লোককথা

দাঁড়কাকের বিয়ে — মহাশ্বেতা

lokakatha (Small)একবার একটা ছোট্ট চড়াই পাখির বর হারিয়ে যাওয়ার পর সে কাঁদছিল প্রচন্ড। তাকে বড়ো ভালবাসত সে। প্রতিদিন সে একগাদা করে পোকামাকড় জোগাড় করে এসে বউকে খাওয়াতো কিনা!

সে এক জায়গায় বসে অঝোরে কাঁদছিল এমন সময় একটা দাঁড়কাক তার কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর প্রশ্ন করল, “কাঁদছ কেন?”

চড়াই উত্তর দিল, “আমার সোয়ামির জন্য কাঁদছি গো! উড়তে উড়তে কোতায় চলে গেল গো! আমার জন্য কত ভাল ভাল পোকা ধরে আনতো সে গো! ও মা গো! আমার এবার কী হবে গো!”

দাঁড়কাকের মনে মনে বিয়ে করার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু কেউ তাকে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছিল না।  তাই এই সুযোগ দেখে সে বলল “আরে কেঁদ না! সারাক্ষণ যারা লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে বেড়ায় তারা কাঁদলে মোটেই ভাল দেখায় না। তুমি এক কাজ কর না, এই আমাকেই বিয়ে করে ফেল! দেখ আমায় কী সুন্দর দেখতে? আমার কপালটা কী বড়ো, কত লম্বা দাড়ি আছে দেখ! আবার, ঠোঁটটাও কী বড়ো। আমার বিশাল পাখনার তলায় তুমি আরামে ঘুমোতে পারবে, আর আমি যেসব মাংসের ছিঁটেফোঁটা পাই, তুমিও তার ভাগ পাবে। তাই বলি, সময় থাকতে আমায় বিয়েটা করে ফেল।”

“আ মোলো যা! তোমায় আমি বিয়ে করব কেন হে? কী উল্টোপাল্টা কথা সব! বলে কিনা লম্বা দাড়ি, বিরাট পাখনা! ওসব পোষাবে না আমার ভাই।”

তাই শুনে দাঁড়কাক একটু দুঃখ পেয়েই উড়ে চলে গেল অন্য কোথাও বউ খুঁজতে। উড়তে উড়তে সে একসময় পৌঁছোল রাজহংসীদের ডেরায়। কিন্তু যখন সে সেখানে পৌঁছোল, তখন তারা দল বেঁধে অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য পাত্‌তাড়ি গুটিয়ে নিয়েছিল। সে দেখেশুনে দুজনকে পছন্দ করে নিয়ে বলল, “ওই বোকা চড়াইটা তো আমার কথা শুনল না। তোমরা কি শুনবে? আমায় বিয়ে করবে?”

তার উত্তরে তারা বলল, “কিন্তু আমরা তো এই কিছুদিনের মধ্যেই এখান থেকে চলে যাব অনেক দূরের দেশে।”

“আমিও তাহলে যাব তোমাদের সাথে।” দাঁড়কাক বলল।

“কিন্তু একটা কথা মাথায় রেখো। আমাদের সাথে যেতে হলে সাঁতার জানতে হবে আর জলের ওপর ভাসতেও জানতে হবে। কারণ সমুদ্রের বিরাট সব এলাকার ওপর দিয়ে আমাদের উড়ে যেতে হবে। আর সেই জলটা হবে একেবারে বরফের মত ঠাণ্ডা। আর বরফের চাঁইও থাকবে বিরাট বিরাট। কী? পারবে তো?”

“আরে পারব না কেন? এসব কে না পারে? আমি তো এসব তোমাদের জন্মের আগে থেকেই করছি বলতে পার।”

বিয়ে তো হয়ে গেল। তার কিছুদিন পরে তারা সবাই আকাশপথে রওনা দিল। কিন্তু অল্পসময় উড়েই দাঁড়কাক প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ল। হবে না? বুনো হাঁসের তুলনায় তার শরীরও ছোট, ডানাও ছোট। ও’রকম লম্বা রাস্তা সে উড়ে যেতে পারে নাকি? সে হাঁফাতে হাঁফাতে কোনরকমে তার দুই রাজহংসী বউকে বলল, “একটু বসব কোথাও, ওগো একটু আরাম করব, চোখ দুটো বুজব। তোমরাও আমার পাশে পাশে বসে থাক।”

এই বলতেই দুই বউ মিলে তাকে নামিয়ে আনল, তারপর জলের ওপর নিজেরা ভেসে থেকে তাদের পিঠে দাঁড়কাককে শুইয়ে দিল। কাক অঘোরে ঘুমোতে লাগল। বউহংসীরা জলের ওপর ভেসে রইল আর বাকি দলটা উড়ে যেতে লাগল।

    কিছুক্ষণ পরে যখন দুই রাজহংসী দেখল তাদের বন্ধুবান্ধবেরা তাদের চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে, অথচ দাঁড়কাকের আর ঘুম থেকে ওঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, তখন তারা পিঠ থেকে কাককে জলের ওপর নামিয়ে রেখে মানে মানে কেটে পড়ল। উড়ে গিয়ে আবার দলে যোগ দিয়ে চিরতরে চলে গেল তারা।

    এদিকে জলে পড়া মাত্র দাঁড়কাক জেগে উঠে চেঁচিয়ে উঠল, “একী! এ আবার কী? শোয়ার জায়গা কই আমার?” এই বলে খানিকক্ষণ সমুদ্রের জলে ভেসে থাকার চেষ্টা করল, কিন্তু সেটা না পে্রে সে সেই জলেই ডুবে গিয়ে মরে গেল। তার শরীরটা টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল সমুদ্রের তলায়, আর তার আত্মাটা হয়ে গেল কালো সমুদ্র শামুক। তাই এই শামুকদের এখনও ‘সমুদ্রের দাঁড়কাক’ বলা হয়।

Eskimo Folk-Tales, by Knud Rasmussen, [1921], থেকে অনুদিত

জয়ঢাকের সব লোককথার বিরাট লাইব্রেরি এই লিংকে