লোককথা আলেকজান্ডার ও মৎস্যকন্যা রমিত দে শীত ২০১৬

রমিত দে-র আগের লোককথা  চাঁদের সিঁড়ি

মৎসকন্যা বা মারমেড ! কেউ কেউ জলপরীও বল হয়ত। তা এই মৎসকন্যাদের নিয়ে গল্প পৃথিবীর প্রায় সব সভ্যতাতেই প্রচলিত। কোথাও সে দেওয়ালে আঁকা ছবি আবার কোথাও বা লোককথার আদলে মুখে মুখে তা হয়ে উঠেছে শতাব্দীপ্রাচীন। পেরুর কুসকোর প্রাচীন পাথরের দেওয়ালে কতই না জলকন্যাদের ছবি আঁকা যা দেখে মনে হতেই পারে সত্যিই তারা ছিল , তারা আছে, আর সে ধারনা আরও শক্তপোক্ত হয় যখন আমরা শুনতে পাই আটলান্টিকের তীরে ম্যাথু নামের একজন মানুষের প্রেমে পড়ে এক মৎসকন্যা। আমার তো মনে হয় ওরা নিশ্চয় আছে, একদিন ঝাউগাছগুলোকে পেরিয়ে সূর্যের আলোর তলায় বালিগুলোকে লুকিয়ে আর কাছিমের ডিমেদের দিকে হাত নেড়ে নেড়ে অনেক দূর সমুদ্রে ফিরে এলেই হয়ত দেখা পেয়ে যাব অবিশ্বাস্য কোনো এক জলপরীর; জানি না তোমাদের হয়ত হানস এন্ডারসনের লিটিল মারমেডের কথা মনে পড়ে যাবে , আমার কিন্তু বাপু মনে হবে নীল সমুদ্রে নিজেকে ছেড়ে দিই আর গড়াতে গড়াতে নেমে আসি ওর ফেনার সংসারে, নুড়ির সুতোর মাঝে ওর রোদ পোহানো আর গা গড়ানোর গল্পে। তোমরা হয়ত বলবে ওমা এত পুরো মাছ আর আমি বলব না না পুরো একটা মানুষ। তো মাছমেয়েকে নিয়ে আমাদের সে ঝগড়াঝাঁটি না হয় পড়ে হোক, আজ বরং দেখে নি এই মৎসকন্যা এল কোথা থেকে ! সে অনেক অনেক বছর আগের গ্রীসদেশের কথা। তখন বীর আলেকজান্ডার ছিলেন গ্রীসের রাজা। আমরা আজ সেই আলেকজান্ডারের বোন থেসালোনিকারই গল্প শুনব।  

আলেকজান্ডারের নাম তো তোমরা নিশ্চই শুনেছ। গ্রীসের সেই প্রবল পরাক্রমী রাজা যে কিনা পশ্চিম থেকে পূর্বে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন নিজের সাম্রাজ্য, প্রায় পুরো পৃথিবীটাই তাঁর দখলে ছিল যে। এককথায় পৃথিবীর ইতিহাসে তাঁকে অন্যতম সফল সামরিক কিংবদন্তি বলা যেতে পারে। টলেমির মানচিত্রানুযায়ী পৃথিবীর বেশিরভাগ এলাকাই জয় করেন মেসিডনিয়ার রাজা আলেকজান্ডার। কিন্তু কথায় বলে না আগে দুঃখ পরে সুখ-তো অতিমানবীয় হলে কি হবে সম্রাট আলেকজান্ডারেরও ছিল এক অদ্ভুত দুঃখু-

একদিন রাজ্যের সব মহান জাদুকর আর সব প্রাজ্ঞ-জ্ঞানী মানুষদের একযোগে সভায় ডাকলেন তিনি।

“পুরো পৃথিবীটাই আমার”-সভায় উপস্থিত অতিথিদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন আলেকজান্ডার। মিনমিন করে নয় কিন্তু, এক্কেবারে তারঃস্বরে ! সারা রাজপুরী কেঁপে উঠল থরথরিয়ে।

