আগে যেমন কাজের চাপ বাড়লে মজুত করার তাগিদে যেতেই হয়। তা মন্দ লাগে না সালুর। ওর বয়সী কত মেয়েই তো যায়। সারাদিন হাসি, গল্প, একসঙ্গে বসে মান্ডুয়ার রুটি চিবোনো। আর পাহাড়ি ঢালে ঘাস কাটা। নয়তো জঙ্গলে গিয়ে কাঠ জড়ো করা। যেদিন যায় না, সেদিন সালু দাদির কোলের কাছে বসে গল্প শোনে। ঠাকুমাকে দাদি বলে সালু। সালুর ভালো নাম সুলেখা। সুলেখার পাঁচ ভাই। তিনজন বড়ো আর দু’জন ছোটো। ছোটো ভাই দু’জন আর সে গ্রামের ইস্কুলেই পড়ে। প্রাথমিক ইস্কুল। অত কড়াকড়ি নেই। গেলেই হল।

সেদিন সালু হামলে পড়ল। “দাদি দাদি, গল্প বলো না।”

চমৎকার রোদ্দুরের আমেজে বাইরের উঠোনে কম্বলের ওপরে শুয়ে দাদির চোখ বুজে এসেছিল। সালু এসে পড়াতে বুড়ি চোখ খুলে হেসে বললেন, “কীসের গল্প বলব বল!”
“ওই যে, দেওমহারাজের।”
“তুই তো খালি দেওমহারাজেরই গল্প শুনতে চাস।”
“হ্যাঁ। আমাদের গ্রামে মন্দির আছে না? কিন্তু দাদি…”
“কী, বল!”
“সবাই সোমদেও বলে কেন দেওমহারাজকে?”
“সে অনেক কথা। আমি অতশত জানি না। আমরা ছোটোবেলা থেকে শুনেছি দেওমহারাজ। পরে এখন শুনি সোমদেও। তা যেইই হোক,
দেবতা তো! তাহলেই হল। তুই দেও মহারাজের গল্প শুনবি কি না বল!”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, বলো বলো।”

সালু ঘন হয়ে আসে দাদির কোলের কাছে।

ওদের কাঠের বাড়ির তিনটে তলা। নীচের তলায় গরু, ছাগল, ভেড়া, মজুতের কাঠ, ঘাস এসব রাখা থাকে। ওপরের দুটো তলায় থাকা। সালুর বাবা বেশ কর্মঠ ছিল, কিন্তু বেশ ক’বছর আগে কী একটা রোগে ভুগে ভুগে দুর্বল হয়ে গেল। সেই থেকে বাড়িতেই বসে থাকে। সালুর বাবা এ-অঞ্চলের একমাত্র পুরোহিত ছিল। বড়ো ছেলে জোহর এখন সে কাজ করে। সে অবশ্য বেশ ধার্মিক। অন্যান্য সময়ে হাল চালায়। চাষের কাজ করে। তার পরের ভাইটি বেশ শান্ত। বিনোদ। চাষের কাজে সবচেয়ে বেশি সাহায্য সেইই করে। অসম্ভব পরিশ্রম করতে পারে। মুখটি বুজে হাসিমুখে সারাদিন কাজ করে যেতে পারে।

“দাদির কাছে কী শুনছিস রে, সালু?”

কথার সঙ্গে সঙ্গেই মাথার চুলে টান পড়াতে পেছন ফিরে তাকিয়ে সালু দেখল, ধনুষ ভাইয়া। ওর ঠিক ওপরের দাদা। সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে দুষ্টু। পড়াশোনায়ও ভালো। হাইস্কুল শেষ করে এখন শহরে পড়ছে। এ-তল্লাটে এর চেয়ে বেশি পড়ার ব্যবস্থা নেই যে!

“দেওমহারাজের গল্প শুনছি।”

“ওহ্‌,” মুখ বাঁকিয়ে বলল ধনুষ, “তোর খালি দেওমহারাজ! সে তো হেরো ভূত একটা। যুদ্ধে হেরে গিয়ে পাহাড়ে এসে লুকিয়েছিল। গ্রামে গ্রামে মোড়লি করে বেড়াত। সে নাকি দেবতা!” হ্যা হ্যা করে হাসল খানিক ধনুষ।

“দাদি! দেখো ভাইয়া কী বলছে!” সালু খুব একচোট অনুযোগ করে দাদির কাছে।

“তুই ওর কথায় কান দিস না। ও শহরে গিয়ে একেবারে নচ্ছার হয়েছে। নইলে দেওমহারাজকে অমনি বলে! তুই গল্প শোন। তারপর হল কী, দেওমহারাজ সারা অঞ্চলের গ্রামের লোকজনকে একত্র করে বললেন, এই পাহাড়-জঙ্গল তোমাদেরই রক্ষা করতে হবে। আর তাহলেই তোমরা বাঁচবে। আর বাইরের শত্রু আক্রমণ করলে আমি বাঁচাব তোমাদের। আমি আর আমার বন্ধু করণমহারাজ একসঙ্গে যুদ্ধ করলে কেউ তোমাদের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।”

“করণমহারাজ? সে কে?” দাদিকে থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠে সালু।

“আরে সে আরেকটা হেরো!” কাঁকরি চিবোতে চিবোতে বলে ওঠে ধনুষ।

“দাদিইই!” সালু চেঁচায়।

দাদি বলেন, “ওর কথায় কান দিও না। করণমহারাজও ছিলেন মস্ত বড়ো বীর রাজা। ওইই নীচে তমসা নদীর পাড়ে ছিল তাঁর প্রাসাদ। কোনও মানুষ কিছু চাইলে কক্ষনও ফেরাতেন না। সাধ্যমতো দান করতেন। দেওমহারাজ আর করণমহারাজ ছিলেন খুব বন্ধু।”

সালু আবার গল্পের মধ্যে ডুব দেয়।

ধনুষের মধ্যে অদ্ভুত একটা দ্বিধা কাজ করে। ছেলেবেলা থেকে সে দেওমহারাজের কথা শুনছে। তাঁর ডোলিযাত্রা দেখছে। পালকি করে গ্রামে গ্রামে দেওমহারাজের মূর্তি ঘোরানো হচ্ছে দেখেছে। কোনও গ্রামে একমাস, কোথাও দশদিন, কোথাও সাতদিন, কোথাও বা পাঁচদিন – এমনি। সব গ্রামেই মন্দির আছে, সেখানেই আসেন দেওমহারাজ। এখনও। ছোটোবেলায় যাত্রাও দেখেছে এক-আধবার পাশের গ্রামে। কিন্তু বছর-দুই হল শহরে গিয়ে তার এতকালের ধারণায় ঠোক্কর খেয়েছে। সেখানে টেলিভিশন আছে, ক্যাসেট প্লেয়ার আছে, ভিডিও আছে। নতুন নতুন সব কেতাব। সেখানেও দেওমহারাজের মতো এক রাজার গল্প আছে। তার স্থির ছবি, ভিডিও দুইই দেখেছে সে।

তবে সে লোকটা দেবতা নয়। রাজার ছেলে। কিন্তু গল্পটা প্রায় একরকম। তারা একশো ভাই। আশ্চর্য হল, সে লোকটা খুব হিংসুটে। রাগী আর যুদ্ধবাজ। এমনকি করণমহারাজের মতো তার একটা বন্ধুও আছে। কানহাইয়া যেমন দেওমহারাজের গল্পে ভগবান, তেমনি শহরের গল্পেও সে ভগবান। দেওমহারাজ অবশ্য হিংসুটে বা রাগী নন। তিনি তাঁর প্রজাদের, গ্রামের মানুষদের রক্ষা করেন। মঙ্গল চান। দূরত্বের হিসেবে সতুরি গ্রাম থেকে উত্তরকাশী সদর তো বড়োজোর পৌনে দু’শো কিলোমিটার। তার বেশি তো নয়। সেখানেও অনেকেই জানে দেওমহারাজের কাহিনি। কেউ কেউ মনে করে, এই দু’জনে আসলে একই লোক। ক্রমে শহরের গল্পের প্রভাবে গ্রামের গল্প ফিকে হয়ে আসতে থাকে। ধনুষ বুদ্ধিমান। বুঝে নিয়েছে নিজের মতো করে। একই গল্পের একেকরকম বয়ান। পাহাড়ে, সমতলে, নদীর মোহানায়। সমুদ্রের অন্য পারে। নানারকম।  ধনুষ  অবশ্য  কখনও  সমুদ্র  দেখেনি।

শুনেছে, অনেকটাই দূর। তবে টেলিভিশনে ছবি দেখেছে।

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ধনুষ শহরের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। শেখার কৌতূহল তার চিরদিনই। ফলে যা যা কিছু কলেজের ভেতরের, গুরুমশাই মানে মাস্টারমশাইদের কাছে আর কলেজের বাইরে আরও নানান গুরু পাতিয়ে তাদের কাছে বিভিন্ন জিনিস চটপট শিখে নিতে থাকল সে। এবারে তার সঙ্গে আলাপ হয়েছে দীনেশের। দীনেশ উনিয়াল। দীনেশ গাড়োয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা ছাত্র। পাশ করে বেরিয়েছে ছ’বছর। এলাকার সবাই তাকে একডাকে চেনে। আলাপ হবার পর থেকেই ধনুষ রাণা দীনেশকে গুরু মেনেছে। দীনেশের একটা ট্রাভেল এজেন্সির ব্যাবসা। যত না পেশা, তার চাইতে বেশি নেশা। অত ভালো ছাত্র, চাইলেই সে তেমন একটা চাকরি জুটিয়ে নিয়ে হিল্লি-দিল্লি চলে যেতে পারত। তা না করে সে ঠিক করল ব্যাবসা করবে, আর পাহাড়েই থাকবে। সে নিজে দক্ষ পাহাড় চড়িয়ে। দেশবিদেশের নানান লোক নিয়ে ট্রেকিং করিয়ে বেড়ায়। পর্বতাভিযানে নিয়ে যায়। এমনকি তার খদ্দেরদের মধ্যে বিদেশিদের তালিকাটা ইতিমধ্যেই দীর্ঘ। দীনেশও ধনুষের মতো বুদ্ধিমান ও চটপটে ছেলে পেয়ে বেশ খুশিই হয়েছিল। পড়ার বাইরে সময় পেলেই ধনুষ দীনেশের দোকানে চলে আসে। এটা ওটা ফরমাশ খাটে, ছবি দেখে, গল্প শোনে। এরই মধ্যে গত এপ্রিলে একদিন দীনেশ ডেকে বলল, “হ্যাঁ রে, তোর কলেজের পরীক্ষা শেষ কবে?”

“কুড়ি তারিখ।”

“কুড়ি… কুড়ি…” আপনমনে খানিক বিড়বিড় করে দীনেশ জোরেই বলে ওঠে, “ঠিক আছে। এবারে তুই আমার সঙ্গে যাবি। একটা দল আসছে। তপোবন যাওয়া আসা, পাঁচদিনের কাজ। তোকে ট্রেনিং দেয়া দরকার।”

ধনুষ রা কাড়ছে না দেখে দীনেশ চোখ সরু করে বলল, “কী রে, যাবি তো? না বাড়ি পালাবি?”

ধনুষ এতদিন তো এর অপেক্ষাতেই ছিল। যদিও সে পাহাড়েরই ছেলে, তবুও নিজের গ্রামের গণ্ডির বাইরে এই উত্তরকাশী শহর ছাড়া অন্য কোথাও তো সে কখনও যায়নি। বিরাট এই হিমালয় পাহাড়। তার কিছুই দেখেনি সে। এইবারে সে সুযোগ যখন এসেছে…

সে তাড়াতাড়ি মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, “যাব যাব, তোমার সঙ্গে যাব।”

দীনেশ ওর একমাথা চুল ঘেঁটে দেয়।

তো এ পর্যন্ত চারবার সে দীনেশের সঙ্গে পাহাড়ে ট্রেকিংয়ের দলের সঙ্গে গিয়েছে। কত কী-ই যে শেখার আছে! তাঁবু লাগানো, রান্না করা, পাথরে দড়ি লাগানো, বরফ কুঠারের ব্যবহার – আরও কত কী। এমনকি খুঁজে খুঁজে জলের উৎস বার করা, সেটাও একটা দারুণ কৌশল। কত পাহাড়ের চূড়ার নামই যে জানল এই ক’দিনে। খানিক বই, খানিক মানচিত্র মিলিয়ে, খানিক বুড়ো মালবাহকদের কাছে। দীনেশ ভাইয়াও বলেছে। বলতে গেলে সেই-ই হাতে ধরে ধরে শিখিয়েছে ধনুষকে। গাড়োয়ালি মালবাহকদের কাছে একটা গান শুনে শুনে ওর তো মুখস্থই হয়ে গেছে। এটা সে তাদের গ্রামে শোনেনি।

“এক সিং রণ কো
এক সিং বন কো
এক সিং মাধো সিং
অউর সিং কাই হো!”

মাধো সিং বলে এক বীর যোদ্ধাকে নিয়ে বানানো গান। নিজেকে ওরকম বলশালী ভাবতে ভালো লাগে ধনুষের। আকাশে যখন কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে, বিদ্যুৎ চমকায়, ওর ভেতরে কেমন করে। তাকিয়ে থাকে আকাশে। নিজেকে আরও শক্তিশালী মনে হতে থাকে। পলকহীন তাকিয়ে থাকে মেঘের দিকে। হঠাৎ করে বাজ পড়ার আওয়াজ দারুণ লাগে, কালো মেঘের বুক চিরে আলোর ঝলক দেখতে দেখতে মুগ্ধ হয়ে যায় ক্ষণিকের জন্যে।

পঞ্চম অধ্যায়
২০১৪। কলকাতা
এক

বাবার কিছু জিনিস একটা টিনের ট্রাঙ্কে রাখা ছিল। তার মধ্যেই ওটা দেখতে পেল অবিন। বাবা মারা যাবার পর বাক্সটা অমনিই ছিল। কেউ হাত দেয়নি তাতে। অবিন তো নয়ই। আজ একটা পুরনো কাগজ খুঁজতে গিয়ে বাক্সটাতে হাত পড়ল। প্রায় তিন বছর পর।

২০১১ সালে মারা গেছেন কাশীনাথ সেন। অবশ্য তার ঢের আগেই

অবিন সেনের হাতে প্রেসের দায়িত্ব এসে পড়েছিল। লেটার প্রেস ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছিল কম্পিউটারের ব্যবহার বাড়াতে। নতুন অফসেট ছাপা ব্যবস্থাও দ্রুত বাজার দখল করে নিচ্ছিল। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল বহু লেটার প্রেস। কয়েকখানা মাত্র ধুঁকতে ধুঁকতে চলছিল।

অবিনের মাথা খুব পরিষ্কার। সে বাপকে বহু আগেই বুঝিয়ে কম্পিউটার ঢুকিয়ে ফেলেছিল প্রেসে। এক কোনায় সেটা নিয়ে নিজেই খুট খুট করতে করতে শিখে নিয়েছিল কম্পোজ। ফাউন্ড্রি উঠে যাচ্ছিল দ্রুত। একসময় লেটারের সাপ্লাই গেল বন্ধ হয়ে। তদ্দিনে কম্পোজে পুরোদস্তুর ডেস্কটপ কম্পিউটার ঢুকে পড়েছে। নতুন নাম হয়েছে ডেস্কটপ পাবলিশিং। চোখের সামনে লেটার প্রেস বদলে চনমনে অফসেট প্রিন্টার্স হয়ে গেল কাশীনাথবাবুর নবীন ধর লেনের প্রিন্ট ও আর্ট।

কাশীবাবুর দুঃখ হয়েছিল বটে, তবে বাধাও দেননি। কালের নিয়ম যে মানতেই হবে। তাও কম দিনের কথা নয়, দু’হাজার তিন কি চার। দেখতে দেখতে একযুগ কেটে গেল। অবিনের নিজেরও আশ্চর্য লাগে। এত দ্রুত যায় সময়? শেষ দু’বছর আর প্রেসমুখো হতেন না কাশীনাথ। তার প্রয়োজনও অবশ্য ফুরিয়ে এসেছিল। অবিন তাঁর ছেলে। যোগ্য লোকের হাতেই ব্যাবসা এসে পড়েছে।

জিনিসটা, থুড়ি, দুটি জিনিস একটা লাল শালুতে বাঁধা ছিল। মোটা সাদা মার্কিন কাপড়ে মোড়ানো একটা চৌকোমতো বস্তু। আর একটা দু’নম্বর বঙ্গলিপি খাতা। খাতা ছেড়ে সাদা কাপড়ের পুঁটুলিটা খুলতে ও দেখল পাঁচটা পাতলা কাঠের পাটাতন। তিন ইঞ্চি চওড়া আর ছ’ইঞ্চিমতো লম্বা, লাল সুতোয় বাঁধা। ওপরে খোদাই করা, কিন্তু বেশ আবছা হয়ে যাওয়া লেখা। বোধহয় সংস্কৃত। কিন্তু হরফগুলো কোনও কোনওটা বুঝতে ওর অসুবিধেই হচ্ছিল। অবিন নিজে সংস্কৃত জানে না। ইস্কুলে সংস্কৃত পড়ানোর পাট কবেই উঠে গেছে। এখন সেটা ঐচ্ছিক বিষয়। খাতাটা এবারে খুলল অবিন। রুল টানা। প্রথম পাতায় মাঝামাঝি লেখা, ওঁ মা। আর কিছু নয়। পরের ডানদিকের পাতাতে অনেকখানি লেখা। বাংলায়। বাঁদিকের পাতাতে বাবার হাতে লেখা দুটো বাক্যঃ

‘সদুক্তিকর্ণামৃত – অনুবাদ, পরিতোষ ঠাকুর। (প্রকাশকাল?)

প্রতিস্মৃতিবিদ্যা (?) অনুবাদ অসম্পূর্ণ। পরিতোষবাবুর আমানত। সুবলবাবুর পরামর্শ প্রয়োজন।’

এই পুঁথিটার নামই কি প্রতিস্মৃতিবিদ্যা? প্রথমেই মনে এল অবিনের। ডানদিকের পাতাটাতে অন্য হস্তাক্ষরে এক, দুই, তিন করে লেখা রয়েছে –

১) মন সংহত করো, সূর্যের ন্যায় একাগ্র ও তেজস্বী হইয়া অন্ধকারকে হৃদয়ে বরণ করো। আলোকসামান্য ব্রহ্ম ইহাতে তৃপ্ত হইবেন। তাহাই অনুসরণ করো।

২) আহবান একটি প্রক্রিয়ামাত্র। উহা শব্দোত্তর কম্পাঙ্কে বিতরিত হইলে দেবতাগণ টের পান। সহর্ষে তাঁহারা ফিরিয়া ফিরিয়া আসিতে পারেন। তোমাদের ইহাতে মঙ্গল হোক।

৩) অতীন্দ্রিয় বোধে মহাকায় মহাবাহু দেবাদিদেব মহাদেব প্রকৃত স্রষ্টা। সর্বোচ্চ দেবতার সহিত সংযোগস্থাপন দুরূহ। সেই লক্ষ্য-সাধনে ঘোরতর তপস্যা প্রয়োজন। তুমি তাহাতে প্রবৃত্ত হও।

অবিন বুঝল, এগুলো ওই পুঁথিটার বাংলা অনুবাদ। নীচে আরও যেসব কথা লেখা, সেগুলো অবশ্য বেশি কৌতূহলের উদ্রেক করল অবিনের। সেগুলোতে কোনও নম্বর দেয়া নেই। সেখানে  লেখা-

‘কাম্যক বনপথে যাত্রা শুরু হল হিমালয়ের অভিমুখে। একদিনের মধ্যে তরাই পার হয়ে হিমাচল পর্বতে উপস্থিত হলেন ফাল্গুনি। দিনরাত হেঁটে চড়াই-উৎরাই ডিঙিয়ে, গভীর বন পেরিয়ে একটি পর্বতের চূড়ায় উপস্থিত হলেন। এই পর্বতের নাম ইন্দ্রকীল। এখানেই তিনি ব্যাসদেবকথিত প্রতিস্মৃতিবিদ্যার প্রয়োগের উদ্দেশ্যে কঠোর তপস্যা আরম্ভ করেন। প্রথম একমাস তিনদিন পরপর, পরের মাসে ছ’দিন পরপর, তার পরের মাসে পনেরোদিন পরপর ফল খেয়ে কাটালেন। শেষে শুধুই বায়ুভক্ষণ করে রয়ে গেলেন। তারপর কিরাতবেশি মহাদেবের দেখা পেলেন। ঘোরতর যুদ্ধ হল, অস্ত্র নিয়ে, শস্ত্র নিয়ে, মুষ্টিযুদ্ধও হল। ভগবান সন্তুষ্ট হলেন। বর দিলেন পার্থকে।’

এ অবধি পড়ে একটু থম মেরে গেল অবিন। এ তো মহাভারতের কথা। কিন্তু সবচেয়ে যেটা ওর নজর কাড়ল, সেটা ওই ফল আর বাতাস খেয়ে থাকার ব্যাপারটা। অবিন পাহাড়ে বহু ঘুরে বেড়িয়েছে। সময়সুযোগ করে একলা হিমালয়ে হাঁটতে যাওয়াটা ওর একরকম নেশাই বলা যায়। আর সেটা ও নিয়মিত করে। সেই সূত্রে ও ফলাহারী বাবা মানে সাধুসন্তদের কথা বিস্তর শুনেছে। এমনকি কেদারনাথ অঞ্চলে একজন   বায়ুভূক  মহাত্মার  কথাও জেনেছে।  তাঁকে  অনেকেই   নাকি দেখেছে। তিনি মন্দির ছাড়িয়ে আরও ওপরে বরফের মধ্যে গুহায় বাস করতেন, আর অমনি ঘোর তপস্যা করতেন। মহাভারতের সঙ্গে এই যোগাযোগটা অবিনকে বলা চলে একটু অস্থির করে দিল। কিন্তু খাতাটা অসম্পূর্ণ।

পরের পাতায় আরও চারটি শ্লোকের অনুবাদ করা হয়েছে। তার মধ্যে একটা মনে হল আংশিক। ব্যস। ওই পর্যন্ত।

সবশেষে একটা ছোটো নোট। তাতে লেখা, ‘সদুক্তিকর্ণামৃতঃ অষ্টদেব। প্রতিস্মৃতিবিদ্যাঃ অষ্ট অমর!  সম্পর্কিত? অনুসন্ধান প্রয়োজন।’

দুই

পরদিন পুরনো খাতাপত্তর ঘেঁটে পরিতোষ ঠাকুরের ঠিকানাটা জোগাড় করল অবিন। ২৬ সদানন্দ রোড। বাবার কাছে সে নাম শুনেছে, বাবার যাতায়াত ছিল শুনেছে, কিন্তু সে নিজে কখনও যায়নি। আগ্রহও দেখায়নি। পরিতোষবাবু বাবার অনেক আগেই মারা যান। সে খবর জানত অবিন। পরিতোষবাবুর ছেলেমেয়ে, বাড়ির লোক কেউ না কেউ নিশ্চয়ই থাকবে সেখানে – এই ভেবে প্রেস থেকে বিকেল বিকেল বেরিয়ে পড়ল অবিন।

মেট্রো রেলে আসাটা সবচেয়ে সহজ ও তাড়াতাড়ি হবে ভেবে প্রেস-ফেরত মহাত্মা গান্ধী স্টেশন থেকে উঠে কালীঘাট মেট্রোয় এসে নামল অবিন। রাসবিহারীর মোড়। এখানে একসময় তার প্রায়ই যাতায়াত ছিল। ভ্রমণবার্তা বলে একটা পত্রিকা বেরোত। ওদের অফিসটা ছিল ঊনপঞ্চাশের-এ সদানন্দ রোডে। রাসবিহারী অ্যাভিনিউ আর সদানন্দ রোডের কাটাকুটিতে। তখন খুব আসত, আড্ডা হত। ভ্রমণবার্তা এখন আর বেরোয় কি? বোধহয় না। কবেই উঠে গেছে – ভাবল চল্লিশ ছুঁয়ে ফেলা অবিন।

ট্রামলাইন পেরিয়ে চেতলার দিকে এগিয়ে ডানহাতে সদানন্দ রোডে ঢুকে পড়ল অবিন। ডানহাতে একটা মনোহারী দোকানের পরই মা তারা হিন্দু হোটেল লাগোয়া ওষুধের দোকান। তার পাশেই একখানা সবুজ গেট। তার ভেতর দিয়ে ঢুকে ওপরে দোতলায় ছিল পত্রিকা অফিস। অবিন সাইনবোর্ডের ভিড়ে ‘ভ্রমণ বার্তা’ খুঁজে পেল না।

একটু   এগিয়ে   ডানহাতে   ঊনচল্লিশে,   ‘নহবত’।   বিয়েশাদির

বাড়িভাড়া  দেয় নির্ঘাত। দু’পা দূরেই তপন থিয়েটারে নাটকের শো চলছে। ডানপাশে এক এক করে বাড়ির নম্বরগুলো কমছে। পুরনো বাড়ি এখনও রয়ে গেছে এই রাস্তাটায়। আড়াআড়ি ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিট। বাঁদিকে কালীঘাট মন্দিরে যাবার রাস্তা। ডানদিকে বেরোলে বড়ো রাস্তা টপকে কালীঘাট পার্ক।

অবিন ফুটপাথ ধরে এগোল। কাঁধের ঝোলায় পুঁথি-খাতা দুইই এনেছে সে। একতিরিশ। বাড়িটার হলদে রঙ হয়েছে। ওপরের তলায় বারান্দায় কাঠের খড়খড়ি দেয়া জানালা। একটু স্পিড বাড়াল অবিন। তার তর সইছে না। ছাব্বিশ ঠিক যেখানে থাকার সেখানেই আছে। কিন্তু সেটা একটা ফ্ল্যাটবাড়ি। ‘আবিষ্কার’।

ডানহাতি সারিতে সবক’টা পুরনো বাড়িই রয়েছে, শুধু এইটেই নেই। ঝকঝকে তকতকে নতুন একখানা পাঁচতলা বাড়ি যেন দাঁত বের করে অবিনের দিকে চেয়ে হাসছে। কেয়ারটেকারের কাছে খোঁজ নিয়ে জানল, পরিতোষ ঠাকুর নামে এ-বাড়িতে কেউ থাকেন না। কেয়ারটেকার লোকটি বললে যে, একজন ঠাকুর থাকত বটে, তবে তারাও বছরতিনেক আগে ফ্ল্যাট বিক্কিরি করে চলে গিয়েছে।

“কোনও  খবর-টবর,  মানে  কোথায়  উঠে  গেছেন  ওরা?” অবিন

জিজ্ঞাসা করে কেয়ারটেকারকে।

“সে আমি বলতে পারব না। আমি এখানে তিন বছর আছি। আপনি বরং উলটোদিকে ‘আপনজন’ দোকানে খোঁজ করুন। ওদের পুরনো দোকান, ওরা বলতে পারবে।”

অবিন গেল বটে, কিন্তু এত ভিড় যে কথা বলাই দায়। ও একটা ফিশ চপ কিনতে হাত বাড়াল। কাউন্টারের ছেলেটা ওর বয়েসিই। টাকা দেবার সময় কথাটা চেঁচিয়ে বলেই ফেলল ও। “ছাব্বিশের ঠাকুর ফ্যামিলির লোকেরা কোথায় উঠে গেছেন জানেন?”

“কোন ঠাকুর? ও-বাড়িতে চারটে ঠাকুর ছিল।”
“পরিতোষ ঠাকুর।”
“ও, পণ্ডিতস্যার?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ।”
“শুনেছি ওঁরা যাদবপুরের দিকে উঠে গিয়েছেন। তবে বলতে পারব না ঠিক কোথায়। ওঁর ছেলে শিশিরদা আগে মাঝেমধ্যে আসত, কিন্তু ইদানীং বছর-দুই আর আসে না।”
“তবুও, যদি আসে, এই আমার নম্বর। যদি দয়া করে…”

অবিন চপের ঠোঙা নিয়ে ভিড় থেকে বেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে ছাব্বিশের সামনে এসে মুখোমুখি আরেকবার দাঁড়াল। তারপর ফুটপাথ ধরে উত্তরদিকে এগিয়ে দ্বারিক গাঙ্গুলি স্ট্রিট ধরে ডানদিকে সোজা বড়ো রাস্তায়, এস.পি.মুখার্জি রোডে।

বাড়ি ফিরে জায়গার জিনিস জায়গাতেই রেখে দিল বটে, কিন্তু কৌতূহলটা মিটল না। আশায় রইল যদি কোনওভাবে পরিতোষবাবুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। পেলেও এ সম্বন্ধে তারা কিছু জানাতে পারবে বলে মনে হয় না। তবুও, মাথায় ভাবনাটা রয়ে গেল।

তিন

পুজোর পরপরই কাজের চাপ বেড়ে যায় প্রেসে। জানুয়ারির শেষ অবধি চলে সে চাপ। কারণ, বইমেলা। এসব কারণে অনেকদিন আর পুঁথিটা খুলে দেখা হয়ে ওঠেনি। তবে যে একেবারেই ভুলে গেছিল তা নয়। এর মাঝে আরও একবার সদানন্দ রোডের দোকানটাতে ঢুঁ মেরে এসেছে অবিন। কোনও খবর নেই।  ফলে ওদিককার আশা  একেবারেই ছেড়ে দিল সে।

কালীঘাট পার্কের পেছনে বাবাদের পুরনো বন্ধু সুবলবাবু থাকেন। তাঁর কাছেও একদিন পরিতোষবাবুর খোঁজে ঢুঁ মেরেছিল সে। তিনিও কিছু বলতে পারলেন না। আর পুঁথিটার কথা শুনে বললেন, সেটা এশিয়াটিক সোসাইটিকেই দিয়ে দেয়াই উচিত হবে। অবিনও সেই কথাটাই ভাবছে ক’দিন ধরে। ভাবছে, আবার পিছিয়েও আসছে।

বেশ একটা দ্বিধা কাজ করছে তার মধ্যে।

ষষ্ঠ অধ্যায়
হোলি। ৫ মার্চ, ২০১৫। কলকাতা
এক
দুপুর সাড়ে বারোটা

“নমস্কার। আপনি নিশ্চয়ই প্রোফেসর সুবলচন্দ্র ভট্টাচার্য? আমি দিবাকর রায়, কিছুক্ষণ আগে আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম। হোলির সকালে এসে বিরক্ত করলাম না তো?”

“আরে, না না। আসুন আসুন, দিবাকরবাবু। ছুটির দিনে কাজে বেরিয়েছেন। ইয়াং ছেলে! অসুবিধে তো আপনাদের হওয়ার কথা।”

“না, স্যার। বাড়ি ছেড়ে পেটের দায়ে কলকাতা শহরে একা একা পড়ে আছি। বন্ধুবান্ধবও বিশেষ নেই। ওসব ছুটিছাটা মানেই বাড়িতে বোর হওয়া। আমাকে স্যার প্লিজ আপনি বলবেন না। স্যার, এ হচ্ছে সুনীল, আমাদের কাগজের ক্যামেরাম্যান।”

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক সুবলবাবু বেশ আদর করে দুই তরুণ সাংবাদিককে নিজের ড্রয়িং রুমে বসালেন। ওরা ‘অন্যগতি’ নামের যে কাগজে চাকরি করে, সেটার নাম অবশ্য সুবলবাবু আগে কোনওদিন শোনেননি। তবে দিবাকর ছেলেটার কথাবার্তা ওঁর খুব মনে ধরেছে। তাই শরীরটা তেমন ভালো না থাকা সত্ত্বেও উনি সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয়েছেন।

দিবাকর সোফায় বসেই ঝোলা থেকে খাতা-পেন বের করে ফেলল। বলল, “তাহলে স্যার, আমরা শুরু করে দিই? আসলে প্রতিমাসে আমরা একটা করে বিশেষ ক্রোড়পত্র করি। তার টপিক কী হবে তা আগে সম্পাদকমণ্ডলী বসে ঠিক করে নেয়। আমাকে সামনের মাসে যে বিষয়টার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটা হল বাংলার প্রাচীন সাহিত্য।

“কিন্তু সত্যি বলতে কী স্যার, এ-বিষয়ে আমার জ্ঞানগম্যি একেবারে নেই। আমার এক দাদা ইউনিভার্সিটিতে আপনার গুণমুগ্ধ ছাত্র ছিল। ও-ই আপনার ল্যান্ডলাইন নম্বরটা দিল। বলল, দ্যাখ যদি স্যারের সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলতে পারিস, তাহলে তোর পত্রিকার লেখা তৈরি করতে কোনও সমস্যা হবে না।”

“ভালো। এবারে তুমি কী জানতে এসেছ বলো।”

“স্যার, সদুক্তিকর্ণামৃত কি বাংলার কাব্য?”

“হ্যাঁ। তবে বাংলাভাষায় নয়। প্রাচীন বঙ্গদেশে সংকলিত দ্বিতীয় সংস্কৃত কাব্যগ্রন্থ হল সদুক্তিকর্ণামৃত। শ্লোক সংখ্যা ২৩৭৭। বিখ্যাত সব লেখকের সংস্কৃত কাব্য থেকে শ্লোক নিয়ে শ্রীধরদাস ঐ কাব্যগ্রন্থটি সংকলিত করেছিলেন রাজা লক্ষ্মণসেনের আমলে। কালিদাস থেকে শুরু করে বিদ্যাকর, সেনযুগের বিখ্যাত সব সভাকবি যেমন জয়দেব, উমাপতিধর, শরণ, ধোয়ী, গোবর্ধন আচার্য প্রমুখের শ্লোকও ঐ গ্রন্থে স্থান পেয়েছিল। এছাড়া শ্রীধরদাস বল্লালসেন, লক্ষ্মণসেন, কেশবসেন প্রমুখ রাজার শ্লোকও গ্রহণ করেছিলেন। ছিল প্রচুর নামহীন কবির শ্লোকও।

“আপাতভাবে শ্লোকগুলো এমন ছিল যা পড়লে মানুষ উপকৃত হয়। এই কাব্যগ্রন্থে দেবতাদের বর্ণনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনা এবং নানা প্রাকৃতিক দৃশ্য যেমন পাহাড়, নদী, গাছপালা ইত্যাদির বর্ণনা আছে।”

“দারুণ তো! আচ্ছা, আমি শুনেছিলাম কয়েকবছর আগে নাকি সদুক্তিকর্ণামৃতের বাংলা অনুবাদ হয়েছিল?”

“তুমি তো অনেক খবর রাখো দেখি হে ছোকরা! জানলে কোত্থেকে?”

“আজ্ঞে হোমওয়ার্ক, স্যার,” দিবাকর হাসল। “ইন্টারভিউ নেবার আগে আপনার দুয়েকটা প্রবন্ধ পড়েছি কিনা! তাতেই খবরটা দেখেছি। কিন্তু কাজটা কার সেটা খেয়াল করতে পারছি না।”

“হুম। ঐ কাজটা করেছিলেন আমারই পরিচিত এক পণ্ডিত মানুষ। পরিতোষ ঠাকুর। সংস্কৃতে অসাধারণ পণ্ডিত। তেমনি অনুবাদের হাত।”

“এইটা দারুণ খবর দিলেন। পরিতোষবাবুর কথাটাও তাহলে স্টোরিতে…” দিবাকরের মুখটা জ্বলজ্বল করে উঠল হঠাৎ। “তা স্যার, পরিতোষবাবু আর কোনও প্রাচীন পুঁথির অনুবাদ করেছিলেন কি? নাকি ওই একটিই…”

একটুক্ষণ ভুরু কুঁচকে ভাবলেন সুবলবাবু। তারপর বললেন, “হ্যাঁ। মনে পড়েছে। ওঁর বইয়ের প্রিন্টার কাশীবাবু বেঁচে থাকাকালীন উনি আরও একটা অনুবাদের কাজ খানিক শুরু করেছিলেন। কিন্তু তারপর সব এলোমেলো হয়ে গেল।”

দিবাকর একটু চমকে উঠল যেন। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, “কেন? এলোমেলো হয়ে গেল কেন?”

“পরিতোষবাবুরা সদানন্দ রোডে থাকতেন। তারপর যা হয়, শরিকি ভাগের বাড়ি, ও-বাড়ি ফ্ল্যাট হবার জন্য ভাঙা পড়তে নব্বইয়ের দশকের শেষে ওঁরা যাদবপুরের দিকে উঠে যান। তারপরেও এ-পাড়ায় মাঝেমধ্যে আসতেন। দেখাসাক্ষাৎ হত। কিন্তু শেষদিকে আর আসতে পারতেন না। কী একটা বিপর্যয় ঘটেছিল, আর তাতেই উনি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ওঁর ছেলে শিশির সে সময়ে একদিন আমাকে ফোন করে সব জানিয়েছিল। তারপর থেকে আর কোনও যোগাযোগ নেই।”

“শিশিরবাবুর নম্বরটা…”

“এই হয়েছে মুশকিল। নম্বরটা রাখা হয়নি। কিছুদিন আগে কাশীবাবুর ছেলে অবিন এসেও তো পরিতোষবাবুর খোঁজ নিচ্ছিল। অবিনই এখন বাবার ব্যাবসাটা দেখে। কিন্তু আমি ওকেও নম্বর দিতে পারলাম না।”

দিবাকর আনমনে মাথা নাড়ল একটু। তারপর বলল, “পরিতোষবাবু অন্য যে অনুবাদটা শুরু করেছিলেন সেইটের নাম…”

“সে এক প্রাচীন সংস্কৃত পুঁথি। কাশ্মীরি পণ্ডিত রুদ্রটের রচনা। পরিতোষদা কোথা থেকে জোগাড় করেছিলেন কে জানে! কাশীবাবুকে বলেছিলেন সেকথা। খানিকটা অনুবাদ করেওছিলেন।”

“পুঁথিটা কি এখনও ওঁর বাড়িতেই আছে? মানে…”

“উঁহু। শিশির তখনই বলেছিল ও-নিয়ে কীসব গণ্ডগোল নাকি হয়েছিল। সে অনেক গল্প। ঐ নিয়েই তো অসুস্থ হলেন পরিতোষবাবু। মৃত্যুর আগে সেটা উনি কাশীবাবুর কাছে রেখে যান। তারপর সব গুলিয়ে গেল। কাশীবাবুও দেহ রাখলেন। আর ওদিকে…”

“তার মানে প্রতিস্মৃতিবিদ্যার পুঁথিটা এখন অবিন সেনের কাছেই?”

দিবাকরের এই মন্তব্য শুনে চমকে উঠলেন সুবল ভট্টাচার্য।

চোখ বড়ো বড়ো করে বললেন, “তুমি পুঁথিটার নাম জানলে কী করে? অবিন তো একথা আমাকে ছাড়া কাউকে বলেনি! ও তো বলেছিল, পরিতোষদার বাড়ির লোকের সাথে কথা বলে পুঁথিটা এশিয়াটিক সোসাইটিতেই দিয়ে দেবে।”

এই প্রথম দিবাকরকে একটু অপ্রস্তুত লাগল। তবে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে ও বলল, “আমরা তো সাংবাদিকতা করি, তাই অনেক খবরই আমাদের কাছে আসে। তা ঐ পুঁথিটা যদি একবার চোখের দেখা দেখতে পেতাম…”

“তাহলে তোমার কী সুবিধা হত?”

“না, সুবিধা আর কী? যে লেখাটা পত্রিকার জন্য তৈরি করব, তার সঙ্গে পুঁথিটার একটা ছবি দিয়ে দিলে জমত ভালো। তা ঐ অবিন সেনের বাড়িটা কোথায় একটু বলতে পারবেন?”

“বিজয়গড়। ঐ যে রসেবশে নামের একটা মিষ্টির দোকান আছে, তার পাশের গলি। রাস্তাটার নাম এখন আর আমার মনে নেই। বছরদশেক আগে কাশীবাবু আমাকে একবার নিয়ে গিয়েছিলেন। বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে আমার একটা বই সেবার উনি নিজ উদ্যোগে ছেপেছিলেন…”

“স্যার, আপনাদের বাথরুমটা কোনদিকে?”

হঠাৎ দিবাকরের প্রশ্নে থমকে গেলেন সুবলবাবু। তারপর তাঁদের বাড়ির বাথরুমটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে সে দ্রুতপায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল।

মিনিটখানেক বাদে বাথরুম থেকে বেরোতে না বেরোতেই দিবাকরের মোবাইল সেটটা গান গেয়ে উঠল। ফোনটা কানে তুলেই দিবাকর একরকম আর্তনাদ করে উঠল, “কী বলছ! বাবার বুকে প্রচণ্ড ব্যথা… নার্সিংহোমে ভর্তি করেছ… আচ্ছা, আমি এক্ষুনি আসছি।”

ফোনটা রেখেই দিবাকর খাতাটা ব্যাগে ভরতে ভরতে বেশ উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, “স্যার, আমার বাবার একটু আগে একটা কার্ডিয়াক অ্যাটাক হয়েছে, নার্সিংহোমে অ্যাডমিট করেছে, দাদা ফোন করে বলল। আমাকে এক্ষুনি নার্সিংহোমে যেতে হবে। আপনি যদি পরে আমাকে আরেকটা দিন সময় দেন…”

একথা শুনে সুবলবাবুও রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। বললেন, “নিশ্চয়ই সময় দেব। তোমাকে এখন আর ওসব ভাবতে হবে না। তুমি এক্ষুনি নার্সিংহোমে চলে যাও। বাবাকে সামলাও। আশা করি উনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন।”

ছেলেদুটো দরজার কাছ পর্যন্ত এগোতে হঠাৎ সুবলবাবু ফের ডাকলেন পেছন থেকে। “তোমার দাদা, মানে আমার ছাত্র যে ছিল আর কী, তার নাম কী বলো তো? কোন ইয়ার?”

“বিভাস, স্যার। তবে আপনি বোধহয় তাকে মনে করতে পারবেন না। চল্লিশ বছর ধরে কত ছাত্র পড়িয়েছেন আপনি। বিভাসদা আপনার কাছে পড়েছে, তা প্রায় বছর কুড়ি-পঁচিশ আগে।”

“না, সত্যিই আমি মনে করতে পারছি না। সে যাক গে, এখন তোমরা এসো।”

তারা বেরিয়ে যেতে খানিকক্ষণ স্থির হয়ে দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন সুবলবাবু। কয়েকটা বিষয়ে একটু খটকা লাগছিল তাঁর। ছোকরা এই দু’নম্বর পুঁথিটা কোথায় আছে সেটা জানতে পেতেই তার বাপের হার্ট অ্যাটাক হয়ে নার্সিংহোম যাওয়া। অথচ খানিক আগেই বলল কলকাতায় একা থাকে। তাহলে?

এইবার ছেলেটার কথাবার্তার ধারাটা ফের একবার মনে মনে নাড়াচাড়া করলেন সুবলবাবু। এমনিতে একেবারে স্বাভাবিক। সদুক্তিকর্ণামৃত পরিচিত নাম। সে নিয়ে তাঁর মতো বিশেষজ্ঞের ইন্টারভিউ চাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তারপর সেই নিয়ে কথা প্রসঙ্গে প্রতিস্মৃতিবিদ্যার পুঁথির কথা আসাটাও স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যভাবে দেখলে, যেন কৌশলে সদুক্তিকর্ণামৃত দিয়ে শুরু করে ধাপে ধাপে প্রতিস্মৃতিবিদ্যার দিকে ইন্টারভিউটাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে তাঁর মুখ থেকে খবরটা বের করে নিয়েছে সে!

সন্দেহটা হতে তিনি ছেলেটার দাদার বিষয়ে খোঁজটা নিয়েছিলেন। তাঁর একজন ছাত্রের কথাও তিনি ভুলে যান না। বিভাস নামে কোনও ছাত্র কস্মিনকালেও তাঁর ছিল না।

তাড়াতাড়ি টেলিফোন ডিরেক্টরিটা এনে ছেলেটার বলা খবরের কাগজের নামটা তার মধ্যে থেকে খুঁজে বের করলেন সুবলবাবু। তারপর নম্বরটায় ডায়াল করলেন। একটু বাদে জবাব আসতে নিচু গলায় বললেন, “আপনাদের ওখানে দিবাকর রায় নামের কোনও জার্নালিস্ট…”

উলটোদিক থেকে ভেসে আসা নেতিবাচক জবাবটা কানে যেতে হঠাৎ বুকটা একটু কেঁপে উঠল তাঁর। কাঁচা কাজ হয়ে গেছে একটা। অবিনের ঠিকানাটা দিয়ে বোধ হয় ভুল করে ফেলেছেন তিনি। পরিতোষবাবু মারা যাবার পর ওঁর ছেলে শিশির পুঁথিটা নিয়ে তাঁকে কিছু কথা জানিয়েছিল। সেগুলো খুব ভালো কথা নয়। তাহলে কি…

শিশিরের নম্বর তাঁর কাছে নেই, নইলে ফোন করে জানা যেত বিশদে। অবিনের প্রেস নিশ্চয়ই হোলির জন্য বন্ধ থাকবে আজ। এখন দুপুর দুটো। বাড়িতেই থাকবে এখন। সাবধানের মার নেই। ডায়েরি থেকে কাশীবাবুর বাড়ির নম্বরটা বের করে ফোনের  বোতাম টিপতে শুরু করলেন সুবলবাবু।

সুবল ভট্টাচার্যর বাড়ি থেকে বেরিয়ে দিবাকর আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। একটা ট্যাক্সি ডেকে সুনীলকে নিয়ে উঠে বসে বলল, “বিজয়গড়।”

একথা শুনে ভজা ওরফে সুনীল বড়ো বড়ো করে জিজ্ঞাসা করল, “তোমার বাবাকে জলপাইগুড়ি থেকে এনে বিজয়গড়ের নার্সিংহোমে ভর্তি করিয়েছে কেন?”

গুড্ডু ওরফে দিবাকর রায় এবার মুচকি হাসল। “আমার বাবা আজ থেকে বিশ বছর আগে মারা গেছে রে হতভাগা। তাছাড়া আমি এক ছেলে। দাদা কোথায় পাব? আমরা এখন বিজয়গড় যাচ্ছি অবিন সেনের বাড়ি। ঐ পুঁথিটার খোঁজ করতে। তেওয়ারিজি দেখছি ঠিকই বলেন, তোর মাথায় গোবর আছে।”

“কিন্তু ঐ যে ফোনটা এল…”

“বাথরুমে ঢুকে আমার পুরনো সেটটা থেকে আমি নিজেই ঐ ফোনটা করেছিলাম। সুবলবাবুর কাছে আমার যা জানার, সব জানা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গেছি একটা বড়ো সাক্ষাৎকার নেব বলে, সন্দেহ না জাগিয়ে হুট করে তো আর বেরিয়ে আসা যায় না! তাই ঐ ছকটা করলাম।

“অবিন সেন যদি পুঁথিটা এশিয়াটিক সোসাইটিকে ইতিমধ্যে না দিয়ে থাকে, তাহলে ওটা বাগাতে আমার বেশি সময় লাগবে না। তেওয়ারিজি বলেছে, ওটার নাকি এই বাজারে দাম প্রচুর।”

দুই
দুপুর দুটো

হোলির দিন প্রেস বন্ধ। হাত মোটামুটি খালি। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর আরেকবার পুঁথিটা খুলে বসেছিল অবিন। সংস্কৃত না জানলেও হরফগুলো থেকে একটা আন্দাজ পাবার চেষ্টা যে শ্লোকগুলো আসলে কার লেখা। লম্বালম্বি দাগ টানা মাত্রার নীচে সুন্দর করে সাজানো অক্ষর। অসাধারণ সজ্জা। মনে মনে তারিফ করল ছাপাখানার কর্তা অবিন সেন। বাহবা। একটা একটা করে কাঠের পাটা তুলে তুলে উলটেপালটে দেখতে দেখতে শেষপাটাতে এসে নীচের দিকে দেখল লেখা আছে – ‘ইতি রুদ্রট’। অন্তত তাই মনে হল ওর।

রুদ্রট কি কোনও রচয়িতার নাম? কবি? কে বলবে এ প্রশ্নের উত্তর? অবিনের মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকল প্রশ্নটা। আর তখনই বাড়ির ফোনটা বেজে উঠল তার ঝনঝন করে। সুবল ভট্টাচার্যর নম্বর দেখাচ্ছে তাতে। ফোনটা ধরল অবিন। আর তারপরেই ভ্রূদুটো কুঁচকে উঠল তার।

মিনিটখানেক বাদে উঠে জামাকাপড় পালটে নিয়ে অবিন হাঁক দিল, “সদরটা বন্ধ করে দাও। আমি একটু ঘুরে আসছি।”

“সাদা জামাটা পরে বেরিও না আজ। রঙখেলার দিন।” ভেতর থেকে সুতপার ঘুম-জড়ানো গলা ভেসে এল।

“ও নিয়ে ভেবো না। শোনো। দিবাকর নামে কেউ একজন আমায় খানিক বাদে খুঁজতে আসতে পারে। তাকে বলবে আমি বাড়ি নেই। পরশু ঘুরে আসতে বলবে।”

“চেনা কেউ? ভেতরে ঢোকাব?”

“নাহ।” বলে দরজাটা টেনে দিয়ে অবিন বেরিয়ে গেল।

সপ্তম অধ্যায়
৬ মার্চ, ২০১৫। কলকাতা

এখন প্রায় মধ্যরাত। মাথার উপরে মান্ধাতা আমলের পাখাটা ঘট ঘট আওয়াজ করে ঘুরে চলেছে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কাগজের তাড়া থেকে চোখ তুলে পাখার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল শিশির। সামনে ছড়ানো কাগজের মধ্যে ‘দ্য হিন্দু’ কাগজের একটা কাটিং আর পয়লা মার্চের ‘জোর খবর’-এর ক্রোড়পত্র। দুটো খবর আর একটা বিজ্ঞপ্তি, দুয়ে দুয়ে চার হবার কথা। মাথাটা বড়ো দপদপ করছে। যত ভাবছে ব্যাপারটা নিয়ে আর মাথা ঘামাবে না, তত যেন চিন্তাগুলো চেপে বসছে মাথায়। ইতস্তত করে শেষে নাকের ডগায় চশমাটা চেপে বসিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে পুরনো ফোন ডায়েরি খুলে একটা নম্বর ডায়াল করল সে। তিনবার রিং হওয়ার পর অপর প্রান্তে গলার স্বর শোনা গেল।

“প্রফেসর সুবল ভট্টাচার্য বলছেন? হ্যাঁ, আমি শিশির বলছিলাম, শিশির ঠাকুর। একটা ব্যাপারে কথা বলতে চাই। অনেক রাত হয়েছে সেজন্য ক্ষমা চাইছি। এখন কি একটু কথা বলতে পারবেন?”

“আরে, কী আশ্চর্য! শিশির! এত রাতে! বলো বলো, কী খবর?”

“জরুরি। আপনি ব্রিজেশ থাপার নাম শুনেছেন?”

“কোন ব্রিজেশ থাপা?”

“অ্যান্টিক জিনিসের দু’নম্বরি কারবারি। মাল্টি-মিলিয়নিয়র। আগে দিল্লিতেই থাকত। এখন পুলিশের তাড়া খেয়ে নেপালে ঘাঁটি গেড়েছে। মাঝে কাগজে খবর হয়েছিল ওকে নিয়ে।”

“ও! নাহ্‌। আমি কাগজের ক্রাইম-টাইমের খবর বিশেষ পড়ি না। কিন্তু তুমি আবার তাকে নিয়ে পড়লে কেন? আর তোমাদের তো কোনও খবর পাইনি বহুদিন!”

“হ্যাঁ। আসলে… ইয়ে, যোগাযোগ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু স্যার, যে জন্য ফোন করেছি, ক’দিন আগে ব্রিজেশ ছদ্মনামে কলকাতায় এসেছিল। আমার এক বন্ধু মৃণাল তপাদার এখন সি.আই.ডিতে আছে। সে-ই জানাল কথাটা। বড়বাজারের ভজনলাল তিওয়ারি থাপার লোকাল এজেন্ট। ওর ওপরেও পুলিশের নজর রয়েছে। ব্রিজেশ থাপা কলকাতায় এসে এই ভজনলালের সঙ্গে দেখা করে।

“ঘটনাটাকে পুলিশ ঠিক সরলভাবে নিচ্ছে না। নিশ্চয়ই কিছু প্ল্যান আঁটছে ওরা। থাপাকেও অনেকদিন থেকে খুঁজছে পুলিশ। সন্দেহবশত তিওয়ারির ফোন ট্যাপ করেছিল পুলিশ।”

“কিন্তু এসব কথা তুমি আমাকে হঠাৎ করে বলছ কেন?”

“বলছি, স্যার। গতকাল নেপালে থাপাকে একটা আই.এস.ডি কলে তিওয়ারি প্রতিস্মৃতিবিদ্যার নাম নেয়। বলে, কলকাতায় এ বইটার খোঁজ সে পেয়েছে। এর বেশি আর কিছু সে বলেনি।”

হঠাৎ  সুবলবাবু  সতর্ক  হয়ে  কান  খাড়া  করলেন।  শিশির  তখন

ফোনের ও-প্রান্তে বলে চলেছে, “জিনিসটা কী বা কতটা মূল্যবান সে বিষয়ে পুলিশের কোনও ধারণাই ছিল না। যদি না মৃণাল কেসটার সঙ্গে যুক্ত থাকত। ও আমার ছোটোবেলার বন্ধু। প্রায়ই আসত আমাদের বাড়িতে। বাবা যখন সেই পুঁথিটা নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন ও নাকি আগ্রহবশত জানতে চেয়েছিল জিনিসটার বিষয়ে। ব্যাপারটা একেবারেই কাকতালীয়। কিন্তু ওর মেমরিতে এতদিন পরেও থেকে গেছে। ব্যাপারটা জেনে তাই ও ফোনে আমাকে জিজ্ঞেস করল সেকথা। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে হল, পুঁথিটা তো বাবা কাশীবাবুর কাছে দিয়েছিলেন। এখন মনে হল, এ-ব্যাপারে সবচেয়ে সঠিক তথ্য জানাতে পারেন কেবল  আপনি।”

কিছুক্ষণ গুম খেয়ে থেকে সুবলবাবু বললেন, “হুম! অবিনকে আমি ডেকে পাঠিয়েছিলাম কাল দুপুরেই। আসলে গতকাল দুপুরে এক ভুয়ো সাংবাদিক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। কী যেন নাম বলল! হ্যাঁ, দিবাকর রায়। সেও আচমকা ঐ পুঁথির কথা উল্লেখ করল। প্রথমে না বুঝে অবিনের ঠিকানাটা তাকে দিয়েছিলাম। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে ব্যাপারটা ঘোলাটে ঠেকতে আমিই অবিনকে ডেকে এনে বলি দিবাকরের নাগালে যাতে সে না আসে। শুনে তো সে প্রথমে ভয়েই অস্থির। ফোন খুলে পুলিশের কোন লোক-টোকের সঙ্গে কথাও বলল। ছেলেটা কিছু একটা বিপদের মধ্যে আছে হে। সেটা একেবারে নিশ্চিত।”

“দিবাকর রায়ের সাথে দেখা হয়েছিল অবিনের?”

