লোককথা বুড়ি ও শূকরের গল্প রাখি পুরকায়স্থ বসন্ত ২০১৮

রাখি পুরকায়স্থের আগের লোককথা আইওই বৃক্ষের কিংবদন্তি

un5.jpg

সবুজ-নীলে মাখামাখি মিকির পাহাড়ের গায়ে ছিল একটি কুয়াশা ঘেরা ছোট্ট শান্ত গ্রাম। সেই গ্রামে থাকত এক থুড়থুড়ে বুড়ি। একদিন সেই বুড়ির হাতে এল একটি চকচকে এক টাকার মুদ্রা। সেই টাকা হাতে পেয়ে বুড়ি তো যারপরনাই খুশি। তবে সে আনন্দ কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হল না। খুশির পেছন পেছন ধেয়ে এল একরাশ চিন্তা। দিনরাত এক করে আকাশ-পাতাল ভেবে ভেবে বুড়ি তো ক্লান্ত। তবু কিছুতেই সে যেন বুঝে উঠতে পারে না, কী এমন ভাল কাজে সেই একটি টাকা খরচ করা যায়!

শেষমেশ, অনেক ভেবে বুড়ির মাথায় এল – ‘আচ্ছা, এই টাকাটা দিয়ে একটা শূকর কিনলে কেমন হয়?’ যেমনটা ভাবা ঠিক তেমনটা কাজ। টুকটুক করে বুড়ি হাজির হল গ্রামের হাটে। অনেক দর কষাকষির পর কিনে ফেললো একখানা মোটাসোটা শূকর।

আনন্দে ডগমগ করতে করতে বুড়ি এবার শূকরকে সাথে নিয়ে বাড়ির পথ ধরল। কিন্তু হায়! বাড়ির সামনে এসেও যে মহা বিপত্তি!

মাটি থেকে খুঁটি দিয়ে বেশ উঁচু করে বাঁশের বেড়া ও খড়ের ছাউনি দিয়ে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয় হেমথেংসঙ নামে কার্বিদের ঐতিহ্যবাহী চাং ঘর। বুড়িও থাকে তেমনই এক জরাজীর্ণ হেমথেংসঙ চাং ঘরে। দোতলার সমান উঁচু সেই চাং ঘরে উঠতে হয় কাঠের সিঁড়ি বেয়ে- আর সেখানেই যত গণ্ডগোল! পাজি শূকরটি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে কিছুতেই রাজি নয়। রেগেমেগে বুড়ি যতবারই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠবার জন্য শূকরকে আদেশ দেয়, ততবারই সে ঘাড় গোঁজ করে একই উত্তর দেয়, ‘না, আমি কিছুতেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠব না!’

শূকরের মুখে এহেন একগুঁয়ে কথাবার্তা শুনে বুড়ি তো বেশ ঘাবড়ে গেল! ক্রমশ সে বুঝতে পারল, শূকরকে সহজে এক চুলও নড়ানো যাবে না। কীভাবে এখন শূকরকে সঙ্গে নিয়ে চাং ঘরে পৌঁছাবে সে! ভেবে ভেবে বুড়ি তো কূলকিনারা পায় না। আর ঠিক তখনই যেন আশার আলো নিয়ে সামনে এসে হাজির হল একটি কুকুর!

কুকুরকে দেখে বুড়ি তো ভীষণ খুশি। বুড়ি এবার তাই গদগদ কন্ঠে কুকুরকে অনুরোধ করলো, সে যেন শূকরকে বেশ করে কামড়ে দেয়, কারণ শূকর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চাইছে না, যার ফলে বুড়ি তার শূকরকে সঙ্গে করে চাং ঘরে পৌঁছাতে পারছে না।

বুড়িকে অবাক করে দিয়ে কুকুর উত্তর দিল, ‘না, আমি কিছুতেই শূকরকে কামড়াব না!’

বুড়ি আর কী করে! সামান্য একটু এগিয়েই সে দেখল এক টুকরো শুকনো কাঠ পড়ে আছে। বুড়ি শুকনো কাঠের টুকরোটিকে অনুরোধ করল, সে যেন কুকুরকে বেদম প্রহার করে, কারণ কুকুর শূকরকে কামড়াতে চাইছে না, কারণ শূকর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চাইছে না, যার ফলে বুড়ি তার শূকরকে সঙ্গে করে চাং ঘরে পৌঁছাতে পারছে না।

বুড়িকে অবাক করে দিয়ে শুকনো কাঠ উত্তর দিল, ‘না, আমি কিছুতেই কুকুরকে প্রহার করব না!’