“আমার ইচ্ছে সব মানুষের ওপর যেন আমার কর্তৃত্ব থাকে আর যা আমার চাই তাই যেন পাই।- অথচ একটা না-পাওয়া নিত্যদিন মনের মধ্যে খোঁচা দেয়, আর তা হল অমরত্ব। আজ আপনাদের এ সভায় ডাকার একটাই উদ্দেশ্য হল এই মৃত্যুকে জয় করতে আপনারা আমাকে সাহায্য করুন।”

এখন উপস্থিত সবাই তো জানে রাজার এহেন ইচ্ছা পূরণ করা একপ্রকার অসম্ভব কিন্তু সে কথাটি বলতে গেলেই যে রাজরোষে পড়ার সম্ভাবনা, সে ঝুঁকি নেবে কে! তবে শেষমেশ তাদের মধ্যে থেকে একজন গুণী মানুষ এগিয়ে এলেন। রাজার উদ্দেশ্যে বললেন, “সম্রাট, ধৃষ্টতা মাপ করবেন। আপনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নৃপতি। বীরত্ব আর সাহসিকতার জন্য পরম শ্রদ্ধেয়। আপনার নিজস্ব শক্তিশালী ব্যক্তিত্বে আপনি মহামতি। কিন্তু আপনি এইমূর্হুতে একটি অসম্ভবকে প্রত্যাশা করছেন কারণ মৃত্যু ভাগ্যের লিখন এবং ভাগ্যকে কেউ বদলাতে পারে না।”  

“আমার জন্য কোনো ভাগ্য নির্ধারিত নেই। আর যদি থেকেই থাকে তবে তাকে আমি জয় করে নেব,” সদর্পে বলে উঠলেন আলেকজান্ডার।

এ কথা শুনে সভার মধ্যে থেকে অন্য এক প্রবীণ ম্যাজিশিয়ান উঠে এলেন। ধীর কন্ঠে বললেন, “সম্রাট, আপনি এ মুহূর্তে যা বললেন হয়ত তার অনুতাপ করার জন্য বেঁচে থাকবেন না একদিন কিন্তু যখন অমর হওয়ার জন্য এতই পীড়াপীড়ি করছেন তখন আমি একটা উপায় বাতলাতে পারি আপনাকে। যদিও আজ অবধি কেউই সম্পূর্ণভাবে প্রয়োগ করে উঠতে পারেনি সেটা।”

সম্রাট আলেকজান্ডার বুড়ো জাদুকরের উপদেশ শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেন। গোটা সভায় বাকি সবাই তখন চুপ।বুড়ো কী বলে তা শোনার জন্য রাজপুরীতে নিমন্ত্রিতদের ঘিরে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করেছে রহস্যের বাতাস।

“বল, জাদুকর!” তোমার এই নিশ্চুপতা কি এটাই প্রমাণ করে যে এমন কোনোকিছু কাজ এখনও এ পৃথিবীতে রয়ে গেছে যা রাজা আলেকজান্ডারের পক্ষে করা সম্ভব না? বেশ খানিকক্ষণ বুড়ো জাদুকর চুপ করে থাকায় উৎকন্ঠায় তীব্র চিৎকার করে উঠলেন আলেকজান্ডার।

“না মহারাজ”, শেষমেশ নিশ্চুপতা ভেঙে বলে উঠলেন জাদুকর।

“আপনি মৃত্যুকে জয় করতেই পারেন যদি একটিবার অমরতার সরোবর থেকে অমর জল পান করেন  এবং যে এই জল একবার পান করেছে তার আর মৃত্যুভয় থাকবে না। কিন্তু মজার ব্যাপার হল কোনো জীবন্ত মানুষই আজ অবধি সমস্ত বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে ওই জল অবধি পোঁছতে পারেনি। প্রথমেই আপনাকে একটি গিরিপথ অতিক্রম করতে হবে যেখানে সেই পথটিকে পাহারা দেওয়া অদ্ভুত বরফবেষ্টিত পাহাড়দুটো অনেকটা অন্ধকার কারাগারের মত, পাহাড়ে পাহাড়ে এত ঠেসাঠেসি যে হাত পর্যন্ত গলে না। এবং তারা প্রতিমূহূর্তে ভয়ংকরভাবে ছুটে আসে একে অপরের দিকে আবার সরে যায় পরের মূহূর্তেই। আর পুরো ঘটনাটা এত অবিরাম গতিতে ঘটতে থাকে যে অতিক্রমণ তো দূর অস্ত, নরকযন্ত্রণার মত ওই পাহাড়মধ্যবর্তী অংশই হয়ে ওঠে মৃত্যুপুরী। উড়ন্ত পাখির পক্ষেও তা ভেদ করা প্রায় অসম্ভব। মূঢ়তার বশবর্তী হয়ে কত সাহসী মানুষ যে ওই সংকীর্ণ গিরিপথ অতিক্রমণ করতে গিয়ে নরকগহ্বরে পতিত হল; এমনকি তারা অনুতাপের আগুনে দগ্ধ হওয়ার সুযোগটুকুও পেল না।    