“তা তো বলতে পারব না। তবে আমি অবিনকে যথেষ্ট সাবধান করে দিই। এখন কীভাবে যে ব্যাপারটা সামলাবে সে!”

“আমায় অবিনের নাম্বারটা দেবেন, স্যার? আমি কাল সক্কালেই একবার কথা বলতে চাই।”

ফোনটা ছেড়ে দিয়ে একটু মাথা নাড়লেন সুবলবাবু। শিশির পরিতোষবাবুর ছেলে। নিশ্চয়ই ভালো ছেলে। বাপের গুণ কি আর পাবে না? কিন্তু তাকেও সবটা সত্যি বলে দেয়া ঠিক হবে না। আর সেই বা সাত-তাড়াতাড়ি এত রাতে, তাও অ্যাদ্দিন বাদে ফোন করল কেন? একেবারে পুঁথিটার ব্যাপারেই! তাই যতটুকু দরকার রেখেঢেকেই তাকে খবর দিয়েছেন তিনি।

অষ্টম অধ্যায়
৭ মার্চ, ২০১৫। কলকাতা
এক

সুতপার ফোনটা ছেড়ে দিল শিশির। যা জানার সে জেনে নিয়েছে। সুবলবাবুকেও গতকাল সে পুরো সত্যিটা বলেনি। একটা গোপন জাল গুটিয়ে আসছে এবারে। শিকারি জানে না যে সে নিজেই আসলে শিকার। দীর্ঘদিন ধরে জমিয়ে রাখা একটা আক্রোশ। তিলে তিলে জাল বুনে তোলা।

সকালে অবিনের বাড়িতে ফোন করে ভেবেছিল অবিনকেই পেয়ে যাবে। ফোন ধরল ওর স্ত্রী সুতপা। সে-ই বলল, গতকাল সন্ধেয় অবিন পাহাড়ে চলে গেছে। শিশির পোড় খাওয়া লোক। দরকারি তথ্য বের করে আনতে তার বেশি সময় লাগে না, সে লোক কিম্বা যন্ত্র যা-ই হোক। অবিন যে হরিদ্বার হয়ে উত্তরকাশীর দিকে যাবে সে খবর সুতপার থেকে বের করে নিতে তার বেশি কসরত করতে হয়নি। এও জেনেছে যে, পুঁথিটাও নাকি সে সঙ্গে করেই নিয়ে গেছে।

অবিনকে সে টোপ হিসেবে ব্যবহার করবে বলেই ঠিক করেছিল। কিন্তু তার জন্য তাকে আর কোনও কষ্ট করতে হল না। ভাগ্যের বিচিত্র লীলা। সে নিজেই টোপ হয়ে রওয়ানা দিয়েছে। মনে হচ্ছে, এবারে গণ্ডগোলটা বেশ পাকিয়ে উঠেছে। এবারে দিবাকরের হোয়্যার অ্যাবাউটস জেনে নিতে হবে। সেটা করার জন্য বেশি বেগ পেতে হবে না।

এবার শুধু আরও একটা ছোট্ট কৌশল। তাহলেই তার আকর্ষণে শিকার পৌঁছে যাবে টোপের কাছে। মুখে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল শিশিরের। ভাগ্যের ইশারা? দেখা যাক! তার সামনে কম্পিউটারের পর্দায় একটা সাইট ভাসছিল। তাতে লগ ইন করে ঢুকে সে একটা আপডেট পোস্ট টাইপ করতে বসল।

‘কনফিডেনশিয়াল সোর্স সেইজ দ্যাট দ্য বুক ইজ নাও ট্র্যাভেলিং টু উত্তরকাশী উইথ কারেন্ট ওউনার…’

মেসেজটা আরও একবার দেখে নিয়ে এন্টার টিপল সে। সাধারণ ইন্টারনেটের ব্যবহারকারীরা এর দেখা পাবে না। পাবে অন্ধকার জগতের মানুষজন। অন্ধকারের সেই শিকারিদের মধ্যে একজন নির্দিষ্ট মানুষ… হ্যাঁ। সে এই খবরটা দেখবেই। মৃনালের দেয়া শেষতম খবরটা শোনবার পর শিশির নিশ্চিত। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছে সে এর জন্য।

এইবার দাবা খেলার এন্ড-গেম। লগ আউট করে বের হয়ে গিয়ে মেক মাই ট্রিপের পর্দাটাকে সামনে ভাসিয়ে তুলল শিশির। সেদিকে মাউসের নির্দেশ করে সে কলকাতা-দিল্লি উড়ানের বুকিংয়ের পাতায় টাইপ করছিল – ‘বলবন্ত সিং…’

দুই

ভজনলাল তেওয়ারি আদতে রাজস্থানের মানুষ। দীর্ঘদিন কলকাতায় থেকে বাংলাটা ভালোই আয়ত্ত করেছেন। একটা সময় বড়বাজারে বাবার গদিতে বসতেন। এখন আর ওদিকে বিশেষ যান না। ব্যাবসা সামলায়

ছেলে চমনলাল। উনি এখন অন্য ব্যাবসায় মগ্ন। সেটা বাড়িরও কেউ ভালো করে জানে না। বেনিয়াটোলা লেনের একটা আদ্যিকালের বাড়ির দোতলায় ওঁর অফিস।

হোলির দিন দুয়েক বাদে সেদিন দুপুরবেলা ভজনলাল একজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন, এমন

 সময়ে গুড্ডু ভজাকে নিয়ে ওখানে ঢুকল। ওদের দেখেই ভজনলাল ফোনটা রেখে দিলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, “কী খবর গুড্ডু, ভালো খবর কিছু আছে?”

টেবিলের এ-পারে রাখা একটা চেয়ারে ঝপ করে বসে বেশ উত্তেজিত স্বরেই গুড্ডু জবাব দিল, “হ্যাঁ তেওয়ারিজি, পুঁথিটা অবিন সেনের কাছেই আছে। আমি ওর বাড়ি হয়েই আসছি।”

“তাহলে দেরি করছ কেন? ডিল করে ফেলো। টাকা অফার করো। জিনিসটা আমার চাই, ব্যস।”

“অবিন সেন বাড়ি নেই। পরশু বিকেলেই গেলাম, তা ওর স্ত্রী বলল কোথায় বেরিয়েছে। বললাম, পরে আসব। কাল একটা অন্য কাজে ফেঁসে গিয়ে যেতে পারিনি। আজ সকালবেলা গিয়ে শুনি সে কাল রাত্রে গাড়োয়ালের দিকে ঘুরতে বেরিয়ে গেছে। সে নাকি প্রত্যেক বছরেই সপ্তাহ দু-তিনের জন্য ট্রেক করতে যায় এই সময়।”

“তাহলে তো মালটা পেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। ইয়ে তো বহুত মুশকিল হো গয়া ভাই।”

“মুশকিল অন্য জায়গায়, তেওয়ারিজি। অবিন সেন ঐ পুঁথিটাও নিজের সঙ্গে নিয়ে গেছে।”

“কী বলছ গুড্ডু, পুঁথিটা হিমালয়ে নিয়ে গেছে! অবিন সেন কি ওটার খদ্দের অলরেডি ঠিক করে ফেলেছে নাকি? তুমি শিওর?”

“আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর, তেওয়ারিজি। ওর স্ত্রী বলল, লাল কাপড়ে মোড়া একটা পুঁথি অবিনকে স্যাকে ভরে নিতে দেখেছে।”

ভজনলাল  এবার  নিজের  চেয়ার  ছেড়ে  উঠে পায়চারি শুরু করে

দিলেন। তারপর গুড্ডুকে বললেন, “তুমি অবিনের ফোন নম্বর নিয়ে এসেছ নিশ্চয়ই? ওকে একবার ফোন করে দেখো তো, কোথায় ঠিক যাচ্ছে সেটা পাত্তা করা যায় কি না।”

“চেষ্টা করেছিলাম, তেওয়ারিজি। রিং বেজে গেল। ধরল না। তবে প্রথমে হরিদ্বার পৌঁছবে সেটা ওর স্ত্রী বলল অবশ্য। তার পর থেকে যেসব জায়গায় ঘুরে বেড়াবে, সেখানে অধিকাংশ সময়েই নাকি ফোনের টাওয়ার পাওয়া যায় না। নিজেই সময়সুযোগ পেলে বাড়িতে ফোন করে খবরাখবর জানায়।”

“হরিদ্বার থেকে কোথায় যাবে কিছু বলেছে?”

“উত্তরকাশী। তারপর কোথায় যাবে সেটা ওর বউ জানে না। এমনকি অবিন নাকি নিজেও ঠিক জানে না। এখান থেকে একরকম ভেবে যায়, আবার ওখানে গিয়ে হামেশাই রুট চেঞ্জ করে নেয়। একটু খামখেয়ালি গোছের।”

“ইয়ে তো বহুত পড়েশানির ব্যাপার দেখছি। কোথায় যাচ্ছে বউ জানে না, নিজেও জানে না। এ কেমন ঘোরা রে ভাই! আচ্ছা পাহাড় ঘুরবি ঘোর, পুঁথিটা সঙ্গে করে নিয়ে গেছিস কেন? এ মতলব আমার ভালো লাগছে না, গুড্ডু।”

“আমারও ভালো লাগছে না, তেওয়ারিজি। তার ওপর, আমি থাকতে থাকতেই ওর বাড়ির ল্যান্ডলাইনে আরেকটা ফোন এল। ওর বউয়ের কথাবার্তা শুনে বুঝলাম শিশির ঠাকুর ফোন করেছিল।”

“সেটা আবার কে আছে?”

“ঐ পুঁথিটা আসলে যার, সেই পরিতোষ ঠাকুরের ছেলে।”

“সত্যনাশ! পুঁথিটা যে খুব দামী সেটা সবাই কোনওভাবে জেনে গেছে দেখছি। খুব তাড়াতাড়ি অবিনের সঙ্গে মিট না করতে পারলে… কিন্তু সে কোথায় গেছে সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। অত বড়ো হিমালয়ে একটা লোককে খুঁজে বের করা সম্ভব নাকি? তুমি ওর বৌয়ের থেকে আর কিছু জানতে পারলে না?”

“একটা ব্যাপার জেনেছি। ওর বৌ বলেছে, টানা কয়েক বছর নাকি অবিন দীনেশ উনিয়াল নামে এক ট্র্যাভেল এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে গাড়োয়াল হিমালয় ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই দীনেশের একটা কার্ড আমি অবিনের বৌকে ভুজুং ভাজুং দিয়ে জোগাড় করে এনেছি।” এই বলে গুড্ডু পকেট থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করল।

ভজনলাল কার্ডটা দেখে খুব খুশি হলেন। বললেন, “সাবাশ, গুড্ডু! এই কারণে আমি তোমাকে এত রিলাই করি। আর দেরি করছ কেন? ট্র্যাভেল এজেন্সিটার ঠিকানা তো দেখছি উত্তরকাশী। এক্ষুনি ফোন লাগাও দীনেশকে। অবিনের খবরটা পেয়ে গেলে আজই রাতের ফ্লাইটে দিল্লি চলে যাও। ওখান থেকে ওভারনাইট বাস জার্নি করলেই কাল সকালে হরিদ্বার পৌঁছে যাবে। তাহলে আর অবিনের নাগাল পেতে অসুবিধা হবে না। আমি চমনকে এক্ষুনি এয়ার টিকিট বুক করতে বলছি। তুমি বাড়ি গিয়ে লাগেজ গুছিয়ে নাও। পুঁথিটা আমার চাই, গুড্ডু। নেপালের ব্রিজেশ থাপাকে আমি কথা দিয়ে দিয়েছি।”

নবম অধ্যায়
১০ মার্চ, ২০১৫। পাহাড়ের পথে
এক

“নমস্তে!”

উত্তরকাশী বাস-স্ট্যান্ডে কাগজের চায়ের কাপটা ডাস্টবিনে ফেলতে ফেলতেই কথাটা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটাকে দেখল অবিন। হাসিমুখ। পিঠে একটা বড়ো রুকস্যাক। জিনসের প্যান্ট আর ফুল-স্লিভ হলুদ কালো ডোরাকাটা সোয়েটার গায়ে। টি-শার্টের সবুজ কলার সোয়েটারের ওপর দিয়ে কাঁধের দু’পাশে উঁকি দিচ্ছে।

ছেলেটা আবারও ঝকঝকে হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলে উঠল, “নমস্তে।”
“নমস্তে।” প্রত্যুত্তরে অবিন বলে এবারে।হিন্দিতেই কথা চলে ওদের।
“দীনেশ ভাইয়া আমাকে পাঠিয়েছে। আপনার সঙ্গে যাবার জন্য।”
“ও, আচ্ছা। তোমার নাম কী?”
“ধনুষ রাণা।”
“তা রাণাবাবু, তুমি তো বেশ দেরি করে ফেললে আসতে। তা তুমি এদিকে এসেছ আগে?”
“না,”  সপ্রতিভভাবে  উত্তর  দেয়  ছেলেটি, “তবে  তাতে  কোনও
অসুবিধে নেই, আমি রাস্তা ঠিক চিনে নিতে পারব। গ্রামের মানুষদের জিজ্ঞেস করে নেব।”

অবিন হাসে। রাস্তা জানা না জানা নিয়ে ওরও অবশ্য মাথাব্যথা নেই। একটা ম্যাপ হাতে করে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানোতেই ওর আনন্দ। তার মাঝে কখনও পরিচিত রাস্তা পড়ে, কখনও নয়। কোথাও ঠায় বসে কাটিয়ে দেয় দু-চারদিন। কখনও আচমকাই পাট শেষ করে বলে, চলো ফিরি। এসব পাগলামি দীনেশ জানে। ফলে উদ্ভটরকম লোকের সঙ্গী হওয়া বেশিরভাগ মালবাহকদের না-পসন্দ। তাই ঠিকঠাক সঙ্গী চাই বলে দীনেশকে জানিয়েছিল। তো এই ছেলেটাকে চটপটেই মনে হল। কাজেরও।

“তা চলো বাবা ধনুষ। তোমার স্যাকে এই খাবারগুলো আর তাঁবু ঢুকিয়ে নাও।” অবিন ওর স্যাকের পাশে নামিয়ে রাখা প্যাকেটগুলো দেখায়।

ভাটোয়ারি ছাড়িয়ে পাঁচ কিলোমিটার এগিয়ে ঝোলাপুল পার হয়ে ভাগীরথী পেরিয়ে দু’জনে পাহাড়ের পূর্ব-ঢালে পা রাখল যখন তখন বেলা প্রায় একটা। সামনে টানা চড়াই ডিঙিয়ে প্রথম পাহাড়ের গিরিশিরাতে পৌঁছতে পারলেই আজকের মতো খেলা শেষ। তাও ঘন্টা তিনেকের আগে নয়। অবিন ভাবতে ভাবতে ধীরে ধীরে চলছিল। তাকিয়ে দেখে, ধনুষ ওর থেকে অন্তত আধা কিলোমিটার এগিয়ে গেছে। একটা সরু পথরেখা আছে। সেইটে ধরে কোনদিকে যেতে হবে সেটা অবিন আগে থেকেই বলে রেখেছিল। তবুও একটা আনকোরা ছেলের পক্ষে অমন ক্ষীণ পথরেখা ধরে দিক ঠিক রেখে চলাটা প্রশংসার। অবশ্য ধনুষ পাহাড়ের ছেলে, এগুলো ওর সহজাত বলেই ধরে নিতে হবে।

পাহাড়ের মাথায় পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে চারটে হল। ও-পাশে খানিক নীচেই একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে। উৎরাই আধঘন্টা বড়োজোর।

“আজ গ্রামেই রাত্রিবাস। কী বলো, ধনুষবাবু?”

ধনুষ আবার হাসে। ছেলেটার চেহারা চমৎকার। আর পাঁচটা গাড়োয়ালি ছেলের চেয়ে লম্বা। স্বাস্থ্যবান। খাড়া নাক। গায়ের রঙটা সামান্য চাপা। দেখেই মনে হয় গায়ে জোর আছে। অত ভারী রুকস্যাকটা, কম-সে-কম কুড়ি কিলো তো হবেই! অথচ পিঠের ওপরে যেন কিছুই নেই এমন হাবভাব।

সে রাতে গ্রামে রাত্রিবাস করে পরদিন আবার পাহাড় চড়া শুরু হল।

মোটামুটি একটা আন্দাজ করে নিয়েছে দু’জনে গ্রামের ভেড়া চরাতে যাওয়া মানুষদের কাছ থেকে। বেলাকখাল থেকে জানা পথে না গিয়ে একটু ঘুরপথে সহস্রতালের দিকে যাবে, এমনটাই ইচ্ছে অবিনের। সেইমতো পূর্বে না গিয়ে ও উত্তরের পাহাড়ের ঢাল ধরে চলতে আরম্ভ করে। ধনুষ যথারীতি সামান্য এগিয়ে। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ছে অবিনের জন্য। এর মধ্যেই ধনুষের সঙ্গে কথাবার্তায় ওর হালহদিশ জেনে নিয়েছে অবিন। আর ছেলেটার জানবার আগ্রহ এবং বুদ্ধি দুইই আছে। অবিনের ভালো লেগে গেল। তাদের হাঁটাপথের বাকি অংশে আর কোনও গ্রাম নেই, ফলে এ ক’দিন অপছন্দের সঙ্গী হলে অসুবিধে হত। যা হোক, এ ছেলেটা মনোমতো।

নানান কথাবার্তায় পথ পেরোচ্ছিল দু’জনে। হঠাৎ ধনুষের কথায় দাঁড়িয়ে পড়ে অবিন।

“দাদা, দেখো।”

অবিন ওর ইশারায় তাকিয়ে দেখে, আকাশের কোনায় কালো মিশমিশে মেঘ। অবিন একটু চিন্তায় পড়ে। শিরশিরে হাওয়াটা বেড়েছে। অথচ ছেলেটা যেন খুব আনন্দের দৃশ্য দেখাচ্ছে, এমন করেই ওকে বলল। পাহাড়ি ঢালে হঠাৎ করে বৃষ্টি এলে মুশকিল। অবিন ব্যস্ত হয়ে পড়ল একটা সুবিধেমতো জায়গায় তাঁবু ফেলার জন্য। পেয়েও গেল। তাঁবু ফেলেছে কি ফেলেনি, তুমুল ধারায় বৃষ্টি এল। একটা হেলানো পাথরের গায়ে গায়ে তাঁবুটা পেতেছে। পাথরের গায়ে প্লাস্টিক দিয়ে একটা দিব্যি কিচেন বানিয়ে ফেলল ধনুষ। পাথরটা মাথার ওপরে ঝুঁকে চমৎকার ছাদ বানিয়েছে। দিব্যি দু’জন থাকা যায়।

রাতে বৃষ্টি বাড়ল। আকাশ মেঘে ঢাকা আর মাঝে মাঝেই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। অবিন খেয়াল করে দেখল, বিদ্যুৎ চমকালেই কেমন যেন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ধনুষের চোখমুখ। চিন্তা তো দূরস্থান। যেন দারুণ মজার ব্যাপার ঘটছে।

পরদিন সারাদিন চলল বৃষ্টি। পাথরের আড়ালে কিচেনের মধ্যেই কেটে গেল গোটা দিন। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কোত্থেকে একরাশ ঘাস এনে পাথরের ওপরে দিয়ে তার ওপর প্লাস্টিক কম্বল বিছিয়ে চমৎকার বসার ব্যবস্থা করে ফেলেছিল ধনুষ। গরম গরম ডাল-ভাত বানিয়ে সন্ধের মুখমুখই রাতের খাওয়া সেরে এদিক ওদিক করে শুতে শুতে টের পেল অবিন, এখন যেন বৃষ্টিটা ধরেছে আর একটা দুটো তারাও যেন ফুটেছে আকাশে।

দুই

পায়ের শব্দটা একলা অবিনই পায়নি, ধনুষও পেয়েছে। গভীর রাত, সময় কত হবে জানে না অবিন। শোবার সময় ঘড়ি খুলে রেখেছিল মাথার কাছে, হাতড়েও সেটা পেল না, টর্চটাও না। অথচ দুটোই মাথার কাছে রাখা ছিল। বৃষ্টি নেই, বাইরে আশ্চর্য নীলাভ জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে একটা বিস্তীর্ণ বুগিয়াল। একেই বুঝি দেবভূমি বলে।

তাঁবুর চেনটা খুলতেই হাত পঞ্চাশেক দূরে একজন মানুষকে দেখতে পেল অবিন। আবছায়া নীলাভ চাঁদের আলোয় তার সাদা পোশাক ঝকঝক করছিল। একদিকের কাঁধে মোটা শক্ত দড়ির মতো কিছু ঝুলছিল। মাথার চুল চুড়ো করে বাঁধা। পূর্ণবয়স্ক সাধারণ উচ্চতার পুরুষের চেয়ে বিঘত দুয়েক লম্বা। চওড়া কাঁধ। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ করে দেখে একঝলক মনে হল, এক পায়ে দাঁড়িয়ে অন্য পা ভাঁজ করে আছে।

অবিন নানারকম গল্প শুনেছে পাহাড়ে, অলৌকিক, অবিশ্বাস্য। তার সঙ্গেও কি এমন ঘটতে চলেছে? হাতড়ে টর্চটাও খুঁজে পাওয়া গেল না। এদিকে ডানপাশের তাঁবুর ফ্ল্যাপ খুলে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে ধনুষ। চোখ সোজা ওই লোকটির দিকে।

এক, দুই, তিন, চার সেকেন্ড… এক পা এক পা করে এগোতে শুরু করেছে ধনুষ। অবিন এইবারে ঘাবড়ে গেল। ভয়ও পেল। করে কী ছেলেটা! আস্তে আস্তে, কিন্তু খুব সাবলীলভাবে এগোচ্ছিল ধনুষ। অবিন প্রাণপণ চেঁচিয়ে ওকে না করতে চাইল। গলা শুকিয়ে কাঠ। তাও ফ্যাসফেসে গলায়, “মৎ যাও, মৎ যাও” বলছিল অবিন। সে ডাক ধনুষের কানে পৌঁছল  কি না কে জানে, কেন না ও  ততক্ষণে  লোকটার

দু’হাতের মধ্যে পৌঁছে গেছে। অবিন চোখ বুজে ফেলল। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ধনুষের গলা শুনল, “দাদা, ওঠো। মৌসম একদম ক্লিয়ার।”

অতিকষ্টে চোখ মেলে দেখল অবিন, ওর দিকে ঝুঁকে ওকে ডাকছে ধনুষ। হাতে চায়ের গেলাস। তাঁবুর ভেতরের দেওয়াল সকালের নরম রোদে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ধনুষের মুখে হাসি, ঝকঝকে মুখ আর কোঁকড়া চুলগুলো আজ ও চুড়ো করে মাথার ওপরে বেঁধেছে।

অবিন চোখ মেলতে ও বলল, “খোঁজ নিয়ে নিয়েছি। ওই যে সামনের পাহাড়ের ধারটা, ওর ওপরেই ‘অর্জুন কা কুর্সি’ আছে। ওটা পেরিয়ে কিয়ার্কিখাল টপকে তারপর সহস্রতাল। আর এই এখানে আমরা যেখানে তাঁবু ফেলেছি, তার নাম কি তোমার ম্যাপে লেখা আছে?”

অবিন যন্ত্রের মতো দু’পাশে মাথা নাড়ল।

“দেওধার।”

দশম অধ্যায়
১২ মার্চ, ২০১৫। পাহাড়ের গভীরে
এক
ধনুষ ও অবিন

চব্বিশ ঘণ্টা পেরোতে না পেরোতেই ধনুষ ছেলেটাকে বেশ পছন্দ হয়ে গেছিল অবিনের। চালচলনে খানিক স্মার্ট হলেও গ্রাম্য সরলতা এখনও যায়নি। পাহাড়ি পথ ধরে অর্জুন কা কুর্সির দিকে যেতে যেতে ধনুষের সঙ্গে বেশ গল্প জুড়ে দিল অবিন। ধনুষ সতুরি গ্রামের বাসিন্দা শুনেই অবিন বলল, “তোমাদের ওখানে তো জখোল নামের একটা গ্রাম আছে। আর সেই গ্রামে আছে দুর্যোধনের একটা মন্দির।”

এই মন্তব্যে ধনুষ খানিক অবাকই হল। বলল, “দুর্যোধন! কিন্তু ওখানে তো দেওমহারাজের মন্দির ছিল। এখন সেটাই নাকি বদলে হয়েছে সোমদেও মন্দির। ঐ মন্দির থেকে প্রতিবছর ডোলি বের হয়। সেই ডোলি যায় এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। আমাদের গ্রামেও আসে।”

“আরে বাবা, ঐ দেওমহারাজই তো মহাভারতের দুর্যোধন। তুমি মহাভারত পড়নি, ধনুষ?”

প্রশ্নটা শুনে ধনুষ এবার লজ্জা পেয়ে গেল। মাথা নেড়ে জানাল, মহাভারত সত্যিই সে পড়েনি। তবে লোকমুখে গল্পটা শুনে শুনে তার মোটামুটি ধারণা ছিল, যে ঐ দেওমহারাজ আর তার বন্ধু করণমহারাজ দু’জনেই নাকি যুদ্ধে হেরে গিয়েছিল।

অবিনের বাড়িতে দু-দুটো মহাভারত। একটা কালীপ্রসন্ন আর অন্যটা রাজশেখর বসুর। শেষের মহাভারতটা অবিন দু-তিনবার পড়েছে। কিন্তু তাও যেন আশ মেটে না। অতঃপর, অবিন শুরু করে দিল ধনুষকে দুর্যোধনের গল্প শোনাতে।

“পাণ্ডবরা তখন সবাই বনবাসে গেছে। তাদের খুঁজতে খুঁজতে দুর্যোধন একদিন চলে গেল তোমাদের ওই এলাকায়। ওখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করল। সে তখন পাহাড়ের দেবতার কাছে প্রার্থনা করল, কিছুটা এলাকা তাকে দেওয়া হোক। সে চায় ঐ এলাকার মানুষের উন্নতি করতে। দেবতা মহাশু মানে মহেশ্বর আর কী, সেই আবেদন মঞ্জুর করলেন। এরপর বেশ কিছুকাল ওখানে কাটিয়ে দুর্যোধন আবার ফিরে এল নিজের রাজ্যে। এর বেশ কিছুদিন পর হল কুরুক্ষেত্রের ভীষণ যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে মৃত্যু হল দুর্যোধনের। সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ওখানকার অধিবাসীরা কান্নায় ভেঙে পড়ল। তাদের চোখের জলে জন্ম হল তমসা নদীর।”

“কিন্তু দাদা, আমাদের ওখানে তো টনস নদী বইছে।”

“আরে বাবা, ঐ তমসাই নাম বদলে টনস হয়েছে। আচ্ছা একটা কথা বলো দেখি, ঐ নদীর জল তোমরা কেউ খাও?”

“না, দাদা। আমাদের এলাকার কেউ ঐ জল খায় না।”

“কেন খায় না জানো? কারণ, তোমাদের ওখানকার লোকেরা এখনও বিশ্বাস করে যে হাজার হাজার মানুষের চোখের জল দিয়ে যে নদী তৈরি হয়েছে তার জল পান করা উচিত কাজ নয়।”

“আপনি এত কথা জানলেন কী করে?”

“বা রে, বছর দশেক আগে আমি গিয়েছিলাম তো ঐ অঞ্চলে। শুধু জখোলের দুর্যোধনের মন্দির কেন, নেতওয়ারের কর্ণের মন্দিরও আমি দেখে এসেছি। তুমি যাওনি কোনওদিন ওখানে?”

ধনুষ আবার মাথা নিচু করল। ওদিকে অবিন বলে চলে, “তবে একটা ব্যাপার তুমি ঠিকই শুনেছ। জখোলের লোকজন বহুদিনই আর দুর্যোধনের পুজো করছে না, ওই মন্দিরে এখন শিবের পুজো হচ্ছে। আসলে দুর্যোধন তো মহাভারতের ভিলেন চরিত্র। তাই বোধহয় গ্রামবাসীরা আস্তে আস্তে দুর্যোধনের বদলে শিবঠাকুরকে আসনে বসিয়েছিল। পুরনো মানুষেরা জানলেও জানতে পারে, নয়া প্রজন্মের এক-দু’জন হাতে গোনা লোক বাদ দিলে তো এসবের কোনও খোঁজই কেউ রাখে না।

“দুর্যোধন ছিল শিবের উপাসক। শিবের আরেক নাম সোমেশ্বর বা

সোমদেব। তাই ওখান থেকে এখন সোমদেও মহারাজের ডোলি বের হয়। তবে নেতওয়ারে কিন্তু কর্ণের পুজো দিব্যি চলছে। লোকটা খুব দানধ্যান করত তো। তাই ঐ গ্রামে এখনও দানবীর কর্ণের খুব সমাদর। ঐ গ্রামের সকলে এখনও কর্ণকে এতটা সম্মান করে যে বিয়ের সময় কেউ এক পয়সা পণ দেওয়া-নেওয়া করে না!”

“আপনি এত খবর জানেন আমাদের এলাকার!”

অবিন হেসে বলল, “ওটাই আমার নেশা, ধনুষ। পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে, আর সেখানকার লোকজন সম্বন্ধে জানতে আমার খুব ভালো লাগে।”

ধনুষ অবিনের কথা মন দিয়ে শুনছিল বটে, কিন্তু কেন জানি ওকে একটু অস্থির লাগছিল। বার বার এদিক

ওদিক ঘনঘন তাকাচ্ছিল ছেলেটা। আরও কিছুটা এগিয়ে ও অবিনকে একসময়ে বলেই ফেলল, “দাদা, কেন যেন আমার মনে হচ্ছে, কেউ আমাদের আড়াল থেকে দেখছে।”

দুই
রাকেশ ও মুলার

“স্যার, আপনি জার্মান তো? তাহলে সংস্কৃত জানলেন কী করে?”

“তুমি তো ইন্ডিয়ান। তাহলে তুমি জার্মান আর ইংলিশ কীভাবে জানলে?” পালটা প্রশ্নটা করে নিজেই হেসে ফেললেন সংস্কৃতভাষার গবেষক ডঃ ম্যানুয়েল মুলার।

মুলারের দিকে তাকিয়ে ছিল রাকেশ। ভদ্রলোক নিজের এদেশে আসবার ব্যাপারে তাকে যা বলেছেন সেটা মোটামুটি এইরকম-

বিশ বছর আগে সংস্কৃত-চর্চা শুরু করার পর থেকেই ভারতবর্ষ সম্পর্কে তাঁর কৌতূহলের শেষ নেই। যে দেশে সংস্কৃতভাষা বিকাশ লাভ করেছে, সে দেশটা একবার ঘুরে আসার বাসনা তখন থেকেই তাঁর মনে উঁকি দিচ্ছিল। তিনি কেবল একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। এতদিনে সেই সুযোগ মিলেছে। খোঁজ পেয়েছেন একটা মহামূল্যবান পুঁথির। তবে সংস্কৃত ব্যাকরণ ও অলঙ্কারশাস্ত্রের সাহায্য না নিয়ে সে পুঁথির সঠিক মর্মোদ্ধার করা যায় না।

তাঁর  কাছে  খবর,  কাশ্মীরি   পণ্ডিত   রুদ্রট   নাকি একটা কোনো রহস্যজনক বিদ্যার খবর দিয়েছেন ঐ পুঁথিটায়। কিন্তু জার্মানিতে বসে রুদ্রটের সেই পুঁথি হাতে পাওয়া যাবে না। তার জন্য যেতে হবে রুদ্রটের দেশেই।

অতঃপর, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তিন মাসের ভিসা নিয়ে ডঃ মুলার চলে এসেছেন ইন্ডিয়ায়। যোগাযোগ করেছেন বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে। প্রায় দিন সাতেক ঘুরেছেন কাশ্মীরে, রুদ্রটের টানে। কিন্তু হাতে আসেনি সেই অভীষ্ট বস্তু। তারপর নাকি বিশ্বস্ত সূত্রে একটা খবর পেয়ে গাড়োয়াল হিমালয়ের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন।

এ অঞ্চলে গাইডের জন্য মুলার দিল্লির একটা ট্র্যাভেল এজেন্সিতে যোগাযোগ করেছিলেন। তারাই জার্মান আর ইংরেজি জানা রাকেশকে দিয়েছে গাইড হিসেবে। রাকেশ সিং রাওয়াত এই মুহূর্তে দিল্লি-নিবাসী হলেও তার জন্ম উত্তরকাশীর মোরি তহশিলের দগোলি গ্রামে, টনস নদীর এক্কেবারে কিনারায়। বুদ্ধিমান। নিজের কাজে দক্ষ।

ডঃ মুলারের বয়স এখন বাহান্ন ছুঁলেও চেহারায় বা চলন-বলনে প্রৌঢ়ত্বের কোনও ছাপ নেই। বছর চব্বিশের রাকেশের সঙ্গে পাহাড়ি রাস্তায় উনি তাল মিলিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। অবশ্য ওঁদের কারও কাছেই একটা হালকা রুকস্যাক ছাড়া আর কোনও ভার ছিল না। মালের বোঝা ছিল এক পোর্টারের পিঠে।

খানিক কথা বলেই ডঃ মুলার বুঝে গেছেন, রাকেশ বেশ বুদ্ধিমান ছেলে, গাড়োয়াল হিমালয়ের পথঘাটও সে ভালোই চেনে। শুধু তাই-ই নয়, ইন্ডিয়ান মিথোলজি সম্পর্কেও রাকেশের মোটামুটি জ্ঞানগম্যি আছে। তবে নিজের যে পরিচয়টা তিনি রাকেশকে দিয়েছেন তাতে পুরোপুরি বিশ্বাস তার হয়নি এখনও। অবশ্য আজকাল কাউকে সহজে বিশ্বাস করা উচিতও নয়। কথাটা ভেবে মনে মনে একটু হাসলেন মুলার। আরও একটু সময় নেবে।

সামনেই  অর্জুন  কা  কুর্সি। রাকেশ এই পথে টুরিস্ট  নিয়ে আগেও এসেছে। এটা বৃদ্ধকেদার থেকে তিরতুনা গ্রাম, মাসারতাল হয়ে একের পর এক পাহাড়ের রিজ টপকে আসা পথ।

ডঃ মুলারকে রাকেশ বলল, “ওখানে একটা পাথর আছে, হুবহু চেয়ারের মতো। স্বর্গযাত্রার সময় পঞ্চপাণ্ডব ঐ জায়গায় এসে নাকি খানিক বিশ্রাম নিয়েছিল।  অর্জুন  বসেছিল  ঐ  পাথরটার ওপর। এখনও অনেক লোক ঐ পাথরটাকে পুজো  করে।  পাথরের  ওপর গ্রামের লোক তির-ধনুক রেখে আসে। ওখান  থেকে হিমালয়টাকে  খুব  সুন্দর দেখায়, চোখ ফেরানো যায় না।”

ডঃ মুলার নিজে মহাভারত পড়েছেন, অবশ্যই সংস্কৃতে। তাই পাণ্ডবদের স্বর্গারোহণের গল্প তাঁর অজানা নয়। তিনি রাকেশকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি তো মহাভারতের গল্প ভালোই জানো দেখছি। তা তুমি প্রতিস্মৃতিবিদ্যার কথা শুনেছ?”

প্রতিস্মৃতিবিদ্যা শুনে রাকেশের ফ্যালফ্যাল করা চোখে তাকাল। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, কস্মিনকালেও অমন বিদঘুটে নাম সে শোনেনি। মহাভারতে এর কথা আছে? সাহেব গুলিয়ে ফেলছে না তো!

হঠাৎ রাকেশের ভাবনার তালটা কেটে গেল মুলারের কথায়, “এসো, এখানে বসে লাঞ্চটা সেরে ফেলা যাক।”

খানিক বাদে পোর্টারের বোঝা নামিয়ে লাঞ্চ প্যাক বের করতে করতে রাকেশ প্রসঙ্গটা ফের তুলল। “প্রতি… কী বললেন, স্যার?”

লাঞ্চ-প্যাকেটটা হাতে নিতে নিতে মুলার বললেন, “ওটা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগের ঘটনা। শকুনির চক্রান্তে পাশা খেলায় হেরে বনবাস জীবন কাটাতে পাণ্ডবরা সবে দ্বৈতবনে হাজির হয়েছে। দ্রৌপদী তার পঞ্চস্বামীর ব্যবহারে রেগে লাল। তার দাবি, তক্ষুনি দুর্যোধনকে আক্রমণ করা হোক। রাগী ভীমও এই প্রস্তাবে সায় দিয়েছে। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের তাতে মত নেই। সে ভীমকে বোঝাতে লাগল যে ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণের মতো অনেক মহাযোদ্ধা কৌরবদের হয়ে যুদ্ধ করবে। তাদের সঙ্গে লড়ার শক্তি এই মুহূর্তে পাণ্ডবদের নেই। অতঃপর অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই।

“এই সময়েই ধ্যানবলে সবকিছু জেনে ঐ দ্বৈতবনে ব্যাসদেবের আবির্ভাব ঘটল। তিনি যুধিষ্ঠিরকে বললেন, তোমাকে আমি প্রতিস্মৃতি নামে এক গুপ্তবিদ্যা শিখিয়ে দেব। তুমি সেই বিদ্যা শেখাবে অর্জুনকে। অর্জুন এই বিদ্যা শিখে নিয়ে ইন্দ্র, বরুণ, রুদ্র, কুবের ও যমকে তুষ্ট করতে পারবে এবং লাভ করবে দিব্য অস্ত্র। সেই অস্ত্র দিয়ে ভবিষ্যতে কৌরবদের হারানো সম্ভব হবে।”

একজন  বিদেশি মানুষের  মহাভারত ও  সংস্কৃতে  এই জ্ঞান দেখে রাকেশ একেবারে হাঁ হয়ে গেল। তার মুখ দিয়ে আর কোনও কথা সরছিল না। ডঃ মুলার তা লক্ষও করলেন। হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কী ভাবছ, রাকেশ?”

রাকেশ বলল, “বছর দুয়েক আগে টুরিস্ট নিয়ে সহস্রতাল যাওয়ার পথে মাসারতালে আমি এক সাধুবাবার দেখা পেয়েছিলাম। তিনি নাকি মাসে এক-দু’বার সামান্য ফলমূল খান। বাকি সময়ে কেবল বায়ু ভক্ষণ করে জীবন কাটান। গ্রামের লোকেরা তাকে খুব মানে। কয়েকমাস তিনি ছিলেন মাসারতালের পাশে খোলা আকাশের নীচে। তারপর কোথায় চলে যান। তাঁর কাছেও একটা কোনও বিদ্যার কথা শুনেছিলাম। বলেছিলেন, এই ঘোর কলিযুগেও যে ঐ বিদ্যার বৈদিক মন্ত্র শিখতে পারবে, সে নাকি ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতাদের আশীর্বাদ পেয়ে দৈব অস্ত্রের মালিক হবে। তিনি বোধহয় তাহলে এই মন্ত্রটাই কথাই… আচ্ছা, মহাভারতে কি মন্ত্রটা আছে?”

ডঃ মুলার হ্যাঁ না কিছুই বললেন না। শুধু মিটিমিটি হাসতে লাগলেন।

একাদশ অধ্যায়
১৩ মার্চ, ২০১৫
এক
অর্জুন কা কুর্সির কিছু আগে

ধনুষের আজ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে তাঁবু গুটোতে হয়নি। কারণ, অবিন আজ এখানেই আরও দুটো দিন থেকে যাবে ঠিক করেছে। এই ক’দিনেই ধনুষ অবিনকে বেশ চিনে ফেলেছে। লোকটা পাহাড়ে আসে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

আসলে অর্জুন কা কুর্সির ঠিক আগের পাহাড়ের একটা ঢালে গতকাল যখন ওরা তাঁবু খাটিয়েছিল, তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঠাণ্ডায় কাবু হয়ে দ্রুত খাওয়া সেরে ওরা দু’জনেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আজ ভোরবেলা যখন ধনুষের ডাকে অবিনের ঘুম ভাঙল, তখন সূর্যের নরম আলোয় প্রকৃতির অপরূপ শোভা দেখে ওর আর এই জায়গা থেকে নড়তে মন চাইল না। ধনুষও আর জোরাজুরি করেনি। কারণ, দীনেশ ভাইয়া তাকে পই পই করে বলে দিয়েছে অবিন সেনের মর্জিমতো চলতে।

তাঁবু থেকে বেরিয়ে পাহাড়ের উত্তরের ঢালের দিকে কিছুটা এগোতেই অবিনের ফোনে টাওয়ার চলে এল। গতকাল টাওয়ার না থাকায় ও বাড়িতে যোগাযোগ করতে পারেনি। অবিন আর দেরি করল না। ফোন করল বাড়িতে।

কিন্তু একটুখানি কথা বলার পরেই আবার সেই সিগন্যালের সমস্যা। তবে এটুকু জেনে সে আশ্বস্ত হয়েছে যে বাড়ির সবাই সুস্থ আছে। বেরোনোর দিন মায়ের জ্বর দেখে এসেছিল। তাই চিন্তা তো হয়ই। মা এখন একেবারে সুস্থ।

তবে স্ত্রী সুতপার কাছ থেকে অবিন আরও দুটো তথ্য পেয়েছে। দিবাকর ফের এসেছিল। তাকে সুতপা, যেমনটা বলা হয়েছিল সেভাবে বলে দিয়েছে। আশ্চর্য হল, শিশির ঠাকুরও নাকি বাড়িতে ফোন করেছিলেন। কিন্তু সে-সম্পর্কে আরও বিশদে জানার আগেই ফোনটা কেটে গেল। আবার টাওয়ার উধাও।

শিশির ঠাকুরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা তো অবিন বহুদিন ধরেই করছে। ভদ্রলোক এমন সময় ফোন করলেন যখন ও বাড়ি নেই। নিশ্চয়ই পুঁথিটার ব্যাপারেই।

কিন্তু এতদিন বাদে হঠাৎ শিশিরবাবুর ঐ পুঁথিটার কথা মনে হল কেন? আর দিবাকর নামের ঐ সাংবাদিক ছেলেটাই বা আসলে কার লোক? কেন হোলির দিন বিকেলে তাকে তাড়াহুড়ো করে পুঁথিটা সহ বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে সুবলবাবু…

এসব ভাবতে ভাবতে অমন নয়নাভিরাম পরিবেশের মধ্যেও অবিনের মনটা হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠল। আর ঠিক সেই সময়েই দক্ষিণের একটা উঁচু পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে ধনুষ বলে উঠল, “দাদা, আপনি কাল বলছিলেন না, এই ট্রেক রুটে আর কোনও ট্রেকার নেই! ওই দেখুন, একজন ইয়া লম্বা সাহেব এদিকেই আসছে। সঙ্গে একজন গাইড আর পোর্টার। ওরাও মনে হয় সহস্রতালই যাবে।”

দুই
উত্তরকাশী। দীনেশ ও সোহেল

ফুলের মালায় ঢাকা গণেশজি আর লছমীজির ছোট্ট ছোট্ট মূর্তি বসানো আছে দেওয়ালে ঝোলানো কাঠের সিংহাসনে। প্রথমে জ্বলন্ত দীপ আর পরে জ্বলন্ত ধূপ নিয়ে সিংহাসনের সামনে বনবন করে হাত ঘোরাতে লাগল দীনেশ। দশটায় অফিস খোলার পর বাই এসে ঝেড়ে-মুছে দিয়ে যায়।

বাই কাজ সেরে বের হয়ে যাওয়ার পর দেবতার আরতি চড়ানো দীনেশের নিত্যকর্ম। সিংহাসনের সামনেই ছোট্ট প্রদীপ আর ধূপদানিতে ধূপ গুঁজে সে শুরু করল মন্ত্রোচ্চারণ। কান আর কপাল ছুঁয়ে চলতে লাগল তার দু’হাতের অবিশ্রান্ত নমস্কারের পালা।

উত্তরকাশীর উনিয়াল ট্যুরস অ্যান্ড ট্র্যাভেলসের স্বত্বাধিকারী দীনেশ উনিয়াল পুজো সেরে কাচের দরজা খুলে বাইরে এল। সূর্যের দিকে মিটমিট চোখে তাকিয়ে তিনবার ঝুঁকে নমস্কার করে হাঁক দিল, “ওয় ছোটে, এক চায় লা ফটাফট।”

বেড়াতে আসা লোকেদের সঙ্গে, ট্রেকার আর অভিযাত্রীদের সঙ্গে দীনেশের ব্যাবসা। সে এই উত্তরকাশী থেকে নানান জায়গায় ট্যুর প্রোগ্রাম বানিয়ে দেয়। হোটেল বুকিং করে দেয়। গাড়ি ঠিক করে দেয়। যারা ট্রেক করতে আসে তাদের গাইড থেকে শুরু করে পারমিট সব সে ম্যানেজ করে দেয়। ডে-ট্যুরিস্টরা সকাল সকাল বেড়াতে যায়, ফেরে সন্ধে নাগাদ। ওই সময়টায় তার ব্যস্ততা বাড়ে। অজস্র ফোন কল, আর পরের দিনের নানান বুকিং করতে করতে তখন সে দম ফেলার সময়ও পায় না। চলে সেই রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত। এই সকালের সময়টা চাপ কম।

মোটর সাইকেলের চেনা ঢিগঢিগ ঢিগঢিগ আওয়াজটা কানে আসতে দীনেশ বাঁদিকে তাকাল। আজাদ ময়দানের পাশের রাস্তা ধরে বাইকটা আসছে। ইন্সপেক্টর সোহেল দাওয়াস। এক-দু’দিন অন্তর এই সময়েই আসেন দীনেশের কাছে। সোহেলজিকে বেশ ভালোই লাগে দীনেশের। পুলিশ মানেই মনে যে একটা ভয় আর দুশ্চিন্তার উদয় হয়, সোহেলজি তেমন নন। বেশ ফ্রেন্ডলি।

দীনেশ গলা চড়িয়ে আবার হাঁক দিল,“ওয় ছোটে, দো চায় লানা।”

দীনেশের দোকানের সামনে বাইকটা দাঁড় করিয়ে সোহেলজি নেমে দাঁড়ালেন। হাতে হেলমেট নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী খবর, দীনেশ ভাই? সব ঠিকঠাক?”

একগাল  হেসে  দীনেশ  বলল, “হাঁ জি, হাঁ জি স্যরজি,  আপনার কৃপায় সব ঠিকঠাক। আসুন, আসুন স্যরজি।”

সোহেলজি দোকানে ঢুকে চেয়ারে বসতে দীনেশ ট্যুরিস্ট রেজিস্টার খুলে এগিয়ে দিল সামনে।

আজকাল দিনকাল মোটেই সুবিধের নয়। ট্যুরিস্টরা সবাই ট্যুরিস্ট কি না সেদিকে লক্ষ রাখতে হচ্ছে প্রশাসনকে। কার মনে কী আছে চট করে বোঝা না গেলেও তাদের নামঠিকানা, পরিচয়পত্র দেখে কিছুটা আন্দাজ পাওয়া যায়।

রেজিস্টারের শেষ চার পাতা খুলে ধরে দীনেশ বলল, “আপনি লাস্ট আসার পর গত তিনদিনে এই সাতাশ জন ট্যুরিস্ট আমার কাছে এসেছে, স্যরজি। অধিকাংশই গঙ্গোত্রী, কেউ কেউ গোমুখভি, আর বাকিরা যমুনোত্রী গঙ্গোত্রী দুটোই। চারটে দল আছে। দুটো ফ্যামিলি আছে, চারধাম যাচ্ছে।”

সকলের নামঠিকানার ওপর চোখ বুলিয়ে সোহেলজির তেমন সন্দেহজনক কিছু মনে হল না। রেজিস্টার ঠেলে দিলেন দীনেশের দিকে। তারপর পা ছড়িয়ে আরাম করে চেয়ারে বসে বললেন, “হুঁ। মনে হচ্ছে সব ঠিকই আছে। এ ছাড়া ট্রেকিং পার্টি কেউ নেই?”

“ট্রেকিং পার্টি তো…” দীনেশের কথার মধ্যে ছোটে দুটো চা নিয়ে ঢুকল। সোহেলজির হাতে চা দিতে দিতে দীনেশ বলল, “ট্রেকিং পার্টি দুটো। একজন অবিনবাবু। অন্যজন…”

“দাঁড়াও দাঁড়াও। অবিন সেন এসে গেছেন? তা এবার কোনদিকে?”

“জানেনই তো, স্যরজি। আপনার সঙ্গে তো ভালো আলাপ। ক্ষ্যাপা মানুষ। কোনও ঠিকঠিকানা নেই।”

“হুম। তা জানি। পঢ়ালিখা আদমি। বিজনেস করে খায়। এমনিতে লোক ভালো। গতবার তো আমার কোয়ার্টারেও গেছিল ফেরার পথে। ছেলেমেয়েদুটোকে কীসব গল্প বলে মোহিত করে দিয়ে গেছে। তা এবারে কোনদিকে যাবে কোনও আন্দাজ দিল?”

“বলল তো উপস্থিত কিয়ার্কিখালের দিকে এগোবার ইচ্ছে অর্জুন কা কুর্সি হয়ে। তারপর…”

“হুম। আর অন্যজন?”

“কাল সন্ধেবেলা এসেছে। সেও একই জায়গায় ট্রেকিংয়ে যাবে। আমার কাছে এসেছে সব ব্যবস্থা করে দেবার জন্যে।”

“একই জায়গায় যাবে মানে? কিয়ার্কিখাল কি ট্যুরিস্ট স্পট হয়ে গেল নাকি হে? লোকটা কে?”

“দিবাকর স্যরজি, দিবাকর রায়। কলকাতার পত্রকার।”

“রিপোর্টার? কলকাতার কাগজের? কলকাতা ছেড়ে হঠাৎ পাহাড়ে ট্রেক করতে যাচ্ছে? ওখানে আবার কোন ব্রেকিং নিউজ আছে, ভাই?” চোখ ছোটো করে দীনেশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন সোহেলজি।

দীনেশের কাছে এই প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই। সে কাঁধ ঝাঁকাল। বলল, “তা তো জানি না স্যরজি, তবে বলল অবিন সেনের সঙ্গে খুব জরুরি দরকার।”

“অবিন সেনের সঙ্গে দরকার! সেইজন্য কলকাতা ছেড়ে এদ্দুর কিয়ার্কিখালের দিকে এসে ধাওয়া করেছে?” সোহেলজি একটু অন্যমনস্কভাবে কেটে কেটে কথাগুলো বললেন। “কিন্তু অবিন সেন তো আর এখানে থাকতে আসেননি! ক’দিন পরেই তো কলকাতায় নেমে যাবেন। এত কী জরুরি কাজ দীনেশ, যার জন্যে ট্রেক করতে হয়?”

“আরও একটা খবর আছে, স্যরজি। অবিন সেনের সঙ্গে গাইড হিসেবে যে আমার ছেলেটিকে পাঠিয়েছি, ধনুষ, সে একটু আগেই ফোন করেছিল। ওখানে একজন ফরেনারেরও আমদানি হয়েছে!”

“ফরেনার?”

“হাঁ জি হাঁ জি, স্যর। বলল জার্মান। মুলার না কী নাম যেন।”

“কোথায় যাচ্ছে লোকগুলো? একজন ফরেনার, একজন বাঙালি?”

“ধনুষ যা বলল, ওরা সহস্রতালের দিকে এগোচ্ছে।”

“আর এখন আরেক বাঙালি চলেছে অবিনবাবুর সঙ্গে জরুরি দেখা করতে! কুছ তো গড়বড় হ্যায়, দীনেশ। তা এই দিবাকর রায় কবে রওনা হচ্ছে?”

“ওরা যে রুটে গেছে, সে রুটে তেমন তো কেউ যায় না, তাই ভালো গাইড যোগাড় করতে পারিনি। না হলে আজই রওনা হয়ে যেত। চেষ্টায় আছি। দেখি, কাল ভোরে হয়তো রওনা করতে পারব।”

“গুড। ফাইন্যাল করার আগে আমাকে একটু খবর দিও। আর আমাকে না জানিয়ে দিবাকর যেন রওনা না হয়। দরকার পড়লে আমি নিজেও গাইড হয়ে যেতে পারি!” সোহেলজি একটু কড়া স্বরেই দীনেশকে বললেন।

দীনেশ একটু অবাক হয়েই বলল, “রওনা হবে না, স্যরজি।”

“ভেরি গুড ।  এখন চলি।” দোকান  থেকে  বেরিয়ে  বাইকে  স্টার্ট দিলেন সোহেলজি। আওয়াজ উঠল ঢিগ ঢিগ ঢিগ ঢিগ…

তিন
অবিন ও মুলার

প্রথম আলাপে অবিন কলকাতায় থাকে শুনেই ডঃ মুলার বললেন, “আপনি তাহা হইলে বাঙালি আছেন?”

খুব অবাক হয়ে অবিন প্রথমে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ডঃ মুলারের দিকে। তারপর হো হো করে হাসতে হাসতে বলল, “হ্যাঁ, আপনি ঠিক ধরেছেন, আমি বাঙালি। কিন্তু আপনি জার্মান মুলুকে থেকেও এমন বঙ্কিমি বাংলা কীভাবে শিখলেন?”

এতক্ষণ ডঃ মুলারের চোখে আর ঠোঁটের কোনায় হালকা হাসির ছোঁয়া ছিল। অবিনের কথায় কিছুটা কৌতূহলী হয়ে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “হোয়াট ইজ ব্যানকিমি বাংলা?”

