লোককথা প্লুটো ও প্রসারপিনা অরুন্ধতী রায়চৌধুরী শরৎ ২০১৭

অরুন্ধতী রায়চৌধুরীর আরো লেখা  দূরের মাটির ধুলো (প্যারিস)  দূরের মাটির ধুলো (ভেনিস) 

তোমাদের আজ আমি একটি বিখ্যাত গ্রিক উপাখ্যান শোনাব। বহু হাজার বছর আগে গ্রিস দেশে এক দেবী ছিলেন। তাঁর নাম ‘সিরিস’। তাঁর আশীর্বাদে পৃথিবী সবুজ শস্যে ভরে উঠত। তাঁর পায়ের ছোঁয়ায় মাটির বুকে ফুটে উঠত নানা রঙের ফুল, তাঁর হাতের স্পর্শ পাবার জন্য পাতায় ভরা গাছের ডাল ফলের ভারে নুয়ে পড়ত।  তিনি ছিলেন ধরিত্রীর যা কিছু শ্যামল, সুন্দর, সুকুমার তার দেবি।

তাঁর মেয়ে কিশোরী প্রসারপিনা ছিল তাঁর প্রাণের ধন। তিনি তাকে এক মুহূর্তও চোখের আড়াল করতেন না। তাঁর মাতৃস্নেহের সমস্ত মাধুর্যটুকু নিয়ে প্রসারপিনার অপরূপ শোভাময় কোমল দেহ ও মন গড়ে উঠেছিল। পৃথিবীর সব চাইতে সুন্দর, নিষ্পাপ বালিকা ছিল সে, ধরিত্রী দেবী সিরিসের একমাত্র কন্যা।

একদিন সিরিস তাঁর রথে চড়ে চললেন পৃথিবীর আরেক প্রান্তে শস্যসম্ভার উজার করে দিতে।  সে দেশ অনেক দূর, আর তিনি নিজে বড়ই ব্যস্ত থাকবেন কাজে, তাই প্রসারপিনাকে তিনি রেখে গেলেন সমুদ্রের তীরে তার বন্ধু জলপরীদের কাছে। বলে গেলেন, “বাছা, কখনও কোথাও যেওনা একা একা। ছোট মেয়েদের মা কাছে না থাকলে কত রকম বিপদ যে ঘটে! বড় ভয় হয়, আমি সারা সকাল এখানে থাকব না, তুমি কিন্তু তোমার বন্ধুদের ফেলে কোথাও যেও না।”

প্রসারপিনা বলে, “তুমি না থাকলে আমার খুব কষ্ট হবে। আমি তোমার অবাধ্য হব না দেখো।”

সমুদ্রের জলের তলায় থাকে যে ছোটো ছোটো মৎস্যকুমারীরা, তারা প্রসারপিনার ডাকে ঢেউয়ের দোলায় উঠে এল। তাদের চুল সবুজ শ্যাওলার মতন, তাদের মুখ অতি সুন্দর ফুলের মত। তারা সাদা ফেনার মধ্যে শরির ডুবিয়ে ভেসে রইল। নইলে সূর্যের প্রখর আলোয় আর হু হু হাওয়ায় তারা শুকিয়ে যাবে। বড়ো কোমল তাদের জলের দেহ। প্রসারপিনাকে তারা ভালোবাসত। কতরকম মুক্তো ও ঝিনুক দিয়ে তার জন্য মালা গেঁথে তুলল তারা। সে-ও খুব খুশি হয়ে ঢেউয়ের সঙ্গে ছোটাছুটি করে খেলতে লাগল। বলল, “তোমরা আমার জন্য এত সুন্দর মালা গেঁথেছ, আমিও তোমাদের জন্য মালা গাঁথি, কেমন? আমার তো সাগরের মুক্তো নেই, আছে ডাঙার ফুল। তার রঙ ও গন্ধে তোমরা পাগল হয়ে যাবে।”

মাঠের ওপর কত দূর পর্যন্ত কত ফুল ফুটে আছে। ভোরের হাওয়ায় দুলে দুলে তারা প্রজাপতির সঙ্গে কথা বলছে। প্রসারপিনা ফুল তুলতে তুলতে মাঠের মধ্যে দূরে, আরও দূরে চলে যেতে লাগল। জলপরীরা ডেকে বলল, “আমরা তো জল ছেড়ে যেতে পারব না, তুমি অনেক দূরে যেও না। তাড়াতাড়ি ফিরে এস।”