“কেবল এটুকুই?” আলেকজান্ডার জিজ্ঞেস করলেন।

“না মহারাজ, দ্বিতীয় একটি কাজও আছে,” প্রাজ্ঞ জাদুকর বলে যেতে থাকেন, “যদিও বা আপনি পাহাড়ের ফাঁক গলে বেরিয়ে এলেন কিন্তু এরপরই আপনার মুখোমুখি হবে হাজার ফুট লম্বা অতিকায় এক ড্রাগন যে দিনরাত ওই অমরতার জলের সরোবরটার পাহারায় রয়েছে। বিশালাকায় সে ড্রাগন, স্তব্ধকঠিন তার শরীর ভেদ করে সূর্যকিরণ আসে না। তার এক পা জলভর্তি সরোবরের সামনের গুহার মাথায় রেখে আর অন্য পা পাহাড়ের চূড়ায় দিয়ে অভ্রভেদী উত্তুঙ্গতায় দাঁড়িয়ে আছে অতিকায় সে শয়তান। তাকে হত্যা করেই একমাত্র অমরতার সরোবর থেকে জল তুলে আনতে পারবেন মহারাজ।

ঠিক এটুকুই শুনেছিলেন আলেকজান্ডার। আর এক মূর্হুতও সময় নষ্ট না করে নিজের প্রিয় ঘোড়া বুসেফেলাসের পিঠে চড়ে বসলেন তিনি। আর ধুলো উড়িয়ে দূরের হালকা বাতাসে হারিয়ে গেল তারা।

মহারাজ চলে যেতেই সভাশুদ্ধ সবাই চিন্তায় পড়ে গেলেন এতবড় সাম্রাজ্য এখন কে সামলাবে, রাজস্ব আদায় থেকে শুরু করে প্রজাদের সুখসুবিধের দিকে নজর দেওয়া-কাজ কি কম নাকি ! আর চিন্তা হবেইনা বা কেন? অমরতার জল আনতে গিয়ে আজ অবধি তো কেউ বেঁচে ফিরে আসেনি,ফলে রাজার মৃত্যুচিন্তাতেও চিন্তিত হয়ে পড়লেন দরবারে উপস্থিত সভাসদেরা।

হতাশায় তাঁরা এক পা নড়াবেন কি নড়াবেন না যখন এমন অবস্থা, তক্ষুনি শুনতে পাওয়া গেল কেল্লার বাইরের পাথরের পথের ওপর দিয়ে ফিরে আসা ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ। প্রহরীরা জেগে উঠল। হৈ চৈ পড়ে গেল দুর্গের মধ্যে। আর বাইরে বেরিয়ে এসে হতবাক হয়ে গেলেন সবাই, দেখলেন স্বয়ং সম্রাট আলেকজান্ডার তাদের সামনে উপস্থিত। হাতে সোনার পাত্রে করে নিয়ে আসা অমরতার জল। বুসেফেলাসের পিঠ থেকে লাফ দিয়ে নেমেই সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের মত সোজা দরবারে প্রবেশ করলেন । উপস্থিত জ্ঞানী ব্যক্তি আর জাদুকরদের উদ্দেশ্যে জলভর্তি পাত্র তুলে বললেন, “বলেছিলাম না, এ বিশ্বব্রহ্মান্ডে এমন কিছু নেই যা আলেকজান্ডারের পক্ষে জয় করা সম্ভব না?”