অবিন হাসতে হাসতেই বলল, “বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জি – বাংলা সাহিত্যে যাঁকে পায়োনিয়ার বলে মানা হয়, তিনি যে ভাষায় লিখতেন তাকে বঙ্কিমি বাংলা বলা হয়। ওই ভাষার এখন আর তেমন চল নেই।”

“আই সি। আমি বঙ্কিম চ্যাটার্জি পড়িয়াছি। কপালকুণ্ডলা, দেবী চৌধুরানি, দুর্গেশনন্দিনী, আনন্দমঠ…”

অবিন কিছু বলতে পারল না। জার্মান এই ভদ্রলোক বঙ্কিম চাটুয্যের যে যে বইগুলোর নাম বলল, তারপর আর কথা চলে না। প্রথম দেখায় অবিনের মনে হয়েছিল, এই জার্মান সায়েব উটকো সায়েবদের মতোই নিছক একজন ট্যুরিস্ট। যারা আজও বিশ্বাস করে, ভারত হিন্দু সাধুদের দেশ, তারা নানারকম ইয়োগা করে, জাদু দেখায়, অদ্ভুত অদ্ভুত মিরাকলে বিশ্বাস করে! তবে এবার অবিন বুঝতে পারছিল, ডঃ মুলার সেই গোত্রের সায়েব নন।

একটু অবাক  হয়েই সে  জিজ্ঞেস  করল, “কিন্তু  আপনি   এতকিছু শিখলেন কী করে?”

ডঃ মুলার মুচকি হেসে বললেন, “আমি ইন্ডোলজি বিষয়ে দীর্ঘদিন পড়াশুনা করেছি। গবেষণা করেছি। প্রথমদিকে সংস্কৃত বিষয়েই প্রাধান্য দিয়েছিলাম, পরবর্তীকালে আপনাদের টাগোরের লেখা গীতাঞ্জলির ইংলিশ ট্রান্সলেশন পড়ে বাংলাভাষা সম্বন্ধে কৌতূহল হয়। তারপর বাংলা বিষয়েও সামান্য কিছু চর্চা করেছি।”

অবিন ডঃ মুলারের কথায় বেশ মুগ্ধই হল। ডঃ মুলার বললেন বটে সামান্য চর্চা, কিন্তু সেটা যে বিনয় সে-বিষয়ে অবিনের সন্দেহ রইল না। সে একটু শ্রদ্ধা নিয়েই জিজ্ঞেস করল, “আপনার এই ভারতভ্রমণের উদ্দেশ্য কি শুধুই ভ্রমণ? নাকি গবেষণার জন্য বিশেষ কোনও উপাদান সংগ্রহের প্রয়াস?”

ডঃ মুলার হাসলেন। “ওয়েল, ওই প্রকারের কিছু তো বটেই! ভারতভ্রমণে এলে সকলে তাজমহল, স্বর্ণমন্দির, রাজস্থানের দুর্গ এগুলিই দেখতে যায়। সেসব ছেড়ে আমি এই পর্বতে কী করছি, এই কৌতূহল আপনার মনে আসাই স্বাভাবিক।”

ডঃ মুলার পরিষ্কার করে বললেন না কেন তিনি এ অঞ্চলে এসেছেন। অবিন আশ্চর্য হল না, কারণ তার সঙ্গে ডঃ মুলারের এমন কিছু ঘনিষ্ঠ পরিচয় এখনও হয়নি যাতে মন খুলে সবকথা বলে দেওয়া যায়।

ডঃ মুলারের ভারতচর্চা কতটা গভীর সেটা পরীক্ষা করার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল অবিনের। তবে সে-মুহূর্তে একটা সংস্কৃত পুঁথির নামই তার মাথায় আসছে। খানিক ইতস্তত করে সে খুব হালকা স্বরে জিজ্ঞেস করল, “সদুক্তিকর্ণামৃত নামে কোনও সংস্কৃত গ্রন্থের নাম কি আপনি শুনেছেন?”

মুলার হেসে বললেন, “শুনেছি। তবে এই গ্রন্থের নাম আপনি কী করে জানলেন?”

“আমার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন শ্রীযুক্ত পরিতোষ ঠাকুর। খুবই পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি সদুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থটির বাংলায় অনুবাদ শুরু করেছিলেন। আমার বাবার পুরাতন সংগ্রহে সেই অনুবাদের অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি আমি দেখেছি।”

নামটা কানে যেতেই হঠাৎ মুলারের শরীরটা শক্ত হয়ে উঠল যেন এক মুহূর্তের জন্য। উত্তেজিত গলায় বললেন, “পরিতোষ ঠাকুর আপনার পিতার বন্ধু ছিলেন? আশ্চর্য! আপনার পিতার সঙ্গে আমি যত শীঘ্র সম্ভব সাক্ষাৎ করতে চাই।”

অবিন ম্লান হেসে বলল, “আমার পিতাও দীর্ঘদিন দেহরক্ষা করেছেন। কিন্তু আপনি পরিতোষ ঠাকুরকে…”

তার কথার জবাব না দিয়ে মুলার হঠাৎ বললেন, “পরিতোষ ঠাকুরের কোনও বংশধরের সঙ্গে আমার যোগাযোগ করিয়ে দেয়া কি সম্ভব?”

“তা হয়তো পারি, কিন্তু সেক্ষেত্রে আপনাকে আমাদের কলকাতার বাড়িতে আসতে হবে।”

“আপনার সম্মতি পেলে আমি অবশ্যই যাব।”

একটু থেমে চিন্তিত মুখে ডঃ মুলার আবার বললেন, “আসলে ওই গ্রন্থের সঙ্গে অধুনা বিস্মৃত এক আশ্চর্য বিদ্যার কিঞ্চিৎ সংযোগ থাকলেও থাকতে পারে। তারই সন্ধানে আমার এ-দেশে আসা।”

অবিন হঠাৎ সাহেবের দিকে মুখ ঘোরাল। বঙ্গলিপি খাতাটার এককোণে লেখা লাইনগুলো মনে পড়ে গেছে তার – ‘সদুক্তিকর্ণামৃতঃ অষ্টদেব। প্রতিস্মৃতিবিদ্যাঃ অষ্ট অমর! সম্পর্ক? কেন?’

“প্রতিস্মৃতিবিদ্যা?”

“Nicht zu fassen, von Jove! আপনি এটাও জানেন? অবিশ্বাস্য। আপনি ওই গ্রন্থ পড়েছেন?” সাহেব প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন।

অবিন বলল, “না, স্যার। ওইসব গ্রন্থ পড়ার সাধ্যও আমার নেই। কারণ, সংস্কৃত আমি জানি না। পরিতোষ ঠাকুরের পাণ্ডুলিপি এবং সেই সংক্রান্ত কিছু লেখার মধ্যে প্রতিস্মৃতিবিদ্যার উল্লেখ পেয়েছি, তাই বললাম। আপনি হয়তো জানতে পারেন।”

ডঃ মুলার অবিনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত স্বরে বললেন, “দুটো পুঁথির মধ্যে যোগাযোগ একটা আছে বৈকি। সদুক্তিকর্ণামৃত আমি পড়েছি, তবে ইংরেজি অনুবাদ। গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন বাঙালি কবি শ্রীধরদাস। মোটামুটি ১২০৫ এডিতে। তখন বাংলার রাজা ছিলেন লক্ষ্মণসেন। লক্ষ্মণসেনের নাম শুনেছেন তো?”

“আজ্ঞে, হ্যাঁ। বাংলার সেনবংশ। দক্ষিণ ভারতের লোক ছিলেন।” অবিন তাড়াতাড়ি বলল।

“সেটাই প্রচলিত ধারণা। তবে এদের উৎস নিয়ে একটা বিকল্প ধারণাও আছে। এই নিয়ে একটা ইন্টারেস্টিং কথা বলি। বাংলার এই সেনবংশের সঙ্গে গাড়োয়ালের গভীর সম্পর্ক আছে, তা জানেন কি?”

“সেন রাজারা গাড়োয়ালে এসেছিলেন!” অবিন খুব আশ্চর্য হয়ে বলল।

ডঃ মুলার মৃদু হেসে বললেন, “বখতিয়ার খিলজির আক্রমণের পর সেন রাজারা তাঁদের রাজধানী নবদ্বীপ ছেড়ে পূর্বদিকে সমতট এবং বিক্রমপুরের দিকে চলে যান। এর কিছুকাল পরে সেনবংশের এক বংশধর রূপসেন উত্তরপশ্চিম ভারতের রোপারে চলে যান ভাগ্যের সন্ধানে।”

“রোপার? মানে, পাঞ্জাব?”

“হুঁ, পাঞ্জাব। যদিও কোনও স্পষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় না, কিন্তু শোনা যায়, পুত্রদের এ অঞ্চলের তিনটে ছোটো রাজ্যের রাজা বানিয়ে রোপার থেকে রূপসেন এক বিরাট বাহিনী নিয়ে গাড়োয়াল হিমালয়ের ভেতরে চলে যান। তাঁর আর কোনও খবর পাওয়া যায়নি।”

“কিন্তু এর সঙ্গে প্রতিস্মৃতিবিদ্যার…”

“সেই কথায় এবার আসছি। সেন রাজাদের বংশের ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন মত আছে। এমার্সন, হাওয়েল ও ব্ল্যাকের সংগৃহীত মান্ডির ইতিহাস বলে, এঁরা নিজেদের চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয় ও পাণ্ডবদের বংশধর বলে দাবি করতেন। ১৭০০ বছর ইন্দ্রপ্রস্থে রাজত্ব করবার পর ওই বংশের শেষ রাজা খেমরাজ নাকি রাজ্য হারিয়ে বাংলায় সেনবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।”

“বেশ গোলমেলে আর ধোঁয়াটে ব্যাপার তো!”

“হোয়াট ইজ দ্যাট?”

অবিন একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “গোলমেলে মানে কনফিউজিং, আর ধোঁয়াটে মানে অবসকিয়োর।”

ডঃ মুলার তাঁর ডায়েরি খুলে শব্দদুটো লিখে নিলেন। বেশ কয়েকবার উচ্চারণও করলেন, “গোলমেল্যে, ঢোঁয়াট্যে”। তারপর হাসতে হাসতে ডঃ মুলার ডানহাতের বুড়ো আঙুল তুলে থাম্বস আপ করে বললেন, “নতুন দুটি শব্দ শিখলাম। থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ।”

অবিনও হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু আসল ব্যাপারটা গুলিয়ে যাচ্ছে যে! সেন রাজা, সদুক্তিকর্ণামৃত আর প্রতিস্মৃতিবিদ্যা এই তিনের মধ্যে যোগসূত্রটা কোথায়?”

“সম্পর্ক একটা আছে, মাই ডিয়ার। এক এক করে বলি। প্রতিস্মৃতিবিদ্যা বিষয়ে আমার সামান্য পড়াশোনা আছে। সেখানে কোনও আটজন সর্বশক্তিমানের সামান্য আভাস পেয়েছি আমি, যাঁদের পথে সাধনা করলে শুধু দৈবাস্ত্র নয়, তার চাইতেও বহুগুণ ঐশ্বর্যের সন্ধান মেলে। অন্যদিকে সেনদের সদুক্তিকর্ণামৃতের দেবপর্বেও রহস্যময় কোনও অষ্টমূর্তির গাথা সংকলিত হয়েছে।

“এঁদের কথা ভারতবর্ষে অনেকেরই জানা ছিল। হাজার বছরের ব্যবধানে কালিদাস থেকে শুরু করে সেনযুগের কবি চিত্তপের রচিত শ্লোকগুলো থেকে খুঁজে খুঁজে তাকে একত্র করা হয়েছিল এই পুঁথির দেবপ্রবাহ নামের অংশের একটা পরিচ্ছেদে। রাজাদেশে রচিত পুঁথি। সংকলন করেছিলেন মন্ত্রীপুত্র শ্রীধরদাস। ধরে নেয়া যায়, রাজার ইচ্ছেতেই তা হয়েছিল এবং তা হয়েছিল লক্ষ্মণসেনের আমলে, যখন সেনদের ভাগ্যে অন্ধকারের সূচনা হয়েছে। কেন?”

মুলারের দেয়া সুতোগুলো একটা নকশা তৈরি করছিল অবিনের চোখের সামনে। যোগসূত্রটা পরিতোষবাবুও অনুমান করেছিলেন তাহলে! সেনরা নিজেদের পাণ্ডবের বংশধর মনে করত! পাণ্ডবদের প্রতিস্মৃতিবিদ্যায় অধিকার ছিল। তাহলে কি ইতিহাস ঘেঁটে সেই বিদ্যার সামান্যতম চিহ্নগুলো খুঁজে বের করে একত্র করবার কাজে নেমেছিলেন দুর্ভাগ্যতাড়িত লক্ষ্মণসেন? সদুক্তিকর্ণামৃতের দেবপ্রবাহ অংশটা কি তাহলে সেই চেষ্টারই ফল?

তিনি তার পরিণতি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তাঁর বংশধর রূপসেন এইখানে এসে সসৈন্যে গাড়োয়াল হিমালয়ের ভেতরে অদৃশ্য হন!

“ওয়েল ওয়েল, ডিয়ার। ইণ্ডিয়া ইজ আ ল্যান্ড অব সাইকাডেলিক মিথস।” হঠাৎ মুলারের গলার শব্দে চমক ভাঙল অবিনের। তার দিকে চোখ রেখে হাসছিলেন তিনি। “কিন্তু আমার মনে হয় এখন আমাদের ডিনার করিয়া লওয়া উচিত।”

ডঃ মুলারের কথায় অবিনের খেয়াল হল, এদিকটা সে প্রায় ভুলতেই বসেছিল। ঠিক কথা। কাল ভোরে বেরোতে হলে আর দেরি করার মানে হয় না। আজ আবার সে ডঃ মুলারকে ডিনারে নেমন্তন্ন করেছে।

অবিন ধনুষকে ডাকল, “ধনুষ ভাই, ডিনার রেডি?”

ক্যাম্পের ওধার থেকে ধনুষ উত্তর দিল, “হাঁ জি স্যরজি, অভি লায়া।”

চার
সোহেল ও প্রফেসর দীক্ষিত। উত্তরকাশী

উত্তরকাশী শহরের চৌহদ্দি থেকে একটু বাইরে দীক্ষিতস্যারের নিরিবিলি এই বাড়িতে এলে সোহেলজি যেন অন্য জগতে পৌঁছে যান। বিঠলদাস দীক্ষিত বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ছিলেন। বছর সাতেক হল অবসর নিয়ে নিজের বাড়িতেই থাকেন। ছেলেমেয়ে দু’জনেই দেশের বাইরে। নির্বিবাদী সৌম্য পণ্ডিত মানুষটি পড়াশুনো আর পুজো-টুজো নিয়েই সময় কাটান।

বেলা পড়ে আসার সময় সোহেলজি তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দেখলেন, দীক্ষিতস্যার বাগানে বসে আছেন। রোদ্দুরের দিকে পিঠ, হাতে একটা মোটা বই নিয়ে পড়ছেন। পায়ের শব্দ পেয়ে মুখ ফিরিয়ে তাকালেন। চশমার ওপর হাতের আড়ালে রোদ্দুর সামলে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন, “আরে, সোহেল যে! কী ব্যাপার? আমার বাড়িতে পুলিশের হানা? কিছু গড়বড় করে ফেললাম নাকি?”

সোহেলজি পা ছুঁয়ে দীক্ষিতস্যারকে প্রণাম করে বললেন, “এখন আমি পুলিশ নই স্যরজি, আপনার ভক্ত ছাত্র। কেমন আছেন, স্যরজি? সব কুশল-মঙ্গল?”

“হাঁ, ব্যস সব ঠিকঠাকই চলছে। তোমার খবর-টবর সব ঠিকঠাক?”

“হাঁ জি স্যরজি, সব ঠিকঠাক।”

“কী কথা আছে বলো। নিশ্চয়ই কিছু জানতে এসেছ?”

“হাঁ জি স্যরজি, কয়েকটা ব্যাপারে কিছু জানকারি চাই, তাই আপনার শরণাপন্ন হলাম।”

“বলো, যদি জানা থাকে নিশ্চয়ই বলব।”

“স্যরজি, একটা কিতাব নিয়ে প্রশ্ন ছিল। আপনি প্রতিস্মৃতিবিদ্যার নাম শুনেছেন?”

দীক্ষিতজি কিছুক্ষণ সোহেলজির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন চুপ করে। তারপর বললেন, “ক্রাইম-টাইম ছেড়ে হঠাৎ মিথোলজি নিয়ে মাতলে যে বড়ো?”

“একটু দরকার ছিল, স্যার। অফিসেরই কাজের ব্যাপারে। যদি একটু গাইড করেন।”

ভুরুদুটো কুঁচকে একটু ভেবে নিলেন প্রফেসর দীক্ষিত। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, “এর মূল উৎস ইতিহাসের গর্ভে হারিয়ে গেছে বলেই বোধ হয়। প্রবাদে বলে, ইতিহাসের যুগে একে লিপিবদ্ধ করেছিলেন কাশ্মীর অঞ্চলের মহাসাধক, পণ্ডিত রুদ্রট। তবে এর বিষয়ে জানতে গেলে তোমাকে মহাভারতের একটা পর্বের কাহিনী শুনতে হবে, সোহেল। আমি সংক্ষেপে বলছি শোনো।”

ঘন্টা খানেক বাদে যখন তাঁর কথা শেষ হল তখন সোহেলজির মুখে একসঙ্গে অনেকগুলো ভাব খেলা করে যাচ্ছে। তিনি একটু অবাক হয়ে বললেন, “কিন্তু অর্জুন তাহলে এই অঞ্চলেই তাঁর তপস্যা…”

“হ্যাঁ হে। এখানকার জনশ্রুতি নিয়ে দীর্ঘকালের গবেষণা আমার। তা থেকে আরও একটা থিওরি আমার আছে। একেবারেই নিজস্ব অবশ্য। মহাপ্রস্থানের যাত্রাটাও আমার মতে ওই অর্জুন কা কুর্সি ছাড়িয়ে লম্বা পথ পেরিয়ে…”

“কী আশ্চর্য কো-ইনসিডেন্স! এই লোকগুলোও তো ওদিকেই…”

অবাক হয়ে দীক্ষিতজি বললেন, “কারা আবার ওদিকে যাচ্ছে?”

“স্যরজি, আজ সকালে খবর পেলাম একজন বাঙালি, আর একজন জার্মান অলরেডি ওই জায়গার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। খবর পেয়েছি, দু’জনে একসঙ্গেই রয়েছে এবং ওইদিকে ট্রেক করছে। তার ওপর কাল বিকেলে কলকাতা থেকে আরেকজন বাঙালি এখানে এসেছে। সেও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওই জায়গাতেই যেতে চায়। দেখা করতে চায় ওই বাঙালির সঙ্গে।”

কিছুক্ষণ চিন্তা করে দীক্ষিতজি একটু ঠাট্টার সুরে বললেন, “তোমার কি মনে হচ্ছে ওখানে সোনার খনি-টনির সন্ধান পেয়েছে? নাকি মহাপ্রস্থানের পথটা নিয়ে নতুন করে কোনও পিলগ্রিম রুট…”

সোহেলজি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “না মানে, ইয়ে, ঠিক তা নয়। তবে…”

দীক্ষিতজি কিছু একটা চিন্তা করতে করতে বললেন, “তুমি তো ওদিককারই ছেলে, না? উত্তর গাড়োয়ালের ওইদিকে বেশ কিছু পৌরাণিক আর ঐতিহাসিক স্পট আছে। হয়তো সেজন্যই…”

“আপনি কি  অর্জুন  কা  কুর্সি  বা  পৌরাণিক  কাম্যকবনের  কথা বলছেন, স্যরজি?”

“নিশ্চয়ই। তাছাড়া জখোলের দুর্যোধন মন্দির, কিংবা নেতওয়ারের

করণ মন্দিরের কথাও ভুলে যেও না।”

দীক্ষিতজির মুখের দিকে গম্ভীরভাবে তাকিয়ে থেকে সোহেলজি বললেন, “আই সি। কিন্তু কাল বিকেলে যে বাঙালি ভদ্রলোক এসেছে, সে নাকি বেঙ্গলি কোন পত্রিকার সাংবাদিক। সে খুব তাড়াতাড়ি ওই জায়গায় পৌঁছতে চাইছে শুধু আরেক ট্রেকারকে ধরবার জন্য। কেন? কোনও বিশেষ সংবাদ কভার করতে চায়? কী সেই সংবাদ? এতদিন পর কোন নতুন উপাখ্যান পেয়ে গেল ওই লোকগুলো?”

দীক্ষিতজি হাসলেন। “তোমরা পুলিশেরা খুব সন্দেহবাতিক হও। সবকিছুর মধ্যেই ক্রাইম খুঁজে পাও, না?”

একটু লজ্জা পেয়ে সোহেলজি বললেন, “না স্যরজি, তা নয়। তবে যা দিনকাল পড়েছে, কাউকেই ভরসা করা যাচ্ছে না। চারদিকে এত টেররিজম, প্রাচীন মূর্তি স্মাগলিং, ড্রাগ সাপ্লাই! আমাদের পেশাটা দিন-কে-দিন যত জটিল হয়ে উঠছে, ততই সন্দেহ বাড়ছে।”

ঝকঝকে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন দীক্ষিতজি। “তা ঠিক। মানুষ যত উন্নত হচ্ছে, ততই বাড়ছে অবিশ্বাস। তা এখন কী করবে, সোহেল?”

“আমি নিজেই যাব, স্যরজি। এই নতুন বাঙালি ভদ্রলোকের গাইড সেজে। সন্দেহ যখন হচ্ছে, মিটিয়ে নেওয়াই ভালো। ক’দিন ঘুরে আসাও হবে ওদিকটা। চাকরির জ্বালায় অনেকদিন যাওয়াও হয়নি ওসব ভেতরকার অঞ্চলে। কিছু না ঘটলে বড়োজোর কয়েকটা ছুটি কাটা যাবে এই যা।”

“কেন? অফিশিয়ালি যেতে পার না?”

“না স্যরজি, ও জায়গাটা আমাদের এরিয়ায় নয়। অফিসিয়ালি কিছু করতে হলে লোকাল থানায় জানাতে হবে। এখন ব্যাপারটা যে অবস্থায় রয়েছে তাতে লোক জানাজানি করলে ডিপার্টমেন্ট হাসবে।”

দীক্ষিতজি চিন্তিত মুখে বললেন, “ইউ আর সো সিরিয়াস!”

সোহেলজি মৃদু হাসলেন। কোনও উত্তর দিলেন না। দীক্ষিতজিকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “আজ চলি, স্যরজি। ঘুরে এসে আপনাকে জানাব, কী হল।”

“আপনা খয়াল রখনা, বেটা।” দীক্ষিতজি  আশীর্বাদের ভঙ্গীতে হাত তুললেন। একটা জিনিস তাঁর কাছে ততক্ষণে পরিষ্কার। সোহেল তাঁকে সবকথা খুলে বলেনি। পেটে কিছু কথা রেখে দিয়েছে।  অবশ্য  পুলিশের ব্যাপার। নিজের  ডানহাতের  কথাও  তারা  বাঁহাতকে  পুরো  বলবে না।

দীক্ষিতজি সে নিয়ে আর মাথা ঘামালেন না বিশেষ।

দীক্ষিতস্যারের বাড়ি থেকে বেরিয়েই দীনেশের নম্বরে ফোন করলেন সোহেল দাওয়াস।

দ্বাদশ অধ্যায়
১৪ মার্চ, ২০১৫

“আমার অনুমানও ঠিক তুমি যা বলছে সেটাই অবিন। সম্ভবত রূপসেন প্রতিস্মৃতিবিদ্যা নিয়ে কিছু চেষ্টা করবার জন্যই এই এলাকায় এসে ঢুকেছিল। সদুক্তিকর্ণামৃততে খুঁজেপেতে জোগাড় করা প্রতিস্মৃতিবিদ্যার ঐ টুকরো-টাকরা যা একত্র করা হয়েছিল, তারই ভিত্তিতে হয়তো আরও কিছু খোঁজখবর চালাবার পর তার এই অভিযান। তবে ফল তাতে কী হয়েছিল কারও জানা নেই। লোকটা আর ফেরেনি। আমার সন্দেহ…”

কথাগুলো বলতে বলতেই খাবারের থালা থেকে মুখ তুলে চাইলেন মুলার। আজ দুপুরে তাঁর তাঁবুতে অবিনের ফিরতি নিমন্ত্রণ। সকালে উঠে আজকের দিনটাও অবিন এইখানে থেকে যাবে শুনে তিনি নিজেও ঠিক করেছেন, দিনটা এখানে কাটিয়ে অবিনের সঙ্গেই সহস্রতালের দিকে এগোবেন।

দুপুরের খাবার খেতে খেতে অবিন তাঁকে তার আগেরদিন রাতের ভাবনাচিন্তাগুলো বলছিল। জবাবটা শুনে সে মুখ তুলে বলল,  “আপনি কি বলতে চাইছেন…”

“আমি যা বলতে চাইছি সেটা বলবার আগে প্রতিস্মৃতিবিদ্যা নিয়ে কিছু বলে নিই। মহাভারত থেকে এ-সম্বন্ধে যেটুকু জেনেছি তাতে আমার মনে হয়, এটি অত্যন্ত গোপন এবং জটিল এক বিদ্যার পাঠ। হাতে গোনা কিছু মহর্ষি, মুনিরা জানতেন। তাঁদের মধ্যে একজন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস।

“কৌরবপক্ষে তখন তিন অজেয় বীর। কর্ণ, পিতামহ ভীষ্ম আর আচার্য দ্রোণ। এঁদের বিরুদ্ধে পাণ্ডবদের জয় নিশ্চিত করিবার জন্য মহর্ষি ব্যাস এই বিদ্যা অর্জুনকেই শেখাতে এসেছিলেন। কিন্তু এই বিদ্যা ধারণ করার জন্য বিশেষ শম-দমের সাধন প্রয়োজন। অন্যকথায় বললে, নিবিড় মেন্টাল ট্রেনিং দরকার একে শিখে সঠিকভাবে প্রয়োগ করবার জন্য। সে মানসিক প্রস্তুতি যুধিষ্ঠিরের এমনিতেই ছিল। কিন্তু অর্জুন যুধিষ্ঠিরের থেকে অনেক বড়ো বীর হওয়া সত্ত্বেও ব্যাস দেখেছিলেন, মানসিকভাবে অর্জুন এই বিদ্যা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত নন। অতএব তিনি যুধিষ্ঠিরকে এই বিদ্যা শিখিয়ে দিয়ে ফিরে যান।

“যুধিষ্ঠির অর্জুনকে এই বিদ্যার উপযুক্ত হয়ে ওঠার সময় দিলেন। তারপর অর্জুনকে প্রতিস্মৃতিবিদ্যা দান করে তার প্রয়োগের জন্য নিজেকে তৈরি করবার পদ্ধতির কথা জানিয়ে একলা পাঠালেন নির্জন কাম্যকবনে। সেখানে কঠোর তপস্যা করে, সম্ভবত এই বিদ্যার প্রয়োগ করেই অর্জুন প্রথমে সাক্ষাৎ পেলেন কিরাতবেশি মহাদেবের। ভীষণ তাঁকে সন্তুষ্ট করে অর্জন করলেন পাশুপত আর অন্য কিছু অস্ত্র। শুধু তাই নয়, তিনি আশীর্বাদও করলেন, যেকোনও শত্রুর বিরুদ্ধে অর্জুন অজেয় হবেন।

“দেবভূমির দরজা খোলবার জন্য প্রতিস্মৃতিবিদ্যার প্রয়োগে অর্জুন ততদিনে দক্ষ। আর ওপর, ভগবান মহাদেব সন্তুষ্ট হওয়াতে অর্জুনের সে-দেশে ঢোকবার বিষয়ে দেবতাদেরও আর কোনো আপত্তি হয়নি। দেবরাজ ইন্দ্রই তো এমনকি নিজেকে অর্জুনের পিতা বলে ঘোষণা করেন। তিনিই তাঁকে স্বর্গে নিজের কাছে বেশ কয়েকমাস সঙ্গে রেখেছিলেন।”

“আপনি কি এসব বিশ্বাস করেন? মানে স্বর্গ, তাতে ঢোকবার জন্য প্রতিস্মৃতিবিদ্যার পাঠ, উপযুক্ত সাধনায় সে পাঠ নেবার জন্য নিজেকে তৈরি করে তোলা…”

ডঃ মুলার উত্তর দিতে একটু সময় নিলেন। “বিশ্বাস অবিশ্বাস এখানে অবান্তর। মহাভারতে এমন অজস্র ঘটনার কথা বলা আছে যেগুলো পড়লে মনে হয় নিছক ধর্মীয় বিশ্বাস আর সংস্কারের কথা। কিন্তু একটু চিন্তা করলে তার মধ্যে প্রচ্ছন্ন তত্ত্বের ইঙ্গিত মেলে। যেমন ধরুন, আপনি তো আধুনিক যুগের মানুষ! আপনি নিশ্চয়ই রিভলভার বা পিস্তল চালাতে জানেন!”

হাসতে হাসতে অবিন বলল, “ওরে বাবা, না না, আমি কোনও বন্দুকই চালাতে জানি না।”

ডঃ মুলারও হাসলেন। “ওক্কে ওক্কে। ধরে নিন, আপনি রিভলভার চালাতে জানেন। এবার আপনার হাতে হঠাৎ কালাশনিকভ অটোম্যাটিক রাইফেল তুলে দিয়ে যদি বলা হয় চালান, চালাতে পারবেন? অথবা অত্যাধুনিক নিউক্লিয়ার ওয়েপন তুলে দেওয়া হল। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ আর প্রস্তুতি ছাড়া রিভলভারের বিদ্যা নিয়ে আপনি পারবেন সেটা ব্যবহার করতে? পারবেন না।

“আর এই কারণেই অর্জুনের মতো দিকপাল বীরকেও প্রথমে দীর্ঘ তপশ্চর্যায় নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়ে তারপর প্রতিস্মৃতিবিদ্যার চর্চা করতে  হয়েছিল। কিরাতবেশী  মহাদেবের  সঙ্গে শক্তিপরীক্ষায়  নামতে হয়েছিল।”

ডঃ মুলার একটু থামলেন। তারপর আবার বললেন, “মহাভারতের কথা যুগ যুগ ধরে ভারতবর্ষের রাজা থেকে প্রজা সকলেই বিশ্বাস করে এসেছে, ভক্তি করে এসেছে। লাগাতার যুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত ভারতবর্ষের বহু রাজাই বিশ্বাস করতেন, প্রতিস্মৃতিবিদ্যাটি একবার শিখে ফেলতে পারলেই অনায়াসে শত্রুবিজয় সম্ভব। তাঁদের ধারণা এই বিদ্যা গোপন একটি মন্ত্র, তার উচ্চারণ করলেই দৈব অস্ত্র দেওয়ার জন্যে মহাদেব নেমে আসবেন মর্ত্যে! কে জানে, রূপসেনও হয়তো সেই বিশ্বাসে ভর করে নিজেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত না করেই…”

হঠাৎ তাঁর কথার সুতোটা ছিঁড়ে গেল একটা টেলিফোনের শব্দে। অবিনের পকেট থেকে শব্দটা আসছিল।

“আরে টাওয়ার এসেছে নাকি? কী আশ্চর্য!” বলতে বলতেই  ফোনটা বের করে তার পর্দার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ অবিনের মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল।

“বাড়ির ফোন?”

“উঁহু। অন্য ফোন। বিজনেস কল।” বলে একটু হেসে অবিন উঠে দাঁড়াল। “ফোনটা অ্যাটেন্ড করে ফিরে আসছি আবার, ডক্টর মুলার।”

বাইরে বের হয়ে খানিক দূরে গিয়ে অবিন একবার চারপাশটা দেখে নিল ভালো করে। কাছাকাছি কেউ নেই। তারপর নিচু গলায় বলল, “মিস্টার সোহেল? আপনি হঠাৎ… কোথা থেকে, বলুন!”

উলটোপিঠ থেকে ভেসে আসা ছেঁড়া ছেঁড়া কথাগুলো শুনতে শুনতে কখন যে মুলার তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন, অবিন খেয়াল করেনি। হঠাৎ কাঁধে তাঁর হাতের ছোঁয়া পেয়ে চমক ভাঙল তার। তিনি উদ্বিগ্নমুখে বলছিলেন, “ইজ এভরিথিং অলরাইট?”

ফোনটা কেটে দিল অবিন। তারপর মুখে একটু হাসি টেনে এনে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। সব ঠিক আছে ,স্যার। নাথিং সিরিয়াস।”

বিকেল নেমে আসছিল পাহাড়ে। চারপাশে তার মায়াবী আলো। সেদিকে একনজর দেখল অবিন। তারপর দূরে দাঁড়ানো ধনুষের দিকে ইশারা করে মুলারকে বলল, “কাল ফের কথা হবে। এখন তাঁবুতে যাব। ধনুষকে কালকের ব্যাপারে কিছু ইনস্ট্রাকশন দিয়ে দিই বরং।”

“ওহ্‌ শিয়োর, গুড আফটারনুন দেন।”

অবিন একবার  তাঁর  মুখের দিকে  তাকাল। খানিক  আগের ফোনকলটার কথা তখন তার মাথায় ঘুরছিল। কে যে শত্রু  আর কে যে বন্ধু তা এ-খেলায় বোঝা দুষ্কর। এ মানুষটাকে আপাতদৃষ্টিতে জ্ঞানতপস্বী মনে হয়। কিন্তু সেটা তাঁর মুখ না মুখোশ সেটা টের পাওয়া দরকার।

মাথায় একটা ছক আসছিল তার। তাঁবুর দরজায় পৌঁছে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল সে। তারপর পেছন ফিরে চলে যেতে থাকা মুলারের দিকে গলা উঁচিয়ে বলল, “একটা কথা আপনাকে বলিনি, মিস্টার মুলার। প্রতিস্মৃতিবিদ্যার পুঁথিটা আমার সঙ্গেই চলেছে। কাল সকালে আসবেন। দেখাব।”

তাঁবুতে ঢুকতে ঢুকতে মুলারের হতভম্ব মুখটা তার চোখে ভাসছিল। আগামীকালকের ঘটনাটা প্ল্যানমাফিক চললে লোকটা ওর পর পুঁথিটার একটা খোঁজ নেবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হবে। সেটা হওয়াটা জরুরি।

ধনুষ এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে সে বলল, “জরুরি কথা আছে, ধনুষ। মন দিয়ে শোনো।”

ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৫ মার্চ, ২০১৫
এক

সকালে ঘুম থেকে উঠে ডঃ মুলার যখন তাঁবুর বাইরে পা দিলেন, ঘাসের উপর ঝুরো বরফ পড়েছে। আর সেগুলো ঝিকমিক করছে সূর্যের আলোয়। চারদিকে বেশ নয়নাভিরাম দৃশ্য। আজ অর্জুন কা কুর্সি পেরিয়ে দেওয়া টপ পৌঁছনোর কথা। রাকেশের কাছ থেকে জেনেছেন, তার পরের ধাপ কিয়ার্কিখাল।

আর তারও পরের দিন সেখান থেকে চার-পাঁচ ঘণ্টার হাঁটাপথ সহস্রতাল। সহস্রতালের চারপাশে ছোটো বড়ো পাথরে ভর্তি। তাই সেখানে তাঁবু ফেলা খুব একটা সুবিধাজনক হবে না। সন্ধ্যা নামার আগে আবার ফিরে আসতে হবে কিয়ার্কিখালের আস্তানায়। রাকেশ আর পাথুর সঙ্গে ধনুষের বেশ ভাব হয়ে গেছে। তিনজনেই পাহাড়ি লোক। সেটাই স্বাভাবিক। একটা কথা হলফ করে বলা যায় যে সমতলের মানুষের থেকে পাহাড়িরা অনেক বেশি সহজ সরল।

পাথু সকালে উঠেই রান্নার কাজ শুরু করে দিয়েছে। রাকেশ হেঁটে আসছিল দূর থেকে সবুজ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। ডঃ মুলারকে দেখতে পেয়ে জোরে পা চালাল।

কাছে এসে সে হাসিমুখে বলল, “ভেরি গুড মর্নিং স্যার, আজকের আকাশটা একদম ঝকঝকে। চা-টিফিন খেয়ে যতটা শীঘ্র সম্ভব বেরিয়ে পড়া হবে। কী বলেন?”

টানা ঠাণ্ডা হাওয়া বইছিল উত্তরদিক থেকে। ডঃ মুলার জ্যাকেটের চেনটা গলা পর্যন্ত টেনে দিয়ে কমফর্টারটা পেঁচিয়ে বললেন,

“অবিন কোথায়? ওকে তো দেখছি না!”

“অবিন স্যারের সঙ্গে সকালে এখনও দেখা হয়নি আমার।”

ঠিক সেই মুহূর্তে ধনুষকে দেখা গেল পশ্চিমের ঢালে অনেকটা নীচে গাছের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে আসছে। মাথায় একটা শুকনো কাঠের বোঝা। ডান কাঁধে কী যেন একটা ঝুলছে। এর মধ্যে রাকেশ একবার অবিনের তাঁবুতে ঢুঁ মেরে এল। সেখানে কেউ নেই। ধনুষ কাছে এসে হাসি হাসি মুখে বলল, “একদল বকরিওয়ালার সঙ্গে দেখা হল, বুঝলে। জঙ্গলের ওদিকে। ওদের একটা বকরি পাহাড়ের গা বেয়ে পড়ে মরে গেছে। আজ সকালেই। ওরা তুলে এনে নীচেই ছাল ছাড়িয়ে নিচ্ছিল। আমি কিছুটা মাংস নিয়ে এলাম। টাকা কমই নিয়েছে, রাকেশ ভাইয়া। দুশো। ভাবলাম, নিয়ে যাই। সাহেব আর অবিন ভাইয়া আছেন। আজকের রাতের খাবারটা জমে যাবে। কী বলো? কাঠের আগুনে রান্না করব।”

রাকেশ মনে মনে খুশি হলেও মুখে বলল, “সে তো ঠিক আছে। তা তোর অবিন ভাইয়া গেলেন কোথায়? তাঁকে দেখছি না কেন?”

“সে কী! তাঁবুতে নেই?” বলেই একবার তার ভ্রূদুটো ওপরের দিকে উঠেই আবার নেমে গেল, “বুঝেছি। ভোরে উঠে হয়তো এদিক সেদিক ছবি তুলতে গেছেন। এসে যাবেন এখুনি। ও নিয়ে ভেবো না। দীনেশ ভাই বলে দিয়েছিলেন উনি একটু আপনভোলা লোক। পাহাড়ে এসে নিজের মতো করে ঘুরে বেড়ান।”

কথাটা শুনে রাকেশ ঘাড় নেড়ে নিজের কাজে চলে গেল। ঠিকঠাক সবকিছু হচ্ছে কি না দেখে নিয়ে গুছিয়ে-গাছিয়ে বেঁধে ফেলতে হবে জিনিসপত্র।

দুই

সাহেবের জন্য টিফিন আর চা তৈরি করছিল পাথু। এখনও সময় লাগবে খানিক। সেদিকে একনজর দেখে ডঃ মুলার ভাবলেন, এই ফাঁকে কিছু ছবি ক্যামেরাবন্দি করে নিলে ভালো হয়। তাঁর জাপানি টেলিলেন্স লাগানো ক্যামেরাটিতে পাঁচ কিলোমিটার দূরে বসা কোনও পাখিরও এমন ছবি ওঠে যাতে প্রতিটা পালক পরিষ্কার বোঝা যায়। সেটা বাগিয়ে ধরে হাঁটা দিলেন সামনের ঢালু, পাথুরে রাস্তায়। কিছুটা নেমে একটা বাঁক নিয়ে পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে ক্যামেরায় চোখ ঠেকালেন।

মিনিট পনেরো পর একটা হিমালয়ান মোনাল ধরা দিল ডঃ মুলারের ক্যামেরায়। অনেকটা নীচে একটা শুকনো গাছের ডালে বসেছিল সে। উজ্জ্বল বেগুনি রঙের ডানা আর লাল টকটকে গ্রীবা। মাথায় আছে এক ঝোটন। অপূর্ব সুন্দর। এটা পুরুষ মোনাল। লেন্সের ফোকাস অ্যাডজাস্ট করে একটার পর একটা ক্লিক করে যাচ্ছিলেন তিনি।

ঠিক সেই সময়ে একটা জিনিসে চোখ পড়তেই চমকে উঠলেন মুলার। মোনালের ঠিক পেছনে আরও অনেকটা দূরে নীল সাদা উইণ্ডচিটার আর জিনস পরা কেউ একজন উপুড় হয়ে পড়ে আছে পাথরের খাঁজে। পোশাকটা ওঁর চেনা। অবিন!

দৃশ্যটা প্রথম দেখাতেই বুকটা কেঁপে উঠল ডঃ মুলারের। কাঁপা হাতে নামিয়ে নিলেন ক্যামেরাটা। অবিন কি মারা গেছে? এবারে ফের একবার লেন্সে চোখ রেখে ছবিটাকে কাছে নিয়ে এসে খুঁটিয়ে লক্ষ করলেন।

ওপরে যেখানে তাঁবু ফেলা হয়েছে সেখান থেকে ঐ জায়গাটা চোখে পড়া সম্ভব নয়। কিন্তু এখান থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। একটা সরু ঝোরা নামছে জায়গাটা দিয়ে। ওর পাশেই শরীরটা পড়ে। কালো চুল ভিজে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে কপালের উপর দিয়ে। মাথাটা যে পাথরের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সেখানেও রক্তের দাগ। হাতগুলো দু’দিকে ছড়িয়ে পড়ে আছে। পাদুটো ঝোপের ভেতরে। শরীরে কোনও সাড় নেই। জায়গাটা কতদূর হতে পারে মনে মনে তার একটা আন্দাজ করে নিলেন ডঃ মুলার। পাখি-ওড়া পথের হিসেবে প্রায় এক কিলোমিটারের মতো দূরে হবে। খাড়াই অনেকটা নীচে।

কিন্তু এটা কি শুধুই অ্যাক্সিডেন্ট! না অন্য কিছু? ভোরবেলা কেউ কি পাহাড় থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে অবিনকে?

মোটিভের কথাটা মাথায় আসতেই চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন ডঃ মুলার। কথাপ্রসঙ্গে অবিন কাল রাতেই জানিয়েছিল, রুদ্রটের লেখা  প্রতিস্মৃতিবিদ্যার পুঁথিটা তার সঙ্গেই আছে। তাহলে কি সেজন্যই…

তিনি লম্বা লম্বা পা ফেলে চড়াই বেয়ে উঠতে শুরু করলেন। তাড়াতাড়ি তাঁবুতে ফিরতে হবে।

তিন

ডঃ মুলার অবিনের তাঁবুতে আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও পুঁথিটার কোনও হদিশ পেলেন না। এর মধ্যেই জিনিসটা গেল কোথায়? কে নিল? ধনুষ, পাথু, না রাকেশ? কারণ এরা ছাড়া এই তল্লাটে কেউ নেই, বা আসেনি। পুঁথিটা যে অসম্ভব দামী সেটা তো জানা কথা। কেউ একবার হাতাতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে নিলামে কয়েক লক্ষ ডলার দাম উঠবে।

হঠাৎ পেছন থেকে একটা ছায়া এসে পড়ল। ডঃ মুলার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, ধনুষ তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে অবাক চোখে। একটু অপ্রস্তুত হলেন। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “একটা বই দিয়েছিলাম গতকাল অবিনকে পড়তে। হঠাৎ একটু দরকার পড়েছে তাই নিতে এলাম। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না। আর সে কোন ভোরে বেরিয়েছে, এখনও এল না!”

“হাঁ, সাব। একটু চিন্তা হচ্ছে বৈকি।”

ধনুষের মুখের দিকে একবার চেয়ে দেখলেন মুলার। সরল পাহাড়ি মুখটাতে সন্দেহের কোনও ছায়া নেই। এবারে মুখ দিয়ে চুকচুক করে একটা শব্দ তুলে তিনি বললেন, “ভাবছি, রাকেশ আর পাথুকে নিয়ে আমি ধীরেসুস্থে এগোই অর্জুন কা কুর্সি ছাড়িয়ে। তোমার অবিন সাহেব এলে তারপর তোমরাও পেছন পেছন এসো, বুঝলে?”

ধনুষ মাথা নাড়ল।

পাথু তাঁর খাবার তৈরি করে ফেলেছে ততক্ষণে। খেয়েদেয়ে পাথু আর রাকেশকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন মুলার।

তাঁবুটা ফেলে অনেকদূর চলে আসার পর শেষ একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, ধনুষ একা দাঁড়িয়ে আছে বাইরে, উন্মুক্ত আকাশের নীচে। মনের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। অবিনের মতো একটা ছেলে দুর্ঘটনায় পড়ল, আর সবকিছু জেনেও তাকে পেছনে ফেলে কাপুরুষের মতো চলে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু কিছু করারও তো নেই। এখন যদি অবিনের লাশটা খাদের মধ্যে থেকে উদ্ধার হয়, তবে প্রথম সন্দেহ হবে ওঁর ওপরেই। সে তিনি একেবারে চান না।

কিন্তু তা সত্ত্বেও পা যেন চলছে না। কেউ যেন টানছে পেছন থেকে। বারবার সকালের ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। জলজ্যান্ত লোকটা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে খাদের মধ্যে। রক্তে ভিজে আছে পাথর। তাছাড়া, পুঁথিটা! ওটা যদি ওর সঙ্গে ওই খাদে…

হাঁটা থামিয়ে হঠাৎ ডঃ মুলার চেঁচিয়ে ডাকলেন, “রাকেশ… রাকেশ…”

দু’জনে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিল সামনে। ওঁর গলা শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল। ডঃ মুলার তাদের কাছে গিয়ে বললেন, “রাকেশ, আমি ভাবছি অবিনদের ফেলে এগিয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে না। ও যতক্ষণ না আসে, এখানে মালপত্র নিয়ে পাথু অপেক্ষা করুক। আমরা ঐ খাদের দিকটা একটু ঘুরে আসি, চলো। জঙ্গলের মধ্যে যদি ভালো কয়েকটা পাখির ছবি পাওয়া যায়!”

“খাদের মধ্যে নামবেন? সে তো খুবই খাড়াই রাস্তা!”

“তা হোক। চলো, একবার ঘুরেই আসি।” বলে ডঃ মুলার কোনও প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা না করে সেদিকে পা বাড়ালেন। উদ্দেশ্য, সকালে দেখা সেই জায়গাটাকে খুঁজে বের করা।

প্রায় তিনশো মিটারের মতো ফাঁকা জমিতে নামার পর শুরু হল জঙ্গল। অনেকটা তলায় ওক, দেবদারু, আমলকি আর ওপরের দিকটাতে কেবল ভুজ আর রডোডেনড্রনের জঙ্গল। সঙ্গে বুনো ঝোপঝাড়ের মধ্যে ছোটো ছোটো পাহাড়ি ফুল। তার উপর উড়ে বেড়াচ্ছে রংবেরঙের প্রজাপতি। মাঝেমাঝেই তিনি দাঁড়িয়ে পড়ছিলেন পাখিদের ছবি তোলার জন্য। কিন্তু মনটা পড়ে আছে অনেক নীচে সেই পাথরের পাশে। রাকেশ বার কয়েক বারণ করেছে, “আর নামবেন না, স্যার। ওঠার সময়ে অসুবিধা হবে।”

ডঃ মুলার নিজেও জানেন যে সমস্যা হবে। কিন্তু অবিনের চেহারাটা বারবার ভেসে উঠছিল সামনে। এখনও হয়তো তার হৃৎপিণ্ড চলছে। হয়তো শুশ্রূষা করলে বেঁচে যাবে গুণী ছেলেটা। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছাতে হবে তার কাছে। হাত ছড়ে গেল কাঁটা ঝোপে। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। তাঁর চোখ খুঁজছিল অবিনের দেহটাকে।

সরু পাহাড়ি ঝোরাটা এবার দেখা যাচ্ছে জঙ্গলের মধ্যে। তরতর করে নেমে এলেন তিনি। অজস্র নুড়িপাথরে ধাক্কা লেগে স্বচ্ছ জলের ধারা ছুটে চলেছে। এদিক সেদিক একঝলক তাকিয়ে দেখলেন মুলার। বডিটা নেই! তাহলে?

ভুল করে কি অন্য জায়গায় চলে এলেন তিনি? কিন্তু তা কী করে হয়! এখানে নতুন হলেও এতটা ভুল তো হবার কথা নয়।

“আপনি কি কিছু খুঁজছেন, স্যার?” হঠাৎ পেছন থেকে রাকেশ প্রশ্নটা করল।

একটু থতমত খেয়ে ডঃ মুলার বললেন, “হ্যাঁ। একটা বেগুনি মোনাল। উড়ে এসেছিল এদিকেই। আর দেখতে পাচ্ছি না।”

“মোনাল তো নীচের জঙ্গলে অনেক আছে। ফেরার সময়ে ছবি তুলে নেবেন।”

মাথা নেড়ে ডঃ মুলার বললেন, “হ্যাঁ, সেই ভালো। চলো, এবার উপরে ওঠা যাক।”

বলতে  বলতেই  ঝোরার  ধার  ধরে  ওপরের  দিকে  হাঁটতে  শুরু

করলেন মুলার। খানিক বাদেই হঠাৎ কিছুটা ওপরে একটা পাথরখণ্ডে চোখ আটকে গেল তাঁর। তাজা রক্তের দাগ। এগিয়ে গেলেন সেদিকে। পিছু পিছু রাকেশও এগিয়ে গেল।

“এটা কীসের রক্ত?”

“ভোরের দিকে লেপার্ড বা কোনও হিমালয়ান ক্যাট শিকার ধরেছে মনে হয়। এটা তারই দাগ।” রাকেশ পেছন থেকে মন্তব্য করল।

ডঃ মুলার ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলেন জায়গাটাকে। আচমকা চোখে পড়ল কিছু সাদা শণের মতো লোম। প্রায় এক বিঘত করে লম্বা।

“এ মনে হয় ভেড়ার লোম।” আবার পাশ থেকে মুখ বাড়িয়ে উক্তি করল রাকেশ।

ডঃ মুলার গম্ভীর মুখে লোমগুলো তুলে পকেটে পুরে, তারপর ধীরেসুস্থে জঙ্গল ছাড়িয়ে চড়াই উঠতে শুরু করলেন। কিছুটা উঠেই হাঁফ ধরছে। খাড়া পাথরের গা দিয়ে নামা যতটা সহজ, ওঠা ততটাই কঠিন। নিজের যৌবনের কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস পড়ল তাঁর একটা। ঠিক সেই সময়ে কানে একটা মিষ্টি পাখির ডাক। চিহু-চিহু করে মিহি সুরে অনেকক্ষণ ধরে ডেকে চলল সে। কোথায় যেন একটা বিষাদের সুর। একটা মন খারাপ করা ডাক। কেন ডাকছে পাখিটা এমন করুণ সুরে? অনেক লক্ষ করেও বনের মধ্যে চোখে পড়ল না পাখিটাকে। কোন ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে আছে কে জানে! তারপর একেবারে হঠাৎ থেমে গেল সেই শব্দ। এক ঝলক দমকা বাতাস এসে উড়িয়ে দিল জঙ্গলের শুকনো পাতার রাশি।

আনমনে এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি অনেকটা। হঠাৎ থেমে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালেন ডঃ মুলার। রাকেশ নেই!

“রাকেশ… রাকেশ…”

দু-তিনবার ডাক দিলেন ডঃ মুলার। কোনও জবাব এল না। ডালপালা খামচে আবার কিছুটা নেমে জঙ্গলের মধ্যে দেখলেনও ইতিউতি। ব্যাপারটা কী? অথচ কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত সে পেছনেই ছিল। পায়ের শব্দ শুনেছেন, পরিষ্কার মনে আছে।

এবার ডঃ মুলারের বুকটা ঢিবঢিব করতে শুরু করল। অবিনের এমন একটা ব্যাপার ঘটে গেল! পুঁথিটা বেপাত্তা। আর এখন রাকেশ… সেও কি…

পর পর ঘটনাগুলো ঘটে চলেছে অদ্ভুতভাবে। যোগসূত্র হয়তো কিছু

একটা আছে, কিন্তু তা তিনি টের পাচ্ছেন না কিছুতেই। অথচ এমনটা তো হবার কথা নয়। তাহলে কি সে এখানে এসে পড়ল! কিন্তু তাই বা কেমন করে হবে? সে তো এখন তাড়া খেয়ে…

আপাতত হুটোপাটি না করে প্রথমে মনটাকে শান্ত করতে হবে। জঙ্গলের ধার ঘেঁষে একটা বড়ো পাথরের ওপর বসলেন ডঃ মুলার। পিঠের ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা বের করে গলাটা ভিজিয়ে নিলেন। তারপর জুতো খুলে পদ্মাসনে মুড়ে নিলেন পা’দুটো। চোখ বন্ধ করে বড়ো করে শ্বাস নিয়ে হাতটা ছড়িয়ে হাঁটুর উপরে রেখে চাপা স্বরে উচ্চারণ করলেন, “ওমমমমমম…”

বারংবার এই ধ্বনি উচ্চারিত হয়ে মিশে যেতে লাগল বনের শুকনো বাতাসের সঙ্গে।

শুধুমাত্র কাশ্মীরি পণ্ডিত রুদ্রটই নয়, প্রায় দু’হাজার বছর আগে প্রাচীন সুমেরীয় ভাষায় লেখা এক শিলাখণ্ডেও পাওয়া গেছে এই আহ্বানের সূত্র। সেটা অনুবাদ করে বেশ কয়েক বছর আগে চমকে উঠেছিলেন ডঃ মুলার। তাতে লেখা ছিল আরেক সমান্তরাল পৃথিবীর সমান্তরাল সভ্যতার কথা। গ্রীক দেবতারাও আসলে নাকি সেই সমান্তরাল পৃথিবীর বাসিন্দা। সেখানে পৌঁছানোর রাস্তা খুবই কঠিন। তার একটা পথ নাকি আছে এই হিমালয়েরই কোলে। লোকচক্ষুর আড়ালে কোনও গোপন স্থানে। তার দ্বাররক্ষী নাকি ভারতভূমিরই এক প্রাচীন মানুষ। বিশেষ কোনও উপায়ে তাঁর শরীর অমরত্ব পেয়েছে। এদেশেরই কোন এক পুঁথিতে রয়েছে নাকি সেই দুনিয়ার দরজা খোলবার গোপন সংকেত।

তারপরই ডঃ মুলারের ভারতীয় সভ্যতা আর ভাষা নিয়ে পড়াশোনা শুরু। বহু পুঁথি, শ্লোক, কোষকাব্য তিনি ঘেঁটেছেন। খুঁজে খুঁজে একত্র করেছেন সূত্রগুলোকে। পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, অলীক গল্পগুলোর ফাঁকে কোথায় যেন লুকিয়ে আছে সেই আসল সত্য। যা এতদিনে কারও চোখে পড়েনি। খুঁজে খুঁজে বের করেছেন রহস্যময় সেইসব যোগাভ্যাসের সূত্র, যাদের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কিছু ঘুমিয়ে থাকা অংশকে উদ্দীপিত করতে পারলে খুলে যায় অন্তরাত্মার সেই দৃষ্টি, যার মাধ্যমে দেখা যায় অভীষ্ট পথ। সেইসব যোগ তিনি অভ্যাস করছেন আজ বেশ কয়েকবছর ধরে। এবারে তার পরীক্ষা নেবার পালা।

“ওমমমমমম…”

তাঁর অজান্তে সময়ের স্রোত দ্রুতবেগে বয়ে যাচ্ছিল তাঁকে ঘিরে। সঠিক মুদ্রায় হাতদুটোকে মুখের সামনে তুলে ধরে প্রাচীন গ্রন্থদের দেখানো পথে সেই তেজোদৃপ্ত ধ্বনি বহমান সময়ের মধ্যে স্থির করে রেখেছিল তাঁর উচ্চারণের মুহূর্তটাকে। দেখতে দেখতে সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ছিল। ধ্যানস্থ মানুষটিকে ঘিরে ঘনিয়ে উঠছিল মেঘ। এইবারে তাঁর শরীর সেই মেঘে আবৃত হয়ে গেল সম্পূর্ণ। তিনি তা টেরও পেলেন না। রাত কেটে ফের সকাল এল। তারপর সকাল গড়িয়ে একসময় সন্ধের দিকে এগিয়ে গেল পৃথিবী।

… ওমমমমমম …

চার
দুপুর আড়াইটে

“এ-পথে আগে এসেছ তুমি?”