প্রসারপিনা উৎসাহে, আনন্দে সব ভুলে গেল। “ওই দূরের ফুলগুলো আরও সুন্দর ও উজ্জ্বল,” এমনি ভাবতে ভাবতে  সে ক্রমশ অচেনা বনে গিয়ে পড়ল। তার আঁচল তখন অপর্যাপ্ত ফুলে ভরে গেছে। আর তো নেবার জায়গা নেই!  এবার ফিরতে হয়। হঠাৎ চোখে পড়ে, একটু দূরে অই ছোটো গাছটিতে যে ফুল ফুটেছে, তার মত শোভা তো সে আর কখনও দেখেনি! কী আশ্চর্য গাছের পাতা! আর তার থেকেও আশ্চর্য তার ফুলগুলি। দু হাত দিয়ে গাছটিকেই টেনে তোলার চেষ্টা করে প্রসারপিনা। শিকড়ে টান লাগে-পৃথিবীর গভীর থেকে যেন কী এক গম্ভীর শব্দ ভেসে ওঠে।  পায়ের তলে মাটি কেঁপে ওঠে। ছোট্ট মেয়েটি ভয়ে, বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে পড়ে। ছুটে পালাতে চায় কিন্তু পা আর সরে না। দারুণ ঘর্ঘর শব্দে অন্ধকার গর্তের অতল থেকে  উঠে আসে এক বিচিত্র রথ। চারটি ঘোড়া যেন ফুঁসছে। রথটি অদ্ভুত! তার সারা গা মনিমাণিক্যে খচিত আর রথের যে আরোহী তার চেহারা একাধারে ভীষণ ও সুন্দর। কঠিন পাথর কুঁদে বার করা মূর্তির মত সুন্দর, আবার মুখের গম্ভীর ভ্রূকুটি ভয়ানক। তাঁর মাথার মুকুটের দ্যূতি ঝলসে অঠে। রাজকীয় পোশাকের আভিজাত্যে সম্ভ্রম জাগায়। আবার চোখের অসন্তুষ্ট, কঠিন দৃষ্টি, দৃঢ় চাপা ঠোঁটের ভাব ভয় এনে দেয় মনে। অসন্তুষ্টি তাঁর সবকিছুতেই। এই সূর্যের আলো, ফুরফুরে হাওয়া, বর্ণগন্ধের সমারহ যেন চরম বিরক্তিকর।

রথ ওপরে উঠে দাঁড়ায়। হাত তুলে চোখের ওপর আড়াল করেন সেই পুরুষ। যেন প্রখর আলো সহ্য করতে পারছেন না। চারিদিকে কী খোঁজেন।  প্রসারপিনাকে দেখতে পেয়ে কঠিন মুখে হাসি ফুটে ওঠে। হাত ধরে তাকে রথে তুলে নেন। যত দূর সম্ভব নরম গলায় বলেন, “এস মিষ্টি মেয়ে। আমার সঙ্গে তোমায় যেতে হবে এবার। আমি রাজা প্লুটো। পাতালপু\রীর যাকিছু সম্পদ সমস্ত আমার। গভীড় পৃথিবীর নিচেকার লুকানো মণিমাণিক্য, সোনাদানার একমাত্র অধীশ্বর আমি। তোমাকে আমার রাজপুরীতে নিয়ে যেতে এসেছি। ”

প্রসারপিনা ছুটে পালাতে যায়। অসহায় গলায়, “আমাকে মা’র কাছে ফিরিয়ে দাও। কোথাও যেতে চাই না মাকে ছেড়ে” বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। পাতালের সম্রাট প্লুটোর মুখে কঠিন হাসি ফুটে ওঠে। তিনি রথ ছুটিয়ে দেন। পাহাড়, পর্বত, মাঠ, নদী বনের ওপর দিয়ে হাওয়ার বেগে ছুটে চলে তাঁর ঘোড়া। প্রসারপিনার এত দুঃখের কান্নায় তাঁর হৃদয় গলে না। বার বার বলেন, “এখন কাঁদছ, কিন্তু তুমি আমার ঐশ্বর্য দেখলে সব ভুলে যাবে। ভুলে তো\মাকে যেতেই হবে পৃথিবীর ওপরকার সব কথা। আমার ওখানে যে একবার যায়, সে আর এই বিশ্রী রোদ হাওয়ার দেশে ফিরতে চায় না।”

তারপর ফের কন্ঠস্বর কোমল করে বলেন, “আমি বড়ো একা। তুমি আমাকে ভালোবাসবে তো?”