কিন্তু যাত্রার ক্লান্তিতেই হোক অথবা অমর হয়ে ওঠার উত্তেজনায়, সেই অমরতার জলভর্তি পাত্র একটা শ্বেতপাথরের টেবিলে রেখে বেমালুল ভুলে গেলেন সম্রাট আলেকজান্ডার। আর ঠিক এখান থেকেই আলেকজান্ডারের বোন থেসেলোনিকা ওই অমর জলের অর্ধেকটা না জেনে পান করে নিল, আর নিজের সুন্দর লম্বা সোনালী চুল ধুয়ে নিল বাকি অর্ধেক দিয়ে।

পরের দিন যথারীতি অমরতার জল পান করার সময় এলে আলেকজান্ডার খুঁজে পেলেন না তাঁর সোনার পাত্র। তন্নতন্ন করে খোঁজা হল রাজপ্রাসাদের আনাচকানাচ, কিন্তু কোত্থাও নেই। শেষঅবধি ভৃত্যদের একজনের মুখ থেকে তাঁর নিজের বোনেরই জল পান করে নেওয়ার ঘটনা শুনে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন আলেকজান্ডার। সে মূর্হুতে কেবল বিস্ময়ে যে তাঁর চোখ বড় হয়ে উঠল তা নয়, রাগে উৎকন্ঠায় আর হতাশায় মাথা কাজ করছিলনা আলেকজান্ডারের। থেসেলোনিকা ভুল করে ফেলার জন্য দাদার পা ধরে ক্ষমা চাইলেও আলেকজান্ডার রাগে থরথর হয়ে বলতে থাকলেন, “তুমি অমরতার জল পান করেছ, অর্থাৎ তুমি এখন অমর, কিন্তু মনে রাখবে সারাজীবন তুমি অর্ধেক মানবী আর অর্ধেক মাছ হয়ে বেঁচে থাকবে। এতটুকুও শান্তি পাবে না, সারা সমুদ্র ছুটে বেড়াবে।”

আলেকজান্ডারের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই থেসেলোনিকা মৎসকন্যায় রূপান্তরিত হয়ে গেল।

এই হল জলপরীর সৃষ্টিকাহিনী। তোমরা জানো কি এরপর থেকেই সেই মারমেড বা জলপরী সারা সমুদ্র সাঁতরে বেড়ায়, হয়ত অভিমানে হয়ত নিজের ভুলের প্রতি চরম হতাশায় কিংবা কেবল অমন এক ভালো দাদার আদর থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার যন্ত্রনায়। এখনও সারা সমুদ্র ঢেউ নিয়ে খেলে সে মেয়ে। জাহাজ দেখতে পেলেই জিজ্ঞেস করে দাদা বেঁচে আছে কিনা , কেমন আছে?

যারা এ গল্প জানে না তারা তো বলেই ফেলে বহুবছর আগে আলেকজান্ডারের মৃত্যুর ঘটনা আর মাছমেয়ে রেগে মেগে তার লম্বা চুল দিয়ে ঢেউ দুলিয়ে দেয়, ডুবিয়ে দেয় জাহাজ। আর যারা জানে তার যন্ত্রণার কথা, তারা বলে, “হ্যাঁ গো মেয়ে, বেঁচে আছেন তিনি, বোনের জন্য কত না তাঁর মন কেমন করে।”

এই শুনেই জলপরী গান শুনিয়ে দেয় আর তার নরম লেজের আদরে জাহাজকে এগিয়ে দেয়।

কখনও যদি জাহাজ়ে করে সমুদ্রসফরে বেরোও আর নতুন কোনো গান ভেসে আসে কানে, জানবে সেই ভালোমানুষের মেয়ে, সেই মারমেড কাছেই কোথাও আছে আর হয়ত তোমার দিকেই সাঁতরে এগিয়ে আসছে,মুখে করে দু একটা নীল ফেনা আর সেই হারিয়ে যাওয়া দুটো কাছিমের ডিম। সবাই তোমার জন্য।

(মূল-গ্রীস দেশের লোককথা)

জয়ঢাকের লোককথা লাইব্রেরি

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s