রাস্তাটা সরু। একটা সাপের মতো পাকিয়ে উঠে গেছে ওপরের দিকে। ঘোড়ার পিঠে বসে এগোতে এগোতেই মঙ্গল জবাব দিল, “হাঁ, স্যরজি। বেশ কয়েকবার এসেছি। শেষ এসেছিলাম গতবছর এপ্রিলে। সেবার ছ’জনের একটা বিদেশি দল ছিল। তবে একটা কথা, স্যরজি। মোটরগাড়ি, ঘোড়া এইসবই যদি চড়বেন তো রাস্তায় হাঁটবার মজাটা পাবেন কেমন করে?”

“আর মজা! আরে ভাই, পাহাড়ে চড়ার লোক আমি নই। বলতে পার, জীবনে এই প্রথম। পেটের দায়ে এই পথে আসা।”

মঙ্গল হাসল। “পেটের দায়ে তো আমরা আসি, স্যর। কিন্তু আপনি সেই কলকত্তা থেকে পেটের দায়ে প্রথম পাহাড়ে আসছেন! তাও এরকম কঠিন রুটে!”

“কী আর করা যাবে! একজন লোক ক’দিন আগে এই রাস্তাতেই গেছে সহস্রতালের দিকে। দরকারটা তার সঙ্গেই। যত তাড়াতাড়ি তার নাগাল ধরা যায়।”

“ও! কিন্তু তিনি তো ওখানে থাকতে যাননি। ক’দিন পরে নেমেই আসতেন। তখন দেখা করে নিলেই হত। এত পরিশ্রম আর টাকা খরচ করে ছুটেমুটে পাহাড়ে চড়ার দরকার কী?”

“সে  তুমি  বুঝবে না।  ব্যাপারটা  জরুরি। লোকটা কলকাতা থেকে

বিশেষ একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে এখানে। সেটাই চিন্তার।”

কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটার পর দিবাকর আবার প্রশ্ন করল,

“আচ্ছা, পাহাড়ে এই উঁচুতে এরকম নির্জনে মহাত্মা সাধুরা থাকেন না? তুমি দেখেছ?”

মঙ্গল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব ধীরে ধীরে উত্তর দিল সে, “দেখিনি, তবে শুনেছি স্যরজি। তবে তেমন তেমন মহাত্মার দর্শন পাওয়া সাধারণ মানুষের ভাগ্যে থাকে না।”

“তাই নাকি!”

“হ্যাঁ, স্যরজি। এখানেই এমন একজন ছিলেন। শোনা যায়, উনি দিব্য পুরুষ। স্বয়ং মহাদেবের অংশ।”

“হুম।”

পাঁচ

কাল শিলা গ্রাম পেরিয়ে প্রায় ঘণ্টা তিনেক জঙ্গলের পথে টানা চড়াই ঠেলে দিবাকর আর মঙ্গল মখমলি ঘাসে মোড়া এক ময়দানে তাঁবু ফেলেছিল। ইচ্ছে করছিল আজও থাকতে। একে পাহাড়ি ঠাণ্ডা, তায় ঘোড়ায় চড়ে হালত খারাপ। কিন্তু পরক্ষণেই চোখের সামনে ভেসে উঠল ভজনলাল তিওয়ারির বোয়ালমাছের মতো পান চিবোনো মুখটা। সঙ্গে সঙ্গে সব ভালোলাগাগুলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। আজ ভোর-ভোরই তাই রওনা দিয়েছিল। সামনের পাহাড়ের গিরিশিরায় পৌঁছানোমাত্রই সামনে খুলে গেল গগনচুম্বী বরফঢাকা পাহাড়চূড়া। জায়গাটায় দাঁড়িয়ে লম্বা কয়েকটা শ্বাস নিল দিবাকর। চারপাশের স্বর্গীয় দৃশ্য দেখে মন জুড়িয়ে যায়। মনে মনে পুঁথিটার কথা ভাবছিল ও। হঠাৎ চমক ভাঙল মঙ্গলের ডাকে।

“আগে চলে, স্যরজি?”

দিবাকর ভাবছিল, জিনিসটা উদ্ধার করে দিতে না পারলে তার ক্যারিয়ার শেষ করে দেবে লোকটা। নতুন একটা পত্রিকা খুলছে। সেখানে তিওয়ারি মেজর শেয়ার হোল্ডার। সহ-সম্পাদকের চাকরি দেবে একটা বলেছে। আর একটু তেল লাগাতে পারলেই চাইকি এডিটরের পোস্টটাও বাঁধা। লোকটার অন্য অনেক বে-আইনি ব্যাবসা আছে। পত্রিকাটা বোধ হয় কালো টাকা সাদা করার জন্য খোলা। তবে তাতে দিবাকরের কী?  তাছাড়া এই কাজটার জন্যও প্রচুর টাকার অফার দিয়ে রেখেছে। সেই লোভের হাতছানিও কম নয়।

মঙ্গল আবার ডাকল, “আমাদের পেছনে দেখছেন বরফে মোড়া বান্দরপুঁছ রেঞ্জ। ডানহাতি বুগিয়াল পেরিয়ে ওই পাহাড়ের ধার ধরে সোজা চলে গেলে আপনি কিয়ার্কিখালে পৌঁছে যাবেন, আর তার ডানপাশ দিয়ে নীচের দিকে গিয়ে আবার চড়াই ঠেলে উঠলে আপনি পৌঁছে যাবেন অর্জুন কি কুর্সিতে। সেদিক থেকে আবার ঘুরে দেওয়াটপ হয়ে উত্তরপশ্চিম দিকে এলে কিয়ার্কিখালের রাস্তা মানে এই ধারের ওপর এসে মিলবে। তবে কিয়ার্কিখালের নীচ অবধিই ঘোড়া যাবে, তার ওপারে যেতে হলে হেঁটেই যেতে হবে।”

“টপ মানে?”

“খাড়া চড়াইয়ের শেষে যে জায়গা চুড়োমতো, তাকেই এখানে টপ বলা হয়। হয়তো সাহেবদের মুখ থেকেই এসেছে কথাটা।”

এতক্ষণের চড়াই পথটা ছিল পুরোটাই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। মাথার উপর মাঝে মাঝে ফাঁকফোঁকরে নীল আকাশ। শুধু পাখির কলতান, কখনও  নাম  না  জানা  কীটপতঙ্গের  ওড়াউড়ি, কোথাও কোথাও নিঝুম

দুপুরেই ঝিল্লিরব। পায়ের তলায় শুকনো পাতার রাশ।

জঙ্গল পার হয়ে পাহাড়ের ধারের মাথা থেকে পথটা ঢালু হয়ে বুগিয়ালে নেমে গেছে। বিস্তীর্ণ বুগিয়ালটা পার হয়ে সামনের গিরিশিরায় ওঠার চড়াইটা অনেকটা দূরে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দিবাকর একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার চলতে শুরু করল। মঙ্গল ঘোড়ার পিঠে খানিকটা আগেই।

দিবাকর বেশ খানিক পিছিয়ে পড়েছে। একলা এগোতে এগোতে সোহেলজি ওরফে মঙ্গল ভাবছিলেন কাকতালীয় যোগাযোগগুলোর কথা। ইন্টেলিজেন্স থেকে আসা সেই ইমেইলটাতে সমস্ত বহিরাগতের উপর কড়া নজর রাখতে বলা হয়েছিল। জেনারেল অ্যালার্ট। কাশ্মীরি কোন এক পণ্ডিতের লেখা কী একটা হারিয়ে যাওয়া পুঁথি। নামটা অদ্ভুত। প্রতিস্মৃতিবিদ্যা। ডার্কনেটে নাকি কেউ এখন সে-পুঁথি বিক্রির কথা বলছে।

বিষয়টা কলকাতার। কিন্তু এসব ব্যাপারে সারা ভারতের সব পুলিশ দফতরেই যায় অ্যালার্টগুলো। সাবধানতা নেয়া। রুটিন কাজ। প্রথমে তা নিয়ে তিনি নিজেও বিশেষ মাথা ঘামাননি। কিন্তু তারপর হঠাৎ অবিনের সেই ফোনটা। পাঁচ তারিখ বিকেলে। খুব ঘাবড়ে ছিল সে। ফোনের বন্ধুবান্ধবের ডিরেক্টরিতে পুলিশের লোক বলতে প্রথমেই তাঁর নম্বরটা পেয়ে তাঁকেই ফোন করে বসেছিল।

অবিনের কথা শুনে সোহেলজি প্রথমে ব্যাপারটা নিয়ে মজাও করছিলেন একটু। কিন্তু তারপর পুঁথিটার নাম শুনে তাঁর কান খাড়া হয়ে যায়। অবিন বলেছিল, সেটা তার পারিবারিক সম্পত্তি।

সোহেলজির পুলিশি অভিজ্ঞতা বলছিল, এ থেকে অবিনের বিপদ হতে পারে। অবিন যা বলেছে তা থেকে এটা পরিষ্কার যে অন্ধকার দুনিয়ার নজর পড়েছে ওর দিকে পুঁথিটার লোভে।

বইটা নিয়ে সোজা লোকাল পুলিশের কাছে চলে যাবার কথাটা বলতে গিয়েও হঠাৎ কেন যে তাঁর মাথায় এই লোভটা চেপে বসল কে জানে! সেটা হল অবিনকে এইখানে ডেকে নিয়ে আসা। ওর গন্ধ শুঁকে শুঁকে যদি বদমাশের দলটাও এদিকে আসে তাহলে অবিনকে টোপ বানিয়ে তাদের ধরে ফেলতে পারলে প্রোমোশন ঠেকায় কে!

কিন্তু বাস্তবে ঠিক সেইটাই ঘটতে শুরু করবার পর এবারে একটু অস্বস্তি হচ্ছিল তাঁর। অবিন মানুষটা ভালো। তাকে এভাবে কেন যে তিনি টেনে আনলেন!

তবে খেলাটা যখন তিনি শুরু করেছেন তখন তার শেষটাও গুছিয়ে খেলতে হবে তাঁকে। এইবার টোপের পেছনে ধাওয়া। চারে আসা আরেক মাছের সঙ্গ ধরে। প্রফেসর দীক্ষিতের বাড়ি থেকে বের হয়েই সে সিদ্ধান্তটা পাকাপাকি নিয়ে ফেলেছিলেন।

আর, ট্রেকিং গাইড সেজে গতকাল দিবাকর রায়ের সঙ্গে রওনা হবার মুখে ওর একটা ফোন-কল শুনে তিনি একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেছেন। দিবাকর কাউকে ফোনে বলছিল, “পাখির পেছনে ধাওয়া করেছি। হাতে পেলেই জবাই করে দানা নিজের কাছে নিয়ে নেব।” বাংলা ভাষাটা পুরোপুরি না বুঝলেও মোটামুটি আন্দাজ করতে পারেন সোহেল দাওয়াস।

সেই তখন থেকেই বার বার অবিনের ফোনে চেষ্টা করে যাচ্ছেন সোহেলজি। একাধিক লোক ওকে ঘিরছে এই পাহাড়ের ভেতরে। খবরটা ওর পাওয়া দরকার। খেলাটা ঠিক করে খেলতে হবে এবারে। বদমাশগুলোকে একত্র করে নিয়ে ওকে স্পট থেকে সরিয়ে দিতে হবে

প্রথমে চুপচাপ। তারপর…

গতকাল বিকেলেই রিজের মাথায় পৌঁছে ফোনের টাওয়ারে দুটো কাঠি দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি অবিনের নম্বরটা ডায়াল করেছিলেন তিনি। কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টার পর হঠাৎ করেই লাইনটা মিলেও যায়। আর তারপর ওপাশ থেকে ছেঁড়া ছেঁড়া একটা গলা ভেসে এল, “মিস্টার সোহেল? আপনি হঠাৎ… কোথা থেকে… বলুন!”

একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বলেছিলেন সোহেলজি, “মন দিয়ে শুনুন। প্রাণ আর পুঁথি বাঁচাতে হলে যা বলব তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন। প্রথমে বলুন, আপনার সঙ্গে নতুন কোনও ট্রেকার…”

*****

নিচের জঙ্গল পাতলা হয়ে এসেছে যেখানে, ঠিক সেই জায়গায় একটি পাকদণ্ডী রাস্তা দিয়ে দু’জন মানুষকে দেখা গেল পিঠে রুকস্যাক বেঁধে উঠে আসছে। একজন মেরুন রঙের পাগড়ি পরা দাড়িওয়ালা পাঞ্জাবী। দ্বিতীয়জন যে গাইড কাম পোর্টার, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। সোহেল দাওয়াসের কপালে একটা ভাঁজ পড়ল। ওরা তখন দ্বিতীয় চড়াইয়ের প্রায় মাথায়। এই গাইড যদি ওঁকে চিনে ফেলে?

দেখাই যাক, ভেবে সোহেলজি ঘোড়া থেকে নেমে চেঁচিয়ে বললেন, “সাবজি, থোড়া আরাম কর লেতে হ্যায়।”

দিবাকরও থামল। সেও দেখেছে লোকদুটোকে। অসম্ভব দ্রুতগতিতে বেলাকের দিক থেকে অর্থাৎ ওদের রাস্তার বিপরীত দিক থেকে সরাসরি কিয়ার্কিখাল যাবার গিরিশিরার মাথায় উঠে আসছিল ওরা যেখানে দিবাকররা এখন দাঁড়িয়ে আছে।

কাছে আসতে দেখা গেল, চিনে ফেলার ভয়টা তেমন নেই। কথা বলে জানা গেল, গাইড ছেলেটির বাড়ি রুদ্রপ্রয়াগে। নাম সুরজ। চমৎকার পেটানো চেহারা। এখানে এর আগে এসেছে একবারই। হৃষিকেশের এক ট্র্যাভেল এজেন্ট পাঠিয়েছে ওকে। দু’দিনে বেলাকখাল হয়ে উঠে এসেছে। উত্তরকাশীতে না থেমে ভাটোয়ারিতে এসে সরাসরি রাত কাটিয়েছে। মঙ্গলরাও একই দিকে যাবে শুনে সে বলল, “ভালোই হল, একসঙ্গে যাওয়া যাবে।”

শিখ  লোকটার   নাম   বলবন্ত   সিং।  জানাল,  লুধিয়ানায়  বাড়ি।

লোকটার দৃষ্টি একটু অদ্ভুত। ঝকঝকে আর উজ্জ্বল। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে নজর পড়ল, তার ডানহাতের মধ্যমাতে যে সরু সোনার আংটিটি রয়েছে তাতে ইংরেজিতে ‘এস’ লেখা। সেটা একটু অস্বাভাবিক। সাধারণত নিজের নামের আদ্যক্ষরই তো…

আরও সন্দেহজনক ব্যাপার হচ্ছে, ওর কথার মধ্যে পূর্ব-ভারতীয় হিন্দির ছাপ। পাঞ্জাব প্রদেশের হিন্দির টান আলাদা। সোহেলজির কয়েকজন পাঞ্জাবী বন্ধু রয়েছে। তাই ওঁর কানে লাগছে। তবে লোকটার চেহারা তারিফ করার মতো, আর হাঁটার গতিতে তো মালুম হলই।

দিবাকর জিজ্ঞেস করল, “আজকে আর কতটা যাবে, মঙ্গল?”

বিনয়ী গলায় সে উত্তর দিল, “আজ একটু এগিয়েই তাঁবু ফেলব। কাল সামনের দেওয়া টপকে বাঁহাতে রেখে কিছুটা সরে ওই ধারের ওপর গেলেই অর্জুন কা কুর্সি। তারপর ফির কিয়ার্কিখালের দিকে যাওয়া যাবে। এপাশের ধার দিয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু ঘোড়া এ-পথে যাবে না। তাই একটু ঘুরপথে।”

দিবাকরের মুখ দেখে মনে হল, পছন্দ হয়নি কথাটা। কিন্তু এখানে মঙ্গলের ওপর ভরসা না করে তার উপায়ই বা কী?

চতুর্দশ অধ্যায়
১৬ মার্চ, ২০১৫
এক
বার্তুকল্য ও অর্জুন

ভোরের সূর্য পুবের আকাশে যখন আবির ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছে, হ্রদের জলরাশি মৃদু হাওয়ার তালে তিরতির করে আবহ সঙ্গীতের সুর লয় বেঁধে দিল, ঠিক সেই সময়ে পশ্চিমের গুহা থেকে বেরিয়ে এলেন দীর্ঘাঙ্গ উজ্জ্বল গৌরবর্ণের দীপ্যমান শ্বেতবস্ত্র পরিহিত এক পুরুষ। তাঁর সাদা শণের মতো লম্বা চুলগুলো উড়ছে হাওয়ার তালে। তাঁর দৃষ্টি সরাসরি উত্তরের বরফাবৃত শৃঙ্গগুলোর দিকে। দু’হাত ছড়িয়ে যেন আহ্বান করছেন কাউকে। উদাত্ত কণ্ঠে ভোরের কালিংড়া রাগ। নিখুঁত স্বরের সেই খেলা চলতে চলতেই চূড়াগুলোতে রক্তিম থেকে সোনালি রঙ মাখিয়ে উঠে এল সকালবেলার সূর্য। ধীরে ধীরে পৃথিবীর অন্ধকারকে আলোয়  ভাসিয়ে দিয়ে সফেদ আর তেজি হয়ে উঠছিল তার আলো।

কিন্তু শেষধাপে পৌঁছানোর আগেই  ছন্দপতন ঘটল। মহর্ষির গলা কেঁপে উঠে থেমে গেল হঠাৎ। ভ্রূ-দুটি কুঁচকে গিয়ে ফের সমান হয়ে এল। কিছু একটা আশঙ্কা করেছেন তিনি। প্রায় মনুষ্যবিহীন এই উপল প্রান্তরে কত যুগ কেটে গেল। এখনও প্রতীক্ষায় আছেন। কবে শেষ হবে এই যাত্রা জানেন না তাও। সন্ধ্যা আর ভোরের সন্ধিলগ্নের মতো তিনি নিজেও দাঁড়িয়ে আছেন এই দুই সমান্তরাল সভ্যতার সংযোগস্থলে। কবে আসবে মানুষের সেই উত্তরসূরি যাঁকে পথ চিনিয়ে মুক্তি পাবেন তিনি!

কিন্তু বাতাসে যেন অন্যরকম একটা আঘ্রাণ। নাক তুলে জোরে জোরে শ্বাস নিলেন তিনি ক’বার। মানুষ বা বন্যপ্রাণীর গন্ধ তাঁর পরিচিত। এ মনে হয়…

নিচু হয়ে হ্রদের তীর থেকে ঝুরো বালি মুঠোয় নিয়ে আকাশের দিকে উঁচু করে ছাড়তে লাগলেন তিনি সরু করে। বাতাসের বেগ আর অভিমুখ বোঝার জন্য। কিন্তু অবাক কাণ্ড, বালির গুঁড়োগুলো পড়তে পড়তে মাটি স্পর্শ করার আগেই থেমে গেল। তারপর একটা ঘূর্ণির মত পাক খেতে খেতে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করল তাঁকে।

তপস্বী অনুভব করলেন বিপদ উপস্থিত। এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর গরুড়াসনের ভঙ্গিতে চোখ বন্ধ করে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতেই অচেনা কোনো ভাষায় বলে উঠলেন, “সময় হয়েছে, জিহুগাপতি। আমি তোমার উপস্থিতি টের পাচ্ছি। সামনে এস… সামনে এস…”

বাতাসের গতি বেড়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মহর্ষির চারপাশে ঘুরতে থাকা বালুকণাগুলো বেগ বাড়িয়ে ব্যস্ত করে তুলল হ্রদের জলকে। হঠাৎ তার জল থেকে একটা আগুনের স্তম্ভ পাক খেয়ে উঠল আকাশে। পরিষ্কার আকাশে আচমকা হাজির হল ঘন কালো মেঘের দল। দেখতে দেখতে সারা আকাশ ছেয়ে ফেলল তারা। বিদ্যুতের রেখায় ফালা ফালা করে পৃথিবী কাঁপিয়ে জানান দিল।

“কী চাও তুমি, জিহুগাপতি?”

বাতাসের সঙ্গে জলের তরঙ্গ মিশে সৃষ্টি হল এক মিহি অপার্থিব শব্দের। সূক্ষ্ম কণাগুলো মহর্ষির কানে বলে গেল নির্মম কিছু কথা।

তিনি  চিৎকার  করে  উঠলেন, “না! এ-কাজ তুমি করতে পার না।

কিছুতেই পার না।”

“আমি সব পারি, বার্তুকল্য। নিজেদের এই স্বর্গরাজ্যকে রক্ষা করবার জন্য প্রয়োজনে আমরা আটজন যতদূর সম্ভব যেতে পারি।”

“নিজেদের? ঈশ্বরভূমির দখলদার তস্কর…”

“তস্কর নয়, বার্তুকল্য। শাসক বলো। তিন অক্ষৌহিণী দিব্যাস্ত্রধারী অমর সৈনিক আমাদের আদেশ মানে। ঈশ্বরজাতি আমাদের দাস। এই ঈশ্বরভূমি এখন আমাদের।”

হঠাৎ চোখে বিদ্রূপের ঝিলিক খেলে গেল বার্তুকল্যের। “মাত্র কয়েকজন আগন্তুকই তো আসছে হে জিহুগাপতি। সেই ভয়ে সর্বশক্তি নিয়ে এই নির্মমতা…”

“ভুলে যেও না বার্তুকল্য, ভবিষ্যৎকে অনুভব করবার কিছু ক্ষমতা তোমার মতো আমারও আছে।”

“তাহলে তো ভবিতব্য তুমি জানো! এটাই বিধির লিখন। তুমি চাইলেই তো আর পালটানো যায় না।”

“মূর্খ! আমি ঈশ্বরসেনাকে পরাস্ত করে ঈশ্বরভূমি অধিকার করেছি। আমি ক্ষত্রিয় হে বার্তুকল্য। ভবিতব্যকে আমি মানি না।”

“নিয়তিকে   শক্তি  দিয়ে  হারাবে,  জিহুগাপতি? বিসর্পিনীর পুনরাগমনের নির্ধারিত  লগ্ন প্রায় উপস্থিত। আর ঠিক সেই সময়ে নিয়তির বিচিত্র আকর্ষণ, অজস্র অঘটনের মধ্যে দিয়ে ওদের একত্র করে টেনে আনছে এইখানে সে কি তুমি দেখতে পাচ্ছ না?”

“সে তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও। ওদের মনের জোর কত? অর্জুনের সমকক্ষ হতে পারবে ওরা?  রূপসেন আর তার সেনাবাহিনীর কী পরিণতি হয়েছিল তুমি দেখনি?  শুধু চন্দ্রবংশের বংশধর এই দাবিতে এই দরজায় পৌঁছে, তারপর…”

“তারা যোগ্য ছিল না, জিহুগাপতি। অযোগ্য জিহ্বায় প্রতিস্মৃতিবিদ্যার পবিত্র মন্ত্রের অশুদ্ধ ধ্বনিরূপ উচ্চারণকারীকে ধ্বংস করে। তাই তার নিপাতে তুমি ও আমি সহযোদ্ধা ছিলাম।

“কিন্তু এইবার প্রতিস্মৃতিবিদ্যার দীর্ঘকাল ধরে অদৃশ্য থাকা শেষাংশ তার প্রথমাংশের সঙ্গে মিলিত হবে। প্রকৃত সাধনায় যোগ্য হয়ে ওঠা উত্তরসূরি সঠিক মুহূর্তে লক্ষ অগ্নিপিণ্ডে উদ্ভাসিত আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে পাঠ করবেন সম্পূর্ণ মন্ত্র। তারপর এইখানে পৌঁছে যখন তিনি তাঁর আহ্বানধ্বনি উচ্চারণ করবেন, তখন আমাকে তো দরজা খুলতেই হবে। তাতে তুমি বাধা দিতে পারবে না। সে আহ্বানধ্বনির সূচনা গতকাল থেকে শুরু হয়ে এখনও উচ্চারিত হয়ে চলেছে ওই দূরবর্তী পাহাড়ের কোলে। তুমি কি তা শোনোনি?”

“শুনেছি। কালস্রোতকে নিয়ন্ত্রণ করেছে সে ধ্বনি, তাও অনুভব করেছি। কিন্তু এখানে পা দিতে এলে আমি তাকে বাধা দেব। আমাদের স্বর্গে তার…”

“এ নিয়ম স্বয়ং বৃষ্ণিকুলপতির সৃষ্টি। তাঁর বিরুদ্ধে গেলে আমার সঙ্গেও মোকাবিলা করতে হবে তোমাকে, জিহুগাপতি।”

“মোকাবিলা? হাহ্‌! কুরুক্ষেত্রের রণভূমির কথা ভুলে গেলে?”

“ভুলিনি। সেই অন্যায় যুদ্ধের কথা কখনও ভুলব না আমি।”

“হাঃ! যুদ্ধে আবার ন্যায় আর অন্যায়!”

“হ্যাঁ, জিহুগাপতি। যুদ্ধেও ন্যায় অন্যায় আছে। অবশ্য তোমাদের মতো ঈশ্বরহন্তার কাছে সেই বোধ আশা করা যায় না। যাঁরা তোমাদের শক্তি দিলেন তাঁদেরই পদানত করে স্বর্গ অধিকার করতেও তো তোমাদের  হাত  কাঁপেনি।  আমি তো কোন ছাড়!  তবে  এইবার   সে আসছে। সঠিক লগ্নে, সঠিক মুহূর্তে, সঠিক জ্ঞানকে সঙ্গী করে। ”

“সাবধান, বার্তুকল্য! তুচ্ছ পাহাড়ি মানুষজনের দেবতা হয়ে পুজা পেয়ে তুমি এত দুঃসাহসী হয়েছ? সামান্য দ্বারপাল…”

পরক্ষণেই আকাশ থেকে একটা বিদ্যুতের রেখা এসে আঘাত করল বার্তুকল্যকে। কাটা কলাগাছের মতো উড়ে গিয়ে পড়লেন তিনি পাথুরে মাটিতে। কিন্তু চোখের পলকে হাওয়ায় ভেসে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ধুলো ঝাড়ার মতো গা ঝেড়ে বললেন, “শেষবারের মতো সাবধান করছি তোমায়, জিহুগাপতি। নিয়তিকে বাধা দিও না তুমি। তাতেই সবার মঙ্গল। যোগ্যতার পরীক্ষায় তারা যদি উত্তীর্ণ হয় তবে…”

আচমকা তন্দ্রাটা ভেঙে গেল শিশিরের। সুরজ ডাকছে তাঁবুর বাইরে থেকে। স্বপ্নটা ভারি অদ্ভুত। লোকে বলে, ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। এর মধ্যে কি কোনও সংকেত লুকিয়ে আছে? কিন্তু…

গতকাল অর্জুন কা কুর্সির বেশ খানিকটা নীচে তাঁবু ফেলা হয়েছিল বিকাল গড়িয়ে যাওয়ার পর। মঙ্গল অবশ্য আরও আগেই তাঁবু ফেলতে চাইছিল। দিবাকরই জোরাজুরি করল, শিশিরও না করেনি। সে চাইছিল, যত তাড়াতাড়ি অবিনের কাছাকাছি আসা যায়। ফলে আরও লম্বা রাস্তা হাঁটতে হয়েছে গতকাল। রাতের খাওয়া সেরে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকতেই তক্ষুনি জুড়ে গেল চোখদুটো। সারাদিন হেঁটে খুবই ক্লান্ত ছিল শরীর। আর ঠাণ্ডাটাও হিমাঙ্কের কাছাকাছি।

কালকের কথা মনে পড়তেই আবারও চোখের সামনে ভেসে উঠল দিবাকর রায়ের মুখ। সাংবাদিক লোকটি আসলে এক ধান্দাবাজ। সেটা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি শিশিরের। লোকটা কী উদ্দেশ্যে সহস্রতাল যাচ্ছে সে বিষয়টাও পরিষ্কার নয়। পরিচয় হয়েছে। তবে কথাবার্তা বিশেষ বলতে চাইছে না।

শিশির অবশ্য নিজের ছদ্মবেশ নিয়েও বেশ দুশ্চিন্তায় আছে। শিখ সর্দারজির পোশাক, ছদ্মবেশ ঠিকঠাকই আছে। কিন্তু ভাষা? শব্দের উচ্চারণ? সেটা বেশ টের পাচ্ছে ও। দিবাকরের গাইড কাম পোর্টার মঙ্গল কয়েকবার তার কথাবার্তা শুনে সন্দেহের দৃষ্টি দিয়েছে তার দিকে। ছেলেটা খুব চটপটে এবং বুদ্ধিমান। মোটেও ওকে গাইড বা পোর্টার মনে হচ্ছে না। ওর কথাবার্তা চালচলন… অবশ্য আজকাল চটপটে শিক্ষিত ছেলেরা এই পেশায় আসছে সন্দেহ নেই। তবু কী একটা খটকা লাগছে ওর।

মঙ্গল শিশিরকে বলেছে, এ-পথে আরও কয়েকজন গেছে। কারা তারা? মঙ্গল সেটা জানল কোত্থেকে? চিন্তাটা বাড়ছে। মঙ্গলরা আজ সকাল সকাল বেরিয়ে যাবে বলেছিল। তাকেও অতএব যতটা সম্ভব সকালে উঠে বেরিয়ে পড়তে হবে। এদের চোখের আড়াল হতে দেওয়া চলবে না। তেমনভাবেই সুরজকে বলে রেখেছিল শিশির গতকাল। তাই সে ভোরের আলো ফোটার আগেই ডেকে দিয়েছে ওকে।

দুই
রাকেশ ও ধনুষ

“চিন্তা হচ্ছে, রাকেশ ভাই।”

রাকেশ ধনুষের মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিল একবার। “টেনশন আমারও হচ্ছে রে! পাথুকে মালপত্রসুদ্ধু এগিয়ে যেতে বলে মুলার সাহেবকে ওভাবে রেখে গতকাল এখানে ফিরে এলাম। আমি উধাও হয়েছি দেখে সাহেব ঘাবড়ে না যান। পাথুটা যা বুড়বক! এগোতে থাকলে  সোজা  এগোতেই থাকবে। পেছন  ফিরে চাইবে না।  সাহেবকে

ছেড়ে এভাবে এখানে গোটা একটা দিন বসে থাকা…”

“ভগবানের ওপর ভরসা রাখো, রাকেশ ভাইয়া,” ধনুষ হাসল। “অবিন সাহেব তো বলেই গেছেন, নতুন দলটা না আসা অবধি আমাদের এইখানেই…”

“কিন্তু মুলার সাহেব যে এভাবে একলা রওনা দেবেন সে-কথা তো তোর অবিন সাহেব তখন জানতেন না রে। তাছাড়া সাহেবকে নিয়ে যে সন্দেহ ইনি করে গেছেন, তারপর ওঁকে এভাবে ছেড়ে দিয়ে… আ-আমি বরং একবার…”

তার কথাটার জবাব না দিয়ে হঠাৎ ধনুষ উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর সামনের উৎরাইয়ের দিকে ইশারা করে উত্তেজিত গলায় বলল, “এসে গেছে, ভাইয়া! অবিন সাহেব যেমন বলেছিলেন।”

তার হাতের ইশারা লক্ষ করে উৎরাইয়ের দিকে নজর করে দেখল রাকেশ। সেখানে তখন একটা নতুন দল দেখা দিয়েছে।

“কিন্তু দলে তো দু’জন থাকবার কথা ছিল,” উঠে আসতে থাকা দলটার দিকে তাকিয়ে রাকেশ নিজের মনেই বিড়বিড় করল একবার, “এ তো দেখছি চারজন!”

“হতেই পারে। দুবলা কানেকশন। কথাবার্তা ভালো শোনা যায় না। সাহেব কী শুনতে কী শুনেছেন। দেখা যাক। ওদের মধ্যে মঙ্গল সিং নামে কেউ থাকলেই নিশ্চিন্তি। সাহেব বলেছিলেন, বড়া আদমি নাকি। ওঁর কথা মেনে চললে সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে।”

মানুষ চারটে খানিক বাদে উঠে এল ওপরে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছে। তারপর তাদের মধ্যে থেকে একজন গাইড ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল।

“আমি মঙ্গল সিং গাইড। তোমাদের ট্রেকাররা গেল কোথায়?”

ধনুষ হড়বড় করে বলে উঠল, “মুলার সাহেব পাথুকে নিয়ে এগিয়ে গেছেন। কিন্তু অবিন সাহেব গতকাল সকাল থেকে নিখোঁজ। আমি… আমি…”

দলের ট্রেকার দু’জন ততক্ষণে কাছাকাছি এগিয়ে এসেছেন। কথাটা শুনে দু’জনেরই ভুরু কুঁচকে উঠছিল। বাঙালি ভদ্রলোক এক পা এগিয়ে আসতে গিয়েছিলেন এদিকে। হঠাৎ পাগড়ি মাথায় অন্য ট্রেকারটি তাঁকে হাত দিয়ে আটকে কিছু বললেন।

সহস্রতালের  দিকে মেঘ  করছিল। অসম্ভব  দ্রুততায় সেটা আকাশ

ছেয়ে ফেলল। আর দেখতে না দেখতে বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেল।

অবিনদের দুটো তাঁবু টাঙানোই ছিল। বৃষ্টি আসাতে তার একটাতে  পাঞ্জাবী আর বাঙালি সাহেবকে ঢুকে পড়তে বলল রাকেশ। তারপর সুরজের সাথে হাত লাগিয়ে চট করে ওদের তাঁবুটা পাততে লাগল।

সেদিকে একনজর তাকিয়েই মঙ্গল সিং হঠাৎ ধনুষের হাত ধরে অন্য তাঁবুটার দিকে টেনে নিল, “ভেতরে চলো। তারপর সব আমাকে খুলে বলবে।”

পঞ্চদশ অধ্যায়
১৭ মার্চ, ২০১৫
এক

সকালের আলো ফুটেছে ফের। ঝকঝকে আকাশ। চায়ের কেটলি হাতে অবিনের তাঁবু থেকে ধনুষ বের হয়ে এল। কাল বেলাবেলি নতুন দলটা পৌঁছে সবটা ঘটনা শুনে বিষয়টা বুঝে নিতে নিতেই দুপুর গড়িয়ে গিয়েছিল। ও-সময়ে সামনে এগোনো বিপজ্জনক। দেখেশুনে মঙ্গল সিং আর সর্দারজির সঙ্গে আসা গাইড সুরজ বলেছিল, রাতটা সেখানেই কাটিয়ে পরদিন যা ব্যবস্থা নেবার নেয়া যাবে। ট্রেকার দু’জন এ-নিয়ে বিশেষ কিছু বলেনি আর। তারা ক্যাম্পের একপাশের একটা তাঁবুর আড়ালে গিয়ে একসঙ্গে বসে অনেকক্ষণ ধরেই কিছু আলোচনা করছিল। মাঝেমাঝে দুয়েকটা গরম গরম কথাবার্তার শব্দও আসছিল সেখান থেকে। সন্ধেরাতের দিকে ধনুষ একবার সেখানে খাবার কথা বলতে গিয়ে তাড়া খেয়েছে জোর। ফলে আর সে সেদিকে এগোয়নি।

সর্দারজি তার তাঁবুতে ঘুম থেকে উঠে বসেছিল। তাকে চা দিয়ে ধনুষ পাশের বাঙালি ট্রেকারের তাঁবুটায় গিয়ে ঢুকল। আর তারপরেই তার হাঁকডাকে বাকি লোকজন সেখানে এসে জড়ো হয়ে গেল। তাঁবুর ভেতরে বাঙালিবাবু, তার স্লিপিং ব্যাগ, স্যাক, কিচ্ছু নেই।

জায়গাটাকে কাছে এসে খুঁটিয়ে একবার দেখল মঙ্গল সিং। তার পেছনে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে দেখছিল সর্দারজি। হঠাৎ মুখ ঘোরাতে মঙ্গল সিংয়ের নজরে পড়ল মৃদু একটা হাসির ছোঁয়া লেগে আছে তার ঠোঁটে। চোখাচোখি হতেই অবশ্য সেটা মিলিয়ে গেল। সর্দার গম্ভীর মুখে বলে, “ইয়ে ক্যায়া গজব?”

মঙ্গল সিংয়ের চোখদুটো হঠাৎ ধারালো হয়ে উঠেছিল। মাথা নেড়ে বলে, “নিজে নিজেই বোধহয় রওনা হয়ে গেছে ভোরবেলা। ঘোড়া ভি লে গয়া। সালা মেরা পৈসা মারো করকে… দেখছি আমি। তোমরা টেন্ট উঠিয়ে পিছে পিছে এসো। যাবে কোথায়?”

বলতে বলতেই সে ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে লম্বা লম্বা পায়ে সামনের চড়াই ধরে এগিয়ে গেল। সেদিকে একনজর তাকিয়ে ধনুষ অন্য দু’জন গাইডকে বলল, “যা বলে গেল সেটাই করা যাক, আসুন। তাছাড়া আর উপায়ই বা কী?”

দুই

ডঃ মুলার ঠিক কতক্ষণ ওভাবে বসে ছিলেন হিসেব মেলাতে পারেননি। যখন এখানে এসেছিলেন তখন সবে সকাল গড়িয়েছে। অথচ এখন ফের সকালবেলা। মাত্র একটা মুহূর্তে কতটা সময় কীভাবে…

কোনওমতে উঠে চারপাশে কাউকে দেখতে পেলেন না উনি। রাকেশ, পাথু কাউকেই না। খানিক ভেবেচিন্তে আবার পেছনদিকে আগের ক্যাম্পের দিকেই রওনা দিলেন তিনি।

উলটোদিক থেকে হনহন করে একটা লোক আসছিল। তাঁকে দেখে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। তারপর কাছে এসে বলল, “মিঃ মুলার?”

“ডু আই নো ইউ?”

“না। আমার নাম মঙ্গল সিং। আগে আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিন। এই পথ দিয়ে কোনও বাঙালি ট্রেকারকে যেতে দেখেছেন?”

ডঃ মুলারের মাথাটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে আছে। সম্পূর্ণ প্রকৃতিস্থ হননি তখনও। খানিক আগের বিচিত্র অভিজ্ঞতাটার রেশ তখনও খেলে বেড়াচ্ছিল মস্তিষ্কের কোষে কোষে। ঘোলাটে চোখে কোনওমতে হাত নেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি লোকটার পাশ কেটে। সেদিকে তাকিয়ে মঙ্গল ওরফে সোহেলজি একটুক্ষণ হতভম্ব থেকে বিড়বিড় করে উঠলেন, “হেড কোয়ার্টারে খবর দিতে হবে। দিবাকর…”

সকালে উঠে বিষয়টা দেখবার পর সামান্য মাথা খেলাতেই ব্যাপারটা বুঝে নিতে কষ্ট হয়নি সোহেলজির। অনুমান করেছিলেন, অবিনের খোঁজেই চলে গেছে দিবাকর কাউকে কিছু না জানিয়ে। আর এইখানটাতেই তাঁর সন্দেহ। অবিন কোথায় আছে তা কি আঁচ করতে পেরেছে সে? নাকি এখানেই খুঁজে বেড়াবে তাকে?

সোহেলজি মনস্থির করে ফেললেন, আর এক মুহূর্ত দেরি নয়। ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। এক বা একাধিক নিরীহ মানুষের প্রাণের আশঙ্কা বেড়ে উঠছে।

যাবার পথেই হেড কোয়ার্টারে খবরটা বিস্তারিত জানিয়ে যেতে হবে। দরকারে সাহায্যও চাইতে হবে। দিবাকরকে খুঁজে বের করা দরকার। কারও কোনও ক্ষতি হবার আগে।

আস্তে আস্তে এইবার ক্যাম্পের দিকে ফিরে চললেন সোহেল দাওয়াস। মুলার সম্ভবত এতক্ষণে ওখানে পৌঁছে গেছেন। এদের নজরে রেখে চলতে হবে। সে-দায়িত্ব তিনি নিজে নেবেন। তবে রাকেশ আর ধনুষকে দরকারি নির্দেশগুলো দিয়ে এবারে চুপচাপ রওনা করিয়ে দেয়া দরকার সতুরির দিকে। দিবাকরের বিষয়টার একটা হিল্লে না হওয়া অবধি ওদিকটা নিজেদের লোক রাখা জরুরি।

তিন

মঙ্গল মানুষটা ঠাণ্ডা মাথার। অবস্থা দেখে সে পরামর্শ দিয়েছে, আর না এগিয়ে বাঁহাতি ঢাল ধরে সোজা শিলা মাল্লা হয়ে উত্তরকাশী ফেরত যেতে হবে। শুধু তাদের মধ্যে রাকেশ বা সুরজ এগিয়ে সহস্রতালের রাস্তাটা এক ঝলক দেখে ফের সঙ্গে এসে যোগ দেবে। উত্তরকাশীতে খোঁজখবর নিয়ে, হারানো মানুষদের নামে থানায় মিসিং ডায়েরি করে  তারপর পরের পরিকল্পনা।

ক্যাম্পে ফিরে এসে মুলার কারও সঙ্গে বিশেষ কথা বললেন না। চুপচাপ একটা পাথরের ওপরে এসে বসলেন। রাকেশ এসে ওঁকে একটা কফির মগ দিয়ে যাওয়াতে উনি একবার চোখ তুলে ওর দিকে চাইলেন মাত্র। রাকেশ চোখ নামিয়ে নিল। পাথুকে আশেপাশে কোথাও না দেখেও একটি কথাও জিজ্ঞেস করলেন না।

চারপাশে গোছগাছ চলছিল।  সবকিছুর  মধ্যে  যেন  বিচ্ছিন্ন একটা অংশ হয়ে বসেছিলেন মুলার। তাঁর মাথায় আলো আর শব্দের ঘনঘটায় একটা কুয়াশাঢাকা উপত্যকার ছবি জেগে ছিল। তাতেই বিভোর হয়েছিলেন তিনি। ধনুষ এসে খানিক বাদে তাঁর হাত থেকে মগটা নিয়ে যেতে যেতে বলল, “স্যরজি, আপ চলিয়ে হমারে সাথ। আগে যানা হ্যায়।”

মুলার মন্ত্রাবিষ্টের মতো উঠে হাঁটতে শুরু করলেন।

কিয়ার্কি বুগিয়ালের অল্প আগে একটা মোটামুটি সুপরিসর চাতালমতো জায়গা বেছে নিয়ে আবার তাঁবু ফেলা হল সেদিনের মতো। অবিনের তাঁবুটা এখন ধনুষের দখলে। বলবন্ত সিং অবিনের তাঁবুর কাছ ঘেঁষেই নিজের জায়গাটা বেছে নিয়েছে। ডঃ মুলার আর মঙ্গলের তাঁবু পাশাপাশি, একটু তফাতে। ট্রেকারদের ঘিরে রেখেছে গাইডদের তাঁবু।

দুপুর নাগাদ একটা ছোটোখাটো হইচই উঠল ক্যাম্পে। দেখা গেল, কিয়ার্কি টপের দিক থেকে পাথু প্রাণপণে এদিকে নেমে আসছে ঢাল বেয়ে। ফিরে এসে দলের মধ্যে মুলার সাহেবকে দেখে তার খুশি ধরে না। যেন বিরাট একটা দুশ্চিন্তার বোঝা নেমে গেছে কাঁধ থেকে।

খানিক বাদে সে একটু সুস্থির হতে জানা গেল, পনেরো তারিখে মুলারের মালপত্র পিঠে পাথু এগিয়ে গিয়েছিল অনেকটা। জায়গামতো পৌঁছে তাঁবুও ফেলে দিয়েছিল সে। ভেবেছিল, সন্ধের মধ্যে সাহেব চলে আসবেন। সে-রাত আর তার পরের গোটা দিন অপেক্ষা করেও রাকেশ বা সাহেব কেউই না আসায় বেশ ঘাবড়ে গিয়ে সেদিন ভোর-ভোর সে ফিরতে শুরু করে। এখন গোটা দলটাকে দেখতে পেয়ে সে যারপরনাই খুশি। এত লোক কেন, কী বৃত্তান্ত, তাতে তার যেন কিছুই আসে যায় না। সে এসেই কিচেনে টান টান হয়ে বিড়ির পর বিড়ি ধরিয়ে যাচ্ছে আর সাহেবদের এটা ওটা ফাইফরমাস খেটে চলেছে। ওতেই তার আনন্দ।

চার

আজও আকাশের মুখ ভার বিকেল থেকেই। রাতের তারারা যেন ছুটি নিয়েছে। কনকনে হালকা বাতাস ছেড়েছে একটা। নির্ঘাত বৃষ্টিও হচ্ছে কোথাও কাছেপিঠে। খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে প্রায় সবাই। জেগে রয়েছে শুধু তিনজন। অবিনের তাঁবুটা ফানুসের মতো আলো হয়ে আছে। ধনুষ কী একটা বই পড়ছে সেখানে আধশোয়া হয়ে। অবিনেরই কোনও বই হবে হয়তো। ফ্ল্যাপের চেন খোলাই রয়েছে। পড়া শেষে একবার বাইরে থেকে ফিরে এঁটে ঘুমোবে। চারদিকের নিঝুম পরিবেশটাকে থেকে থেকে  সচকিত  করে  তুলছে  হাওয়ায়  তাঁবুর ফ্ল্যাপের আচমকা ফররর ফররর শব্দ।

হঠাৎ মিশমিশে আঁধারের সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে কে একজন অবিনের তাঁবুতে ঢুকে পড়ল টুক করে। ঢোকার মুখে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখলেই লোকটা ঠিক টের পেত, হাত কুড়ি পেছনেই অন্ধকারের আড়াল করে কেউ একজন চোখ রেখেছে তার দিকে। আচমকা আগন্তুককে এই অসময়ে তাঁবুতে ঢুকতে দেখেই চট করে উঠে বসল ধনুষ। থতমত খেয়ে বলল, “আরে! কিছু চাই নাকি, সাবজি?”

কোনও ভূমিকা না করেই আগন্তুক বলে উঠল, “অবিন সেনের রুকস্যাকটা একবার দেখাতে পার? টাকাপয়সা যা চাও দেব।”

হতবাক ধনুষের মুখে কথা জোগানোর আগেই আগন্তুক আবার বলে উঠল, “ঘাবড়ে যেও না, কাকপক্ষীতেও টের পাবে না। আমি আর তুমি জানব শুধু। অবিনের শহরেই আমার বাড়ি। বেশ কাছাকাছি। বাড়ি থেকে এতদূরে এসে অবিন নিখোঁজ হয়ে গেল, ফিরে ওর পরিবারকে কী জবাব দেব জানি না। তাও ব্যাগপত্তর যদি তুলে নিয়ে গিয়ে সঁপে দিতে পারি তো কিছুটা অন্তত…”

“কিন্তু আপনি তো ও মুলুকের…”

“আহ্‌! সব প্রশ্নের উত্তর পাবে। আমায় যা দেখছ আমি তা নই। এখন বলো…”

ধনুষ কিছু বলল না। শুধু আঙুলটা তাক করল অবিনের ব্যাকপ্যাকটার দিকে।

ষোড়শ অধ্যায়
১৮ মার্চ, ২০১৫
এক

ভোর হতেই হাঁকডাক পড়ে গেল। ধনুষ কিছু কাঠ জোগাড় করেই রেখেছিল। ব্যস্ত হাতে ব্রেকফাস্ট তৈরিতে লেগে পড়েছে সুরজ আর পাথু। তাঁবুতে তাঁবুতে আপাতত চা পৌঁছে দেবার দায়িত্ব মঙ্গলের।

বলবন্ত সিংয়ের তাঁবুতে মঙ্গল চায়ের কাপ হাতে ঢুকেই জানাল, “আপনার গাইড ওমলেট বানাতে ব্যস্ত, স্যার। চা-টা আমিই নিয়ে এলাম তাই।”

বলবন্ত স্লিপিং ব্যাগ গোছাতে গোছাতে হাসিমুখে বললেন, “তা ভালোই করেছ। কই দাও,” বলে হাত বাড়াতেই মঙ্গল কড়া চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “হাতের ওই ‘এস’ মার্কা আংটিটা বাড়িতেই রেখে আসতে পারতেন, মিস্টার বঙ্গালিবাবু। আর ওই পাগড়ি মাথায় ঘুমোতে কিন্তু শিখদেরই বড্ড অসুবিধে হয়। আপনি তো রাতেও পরে ছিলেন দেখছি। পাহাড়ে লোকে যতটুকু পারে হালকা হয়ে চলে। আপনি দেখছি উলটো পথের পথিক।”

শিশিরের হাতটা কেঁপে উঠে চা চলকে পড়ল খানিকটা। ভেতরের ঝড়টাকে কোনওমতে সামলে বলল, “তু-তুমি, মানে আপনি?”

“সোহেল দাওয়াস। উত্তরাখণ্ড পুলিশ। আপনার মতোই ভেকধারী আপাতত।” বলেই গলা ছেড়ে হেসে উঠলেন সোহেলজি।

তাঁর দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল বলবন্ত। তারপর বলল, “আশা করি ছদ্মবেশ নেয়াটা কোনও ক্রাইম নয়।”

“উঁহু। যতক্ষণ না  অন্য  কোনও  ক্রাইমের  প্রমাণ  হাতে  আসছে ততক্ষণ তো নয়ই। ওহো, একটা প্রশ্নের জবাব দিন তো! অবিন সেনের ব্যাগ চাইছিলেন কেন কাল রাতে?”