প্রসারপিনা প্রবল বেগে মাথা নাড়ে, “না। আমি মাকে ছাড়া আর কাউকে কোনদিন ভালোবাসব না। মা’র কাছে আমাকে ফিরিয়ে দাও।” ওর আঁচলের ফুল দু হাতে উড়িয়ে দেয় বাতাসে। পথের পাশে তারা ছড়িয়ে পড়ে তার চলে যাওয়ার চিহ্ন রেখে। তার করুণ কান্না শুনে মাঠের চাষী ধান কাটতে কাটতে মুখ তুলে চায়। রাখালছেলে গরু চরাতে চরাতে চমকে ওঠে। কুটিরের দাওয়ায় মায়েরা ত্রস্ত হয়ে এদিকওদিক তাঁদের নিজেদের ছেলেমেয়েদের খুঁজে বেড়ান। ভয় হয় বুঝি তাঁদের সন্তানদেরও কোন অনিষ্ট হল।

কিন্তু, মা সিরিস ছিলেন বহুদূরে। তিনি কিছুই জানতে পারলেন না। কাজ শেষ করে তিনি যখন ফিরে এলেন, তখন সমুদ্রের তীর শূন্য, তাঁর ঘরের দাওয়া শূন্য, তাঁর ফুলের বাগান, মাঠ ঘাট, কোথাও প্রসারপিনা নেই।

ওদিকে প্লুটো প্রসারপিনাকে নিয়ে প্রবেশ করলেন তাঁর পাতালের সাম্রাজ্যের তোরণদ্বারে। তিনটি সাপের মাথাওয়ালা ভীষণ কুকুর, তাঁর আদরের সের্‌বেরাস এসে তাঁকে অভ্যর্থনা করল। ভয়ে ছোটো মেয়েটি কুঁকড়ে গেল। এ কী অন্ধকার চারিদিকে! কী অদ্ভুত সব থাম উঠে গেছে মাথার ওপর! তাদের গায়ে চিকচিক করছে নীলাভ আলো। সবই যেন শীতল। প্রাণহীন। প্রাসাদের সামনে এসে রথ থামে। একটি নদী এঁকেবেঁকে চলে গেছে। তার কালো , শ্লথ জলের স্রোত যেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বয়ে চলেছে।  কী বিশ্রী! রাজা প্লুটো কিন্তু এতক্ষণে ভারী খুশি হয়ে উঠেছেন তাঁর নিজের রাজ্যে প্রবেশ করে। তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বললেন, “ দেখ। কী সুন্দর আমাদের পাতাল নদী ‘লেথ’! এর জল যদি একবার কেউ খায়, তার কোন দুঃখ, হতাশা থাকে না। তুমিও সব কিছু ভুলে যাবে এর একবিন্দু মুখে দিলে।”

“না না। আমি কিছুতেই এর জল ছোঁব না। আমি মাকে কিছুতেই ভুলব না। তুমি দেখে নিও!”

প্লুটো হাসেন। তাঁর বিশাল প্রাসাদের সহস্র কক্ষে নীল-সবুজ দ্যূতি ছড়িয়ে হীরা-মণি-মাণিক্য জ্বলতে থাকে। সোনার দেয়ালের কারুকার্যের ওপর আলো পড়ে ঘর ঝলমল করে। এত রত্নসম্ভার প্রসারপিনা দেখতে চায় না। দু হাতে মুখ ঢেকে সে কাঁদে। তার চোখের স্বচ্ছ জল বিন্দু বিন্দু মুক্তোর মতন গড়িয়ে নামে পাতালের মাটিতে। প্রসারপিনা যেন সূর্যের রশ্মি। এত বেদনার মধ্যেও তার রূপ যেন সূর্যকিরণের মত আনন্দ ছড়িয়ে দেয় চির নিরানন্দময় পাতালপুরীতে। প্লুটো খুশি হন। তিনি তাকিয়ে দেখেন কিশোরী মেয়েটির মুখের দিকে। তাঁর অনুচরদের ডেকে বলেন, “সবচাইতে সুস্বাদু খাবার দিয়ে ভোজের ব্যবস্থা কর। সব থেকে সুন্দর জিনিস দিয়ে সাজাও প্রসারপিনার ঘর। আর নিয়ে এস সোনার পাত্রে করে সেই নদীর মিষ্টি জল।”

