লোককথা সারস পাখির পালক মৌসুমী রায় শরৎ ২০১৬

saras03 (Medium)

মৌসুমী রায়

অনেক দিন আগে ইউজান নামে এক ভারি সুন্দর ছেলে ছিল। তার  ছিল এক ছোট ভাই, হজুগুর। তাদের বাবা-মা অনেকদিন আগে মারা গেছিল,তাই ইউজান একাধারে ছিল হজুগুরের বাবা আর মা।ইউজান সারাদিন বনে বনে শিকার করে বেড়াত আর ছোট্ট হজুগুর ঘর সামলাত।

একদিন হয়েছে কী, অন্যদিনের মতন ইউজান বনে গেছে আর হজুগুর উঠোন ঝাঁট দিতে বেরিয়েছে। হঠাৎ মাথার উপরে সারসের তীব্র আওয়াজ শুনে তাকিয়ে দেখে বাড়ির ঠিক উপরেই বিশাল সাদা রঙের সাতখানা সারস পাক দিয়ে উড়ছে। কী অপূর্ব সে দৃশ্য ! হজুগুর হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইল।

saras02 (Medium)একে একে নেমে এল সেই বিশাল সারসেরা। উঠোন জুড়ে ধবধবে সাদা ডানা ছড়িয়ে তারা হেঁটে বেড়াতে লাগল। তারপর হঠাৎ তাদের পালক ভরা চামড়াগুলো এক এক করে খসিয়ে দিয়ে হয়ে গেল সাতখানি অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে। শুরু হল হাসি, আনন্দ, নাচ-গান আর ফূর্তির ফোয়ারা। সারাদিন কোথা দিয়ে যে চলে গেল, বোঝা গেল না। সুয্যি গেল পাটে আর সেই সাত সুন্দরী চুপচাপ পালক ভরা চামড়া গায়ে দিয়ে ফের সাতখানা সারস হয়ে দূর আকাশে মিলিয়ে গেল।

ইউজান ফিরে দেখে উঠোনে ঝাঁট পড়েনি, বালতিতে জল ভরা হয়নি, কাঠ কাটা হয়নি, উনুনে আগুন জ্বলেনি।

“ভাইয়া তো কাজে ফাঁকি দেয় না ! আজ কী যে হল ওর! নিশ্চয় এর পিছনে কোন রহস্য আছে !”

এই ভেবে ইউজান আর পরের দিন বনে গেল না। বনে যাবার ভান করে , বেড়ার পিছনে গিয়ে লুকিয়ে রইল। পরেরদিন আবার আকাশ থেকে নেমে এল সাত সারস তাদের ধবধবে সাদা বিশাল বিশাল ডানা উড়িয়ে। উঠোনে নেমে চামড়া খসিয়ে হয়ে গেল এক একটি অপূর্ব সুন্দরী কন্যা…আর ছোট্ট হজুগুরকে নিয়ে মেতে উঠল খেলায়। বেড়ার আড়াল থেকে ইউজান সব দেখছিল। সবার মধ্যে একটি কন্যা,যে নাকি সব চাইতে সুন্দর,তাকে তার ভারি পছন্দ হল। সারাদিন হেসে খেলে কেটে গেল আর সুয্যি যেই না পাটে উঠল, অমনি তড়িঘড়ি করে কন্যারা গায়ে পালকের চামড়া চাপাতে গেল। ইউজান এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। সঙ্গেসঙ্গে সে তার পছন্দের কন্যার পালকের চামড়া লুকিয়ে ফেলল।

পরের মুহূর্তেই ছয় সারস চীৎকার করে দূর আকাশে মিলিয়ে গেল। পড়ে রইল সেই সুন্দরী; ভয়ে তখন সে কাঁপছে,চোখে তার জল এসে গেছে। হাতজোড় করে সে তার পালকের চামড়া ফেরত চাইল ইউজানের কাছে। ইউজান কী বলল তাকে,জানো ?

“সারাদিন লুকিয়ে দমবন্ধ হয়ে শুধু তোমাকেই দেখেছি সুন্দরী, তুমি কি ফিরে আমাকে একবার দেখবে না ? যদি ঘুরে দেখ আর আমাকে তোমার ভাল লাগে,তাহলে থেকে যেও আমার সাথে আমার বৌ হয়ে।”

কন্যা একবারটি তার ভেজা চোখে ইউজানের সুন্দর হাসিমুখখানার দিকে তাকাতেই তার মুখেও হাসি ফুটে উঠল।ফিসফিস করে বলল, “আমি থাকব।”

“তাহলে তোমার পালকের চামড়াটার কী করি ? টাঙিয়ে রাখি না পুড়িয়ে ফেলি ?”