“আপনি…”

“আজ্ঞে, হ্যাঁ। তাঁবুটার দিকে আমার নজর ছিল। এটা কিন্তু সন্দেহের একটা গ্রাউন্ড হতে পারে।”

“আজ্ঞে, না। আমি ব্যাকপ্যাকটা থেকে একটা জিনিসও সরাইনি। ধনুষ সেখানে ছিল। তাকে ডাকলে…” বলতে বলতেই উঠে দাঁড়াতে গিয়েছিল মানুষটা। সোহেলজি তার হাত ধরে ফের টেনে বসিয়ে দিলেন। “ধনুষ আর রাকেশ ক্যাম্পে নেই। আমি তাদের অন্যত্র পাঠিয়েছি। উপস্থিত কথাটা অন্যদের জানাবেন না। দ্যাটস অ্যান অর্ডার। আর, এবারে নিজের আসল পরিচয়টা দেবেন কি? অবশ্য সেটাও কতটা ঠিক বলবেন জানি না। কিন্তু পরে সেটা মিলিয়ে দেখব।”

আস্তে আস্তে মাথা থেকে পাগড়িটা খুলে আনল মানুষটা। তারপর পাতলুনের পকেট থেকে একটা কার্ড কেস বের করে এনে তার থেকে একটা কার্ড এগিয়ে ধরল সোহেলজির দিকে।

*****

সকাল সকাল তাঁবু গুটিয়ে নিয়ে ফেরা শুরু হল পাহাড়ের ধার ধরে পশ্চিমদিকে। ফেরার আগে একবার উত্তর-পুবদিকে চাইলেন ডক্টর মুলার। গত দিন তিনেকের দিনলিপিটা এমন হবে কেউ আঁচ করতে পারেনি নিশ্চয়ই। বলা নেই, কওয়া নেই দু’দিন আগে আচমকা অবিন নিখোঁজ। গতকাল রাতের খাওয়ার পর কখন থেকে কে জানে, দিবাকর গায়েব। আর আজ তৃতীয় দিনের সকালে রাকেশ আর ধনুষও বেপাত্তা। যেন কোন একটা অদৃশ্য সুতোর টানেই একে একে ঘটে গেল স্বতন্ত্র তিনটে অঘটন।

মুলার যেন কুঁকড়ে আছেন পরশু থেকেই। এখন চার-চারটে জলজ্যান্ত মানুষের এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা তাঁর মনে যথেষ্ট ভীতির সঞ্চার করেছে। কখনও আঁচ করছেন ভয়ংকর কোনও ষড়যন্ত্রের। সেটা অবশ্য খুবই স্বাভাবিক। জনে জনে আলাদাভাবে এই নির্জন পাহাড়িতে ট্রেকিংয়ের আড়ালে যার যার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে এলেও অবিনের মতো হঠাৎ গুম হয়ে যেতে চাইবে না কেউই। বিশেষত এই বিদেশে-বিভূঁইয়ে কখন কী হয়ে যায় কে জানে।

আগে আগে চলেছেন ইন্সপেক্টর সোহেল দাওয়াস। এই দলে এখন আর কারও আসল পরিচয় অন্যের কাছে গোপন নেই। রওনা হবার আগে সোহেলজিই তা সবার কাছে পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তাঁর মুখ এখন পাথরের মতো শক্ত। সবাই তার পেছন পেছন নিঃশব্দে হাঁটছিলেন।

দুই

সতুরি। ধনুষের নিজের গ্রাম। শেষরাত্রে রওনা হয়ে রাকেশকে সঙ্গে করে বেলাক হয়ে সোজা উত্তরকাশী নামতে নামতে বিকেল। দীনেশ ভাইয়াকে রাস্তা থেকেই ফোন করে দেওয়া ছিল। ওকে সোহেল দাওয়াস সাহেব আগেভাগেই সব বলেই গিয়েছিলেন বোধহয়। ভাইয়া গাড়ি রেডি করেই রেখেছিল।

তড়িঘড়ি কিছু মুখে দিয়ে জিপে চড়ে বসেছিল ওরা। রাতের মধ্যে পুরোলা পৌঁছে যেতে পারলে কাল ভোরেই গ্রামের বাড়ি পৌঁছে যেতে পারবে।

কাজটা সারতে হবে খুব গোপনে। লোক জানাজানি হলেই ফেউ লেগে যাবে পেছনে। গাঁয়ে আছেই মোটে গোটা চল্লিশেক পরিবার সাকুল্যে। লোকসংখ্যা দুশোরও কম। বসতি বলতে গেলে একটাই। কেউ কারও অচেনা নয়। সবাই সবার খোঁজখবর রাখে। সতর্ক থাকতে হবে।

বাড়িতে  পা  দিয়ে  কোনওমতে রুগ্ন বাবা আর ঠাকুমার পা ছুঁয়েই বিনোদকে খুঁজে বার করল ধনুষ। বিনোদ ওর ঠিক ওপরের ভাই। বেশ শান্ত প্রকৃতির। ভাইয়ে ভাইয়ে চোখে চোখে কী কথা হতেই দুদ্দাড় করে পাইন কাঠের সিঁড়ি ভেঙে তিনতলার সবচেয়ে নিরাপদ ঘরটায় গিয়ে ঢুকল তিনজনে। বুকে কী একটা বই উলটে রেখে চোখ বুজে শুয়ে ছিলেন একজন ভিনরাজ্যের মানুষ।

সপ্তদশ অধ্যায়
১৯ মার্চ ২০১৫
এক

রাকেশ কর্মসূত্রে দিল্লিবাসী হলেও নিজে পাহাড়ি মানুষ। এই টনস নদীর তীরেই দগোলি গাঁয়ে তারও ঘর। প্রকৃতি সেখানেও অকৃপণ। তবে দু’গাঁয়ের সৌন্দর্যে ফারাক আছে।

ঘুম থেকে উঠে বাইরে এসেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল  রাকেশ। আকাশ

ঝকঝকে। চারদিকে ঝলমল করছিল সকালের নরম আলো। যেদিকে চোখ যায় পাহাড় আর পাহাড়। তারই খাঁজে খাঁজে দু-চারটে ঘরের চালা, যেন টোপর মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিম থেকে তো চোখ ফেরানোই যাচ্ছে না। পাশাপাশি দুটো পাহাড়ের ঢাল এসে ঠেকেছে পায়ে পায়ে। মাঝামাঝি ঝাপসা পাহাড়ের গায়ে ছেঁড়া ছেঁড়া সচল মেঘের চাদর, চারদিক থেকে জমা হয়ে পাহাড়ের পায়ে পড়ছে এসে, তারপর গাঢ় ধোঁয়া হয়ে উঠে যাচ্ছে গা বেয়ে।

ধনুষদের কাঠের বাড়ির তিনতলার অপরিসর বারান্দার নড়বড়ে রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল রাকেশ। চোখের সামনেই বাড়িতে ঢোকার রাস্তা। রাকেশের পেছনে এসে চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে ডাক দিল ধনুষ। “নাও, চা খেয়ে নাও।”

এ ক’দিনে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে দু’জনের। তন্ময় রাকেশ চমক ভেঙে পেছন ফিরে তাকিয়ে হাসল একবার। চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বলল, “দাদা কোথায় রে? কথা বলবি কখন?”

ধনুষ চোখ নাচিয়ে রাস্তার দিকে ইশারা করল একবার। “ওই আসছে। ভোরে বেরিয়ে গেছিল মন্দিরে। মঙ্গল আরতি করতে হয় কিনা! দাঁড়াও, দীনেশ ভাইয়া আসুক, তারপর ভেবেচিন্তে যা বলার বলা যাবে’খন। কাজ বিগড়ে যেতে পারে নইলে।”

দীনেশ এসে যখন সতুরিতে পৌঁছল তখন সন্ধে নেমে এসেছে। উত্তরকাশী থেকে বারকোট হয়ে আসতে আসতে সারাদিন লেগে গেছে। পাহাড়ি পথে কম সে কম দুশো কিলোমিটার।

বাড়িসুদ্ধু লোক জানল, ধনুষের অন্নদাতা রাস্তায় গাড়ি বিগড়ে আটকে গিয়ে অনেক কষ্টে কিছুটা হেঁটে, কিছুটা অন্য গাড়ি ধরে শেষমেশ বাড়ি এসে পৌঁছেছে। উদ্দেশ্য, ধনুষের আমন্ত্রণে ক’দিন ছুটি কাটানো। তাছাড়া বাবা সোমেশ্বরের ডোলিরও যেহেতু বিশেষ দেরি নেই, দিনদুয়েকের মধ্যেই, সেটাও চাক্ষুষ করে যাওয়া।

আদর-আপ্যায়নের ত্রুটি রইল না। সালু এসে জল-গামছা হাতে ধরিয়ে দিয়েই পালিয়ে গেল হরিণ-পায়ে। ধনুষ আর রাকেশ স্বস্তি পেল খানিকটা। এবারে যা প্ল্যান করার, যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সব দীনেশের কাঁধে।

দুই

জখোলের সোমেশ্বর মন্দিরটা পাহাড়ের কোলে একটা বড়োসড়ো চাতালের ওপর। চৌকো ভিতের ওপর কাঠের খাড়া দেওয়াল। মাথায় টোপরের ওপর টোপর সাজিয়ে কাঠেরই পাটাতনের একেকটা শঙ্কু, ঘর চৌচালা। চাতালটাকে ঘিরে রেখেছে নকশাকাটা লোহার রেলিং। দু’দিকে গভীর খাদ।

সকাল থেকেই ছোট্ট নাটমন্দিরটা থেকে সামান্য দূরত্বে দোচালার নীচে এসে জড়ো হচ্ছে শয়ে শয়ে শিবভক্তেরা। মাথায় বাঁধা জরি বোনা লাল কাপড়ের টুকরো। কেউ পুরো মাথা ঢেকেছে তাতে, কেউ বা শুধু ফেট্টিমতো বেঁধেছে। এতটা চড়াই ভেঙে আসতে অনেকেরই কমবেশি হাঁফ ধরেছে। ডোলি রওনা হওয়ার আগে জিরিয়ে নিচ্ছে তাই দোচালার নীচে বসে। মাইকে তারস্বরে অবিরাম বেজে চলেছে শিব মহিমার গীত। আগে সবাই গাইয়ের সঙ্গেই কণ্ঠ মেলাত একসময়। আদিকালের চারণকবিদের বাঁধা সব শিবস্তুতি। এখন দিনকাল পালটেছে। মোবাইলে কানেক্ট করে আধুনিক মিউজিক সিস্টেমেই গান বাজে এখন। সে গাইয়েও  নেই।  তবে  সবটাই  ব্যাটারি আর  সোলারে।  বিদ্যুতের  খুঁটি পড়েছে বটে, তবে বিদ্যুৎ আসতে এখনও দেরি আছে।

একটা কোলাহল পাহাড়ের দূরের বাঁক থেকে কানে আসতেই বই নামিয়ে রেখে তিনতলার ঘরটা থেকে বেরিয়ে ভিনরাজ্যের মানুষটা এসে দাঁড়াল বারান্দায়। রাকেশ আর ধনুষ আগে থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল।এখন একে একে এসে জুটেছে ঠাকুমা আর সালু। বাবাকে এনে একটা উঁচু চেয়ারে বসিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে বিনোদ।

সোমেশ্বরের ডোলি নেমে এসেছে মন্দির থেকে। এইবারে গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে বেড়াবে তা ক’মাস। তারপর ভাদ্র পূর্ণিমায় মন্দিরশুদ্ধির নিয়ম-রীতি শেষে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবেন তিনি স্বস্থানে।

ডোলির এক্কেবারে শুরুতে রয়েছে ছেলেছোকরা আর কাচ্চাবাচ্চার দল। সাউন্ড বক্সের গানের তালে তালে নেচেই চলেছে অবিরাম। উদ্দীপনাটা এদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি। তারপরে রয়েছে একদল বাদ্যকর। শিঙা, ঢোলক, রাম-করতাল যে যেমন পারে বাজাচ্ছে। রঙবেরঙের পতাকা উঁচিয়ে হেঁটে চলেছে ক’জন বাদ্যকরদের পেছনে।

এরপরের দলটা ঘড়াবাহীদের। বিশাল বিশাল ঘড়া কাঁধে হাঁটছে জনা দশেক ভক্ত। মাঝে মাঝে জল ঢেলে দিচ্ছে ছোটো ছোটো ঘটের মতো পাত্রে। সে-জল ছিটিয়ে সোমেশ্বরের যাত্রাপথ শুদ্ধ করে দিচ্ছে কয়েকজন।

তারপরেই ডোলিতে বসে পরিক্রমায় বেরিয়েছেন স্বয়ং সোমেশ্বর। জনা আটেক জোয়ান ছেলে কাঁধে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে ডোলি। সোমেশ্বরের অবয়ব সম্পূর্ণ নয়। পেতলের মুখ একখানা, সিঁদুর লেপা। গলায় পাহাড়ি অলঙ্কার। মাথার ওপরে ঝুলছে লম্বা লম্বা কালো লোমের চামর।

দ্বিতীয় ধাপে নীচেই রয়েছে আরেকখানা মুখাবয়ব। আর তার দু’পাশে তামার তৈরি ছোটো ছোটো দু’খানা উপবিষ্ট মূর্তি। দেও আর করণমহারাজ। ডোলির পেছনে শ-খানেক শিবস্তুতিরত জনতা। রাস্তার দু’পাশে ভক্তেরা কেউ হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে, কেউ বা সাষ্টাঙ্গে ডোলির ধূলি মাথায় নিতে ব্যস্ত।

মানুষটা তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইল  সেই  ডোলির দিকে। অনুভূতিটা ঠিক নিয়ন্ত্রণে নেই ওর এই মুহূর্তে। ঠিক কী হচ্ছে ভেতরটায় ঠাহর করতে পারছে না ও।

সোমেশ্বরের ডোলি পেরিয়ে গেলে লোকটা ধীরপায়ে ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ল বিছানায়। অসম্ভব ছটফট করছে ভেতরটা। এটা ওটা ভাবতে ভাবতে কখন চোখ লেগে গেছে টের পায়নি। রাকেশ আর ধনুষ মিলে ডোলির গল্পই করছে বারান্দায় বসে।

কতক্ষণ কেটে গেছে কে জানে। হঠাৎ নিজের গলার গোঁ গোঁ আওয়াজটা নিজের কানে ঠেকতেই বিছানায় উঠে বসল মানুষটা। এই ঠাণ্ডাতেও গলায়, চোখের কোলে ঘাম জমে গেছে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ। বুকের ভেতরটা ভীষণ লাফাচ্ছে।

আবার তাঁকে দেখেছে সে স্বপ্নে। প্রথম দেখেছিল পাহাড়ের কোলে খোলা আকাশের নীচে এক ভোরবেলাতে। সেই লম্বা, ঋজু শরীর। মাথার লম্বা চুল চুড়ো করে বাঁধা। কাঁধে দড়ির মতো পেঁচিয়ে আছে কী যেন। সোমেশ্বরের ডোলি থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন তিনি। সাদা অত্যুজ্জ্বল পোশাক থেকে দ্যুতি ছিটকে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। চোখের কড়া ইশারায় কাছে ডাকছিলেন তিনি।

অষ্টাদশ অধ্যায়
২০ মার্চ, ২০১৫

ধনুষদের বাড়ির অনেকটা নীচে গাড়ি-রাস্তা যেখানে এসে শেষ হয়, সেখানে জিপটা এসে যখন দাঁড়াল তখন সন্ধে লেগে গেছে। দৌড়ে এল ধনুষ। এসে দাঁড়াতেই মুখের আলোটা মিলিয়ে গেল ওর। মুচকি হেসে সোহেলজি লাফিয়ে নামলেন সামনের সিট থেকে। তারপর মাঝের সিট থেকে একে একে ডঃ মুলার আর শিশির ঠাকুর। শিশিরের পরিচয় এখন আর কারও অজানা নয়। মাথায় পাগড়ির বদলে ব্যাকব্রাশ করা চুল দেখা যাচ্ছে। পাথুসুদ্ধু অন্য গাইডটি মানে সুরজকে উত্তরকাশী থেকেই পয়সাকড়ি মিটিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ধনুষের মনের ভাবটা আঁচ করে সোহেলজি ওর কাঁধে হাত রেখে বললেন, “এঁদের সবার নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন আমার, ধনুষ। ছেড়ে দিই কী করে বলো, বিশেষত আরেক বঙ্গালিবাবু দিবাকর রায় যখন বেপাত্তা?”

চারদিকে একটু নজর বুলিয়ে নিয়েই আবার জিজ্ঞেস করলেন, “হুম, বাড়ি তো তোমাদের বড়োসড়োই দেখছি হে, সবার থাকতে কোনও অসুবিধে নেই তো?”

ধনুষ দেঁতো হেসে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, “কী যে বলেন, স্যরজি! কতদিন আমাদের বাড়িতে এত মানুষের পা পড়েনি। দাদি, বাবা, দাদা সব্বাই দারুণ খুশি হবে। আসুন আপনারা, প্লিজ।”

দীনেশ উনিয়াল ছুটে নেমে এল তিনতলা থেকে। জানাল, “স্যরজি, আপনার ফোন পেয়েই বারকোটে খবর পাঠিয়েছি। আমার লোকজন আছে। ছবি পাঠিয়ে বলে রেখেছি। এদিকে আসতে হলে বারকোট পেরোতেই হবে। উত্তরকাশীতে তো বলাই আছে। ওদিকে যেখানেই দিবাকর রায়কে দেখা যাবে, খবর পেয়ে যাবেন স্যর। আমি থাকলে অবশ্য…”

সোহেলজি আশ্বস্ত করলেন, “খবর আমি হেড কোয়ার্টারেও পাঠিয়েছি, দীনেশ। দেরাদুন আর কলকাতা পুলিশকেও জানানো হয়েছে সাসপেক্টের কথা। দেখা যাক, ওরাও ওয়াচে রাখবে। যদিও তার সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ বা প্রমাণ নেই এখনও আমাদের হাতে।”

ডঃ মুলার কখন যেন তিনতলায় উঠে গিয়েছিলেন এক ফাঁকে। সেখানে কোণের ঘরটার মধ্যে উঁকি দিয়েই থমকে গেলেন তিনি। তারপর সেখান থেকে তাঁর চিৎকার ভেসে এল, “হেই, অবিন ইজ হিয়ার! অবিন ইজ হিয়ার! থ্যাঙ্ক গড!”

তিনি ধারণাই করতে পারেননি অবিন সুস্থ শরীরে এখানে উপস্থিত থাকতে পারে। বুক থেকে তাঁর পাথর নেমে গেল একটা। হঠাৎ করে শীতলতা ছেড়ে খুশিতে বাচ্চা ছেলের মতো বড্ড হইচই শুরু করে দিলেন মানুষটা।

*****

গোটা দলটা একত্রে বসে কথা বলছিল। গত কয়েকটা দিনের অজস্র অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেয়া নিজেদের মধ্যে। শুধু তাদের মধ্যে গম্ভীর হয়ে বসেছিলেন সোহেলজি। তাঁর সতর্ক চোখগুলো প্রয়েকের মুখের দিকে ঘুরে চলেছে।

সালুর উৎসাহের বিরাম নেই। দৌড়ে দৌড়ে এটা এনে দিচ্ছে, ওটা গুছিয়ে  দিচ্ছে।  একদিনে  এত লোক  সে  নিজেদের  বাড়িতে  কখনও

দেখেনি এ অবধি। আর ওই সাহেবসুবোদের তো জন্মেও দেখেনি, কোনও ছবিতেও নয়। প্রাথমিক ভয়টা কেটে গিয়েছিল ডঃ মুলারের আন্তরিক আদরে। বারান্দার থাম আড়াল করে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়েই যাচ্ছিল শুধু প্রায় সাড়ে ছ’ফুট লম্বা লাল মানুষটার দিকে ও। ডঃ মুলার ভাবগতিক বুঝতে পেরে হেসে হাতছানি দিলেন। “এই যে খুকুমণি, ওইদিকে কেন? কাছে এসো। নামটা বলো তোমার।”

ধনুষের চোখের ইশারায় আশ্বস্ত হয়েও খানিকটা দ্বিধা নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল সালু। সাহেব এক ঝটকায় কোলে তুলে বসিয়ে দিয়েছিলেন নিজের ঊরুতে। ভয় কেটে গেছিল সালুর। আদতে সে পাহাড়ি মেয়ে। সমতলের মানুষদের মতো অত ভয়ডর থাকে না ওদের।

দাদি, বিনোদ আর জোহরেরও ক্লান্তি নেই। অতিথিরা পাহাড়িদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই ভগবান। হাসিমুখে সেবা করে চলেছে বিরামহীন।

*****

“অবিন?”

গোলমাল থেকে সরে এসে বারান্দার এককোণে দাঁড়িয়ে অবিন বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। ডাকটা শুনে মুখ ঘুরিয়ে দেখল, শিশির কখন যেন তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কলকাতার গণ্ডি ছাড়িয়ে এই এতদূরে এসে এভাবে আলাপ হয়ে সে একটু অবাকই হয়েছিল প্রথমে।

“বলুন।”

“আমার পরিচয় তো আপনি পেয়েছেন। এখন পুঁথিটা আমাকে একবার দেখতে দেবেন?”

“কেন?” অবিন মুখ ঘুরিয়ে তাকাল তার দিকে। তারপর মাথা নেড়ে

বলল, “যা শুনলাম, তাতে পুঁথির খোঁজে আপনি আমার তাঁবুতেও হানা দিয়েছিলেন।”

“তার কারণ ছিল, অবিন। আমি ভেবেছিলাম আপনি সম্ভবত…”

“যুক্তিটা আমি অস্বীকার করছি না শিশিরবাবু। তাছাড়া সোহেলের কাছে আপনার পরিচয় যতটুকু শুনেছি তাতে আপনাকে সন্দেহ করবার খুব একটা কারণ নেই। কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই রহস্যের ভেতর কে যে বন্ধু আর কে যে শত্রু তার কোনটাই আমার কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। তবে একটা  সত্যি  কথা  আপনাকে আমি এ-মুহূর্তে  বলতে  পারি।

ও-পুঁথি আমার কাছে নেই।”

“তার মানে?”

“এত মূল্যবান একটা জিনিস সঙ্গে করে নিয়ে আসব ততটা বোকা আমাকে ভাবলেন কেমন করে?”

“তাহলে…”

“পুঁথি নিরাপদেই আছে, শিশিরবাবু। তবে কোথায় আছে তা আমি এই মুহূর্তে কাউকেই বলব না। অন্তত যতক্ষণ না সবগুলো সুতোকে মিলিয়ে আপনাদের প্রত্যেকের সঠিক পরিচয় আর উদ্দেশ্য আমার আছে পরিষ্কার হচ্ছে।”

এবার মরিয়া হয়ে শিশির বলল, “কিন্তু ডঃ মুলার বললেন, পুঁথিটা নাকি আপনার সঙ্গেই রয়েছে।”

“আছে। তবে পুঁথি নয়। ওর পাটাগুলোর ছবি আমি তুলে এনেছি আমার মোবাইলে। ডক্টর মুলারকে খানিক আগেই তা দেখিয়েছি। আপনিও চাইলে দেখতে পারেন।”

একটু ভেবে মাথা নাড়ল একবার শিশির, “নাঃ ওতে আমার আগ্রহ নেই খুব একটা। বুঝবও না বিশেষ কিছু। পুঁথিটা নিরাপদে আছে কি না সেইটেই বুঝতে চাইছিলাম আমি। কিন্তু একটা অন্য কৌতুহল আছে। ভরসা করে আমায় বলতে পারবেন কী, এভাবে একটা ধোঁয়াশা তৈরি করে হঠাৎ পালিয়েছিলেন কেন?”

অবিন ম্লান হাসল, “উপায় ছিল না শিশিরবাবু। সোহেলজির সঙ্গে আমার আগে থেকে আলাপ ছিল। সে বিষয়ে পরে কখনো বলব। এখন শুধু এইটুকু জেনে রাখুন, আমার দুর্ঘটনায় পড়াটা সম্পূর্ণ সাজানোই ছিল। সোহেলজি একটা ফোন করে আমাকে হঠাৎই সাবধান করে দেন যে একটা বিপদ আসছে। তারপর আমি আর দেরি করিনি। ধনুষকে ডেকে এনে সবকথা বলি। ওদের বিশ্বাস করা যায় শিশিরবাবু। সমতলের কালি এখনও ওদের মনে ঢোকেনি।  ওর পরামর্শেই রাকেশকেও প্ল্যানটা জানাই। উদ্দেশ্য ছিল দুনিয়ার কাছে একটা জিনিস পরিষ্কার করে দেয়া – আমি মারা গেছি, আর পুঁথিটারও হদিশ নেই কোনো।

“কাজেই পরদিন সকালেই ডঃ মুলার আমার লাশ দেখতে পান পাথরের খাঁজে। ভেড়ার রক্তটা ভাগ্যক্রমে জুটে গিয়েছিল ধনুষ আর রাকেশের।

“তারপর মুলারকে সেদিকেই আসতে দেখে রাকেশই গাছগাছালির আড়ালের সুযোগে আমাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। মুলারের চোখ বাঁচিয়ে নিরাপদ দূরত্ব অবধি আমাকে পৌঁছে দিয়ে সে ফের ক্যাম্পে ফিরে আসে। সেখান থেকে সবার অলক্ষ্যে ধনুষের ঠিকানা ধরে আমি সোজা এই সতুরি গ্রামে এসে পৌঁছোই। উত্তরকাশীতে দীনেশ বাকি ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। বিনোদ তার কাছে ভাই ধনুষের হাতচিঠি পেয়ে তৎক্ষণাৎ লুকিয়ে ফেলে আমাকে। সেই থেকে আমি সোহেলজির এসে পৌঁছোবার অপেক্ষায় রয়েছি।”

উনবিংশতি অধ্যায়
২১ মার্চ, ২০১৫
এক

ভোর তিনটে কুড়ি। হঠাৎ ডঃ মুলারের উপর্যুপরি ধাক্কায় জেগে উঠল অবিন। তিনতলার বড়ো ঘরটায় জিনিসপত্র সরিয়ে চার কোণে চারটে খাটিয়া পেতে শোবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। রাতে খাওয়াদাওয়ার পর হালকা এক পশলা বৃষ্টি হওয়ায় ঠাণ্ডাটাও বেশ কামড় বসিয়েছে আজ।

চোখ খুলে অবিন দেখে, ডঃ মুলার চোখেমুখে একরাশ অস্বস্তি নিয়ে ঝুঁকে আছেন তার মুখের ওপর। কণ্ঠস্বর বিচলিত। বললেন, “অবিন, বাকিদের উঠে এসে এই ঘরে আসতে বলুন শিগগির প্লিজ। আবার সেই জিনিসটা স্পষ্ট চোখে সামনে… তাড়াতাড়ি করুন, প্লিজ। কোনও কিছু ভুলে যাওয়ার আগে আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করা প্রয়োজন।”

অবিন কিছু বুঝে উঠতে না পেরে পাশের ঘরের দরজায় টোকা দিয়ে দীনেশ আর ধনুষকে ডেকে আনল। শিশিরও উঠে এল কৌতূহলী হয়ে। ততক্ষণে ডঃ মুলারের ধাক্কায় যার যার খাটিয়ায় উঠে বসেছেন বাকি দু’জন – রাকেশ আর সোহেলজি।

ডঃ মুলার সামান্য একটু প্রস্তুতি নিয়ে গলাটা একবার পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন, “আমার ইন্ডিয়ায় আসার পেছনে মুখ্য যে কারণ সেটা একটা পুঁথি এটা অনেকেই জানেন, বিশেষত অবিনকে তো নিজেই বলেছি। কিন্তু যে আরেকটা জিনিস আমাকে এ-অবধি হন্ট করে বেড়াচ্ছে সেটা একটা স্বপ্ন। দ্যাট মে বি আ নাইটমেয়ার অর সামথিং এলস, আই-আই কুড নট মেক আউট। জার্মানিতে নিজের বিছানায় শুয়ে বেশ ক’বার দেখেছি আগেও। ঝাপসামতো কিছু একটা। কিন্তু আজ যখন একটু আগে…”

“কী এমন স্বপ্ন ডঃ মুলার, যার জন্যে এই শেষরাতে সব্বাইকে জাগিয়ে দিয়ে…” কথার মাঝখানেই জিজ্ঞেস করে বসে রাকেশ।

“ওয়েল, স্বপ্নটা একই, তবে আজ যেন অনেকটাই বেশ স্পষ্ট আমার কাছে। ইভন মোর মিনিংফুল আই মাস্ট সে। বেশ কয়েকবার দেখার পর স্বপ্নটাকে তিনটে মূল ভাগে ভাগ করে নিয়েছি আমি। জার্মানিতে স্বপ্নের প্রথমেই তিনটে জায়গার অস্পষ্ট ছবি ভেসে উঠত ধীরে ধীরে একের পর এক। প্রথমে একটা প্লেন ল্যান্ড – বসতি এলাকা, তারপর একটা টেম্পল আর শেষে একটা দুর্গম নির্জন পাহাড়ি এলাকা।

“পরের ধাপে এক আর দু’নম্বর জায়গাদুটোকে জুড়ে দিত একটা আলোর রেখা। আর তারপর দুটো জায়গা থেকে দুটো আলোর ধারা বের হয়ে গিয়ে তিন নম্বর জায়গাটায় পৌঁছে একটা আলোর ত্রিভুজ গড়ে তুলত। আবছা। ট্রায়াঙ্গলের লাইন তিনটে থেকে অস্বাভাবিক চোখ ধাঁধানো লাইট ডিসপার্শন হত। সহ্য হত না। হাঁফিয়ে উঠতাম। মনে হত, কেউ যেন গলাটা টিপে ধরেছে। কিন্তু একটুকুও নড়াচড়ার সাধ্য ছিল না আমার। অল্প পরেই ধীরে ধীরে দাগগুলো এগিয়ে গিয়ে কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করত পাহাড়ি এলাকাটার নির্দিষ্ট বিন্দুতে।

“তৃতীয় ধাপে ওই বিন্দুটা আস্তে আস্তে একটা লাল গোলার আকার নিয়ে রূপান্তরিত হত একটা ধোঁয়াটে, আবছা অবয়বে। শূন্যে ভেসে থাকত সে। চেহারাটা কিছুটা ইন্ডিয়ান কোনও সেইজের মতো দেখতে।”

ঠোঁটটা একবার চেটে নিয়ে এক ঢোঁক জল খেয়ে নিলেন ডঃ মুলার। সব্বাই চুপ করে আছে। খানিক বাদে অবিন ফের জিজ্ঞেস করল, “আজ ঠিক কী দেখলেন, ডঃ মুলার? কোনও পার্থক্য ছিল?”

ডঃ মুলার একবার সবার মুখের দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, “আজ স্বপ্নটা আগের চেয়ে অনেক স্পষ্ট ছিল, অবিন। হয়তো কোনও সংকেতবার্তা, আমি তার অর্থ বুঝতে পারছি না।

“আজ তিনটে জায়গা বেশ স্পষ্ট দেখেছি। প্রথমটা ইস্ট ইন্ডিয়ার কোনও একটা জায়গা বলেই আমার বিশ্বাস। বসতি এলাকাটার পয়েন্টে একটা  পরিত্যক্ত  গোডাউন  বা  মিলের  পাশে  একটুকরো খোলা মাঠ।

মাঠের এককোণের একটা লাইট স্ট্যান্ড ভাঙা।”

এতটুকু শোনার পরই চমকে উঠল অবিন। “আরে! এ তো মনে হচ্ছে সুব…”

পরমুহূর্তেই কথাটা গিলে ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে সবার দিকে একবার নজর বোলাল সে। মাথা দুলিয়ে আপনমনেই বিড়বিড় করে উঠল, “না না, সে কী করে সম্ভব? এ কীসের সংকেত?”

ছ’জোড়া চোখ তখন মুলারের মুখেই নিবদ্ধ। সোহেলজি অবিনকে বিশেষ আমল না দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “দ্বিতীয় পয়েন্ট কোনটা, ডঃ মুলার?”

“একটা মন্দির। আকৃতিটা সঠিক বুঝতে পারিনি। আবছা কুয়াশায় ঢাকা। তবে সেটা যে কোনও উপাসনাস্থল সেটুকু অনুভব করেছি। এখানকারই কাছাকাছি কোনও অঞ্চল হবে সেটা। যেটুকু দেখেছি তাতে ভূপ্রকৃতি মোটামুটি এখানকার মতোই। তবে তৃতীয় পয়েন্টটা বেশ গোলমেলে এখনও। কিছুতেই জায়গাটাকে বিন্দুমাত্র ট্রেস করতে পারছি না। তবে এই উত্তরাখণ্ডেই কোনও গহিন জায়গা বলে আমার প্রাথমিক ধারণা। বাকি দুটো বিন্দু স্বপ্নের শেষে ওই তৃতীয় বিন্দুতেই থিতু হয়।”

এবারে সবাই একটু সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল ডঃ মুলারকে। অন্য ধারার অবিরাম গবেষণা চালিয়ে ভদ্রলোক মনস্তাত্ত্বিক কোনও সমস্যায় ভুগছেন না তো? দিনের পর দিন এস্বপ্নের অর্থ কী হতে পারে? সংকেত কিছু হলেও বিষয়টা সম্পর্কে একটা ধারণা তো চাই প্রথমে!

সবার মনের ভেতরের প্রশ্নগুলো আস্তে আস্তে একটা গুঞ্জন হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল সারাঘরে। বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে ধীরে ধীরে।

সোহেলজি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা ডঃ মুলার, এই স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক কী? সেটা নিছক একটা স্বপ্নই তো হতে পারে। আপনি সবাইকে জড়ো করে এটা শোনানোরই বা মানে কী?”

ডঃ মুলার দৃপ্তকণ্ঠে জবাব দিলেন, “মানে আছে, ইন্সপেক্টর। খুব দৃঢ় যোগসূত্র রয়েছে প্রতিস্মৃতিবিদ্যার সঙ্গে। আমি একরকম নিশ্চিত। এই দেখুন না।” বলে নিজের ব্যাকপ্যাক থেকে খয়েরি মলাটের একটা ডায়েরি বের করে আনলেন দ্রুত হাতে। কয়েকটা পাতা উলটে খোলা ডায়েরিটা সোহেলজির  হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “এখানে কিছু সংস্কৃত মন্ত্র আমি নোট করেছি। তবে একটা লাইনও সম্পূর্ণ নয়।”

“আপনি এগুলো পেলেন কী করে? খোদ দেবনাগরী হরফেই লিখেছেন দেখছি সব! মাই গুডনেস!”

“এগুলো আমার সেই স্বপ্ন থেকে পাওয়া। আপনাদের দেশের রীতি অনুসারে স্বপ্নাদেশ বলা চলে। ইজ নট ইট? ত্রিভুজের প্রথম লাইনটা এক আর দু’নম্বর বিন্দুকে জুড়ে দিতেই কিছু চ্যান্টিং শুরু হয়ে যায়। আমি স্পষ্ট শুনতে পাই। আজও পাচ্ছিলাম। শেষ হয় সেই নির্দিষ্ট পয়েন্টে লাইনগুলো ভ্যানিশ হয়ে যাওয়ার পর। ঘুম ভেঙে উঠে আমি লিখে রাখার চেষ্টা করতাম মন্ত্রগুলো ডায়েরিতে। সবকিছু মনে থাকত না। কিছু কিছু শব্দ যেগুলো নিখুঁত মনে থাকত এগুলো তাই। আজ অবিনের মোবাইলে ওই পুঁথির ছবি দেখে মিলিয়ে দেখলাম মনে মনে। যেগুলো লিখতে পেরেছি হুবহু মিলে গেছে। শিউরে উঠেছিলাম তখন। আপনিও মিলিয়ে দেখুন না একবার।”

বিস্মিত চোখগুলো সব তাকিয়ে রইল ডঃ মুলারের দিকে। শিশির এতক্ষণ মৌন ছিল আগাগোড়া। আচমকা বলে উঠল,

“আচ্ছা ডঃ মুলার, যে মুনিঋষির কথা বললেন আপনি, তিনি উজ্জ্বল রঙের সাদা পোশাক পরা কেউ, সাদা লম্বা লম্বা চুল? নাম কিছু জানতে পারলেন, বার্তুকল্য বা এধরনের কিছু?”

চমকে উঠলেন ডঃ মুলার। জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাঁ, শারীরিক বর্ণনা ঠিক ওইরকমই। তবে নামটা আমার জানা নেই। আপনি কী করে…”

উৎসাহিত অবিন এবারে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, আপনার স্বপ্নে এমন কেউ আসেন যার যুবা বয়স, ঋজু শরীর আর মাথার লম্বা চুল চুড়ো করে বাঁধা? আমিও এ-ক’দিন এ স্বপ্নটা দেখছি প্রায়ই। সে যেন আমায় কাছে ডাকে, কিছু বলতে চায়। আর ঠিক সে সময়ই ঘুম ভেঙে যায়।”

ডঃ মুলার শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ অবিনের মুখে। অবিনের শেষ কথাগুলো তাঁর কানে গেল কি না বোঝা যায় না।

সোহেলজি প্রশ্ন করেন, “এ যদি কোনও সংকেত হয় তবে সেটা ঠিক কী? ডঃ মুলার, আপনার ধারণা কী?”

ডঃ মুলার একটু নড়েচড়ে বসে উত্তর দিলেন, “আপনার এখনও সন্দেহ আছে, অফিসার? ওয়েল, এটা নিশ্চিত একটা সংকেত। তিনজনের স্বপ্ন আলাদা হলেও কেন্দ্রবিন্দু সম্ভবত এক।”

অবিন  হঠাৎ  বলে  উঠল, “আমি  ডঃ মুলারের সঙ্গে একমত। এর যুক্তিপূর্ণ  কারণও  রয়েছে।  সংকেতে  পূর্ব-ভারতের  এলাকাটা যেখানে দেখাচ্ছে সে জায়গাটা আমার সুপরিচিত। আর সেখানে রয়েছে আমার পুঁথিটা। সেটা অসম্পূর্ণ।”

রাকেশ চোখ গোল গোল করে জিজ্ঞেস করে বসল, “কোথায় সেটা, অবিনস্যার?”

অবিন সংযত করে নিল নিজেকে। বলল, “সরি, নিরাপত্তাজনিত কারণে এখনই আমি জায়গাটার নাম বলতে পারছি না। ধরে নাও যে একটা সূত্র আমাদের হাতে রয়েছে। এবারে সেকেন্ড পয়েন্ট, পাহাড়ি হিন্দু মন্দির এবং সেটা এই এলাকাতেই কোথাও বলেই ডঃ মুলারের ক্যালকুলেশন। কী ডক্টর, ঠিক বলছি?”

“ইয়েস, মাই ফ্রেন্ড। আই থিঙ্ক সো।”

“এর একটাই অর্থ হয়। দু’নম্বর বিন্দুতে পুঁথির বাকিটা হয়তো রয়েছে। এক আর দুইকে জুড়ে দিয়ে পুঁথির মন্ত্রোচ্চারণ হয়তো ইঙ্গিত করছে এই দুটো জায়গা মিলিয়ে পুঁথিটা সম্পূর্ণ হবে। আর তারপর তিন নম্বর বিন্দুতে এগিয়ে গিয়ে…”

ধনুষ চট করে দীনেশ আর সোহেলজির চোখে চোখ রেখে অনুমতি পেতেই শান্ত গলায় বলল, “এখানে আমি একটা মন্দির চিনি। পাশের গাঁও জখোলের সোমেশ্বর মন্দির, এককালে যেটা দেওমহারাজ মানে দুর্যোধনের মন্দির ছিল। সেখানেও আমার দাদা পুজো করে। আমি নিয়ে যেতে পারি।”

চমকে ওঠা উপস্থিত সবার চোখ চকচক করে উঠল এবারে।

ডঃ মুলার উৎসাহিত হয়ে বললেন, “আজই যাওয়া যায় না সে মন্দিরে? আমি যদি একবার…”

হঠাৎ সোহেলজি তাদের কথায় বাধা দিলেন, “একা একা কেউ ওখানে যাবেন না। এখনও এখানে অনেকেই সন্দেহের ঊর্ধ্বে নন। যা আলোচনা হল তা সত্যি হলে বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি নিজে সঙ্গে যাব। তবে তার আগে জোহরের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।”

ভোর হয়ে আসছিল। জোহর ঘুম থেকে ওঠেনি হয়তো। ধনুষ নিজেই নীচে নেমে গেল দাদাকে ডেকে আনবে বলে, সে সঙ্গে সকলের জন্য একেক কাপ চা।

দুই

সব শুনে জোহরের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল হঠাৎ। বলে, “সত্যি বলছিস তোরা? এটা তো বাবা সোমেশ্বরের সম্পত্তি!” তারপর বিড়বিড় করে, “জয় ভোলে, জয় ভোলে” বলে হাতজোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বলল, “হ্যাঁ। পুঁথি একটা আছে বটে। তবে তার শেষদিকের বেশ খানিকটার কোনও হদিস নেই।  কই দেখি,  তোদের  পুঁথিখানা  একবার দেখা দেখি।”

অবিন ত্রস্ত হাতে মোবাইলের বোতাম টিপে তার দিকে সেটা এগিয়ে ধরল। প্রথম ছবিটার লেখাজোখাগুলো একটুক্ষণ খুঁটিয়ে পড়ার চেষ্টা করতেই চোখমুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল জোহরের। গলায় একরাশ আশ্চর্য ঝরিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এই পুঁথি এতদিন আপনার কাছে ছিল? জয় ভোলে! এই পুঁথির কিছু শ্লোক পড়া আছে আমার। যতটুকু বুঝতে পারছি, তাতে এই হল তার হারানো শেষাংশটুকু।”

এতক্ষণ সোহেলজি চুপচাপ বসেছিলেন একপাশে। এইবার উঠে এসে তিনি দাঁড়ালেন জোহরের সামনে। গম্ভীর গলায় বললেন, “জোহর, তোমার কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে এই পুঁথির ঐতিহাসিক মূল্য আমাদের কল্পনারও বাইরে। এর সামান্য ক’টা পাতার জন্যই একদল মানুষ পাগল হয়ে গেছে। নিয়তির লীলায় না জেনেই তারা সবাই এই পাহাড়ে এসে উপস্থিতও হয়েছে। কে শত্রু, কে মিত্র বোঝা যাচ্ছে না পরিষ্কার। এই পুঁথি আমাদের রক্ষা করতে হবে। একে ঐ অরক্ষিত মন্দির থেকে সরিয়ে নিয়ে…”

দারুণ সম্ভাবনায় মুহূর্তে চোখমুখ ঝকমক করে উঠল অবিনদের। কিন্তু পরমুহূর্তেই বেঁকে বসে জোহর। বলে, “কিন্তু ওই পবিত্র পুঁথি ভোলে বাবার সম্পত্তি। ওতে হাত দেওয়া চলবে না কিছুতেই, সম্ভবও নয়। গোপন কুঠুরিতে ঢোকা বারণ আছে সে তো তোর অজানা নয়, ধনুষ! তাছাড়া গোপন মন্ত্রে পুজোর পরেই খোলে দরজা বছরে সে একবারই। ডোলি ফেরার আগের দিন নিশুতিতে।”

মুখগুলো নিমেষে অন্ধকার হয়ে উঠল অবিন, রাকেশ আর ধনুষের। এরপর ঘণ্টা দুয়েক ধরে চলল বিস্তর কথাবার্তা, বোঝানোর চেষ্টা, শেষে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়। কিন্তু জোহর তার সিদ্ধান্তে অবিচল। বেঁচে থাকতে মন্দিরের  ওই   পুঁথিতে  হাত  দিতে  দেবে না  কাউকে ।  সেদিন  আর জোহরকে ঘাঁটায়নি কেউ।

তিন

কাল রাতের সামান্য বৃষ্টির পর সকালটা বেশ ঝলমলে আজ। সোহেলজি আর ধনুষ হাঁটতে বেরিয়েছিলেন একটু। সতুরির ছোট্ট বসতিটা পাশে রেখে পুবের প্রায় সমতল ঢালটা বেয়ে নামছিলেন মন্থর চালে। দীনেশ দৌড়ে এসে ধরে ফেলল ওঁদের। ওঁরা অবাক হয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই দীনেশ হাঁফাতে হাঁফাতে খবর দিল, “দিবাকর রায়ের খোঁজ মিলেছে, সাবজি। একটু আগেই ফোন করেছিল আমার লোক। বারকোটেই একটা ঘুপচি হোটেলে লুকিয়ে ছিল। কাল বিকেলে আরও দু’জন এসে জুটেছে ওর সঙ্গে। আজই কিছুক্ষণ আগে বারকোট ছেড়ে গাড়ি নিয়ে এদিকে এসেছে।”

সোহেলজির কুঁচকে যাওয়া ভ্রূ সোজা হয়ে গেল দীনেশের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলেন, “অবিন সেনকে এক পলকের জন্যেও দৃষ্টির বাইরে রাখা চলবে না। ব্যাটারা কখন কোথায় এসে হাজির হবে ঠিক নেই। লোকাল থানায় একবার জানিয়ে রাখা দরকার।”

ওদিকে অবিন তখন বেরিয়েছে বাজারের দিকে রাকেশকে সঙ্গে করে। বাজার, বাস-স্ট্যান্ড গ্রামের কেন্দ্রস্থল সব ওই একটাই যেখানে এসে গাড়ি-রাস্তাটা এসে শেষ হল। ধনুষদের বাড়ি থেকে খানিকটা নীচে নামতে হয়। বেশ কিছুদিন হয়ে গেল কলকাতার কোনও খবরাখবর পাওয়া যাচ্ছে না। ফোনে যোগাযোগ হচ্ছে না। ধনুষদের বাড়িতে মোবাইলে নেট কানেকশন পাওয়া যায় না। এইখানে জিপ-স্ট্যান্ডে সেটা দিব্যি পেয়ে একটা চায়ের দোকানের বাইরে পাতা বেঞ্চে দু’কাপ চা নিয়ে বসল ওরা।

কলকাতায় রোজ খবরের কাগজ পড়া অভ্যেস। পাহাড়ে সেটা আর হয় না। চায়ের দোকানে তিনদিনের পুরনো একটা ইংরেজি খবরের কাগজ দেখে সেটা টেনে নিল অবিন। দেরাদুন থেকে ছাপা হয়। হিন্দুস্তান টাইমস। এখানে একদিন দেরিতে এসে পৌঁছোয় হয়তো। পাতা ওলটাতে  ওলটাতে  ভেতরের  পাতায়  হঠাৎ  একটা ছোটো খবরে চোখ

আটকে গেল অবিনের। ভীষণ এক উৎকণ্ঠা নিয়ে নিমেষে খবরটা পড়া শেষ করল ও। পড়া শেষে একরাশ আতঙ্ক এসে গ্রাস করল ওকে।

‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক সুবলচন্দ্র ভট্টাচার্যর মল্লিকপুরের বাড়িতে ভরদুপুরে দুষ্কৃতীর হানা প্রফেসরকে রিভলভার উঁচিয়ে পাশের ঘরে আটকে রেখে তাঁর সাধের লাইব্রেরি তছনছ করে দিয়ে গেছে টাকাপয়সা, সোনাদানায় হাত দেয়নি তিনজনের দল উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয় তবে প্রফেসর পুলিশে জানিয়েছেন, লাইব্রেরি থেকে তাঁর কিছু দুষ্প্রাপ্য বইপত্র খোয়া গেছে পুলিশ অপরাধীদের খোঁজ করছে

সুবলবাবু নামকরা লোক বলে সর্বভারতীয় কাগজেও খবরটা বেরিয়েছে।

তড়াক করে লাফিয়ে উঠে অবিন ফোন করল সুবলচন্দ্রকে। দরদর করে ঘামছে এই শিরশিরে আবহাওয়াতেও। অপ্রস্তুত রাকেশ জিজ্ঞেস করল, “কী হল, অবিনস্যার? কোঈ মুসিবত?”

অবিন হাত দিয়ে রাকেশকে থামতে ইশারা করে ঢোঁক গিলে বলল, “হ্যালো, স্যার? আপনি ঠিক আছেন? আর আমার সেই জিনিস?”

ওপার থেকে ভেসে এল, “আমি ঠিক আছি, অবিন। তুমি কেমন আছ? ফিরছ কবে?”

“স্যার, এইমাত্র পত্রিকায় দেখলাম… কবে ঘটেছে এটা?”

“দূরে আছ, অযথা টেনসড হয়ে পড়ো না।” প্রফেসর সামান্য হেসে আশ্বস্ত করলেন, “তোমার আমানত সুরক্ষিত আছে অবিন, ভেবো না।”

“ত-তবে যে পুলিশকে জানালেন দুষ্প্রাপ্য কিছু বইপত্র…”

অবিনকে বাধা দিয়ে সুবলচন্দ্র বলে উঠলেন, “কিছু নিয়ে গেছে সত্যি, তবে আসল জিনিসের খোঁজ ওরা পায়নি। আমি ইচ্ছে করেই বলেছি ও-কথা পুলিশকে। ওটা দরকার ছিল।”

অবিনের যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। আনমনে বলল, “আমি জানতাম এ-জিনিস আপনার কাছেই বেশি সুরক্ষিত থাকবে। তাই কলকাতা থেকে বেরোনোর আগে আপনার হাতে তুলে দিয়ে এলাম আমি।”

তারপর কী একটা বলতে যেতেই সুবলচন্দ্র বলে উঠলেন, “তুমি শিগগিরই ফিরে এসো অবিন, জমিয়ে গল্প শুনব এবারও।”

অবিন ফোন ছেড়ে দিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করতে লাগল, “গল্প নিশ্চয়ই শুনবেন, স্যার। অশ্রুতপূর্ব গল্প। তবে তার আগে একবার হয়ত যেতে হবে কোনো অজানা পথে। আমাদের কারও বোধহয় এখন নিজেদের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই আর। সবাইকে টানছে এক অমোঘ নিয়তি। একে খণ্ডানো বোধহয় কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। ডঃ মুলার স্বপ্নে দেখে আপনার বাড়ির নিখুঁত লোকেশনটা পর্যন্ত বলে দিলেন। আমাকে নিরন্তর ডেকে চলেছে অজানা সৌম্যকান্তি এক দিব্য পুরুষ। শিশিরবাবুকে দেখা দিচ্ছেন…

“…ডঃ মুলারের দিব্য ত্রিভুজের শেষ বিন্দুতে পৌঁছানো অবধি আমাদের নিস্তার নেই কারও। যেন বিরাট এক অজ্ঞাত মাকড়শা তার জাল বোনা শেষ করেছে, স্যার। শিকারকে তার কেন্দ্রবিন্দুর দিকে টেনে নিয়ে চলেছে প্রবল আকর্ষণে।”

আনমনে আরেক কাপ চা নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল অবিন। মনের অস্বস্তিটাকে কোনওভাবেই সরিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। চায়ে চুমুক দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল সে। ঘন নীল আকাশ, গত কয়েকদিন হালকা ঝড়বৃষ্টির পর আজ সকালে যেন নতুন করে সেজেছে পাহাড়। হাওয়ায় একটা শিরশিরানি অনুভব করা যাচ্ছে। কয়েকটা ছোটো ছোটো মেয়ে ঘাস তুলতে যাচ্ছে চুবড়ি নিয়ে, ছেলেরা ছাগলের পাল চরাতে বেরিয়েছে। আশেপাশের শান্ত জীবনযাত্রার দিকে তাকিয়ে অবিনের মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। এই পাহাড়ের নিরিবিলি শান্ত সমাহিত পরিবেশেও কয়েকজন মানুষ স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে হানা দিয়েছে। মানুষের লোভের কি কোনও শেষ নেই?

চার

সতুরিতে ধনুষদের বাড়িতে সোহেলের অনুরোধে জড়ো হয়েছে সবাই। গোল হয়ে বসেছেন ডঃ মুলার, শিশির, অবিন, রাকেশ, ধনুষ আর দীনেশ। সোহেলজি সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “খবর পেয়েছি দিবাকর বারকোট থেকে নৌগাঁও-পুরোলা রোড ধরে নেতওয়ারের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু সে একা নয়, তার সঙ্গে দু’জন বিদেশিও  আছে।” ডঃ মুলার গলাখাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে এখন আমাদের করণীয় কী? ওদের কী উদ্দেশ্য, তা অন্তত আমার তো কিছুই জানা নেই।”

“দিবাকর আর তার সাঙ্গপাঙ্গ যে অবিন সাহেবের পুঁথির লোভে এখানে ঘাঁটি গেড়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের কাছে তার কোনও প্রমাণ নেই। ট্রেকের মাঝ থেকে উধাও হয়ে যাওয়ার অপরাধে তো কাউকে অ্যারেস্ট করা যায় না,” সোহেলজি মাথা নেড়ে বললেন, “তবে আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে। লোকটা হঠাৎ করে উবে গিয়ে বারকোটে গেল কেন? সে যদি অবিন সাহেবের পুঁথি হাতাতেই এসে থাকে তাহলে তো তার ফিরে যাওয়ার কথা নয়! তাহলে এমন কী হল যে সে মাঝরাস্তায় ইউ টার্ন করে সাত-তাড়াতাড়ি বরকোটে পালিয়ে গেল? ওর সঙ্গের লোকগুলোই বা কে?”

ঘর নিস্তব্ধ। সোহেলজি কী বলতে চাইছেন তা পরিষ্কার। কোনও উদ্দেশ্য ছাড়া দিবাকর ফিরত না। অতএব ট্রেক চলাকালীন সে এমন কিছু খবর পেয়েছে যাতে সে বারকোটে ফিরে গিয়ে দলের অন্য লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সে-খবর তাকে কে দিল? কেন?

সোহেলজি সকলের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “আপনাদের অনেকেই যে এখানে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছেন সেটা বোঝা কঠিন নয়। একটা পুরনো পুঁথির সন্ধানে হঠাৎ সারা দুনিয়া থেকে এতগুলো লোক কাকতালীয়ভাবে একই জায়গায় এসে উপস্থিত হবে, সেটা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমি পুলিশের তরফ থেকে এখুনি অফিশিয়ালি আপনাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে থানায় নিয়ে যেতে পারি। সে অধিকার আমার আছে। কিন্তু আমি তা চাই না।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি আবার বললেন, “একজন পুলিশ অফিসার ছাড়াও আমি এই পাহাড়ের একজন মানুষ। এই দীনেশ, ধনুষ, রাকেশ আমার ভাইয়ের চেয়ে কম নয়। কোনও বাইরের লোক এসে এদের অনিষ্ট করবে সে আমি হতে দেব না। অবিন সাহেবের পুঁথির মধ্যে হয়তো এমন অনেক কথা লুকিয়ে আছে, যা আমাদের বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু আমরা একসঙ্গে চেষ্টা না করলে এই রহস্যের সমাধান অসম্ভব। কেউ কোনও কথা লুকোলে আমরা কিছুতেই এই ধাঁধার পরের পদক্ষেপে পৌঁছতে পারব না। এবার আপনারা ঠিক করুন কী করবেন।”

পাঁচ

সুনালিতে জিপ দাঁড় করানো হয়েছে ঘন্টাখানেক আগে। দূরে দিবাকরকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে চায়ের দোকানের কাছে। বাইনোকুলার থেকে চোখ সরালেন মানুষটি। এই অঞ্চলে প্রফেসর উলফগ্যাং আগেও এসেছেন কয়েকবার। প্রাচীন প্রত্নবস্তুর খনিবিশেষ এই এলাকা। অতীতেও অনেক লাভজনক জিনিসপত্র হাতিয়েছেন তিনি এখান থেকে।

কিন্তু এইবারের পরিস্থিতি অনেক ঘোরালো। জার্মানি থেকে পালানো গেছে বটে, তবে ব্যাপারটা ইন্টারপোলের হাতে গিয়েছে বলে খবর আছে তাঁর কাছে। এখানকার পুলিশও নিশ্চয়ই গালে হাত দিয়ে বসে থাকবে না। তার ওপর তিনি শুনেছেন, মুলারও এখানে এসে জুটেছে ওই পুঁথির সন্ধানে। এত বছর ধরে লোকটা একটা আকাট রয়ে গেল। সারাজীবন বইয়ে মাথা গুঁজে পড়ে রইল একটা উদ্ভট কল্পনার ওপর বিশ্বাস করে।

মুলারের কথা মনে হতেই কলকাতার সেই বুড়োটার কথাও মনে পড়ে গেল উলফগ্যাংয়ের। পরিতোষ ঠাকুর। অত মেধা নিয়ে চিরটাকাল সকলের আড়ালেই পড়ে রইল। প্রাচীন পুঁথির পাঠোদ্ধারের ওর দক্ষতার তারিফ করতে হয়। তিনি নিজেও তো এত বছর ধরে পুঁথি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন, কিন্তু সেই বুড়োটার সাহায্য ছাড়া তাঁর পুঁথির চোরাকারবার কিছুতেই এতটা সফল হত না। লোকে পুঁথি কেনার আগে তার বিষয়ের গুরুত্ব জানতে চায়। সবসময় তা আয়ত্ত করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে যতদিন ঐ লোকটা বেঁচে ছিল ততদিন তার দক্ষতার কৃপায় তাতে কোনও সমস্যা আসেনি আগে। শুধু আক্ষেপ একটাই। যে আসল কারণে তাঁর বুড়োর কাছে আসা সেটা পুরো হবার আগেই লোকটা মারা গেল।

তবে তার কথা থাক। প্রফেসর উলফগ্যাং তাঁর কাঁচাপাকা দাড়িতে হাত বুলোলেন। অ্যাদ্দিনে সেই উদ্দেশ্যটাও সফল হতে চলেছে তাঁর। মুলার নিশ্চয়ই অবিনের সঙ্গেই আছে। সুযোগ পেলে তাকেও নিকেশ করে দেওয়া যাবে। তাঁর সম্পর্কে অনেক কথাই জানে মুলার। লোকটাকে বাঁচিয়ে রাখা বিপজ্জনক। তবে আগে পুঁথিটা হাতে আসুক।

কিন্তু দিবাকর যা বলছে, তাকে বিশ্বাস করতে হলে থাপার লোক অবিন আর পুঁথি সঙ্গে করে পোখুমন্দিরের কাছে থাকবে। তিনি নিজে সেখানে না গেলে পুঁথিটা আদায় করা যাবে না।

অবশ্য এই  মুহূর্তে  দিবাকরকে  বিশ্বাস না করে উপায়ও নেই। এ-

অবস্থায় থাপাকে ফোন করে সে সত্যিই লোক পাঠিয়েছে কি না সেটা যাচাই করবার চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে। সরকারি এজেন্সিগুলো কার কোন ফোনে নজর রাখছে কে জানে!

