লোককথা কুঁড়ের গল্প সুন্দরবন এহসান হায়দার বর্ষা ২০১৬

জয়ঢাকের সব লোককথা একত্রে

loka01 (Medium)

অনেক অনেকদিন আগেকার কথা। আজকের বাংলাদেশ তখন মোঘল সম্রাট হুমায়ুনের দখলে ছিল। তখনকার দিন রাজা রাজবাড়ি এই নিয়ে ছিল যত গল্প। প্রজারা সব রাজবাড়িতে কী ঘটলো এই নিয়ে মত্ত থাকত। এর বাইরেও ছিল আরও কত মানুষের সুখ দুঃখের কথা! তা এসেছে রূপকথার মতো।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে তখন ছিল গাছ আর গাছ মাঝে মাঝে নদী,তারপর গহীন সুন্দরবন। সেই বনেরই একটা ঘটনা আজও মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। এক মায়ের ছিল এক ছেলে। মা খেটেখুটে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যা কাজকর্ম করে পেত তা দিয়েই চলতো মা ছেলের ছোট্ট সংসার। ছেলেটির কখনো মনে হত না,মা কী কষ্ট করে আয় করে তাকে বড়ো করছে। মনেই হত না মাকে একটু সাহায্য করি আজ। আসলে তার কাজ করতে ইচ্ছেই করত না।

সে ছিল কুঁড়ের হদ্দ। একেবারে যাকে বলে রাম কুঁড়ে। এই কুঁড়ে ছেলেকে রাগ করে একবার মা বলল “তোর কি কোনোকালে আমার জন্য একটু দয়ামায়া হবে না রে? আমি তো আর পারছি নে! বুড়ো হয়ে গেছি। আয়রোজগার কিছু কর এবার।”

মায়ের কথাতে কুঁড়ে করলো গোঁসা। রাগ করে মাকে বলল, “আমি বড়লোক হয়ে তবেই বাড়ি ফিরব নচেৎ ফিরব না।”

এই কথা মাকে বলে সে বেরুলো দরবেশের সন্ধানে। সে ভাবে দরবেশ হাত দেখতে জানে। হাত গুণে বলে দেবে সে কীভাবে ধনী হবে। তার বড়োদের কাছে জানা আছে গহীন জঙ্গলে এক ফকির দরবেশ থাকে; দরবেশবাবা সব বলে দিতে পারে। তাই সে যেতে থাকল বনজঙ্গল পার হয়ে। পথে দেখা পেল এক অসুস্থ বাঘের। বাঘ বলল,  “ওহে খোকা, কোথায় চলেছ?”

loka02 (Medium)কুঁড়ে বলল, “আমি এই বনের মাঝে এক দরবেশের খোঁজে যাচ্ছি।”

“কেন? কী কাজে যাচ্ছ তুমি?”

“যাই, কীভাবে বড়লোক হব তা জানতে-”

তখন বাঘ তাকে বলল, “খোকা আমার পেটের ব্যাথায় নড়তে পারি না,খেতে পারি না। তুমি একটু জেনে আসবে আমার পথ্য কী?”

কুঁড়ে ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে ফের হাঁটা শুরু করল। কিছুদূর গিয়ে দেখা পেল এক বুড়ো আমগাছের। আমগাছ কুঁড়েকে ডেকে বলল, “ওহে,তুমি কোথায় যাও এই পথে? সামনে তো জঙ্গল আর জঙ্গল!”

কুঁড়ে বলল, “ধনী হবার উপায় জানতে ওই গহিন বনের দরবেশের কাছে যাই।”

তখন বুড়ো আমগাছ বলল, “ আমার বয়স হয়েছে। প্রতিবছর বসন্তে এখনও ঠিক বোল আসে কিন্তু একটা আমও কেউ চেখে দেখতে পায় না আজ অনেক কাল। কেউ আমার ডাল থেকে একটা আমও পাড়তে পারে না। এই কষ্ট আর সইতে পারি না। তুমি একটু জেনে আসব গো আমার বোল কেন পড়ে যায়?”

কুঁড়ে আমগাছের দুঃখে ব্যথিত হয়ে বলল, “হ্যাঁ,জেনে আসব।” তারপর আবার সেই পথ ধরে হাঁটতে থাকলো দরবেশের উদ্দেশ্যে।

পথের পাশে নদী পার হতে গিয়ে দেখা মিললো এক কুমিরের। কুমির বলল, “খোকা তুমি কোথায় যাচ্ছ এই গহীন বনের দিকে?”