শিউরে উঠে কন্যা বলে, “না না,পুড়িয়ো না…তাহলে মহা সর্বনাশ!আবার,সামনাসামনিও রেখো না…তাতেও ঝামেলা।”

অতএব ইউজান করল কী, পালকভরা চামড়াটা একটা  লোহার সিন্দুকে ঢুকিয়ে দিয়ে তিনখানা শক্তপোক্ত তালা ঝুলিয়ে দিল তাতে। তারপর সারস কন্যা আর ইউজান বিয়ে করে সুখে ঘরকন্না করতে লাগল।সারস কন্যার মতন ভাল বৌ আর হয় না, ইউজান আর  মাতৃহীন ছোট্ট হজুগুরের আর আনন্দের শেষ রইল না।

কিন্তু গল্প এখানে ফুরলো না। বেশ কিছুদিন কেটে গেছে তারপর।হজুগুরের খুব ইচ্ছে সেও দাদার মতন শিকারি হয় আর দাদাকে সাহায্য করে।একদিন যখন ইউজান ঘরে নেই বালক হজুগুর দাদার পুরনো এক তীরধনুক খুঁজতে গেল। সারা বাড়ি খুঁজে খুঁজে সে অবশেষে সেই সিন্দুকের তালা ভেঙে  ফেলল, যেখানে সারস-কন্যার পালকের চামড়াখানা লুকানো ছিল। বোকা হজুগুর তখন টেরও পায়নি যে বৌদিদি তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সারস কন্যার কী যে হয়ে গেল! সে বলল, “আমায় ওটা দে না ভাই,তার বদলে তোকে আমার এই ছোরাটা দেব।”

ছোট্ট হজুগুর আর ছোরার লোভ সামলাতে পারল না,পালকভরা চামড়াখানা  বের করে দিয়ে দিল।

সারস-কন্যার কী যে হল, ডানাজোড়া সে গায়ে চড়িয়ে বাইরের উঠোনে গিয়ে টলমল করে যেই না দাঁড়াল, অমনি  হয়ে গেল এক বিশাল সাদা ডানাওয়ালা সারস। আর তখনই মাথার উপর চক্কর দিতে দিতে উড়ে এল আরো ছয় সারস, তার বোনেরা। সারস-কন্যা  ক্ষীণ একটা চেষ্টা করল পালকভরা চামড়াটা ফেলে দিতে। কিন্তু আর পারল না, একটা আর্ত চীৎকার করে ধপধপে সাদা ডানাগুলো ছড়িয়ে তার ছয় বোনের সঙ্গে উড়তে উড়তে মিলিয়ে গেল সুদূর আকাশে।

হজুগুর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল সাত সারসের দল চিরকালের মতন বিদায় জানিয়ে চলে গেল আকাশের বুকে আর পড়ে রইল একখানি সারসের পালক। ইউজান শিকার থেকে ফিরে এসে সব দেখল,সব শুনল। তারপর যা বোঝার তা বুঝে নিয়ে তার বাদামি রঙের ঘোড়াটিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল দুনিয়ার পথে। বুকের মধ্যে তার একখানি ধবধবে সাদা সারসের পালক। দরকার হলে সারা দুনিয়া ঘুরে তার বৌকে সে ফিরিয়ে আনবে,এই তার পণ।

ঘুরতে ঘুরতে মাস কেটে গেল,বছর ঘুরে গেল। অবশেষে এক আকাশছোঁয়া পাহাড়ের মাথায় বরফের মুকুট,তার তলায় এসে একদিন হাজির হল ইউজান। খানিক উপরেই এক বরফ সাদা বাড়ি, চুপচাপ তাতে গিয়ে ঢুকে পড়ল সে। ভারি সুন্দর আর আরামের সেই ঘরবাড়ি,আর ঘরের মধ্যে আগুনের পাশে বসে আছে এক প্রকান্ড ঈগল আর সোনার দোলায় করে কাকে যেন দুলিয়ে চলেছে। ইউজানকে ঢুকতে দেখে সে ঈগল মানুষের গলায় বলে উঠলো, “তুমি কি ইউজান ? বৌকে খুঁজতে এসেছো ?”