হতাশ হয়ে বুড়ি সামনে এগিয়ে গেল। অল্প খানিকটা পথ এগিয়েই তার চোখে পড়লো একটি জ্বলন্ত অগ্নিশিখা। বুড়ি এবার তাই আগুনকে অনুরোধ করল, সে যেন শুকনো কাঠকে পুড়িয়ে দেয়, কারণ শুকনো কাঠ কুকুরকে প্রহার করতে চাইছে না, কারণ কুকুর শূকরকে কামড়াতে চাইছে না, কারণ শূকর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চাইছে না, যার ফলে বুড়ি তার শূকরকে সঙ্গে করে চাং ঘরে পৌঁছাতে পারছে না।

বুড়িকে আবারও অবাক করে দিয়ে আগুন উত্তর দিল, ‘না, আমি কিছুতেই শুকনো কাঠকে পোড়াব না!’

সাহায্য পাবার আশা নেই বুঝতে পেরে আরও খানিকটা পথ এগিয়ে গেল বুড়ি। এবার দেখা হল জলের সাথে!

বুড়ি এবার একটুও সময় নষ্ট না করে জলকে অনুরোধ করল, সে যেন আগুনকে নিভিয়ে দেয়, কারণ আগুন শুকনো কাঠকে পোড়াতে চাইছে না, কারণ শুকনো কাঠ কুকুরকে প্রহার করতে চাইছে না, কারণ কুকুর শূকরকে কামড়াতে চাইছে না, কারণ শূকর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চাইছে না, যার ফলে বুড়ি তার শূকরকে সঙ্গে করে চাং ঘরে পৌঁছতে পারছে না।

এবারও বুড়িকে অবাক করে দিয়ে জল উত্তর দিল, ‘না, আমি কিছুতেই আগুনকে নেভাব না!’

কষ্ট করে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে গেল বুড়ি। পথে দেখা হল এক বলদের সাথে।

বলদকে সে অনুরোধ করল, সে যেন সবটুকু জল গবগব করে গিলে ফেলে, কারণ জল আগুনকে নেভাতে চাইছে না, কারণ আগুন শুকনো কাঠকে পোড়াতে চাইছে না, কারণ শুকনো কাঠ কুকুরকে প্রহার করতে চাইছে না, কারণ কুকুর শূকরকে কামড়াতে চাইছে না, কারণ শূকর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চাইছে না, যার ফলে বুড়ি তার শূকরকে সঙ্গে করে চাং ঘরে পৌঁছাতে পারছে না!

বুড়িকে হতবাক করে বলদ উত্তরে বলল, ‘না, আমি কিছুতেই জল খাব না!’

নিরাশ হয়ে বুড়ি আরও খানিকটা পথ এগিয়ে গেল। এবার দেখা হল এক কসাইয়ের সাথে।

বুড়ি কসাইকে অনুরোধ করল, সে যেন বলদকে জবাই করে, কারণ বলদ জল খেতে চাইছে না, কারণ জল আগুনকে নেভাতে চাইছে না, কারণ আগুন শুকনো কাঠকে পোড়াতে চাইছে না, কারণ শুকনো কাঠ কুকুরকে প্রহার করতে চাইছে না, কারণ কুকুর শূকরকে কামড়াতে চাইছে না, কারণ শূকর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চাইছে না, যার ফলে বুড়ি তার শূকরকে সঙ্গে করে চাং ঘরে পৌঁছাতে পারছে না।

বুড়িকে আশ্চর্য করে দিয়ে কসাই জবাব দিল, ‘না, আমি বলদকে কিছুতেই জবাই করব না!’

উপায় না দেখে বুড়ি কষ্ট করে আরও কিছুটা পথ এগিয়ে গেল। এবার দেখা হল দড়ির সাথে।

বুড়ি এবার দড়িকে অনুরোধ করল, সে যেন কসাইকে ফাঁসি দেয়, কারণ কসাই বলদকে জবাই করতে চাইছে না, কারণ বলদ জল খেতে চাইছে না, কারণ জল আগুন নেভাতে চাইছে না, কারণ আগুন শুকনো কাঠকে পোড়াতে চাইছে না, কারণ শুকনো কাঠ কুকুরকে প্রহার করতে চাইছে না, কারণ কুকুর শূকরকে কামড়াতে চাইছে না, কারণ শূকর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চাইছে না, যার ফলে বুড়ি তার শূকরকে সঙ্গে করে চাং ঘরে পৌঁছাতে পারছে না।

হায়! দড়ি উত্তর দিল, ‘না, আমি কসাইকে কিছুতেই ফাঁসি দেব না!’

মন খারাপ করে আরেকটু পথ এগিয়ে গেল বুড়ি। খানিকক্ষণ হেঁটে যেতেই হুড়মুড় করে সামনে এসে পড়ল একটি নেংটি ইঁদুর!