প্রসারপিনা কোন খাদ্য ছোঁয় না।  জলও তার ঠোঁটে লাগে না। দিনের পর দিন কেটে যায় তার এমনিভাবে। ঘুরে বেড়ায় সে প্রাসাদের শতশত ঘরের মধ্যে। কখনও কৌতুহলে চারদিকে চেয়ে দেখে। তার বালিকা মনে বিস্ময় জাগে—এত সম্পদ আছে! অথচ প্রাণ নেই! এত নিরানন্দ পরিবেশ সে আগে কখনও দেখেনি। হীরামাণিকের ঠিকরে পড়া আলোয় দাঁড়িয়ে আছেন প্লুটো। সিঃসঙ্গ, বিষাদময় সুন্দর তাঁর চেহারা। করুণা জাগে মনে। কাছে এসে বলে, “বৃথাই তুমি আমাকে এখানে আটকে রেখেছ। দেখেচ তো, মাকে আমি ভুলিনি? আর তাছাড়া, আমাকে দিয়ে তোমার কী কাজ হবে বল? মায়ের কাছে আমাকে পৌঁছে দাও।”

দুঃখিত প্লুটো বলেন, “আমার কত সাধ ছিল তুমি আমার প্রাসাদের মধ্যে গান গেয়ে হেসে ছুটে বেড়াবে। আমাকে তোমার খেলার সাথী করে নেবে। আমার নিরানন্দপুরীতে আনন্দের দোলা লাগবে। তা আর হল না। আজ ছ’মাস আমি তোমাকে আটকে রেখেছি। কিন্তু একটি দানাও তুমি মুখে দাওনি। একবিন্দু জলও তুমি ঠোঁটে ছোঁয়াওনি। আমার এখানে কি তোমার কিছুই ভালো লাগে না? আমাকে দেখেও কি তোমার একটু দয়া হয় না?”

প্রসারপিনার মন বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে। প্লুটোর কঠিন হাতে নিজের কোমল স্নত্বনার হাতখানি বুলিয়ে দিয়ে বলে, “সত্যিই। তোমার কিছুই যে আমার ভালো লাগে না। তোমার এখানে তাজা ফল নেই। মিষ্টি দুধ নেই। নেই নদীর ঠাণ্ডা স্বচ্ছ জল। আমি তো এ ছাড়া আর কিছুই খাইনে।”

প্রসারপিনাজানে না, এই মায়াপুরীতে যা কিছু সে মুখে দেবে তাতেই তাকে সব ভুলে যেতে হবে। তার অজান্তেই সে এতদিন এই কঠিন মোহজাল এড়িয়ে এসেছে। প্লুটো সাগ্রহে বলেন, “তোমাকে আমি ফল, দুধ এখনই আনিয়ে দিচ্ছি। তুমি খাও। আমি বড়ো খুশি হব যদি তুমি আমার রানি হও। আমার মুকুট তোমায় দেব। তুমি খেলা কর।”

প্রসারপিনা চমকে ওঠে ভয়ে। ছুটে পালিয়ে যায়। প্লুটো গভীর বিষাদে দাঁড়িয়ে থাকেন। মহামূল্য রাজবেশ তাঁর অঙ্গে ঝলমল করে। মাথায় জ্বলতে থাকে রাজমুকুট।

এবার পৃথিবীর ওপরে এস। দেখ কী হল সেখানে কী হল মা সিরিসের! নিদারুণ দুঃখে, হতাশায় তাঁর হৃদয় তখন ভেঙে গেছে। দিনের আলোয় দেশ-দেশান্তরের সমস্ত পাহাড় গুহা বন খুঁজে ফিরেছেন। মশাল জ্বালিয়ে তিনি প্রতিটি রাতের অন্ধকারে খুঁজেছেন তাঁর মেয়েকে। জলের পরীরা, বনদেবীরা, ফুলের শিশুরাও কত খুঁজেছে। কিন্তু হায়, কেউ তার সন্ধান পায়নি।