মনে মনে উলফগ্যাং অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। অবিনের সামনে নিজে উপস্থিত থাকার ঝুঁকিটা বেশি হয়ে যাচ্ছে। দিবাকর অবিনকে কব্জা করতে পারলে তাঁকে এই রাস্তা নিতে হত না। কিন্তু অবিন নিরুদ্দেশ হতে তার জিনিসপত্রে পুঁথি খুঁজে না পেয়ে তড়িঘড়ি তাঁকে ফোন করে দেরাদুন থেকে বারকোটে ডেকে আনল।

তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী পল জিপের পেছনে বসে সিগারেট টানছিল।

তিনি পলকে জিজ্ঞেস করলেন, “অটোমেটিক গানগুলো সামনের দিকে আছে তো, পল?”

চোখ ছোটো করে সম্মতিসূচক মাথা নাড়াল পল। তার সঙ্গে নিচু স্বরে কথা বলতে লাগলেন প্রফেসর উলফগ্যাং।

ছয়

ঘরের থমথমে আবহাওয়া ছাপিয়ে ডঃ মুলার বললেন, “ইউ আর রাইট, অফিসার। আমাদের হাতে সময় কম। আপনাদের সবকথার উত্তরই আমি দেব।”

তাঁর ক্লান্ত চোখে চোখ রেখে অবিন বলল, “ডক্টর মুলার, আপনি কি প্রতিস্মৃতিবিদ্যার সন্ধানেই এইখানে এসেছিলেন?”

ডঃ মুলার মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ। তবে, এখানে এই পুঁথির ইতিহাস কিছুটা বলে নেয়া জরুরি। অবিন, তোমার ও-পুঁথির মালিক তুমি বা পরিতোষবাবু কেউই নন। এই ঘটনার সূত্রপাতও আজকে নয়। পঁয়ত্রিশ বছর আগে এই ঘটনার শুরু। আমি তখন হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ স্কলার হিসেবে কাজ শুরু করেছি।

“ইন্ডোলজি সম্পর্কে আগ্রহ ছিল আমার। কিন্তু সংস্কৃত আমি জানতাম না। সেই সময়ে আমাদের হেড অফ ডিপার্টমেন্ট ছিলেন ডক্টর হেলমুট ক্রুগার। তিনি ভারতীয় পুঁথি আর ভাষা নিয়ে সারাজীবন গবেষণা করেছেন। প্রাচীন লিপির একজন প্রখ্যাত গবেষক হওয়া ছাড়াও তিনি ইতিহাস, বিজ্ঞান আর ভাষাতত্ত্বে প্রচণ্ড আগ্রহী ছিলেন।

“আমি তখন কাজ করছি তাঁর কাছে। তিনি আমাকে নিজের ছেলের

মতোই স্নেহ করতেন। এমন সময়ে একটা নিলামে তিনি দেখতে পান রুদ্রটের লেখা একটি পুঁথি।”

ডঃ মুলার দম নেয়ার জন্যে থামতেই সোহেলজি জিজ্ঞেস করলেন, “সেই পুঁথিটাই প্রতিস্মৃতিবিদ্যা? যদি তাই হয়, সেই পুঁথি জার্মানি গেল কীভাবে?”

ডঃ মুলারের মুখে একটা হাসির রেখা দেখা গেল মুহূর্তের জন্যে। তিনি বললেন, “আমি বুঝতে পেরেছি তুমি কী বলতে চাইছ, অফিসার। ভারতের প্রত্নবস্তু বিদেশে নিলাম করা বে-আইনি তো বটেই, কিন্তু দুঃখের বিষয় যে আজকেও আন্তর্জাতিক কালোবাজারে ভারতের প্রাচীন নিদর্শন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। তোমাদের দেশ থেকে কেউ না কেউ সামান্য টাকার লোভে এইসব চুরি করে চালান করে বাইরের দেশে। আর পশ্চিমে সেই জিনিস কিনতে প্রতিপত্তিশালীরা দু’বার ভাবেন না, তা সে সরকারি মিউজিয়াম হোক বা বাইরের কোনও ব্যক্তি। ডক্টর ক্রুগারও দ্বিধা করেননি। সেই পুঁথিটাই ছিল প্রতিস্মৃতিবিদ্যা, বা ঠিকভাবে বললে, তার একটা অংশ।”

একটু থেমে দম নিয়ে মুলার ফের কথা শুরু করলেন, “কারণ, পুঁথিটা সম্পূর্ণ ছিল না। রুদ্রটের অলঙ্কারশাস্ত্রের ওপরে কাজকর্ম নিয়ে আমরা আগে থেকেই ওয়াকিফ হাল ছিলাম। কিন্তু এই পুঁথিটা ছিল একেবারেই নতুন এবং অচেনা। ডক্টর ক্রুগার আমাকে আর আরেকজন ছাত্র উলফগ্যাং অ্যামব্রোসকে নিয়ে লেখাটার পাঠোদ্ধার করার কাজ শুরু করেন।”

“উলফগ্যাং?” শব্দটা উচ্চারণ করেই সোহেলজির ভুরুদুটো কুঁচকে উঠল একবার। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বললেন, “সরি, প্রফেসর। আপনি বলুন।”

বাধা পড়ায় একটু থমকে গিয়েছিলেন মুলার। এবারে ফের গল্পের সুতোটা তুলে নিলেন তিনি। “ক্রুগার  সংস্কৃত থেকে জার্মানে অনুবাদ করতেন আর তারপর আমরা জার্মান ভাষায় তথ্যগুলো জোড়া লাগিয়ে একটা কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা করতাম।

“কিন্তু কিছুদিন পরেই ক্রুগার বুঝতে পারেন, সে বড়ো সহজ কাজ নয়। সারদা লিপিতে লেখা হলেও তার ভাষার কাঠামো সে-লিপির সময়কার সংস্কৃতের চাইতে অনেক বেশি প্রাচীন আর আলাদা। গলদঘর্ম হয়ে জার্মান ভাষায় তার আনুমানিক অনুবাদ করতে পারলেও কিছু কিছু কথা বাদে পরিষ্কারভাবে তার কোনও অর্থ বোঝা যাচ্ছে না।

“আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে রুদ্রটের এই লেখা সম্পর্কে আমাদের আগে কেউ খবর পাননি। সেক্ষেত্রে আবিষ্কারটার গুরুত্ব অপরিসীম। পুঁথিটার দামও হবে আকাশছোঁয়া। তাই সাবধান হয়ে গিয়েছিল আমাদের গোটা টিম। পুরো কাজটাই চলছিল প্রচণ্ড গোপনে।

“কিন্তু প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করা সত্ত্বেও আমরা অনুমান করতে পারলাম না লেখাটা ঠিক কী বলতে চাইছে। দেবতাদের আহ্বানের কয়েকটা সূত্র ছাড়া আর কিছুই তা থেকে বোঝা যাচ্ছে না।

কিছুদিন সেই প্রজেক্টে কাজ করবার পর উলফগ্যাং হাল ছেড়ে দিয়ে

বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গেল জীবিকার সন্ধানে। আর তার কিছুকাল বাদেই ডক্টর ক্রুগার সন্ধান পান পরিতোষ ঠাকুরের।”

“বাবা?” শিশির অস্ফুটে বলে উঠল। তার দিকে চোখ রেখে মুলার নরম স্বরে বললেন, “তোমার বাবা যে একজন জিনিয়াস হওয়া সত্ত্বেও সারাজীবন লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলেন সেকথা আমরা পরে ডক্টর ক্রুগারের কাছ থেকে জেনেছি। পরিতোষ ঠাকুরের প্রতিবেশী সুবলচন্দ্র ভট্টাচার্য নানা বিষয় নিয়ে লেখালিখি করতেন বিদেশি কাগজে। প্রাচীন সংস্কৃত আর বাংলাভাষার সম্পর্কের ওপর লেখা তাঁর একটা প্রবন্ধ পড়ে ডক্টর ক্রুগার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

“কিছুদিনের মধ্যেই ডক্টর ক্রুগার বুঝতে পারেন যে পরিতোষ ঠাকুরের সাহায্য পেলে হয়তো রুদ্রটের পুঁথির অর্থ বের করা সম্ভব। পরিতোষ ঠাকুর তেরোটা লিপিতে সংস্কৃত পড়তে পারতেন। গভীর পাণ্ডিত্য ছিল সংস্কৃতের পূর্বসূরি বৈদিক ভাষাতেও। ক্রুগারের কাছে প্রতিস্মৃতিবিদ্যার পুঁথিটার কথা জানতে পেরে স্বভাবতই তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। এরপর তাঁর অনুরোধে ডক্টর ক্রুগার গোপনে পুঁথিটা তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেন অনুবাদ করার জন্যে। আমি ছাড়া কেউ এই কথা জানত না।”

“তারপর?” অবিন প্রশ্ন করল।

“পরিতোষবাবু প্রফেসর ক্রুগারের পাঠানো পাতাগুলো নিয়ে চর্চা করে জানালেন যে সেটা অসম্পূর্ণ। রুদ্রট অলঙ্কারের পণ্ডিত ছিলেন। শব্দালঙ্কার আর অর্থালঙ্কারের ব্যবহার করা হয়েছে সর্বত্র। প্রায় প্রতিটা শ্লোক লেখা হয়েছে শ্লেষালঙ্কার যুক্ত করে। শ্লেষালঙ্কারে একটা শব্দের কয়েকটা অর্থ হয়। তার ফলে পুঁথির প্রতিটা শ্লোকের দু’রকম অর্থ আছে। একটা আমাদের খুব পরিচিত মহাভারতের অর্জুনের বনপর্বের কথা, আর আরেকটা কয়েক শতাব্দী অন্তর অন্তর বিশেষ কোনও নক্ষত্রে সৃষ্ট কোনও একটা ঘটনার কথা। কোথাও কোথাও এই দুটো কাহিনী এক হয়ে মিশে গেছে একে অপরের সঙ্গে।

“তাঁর কথা শুনে ডক্টর ক্রুগার প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি কলকাতায় পরিতোষবাবুর সঙ্গে দেখা করবেন বলে ঠিক করেন। তাঁরা একসঙ্গে যে একটা বিরাট রহস্যের সমাধান করতে চলেছিলেন সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না।

“কিন্তু অদৃষ্টের সে-ইচ্ছা ছিল না। পরিতোষবাবুর সঙ্গে ডক্টর ক্রুগারের কোনওদিনই দেখা হয়নি। কলকাতায় আসার সময় প্লেন ক্র্যাশ করে তাঁর। সব শেষ হয়ে যায় নিমেষে।”

“এরপর পরিতোষবাবুর সঙ্গে আমাদেরও আর কোনও যোগাযোগ হয়নি। প্রতিস্মৃতিবিদ্যার কাজ বন্ধ হয়ে গেল। শুধু আমাদের করা প্রাথমিক অক্ষম অনুবাদের কপিটা রয়ে গেল আমার কাছে। তারপর আমি নিজেও এ-পুঁথির কথা ভুলে গিয়ে অন্য কাজে মন দিই। শিক্ষকতার কাজ নিয়ে চলে যাই বন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

“এর প্রায় দশ বছর পর প্রাচীন এক সুমেরীয় প্রত্নলিপি পড়তে গিয়ে আমি চমকে উঠি। তাতে লেখা আছে এক সমান্তরাল দুনিয়ার কথা, যার দ্বার আছে ভারতের হিমালয়ের কোনও এক জায়গায়। প্রত্নলিপিতে খোদাই করা ছিল সেই একই আহ্বান মন্ত্র যার উল্লেখ প্রায় দশ বছর আগে আমি রুদ্রটের পুঁথিতে দেখেছিলাম!”

ডঃ মুলার চুপ করলেন কয়েক মুহূর্তের জন্যে। তারপর আবার বললেন, “পুঁথিটা কলকাতায় পরিতোষবাবুর কাছে আছে জানতাম, কিন্তু এতদিনের ব্যবধানে তাঁর কোনও সন্ধান পাওয়া আর সম্ভব ছিল না। নিরুপায় হয়ে খুঁজেপেতে ফের বের করে আনলাম আমাদের সেই প্রথম করা রুদ্রটের পুঁথির অক্ষম অনুবাদ। সংস্কৃত আগেই শিখেছিলাম। সেইদিন থেকে ফের উঠেপড়ে লাগলাম ভারতীয় সভ্যতা আর ভাষা নিয়ে। এই রহস্যের খোঁজ আমাকে পেতেই হবে। সদুক্তিকর্ণামৃত থেকে শুরু করে মহাভারত আর প্রাচীন ভাষালিপি, পুঁথি, শ্লোক, কোষকাব্য থেকে শুরু করে ভারতবর্ষের ইতিহাস – কিছুই বাকি রাখিনি সে অনুবাদের অর্থ উদ্ধারের ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে। সেই করতে করতেই বার বার মনে হত, এই পরিণত বয়সে ভারতীয় সংস্কৃত  সাহিত্যে গভীর জ্ঞান হওয়ার পর একবার যদি পুঁথিটা হাতে পেতাম!

“চেষ্টা করতে করতে যখন ফের হাল ছেড়ে দিতে বসেছি তখন উলফগ্যাংয়ের সঙ্গে আমার আবার দেখা হয় বন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা সেমিনারে। বলল, সে নাকি এত বছর ধরে পৃথিবী জুড়ে নানা জায়গায় গবেষণা করে চলেছে নানা প্রাচীন পুঁথির বিষয়ে। অবশেষে কয়েকবছর আগে আবার হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিভাগেই শিক্ষক হিসেবে ফিরে এসেছে।

“আমাদের   প্রতিস্মৃতিবিদ্যা   প্রজেক্টের   ব্যাপারে  আমার   নতুন অনুসন্ধানের সবকথা তাকে খুলে বললাম আমি। মূল পুঁথিটা সে আরেকবার দেখতে চাইতে তাকে পরিতোষবাবুর কথাও বললাম। শুনে উলফগ্যাং উত্তেজিত হয়ে বলে, এবারে সে চেষ্টা করে দেখবে পরিতোষ ঠাকুরের খোঁজ পায় কি না। এরপর সে হাইডেলবার্গ ফিরে যায়।

“এরপর বেশ কিছু বছর তার সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ ছিল না। তারপর মাত্রই কিছুদিন আগে একটা খবর পেয়ে আমি হতবাক হয়ে যাই। প্রত্নবস্তুর চোরাচালানের একটা দলের সঙ্গে নাকি উলফগ্যাংয়ের যোগসূত্র আবিষ্কার করেছে পুলিশ। কিন্তু গ্রেফতার হবার আগেই সে তাদের চোখে ধুলো দিয়ে দেশ ছেড়ে উধাও হয়েছে। সঙ্গে নিয়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নবিভাগের অর্কাইভের কিছু মূল্যবান পুঁথি।

“প্রায় একই সময়ে হঠাৎ ইন্টারনেটে কিছু খবর ভেসে উঠতে শুরু করে। তাতে দেখা যায়, ভারতে কেউ একজন প্রতিস্মৃতিবিদ্যার পুঁথি বিক্রি করতে চাইছেন। খবরটা দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। ভেবেছিলাম, পরিতোষ ঠাকুরের কাছে পাঠানো পুঁথিটা ফের কোনও পথ বেয়ে বাজারে ফিরে আসছে। আমার কৌতূহল বেড়ে উঠছিল। উলফগ্যাংয়ের দিক থেকে আমার মনোযোগ তখন সরে গেছে এই নতুন খবরটা পেয়ে।

“ব্যাপারটার দিকে নজর রাখতে শুরু করলাম আমি। তারপর সেখানেই একদিন খবর পেলাম, অবিন সেন নামে কোনও একজন মানুষ পুঁথি সঙ্গে করে কলকাতা থেকে এই এলাকার দিকে রওনা দিয়েছেন।

“হ্যাঁ অবিন, আমি তোমাকে ফলো করেই এসেছিলাম। লোক লাগিয়ে তোমার হদিশ বের করেছিলাম। তোমার কোনওরকম ক্ষতি করতে আমি চাইনি। পুঁথিটা নিয়েই আমার যত আগ্রহ ছিল। কিন্তু তোমার সঙ্গে কথা বলেই বুঝতে পারি, তুমি এই ব্যাপারে কিছুই জানো না। তোমাকে সামনে রেখে কেউ ষড়যন্ত্র করছে। আমি এবার হেরেই গেলাম।”

সোহেলজি চোখের ইশারায় ধনুষকে বললেন মুলারকে এক গেলাস জল দিতে। ধনুষ জল নিয়ে এলে তাতে চুমুক দিয়ে ডঃ মুলার বললেন, “ডাঙ্কে, থ্যাঙ্ক ইউ।”

সোহেলজি এবার ডঃ মুলারকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপনাকে জানিয়ে রাখি, আপনার প্রিয় বন্ধু প্রফেসর উলফগ্যাং মোটেই নিরুদ্দেশ হয়ে যাননি। তিনি বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন এবং আমাদের সুপরিচিত দিবাকর রায় আর তার এক স্যাঙাতকে নিয়ে এই মুহূর্তে নেতওয়ারের পোখুমন্দিরের দিকে চলেছেন।”

ডঃ মুলার চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, “কী? উলফগ্যাং এখানে আছে? তুমি তাকে…”

সোহেলজি বললেন, “ইনি আমাদের অপরিচিত নন। শিক্ষকের ছদ্মবেশে এক কুখ্যাত আন্তর্জাতিক প্রত্নচোর। ভারতবর্ষে বহুবার যাতায়াত করেছেন। মাসখানেক আগে ইন্টারপোল থেকে তাঁর নামে রেড কর্নার নোটিশ জারি হয় এবং খবর মেলে যে ইনি ফের ভারতবর্ষের দিকেই আসছেন।

“এই এলাকা থেকে একাধিকবার ইনি বহু মূল্যবান প্রত্নবস্তু পাচার করেছেন। তবে হাতেনাতে প্রমাণ না পাওয়ায় কিছু করা যায়নি। অতএব খবরটা পেয়েই আমি এখানকার প্রতিটি টুরিস্টের ওপর কড়া নজর রাখতে শুরু করি।

“এমন সময় আরও একটা ঘটনা ঘটে। একটা সর্বভারতীয় অ্যালার্ট জারি হয় যে, কোনও একটা পুঁথির সন্ধানে নেপালের কুখ্যাত স্মাগলার ব্রিজেশ থাপার লোক কলকাতার অপারেটিভ ভজনলাল তেওয়ারিকে নিয়ে সেখানকার কোনও একজন মানুষকে টার্গেট করছে। সাধারণত এগুলো রুটিন অ্যালার্ট হয়। বিষয়টাও অন্য এলাকার। কিন্তু এই কেসটায় আমার মনোযোগ টেনেছিলেন স্বয়ং অবিন। বেশ কয়েকবছর ধরে ভদ্রলোক এদিকে আসছেন। ফলে তাঁর সঙ্গে আমার পূর্ব-পরিচয় আছে। মাঝেমধ্যে কথাবার্তাও হয়।

“এরপর একদিন হঠাৎ কাকতালীয়ভাবে আমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে তিনি জানান, তাঁর বাবার জিনিসপত্রের মধ্যে তিনি সম্প্রতি প্রতিস্মৃতিবিদ্যা নামে একটা পুঁথি আবিষ্কার করেছেন এবং সেই নিয়ে কে বা কারা তাঁর খোঁজখবর শুরু করেছেন। শুনে আমি তাঁকে বিপদের কথাটা জানিয়ে এখানে চলে আসতে বলি। ঠিক হয়, তিনি পুঁথিটা ওখানেই নিরাপদ কোথাও লুকিয়ে রেখে আসবেন ও প্রচার করে দেবেন যে পুঁথিটা তিনি সঙ্গেই নিয়ে আসছেন। অবিন প্রতিবছরেই এই সময় এখানে আসেন, তাই কারও সন্দেহ হওয়াও উচিত নয়।”

“কিন্তু প্রতিস্মৃতিবিদ্যার সঙ্গে উলফগ্যাংয়ের যোগসূত্র তো আপনার জানার কথা নয়! আপনি কীভাবে…”

“সহজ। ব্রিজেশ থাপা উপমহাদেশে উলফগ্যাংয়ের এজেন্ট হিসেবে অপারেট করে সে-খবর আমাদের কাছে আছে। তার লোক যে পুঁথিটার জন্য অবিনের কাছে খোঁজখবর করছে সেটা অতএব ওই প্রতিস্মৃতিবিদ্যা হতে বাধ্য। সিম্পল ডিডাকশন, সাব। তবে ইয়েস, বইটার বিষয়ে সে-মুহূর্তে আমি কিছু জানতাম না। অবিনকে রওনা হতে বলবার পর আমার শিক্ষক প্রফেসর দীক্ষিতের কাছে এ-বিষয়ে খানিক খোঁজখবর নিয়ে বিষয়টার প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে ওঠে।

“শুধু একটা রহস্যের সমাধান হচ্ছে না, ডঃ মুলার। আপনি দাবি করছেন পুঁথিটার বিক্রির সম্ভাবনার খবর, তারপর অবিনের এই এলাকায় আসা এগুলো ইন্টারনেট থেকে জেনেছেন। সেটা ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না আমার। সাধারণত এসব তথ্য নিয়ে খুব নিয়মিত তথ্য চালাচালি ইন্টারনেটে…”

“উনি ঠিক কথাই বলেছেন, সোহেলজি,” হঠাৎ শিশিরের গলা শুনে সবাই চমকে তার দিকে তাকাল। “এর উত্তর আমার কাছে রয়েছে। সেটা শুনলে হয়তো আপনার এ সন্দেহও মিটবে। আরও একটা কথা বলি। শুধু স্মাগলার নন, উলফগ্যাং আমার কাছে একজন খুনিও বটে। কারণ, আমার বাবার মৃত্যুর কারণ একমাত্র উনি।”

ঘরে যেন এবার বাজ পড়ল। অবিন হতবুদ্ধি হয়ে শিশিরের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী বলছেন, শিশিরবাবু?”

শিশির সকলের দিকে তাকিয়ে গলা পরিষ্কার করে বলল, “ঠিকই বলেছি। এ-কাহিনির আরেকটা মিসিং পিস আমার কাছে রয়েছে। এবারে সেটা শুনুন। সোহেলজি, আমার কার্ডে শুধু আমার ডিটেকটিভ পরিচয়টাই রয়েছে। আমি ঠিক কী গোয়েন্দাগিরি করি তার কোনো হদিশ সেখানে নেই। এবারে আমি সে-কথা খুলে বলতে চাই।”

বলতেবলতেই একটা কার্ড বের করে অবিনের হাতে তুলে দিয়ে সে নিজের কথার সুতোটা ফের তুলে নিল।

“অবিনবাবু, আপনার বাবা কাশীনাথবাবুকে আমি শুধু চিনতাম বললে ভুল হবে, তিনি আমায় ছেলের মতোই ভালোবাসতেন। আমার বাবা আর কাশীবাবুর মধ্যে যে সম্পর্ক ছিল, তাকে লেখক আর মুদ্রকের সম্পর্ক বলা চলে না। তাঁরা ছিলেন প্রকৃত বন্ধু। কাশীবাবু বাবাকে চিনতেন খুব ভালো করে, আর সদুক্তিকর্ণামৃত অনুবাদের জন্যে উদ্যোগী পাবলিশিং হাউসের অভাব তাকে বিমর্ষ করেছিল। বাবার বিদ্যার ওপর তাঁর এমনই ভরসা ছিল যে তিনি নিজেই উদ্যোগ নিয়েছিলেন বাবার লেখা ছাপানোর।

“সুবলবাবুও চেষ্টা করেছিলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। দেশবিদেশের নানা পত্রিকায় তাঁর গবেষণা প্রকাশও পেত। মনে পড়ে একদিন বাবা ভারি খুশি হয়ে বলেছিলেন, সুবলবাবুর লেখা প্রবন্ধে তাঁর কথা পড়েই নাকি ক্রুগার নামে এক জার্মান পণ্ডিত একটা দুষ্প্রাপ্য বইয়ের পাঠোদ্ধার করতে পাঠিয়েছেন তাঁর কাছে।

“এরপর ব্যাপারটা বেশ কিছুদিনের জন্য থেমে যায়। বাবার পড়াশোনার জগতের বিষয়ে আমার কৌতূহল খুব একটা নেই। তাছাড়া নিজের কাজকর্ম নিয়েও ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তবে এর বেশ কিছুকাল বাদে প্রফেসর উলফগ্যাং যখন ক্রুগারের কথা উল্লেখ করে বাবার সঙ্গে চিঠিতে যোগাযোগ করলেন তখন তিনি ভারি খুশি হয়ে আমায় চিঠিটা দেখান। কাজটা তাঁর মনের খুব কাছাকাছি ছিল।”

ডঃ মুলার আশ্চর্য হয়ে বললেন, “উলফগ্যাং? কিন্তু তার কাছে পরিতোষবাবুর ঠিকানা আসবে কোত্থেকে?”

সোহেলজি এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন। এইবার মাথা নেড়ে বললেন, “সিম্পল। উলফগ্যাং হাইডেলবার্গে ফিরে গিয়েছিলেন। সেখানে এককালে ক্রুগারও শিক্ষকতা করতেন। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাফেজখানায় গিয়ে ক্রুগারের ব্যক্তিগত কাগজপত্র হাটকে ঠিকানাটা বের করে নেয়া খুব কঠিন কাজ হওয়া উচিত নয়।” বলতে বলতেই শিশিরের দিকে ঘুরে তিনি বললেন, “তারপর বলুন।”

“বাবা সরল মনের মানুষ হলেও বুদ্ধিমান ছিলেন। একটা ব্যাপারে তাঁর একটু খটকা লেগেছিল। সেটা হল, উলফগ্যাং প্রথম দর্শনেই পুঁথির ভাষ্য নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে অনেক টাকায় সেটা কিনে নেবার অফার করেন তাঁকে। তবে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয় পেয়ে তিনি সে অফারের পরেও তাঁকে বিদায় করে দেননি। কিন্তু পুঁথিটার বিষয়ে তাঁকে খুলে বলেনওনি কিছু। শুধু বলেছিলেন, সে-পুঁথি কোথায় রেখেছেন তা তাঁর খেয়াল নেই।

“উলফগ্যাং কিন্তু হাল ছাড়েননি। বাবার কথায় তিনি বিশ্বাস করেননি, বলা বাহুল্য। তাই যোগাযোগটা রেখে চলেছিলেন। আন্দাজ করবার চেষ্টা করছিলেন হয়তো, কোথায় থাকতে পারে পুঁথিটা। এই সময়টাকে তিনি অন্যভাবে কাজেও লাগান।

“আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাচীন পুঁথির মূল্য নির্ধারণ হয় লেখার বিষয়বস্তুর ওপর। অর্থ না বুঝলে চোরাকারবারও করা যায় না। অথচ সংস্কৃত বা সারদা লিপিতে তাঁর নিজস্ব দক্ষতা ছিল না। বাবার অসাধারণ মেধার কথা তিনি শুনেছিলেন ডক্টর ক্রুগারের কাছে। কাজেই এই আসা-যাওয়ার সময়টা এদেশ থেকে চুরি করা একাধিক পুঁথির অর্থ উদ্ধারের কাজে তিনি বাবাকে লাগিয়েছিলেন। আসল পুঁথিগুলোর বদলে তিনি দিয়ে যেতেন তাদের জেরক্স কপি। বলতেন, সেগুলো তাঁর গবেষণার বিষয়। বলতেন, এদের অনুবাদ হলে প্রাচীন ভারতীয় দর্শন আর ইতিহাসের অনেক কথা জানা যাবে। বাবা আপত্তি করতেন না।

“কিন্তু একদিন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ঠিকই। সেদিন আমি বাড়িতে ছিলাম। বাবা তন্ময় হয়ে তাঁর ঘরে কাজ করছিলেন। হঠাৎ তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। তাঁর হাতে কয়েকটা কাগজের জেরক্স। বললেন, উলফগ্যাং অনুবাদ করতে পাঠাল। বলল, এর মূলগুলো হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে আছে। কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে এর মূল পুঁথিগুলো বেনারস সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি দেখেছি। যতদূর মনে হচ্ছে, এটা বিদ্যাপতির দুর্লভ কাজ শ্রীমদভাগবত গীতার একটা অংশ। এই অন্য লেখাটা মাধব আচার্যের সংস্কৃত টেক্সট। উডুপিতে পি. আর. মুকুন্দ এইটার একটা অংশ ছাপিয়েছিলেন একবার। তুমি কাশীবাবুকে খবর দাও এক্ষুনি।

“বিকেলে কাশীনাথবাবু এসে বাবার সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পারি, দুটো পুঁথিই কিছুদিন আগে চুরি হয়ে গিয়েছে। এই পুঁথি হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অসম্ভব। বাবা প্রচণ্ড আঘাত পান। কাশীনাথবাবু যাওয়ার পর বার বার বলতে লাগলেন, এত বড়ো  ভুল  করলাম!  এতদিন  ধরে  একটা  ঠগ,  জোচ্চোরকে  সাহায্য করলাম! ক্ষমা নেই, এর ক্ষমা নেই।

“এর তিনদিনের  মাথাতেই  হার্ট  অ্যাটাক  হয়ে  বাবা  মারা  যান। মৃত্যুর আগে পুঁথিটাকে দিয়ে গিয়েছিলেন বন্ধু কাশীনাথ সেনের কাছে। যদি কখনও তা দিয়ে কিছু কাজ হয় এই আশায়।”

সকলে মুহ্যমান হয়ে বসে রইল। ডঃ মুলার ঘন ঘন মাথা নাড়ছেন। শিশির আবার কথা শুরু করল, “আমার তখন বয়স কম। বাবার কাজের মূল্য সম্পর্কে কোনও স্পষ্ট ধারণা ছিল না। কিন্তু মনের ভেতর জেদ চেপে গেল। এই লোকটাকে শাস্তি পেতে হবে। শুধু উলফগ্যাং নন, যত স্মাগলার আছে কাউকেই রেহাই দেওয়া যাবে না।

“পড়াশোনা শুরু করলাম। বাবার হাতে লেখা প্রতিস্মৃতিবিদ্যার কয়েকটি নোট ছিল। পড়ে দেখলাম। ততদিনে ইন্টারনেট এসে গেছে। আস্তে আস্তে জানতে পারলাম, ইন্টারনেটে কিছু গোপন সাইট বানিয়ে কোড ওয়ার্ডের মাধ্যমে প্রাচীন জিনিসের লেনদেন চলে। কোটি কোটি ডলারের ব্যাবসা। ঠিক করলাম, এই পথেই এগোতে হবে আমাকে।

“বছরখানেক সময় লেগেছিল আমার সাইবার দুনিয়ার অ-আ-ক-খ রপ্ত করে নিতে। তারপর যন্ত্রপাতি জোগাড় করে, ভুয়ো আইডেন্টিটি তৈরি করে জাল ছড়াতে শুরু করলাম। একদিকে পুলিশবিভাগের কিছু অ্যান্টিক স্মাগলিং এর কেস-এ সাহায্য করে সেখানে একটা জমি তৈরি করে নিলাম। পাশাপাশি সাইবার ক্রাইমের অন্যান্য শাখার ডিটেকশনেও পুলিশবিভাগে নাম হচ্ছিল একটু আধটু। আর সেইসঙ্গেই শুরু হল একের পর এক ফাঁদ পাতবার পালা।

“কিন্তু উলফগ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ পাচ্ছিলাম না। পাওয়ারফুল লোক। একটা ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত। এমনিতে কাবু করা যাবে না। তবে ধৈর্যের অভাব আমার ছিল না। জানতাম, একদিন না একদিন আমার ফাঁদে পা তাঁকে দিতে হবেই।

“তারপর হঠাৎ করেই কয়েকমাস আগে কপাল খুলল। ইমিগ্রেশন দফতরের একটা পাসপোর্ট নজরদারির তালিকা নিয়ে সরকারী বরাতের কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ তার মধ্যে উলফগ্যাংয়ের নামটা ভেসে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গেই খবর নিয়ে জানলাম, তিনি জার্মানি থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন। ইন্টারপোল রেড কর্নার নোটিস জারি করেছে তাঁর নামে।

“মানুষটা এখন একটু বেকায়দায় আছেন। সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে এইবার ফাঁদ পাতলাম। যে টোপটা তাতে দিলাম, জানতাম তার লোভ সামলানো তাঁর সাধ্য হবে না। বে-আইনি শিল্পদ্রব্যের অকশন হাউসের একটা ফেক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে তার থেকে নোটিস দিলাম, আমার সন্ধানে রুদ্রটের প্রতিস্মৃতিবিদ্যা পুঁথির একটা অংশ আছে।

“মাছ ধরার জন্যে কতরকম ফাঁদ পাততে হয়। যা ভেবেছিলাম তাই হল, নানান লোকজন যোগাযোগ করতে লাগল সাইটে। তবে আসল লোক আসা না পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে আমার হ্যান্ডলার মৃনালকে  বলে রেখেছিলাম এ-সম্পর্কে কোনও খবর তার কাছে এলে তা জানাতে। তিনদিনের মধ্যেই সে জানাল, কলকাতার ভজনলাল তেওয়ারির ফোন ট্যাপ করার সময় প্রতিস্মৃতিবিদ্যার কথা সে শুনতে পেয়েছে। জার্মানির এক পার্টি সেটা কিনতে আগ্রহী। অতএব দুয়ে দুয়ে চার করে নিলাম।

“অবিনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ইচ্ছে করেই করিনি। আগেভাগে তাকে সমস্ত বিষয়টাতে জড়িয়ে ব্যতিব্যস্ত বা বিপদে কোনওটাতেই ফেলতে চাইনি। একই কারণে সুবলবাবু মানে স্যারের সাথেও  যোগাযোগ  রাখিনি।  নইলে  এ-যুগে  কলকাতা  শহরে কাউকে খুঁজে বার করা কী আর শক্ত কাজ! আমার উদ্দেশ্য ছিল অন্য।

“এর একদিনের মধ্যেই তেওয়ারির ফোন পেলাম। অবিনের সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ আছে কি না খোঁজ করছিল সে। জরুরি দরকার নাকি। তাকে বলে দিলাম, সে ব্যাপারে আমার কিছু জানা নেই।

“এদিকে মৃনাল এর মধ্যেই জানিয়েছে যে উলফগ্যাং নিজেই নকল পাসপোর্ট নিয়ে ভারতে চলে এসেছে। নেপালের ব্রিজেশ থাপার এক শাগরেদ বলবন্ত সিংকে দেরাদুন থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ এই খবর জানতে পেরেছে। তেওয়ারি খবরটা জানত না।

“উপায় না দেখে এবারে অবিনের সঙ্গে যোগাযোগ করবার চেষ্টা করি। স্যারকেও ফোন করি, কথা হয়। কিন্তু অবিনের স্ত্রী জানান, অবিন ট্রেকিংয়ে বেরিয়েছেন। আর হ্যাঁ, পুঁথিটাও নাকি ইনি সঙ্গে নিয়েই গেছেন। বুঝলাম, এবার মোক্ষম সুযোগ পাব রাঘব বোয়ালটিকে ধরার, সেই সঙ্গে অবিনেরও কোনও বিপদ হতে দেওয়া যায় না। তক্ষুনি সিদ্ধান্ত নিই এখানে আসার।

“এইবার টোপ দেবার পালা। ফেক সাইটে একটা পোস্ট দিলাম অবিন পুঁথি নিয়ে এই এলাকায় এসেছেন বলে। উলফগ্যাং যে সাইটের দিকে নজর রাখবে তা বলাই বাহুল্য। এইভাবে দলবল নিয়ে সে যাতে এখানে আসে সেটা মোটামুটি নিশ্চিত করে বলবন্ত সিংয়ের ছদ্মবেশ নিয়ে এইখানে এসে হাজির হলাম আমি। এখানেই কোথাও তাকে ফাঁদে ফেলবার পরিকল্পনা নিয়ে।

“কিন্তু সোহেলজি যে ছদ্মবেশে আমাদের সঙ্গে চলেছেন, বুঝতে পারিনি। এর মাঝে দেখি, সুবলবাবুর বলা সেই দিবাকর রায়ও এসে জুটেছে এখানে অবিনের খোঁজে। এদের নেটওয়ার্কের ব্যাপারে আমার যা জ্ঞান আছে সেটা ব্যবহার করে আমি যে এদের দলের লোক সেটা দিবাকরকে বোঝাতে বেশি বেগ পেতে হয়নি আমায়। তার সঙ্গে কথা বলে যখন বুঝলাম থাপাকে সে একেবারেই চেনে না তখন বললাম, আমি থাপার লোক। গোটা কাজটার গোপনে নজরদারি করতে এসেছি। অবিনকে চোখে চোখে রেখে আর তার পুঁথি নিয়ে নেতওয়ারে পোখুমন্দিরে দেখা করব, কিন্তু ফার্স্ট পার্টি না এলে পুঁথি বিক্রি হবে না। সে যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জার্মান সাহেবদের সঙ্গে করে পোখুমন্দিরের কাছে অপেক্ষা করে।”

সকলে অবাক  হয়ে  তার দিকে তাকিয়ে ছিল। অবিনের মাথা খালি খালি মনে হচ্ছে। এত ঘটনা একসঙ্গে চলছে যে সব জট পাকিয়ে গেছে। বাকি কারও মুখে কথা নেই। শুধু দীনেশ বারবারই শিশিরের দিকে ঘুরে দেখছিল। খানিক বাদে অবিনের হাত থেকে শিশিরের কার্ডটা নিয়ে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে খানিক ঘাবড়ানো গলায় বলে, “শিশির ঠাকুর। সাইবার ফরেনসিক ইনভেস্টিগেটর। বহ হৈ কওন সা চিজ?”

এইবার সোহেলজি কথা বললেন। “ইয়েস। দ্য এনিগম্যাটিক ‘এস.টি’। ডিপার্টমেন্টে এঁর নাম এতদূরে বসেও শুনেছি আমরা। জিনিয়াস আইটি বিশেষজ্ঞ ডিটেকটিভ। দ্য গ্রেট মাইক্রফট হোমস অব টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি ক্যালকাটা! কার্ডটা দেখবার পর থেকেই সন্দেহের খাতা থেকে এঁর নামটা বাদ দিয়েছিলাম আমি। নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় ইনি দেয়া না পর্যন্ত আপনাদের কাছে এঁর অনুরোধেই তা ভাঙিনি। তবে হ্যাঁ, এই কেস-এ এঁর এই পার্সোনাল অ্যাঙ্গলটা আমার জানা ছিল না।”

সাত

জোহর মাথা নিচু করে সোহেলজির কথা শুনছিল। সূর্য অস্ত যেতে বেশিক্ষণ বাকি নেই। আকাশে একটা কমলা আভা লেগে আছে। দূরের পাহাড়ের দিকে তাকালে ঘোর লেগে যাচ্ছে। অনেক নীচে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে টনস নদী।

সকালের লম্বা আলোচনা আর প্রত্যেকের বক্তব্য শোনার পর এখন অনেকটাই হালকা লাগছে অবিনের। একটা ক্ষীণ আশা দিয়েছে তার মনে এই রহস্যের সমাধানের। শিশির আর ধনুষকে সঙ্গে করে অবিন আর ডঃ মুলার বাড়ির পেছনদিকে উঁচু পাহাড়টার ওপর বসে ছিল। এখান থেকে সূর্যাস্ত দেখতে অপূর্ব লাগে। খানিকক্ষণ একদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে শিশির বলল, “ধনুষ, তোমাদের গ্রামটা কী সুন্দর! তুমি কখনও একা থাকলে এখানে এসে সূর্যাস্ত দেখো না?”

ধনুষ বলল, “দেখব না কেন? আমি তো হামেশাই এখানে চলে আসি। কখনও কখনও সালুও আসে আমার সঙ্গে। দাদি বলে, আমাদের মাথা খারাপ।” বলে ধনুষ হাসতে লাগল। অবিন আর শিশিরও হাসতে লাগল তার সঙ্গে।

ডঃ মুলার বললেন, “যতদিন তোমাদের মাথা খারাপ থাকবে এরকম, এই জায়গাগুলো একইরকম সুন্দর রয়ে যাবে।”

“ওই যে সোহেল সাব আসছে।” হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ধনুষ আঙুল দিয়ে দেখাল। ওরা দেখল, রাকেশ আর জোহরকে নিয়ে সোহেলজি উঠে আসছেন ওদের দিকে।

ওপরে উঠে এসে জোহর শিশিরের সামনে দাঁড়াল। বলল, “ভাইয়া, আমি সব শুনেছি। সোহেল স্যরজি আমাকে সব বলেছেন। তোমার পিতাজি যে কাজ করেছেন তা আমি বরবাদ যেতে দেব না। আমি তোমাকে ওই মন্দিরের কথা বলব যেখানে এই পুঁথি রাখা আছে।”

“তার মানে? ও-পুঁথি তো সোমেশ্বরের মন্দিরের গোপন কুঠুরিতেই…” অবিন উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল।

জোহর মাথা নাড়ল। “না। আগে ওই পুঁথি সোমেশ্বর মন্দিরেই ছিল। কিন্তু বাবাকে সাধুবাবা স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন ওই পুঁথি অন্যত্র সরিয়ে দিতে। বলেছিলেন, নিশ্চিত না হয়ে যেন কাউকে আসল জায়গার

সন্ধান না দেয়া হয়।”

ধনুষ জিজ্ঞেস করল, “সাধুবাবা মানে কোন সাধুবাবা?”

জোহর বলল, “ফলাহারী বাবা, যিনি বছরের বেশিরভাগ সময়ে শুধু হাওয়া খেয়ে থাকেন। সহস্রতালের কাছে  কিসমত ভালো থাকলে তাঁকে কেউ কেউ দেখতে পায়।”

“তা এখন তুমি নিশ্চিত হলে কোন বিশ্বাসে?”

হলাম সাহেবের স্বপ্নের কথা শুনে। সোহেল ভাইয়া আমাকে সেই স্বপ্নের কথা বলেছেন। বাবাকে সাধুবাবা স্বপ্নে ওই কথাই বলে গিয়েছিলেন। যদি কেউ এসে ওই স্বপ্ন দেখেছেন বলে জানান তাহলে তিনিই পুঁথির আসল হদিশ জানবার যোগ্য অধিকারী।”

“সেই পুঁথি কোথায় রয়েছে জোহর?” ডঃ মুলার এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিলেন। এইবার নিচু গলায় তিনি কথা বলে উঠলেন।

তাঁর দিকে সমীহভরা দৃষ্টিতে ঘুরে দেখছিলেন সোহেলজি। পুলিশ বিভাগের কর্মী হলেও এই এলাকার মানুষ তিনি। এখানকার বিশ্বাস তাঁর রক্তে রয়েছে। তাকে তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। মুলারকে আর তিনি কোনওভাবেই সন্দেহের তালিকায় রাখতে পারবেন না।

“বাবা শেষপর্যন্ত ওটা রেখে এসেছিল জিহুগাদের মন্দিরে।”

“জিহুগাদের মন্দির? সেটা কোথায়? এরকম কোনও মন্দিরের কথা তো শুনিনি আমি এতদিন!” অবিন অবাক হয়ে বলল।

জোহর তার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবাকে ফলাহারী বাবা স্বপ্নে বলেছিলেন এই মন্দিরের কথা। নেতওয়ার থেকে বিটরি হয়ে মাসুন্ধা ধার দিয়ে এগিয়ে গেলে পথে কোথাও পড়ে এই মন্দির। জিহুগারা স্বর্গ অভিযানের আগে প্রতিস্মৃতিবিদ্যার পাঠ নিয়েছিল সে-জায়গায়। এ-মন্দির তারই স্মৃতি।”

“তুমি গিয়েছ?”

জোহর হাসল। “বাবা আদেশ পেয়েছিলেন, তাই যেতে পেরেছিলেন। আমি কখনও ও-পথে যাইনি। তাছাড়া আমরা সাধারণ মানুষ… ভোলে বাবার আশীর্বাদ ছাড়া ও-পথে যাওয়া অসম্ভব।”

“মন্দিরটার কোনও বিবরণ তিনি বলেছিলেন?”

জোহর নিঃশব্দে দু’দিকে মাথা নাড়ল।

“কিন্তু তাহলে সে-মন্দির আমরা খুঁজে পাব কেমন করে?”

সোহেলজির  তখন  এদিকে  কান  ছিল না। একটা ম্যাপ খুলে বসে তার ওপর উদ্বিগ্ন মুখে আঙুল চালাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ জোহরের কথা শেষ করতে না দিয়েই তাঁর শান্ত গলাটা বেজে উঠল। “মন্দিরের রহস্য পরে ভাবা যাবে। উপস্থিত বিটরি অবধি যে যেতে হবে সেটা তো নিশ্চিত। যেতে হলে আমাদের আর দেরি করা উচিত হবে না। মাসুন্ধা ধার অনেক ওপরে।”

রাকেশ সোহেলজিকে প্রশ্ন করল, “কিন্তু শিশির  ভাইয়া  যে  অবিন ভাইয়াকে নিয়ে পোখুমন্দিরে যাবে বলেছে দিবাকরকে, সেটার কী হবে?”

সোহেলজি অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “উলফগ্যাংকে আমি ছাড়ব না হে। একটা প্ল্যান করেছি। তোমাদের সকলের সঙ্গে সেটা আলোচনা করে নেব বেরোনোর আগে। কিন্তু খবরদার, কেউ যাতে ঘুণাক্ষরেও টের না পায় এই কথা। শিশিরজি, আপনি একটু আমার সঙ্গে আসুন তো।”

শিশির আর সোহেলজি টিলা থেকে নীচের দিকে নেমে গেলেন। অবিন ডঃ মুলারের দিকে চেয়ে দেখল, তিনি তাঁর নোটবুক বের করে কিছু লিখছেন। সে জিজ্ঞেস করল, “ডঃ মুলার, আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? জোহর যা বলল, তাতে মন্দিরটাকে এই পাহাড়-জঙ্গলে খুঁজে বের করা…”

“জানি না, অবিন। এখনও জানি না। তবে এইটুকু জানি, সঠিক সময়ে নির্দেশ আসবে। এতদিন অবধি তাই তো ঘটে চলেছে।”

“বুঝলাম না, ডঃ মুলার।”

মুলার মৃদু হাসলেন। “তোমার, শিশিরের আর আমার স্বপ্নগুলোর কথা ভাবো অবিন। তোমরা বারবার একটা আহ্বান পেয়েছ। আর আমি পেয়েছি কিছু নির্দেশ। একটা পুঁথির পূর্ণাঙ্গ রূপকে খুঁজে বের করবার নির্দেশ। আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না। কিন্তু তারপর কাকতালীয়ভাবে কিছু ঘটনা ঘটে চলল, যা আমাদের একই সঙ্গে একই জায়গায় এনে ফেলল।

“একটা গভীরতর খেলা চলেছে এখানে, অবিন। এক অদৃশ্য খেলোয়াড়ের সুতোর টানে সে খেলার ঘুঁটিগুলো এইখানে একত্রে এসে জমা হয়ে চলেছে। সম্পূর্ণ পুঁথি খুঁজে বের করা সে খেলার পরের ধাপ। সেই অবধি নির্দেশ পাওয়া গেছে যখন, তখন সে-ধাপ পুরো হলে…”

“কিন্তু  কেন?  আপনি যা ভাবছেন তা যদি সত্যিও হয় তাহলে এই খেলার অর্থ কী?”

“জানি না, অবিন। অনেক কিছুই জানি না। হয়তো সময় এই সমস্ত না-জানা প্রশ্নের উত্তর দেবে। উপস্থিত মন্দিরটার সঠিক নিশানা চাই আমার। খেলার দ্বিতীয় ধাপ পুরো করবার আগে আমি নিজেই সে উত্তর খুঁজব।”

“আপনি…”

ডঃ মুলার মাথার চুলে কিছুক্ষণ আঙুল চালিয়ে বললেন, “হ্যাঁ। একটা পথ আছে। তবে এখন নয়। যথাসময়ে আমি বলব তোমাদের সেকথা। তার আগে উলফগ্যাংয়ের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া হয়ে নিক।”

“কিন্তু তার সঙ্গে এই মিশনের কী সম্পর্ক?”

“সম্পর্ক আছে, অবিন। কেন সেই অন্ধকারের জীবও এইভাবে এ-খেলায় জড়িয়ে পড়ে ভেসে এল এখানে? ঘটনার পর ঘটনা সাজিয়ে তুলে কে এখানে এনে পৌঁছে দিল তাকে? সেও কি কোনও স্বপ্ন দেখে চলেছে? এ খেলায় তার ভূমিকা আমি জানি না। একটা আননোন ফ্যাক্টরকে এভাবে অমীমাংসিত ছেড়ে রেখে পরের ধাপে এগোতে সাহস করব না আমি।”

আট

“পুত্র রূপসেন!”

বাতাসে সামান্য কাঁপুনিও জাগল না। শুধু বায়ুমণ্ডলে ছেয়ে থাকা সুক্ষ্ম বিদ্যুৎমণ্ডলে একটা নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের কাঁপুনি তুলে সেই অশ্রুত ডাক ধেয়ে গেল পাহাড় থেকে পাহাড়ে। নির্জন, নিস্তব্ধ পাহাড়ের শরীরে সাড়া জাগাল সেই ডাক। যেন তার জবাবেই মৃত পাথরের শরীর থেকে ভেসে উঠছিল শত শত ছায়ার দল। দীর্ঘ ঘুমের পর অবশেষে প্রভুর ডাক পেয়ে ফের প্রাণসঞ্চার হয়েছে তাদের।

কয়েক মুহূর্ত বাদে বাতাসে ভাসমান সোনারঙের বর্ম পরা শরীরটার সামনে নতজানু হল একটা রাজপোশাক। তার পেছনে অসংখ্য ছায়াশরীর নিঃশব্দে অপেক্ষা করে।

“আদেশ, শ্রদ্ধেয় অর্জুন।”

“ঈশ্বরপ্রদেশে  আমার  অতিথি আসছেন।  আজ  তাঁর  প্রাণ  বিপন্ন হবে। তাঁকে  রক্ষা  করতে  হবে। তিনদিন পরে, বিসর্পিণীর উল্কাপাতের মুহূর্তে তাঁকে অভিষেকযন্ত্রের কাছে পৌঁছে দিতে হবে তোমাকে।”

“আদেশ শিরোধার্য, প্রভু। অতিথির বিবরণ?”