কুঁড়ে বলল, “যাই ওই বনের মধ্যে এক দরবেশের কাছে। তার কাছে গিয়ে জানব আমার ধনী হওয়ার উপায় কী?”

loka03 (Medium)কুমির তখন কুঁড়েকে বলল, “জানো, আমার গলায় ভীষণ ব্যথা করে অনেকদিন হল। কিছু খেতে পারি না। তুমি কি আমার এই ব্যথা সারার ঔষধ জেনে আসবে?”

কুঁড়ে এবারও ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে পথ চলতে শুরু করল। এভাবে পথ চলতে চলতে পেয়ে গেল এক সময় বনের মধ্যে সেই সাদা দাড়ি সাদা চুলের দরবেশকে। মনের কথা খুলে বলল তাকে। সব শুনে দরবেশ বলল, “তুমি তো এমনিতেই ধনী হবে।”

তখন সে জানতে চাইল বাঘ,বুড়ো আমগাছ আর কুমিরের সমস্যার উপায়। দরবেশ তাও বলে দিল কুঁড়েকে। সব শুনে কুঁড়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাড়ির পথ ধরল।

পথে দেখা কুমিরের সাথে। কুমিরকে কুঁড়ে বলল, “তোমার গলায় একটা হিরের হার আটকে গেছে।loka05 (Medium) ওটা সরালেই তুমি খেতে পারবে।”

শুনে কুমির বলে, “তাহলে তুমি ওটা খুলে নিয়ে যাও।”

কুঁড়ে তাচ্ছিল্য করে বলল, “আরে আরে তুমি অন্য কাউকে দিয়ে ওটা খুলিয়ে নিয়ে তাকে বখশিস দিও। আমি এমনিতেই বড়লোক হয়ে যাব। দরবেশবাবা বলেছে।”

তারপর সে আবার সামনে এগুতে লাগল। ফের কিছুদূর এসে বুড়ো আমগাছের সাথে দেখা। কুঁড়ে তাকে বলল, “শোনো বুড়ো আমগাছ। তোমার গোড়ায় বহুকাল আগে এক ডাকাত সর্দার সাত কলস সোনার মোহর পুঁতে রেখেছিল। পরে আর সে তুলতে আসেনি। কারণ,সে তার তার দলের লোকের হাতে মারা যায়। এইজন্য তোমার ফুলে ফল ধরে না।ওই সাত কলস সোনার মোহর তুলে ফেললে তুমি এই বসন্তেই ফলবতী হবে।”

বুড়ো আমগাছ শুনে বলল, “তুমিই তবে ওই সাত কলস সোনার মোহর নিয়ে নাও তুলে।”

এবারও হদ্দকুঁড়ে খাটতে চাইল না। বলল, “আমি এমনিতেই ধনী হব যখন,  তবে কেন এই কষ্ট করবো বল তো! তুমি বরং কোনো পথিককে বল,  সে তুলে নেবে’খন।”

এই বলে সে বুড়ো আমগাছের কাছ থেকে বিদায় নিল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে দেখা পেল অসুস্থ বাঘের। বাঘের সাথে সে কুঁড়ে কুমির আর আমগাছের সমস্যার কথা বলে হেসে হেসে বলল,  “এমনিএমনিই ধনী হব বলে কুমিরের গলা থেকে হিরের হার আর বুড়ো আমগাছের গোড়া থেকে সাত কলস সোনার মোহর আর নিইনি। কষ্ট করার দরকার কী?”

এরপর কুঁড়ে বলল, “তোমার অসুখ সারানোর উপায় হল, দুনিয়ার সবচেয়ে কুঁড়ে লোকের মাংস খাওয়া। তবে তোমার পেটের ব্যথা কমবে।”

বাঘ শুনে হাসতে হাসতে বলল, “তুমি এত যখন উপকার করলে তখন আর একটা উপকার করো আমার। তোমার সব কথা শুনে মনে হল আমার দেখা সবচেয়ে বড় কুঁড়ে তুমি। তাই তোমার মাংস খেয়েই পেট ব্যথা কমাই আমি, কী বল?”

তারপর তো বাঘ মহানন্দে কুঁড়েকে খেয়ে ফেলল।

ছবিঃ মৌসুমী