অবাক হয়ে ইউজান বলল,”হ্যাঁ,ঠিক তাই। আমার প্রিয়তমার খোঁজে সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াচ্ছি।তুমি তার খোঁজ জানো ?”

“বলছি। তার আগে দোলায় তোমার ছেলেকে দেখ!”

অবাক হয়ে ইউজান দোলার মধ্যে দেখে এক ফুটফুটে সুন্দর খোকা;ইউজানকে দেখে খোকা হাসিমুখে তার ফোলাফোলা দুই হাত বাড়িয়ে দিল দেখে ঈগল তারিফ করে বলে ফেলল, “ছোট্ট ঝর্ণাও চিনে ফেলেছে বিশাল নদীকে। খোকা, তোমার বাবাকে দেখ। আর ইউজান বাছা ,ছেলের সঙ্গে একটু খেল। দোলা দিয়ে দিয়ে আমি থকে গেছি।”

খোকাকে নিয়ে ইউজান খেলছে আর মজে গেছে;খোকার হাসি আর শেষ হয় না, এমন সময়ে দোরগোড়ায় পায়ের শব্দ হল শুনে ঈগল বলে উঠল, “তোমার বৌ কি তোমাকে দেখে খুশি হবে …কে জানে ?  আপাততঃ চটপট লুকিয়ে পড়।”

ঘরের এক কোণে লুকিয়ে লুকিয়ে ইউজান দেখতে পেল যে,সারস-কন্যা ঘরে ঢুকেই তার পালকের চামড়া খুলে ফেলে আবার সুন্দরী মেয়ে হয়ে গেল। খোকা বাবাকে না দেখতে পেয়ে চিৎকার করে কাঁদছিল, তার সারস-কন্যা মা খোকাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরতেই তার কান্না থেমে গেল । মা আর ছেলেকে একসঙ্গে দেখে ইউজান আর অপেক্ষা করতে পারল না। সোজা বেরিয়ে এসে পালকের চামড়াখানা আগুনের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিল।

“এ কী করলে? এ কী করলে প্রিয় আমার?” বলতে বলতে সারস-কন্যার চোখ বুঁজে এল, শরীর ঢলে পড়ল, শ্বাস গেল নিভে। হায় হায় করতে করতে ইউজান প্রিয়তমার নিথর দেহখানি তুলে ধরে শুইয়ে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করল, “যেভাবেই পারি,আমাকে তোমার দেহে প্রাণ ফিরিয়ে আনব।”

প্রতিজ্ঞা পালনের জন্য ইউজান কীই না করল এরপর…

খোকাকে ঈগলের কাছে রেখে আকাশগঙ্গা পেরিয়ে প্রথমে  গেল  তারার দেশে, তারপরে চাঁদের দেশে আর অবশেষে সুয্যির দেশে। তারার কন্যা, চাঁদের কন্যা আর সুয্যির কন্যার সাহায্যে বৌয়ের প্রাণ ফিরিয়ে আনল। সে আর এক গল্প বটে।

তারপর ? তারপর আর কী ? দিগ্বিজয়ী বীরের মতন ইউজান ফিরে এল তার গ্রামের বাড়িতে,সঙ্গে সুন্দরী বৌ,ফুটফুটে ছেলে,প্রকান্ড ঈগল আর ধনসম্পত্তি।

বাড়ির দরজায় এক সুপুরুষ যুবক তাদের দেখে হাসিমুখে দৌড়ে এল। ইউজান অবাক হয়ে বলে, “আরে, আমার সেই ছোট্ট ভাইটি না?”

হজুগুর হাসতে হাসতে বলে, “দাদা,আমি সত্যি  এত বড়ো হয়ে গেছি যে আমায় চিনতে পারছো না ? আর, বৌদি তুমি ফিরে এসেছো বলে যে কি আনন্দ হচ্ছে! আমার সেই ভুলের কথা কি আমি আর ভুলতে পেরেছি কখনো? এসো,সবাই ঘরে এসো।”

ব্যস,গল্প এখানেই শেষ।এরপর তারা সত্যি সত্যিই সুখে সংসার করতে লাগলো। 

(ইয়াকুত লোককথা)

ছবিঃ মৌসুমী

জয়ঢাকের লোককথা সংগ্রহ

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s