তখন একদিন, হাওয়ার দেবতা হঠাৎ খবর এনে দেন, “দেবী, তোমার মেয়ে আছে ওই পাতালের রাজপ্রাসাদে, রাজা প্লুটোর কাছে। তাকে কি আর ফিরে পাওয়া যাবে? ওখানে সে তো সবই ভুলে গেছে।”

মা সিরিস ছুটে যান তাঁর প্রিয় দূত কুইক সিলভারের দরজায়। সে সদানন্দময় ভারী মজার দেবদূত। সে হাওয়ার আগে ছোটে। তার অগম্য কোন স্থান নেই পৃথিবীতে। সে-ই পারবে এ কাজ। সে গিয়ে বলব রাজা প্লুটোকে-একটি মেয়ের অভাবে আজ পৃথিবী সৌন্দর্যহীন। ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকারে আকাশবাতাস ভরে গেছে।  দেবী সিরিস আর ফুল ফোটাচ্ছেন না। ফল ফলছে না গাছে গাছে। শস্যক্ষেত্র শুকিয়ে ফেটে গেছে। জল নেই, মেঘ নেই, ছায়া নেই, দেবী সিরিসের আশির্বাদ নেই। তিনি শোকে দুঃখে আর সবকিছু ভুলে গেছেন। তাঁর মেয়েকে যেন প্লুটো ফিরিয়ে দেন।

*********

আজ রাজা প্লুটোর অনুচর অনেক খুঁজেছিল। কিন্তু পৃথিবীর ওপরকার ফল দুধ সে কিছুই পায়নি। সমস্ত গাছ শুকিয়ে আছে। গরুরা ঘাস না পেয়ে দুধ দেয়া বন্ধ করেছে আজ বহুদিন। সারাদিন খুঁজে সে পেল শুকিয়ে যাওয়া একটি বেদানা। রসহীন, বিবর্ণ, শুকনো ফলটিই সে একখানি সুনব্দর পাত্রে নিয়ে চলল প্রসারপিনার কাছে।

রাজা প্লুটো বসেছিলেন তাঁর সিংহাসনে। সেই সময় কুইক সিলভার ছুটে এল হাওয়ায় ভর করে তাঁর সিংহদ্বারে। মাথার মুকুটে আর পায়ের চটিতে তার পাখা লাগানো। রাজা খুব খুশি হলেন। ভাবলেন খানিকক্ষণ আনন্দে কাটবে ওর মজার মজার কথাগুলি শুনে। দু’হাত বাড়িয়ে তাই তার দিকে এগিয়ে এলেন।

দেবদূত কিন্তু এসে তাঁকে শোনালো পৃথিবীর দুঃখের কথা। প্রসারপিনার অভাবে আজ সেখানে যে দুর্দশা নেমে এসেছে তার কথা। রাজা প্লুটো গভীর দুঃখের সঙ্গে জেনে নিলেন যে,  দেবী সিরিসের প্রাণের ধন প্রসারপিনাকে নিয়ে আসা তাঁর অন্যায় হয়েছে। তিনি চান্না তাঁর সুখের জন্য পৃথিবীর এমন বেদনা হোক। তিনি এতটা স্বার্থপর হবেন না। প্রসারপিনাকে তার মা ফিরে পাবেন। পৃথিবী ফিরে পাবে।

প্রাসাদের এক কোণে তখন শুকনো বেদানাটির দিকে চেয়ে আছে মেয়েটি। কী রসহীন বিবর্ণ চেহারা! এতদিন পর ওর প্রিয় ফল যখন এল হাতের কাছে অখন ওর ভীষণ খাবার ইচ্ছে হল, তখন খাওয়ার অযোগ্য এই ফল নিয়ে সে কী করবে? অন্যমনস্কভাবেই হাতে তুলে নেয় সে ফলটিকে। হাত আপনি তাকে মুখে তুলে দেয়। দাঁতের কামড় পড়ে তার অজান্তে। আর তখনই ঘরে ঢোকেন রাজা প্লুটো ও দেবদূত। তাড়াতাড়ি হাত নামিয়ে নেয় প্রসারপিনা। প্লুটো দেখতে পান না কী হল। তিনি বলে চলেন, “প্রসারপিনা, আমি খুব ভুল করেছই তোমাকে এখানে আটকে রেখে। পৃথিবীর বহু ক্ষতি হয়ে গেছে। আবার তুমি মায়ের কাছে ফিরে যাও। আর বাধা দেব না আমি।”