উপায়ান্তর না দেখে বুড়ি শেষমেশ সেই ক্ষুদ্র নেংটি ইঁদুরের কাছেই সাহায্য চাইবে বলে ঠিক করল। বুড়ি এবার তাই ইঁদুরকে অনুরোধ করলো, সে যেন দড়িকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে, কারণ দড়ি কসাইকে ফাঁসি দিতে চাইছে না, কারণ কসাই বলদকে জবাই করতে চাইছে না, কারণ বলদ জল খেতে চাইছে না, কারণ জল আগুন নেভাতে চাইছে না, কারণ আগুন শুকনো কাঠকে পোড়াতে চাইছে না, কারণ শুকনো কাঠ কুকুরকে প্রহার করতে চাইছে না, কারণ কুকুর শূকরকে কামড়াতে চাইছে না, কারণ শূকর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে চাইছে না, যার ফলে বুড়ি তার শূকরকে সঙ্গে করে চাং ঘরে পৌঁছতে পারছে না।

এক মূহুর্ত ভেবে ইঁদুর জবাব দিল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে বুড়ি মা। যদি আমাকে দুধ দিয়ে ময়দা মেখে খাওয়াও, তুমি আমাকে যেমনটা বলবে আমি ঠিক তেমনটাই করব!’

বুড়ি চটপট দুধ দিয়ে এক দলা ময়দা মেখে এনে ইঁদুরকে দিল। চেটেপুটে সবটুকু দুধে মাখা ময়দার দলা খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললো ইঁদুর। তারপর কথামত সে কোমর বেঁধে দড়ি কাটতে লেগে পড়ল। ভয় পেয়ে দড়ি সাথে সাথে কসাইকে ফাঁসি দেবার প্রস্তুতি নিতে লাগল। সে কথা জানতে পেরে কসাই শিগিগির বলদকে জবাই করবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। বলদও তাই শুনে তড়িঘড়ি সবটুকু জল খেয়ে নেবার প্রস্তুতি নিতে লাগল। এদিকে জলও তখন ঝপাঝপ করে আগুন নেভাতে শুরু করে দিল। সেই দেখে আগুন তাড়াহুড়ো করে শুকনো কাঠকে পুড়িয়ে দিতে উদ্যত হল। সব খবর জানতে পেরে আতঙ্কিত শুকনো কাঠ ধুম ধাম প্রহার করতে লাগল সেই পাজি শূকরকে। বিপদ বুঝে শূকর জলদি জলদি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। অবশেষে, বুড়ি মহানন্দে শূকরকে সঙ্গে করে পৌঁছে গেল তার সাধের চাং ঘরে!

Source: ‘Tomo Puru’, a compilation of folk-tales published by William Rulph Hutton. 

কার্বিদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়ঃ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, বিশেষত আসামের পাহাড়ি অঞ্চলে, বাস করেন কার্বি বা মিকির উপজাতির মানুষেরা। জাতিগতভাবে কার্বিরা মঙ্গোলীয় নরগোষ্ঠীর অন্তর্গত। তাঁরা মূলত কার্বি ভাষায় কথা বলেন। ভাষাটি মিকির বা আরলেং ভাষা নামেও পরিচিত। কার্বি ভাষা চীনা-তিব্বতীয় ভাষাগোষ্ঠীর তিব্বতি-ব্রহ্ম শাখা পরিবারের অন্তর্গত বলে মনে করা হয়। কার্বিরা আসামের তৃতীয় বৃহত্তম উপজাতীয় সম্প্রদায়। সেই সাথে, তাঁরা আসামের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত কার্বি আংলং (স্বশাসিত) জেলার প্রধান উপজাতীয় জনগোষ্ঠী। কার্বি ভাষায় আংলং শব্দের অর্থ পাহাড়। তাই আক্ষরিক অর্থে কার্বি আংলং মানে কার্বি মানুষদের পাহাড়। তবে কার্বি উপজাতীয় মানুষেরা কার্বি আংলং জেলার পাশাপাশি, আসামের ডিমা হাসাও, কামরূপ, মরিগাঁও, নগাঁও, গোলাঘাট, করিমগঞ্জ, লখিমপুর, শোণিতপুর ও বিশ্বনাথ চারিআলি জেলায়ও বসবাস করেন। এছাড়া, অরুণাচল প্রদেশের পাপুম পারে জেলার বালিজান অঞ্চল, মেঘালয়ের জয়ন্তিয়া পার্বত্য জেলা, পূর্ব খাসি পার্বত্য জেলা ও রি-ভয় জেলা, এবং নাগাল্যান্ডের ডিমাপুর জেলায় কার্বি উপজাতীয় মানুষদের বাস।

জয়ঢাকের সমস্ত লোককথা একত্রে এই লিংকে

 

 

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s