“দেখো।”

জিহুগাপতির ইশারায় রূপসেনের সামনে তখন ভেসে উঠেছে নেতওয়ারের কাছে পোখু মহাদেব মন্দির ছাড়িয়ে কিছুদূরের একটা রাস্তার ছবি। সেখানে খাদের ধারে দাঁড়িয়ে আছে এক শ্বেতাঙ্গ আর্য। অল্প দূরে একটা অদ্ভুতদর্শন রথ। ছোটো একটি ঘরের মতো চেহারা। তলায় চারটি চাকা। কোনও ঘোড়া বা গবাদিপশু তার সামনে বাঁধা নেই।

এক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে দেখল মুণ্ডহীন রাজমুকুট। তারপর তার সৈন্যদের দিকে ইশারা করে নিঃশব্দে বাতাসে ভেসে উঠল তার দেহহীন রাজপোশাক। ছায়াসৈন্যের দল ততক্ষণে ফের মিশে গেছে পাহাড়ের শরীরে। তাদের নেতার মানসিক আদেশ ঠিকই পৌঁছে গেছে তাদের কাছে।

নয়

নেতওয়ারের কাছে পোখু মহাদেব মন্দির ছাড়িয়ে ধৌলা-সেওয়া রোডে খানিকটা এগিয়ে খাদের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন প্রফেসর উলফগ্যাং। জিপটা পার্ক করে রাখা আছে খানিকটা এগিয়ে। রাত প্রায় আটটা হবে। কিন্তু মনে হচ্ছে যেন মধ্যরাত। শীতের দাপটে লোকজন বহু আগে ঘরে ঢুকে গেছে। বাঁদিকে খাদে অনেক নীচে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে রুপিন-সুপিনের মিলিত জলধারা যা নেতওয়ারের থেকে নীচের দিকে টনস নদী নামে পরিচিত হয়েছে।

কালো জ্যাকেট পরে আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে প্রফেসর উলফগ্যাং একটা সিগারেট টানছিলেন। পাশে পাথরের ওপর উবু হয়ে বসে দিবাকর ঘন ঘন হাতঘড়ি দেখছিল। বলবন্ত সিং তাকে ফোন করে এখানেই অপেক্ষা করতে বলেছে উলফগ্যাং সাহেবকে নিয়ে। লোকটা অবিন সেনকে নিয়ে এখানেই আসবে পুঁথি লেনদেন করতে। টেনশনে এত শীতেও ঘেমে যাচ্ছিল দিবাকর। কী ঝামেলাতেই না পড়েছে সে! তেওয়ারিজির কাজ করতে গিয়ে প্রাণটাই না দিতে হয়। বলবন্ত সিংয়ের কথামতো লুকিয়ে ট্রেক থেকে ফিরে আসাই যে কী ঝক্কি! তারপর নীচে এসে তেওয়ারিজির সঙ্গে কথা বলে বারকোটে এই উলফগ্যাং সাহেবকে ডেকে আনতে আরও এক ঝক্কি। জেরবার হয়ে গেছে সে বোঝাতে বোঝাতে। এরা যে লোক সুবিধের নয়, তা সে প্রথমদিনেই বুঝতে পেরেছে। কিন্তু কী আর করবে। এখন কাজটা মিটলে সে সোজা কলকাতা ফিরবে।

ডানদিক থেকে  একটা  জিপ  আসছে। প্রফেসর উলফগ্যাং হাতের সিগারেটটা ফেলে দাঁড়ালেন। দিবাকরের কাছে এসে গাড়ি থেকে নামল বলবন্ত সিং আর আরেকজন মানুষ। অবিন সেনই হবে।

দিবাকরের দিকে চেয়ে বলবন্ত বলল, “ইনি অবিন সেন। পুঁথিটা এঁর সঙ্গেই আছে।”

দিবাকর তার দিকে এগোতেই অবিন হাত তুলে ইংরেজিতে বলল, “দেয়ার ইজ নো নিড ফর ফর্মালিটিজ। পার্টি কোনজন? আমি বেশিক্ষণ সময় নষ্ট করতে চাই না।”

এইবার প্রফেসর উলফগ্যাং এগিয়ে এসে বললেন, “আমার নাম প্রফেসর উলফগ্যাং অ্যামব্রোস। আমিই পুঁথিটা কিনব আপনার কাছ থেকে।”

অবিন আপাতমস্তক নিরীক্ষণ করে বলল, “ওকে। আই নিড হাফ আ মিলিয়ন ডলার। কোনওরকম নেগোসিয়েশন করতে চাই না।”

প্রফেসর উলফগ্যাং চোখ সরু করে উত্তর দিলেন, “পেয়ে যাবেন। বাট লেট মে চেক দ্য পিস ফার্স্ট।”

অবিন তার ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করল। তার থেকে সেলোফেন পেপারে মোড়া কাঠের পাটাতনে রাখা তিন ইঞ্চি বাই ছয় ইঞ্চির একটা প্যাকেট বেরোল। ততক্ষণে দিবাকর একটা ছয় ব্যাটারির বড়ো টর্চ বের করে ফেলেছে।

প্রফেসর উলফগ্যাং খুব সাবধানে পুঁথির প্রথম পাটাটা খুললেন। তারপর টর্চের আলো ফেলে এক ঝলক দেখে নিয়েই অবিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই পুঁথিটা জাল। আমাকে ঠকাবার চেষ্টা করবেন না, মিঃ সেন। আসল পুঁথিটা বের করুন।”

জবাবে অবিনের মুখে একটা হাসি খেলে গেল। সহাস্যে বলল, “আই ওয়ান্টেড টু চেক ইওর ক্রেডেনশিয়াল, ডক্টর। যারা পুঁথি চেনে না, সেরকম সেকেন্ড পার্টি স্মাগলারদের সঙ্গে আমি ডিল করি না। কিন্তু আপনি একজন জেনুইন অথরিটি। আপনি বুঝলেন কী করে যে পুঁথিটা জাল?”

এইবার প্রফেসর উলফগ্যাং একটু হাসলেন। “লুকস লাইক ইউ আর আ ট্রু প্লেয়ার, মিঃ অবিন। এই প্রতিস্মৃতিবিদ্যা পুঁথি আমি আগেই দেখেছি হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। রুদ্রট কাশ্মীরি পন্ডিত ছিলেন। আপনার পুঁথিটা দেবনাগরী লিপিতে লেখা। রুদ্রট পুরো পুঁথিটাই লিখেছেন সারদা স্ক্রিপ্টে। কাশ্মীরের সব পুঁথিই রুদ্রটের সময় সারদা স্ক্রিপ্টেই লেখা হত। ও-পিরিয়ডের বহু পুঁথিই এখান থেকে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে চালান করেছি আমি এর আগে। আমাকে ধোঁকা দেওয়া কঠিন।”

অবিন একদৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়েছিল। এবার তার মুখে হাসি দেখা গেল। সে বলল, “আসল পুঁথিটা আপনাকে দেখাই।”

বলতে বলতেই সাইড ব্যাগে হাত দিয়ে অবিন চকিতে বের করে আনল একটা রিভলভার। সে বলল, “প্রফেসর উলফগ্যাং, তোমার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই তোমায় ডোবাল। আমি অবিন নই, পুলিশ অফিসার সোহেল দাওয়াস। তোমার নিজের মুখে বলা অপরাধের স্বীকৃতি আমরা রেকর্ড করেছি। তোমাকে জেলে পাঠাতে বেশি অসুবিধে হবে না। ইওর গেম ইজ ফিনিশড। ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।”

প্রফেসর উলফগ্যাংয়ের মুখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। দিবাকর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে বসে পড়েছে। শিশির ওরফে বলবন্ত সিং তাকে ঠেলা দিয়ে বলল, “তুমিও চল হে। জিপে বসো। ইউ টু, ডক্টর।”

এমন সময় পেছনদিক থেকে চকিতে একটা গুলি এসে সোহেল দাওয়াসের হাত থেকে রিভলভারটাকে ছিটকে দিল। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি। সুযোগ পেয়ে দিবাকর আর প্রফেসর উলফগ্যাং তখন দৌড়োতে শুরু করেছে তাদের জিপের দিকে। সেদিকে এগোতে যেতেই পেছনের অন্ধকার থেকে আবার কয়েকটা গুলি ছুটে এল শিশির আর সোহেলজির দিকে। শিশির চিৎকার করে বলল, “টেক কভার, সোহেলজি। ওদের দলের কোনও লোক রাস্তার ওপর থেকে গুলি চালাচ্ছে। জিপের পেছনদিকে চলুন।”

বলতে বলতেই শিশির নিচু হয়ে মাটি থেকে সোহেলজির রিভলভার তুলে গুলি চালাল অদৃশ্য আততায়ীর দিকে। তারপর সোহেলজিকে ধরে জিপের পেছনে নিয়ে বসাল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “শয়তান!”

ততক্ষণে  প্রফেসর  উলফগ্যাং জিপের ইঞ্জিন চালু করে দিয়েছেন। তার মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন নেতওয়ারের দিকে। সেদিকে দেখিয়ে সোহেলজি কাঁপা স্বরে  বললেন, “ওরা পালাচ্ছে।”

শিশির ততক্ষণে গুঁড়ি মেরে নিজেদের জিপের ভেতরে ঢুকে গিয়ে হেডলাইটদুটো জ্বালিয়ে দিয়েছে। তারপর জিপের আড়ালে পজিশন নিয়ে চাপা স্বরে বলল, “মার্ক্সম্যানটাকে না নিয়ে ওরা যাবে না, সোহেলজি। ব্যাটাকে এই আলোর মধ্যে দিয়ে ছুটতে হবে ওই জিপের দিকে। একটা চান্স…”

কথাটা বলতে না বলতেই হঠাৎ অন্ধকার থেকে নিখুঁত লক্ষ্যে দু-দুটো গুলি ছুটে এসে চুরমার করে দিল হেডলাইটদুটোকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই অন্ধকারের মধ্যে জিপের পাশ থেকে গড়িয়ে রাস্তার ওপরে উঠে এসে দ্রুত ছুটন্ত একটা পায়ের শব্দকে লক্ষ্য করে আগুন ওগরাল শিশিরের রিভলভার।

ছুটন্ত লোকটা ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। সোহেলজি অস্ফুটে বললেন, “মেরে ফেললেন?”

শিশির অভয় দিয়ে বলল, “না, পায়ে গুলি করেছি।”

উলফগ্যাংয়ের জিপ ততক্ষণে সঙ্গীর আশা ছেড়ে দিয়ে তিরবেগে ছুটতে শুরু করেছে পথ ধরে।

জিপ স্টার্ট করে আহত লোকটাকে হাতকড়া পরিয়ে শিশিররাও ফেরবার পথ ধরল এবার। সোহেলজির ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ করা দরকার আগে। শিশির গাড়ি ড্রাইভ করে পোখুমন্দিরের কাছে এসে পড়ল। সোহেলজি ওয়ারলেসের মাধ্যমে মোরি পুলিশ স্টেশনে খবর দিয়েছিলেন প্রফেসর উলফগ্যাংয়ের গাড়ি আটক করার জন্যে।

কাছাকাছি একটা মেডিকেল সেন্টারে গিয়ে সোহেলজি আর আহত লোকটার ঘায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা হল। লোকটাকে আটকে রাখা হল একটা ঘরে যতক্ষণ না পুলিশ এসে তাকে নিয়ে যাচ্ছে।

প্রথমদিকে ফাঁদে পড়া বাঘের মতো ফুঁসলেও সোহেলজির হাতে পড়ে লোকটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, লোকটার নাম পল। প্রফেসর উলফগ্যাংয়ের সহকারী এবং তাঁর কথাতেই সে লুকিয়ে ছিল রাস্তার ওপারে। উদ্দেশ্য, পুঁথি নেওয়ার পর অবিন সেনকে শেষ করে দেওয়া।

অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। অবিনরা কাছেই দীনেশের চেনা একজনের  বাড়িতে  অপেক্ষা করছিল। সোহেলজির হাতে ব্যান্ডেজ দেখে সকলেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। শিশির তাদের সবকথা জানাল। সোহেলজি আশ্বাস দিলেন যে প্রফেসর উলফগ্যাং ধরা পড়বেই।

পরদিন সকালে সোহেলজি স্থানীয় পুলিশের কাছে দুঃসংবাদটা পেয়েছিলেন। ধনুষদের বাড়ি ফিরে এসে সকলের কাছে খবরটা জানালেন, “প্রফেসর উলফগ্যাং প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন। জিপটা পুলিশ রাস্তার অনেক নিচ থেকে উদ্ধার করেছে। বাট হিজ বডি ওয়াজ নট ফাউন্ড।”

“আর দিবাকর? সে বেঁচে আছে?”

অবিনের প্রশ্নে সোহেলজি দু’দিকে মাথা নাড়লেন। “তার বডিটা পাওয়া গেছে।”

সকলের মনটাই ভারী হয়ে গেল এই সংবাদে। সামান্য লোভের জন্যে বেচারাকে প্রাণ দিতে হল। দিবাকর এমন কিছু অপরাধ করেনি যে তাকে এত বড়ো শাস্তি পেতে হবে। অথচ আসল অপরাধী এখনও নাগালের বাইরে।

সোহেলজি সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “উলফগ্যাংয়ের লাশ খুঁজে বের করা হবে। অত উঁচু থেকে ওই গতিতে নীচে আছড়ে পড়লে কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। তল্লাশি চলছে। তবে এই মুহুর্তে ও-নিয়ে আমাদের আর কিছু করার নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জোগাড়যন্ত্র সেরে নিয়ে বিটরির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তে হবে।”

দশ

তীব্রবেগে জিপ চালাচ্ছিলেন উলফগ্যাং। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ। ছুটন্ত জিপের আলো দু’পাশের পাহাড়ে পিছলে যায় বার বার। পাশে বসে দিবাকর থরথর করে কাঁপছিল। একবার কিছু একটা বলতে গিয়েছিল সে উলফগ্যাংকে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে থেকে অন্য হাতে একটা সপাট চড় মেরে তার মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন উলফগ্যাং। লোকটা হয় বিশ্বাসঘাতক, নাহয় একেবারে নির্বোধ। এছাড়া এত সহজে ওদের ফাঁদে পা দেবার আর কোনও ব্যাখ্যা হতে পারে না। নতুন কোনও পথ ভাবতে হবে। পুঁথিটাকে ছাড়া এদেশের মাটি থেকে নড়বেন না উলফগ্যাং। একসঙ্গে একাধিক পরিকল্পনা মাথায় আসছিল তাঁর। দু-তিনটে সূত্র ছেড়ে গেছে ওরা। একবার কাছাকাছি কোনও একটা শহরে পৌঁছোতে পারলে…

ঠিক তখনই পায়ের নীচের পাকদণ্ডীতে আরেকটা ইঞ্জিনের গর্জন ভেসে উঠল। কেউ আসছে! এত সহজে ওরা পিছু ছাড়বে না তাঁর। খুব তাড়াতাড়ি চিন্তা করছিলেন উলফগ্যাং। ফোনের জিপিএস ন্যাভিগেশনের সবুজ দাগটা সামনে ছড়িয়ে আছে। হেডলাইটের আলোয় ছুটন্ত সেই পথটার পাশে ডানদিকে একটা পাথুরে রাস্তা খাদের মাথা বেয়ে উঠে গেছে ওপরের অন্ধকার পাহাড়ের দিকে। জিপিএসের পর্দায় একবার ঘুরে দেখলেন তিনি। রাস্তাটায় গাড়ি ঢোকানো সম্ভব। কিন্তু অজানা এই গেঁয়ো পথ জিপিএসের ন্যাভিগেশনে দেখাচ্ছে না। এ পথে ঢুকে গেলে হয়তো…

হঠাৎ প্রাণপণে ডানদিকে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ধরলেন তিনি। যা থাকে কপালে।

পেছনে ইঞ্জিনের গর্জনটা আরও কাছে এগিয়ে এসেছে। তাড়াতাড়ি, আরও তাড়াতাড়ি। জিপের অ্যাক্সিলারেটরে পা দাবালেন উলফগ্যাং। গর্জন করে একটা লাফ দিয়ে উঠল যানটা। আর তারপর পাথর ছড়ানো সরু রাস্তাটায় আছড়ে পড়েই হঠাৎ হাতের বাঁয়ে খাদের ওপর টলে পড়ল সেটা।

সময় যেন ধীরগতি হয়ে গেছে এই মুহূর্তে। আস্তে আস্তে তাঁদের নিয়ে গভীর খাদের মুখে টলে পড়ার প্রত্যেকটা মূহূর্তকে যেন আলাদা করে দেখতে পাছিলেন উলফগ্যাং। চোখের সামনে ছোটোবেলা থেকে অতীত জীবনের সব ছবি ভেসে উঠছে একে একে। নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স? তাহলে কি সত্যিই…

হঠাৎ একটা তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল গাড়িটা। তার খুলে যাওয়া দরজা দিয়ে বাতাসে ছিটকে এসে খাদের অতলে তলিয়ে যেতে যেতেই উলফগ্যাংয়ের চোখে পড়েছিল, রাস্তাটার মাথায় অনেকগুলো আলো জ্বলে উঠেছে। অনেক মানুষের কথা বলবার শব্দ সেখানে। ওরা দেখতে পেয়েছে।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই চারপাশের অন্ধকার গাঢ় হয়ে উঠে জড়িয়ে ধরল তাঁকে। পড়বার গতি থেমে গেছে তাঁর। অন্ধকারের মধ্যেই হঠাৎ তাঁকে ঘিরে জমাট বেঁধে উঠেছে একটা শরীর। তাঁর মুখের ওপরে ঝুঁকে পড়া একটা রাজমুকুটের ভেতর থেকে দুটো তীব্র লাল বিন্দু স্থির হয়েছে তাঁর চোখের দিকে। আর তারপর হাওয়ার ঝটকায় তিরবেগে ভেসে যাবার অনুভূতির মধ্যেই আবছাভাবে তাঁর কানে এসেছিল, বহু নীচে পাথরের বুকে তাঁর গাড়িটার আছড়ে পড়বার শব্দ। তারপর আর কিছু মনে নেই তাঁর।

বিংশতি অধ্যায়
২৩ মার্চ, ২০১৫

“লুসিড ড্রিমিং? সেটা কী জিনিস?” সোহেলজি জিজ্ঞেস করলেন।

ডঃ মুলার চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “লুসিড ড্রিম আসলে স্বপ্নে দেখা জিনিসকে পরিষ্কারভাবে মনে রাখার একটা উপায়। ধরো আমি ঘুমালাম, কিন্তু আমার মস্তিষ্ককে জানিয়ে রাখলাম যে আমি জেগে আছি। ঘুমন্ত অবস্থায় যা আমি দেখব, ঘুম থেকে জেগে ওঠার পরেও আমার মস্তিষ্ক সেটা ভুলে যাবে না। র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট বা ওয়েকফুল ভিশন-এর মাধ্যমে অনেকেই এইভাবে নানান স্বপ্নাদেশের উত্তর পেয়েছেন। সবসময় যে সেটা খুব অর্থপূর্ণ হয় তা নয়, কিন্তু স্বপ্নের ডিটেইলগুলো মনে থাকলে কথাগুলোর অর্থটা বের করা অনেক সহজ হয়ে যায়।”

সকলে ঘরের ভেতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছেন। এটা আসলে একটা পুরনো ভাঙা মন্দির। অনেকদিন ধরে পরিত্যক্ত পড়ে আছে। ভেতরের জায়গাটা বেশ বড়ো। চারদিক থেকে বন্ধ বলে ঠাণ্ডাটাও এখানে কম। অবিনরা বিটরি পৌঁছেছে বিকেল পাঁচটার কাছাকাছি। নেতওয়ার থেকে দশ কিলোমিটার ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে জিপে এসে তারা পৌঁছেছিল ধৌলাতে। সেখান থেকে হাঁটতে শুরু করেছিল বিটরির উদ্দেশ্যে।

এদিকের উচ্চতা আট হাজার ফুটের কাছাকাছি, তাই শীত অনেক বেশি। ভারী ব্যাগ নিয়ে হাঁটা মোটেই সহজ নয়। কিন্তু ট্রেইলের চারদিকে তাকালে সব কষ্ট জুড়িয়ে যায়। অনেকদিন পর অবিনের একটু হালকা লাগছিল। সে ভালোবেসে পাহাড়ে আসে। এতদিন ধরে ক্রমাগত নানা ঝামেলায় মন অস্থির হয়ে ছিল। আজ অনেকদিন পর সে আবার পাহাড়ের সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারছে। মাইলের পর মাইল সবুজ ঘাসের ময়দান পেরিয়ে পাহাড়ি কাঁচা রাস্তা দিয়ে হিমাচ্ছাদিত পাহাড়ের কোলে হাঁটলে মনে কীরকম ভাব হয়, যে আসেনি তাকে বোঝানো মুশকিল।

ধৌলা থেকে বিটরি মাত্র আড়াই কিলোমিটার। কিন্তু তারা অনেক দেরি করে বেরিয়েছিল বলে সেখানে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেল। পাহাড়ের কোলে বিটরি গ্রাম দেখে সোহেলজি অবধি হাতের ব্যথা ভুলে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। বিকেলের পর শীত বাড়তে শুরু করবে। এপ্রিলেও এখানে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়ে। তাদের সঙ্গে গরম স্লিপিং ব্যাগ, তাঁবু আছে কিন্তু রাকেশ দেখেশুনে এই মন্দিরেই ক্যাম্প করেছে আজ। দেখা যাচ্ছে, সিদ্ধান্তটা ভুল হয়নি। সকলে এখানে আরামেই আছে।

কাঠকুটো দিয়ে আগুন করে চা বসিয়েছিল ধনুষ। এই অভিযানে তাদের উত্তেজনা কম নয়। পরবর্তী প্ল্যান ঠিক করার আলোচনা করার পর ডঃ মুলার সবাইকে বলেছেন তাঁর পরিকল্পনার কথা।

শিশির আগুনে হাত গরম করছিল। এবার সে বলল, “লুসিড ড্রিমিংয়ের কথা আমি জানি। কিন্তু সে স্বপ্নে পৌঁছে আপনি ঠিক কী জানতে চাইবেন সেটা আপনার কাছে পরিষ্কার কি?”

ডঃ মুলার হালকা হেসে বললেন, “সত্যি বলতে মিঃ ঠাকুর, আমি নিজেও জানি না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের স্বপ্নে আবির্ভূত ব্যক্তি, যাঁকে আমি দেখেছি ঋষির বেশে, আপনি দেখেছেন বার্তুকল্য রূপে, আর অবিন দেখেছে যুবা রূপে, তিনি একই ব্যক্তি এবং খুব সম্ভবত সমান্তরাল সভ্যতার দ্বাররক্ষী যিনি আবহমান কাল ধরে এই দুই জগতকে সন্নিবদ্ধ করে রেখেছেন। এ-খেলার তিনিই প্রধান পক্ষ। তিনি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছেন। আমি শুধু লুসিড ড্রিমিংয়ের অবস্থায় তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করব। তারপর কী হবে, আমিও জানি না।”

রাকেশ বিড়বিড় করে বলল, “ইনিই কি ফলাহারী বাবা যিনি মাঝে মাঝে সাধারণ মানুষকে দেখা দেন?”

ডঃ মুলার সে-প্রশ্নের জবাব দিলেন না কোনও। আস্তে আস্তে নিজের জায়গাতেই চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন। শিশির তাঁর দিকে ঝুঁকে বলল, “গুড লাক, ডক্টর।”

ডঃ মুলার চোখ বুজলেন….

*****

….একটা উঁচু  পাহাড়ের  মাথায়  দাঁড়িয়ে আছেন মুলার। অন্ধকার আকাশে জ্বলজ্বল করছে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রপুঞ্জ। তার চারপাশে মাথা তুলে আছে হিমালয়ের তুষারাচ্ছাদিত পর্বতশৃঙ্গ। হু হু করে বইছে ঠাণ্ডা হাওয়া। শীতে তাঁর দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। তিনি নিজের মনেই নিজেকে বললেন, “এটা স্বপ্ন। চিন্তার কিছু নেই।”

মনকে  শান্ত করে  বাঁদিকে  তাকাতেই তিনি দেখতে পেলেন প্রাচীন একটা দেবস্থান। পরিচিত কোনও মন্দিরের সঙ্গে তার চেহারার মিল নেই কোনও। অনেকটা এস্কিমোদের ইগলুর মতো তার আকৃতি।

বাতাসে মৃদু গুঞ্জন উঠছিল। অস্পষ্ট কিছু উচ্চারণ। মন্দিরটার দিক থেকেই ভেসে আসছে তা। শব্দটা কানে আসতে মন্দিরটার দিকে পা বাড়ালেন তিনি। আর সঙ্গে সঙ্গেই দেখলেন, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন মন্দিরের পাশে।

মন্ত্রের উচ্চারণ এখন অনেক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বহুবার স্বপ্নে শোনা সুপরিচিত সংস্কৃত শব্দগুলোর ধ্বনি তাঁকে ঘিরে ঢেউয়ের মতো ছেয়ে যাচ্ছিল। যেন এইবার তারা ভাসিয়ে নিয়ে যাবে তাঁকে। জানেন স্বপ্ন, তবুও একটা অজানা ভয়ে চোখ বুজে প্রাণপণে মন্দিরের দেয়াল আঁকড়ে ধরবার চেষ্টা করলেন মুলার। সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর বন্ধ চোখের আড়াল থেকে আবছা একটা আলোর আভাস ভেসে এল।

চোখ খুলে তিনি দেখলেন, কোথায় মন্দির! একটা মাঠের মধ্যে তিনি একলা দাঁড়িয়ে। মাঠের এককোণে একটা ভাঙা লাইট স্ট্যান্ড। দূরে একটা পরিত্যক্ত গোডাউন দেখা যাচ্ছে।

এ কোন জাদু! তাড়াতাড়ি দু’হাতে চোখ কচলে ফের তাকাতে তিনি আতঙ্কে বোবা হয়ে গেলেন। বরফাবৃত প্রান্তরের মাঝে ছোট্ট একটা হ্রদের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি। দাউ দাউ করে আগুনের শিখা লাফিয়ে উঠছে হ্রদের বুক থেকে। আর সেই সঙ্গে তিনি শুনতে পেলেন মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি। বারবার সেই তিনটে দৃশ্য এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছিল তাঁর রেটিনায়। মন্দির, লেক, মাঠ.. ক্রমশ গতি বাড়ছিল সেই দৃশ্যবদলের। তাঁকে ঘিরে বনবন করে ঘুরে চলেছে দৃশ্য তিনটে। মাথার তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন মুলার। কিন্তু জাগলে চলবে না। তাঁকে এই স্বপ্ন মনে রাখতে হবে।

মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি বেড়ে চলছে। এবার একটা অপার্থিব আলো ফুটে বেরোতে শুরু করল ঘুরন্ত তিনটে জায়গা থেকে। তীব্র, চোখ ধাঁধানো সেই আলোর বিচ্ছুরণে হারিয়ে গেছে দৃশ্যের দল। এক আলোকিত অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড যেন ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁকে ঘিরে। তাঁর পাশ দিয়ে ছুটে চলেছে গ্রহ, নক্ষত্র, উল্কাপিণ্ডের দল! ধীরে ধীরে আলোর বিচ্ছুরণ এসে পুঞ্জীভূত হল একটা বিন্দুতে। লাল গোলকের মতো একটা আগুনের হলকা ভেদ করে সামনে প্রকট হলেন সেই দিব্যমূর্তি। অনবরত রূপ বদলাচ্ছিল তাঁর অবয়ব। কখনও তিনি যুবক, কখনও বৃদ্ধ, কখনও তাঁর মাথায় জটা, কখনও তাঁর মুণ্ডিত মস্তক। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল মুলারের। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। কিন্তু হারলে চলবে না। প্রচণ্ড মনের শক্তিতে নিজেকে সংযত করে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “আপনি কে?”

উত্তরে কোনও কথা না বলে তাঁর দিকে এগিয়ে এল সেই মূর্তি। তীব্র উত্তাপে তাঁকে যেন ঝলসে দিয়ে একেবারে সামনে এসে স্থির হল সে। তারপর একটা আঙুল তাঁর কপালে রাখলেন সেই দিব্য পুরুষ। সঙ্গে সঙ্গে মুলারের সব যন্ত্রণা উধাও হয়ে গেল।

মন্ত্রোচ্চারণ থেমে গেছে। তিনি চোখ খুলে দেখলেন, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই পুরুষ। চারদিকের নিকষ অন্ধকারের মধ্যে শরীর থেকে বিচ্ছুরিত আলোয় তাঁকে দেবতার মতো মনে হচ্ছিল মুলারের। এইবার কথা বললেন তিনি। ঠোঁট নড়ল না, কিন্তু মুলারের মস্তিষ্কে এসে ধ্বনিত হল তাঁর প্রশ্ন।

“কী জানতে চাও?”

“আপনি কে? আপনিই কি সমান্তরাল সভ্যতার রক্ষী সেই দিব্য পুরুষ? কেন আমাদের এখানে এইভাবে ডেকে এনেছেন? উলফগ্যাং… সে-ই বা কেন…”

মূর্তি কোনও উত্তর দিলেন না। গভীর অন্ধকার দুটি চোখ তুলে ধরলেন তাঁর চোখের দিকে। মুলার অনুভব করলেন, এতদিন ধরে জমা হয়ে থাকা তাঁর প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর এইবার এসে সঞ্চিত হচ্ছে তাঁর মস্তিষ্কে।

হয়তো অনন্তকাল ধরে চলেছিল সেই প্রক্রিয়া, অথবা, হয়তো বা শুধু একটি খণ্ডমুহূর্ত। কে জানে! তারপর দিব্যমূর্তি তাঁর ডানহাত তুলে আশীর্বাদ করলেন মুলারকে।

একবিংশতি অধ্যায়
২৪ মার্চ, ২০১৫

ঝড়ের দাপটে ভালো করে কিছু দেখা যাচ্ছে না। টেন্ট লাগাতে গিয়ে আরেকটু হলে প্রচণ্ড হাওয়ার অবিনদের টেন্ট উড়ে যাচ্ছিল প্রায়। তার সঙ্গে চলেছে বৃষ্টি। মেঘের গর্জনে কানে তালা লেগে যাচ্ছে।

রাকেশ চিৎকার করে বলল, “এখানে টেন্ট লাগানো অসম্ভব। হাওয়ার জোর অনেক বেশি। এখানে বাজ পড়াও অসম্ভব নয়। মনে হচ্ছে রুপিন পাসের দিকে ওয়েদার খারাপ হয়ে গেছে। আমাদের রিজ লাইন থেকে নীচে নেমে যেতে হবে।”

সোহেলজি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। সকালবেলা বিটরি থেকে বেরিয়ে অবিনরা হাঁটতে আরম্ভ করেছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা আজকে রুপিন আর সুপিন ভ্যালির মাঝের রিজ লাইন মাসুন্ধা ধারের ওপর টেন্ট খাটাবে। বিটরি থেকে এগিয়ে ঘাসের বুগিয়াল শেষ হয়ে একসময়ে ট্রিলাইন আরম্ভ হয়েছিল। সেই জঙ্গলের শোভা অবর্ণনীয়। রকমারি রঙের ফুল, রডোডেনড্রন, অর্কিড আর গাছের মাঝে উড়ে বেড়াচ্ছে হিমালয়ান মোনাল, স্পট উইংড গ্রসবিক, ব্লু ক্যাপড রকথ্রাশ আর নানান রঙের কাঠঠোকরা। ম্যাগপাই আর পায়রা তো আছেই। পাখি আর ফুল দেখতে দেখতে অবিন সম্মোহিত হয়ে গিয়েছিল একসময়।

নানান পাখির ডাক শুনতে শুনতে তারা এগিয়ে চলেছে মাসুন্ধা ধারের দিকে। কিন্তু বিকেলে মাসুন্ধা ধারে পৌঁছে তাঁবু লাগানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করল। একসময় শুরু হল প্রচণ্ড ঝড় আর বৃষ্টি।

কাল রাতে ডঃ মুলারের জেগে ওঠার পর সকলে ব্যস্ত হয়ে তাঁকে একের পর এক প্রশ্ন করেছে, কিন্তু ডঃ মুলার কোনও কথারই উত্তর দিতে পারেননি। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, তাঁর ওপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে। শেষে তাঁর বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে সোহেলজি সকলকে বলেছিলেন, “ওঁকে স্বাভাবিক হওয়ার জন্যে একটু সময় দেওয়া দরকার। এখন কোনও কথা জিজ্ঞেস না করাই ভালো, ওতে হিতে বিপরীত হতে পারে। তার চেয়ে আমরা আমাদের প্ল্যানমত এগিয়ে চলি, সময় হলে উনি নিজেই আমাদের সবকথা জানাবেন।”

অবিনরা  মাসুন্ধা  ধার  থেকে  নীচে  নামতে শুরু করেছে। সকলের আগে চলেছে ধনুষ। সবশেষে ডঃ মুলার। প্রায় ঘন্টা দুয়েক হাঁটার পর ঝড়ের বেগ কমে এল। বৃষ্টি পড়ছে না। হঠাৎ করে সামনের মেঘ সরে গিয়ে তাদের সকলের চোখের সামনে ভেসে উঠল রুপিন আর সুপিন ভ্যালি। সেদিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল অবিন। এমনকি ডঃ মুলার অবধি সব ভুলে বলে উঠলেন, “বাহ্!” আর তারপরেই হঠাৎ সামনে নীচের দিকে এগিয়ে যাওয়া পথটা ছেড়ে বাঁয়ের দিকে পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করলেন তিনি।

রাকেশ একটু অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে হাঁক পেড়েছিল, “ওদিকে যাবেন না। ওদিকে রাস্তা নেই কোনও।”

ততক্ষণে ডঃ মুলার বেশ খানিকটা ওপরে বেয়ে উঠে গেছেন। সেখান থেকেই হাঁক দিয়ে বললেন, “আছে। এইটাই সঠিক পথ। উঠে এসো তোমরা।”

উঠে এসে একটা তীক্ষ্ণ ঢালে গড়িয়ে যাওয়া পাথুরে রেখাটার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে দেখল রাকেশ। প্রায় মিটার চল্লিশেক নেমে ডানদিকে বাঁক নিয়ে পাহাড়ের ভেতরের দিকে এগিয়ে গেছে। এটা কোনও ট্রেল নয়। সম্ভবত কোনও শুকিয়ে যাওয়া জলধারা। তার বুকে ছড়ানো নুড়িগুলোর ফাঁকে-ফোঁকরে তখনও ইতিউতি জলের ধারা বয়ে চলেছে।

“রিস্কি, ডঃ মুলার। পাথরগুলো আলগা। এতটা খাড়াই ঢাল ধরে এই ট্রেল দিয়ে…”

মুলার তার কথার কোনও জবাব দিলেন না। ভূতগ্রস্তের মতো তখন তিনি নেমে পড়েছেন ট্রেলটার বুকে। কোনওমতে ভারসাম্য রেখে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছেন নীচের দিকে। ওরা নিঃশব্দে তাঁর পেছন পেছন রওনা হল।

বিকেল হয়ে আসছিল। গত কয়েকটা ঘন্টা ধরে আঁকাবাঁকা ঢালু পথটা পাহাড়ের এই অচেনা গভীরে তাদের কোনদিকে নিয়ে চলেছে কোনও আন্দাজ ছিল না কারও।

চলতে চলতেই ধনুষ হঠাৎ পেছন থেকে রাকেশের আস্তিন ধরে একটা টান দিল। “কোথায় চলেছি, ভাইয়া? এদিকটায় কখনও মানুষের পা পড়ে বলে তো মনে হচ্ছে না! সন্ধে হয়ে আসছে। ক্যাম্প করবার মতো কোনও জমিনও তো…”

আর ঠিক  তখনই  সামনের  বাঁকটার  আড়াল  থেকে  ডঃ মুলারের উত্তেজিত গলার শব্দ ভেসে এল, “জিহুগা টেম্পল! ইয়েস, অবিন। আই নিউ, আই নিউ…”

ঢালু পথটা পেরিয়ে কোনওমতে এগিয়ে গিয়ে তারা দেখল, পায়ের খানিক নীচে পাহাড়ের নিঃশব্দ প্রহরায় সেখানে জেগে রয়েছে একটা অতিকায় বুগিয়াল। প্রথম জ্যোৎস্নার নীলাভ আস্তর তার ওপরে। আর তার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের তৈরি ছোটো একটা ইগলু গড়নের বাড়ি।

বুগিয়ালটার দিকে চোখ রেখে অবিন প্রায় ফিসফিস করে, যেন নিজেকেই বলছিল বারবার, “দেবভূমি! আমি একে দেখেছি। আমি…”

খানিক বাদে শিশির রাকেশকে বলল, “কতক্ষণ লাগবে ওখানে পৌঁছতে?”

রাকেশ ঘড়ি দেখল। “আরও ঘন্টাখানেক।”

ডঃ মুলার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন মন্দিরের দিকে। এবার স্থির কন্ঠে বললেন, “আমি যদি কাল ঠিক বুঝে থাকি আমার স্বপ্ন, তাহলে আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর ওখানেই আছে।”

ঘন্টাখানেকের আগেই ওরা মন্দিরের কাছে পৌঁছে গেল। দূর থেকে ইগলুর মতো মনে হলেও মন্দিরটা পুরোপুরি গোল নয়। সামনে একটা দরজা আছে। দেওয়ালের গায়ে কালো-সাদা পাথর একান্তরে বসানো আছে। তাই দূর থেকে দেখতে ছাই রঙের মনে হয়। মন্দিরের ভেতর কোনও মূর্তি দেখতে পেল না তারা। কিন্তু একটা গোল বেদি আছে। এছাড়া গোটা জায়গাটা সম্পূর্ণ নিরাভরণ।

ডঃ মুলার অন্ধকার, ফাঁকা মন্দিরটার ভেতরে টর্চ জ্বেলে মন দিয়ে কী যেন দেখছিলেন। বাইরে ধনুষরা তাঁবু লাগাতে ব্যস্ত। অবিন আস্তে আস্তে তাঁর দিকে এগিয়ে গেল।

“কিছু পেলেন?”

ডঃ মুলার মাথা নাড়লেন। “হিসেবমতো এখানেই পুঁথির প্রথমাংশ থাকার কথা। কিন্তু কোথায়? আ-আমাদের কি কিছু ভুল হল?”

শিশিরও এর মধ্যে কখন যেন মন্দিরের ভেতরে এসে দাঁড়িয়েছে। হাতের আলোটা জ্বেলে সে ফাঁকা বেদিটাকে দেখছিল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। মুলারের কথাটা শেষ না হতেই সে হঠাৎ চাপা গলায় বলল, “ভুল আমাদের হয়নি, ডঃ মুলার।”

“তার মানে?”

শিশির বেদির দিকে আলোটা ধরে রেখে বলল, “এইখানে সম্ভবত কোনও মূর্তি ছিল। সেটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আসল কথা সেটা নয়। বেদিটার গায়ে দেখুন। অবিন, আপনার মোবাইলের পুঁথির ছবিগুলো বের করুন তো।”

অবিন  নিঃশব্দে  ছবিগুলো  বের করে  এগিয়ে  দিল।  দুটো  টর্চের আলো তখন বেদিটার গায়ে এসে স্থির হয়েছে। সেই উজ্জ্বল আলোয় দেখা যাচ্ছিল সেখানে ক্ষুদে ক্ষুদে অক্ষরে কিছু লেখা আছে। ডঃ মুলার মন দিয়ে মোবাইলের ছবিগুলোর সঙ্গে লিপিটা মিলিয়ে দেখে বললেন, “এই লেখাও সারদা লিপিতে খোদাই করা আছে। পুঁথির পূর্বভাগের সঙ্গে এর যোগাযোগ আছে। পুঁথি এখানেই আছে। রাকেশ, তুমি এখানে একটা আগুনের বন্দোবস্ত করো। অন্ধকারে কিছুই ঠিক করে দেখা যাচ্ছে না। আমাদের মন্দিরটা খুঁজে দেখতে হবে।”

রান্নার জন্য জঙ্গল থেকে কাঠ জোগাড় করে এনেছিল ধনুষ। তার থেকে তিনটে বড়োসড়ো লম্বা টুকরো নিয়ে কেরোসিনে ভিজিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনটে মশাল জ্বলে উঠল মন্দিরের ভেতরে। তার কাঁপা কাঁপা লালচে আলোয় গোটা গর্ভগৃহটা এইবার পরিষ্কার চোখে পড়ল সবার। বেদির পেছনের দিকের দেয়ালটার দিকে দেখিয়ে ডঃ মুলার বললেন,

“এদিকটা দেখো তোমরা। বাইরেটা গোল হলেও ভেতরের দিকটা সমান একটা পাঁচিল। যেন কিছু আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে এখানে।”

ততক্ষণে সোহেল দাওয়াস ভেতরে এসে গেছেন। দেয়ালটার দিকে খানিক নজর করে দেখে তাঁর মুখে একটু হাসি ফুটল। “পুলিশি চোখ। অত সহজে ফাঁকি দিতে পারবে না! দেয়ালটার গায়ে প্লাস্টার করে রঙ করা। এ-জিনিস বেশি পুরনো নয়। এর পেছনে একটা চেম্বার আছে। ধনুষ, টুল বক্স থেকে একটা হাতুড়ি নিয়ে এসো এদিকে।

“জলদি।”

সামান্য চেষ্টাতেই দেয়ালটার গায়ে খুঁড়ে ফেলা ছোট্ট গহ্বরে মশালের আলো ফেলে দেখা গেল সেখানে রাখা আছে একটা কাঠের সিন্দুক। গর্তটা বড়ো করে নিয়ে সেটা ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে আসা হল। তারপর সাবধানে সেটা খুলতেই সবাই দেখতে পেল লাল শালুতে মোড়া  কয়েকটা  কাঠের  পাতলা  পাটা।  মশালের কমলা আলোয় তার লেখাগুলো জ্বলজ্বল করছে। প্রতিস্মৃতিবিদ্যার বাকি অংশ!

তাঁবুগুলোর সামনে আগুন জ্বালানো হয়েছে। ডঃ মুলার পুঁথির লেখা পড়ার জন্যে একলা বসে আছেন তাঁর তাঁবুর মধ্যে। অবিনের মোবাইলটাও তাঁর কাছে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হওয়া সত্ত্বেও অবিন বাইরে না এসে থাকতে পারেনি।

আকাশে এখন মেঘ নেই। লক্ষ লক্ষ তারা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। দূরে পাহাড়চূড়ার বরফ রাতেও চকচক করছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতে মন চায়নি তার। একে একে শিশির, সোহেলজি, রাকেশ, ধনুষ সকলেই বাইরে এসে বসেছে আগুনের পাশে। সকলেরই চোখে এক প্রশ্ন।

“এরপর?”

ধনুষ হঠাৎ শিশিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “সাহেব মাঝেমাঝেই কীসব প্যারালাল ওয়ার্ল্ড-টোয়ার্ল্ড বলছিল, সে কী জিনিস?”

শিশির একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তোমরা কি বাসু ভানোট-এর কথা জানো?”

রাকেশ মাথা নাড়ল। ধনুষও জানে না। সোহেলজি শুধু মাথা নেড়ে বললেন, “নৈনিতালের কেস, না? ওখানে ট্রেনিংয়ে গিয়ে একটা পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ফাইল দেখিয়েছিল আমাদের। ঐ এক ছোকরা কাকার বাড়ি গিয়ে শুনেছিল কাকা বিশ বছর আগে মারা গেছে, সেটা তো? যত বকোয়াস।”

“হ্যাঁ। ১৯৬৫ সালের কেস। সে নাকি তার আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়ার সময়ে ভুল করে সমান্তরাল পৃথিবীতে পৌঁছে গিয়েছিল।”

অবিন চমকে উঠে বলল, “কী?”

শিশির বলল, “সত্যি কি না জানি না। সে নাকি তার কাকার গ্রামে যাবার পথে একতাল কুয়াশায় ঢুকে গিয়েছিল। সেই থেকে বেরিয়ে কাকার গ্রামে গিয়ে দেখতে পায় সেখানে অন্য লোকেরা থাকে। কেউ তাকে চেনে না, কোনওদিন চিনত না। তারপর ফের ঘন কুয়াশা পেরিয়ে নিজের গ্রামে ফিরে আসে। এইবার সবকিছুই আগের মতো। কেউই তার কথা বিশ্বাস করেনি।”

বলতে বলতেই সোহেলজির দিকে ফিরে সে বলল, “এমন ঘটনা কিন্তু আরও আছে। ব্রাজিলে নাকি অনেকেরই ‘সেতাএলাম’ বলে একটা প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের অভিজ্ঞতা হয়েছে। সুবলবাবুও একদিন বলছিলেন, মহাভারতে অর্জুন তিব্বত যাবার পথে এমন এক অদৃশ্য নগরীর লোকজনের পাল্লায় পড়েছিলেন।”

“উনি ভুল বলেননি।” সবাই দেখল, ডঃ মুলার তাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। হাতের পুঁথিটা সাবধানে রেখে তিনি মাটিতে বসে পড়লেন।

অবিন জিজ্ঞেস করল, “অর্থ উদ্ধার হল, ডঃ মুলার? কিছু বুঝতে পারলেন?”

ডঃ মুলার ধীরে ধীরে সকলের মুখের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “হ্যাঁ, পুঁথির লেখা আমি পড়েছি। কালকের অভিজ্ঞতা না হলে এই লেখা আমি কোনওদিনই বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু এখন আমার সমস্ত সত্ত্বা মনপ্রাণ দিয়ে এর প্রতিটা কথা বিশ্বাস করে। তোমাদের যদি আমার কথা বিশ্বাস না হয়, তাহলে আমি জোর করব না। কিন্তু কাল লুসিড ড্রিমের মাধ্যমে সেই দিব্য মহাপুরুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, যাকে তুমি আর শিশিরবাবু স্বপ্নে দেখেছ।”

শিশির ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “সত্যি? সাদা রঙের পোশাক, লম্বা চুল…”

ডঃ মুলার তাকে থামিয়ে বললেন, “তিনি চেহারা, পোশাক আর বয়সের ঊর্ধ্বে, কিন্তু সমগ্র মানবজাতির সঙ্গে তাঁর একটা মানসিক যোগাযোগ আছে।”

শিশির অস্ফুটে বলে উঠল, “কালেকটিভ কনসিয়াসনেস!”

সোহেলজি উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কে তিনি? কী বললেন? তিনি কি সত্যি আমাদের কিছু বলতে চাইছিলেন?”

ডক্টর মুলার বললেন, “আমাকে তিনি বার্তুকল্য বলেই নিজের পরিচয় দিলেন। আমাকে মুখে কিছুই বলেননি, সরাসরি আমার মস্তিষ্কে পৌঁছে যাচ্ছিল তাঁর বার্তা।”

বলতে বলতেই শিশির আর অবিনের দিকে ঘুরে তাকালেন তিনি। “যা জেনেছি তাতে, প্রতিস্মৃতিবিদ্যার একটা হারানো অংশকে নিরাপদে আমার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য তোমাদের তাঁর এখানে আহ্বান করা। আর সে-ছাড়াও তোমাদের দু’জনের অন্য ভূমিকাও রয়েছে এ-অভিযানে। তবে সে ভুমিকা কী তা আমি বুঝিনি।”

অবিন বলল, “এ-ছাড়া আর কিছু?”

“হ্যাঁ। তিনি আমায় হদিশ  দিয়েছেন সেই  সমান্তরাল সভ্যতার, যা যুগের পর যুগ ধরে মানুষের কাছে অজানা রয়ে গেছে। যাকে আমরা স্বর্গ বলে জানি। হদিশ দিলেন তার প্রবেশদ্বারের। আমার স্বপ্নে দেখা ত্রিভুজের তৃতীয় বিন্দুই সেই প্রবেশদ্বার।

“সেই অমরলোকের সভ্যতা এখন জিহুগাদের। মানসিক আর শারীরিক শক্তিতে মানুষের চেয়ে অনেক এগিয়ে তাঁরা। তাদের তুমি দেবতা বলতে পার। কারণ, মানসিক শক্তির জোরে তারা জড়বস্তুকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে – পারে বিদ্যুৎ, বৃষ্টি, ঝড়, প্রলয় সৃষ্টি করতে। হাজার হাজার বছর ধরে তাঁরা রয়েছেন সেখানে। তাঁদের মধ্যে আটজন প্রধান দেবতা। তবে তাঁরাও এর আদি ঈশ্বর নন। এক ভয়ংকর পাপ রয়েছে জিহুগাদের সেই ঈশ্বরভূমির অধিকারের পেছনে।

“মানসিক শক্তিতে জিহুগাদের সমকক্ষ না হলে কোনও মানুষ সেই দ্বার লঙ্ঘন করতে পারে না। অর্জুনের মতো প্রতি যুগে কয়েকজন মাত্র এই দ্বার অতিক্রম করে সমান্তরাল সভ্যতায় পৌঁছতে পেরেছেন। পৃথিবীর নানা প্রান্তে অবস্থিত আছে এই অদৃশ্য দ্বার, যা অতিক্রম করতে গেলে প্রচণ্ড মানসিক শক্তির দরকার হয়।

“প্রতিস্মৃতিবিদ্যা আসলে কোনও জাদুমন্ত্র নয়। গোটা মস্তিষ্ককে জাগিয়ে তুলে তার শক্তিতে সারা ব্রহ্মাণ্ডকে দেখতে পাওয়ার মানসিক ক্ষমতা। ব্রহ্মাণ্ড বলতে এখানে শুধু পৃথিবীর সভ্যতাকে বোঝানো হয়নি, বলা হয়েছে প্রতিটা সমান্তরাল সভ্যতার কথা।

“অর্জুন প্রতিস্মৃতিবিদ্যার মাধ্যমেই এই আদি ঈশ্বরদের সঙ্গে যোগাযোগ করার ক্ষমতা পেয়েছিলেন। প্রথমে নিজেকে দীর্ঘ সাধনায় প্রস্তুত করেছিলেন। তারপর নির্দিষ্ট তিথিতে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হয়ে শেষ প্রস্তুতি হিসেবে আলোকধারায় স্নান করে পবিত্র হয়েছিলেন। তারপর স্বর্গের দ্বারপথে পৌঁছে আবাহনধ্বনি উত্থিত করে তারপর প্রয়োগ করেছিলেন প্রতিস্মৃতিবিদ্যা। তখন তাঁর সামনে উন্মোচিত হয়েছিল সেই স্বর্গভূমি।

“তারপর আদি ঈশ্বরদের সাদর আহ্বানে তিনি গিয়ে যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে। অভূতপূর্ব শক্তি ও জ্ঞান অর্জন করে ফিরে এসেছিলেন ফের মানুষের সমাজে।”

সকলে তন্ময় হয়ে ডঃ মুলারের কথা শুনছিল। এইবার অবিন বলল, “কিন্তু… আলোকধারায় স্নান বলতে…”

“এই  একটা  কথাই  ঠিক  বুঝতে  পারিনি আমি, অবিন। তিনি তা বলেছেন আমাকে, কিন্তু আমি সঠিকভাবে তার অর্থ অনুধাবন করতে পারিনি। আশা করি তিনি সঠিক সময়ে সে-পথ আমাকে দেখিয়ে দেবেন।”

“আ-আমরা কি পারব?”

একটুক্ষণ  চুপ  করে  বসে রইলেন ডঃ  মুলার। তারপর যখন কথা বললেন, তখন হঠাৎ তাঁর শরীরী ভাষা কেমন যেন বদলে গেছে। লকলকে আগুনের লালাভ শিখায় তাদের সামনে উঠে দাঁড়ানো মানুষটাকে যেন প্রাচীন যুগের কোনও দেবপুরুষের মতো দেখাচ্ছিল। তেমনই সুন্দর। তেমনই ভয়ংকর।

“পারব। কারণ, সেটাই আমার নিয়তি। আমার অজান্তেই দীর্ঘকালের সাধনায় আমাকে নিয়োজিত করেছিলেন তাঁরা। আমাকে তৈরি করেছেন ধীরে ধীরে। তারপর নিয়তির বিচিত্র গতিতে নির্দিষ্ট তিথিটি আসবার মুহূর্তে আমি এখানে এসে পৌঁছেছি। তোমাদের সহায়তায় নাগাল পেয়েছি প্রতিস্মৃতিবিদ্যার সম্পূর্ণ পাঠের। আমি সে-গ্রন্থ পড়েছি। তারপর স্বপ্নে তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পেয়েছি আমি। এখন আমি সে কৌশল জানি।”

“কবে সেই তিথি, ডঃ মুলার? কীসের তিথি?”

“আগামীকাল। এই পুঁথিতেই ব্যাখ্যা করা আছে সেই অবিশ্বাস্য দৈবীয় ঘটনার যখন সেই দ্বার খোলবার সময় হয়। লিরা নক্ষত্রপুঞ্জের ভেগা বা অভিজিৎ নক্ষত্রের দিশা থেকে ছুটে আসা একটা ধূমকেতু। সে যখন পৃথিবী পাশ কাটিয়ে যায়, তখন হাজার হাজার উল্কাপিণ্ড ঝড়ের গতিতে ছুটে আসে পৃথিবীতে। প্রায় আটশো বছর পরপর একটা বিশেষ তিথিতে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়।

“ত্রয়োদশ শতাব্দীতে একবার সে তিথি এসেছিল। এবারের সুযোগ আমাদের হারালে চলবে না। আর একদিন পরেই সেই তিথি। আমাদের সেখানে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছতে হবে। হয়তো সেই আলোকধারায় স্নানের রহস্যও সেখানেই খুলে যাবে আমাদের সামনে। নাহলে কয়েকশো বছরের জন্যে এই রহস্যের দ্বার অবরুদ্ধ থেকে যাবে মানুষের কাছে।”

“কিন্তু কোথায় সেই জায়গা, ডঃ মুলার?” রাকেশ শশব্যস্তে জিজ্ঞেস করল।

ডঃ  মুলার  বললেন, “সেই  জায়গাটা  এখন  আমি  জানি।  আরও উত্তরে যেতে হবে আমাদের। যেখানে চারদিকে বরফের পাহাড়। বরফাবৃত প্রান্তরের মাঝে একটা ছোট্ট আগ্নেয় হ্রদ। তার পাশে ছোটো বালির সৈকত।”

“একটা প্রশ্নের উত্তর জানবার ছিল, ডক্টর।” হঠাৎ অবিন এগিয়ে এসে মুলারের সামনে দাঁড়াল, “আপনি বারংবার বলছেন আদি ঈশ্বররা নয়, এসেছেন নতুন আট ঈশ্বর। কোনও একটা ভয়ংকর পাপের কথাও বলেছেন এই জিহুগাদের বিষয়ে। ওঁরা কারা?”

তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে একটা বিষণ্ণ হাসি হাসলেন মুলার। “জানতে চেও না, অবিন। তোমাদের এতদিনের সমস্ত বিশ্বাস ধূলিসাৎ হয়ে যাবে তাতে।”

“তবুও…”

“তাঁরা মানবজন্মে ছিলেন পঞ্চপাণ্ডব, দ্রৌপদী, কুন্তি ও কর্ণ!”

দ্বাবিংশতি অধ্যায়
২৫ মার্চ, ২০১৫
এক

ভোরের প্রথম আলোর সঙ্গেই অবিনরা যাত্রা শুরু করল। সূর্যের প্রথম আলো তখন স্বর্গারোহিণীর শৃঙ্গে সোনা ঢেলে দিয়েছে যেন। সেদিকে তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। কনকনে ঠাণ্ডা আর উদ্দাম হাওয়ার মাঝে প্রকৃতির এই অপার্থিব রূপ তাদের মনে অজান্তেই এক উষ্ণতার সঞ্চার করল।

এত উচ্চতায় অক্সিজেন কমে আসে, নানাধরনের বিপদের আশঙ্কা থাকে শরীরকে এক্লেমেটাইজ না করলে। রাকেশ হাঁটতে হাঁটতে সকলকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিচ্ছিল। যদিও সবাই আসন্ন অভিযানের জন্য বুকে বল বেঁধে আছে, কিন্তু সাহস আর হঠকারিতা এক নয়। প্রকৃতির সঙ্গে ছেলেখেলা করলে যেকোনও মুহূর্তে বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে।

মাসুন্দা ধারের মূল পথে ফিরে এসে খানিক এগিয়েই অন্য একটা রিজ ধরে হাঁটতে শুরু করেছিলেন মুলার। অবশ্য আগের দিনের ঘটনার পর আজ আর তাঁর সে সিদ্ধান্ত নিয়ে কেউ কোনও প্রশ্ন তোলেনি।

ট্রেকিং  পোল  নিয়ে  হাঁটতে  হাঁটতে  শিশির  ভুরু  কুঁচকে  বলল, “একটা কথা এখনও বুঝতে পারছি না। রুদ্রট প্রতিস্মৃতিবিদ্যা সম্পর্কে এত কথা জানলেন কী করে?”