প্রসারপিনার মনে কিন্তু গভীর ব্যথা বেজে ওঠে রাজা প্লুটোর জন্য। যেন বুঝতে পারে কত কষ্ট হবে তাঁর সে চলে গেলে। নিরানন্দ পুরী আরও প্রাণহীন হয়ে যাবে।

কিন্তু কুইক সিলভার তাকে ভাবতে দেয় না। তাড়াতাড়ি সরিয়ে নিয়ে যেতে চায় পাতালের ওই মায়াপুরীর বাইরে তার আপন পৃথিবীতে। তাদের নীরবে বিদ্যায় দেন রাজা প্লুটো।

*********

দেবী সিরিস অন্যমনে বসে ছিলেন তাঁর ঘরের দাওয়ায়। বাইরে হু হু হাওয়া বয়ে চলেছে শুকনো মাঠের ওপর দিয়ে। আকাশের রঙ ধূসর। হঠাৎ হাওয়ায় জাগল ফুলের গন্ধ। মাঠের ওপর সবুজের আভা ছড়িয়ে পড়ল। মরা গাছগুলো যেন মন্ত্রবলে কচি পাতায় ছেয়ে গেল। আর বহুযুগ পরে যেন, পাখির গানে আকাশবাতাস ভরে উঠল। মা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন। তবে কি তিনি বুকের মাঝে প্রিয় কন্যার পায়ের শব্দ শুনতে পেলেন? ওই সে ছুটে আসছে। হাঁফাতে হাঁফাতে, হসতে হাসতে ওই সে এসে পড়ল একেবারে সামনের আঙিনায়, দু হাত বাড়িয়ে।  মা সিরিস প্রবল আবেগে প্রসারপিনাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মা ও মেয়ের বিচ্ছেদের ব্যথার অশ্রু সহস্রগুণে ঝরে পড়ল মিলনের মুক্তাবারি হয়ে। বারবার মেয়ের মাথায় চুম্বন করে মা জিজ্ঞাসা করলেন, “কেমন ছিলি? কোথায় ছিলি? কিছু খেয়েছিলি কি প্লুটোর প্রাসাদে?”

প্রসারপিনা বলল, “কোনদিন কিছু খেতে ইচ্ছে করেনি মা। শুধু আজ একটি শুকনো বেদানায় কামড় দিয়েছিলাম।”

মা চমকে ওঠেন, “ওরে, খেয়ে ফেলেছিস সেই ফল?”

“না মা। শুধু দাঁতে লেগেছিল দানা। এই দেখ এখনো রয়েছে ছখানা দানা মুখের ভেতর।”

দেবী সিরিস কেঁদে বলেন, “ওরে মেয়, তবে তো তোকে আমি আর ধরে রাখতে পারব না। তোর মুখের ছয়টি দানার জন্য বছরের ছটি মাস তোকে থাকতে হবে নির্বাসনে, প্লুটোর প্রাসাদে। বাকি ছ’টি মাস শুধু তুই আমার।”

প্রসারপিনা মায়ের চোখের জল মুছে দেয়, “মা, তবুও তো  তোমাকে আমি বছরের অর্ধেকটাও কাছে পাব। যই আর কোনদিন না ফিরে আসতাম? যদি ভুলে যেতাম সব? কী হত তবে বল?”

এমনি করে প্রসারপিনা প্লুটোর রানি হয়ে ছ মাসের জন্য ফিরে চলে গেল পাতালের প্রাসাদে। পৃথিবীর বুকে  সেই ছ মাস নেমে এল শীত। গাছের পাতা ঝরে গেল। তুষার পড়ে সমস্ত ফুলের বন, শস্যখেত ঢেকে যায়। তারপর ফের যখন ছ মাসের শেষে সে ফিরে আসে সিরিসের কাছে, পৃথিবীতে আবার বসন্ত আসে। ফুলে ফলে ভরে ওঠে পৃথিবী।

জয়ঢাকের লোককথা লাইব্রেরি

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s