ডঃ মুলার বললেন, “ঠিক করে বলা কঠিন, তবে পুঁথির মধ্যেই ওর একটা আভাস দেওয়া আছে। সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে প্রায় তিনশো বছর এই অঞ্চলে কাট্যুরি শাসকদের রাজত্ব ছিল। তাঁরা যে আসলে কোথা থেকে এসেছিল তা নিয়ে সংশয় আছে। বেশিরভাগ লোকেদের ধারণা, কাট্যুরি রাজারা আসলে শক বা ইন্দো সিথিয়ানদের বংশধর।

“কাট্যুরি রাজারা মন্দির-নির্মাণে আগ্রহী ছিলেন। তাঁরা বহু মন্দির বানিয়েছেন এবং পুরনো মন্দির পুনঃসংস্কার করেছে। আমার ধারণা, এই অঞ্চলে কোনও দুর্গম এলাকার প্রাচীন মন্দিরে কাট্যুরি রাজারা প্রতিস্মৃতিবিদ্যার বিবরণ পান কোনও প্রাচীন শিলালিপি অথবা পুঁথিতে। সেটা এখন আর জানার উপায় নেই। সেই তথ্য নথিভুক্ত করার জন্যে তারা কাশ্মীরে খবর পাঠান যদি কেউ এই কাজে সাহায্য করতে পারে। রুদ্রট সেই সময়ে কাশ্মীরের সবচেয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাঁকে নিয়ে আসা হয় লেখা নথিভুক্ত করতে। রুদ্রট লেখাটি পড়েই তার গুরুত্ব বুঝতে পারেন এবং প্রতিস্মৃতিবিদ্যা পুঁথিটার রচনা করেন।”

অবিন সায় দিয়ে বলল, “খুব সম্ভবত এটাই হয়েছে। কিন্তু সেই আসল লেখা কে লিখেছিল?”

শিশির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হয়তো ব্যাসদেব। অথবা আরও প্রাচীন কেউ। আমাদের দুর্ভাগ্য, সেই লেখা আর কোনওদিন খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

দেবভূমি ছাড়িয়ে গিয়ে চড়াই শুরু হল। প্রায় সাড়ে তিন হাজার ফুট ওপরে উঠতে হবে এবার। পথে ঠাণ্ডা ক্রমেই বাড়ছে। তার সঙ্গে কমছে অক্সিজেন। হাঁটতে রীতিমতো কষ্ট হচ্ছে এবার। সবুজের আধিক্য কমে গিয়ে দেখা দিয়েছে রুক্ষ হিমালয়ের পাথুরে রূপ।

এমন সময় তীক্ষ্ণ চিৎকারে সম্বিৎ ফিরল তার। তার সামনে হাঁটছিল ধনুষ। আতঙ্কে তার চোখদুটো বড়ো বড়ো হয়ে এসেছে, হাতের আঙুল প্রসারিত করে সে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে ডানদিকে।

ধনুষের চিৎকারটা কানে যেতেই তার আঙুলের ইশারার দিকে ঘুরে তাকাল অবিন। আর তারপর আতঙ্কিত গলায় কিছুটা এগিয়ে যাওয়া মুলারকে ডাক দিল সে। তাদের চোখের সামনে তখন দক্ষিণ-পুবে দিগন্তের গায়ে স্বর্গারোহিণীর পাশে ভেসে উঠেছে একটুকরো মিশমিশে কালো মেঘ। তার থেকে নীচের দিকে নেমে আসা হাতির শুঁড়ের মতো দীর্ঘ বায়ুস্তম্ভটা তাদের কারও অচেনা নয়। ভয়াবহ এই ঘূর্ণিঝড় কীভাবে কোন পথে ধেয়ে আসবে তা আগে থেকে হিসেব করে বোঝবার কোনও উপায় নেই।

সরু এই রাস্তাটা খাড়াই। তার বাঁয়ে পাহাড়ের দেয়াল। হাতের ডানে বিস্তীর্ণ খাদ পেরিয়ে অনেক নীচে সেই মাঠের বুকের মন্দিরটাকে একটা খেলনাবাড়ির মতো দেখায়। সেই বিস্তীর্ণ খাদের একেবারে পুবপ্রান্তের দিগন্তে জেগে উঠেছে ঝড়টা।

খুব তাড়াতাড়ি কিছু হিসেব করছিল রাকেশ। এই অঞ্চলের প্রকৃতির সঙ্গে তার আজীবন আলাপ। যেখানে তারা আছে তাতে ওই ঝড় কাছাকাছি দিয়ে বয়ে গেলেও খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে তারা। নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে হবে। তাড়াতাড়ি। অথচ যে-পথে মুলার নিয়ে চলেছেন তাদের, সে-পথ তার কাছে অচেনা।

“কাছাকাছি কোনও ঘেরা জায়গা থাকবার কোনও সম্ভাবনা আছে কি, ডঃ মুলার?”

মুলার দু’দিকে মাথা নাড়লেন। যে-পথে যেতে হবে, শুধু তারই ইশারা পেয়েছেন তিনি স্বপ্নে। সে-পথের কোনও বিস্তারিত খবর তাঁর কাছে নেই।

সামনে এগিয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা দীর্ঘ অলিন্দটার দিকে একনজর তাকিয়ে মনস্থির করে নিল রাকেশ। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বড়ো বড়ো পা ফেলতে ফেলতেই বলে উঠল, “চেনা রাস্তায় নীচের দিকে ফিরে যেতে বেশি সময় লাগবে না। আজকে আর আগে এগোনো হবে না, ডঃ মুলার। নেমে গিয়ে ওই মন্দিরেই ফের…”

দুই

তীক্ষ্ণ অনুভূতিকে প্রসারিত করে দিয়ে স্থির হয়ে ছিলেন বার্তুকল্য। আজ বিসর্পিণীর রাত। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আজকের দিনটায় সঠিক জায়গায় এসে পৌঁছোবার পরেও মানুষটা সে জায়গা ছেড়ে চলে যাবার জন্য পা বাড়িয়েছিল। এ হতে দিতে পারেন না তিনি। বায়ুপ্রবাহের সামান্য নিয়ন্ত্রণ করবার প্রয়োজন হয়েছিল তাই।

ওইটুকু হস্তক্ষেপই মানুষগুলোকে ফের ফিরে যেতে বাধ্য করছে অভিষেকযন্ত্রের কাছে। মৃদু একটু হাসি ফুটে উঠেছিল তাঁর ঠোঁটে। এ-খেলায় অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা নিষিদ্ধ। জিহুগাপতি তাঁর ক্রীড়নককে রক্ষা করেছেন তাঁর পোষ্য রূপসেনকে দিয়ে। নিজে সামনে আসেননি। বার্তুকল্যও সাবধান হয়েছেন তাই। বায়ুপ্রবাহের সামান্য নিয়ন্ত্রণ। সব বুঝলেও এতে জিহুগাপতির কোনও প্রতিবাদ করবার জায়গা থাকবে না। স্বপ্নে কিছু ইঙ্গিত দেয়া ছাড়া তিনি সরাসরি ওই আর্যকে কোনও নির্দেশ দেননি। শুধু এইবার সামান্য একটু সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হবে তাঁকে ওঁর মনে। আজকের রাতটা ওঁকে ওই মন্দিরের ভেতরেই আটকে রাখা প্রয়োজন। একা।

তিরের বেগে এগিয়ে আসছে ঘূর্ণি হাওয়াটা। প্রাণপণে ছুটছিল মানুষগুলো। একসময় মাঠের বুকে নেমে এসে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গিয়ে মন্দিরটার ভেতরে তারা ঢোকবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কান ফাটানো গোঁ গোঁ শব্দ করে তাদের পাশ দিয়ে ছুটে গেল ঘুরন্ত হাওয়ার স্তম্ভ।

নিরাপদ আশ্রয় থেকে সেদিকে তাকিয়ে একেকবার শিউরে উঠছিল দলটার প্রত্যেকে। খোলা পাহাড়ের বুকে ওই সরু অলিন্দে দাঁড়িয়ে এই ঝড়ের মুখোমুখি হতে হলে আজ তাদের কী পরিণতি হত সেটা আন্দাজ করতে কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না তাদের।

তিন

বাইরে তীব্র ঝড়ের গতি কমে আসছিল ধীরে ধীরে। মেঘের গায়ে ফাটল ধরেছে। সেই ফাঁকফোঁকর দিয়ে অস্তগামী সূর্যের কমলা আলো এসে পড়েছে মাঠের গায়ে। ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে দেখল রাকেশ। সাড়ে চারটে বাজছে। এখন সন্ধ্যার মুখমুখ ওই রাস্তায় পা দেয়ার আর কোনও অর্থ হয় না।

ডঃ মুলার কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন তার দিকে। সেদিকে ঘুরে মাথা নাড়ল সে, “সরি, ডঃ মুলার। আজকের রাতটাও এখানেই কাটাতে হবে বলে মনে হচ্ছে আমাদের। আপনার মিশনে একটু দেরি হয়ে গেল। বেলা পড়ে আসছে। আমি মাঠের একপাশে তাঁবু খাটাবার অর্ডার দিচ্ছি। কাল ভোরে উঠে…”

একটু  হেসে  মাথা  নাড়লেন  মুলার।  “একটা  কথা  বলতে চাই, রাকেশ। তোমরা তাঁবুতে রাতটা কাটাও। আমি আজকের রাতটা এই মন্দিরের চত্বরেই কাটাতে চাই।”

“কিন্তু…”

মৃদু হাসলেন মুলার। “কোনও কিন্তু নেই এতে, ডিয়ার। কেন জানি না, আমার মন চাইছে রাতটা  আমি একা  একা এইখানে  একটু নির্জনে কাটাই। আমায় নিয়ে ভেবো না। এখানে কোনও রিস্ক তো আর নেই!”

“অ্যাজ ইউ প্লিজ, স্যার,” রাকেশ হাসল। দরজা দিয়ে তার চোখে পড়ছিল, মাঠের সীমানার ঠিক বাইরে একটা টিলার গায়ে ঝুঁকে পড়া একটা ওভারহ্যাং-এর ছায়ায় তাদের লাল-নীল তাঁবুগুলো ফুটে উঠছে। যে ধরনের তুফানের দেখা মিলেছে এখানে খানিক আগে, তাতে খোলা মাঠে তাঁবু খাটিয়ে থাকাটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে যেকোনও সময়ে।

চার

“অবিন ভাইয়া… অবিন ভাইয়া…”

তাঁবুর সামনের ফ্ল্যাপের বাইরে থেকে একটানা ডাকছিল ধনুষ। মাঝে মাঝে ফ্ল্যাপের গায়ে অস্থির চাপড়। ধড়মড় করে উঠে বসল অবিন। অন্যান্য তাঁবুগুলোর ভেতরেও ইতিউতি টর্চের আলো জ্বলে উঠেছে।

“কী হল রে হঠাৎ?”

“বাইরে এসে দেখো!”

দলের বাকিরা ততক্ষণে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। অন্ধকার আকাশ ভেদ করে ধেয়ে আসা আলোকপুঞ্জের ঘনঘন আগুনের আঘাতে সূর্যের মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠা বাটির গড়নের মন্দিরটার দিকে সবার চোখ আটকানো। সেখান থেকে ছড়িয়ে আসা নীলাভ আলোয় ঢেকে গেছে তাদের পায়ের নীচের গোটা মাঠ।

“ডক্টর মুলার…” আলো ঝলসানো পাথরের বাড়িটার দিকে আঙুল দেখিয়ে হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ধনুষ। শিশির তাকে দু’হাতে কাছে টেনে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। প্রকৃতির এমন অকল্পনীয় লীলার সামনে সে নিজেও বড়ো অসহায় বোধ করছে এখন। ওই অগ্নিকুণ্ডের ভেতর ডঃ মুলারের বেঁচে থাকবার আর কোনও সম্ভাবনা উপস্থিত নেই।

“কতক্ষণ শুরু হয়েছে?”

“আধমিনিটও হবে না, অবিন ভাইয়া। আমি ঘুম থেকে উঠে বাথরুম যাব বলে বাইরে পা দিতেই…” বলতে বলতে শিশিরের হাতের বাঁধনের ভেতর থেকেই ফের থরথর করে একবার কেঁপে উঠল ধনুষ।

ছটফট করে এদিক ওদিক পায়চারি করছিল রাকেশ। অসহায়ভাবে

নিজের হাতদুটোই মোচড়াচ্ছে সে। তার পাশে দূরবীনে চোখ লাগিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে পাথরের গায়ে শুয়ে আছে শিশির আর অবিন। মাঠজোড়া মায়াবী নীল আলো আর তার মধ্যে সূর্যের মতো উজ্জ্বল মন্দিরটার দিকে বারবার লেন্সগুলোকে তাক করে আঁতিপাঁতি করে কিছু খুঁজে চলেছে তারা। ডঃ মুলার এত সহজে হাল ছেড়ে দেবেন? হয়তো মন্দির ছেড়ে বের হয়ে ওই নীলাভ আলোর সমুদ্রেই কোথাও…

হঠাৎ যেন তাদের ইচ্ছেটার জবাবেই তার দূরবীনের কাচে একটা আবছা অবয়ব ফুটে উঠল। মাঠের সীমানার কাছে উবু হয়ে পড়ে আছে শরীরটা। বারংবার এঁকেবেঁকে উঠছে, যেন কোনও ভয়ংকর যন্ত্রণায়।

“ডঃ মুলার?” হঠাৎ দূরবীনটা ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল তারা দু’জন। তাদের ক্যাম্পের উচ্চতাটা খুব বেশি নয়। আর তারপর রাকেশ আর ধনুষের সন্ত্রস্ত গলার পিছু ডাককে অগ্রাহ্য করে তারা লাফিয়ে পড়ল মাঠটার ধারে।

শরীরটা পড়ে আছে তাঁবুগুলোর ঠিক নীচে। মাঠের প্রায় সীমানার কাছে। অবিন আর শিশির সাবধানে নীলাভ আলোর সমুদ্রে তাদের ট্রেকিং পোল দুটোর বাঁকানো মাথাদুটো ঢুকিয়ে দিল। তারপর শরীরটার পোশাকের খাঁজে কোনওমতে আটকে দিয়ে একসঙ্গে টান দিল তারা।

মাঠের সীমানার বাইরে শরীরটাকে এনে ফেলে হাতের আলোটা জ্বালিয়ে তার মুখের দিকে ফেলেই তারা দু’জন চমকে উঠেছিল হঠাৎ, “ইউ আর নট ডঃ মুলার! হু আর ইউ?”

হঠাৎ চোখদুটো খুলে গেল মানুষটার। একেবারে স্থির হয়ে গিয়ে কী একটু ভাবল সে। আর তারপর হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, “ইয়েস! আই ক্যান ফিল ইট ইনসাইড মি! বাই জোভ! দ্য গোস্ট কিং ওয়াজ রাইট!” আর তারপর তাদের একরকম উপেক্ষা করেই তাদের পেছনের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল, “লেটস গো।”

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা তীব্র গরম হাওয়ার ঝটকা তাদের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়ে বাতাসে ভাসিয়ে তুলল সাহেবের শরীরকে। সে বাতাসের গর্জনের মধ্যে কারও হা হা করে উন্মাদ হাসির শব্দ শুনেছিল তারা দু’জন। নীলাভ আলোয় এক মুহূর্তের জন্য চোখে পড়েছিল ছুটন্ত শরীরটার পেছনে একটা অন্ধকার, প্রাচীন পোশাক যেন উড়াল দিয়েছে পাহাড়ের ছায়া ছেড়ে। তার মাথায় যেন ঝিকিমিকি করে কোনও প্রাচীন রাজমুকুট।

সেদিকে স্তম্ভিত হয়ে কতক্ষণ তাকিয়ে ছিল তা তারা জানে না। তারপর একসময় হঠাৎ দলের বাকিদের উত্তেজিত গলা কানে আসতে চমক ভাঙল তাদের। মাথার ওপর ঝুঁকে থাকা পাথরটার ওপর থেকে একসঙ্গে চিৎকার করছিল রাকেশ আর ধনুষ, “ডঃ মুলার! বেঁচে আছেন!”

একটু ধাতস্থ হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল অবিন ও শিশির। উল্কাপাত কখন যেন থেমে গেছে। নির্জন মাঠে মরা চাঁদের আলো। সেই আলোতে আস্তে আস্তে নিষ্প্রভ হয়ে আসতে থাকা মন্দিরটার চত্বর ছেড়ে তিরবেগে তাদের দিকে ছুটে আসছেন একজন মানুষ। আবছা চাঁদের আলোয় তাঁকে চিনতে ভুল হল না তাদের। ডঃ মুলার!

বহুদূরে, আগুনে পাহাড় বুকে নিয়ে জেগে থাকা এক হ্রদের পাশের একটি গুহায় জেগে থাকা একটা চেতনা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তাঁর দৃষ্টি গুটিয়ে নিলেন অভিষেকযন্ত্রের মাঠ থেকে। আসল মানুষটির অভিষেক সম্পূর্ণ হয়েছে। বিসর্পিণীর সম্পূর্ণ বিচ্ছুরণ আত্মস্থ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে দীর্ঘ সাধনায় নিজেকে তৈরি করে তারপর গ্রহণ করেছেন প্রতিস্মৃতিবিদ্যার পাঠ।

জিহুগাপতি অর্জুন কেবল প্রতিস্মৃতিবিদ্যার প্রয়োগ শিখেছিলেন। আর তিনি, বার্তকুল্য, তিনি নিজে পেয়েছিলেন বিসর্পিণীর পূর্ণ সময়ের অগ্নি আশীর্বাদ। কিন্তু, দু’দিক থেকে এইভাবে নিজেকে এ-পর্যন্ত একজন মানুষই তৈরি করতে পেরেছে। অমিত শক্তিধর এই মানুষটির সামনে এইবার সকলকেই নতজানু হতে হবে। দূর অতীতের সেই সন্ধ্যায়, ভবিষ্যতের আবছায়া জগতে একদিন এই মানুষটির এই সম্ভাবনার দিকেই তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন মহামতি কৃষ্ণ।

আবার এর বিপরীতে যে দুঃসম্ভাবনার আবছা আভাস দেখে তাকে প্রতিরোধ করবার জন্য অবিন ও শিশির নামের ওই দুই তরুণকে এখানে ডেকে এনেছিলেন তিনি, সে ভবিষ্যতও সত্য হয়ে উঠতে চলেছিল প্রায়। আর সেইখানেই ওরা দু’জন, এই নাটকে তাদের ভূমিকা, না জেনেই নিখুঁতভাবে পালন করেছে। জিহুগার টেনে আনা অন্ধকার সহচর উলফগ্যাং নামের ওই মানুষটির অভিষেক সম্পূর্ণ হবার বহু আগেই তাকে তারা বের করে আনতে পেরেছে বিসর্পিণীর প্রভাব থেকে। তার ক্ষমতা এখন পাণ্ডবদের সঙ্গে আসা দিগ্বিজয়ী সেনাদের মতোই সীমিত হবে। তাকে রোখা বার্তুকল্যের পক্ষে কঠিন হবে না।

তবে এখন সে নিয়ে ভাবনার অবকাশ তাঁর নেই। মুলারকে সমস্ত কিছু জানাবার সময় হয়েছে। জানবার জন্য তিনি প্রস্তুত। অনুভূতির একটা অদৃশ্য আকর্ষী তাঁর চেতনা থেকে বের হয়ে এল এবার। আকাশচুম্বী পর্বতশ্রেণীকে অতিক্রম করে আলোর গতিতে তা ধেয়ে গেল বহুদূরে। তারপর খুঁজে নিল তার লক্ষ্য, তাঁর চাইতেও শক্তিশালী হয়ে ওঠা আরেকটি চেতনাকে।

ত্রয়োবিংশতি অধ্যায়
২৬ মার্চ, ২০১৫

“মুলার।”

“কে?” মনে মনে প্রশ্নটা করেই থেমে গিয়ে মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল ডঃ মুলারের। চেতনায় এই স্পর্শকে তিনি চেনেন। আর স্বপ্নের প্রয়োজন নেই। পূর্ণ জাগ্রত অবস্থাতেই বার্তুকল্যের সঙ্গে সরাসরি মানসিক সংযোগের কৌশল এখন তাঁর জানা।

বরফ-জড়ানো গিরিশিরাটা ধরে সাবধানে নেমে আসতে থাকা দলটার দিকে একনজর তাকিয়ে দেখলেন মুলার। তারপর হঠাৎই গতি বাড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে হারিয়ে গেলেন খানিক নীচের একটা বাঁকের ওধারে।

“বলো, বার্তুকল্য।”

“আমার কাছে সমস্তই জেনেছেন আপনি কাল। আর কত অপেক্ষা করব আমি? কত যুগ-যুগান্তর কেটে গেছে আপনার আসবার অপেক্ষায়। আর আজ দরজার কাছে এসে পৌঁছেও সামান্য মানুষের মতো পায়ে হেঁটে পর্বতশিখর পার হয়ে…”

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেই আগ্নেয় হ্রদের পাশের গুহার অন্ধকারে ধ্যানমগ্ন শ্বেত পোশাক পরিহিত মানুষটির সামনে একরাশ উজ্জ্বল আলোককণা ফুটে উঠল।  তারপর  দ্রুত  জমাট  বেঁধে তারা তৈরি করল একটা মানুষের অবয়ব।

“এই তো আমি এসেছি, বার্তুকল্য। তোমার সামনে। বলো।”

আভূমি প্রণত হলেন বার্তুকল্য তাঁর সামনে। তারপর বললেন, “আমি ধন্য। তবে আর দেরি নয়। ঈশ্বরভূমির আদি বাসিন্দারা আপনার আসবার প্রতীক্ষায় আছে। জিহুগাদের হাত থেকে তাঁদের মুক্তি…”

“এখনই নয়, বার্তুকল্য। এখন আমাকে ফিরে যেতে হবে আমার সঙ্গীদের কাছে। তাদের সঙ্গে করে নিয়ে…”

“কেন? কিছু নিরীহ মানুষকে এই যুদ্ধের আগুনে এনে ফেলে…”

“ভুল করছ। দুটো ভুল। প্রথমত, তাদের রক্ষা করবার শক্তি আমার আছে। আর দ্বিতীয়ত, তাদের কৌতূহল নিবৃত্ত না করে মাঝপথে তাদের ছেড়ে দিলেও তারা আসবেই। বহুকাল হল মানুষের সমাজে তুমি নেই। তাদের উগ্র কৌতূহলের প্রবৃত্তির কথা তুমি ভুলে গেছ। অসমাপ্ত কোনও রহস্যকে তারা ছেড়ে দেয় না। আজ মাঝপথে তাদের ফিরিয়ে দিলে ফিরে গিয়ে তারা গোটা পৃথিবীকে জানাবে, এখানে রহস্য কিছু আছে। তারপর আজ না হোক কাল তারা নিজে থেকে ঈশ্বরভূমির রহস্যকে উদ্ধার করবেই। সেটা কাম্য নয়।”

“কিন্তু আপনি তাদের সঙ্গে করে এখানে এলে ঈশ্বরভূমির মন্ত্রগুপ্তি…”

মৃদু হাসলেন মুলার। “সে তুমি আমার হাতে ছেড়ে দাও। আমার অন্য পরিকল্পনা আছে।”

কথাগুলো বলতে বলতেই তাঁর জড় শরীর ফের ভেঙেচুরে গিয়ে একরাশ আলোককণার স্রোতে বদলে যাচ্ছিল। গুহা ছেড়ে তিরবেগে পেছনের পাহাড় পেরিয়ে ধেয়ে ফিরে যেতে থাকা সেই আলোকস্রোত থেকে মুলারের চিন্তার একটা শেষ তরঙ্গ ভেসে এল তাঁর চেতনায়, “আমাকে কী করতে হবে তা আমি এখন জানি, বার্তুকল্য।”

“ডঃ মুলার!”

অনেক উঁচু থেকে অবিনের গলাটা ভেসে আসছিল। তাদের চোখের আড়ালে খাড়াই ঢালের বরফের গায়ে আস্তে আস্তে একটা মূর্তি ফুটে উঠল। নিজের তুষার কুঠারের ফলাটা বরফের গায়ে গেঁথে দিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড়িয়ে ছিলেন মুলার। সেই অবস্থাতেই ডাক দিয়ে বললেন, “আমি এগিয়ে গিয়েছি খানিক। ভয় নেই। নেমে এসো তোমরা।”

কথাগুলো বলতে বলতেই মাথার খানিক ওপরে রাকেশের মাথাটা দেখা দিয়েছে। সাবধানে পা টিপে টিপে তাঁর কাছে নেমে এসে সে বলল, “সূর্য উঠে গেছে। পিছল বরফে এইভাবে দল ছেড়ে এগিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে, ডঃ মুলার। এ-রাস্তা গতকালের ট্রেকের মতো পাথরের অলিন্দ বেয়ে উঠে যাওয়া নয়। গভীর বরফের ঢালে একলা এগিয়ে গিয়ে আপনি ঠিক করেননি। এভাবে অজস্র দুর্ঘটনা ঘটেছে পাহাড়ে। আমি লিড ক্লাইম্বার হিসেবে…”

গভীর নীল চোখদুটো এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে  তুলে ধরলেন মুলার। তারপর একটু লাজুক হাসি হেসে বললেন, “সরি, স্কিপার। এখন থেকে তুমি সবার আগে থাকবে। আমি…”

রাকেশের মুখেও হাসির ছোঁয়া লেগেছে। “অন্তত যতক্ষণ এই রিস্কি এলাকাটা থেকে না বের হচ্ছি। যে রাস্তায় চলেছি সেটা আপনারই জানা আছে একমাত্র। স্নো লাইনের নীচে ফিরে গেলেই ফের আপনি আমাদের লিডার।”

এক মুহূর্ত থেমে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে অনুভূতিকে ছড়িয়ে দিলেন ডঃ মুলার। তারপর বললেন, “ডোন্ট ওরি। রাত তিনটেয় বের হয়েছি। এখন সকাল ন’টা। এই ঢালের স্নো লাইন আর খুব বেশি হলে একঘণ্টার পথ।”

“আপনি শিওর?”

“একদম। পাহাড়ে আমার অভিজ্ঞতা খানিক আছে। খানিক এগিয়ে গেলেই দেখতে পাবে।”

চতুর্বিংশতি অধ্যায়
২৬ মার্চ, ২০১৫
এক

নির্জন হ্রদের পাশে বালির চরায় দুপুরের রোদ ঘুমিয়ে আছে। হ্রদের বুকের অগ্নিস্তম্ভ এই মুহূর্তে অদৃশ্য। তার বাঁ-পাশ থেকে অরণ্যে ঢাকা একটা গিরিশিরা নেমে এসেছে চরার বুকে। তার পাদদেশের ঘন অরণ্যের ছায়ায় অজস্র গাঢ়তর ছায়ার খণ্ড ইতিউতি ঘুরে বেড়ায়। তাদের অদৃশ্য নাসারন্ধ্রে সুস্বাদু চেতনার ঘ্রাণ লেগেছে। মানুষের চেতনা। শ্রেষ্ঠ খাদ্য! এই পাহাড়ে মানুষের পা পড়ে না সহজে। নিতান্তই মৃত্যুহীন অস্তিত্ব। তাই দীর্ঘকাল তীব্র খিদের আগুনে পুড়েও তাদের মৃত্যু আসে না। বড়ো যন্ত্রণা।

আজ বহুকাল পরে একসঙ্গে বেশ কয়েকটা চেতনার ঘ্রাণ মিলেছে তাদের। ওই গিরিশিরা বেয়ে নেমে আসছে তারা। এদিকেই। জিহুগাপতির অতিথিকে উদ্ধার করে তাঁর কাছে পৌঁছে দেবার পর রূপসেনকে সে খবর দিয়েছেন স্বয়ং জিহুগাপতি। বলেছেন, রূপসেনের বাহিনীর আহারের জন্য নাকি এদের তিনিই আকর্ষণ করে এনেছেন এই পাহাড়ে। তাঁর সাফল্যের পুরস্কার। এই আগন্তুকদের চেতনার পুষ্টিকর তরঙ্গকে প্রাণভরে শুষে নেয়ার অনুমতি মিলেছে তাঁদের আজ।

আস্তে আস্তে কাছে, আরও কাছে এগিয়ে আসছিল তারা। নীচে নেমে আসবার খানিক আগে একটা চওড়া এলাকা আছে। সেখান থেকে হ্রদটা চোখে পড়ে না। জিহুগাপতির নির্দেশ সেইখানেই আহারের কাজ সমাধা করতে হবে তাঁদের। কেন, সে প্রশ্ন তোলেননি রূপসেন। কোনও প্রশ্নকর্তাকে ক্ষমা করেন না জিহুগাপতি। বহুকাল আগে এই হ্রদের তীরে একদিন সে অপরাধে বরুণপালের প্রেতছায়ার নিদারুণ যন্ত্রণায় ধ্বংস হবার ছবি আজও তাঁর চোখে ভাসে।

অধৈর্য হয়ে উঠছিল তাঁর সৈন্যদল। এইবার তাদের দিকে ঘুরে দেখলেন তিনি একবার। সময় হয়েছে। তাঁর নির্দেশ পাওয়ামাত্র যেন একটা ঝড় উঠল সেই অরণ্যে। সূর্যের আলোকে ঢেকে দিয়ে একটা তীব্র অন্ধকার ঝঞ্ঝা শৈল-সমুদ্রকে, অরণ্যকে ঢেকে দিয়ে তিরবেগে ছুটে গেল গিরিশিরার ওপরের দিকে।

দুই

জায়গাটা বেশ খানিক চওড়া। ওপর থেকে খাড়াই পথটা এসে তার ডান প্রান্তে শেষ হয়ে গেছে। জায়গাটার বাঁদিক থেকে ফের নীচের দিকে নেমে গেছে ধাপে ধাপে পাথরের স্তূপ, যেন কোনও প্রাগৈতিহাসিক দৈত্যদের সিঁড়ি।

“ডেভিলস ল্যাডার।” সেদিকে ইশারা করে খাবারের শেষ টুকরোটা মুখে পুরে অবিন বলে উঠল।

“নামটা উপযুক্ত বটে,” রাকেশ তার মাদুরটা গোটাতে গোটাতে বলছিল, “তবে এই এলাকায় ও-জিনিসের নাম কে রাখল, অবিন ভাইয়া? এদিকে কেউ এসেছে কখনও বলে তো আমরা জানি না।”

“আরে, না না। সাতপুরাতে এইরকম একটা জিনিস আছে। ঐ নামে। আমি একবার ক্রসও করেছি। তাই বললাম আর কী।”

জবাবে রাকেশ কিছু একটা বলতে গিয়েছিল, কিন্তু কথাটা বলবার আগেই আকাশের দিকে চোখ চলে গেল তার। “মেঘ করল নাকি?” নিজের মনেই হঠাৎ মরে আসা সূর্যের আলোর দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করছিল। “কিন্তু আকাশ তো…”

“মেঘ নয়,  রাকেশ!”  হঠাৎ  নিজের আসন ছেড়ে সোজা হয়ে উঠে

দাঁড়ালেন ডঃ মুলার। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ডেভিলস ল্যাডার থেকে তীব্র গতিতে ধেয়ে এল অন্ধকার ঝড়টা। চেতনা হারাতে হারাতেই তারা দেখেছিল, সেই ঝড়ের আবছায়ায় অজস্র অন্ধকার সৈনিক অবয়বের ভিড়। আর একটা পাহাড়ের মতোই অটল থেকে ধীর পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন ডঃ মুলার।

“থামো।”

মাথায় মুকুট পরা রাজকীয় চেহারাটা থমকে দাঁড়িয়েছে তাঁর সামনে। তার পেছনে জমা হওয়া সৈন্যের বিশাল দলটাও কোন মন্ত্রবলে যেন থমকে গেছে।

ছায়াগুলোর সামনে গিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে হঠাৎ বুকটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল মুলারের। বড়ো যন্ত্রণায় আছে তারা। সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে শুধুই তীব্র খিদে তাদের।

স্থির চোখে তাঁর চোখের দিকেতাকিয়েছিল সৈন্যদলের রাজমুকুট পরা  নেতা।  একটু  বাদে  বিস্মিত  গলায়  সে  বলল,  “তুমি…… তুমি

আমাদের দেখতে পাচ্ছ? সাধারণ মরণশীল একজন মানুষ…”

তার চোখে চোখ রেখে যেন মনের ভেতরটা পড়ে নিচ্ছিলেন সামনে দাঁড়ানো সোনালি চুলের বিরাট চেহারার মানুষটা। খানিক বাদে মৃদু একটু হাসি ফুটল তাঁর মুখে। তার দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে তিনি বললেন, “তুমি, তোমরা বড়ো ক্ষুধার্ত, রাজা রূপসেন। আজ আমার চেতনায় তোমাদের নিমন্ত্রণ। এসো।”

বলতে বলতেই নিজের চেতনার ওপর থেকে আবরণ সরিয়ে নিলেন মুলার। তাঁর মানুষ-সঙ্গীরা এখন অচেতন। এই দুর্ভাগা প্রেতদের কাছে আর ছদ্মবেশের আবরণ ধরে রাখবার প্রয়োজন নেই তাঁর।

সেদিকে চোখ ফেলে স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছিলেন রাজা রূপসেন। অনন্ত শক্তির জ্যোতির্ময় এক সমুদ্র যেন ফুটে আছে সেখানে। দেখতে পেয়েছিল তাঁর সৈন্যদলও। হঠাৎ ক্ষুধার্ত পশুর মতো একযোগে গর্জন করে উঠল তারা। তারপর একটা অতিকায় অন্ধকার স্রোতের মতো ছুটে এসে মিশে গেল মুলারের শরীরে।

তখন তাঁর চৈতন্যের বিপুল সমুদ্রে অবগাহন করে বেড়ায় দুর্ভাগা প্রেতচেতনার দল। বড়ো ক্ষুধার্ত ওরা। কিন্তু চেতনার যে বিপুল ভাণ্ডারের সন্ধান তাঁকে দিয়েছে প্রতিস্মৃতিবিদ্যার সাধনা, দিয়েছে বিসর্পিণীর অগ্নি-আশীর্বাদ, তার কতটুকুই বা আর লাগবে তাদের খিদে মেটাতে!

সঙ্গীদের অচেতন শরীরগুলোর পাশে একটা অতিকায় পাথরের পাশে গাছের নীচে ধ্যানস্থ হয়ে অপেক্ষা করছিলেন মুলার। তাঁর চেতনাসমুদ্রে ডুব দিয়ে ওরা তৃপ্ত হোক। তিনি জানেন, সেই তৃপ্তিই তাদের প্রেতশরীরের মুক্তির পথ।

যেন অনন্তকাল পরে একসময় ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। খিদের নিবৃত্তি করে বহুযুগের অতৃপ্ত সেই প্রেতচেতনার দল এইবার মিশে গেছে তাঁর চেতনার অতল সমুদ্রে। মুক্তি হয়েছে তাদের অভিশাপের। আর তারা জাগবে না কখনও। তাঁর হাতের ঘড়িতে দেখাচ্ছিল, এই জগতের সময়ের হিসেবে মাত্রই পাঁচটা মিনিট কেটেছে ততক্ষণে।

সঙ্গীদের অচেতন শরীরগুলোর দিকে একবার ঘুরে দেখলেন মুলার এইবার। ওদের জাগাবার সময় হয়েছে।

“আরে রাকেশ, মিস্টার অবিন, হোয়াটস রং উইথ ইউ গাইজ? খেয়েদেয়ে দুপুরের  সিয়েস্তা  তোমাদের ইন্ডিয়ানদের  একটা  ভারি বদ অভ্যাস কিন্তু।”

মুলারের গলাটা যেন অনেকদূর থেকে ভেসে আসছিল। ধড়মড় করে উঠে বসল অবিন। রাকেশ, শিশির, ধনুষরাও জেগে উঠেছে একই সঙ্গে। তাদের দিকে একনজর তাকিয়ে সে একটু লাজুক গলায় বলল, “বিশ্রী একটা স্বপ্ন দেখছিলাম, বুঝলেন? একটা অন্ধকার ঝড়…”

“ওই ডেভিলস ল্যাডার থেকে উঠে এল, তাই তো?” মুলার তাদের সবার দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, “আমিও তাই দেখলাম। দেখেই তো ধড়মড় করে উঠে বসেছি। হাই অল্টিচ্যুডে অনেক সময় এমনটা হয়। তাই না, রাকেশ?”

“হ্যাঁ। মানে অক্সিজেন ডেফিশিয়েন্সি হলে অনেক সময় ডিলিরিয়াম…” বিড়বিড় করে যেন নিজেকেই বোঝাছিল সে কথাগুলো। কারণ, খানিক আগে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে স্বপ্ন সেও দেখেছে।

“ওকে। এনাফ অব দিস,” মুলার হাসছিলেন, “এখন চলো।”

তিন

“রূপসেন। পুত্র রূপসেন… উত্তর দাও। তুমি কোথায়? রূপসেন…”

জিহুগাপতির চেতনার সুক্ষ্ম আকর্ষীগুলো আঁতিপাঁতি করে খুঁজে ফেরে চারদিকে। মাত্রই কিছুক্ষণ আগে তাঁর সব আশাকে ধূলিসাৎ করে মানুষের ছোটো দলটা ওই পাহাড়ি পথ বেয়ে এসে হাজির হয়েছে হ্রদের ধারে। তাদের সকলের সামনে থাকা শ্বেতাঙ্গ মানুষটা সেখানে এসে নামবার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের নিয়ে বেলাভূমির পাশের গুহায় গিয়ে ঢুকেছেন। জিহুগাপতি জানেন সেখানে তারা বার্তুকল্যের আশ্রয়ে থাকবে। পাহাড়ে ঠিক কী ঘটেছে তা তিনি জানেন না। একটা অদৃশ্য, শক্তিশালী বাধা দেয়ালের মতো উঠে দাঁড়িয়ে সেখানে তাঁর চেতনাকে ঢোকবার অধিকার দেয়নি।

দরজার অন্যপাশে এক অক্ষৌহিণী পাণ্ডবসেনা উদগ্র অপেক্ষায় আছে। কিন্তু সে তো দরজার অন্যধারে, ঈশ্বরভূমির সীমান্তের ভেতরে। দরজা পার হয়ে বাইরে আসবার শক্তি তাদের নেই। এই মুহূর্তে রূপসেনের বাহিনীকে তাঁর বড়ো প্রয়োজন।

আর ঠিক তখন গুহার ভেতর থেকে সেই মানুষটা বের হয়ে এলেন।

“রূপসেন। পুত্র রূপসেন… উত্তর দাও।”

কোন উত্তর এল না।

গুহার ভেতর থেকে এইবার বের হয়ে এসেছেন শ্বেতাঙ্গ মানুষটা। একনজর সেদিকে ঘুরে তাকালেন জিহুগাপতি তৃতীয় পাণ্ডব। রূপসেনের বাহিনী আর নেই। তবে নিজে যুদ্ধে নামবার আগে আরও একটা অস্ত্র তাঁর কাছে আছে।

হঠাৎ হ্রদের মাঝখানের সেই অগ্নিস্তম্ভ থেকে বালির তীব্র একটা ঝড় উঠে ধেয়ে এল তীরের দিকে। এক মুহূর্ত মানুষটার সামনে এসে স্থির হয়ে থেকে তা যখন সরে গেল তখন সেখানে অন্য একজন মানুষ সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন।

তাঁর দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন মুলার। তারপর অস্ফুট গলায় বললেন, “উলফগ্যাং?”

জবাবে তাঁর সামনে নিঃশব্দে বাতাসে ভেসে উঠলেন উলফগ্যাং। তারপর বাতাসকে পুড়িয়ে দিয়ে তীব্র শক্তির একটা শ্বেততপ্ত ধারা তার চোখ থেকে ছিটকে এল মুলারের দিকে।

বেদনার্ত চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখলেন মুলার। উলফগ্যাং প্রতিভাধর ছিলেন। সৎ ছিলেন। এখন তিনি বুঝতে পারছেন, অন্ধকারের পথে তার এগিয়ে যাবার মূলে শুধু তাঁর নিজের লোভ দায়ী ছিল না। যেভাবে তাঁকে নিয়তির মতো এই যুদ্ধক্ষেত্রে টেনে এনেছেন বার্তুকল্য, ঠিক তেমনই ঘটনাস্রোতকে প্রভাবিত করে এ-পথে উলফগ্যাংকেও টেনে এনেছে তাঁর নিয়তি। ওই জিহুগাপতি অর্জুন।

হঠাৎ তীব্র সেই ভুবনগ্রাসী শক্তির ছটা ধেয়ে এসে আঘাত করল মুলারকে। শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন মুলার। এই গ্রহের বায়ুমণ্ডলের বিদ্যুৎকে সংহত করবার তুচ্ছ প্রক্রিয়ায় অধিকার হয়েছে এর।

তাঁর শরীরকে আঘাত করে সেখানেই মিলিয়ে গেল শক্তির ধারা। ততক্ষণে ফের একবার আঘাত হেনেছেন উলফগ্যাং। তারপর আবার… আবার…

“আর কতবার আমাকে আঘাত করবে, উলফগ্যাং?”

“যতক্ষণ না তুমি ধ্বংস হও, মুলার। আমার ওপর জিহুগাপতির তাই আদেশ।”

হঠাৎ তীব্র শক্তি নিয়ে চোখদুটো ঝলসে উঠল মুলারের। “তুমি আর জিহুগাপতির দাস নও, উলফগ্যাং। আমি তোমাকে মুক্তি দিলাম।”

মোলায়েম   নরম   একটা   আলোর   ধারা   এসে  ছেয়ে  যাচ্ছিল উলফগ্যাংয়ের শরীরে। এখানে কী করছেন তিনি? তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল প্রথম যৌবনের সেই দিনগুলো। ক্রুগারের ল্যাব। তিনি ও মুলার মিলে জ্ঞানের সাধনার পথে প্রথম যাত্রা। শেষ বিকেলের পড়ন্ত আলোয় নদীর ধারে বসে দুই বন্ধুর সেইসব স্বপ্ন, একদিন তাঁরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রত্নবিদ হবেন! মানবসভ্যতার অতীতকে খুঁড়ে এনে গড়ে তুলবেন সভ্যতার সঠিক ইতিহাস।

থেমে আসছিল তাঁর মস্তিষ্কের ভেতরের চূড়ান্ত তোলপাড়। দীর্ঘকাল ধরে লোভের ছদ্মবেশে তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা একটা অদৃশ্য শেকল যেন খুলে আসছে সেখান থেকে। তাঁর মন থেকে  মিলিয়ে যাচ্ছিল জিহুগাপতির নিষ্ঠুর মুখের ছবি।

“মুলার, আমি… আমি…”

“কিচ্ছু বলতে হবে না, উলফগ্যাং। কোনও কৈফিয়ত দিতে হবে না। এখন আমি সব জানি। যা করেছ তার জন্য তুমি দায়ী ছিলে না। এরপর তোমার সামনে আরও বড়ো কর্তব্য অপেক্ষা করছে। এখন যাও। এই যুদ্ধক্ষেত্রে তোমার আর কোনও ভূমিকা নেই।”

তার শরীরে ডানহাতের তর্জনীটা ছুঁইয়ে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইলেন  মুলার। দেহটা  ভেঙেচুরে  একরাশ আলোর  বিন্দু  হয়ে  ধেয়ে চলেছে বার্তুকল্যের গুহার দিকে। ওখানে সে নিরাপদে থাকবে এখন।

হ্রদের মাঝখানে অগ্নিস্তম্ভ জেগে উঠেছে ফের। তার অতিকায় মাথা উঁচু হয়ে আকাশের গায়ে ঠেকেছে গিয়ে যেন। একনজর সেদিকে তাকিয়ে হাঁটু গেড়ে বালির ওপর বসে পড়লেন মুলার। তাঁর গলায় তখন জেগে উঠেছে ঈশ্বরভূমির দরজা খোলবার আদি শব্দসংকেতের নিখুঁত উচ্চারণঃ

“ওমমম…”

অগ্নিস্তম্ভ থেকে তাঁর দিকে ছুটে আসা বালির ঝড়টা উন্মাদ হয়ে উঠেছে যেন। বেলাভূমির সমস্ত বালিকে বাতাসে ভাসিয়ে তুলে বহুযুগ পরে তা উন্মুক্ত করে দিয়েছে তার পাথরের ভিতকে। সেই ঘুরন্ত বালির স্তম্ভ এক রাজবেশধারী অতিকায় স্বর্ণবর্ণ পুরুষের রূপ ধরে আগুন ঝরিয়ে যায় ধ্যানস্থ শরীরটার দিকে। ব্রহ্মাণ্ডগ্রাসী শক্তির সেই আঘাতকে নিজের শরীরে শুষে নিয়ে একেকবার থরথর করে কেঁপে ওঠেন তিনি। কিন্তু তবুও তাঁর অবিচল কন্ঠ থেকে ভেসে ওঠে সেই আদি শব্দসংকেত।

“ওমমম…”

দুই যোদ্ধাকে ঘিরে তখন উন্মাদ হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। তীব্র ভূকম্পের আঘাতে তাঁদের ঘিরে আর্তনাদ করে ওঠে আকাশছোঁয়া পাহাড়দের পাথুরে শরীর। আকাশ থেকে নেমে আসা বিদ্যুতের দল তাঁদের ঘিরে তা থৈ তা থৈ নৃত্য করে। হ্রদের বুক থেকে বারংবার ছুটে আসে অতিকায় ঢেউয়ের দল।

অবশেষে একসময় শেষ হল সেই শব্দোচ্চারণ। চোখ খুলে উঠে দাঁড়ালেন তিনি তাঁর সামনে দাঁড়ানো রাজবেশধারীর মুখোমুখি। তারপর পেছন ফিরে গুহার দিকে মুখ করে গম্ভীর গলায় ডাক দিলেন, “দ্বারপাল, দরজা খোলো।”

আদেশ পাবার সঙ্গে সঙ্গেই গুহার ভেতর থেকে ছুটে আসা শ্বেততপ্ত একটা আলোর ধারা গিয়ে আঘাত করল হ্রদের বুকের অগ্নিস্তম্ভের গায়ে। সেখানে তখন ফুটে উঠছিল স্ফটিকের তৈরি একটা অতিকায় দরজা। তার পাল্লাদুটো খুলে ধরে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসেছেন শ্বেত পোশাক পরা বার্তুকল্য।

“ঈশ্বরভূমিতে স্বাগত, প্রভু।”

ধীরে ধীরে হ্রদের শান্ত হয়ে আসা জলের বুকে পা রাখলেন মুলার। তাঁর পেছন পেছন এগিয়ে আসছিলেন রাজবেশধারী জিহুগাপতিও। একটা জটিল সমীকরণ তখন জেগে উঠেছে তাঁর মস্তিষ্কে। রাজনীতির পথ জটিল। সেখানে কেউ চিরকাল শত্রু বা মিত্র থাকে না।

দরজার সামনে এসে তাড়াতাড়ি মুলারের মুখোমুখি হলেন তিনি। তাঁর চোখের উগ্রভাব শান্ত হয়ে এসেছে। বন্ধুত্বপূর্ণ একটা হাসি এখন ছেয়ে আছে সেখানে।

“ঈশ্বরভূমিতে স্বাগত। আজ এতকাল পরে আমার সমান শক্তিধর একজন পুরুষের পা পড়ল এখানে। আপনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, দেব। জিহুগাপতি অর্জুনের অভিনন্দন নিন। আমার রাজসভায় আজ থেকে আপনার স্থান আমার পাশে হবে। আমাদের যৌথ শক্তির সামনে মাথা নোয়াতে বাধ্য হবে অগণিত সমান্তরালের অসংখ্য মানব-সাম্রাজ্য। আজ বহুকাল পরে ফের দিগ্বিজয়ে যাবে অজেয় পাণ্ডববাহিনী।”

“ভুল করছ, জিহুগাপতি,” বার্তুকল্য কথা বললেন হঠাৎ। “নিয়তির নির্দেশে আজ বহুযুগ পরে এঁর এখানে আসবার উদ্দেশ্য তোমার লোভের আগুনে আহুতি দেবার জন্য নয়। ইনি এসেছেন ঈশ্বরজাতিকে তোমাদের অন্যায় অধিকারের  হাত  থেকে  মুক্তি  দিয়ে  তাঁদের ক্ষমতাকে ফিরিয়ে দেবার জন্য। পাণ্ডবদের বহুকালের পাপ এবার…”

“না।”

মুলারের শান্ত গলার স্বর এবার তাঁদের দু’জনেরই দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে ধরল তাঁর দিকে। তাঁদের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন তিনি। “আজ নয়, বার্তুকল্য। ঈশ্বরভূমি আমার জন্মভূমি নয়। আমার প্রথম কর্তব্য আমার নিজের পৃথিবীর প্রতি। এখন আমি ফিরে যাব। যে বিদ্যা আর শক্তি আমি অর্জন করেছি এই যাত্রায়, এইবার তাকে ব্যবহার করব আমার পৃথিবীতে। এখানে অজস্র মানুষের মধ্যে আমার মতোই জেগে ওঠবার বিপুল সম্ভাবনা আছে। চিরকালই ছিল। অর্জুন ক্ষমতার লোভে অন্ধ ছিল। যে শক্তি সে পেয়েছিল তাকে সে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায়নি। কিন্তু আমি তা দেব।”

“কিন্তু তাহলে কেন এলেন? কেন এই দরজা খোলবার আদেশ দিলেন আমাকে?”

মৃদু হাসলেন মুলার। তারপর বার্তুকল্যের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে জিহুগাপতির দিকে ফিরে বললেন, “শক্তির একটু নমুনা দেখাবার জন্য হে অর্জুন। তোমাকে দেখাতে, যে উপযুক্ত শক্তির সন্ধান পেলে তোমার বাধাকে পেরিয়ে ঈশ্বরভূমির দরজা খুলে দিতে এই পৃথিবীর একজন মানুষই যথেষ্ট। এইবার আমি ফিরে যাব। আগামী আট শতাব্দী ধরে এই শক্তি দিয়ে আমার পৃথিবীকেও দ্বিতীয় ঈশ্বরভূমি করে গড়ে তুলব আমি।

“তারপর অর্জুন, বিসর্পিণী ফিরে এলে হাজার হাজার সমশক্তিধর অতিমানবের বাহিনী নিয়ে আমি ফিরে আসব। সেইদিন ঈশ্বরভূমি মুক্ত হবে। সেইদিন ঈশ্বরভূমির প্রতি মানবভূমির করা প্রাচীন পাপের প্রতিকার হবে। সেইদিন এই ঈশ্বরভূমিতে তোমাদের আটজনের শাস্তিবিধান করবে ক্ষমতায় ফিরে আসা ঈশ্বরশাসক। প্রস্তুত থেকো।”

উপসংহার

রাত গভীর হয়েছে। অভিযাত্রীদের ছোটো দলটার ক্যাম্প পড়েছে একটা নির্জন টিলার মাথায় ছড়ানো একটুকরো জমিতে। এখান থেকে অন্ধকার আকাশের বুকে মিল্কি ওয়ের দীর্ঘ তারানদী চোখে পড়ে। সেইদিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিল অভিযাত্রীদের ছোটো দলটা। হ্রদের পাশের সেই অতিমানবিক যুদ্ধ তারা দেখেছে বার্তুকল্যের গুহায়, তাঁর নিরাপদ আশ্রয়ে বসে।

“আ-আপনি কে? ওরা… ওরা… এই বিপুল শক্তি…”

অবিনের দিকে ফিরে মৃদু হাসলেন মুলার। “এইবার তোমাদের সব বুঝিয়ে বলবার সময় এসেছে, অবিন। যে দূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে আমি এগোব, তার প্রথম সৈনিক হবে এই তোমরা ক’জন। কিন্তু তার আগে তোমরা আমার সমস্ত কথা শোনো। পৃথিবী একটা নয়। মানবভূমির সমান্তরালে অবস্থান করে ঈশ্বরভূমি, রাক্ষসভূমি, রসাতলভূমি – এমন অসংখ্য সমান্তরাল দুনিয়া। কয়েকটা দরজা তাদের মধ্যে…”

রাত গভীরতর হয়। একজন জ্ঞানী মানুষ তাঁর গল্প বলে চলেন। পাহাড়ের চূড়া থেকে ঠাণ্ডা হাওয়ার স্রোত ভেসে আসে। কয়েকজন মানুষ তাঁর স্বপ্নের কথা শোনে। দূর ভবিষ্যতে কোনও একদিন মানবভূমিকে শক্তিমান ঈশ্বরভূমিতে বদলে দেবার স্বপ্ন। একদিন মানুষের হাতে মানুষেরই হিংস্র পূর্বজের অত্যাচার থেকে ঈশ্বরজাতিকে মুক্তি দেবার স্বপ্ন।

——————————————————————————————

কলমেঃ শান্তনু, কৃষ্ণেন্দু দেব, কিশোর ঘোষাল, পুষ্পেন, রাজীব, সুদীপ ও দেবজ্যোতি। 
তুলিতেঃ শিমুল।

কিছুদিনের মধ্যেই ‘জয়ঢাক প্রকাশন’ থেকে বই হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে ‘ইতি রুদ্রট।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Advertisements

3 Responses to যৌথ উপন্যাস ইতি রুদ্রট শরৎ ২০১৮

  1. Dr. Sudip Banerjee says:

    খুব ভালো লাগলো। এডিটিং সুন্দর হ‌ওয়ায় এতোজনের লেখা প্রায় বোঝাই যাচ্ছে না। এক‌ইরকম টানটান লেগেছে। তবে আদি ঈশ্বরদের পঞ্চপান্ডব কিভাবে পরাস্ত করলো সেটা পরিষ্কার করে জানালে ভালো হতো। রাজশেখর বসুর মহাভারত পড়েছি, উনি ছদ্মনামেও মহাভারত লিখেছিলেন, এটা তথ্যগত ভুল নাকি কল্পনা? এইরকম লেখা আর‌ও পড়ার ইচ্ছা থাকলো

    Like

    • joydhakwalla says:

      😀 পাণ্ডবদের ঈশ্বরভূমি জয় পর্ব নিজেই একটা বিশাল কাহিনী। খুব সহজ ছিল না সেই পর্ব। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বিরাটতর সেই ভার্শনের কল্প ইতিকথা নিয়ে হয়ত এই সিরিজের আরেক কাহিনী, (যা এ কাহিনীর প্রিকোয়েল,) লেখা হবে সপ্তরথীর কিবোর্ডে।

      Like

  2. Rahul Ketu says:

    Simply incredible..

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s