শীত স্পেশাল পারাচিনারের স্মৃতি দীপালি দেবনাথ শীত ২০১৭

শৈশবে আফগানিস্তানের রোমাঞ্চকর দিনগুলির স্মৃতিচারণ করলেন  শ্রীমতী দীপালি দেবনাথ

পারাচিনারের বাড়িতে প্রথম প্রবেশের মুহূর্তটা বেশ মনে পড়ে। দুর্গের দরজা দিয়ে ভেতরে গিয়েই বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছতে আমাদের তিন ভাইবোনের একটা কমপিটিশান হয়ে গেল। অবশ্য আমি ছোট বলে ছুট পেয়ে যেতাম। দুর্গের সদর দরজাটা পেল্লাই। লোহার দরজা, তার মধ্যে একটা ছোট দরজা। সেখানে একজন খাসাদার দাঁড়িয়ে, পরণে ছাইরঙা Mazri cloth এর সালোয়ার কুর্তা,কাঁধে রাইফেল আর কোমরে টোটার বেল্ট। দরজায় গোল গোল গর্ত। তার মধ্যে দিয়ে রাইফেলের নল বেরিয়ে আছে। দরজার অন্য দিকে আর একজন খাসাদার দাঁড়িয়ে  । দুর্গের ভেতরে বাড়ির দরজাটা তুলনায় ছোট, সেই দরজাতেও একটা ছোট দরজা ছিল।  

দরজা খোলা। আমরা ছুটে গেলাম। আধখোলা দরজার ওপাশে একটা মোটাসোটা বেডা়ল ঘুমোচ্ছিল। আমাদের দেখে বাঁ হাত কানের কাছে তুলে একটা বিরাট হাই তুলে লাফ দিয়ে দরজার ওপরে উঠে চলে গেল। 

বিকেল বেলায় আমাদের বেডা়তে পাঠানো হত। একদিন বিকেলে আমরা দুর্গের বাইরে খেলা করছি, দুই দাদা আখরোট গাছে দোল খাচ্ছে আর আমি গাছের নিচে ঘুরে ঘুরে কাঁচা সবুজ আর কষাটে আখরোট চিবিয়ে চিবিয়ে ফেলছি, এমন সময় একটা গাড়ি(সে যুগে মোটর বলা হত) হর্ণ বাজাতে বাজাতে এসে থামল। গাড়ি থেকে খাসাদারকে সঙ্গে করে আমার বাবা নেমেই  আমাদের সঙ্গে খেলতে শুরু করে দিলেন। বাপি শনিবারে এসে সোমবারে চলে যেতেন যেটা কিনা আমাদের একেবারে পছন্দ ছিল না। বাপির কাজের জায়গা ছিল থাল দুর্গ। 

মাকেও ড্রাইভিং শিখতে হয়েছিল দেহরক্ষী সঙ্গে নিয়ে একটু আধটু বাজারহাট করার জন্য। তার আগে মাকে বন্দুক চালানোও শিখতে হয়েছিল। আমাদের নিয়ে বেরোতেন পৈতের  মত করে টোটার মালা ঝুলিয়ে কাঁধে বন্দুক নিয়ে। মাথায় কিন্তু সামান্য ঘোমটা থাকত। 

 মা যখন মোটামুটি ড্রাইভিং করছেন তখন একদিন পরীক্ষা নিতে বাপি সবাইকে নিয়ে বেরোলেন। চারিদিকে বরফ। তখন পড়ছিল না অবশ্য। রাস্তার পাশে চওডা় নালার মত।

খানিক বাদেই মা গাড়ি চালিয়ে নিয়ে পাশে সেই নালায় ল্যান্ড করলেন। বোধহয় বরফে গাড়ির চাকা পিছলেছিল। গাড়ি স্লো মোশনে নালায় গিয়ে পড়ল। বাঁ দিকটা আটকে গেছে। আমরা সবাই ডান দিক দিয়ে একে একে বেরিয়ে এলাম। তারপরে সেইখানে আমাদের কী হাসি আর লাফাতে গিয়ে আছাড় খাওয়া!

আমাদের ছোট ছোট বেলচা ছিল। সকাল বেলায় বেলচা নিয়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে রাস্তার বরফ পরিষ্কার করতে হত। না হলে খেলতে যেতে পারব না। বাড়ি ফিরে আগে গরম জলে হাত চুবিয়ে খানিকক্ষণ পরে আগুনের সামনে যেতে পেতাম। একদিন খেলার পর খালি পায়ে লাফাতে লাফাতে বাড়ি ফিরলাম। লাফাবার কারণ বরফ । আমাদের জুতোগুলোকে দাদার বুদ্ধিতে বরফে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। ফলভোগ কী হয়েছিল সেটা মনে নেই । বাপি এসব বেশ উপভোগ করতেন। ঝামেলা ভোগের বেলায় মা । 

আমাদের বাড়ির সামনে চৌকিদারের ঘর ছিল। তার সঙ্গে আমাদের বড় ভাব ছিল। তার ঘরে আর কে ছিল তা মনে নেই কিন্তু প্রায়ই দুপুরবেলায় দেখতাম তার বৃদ্ধ বাবা একটা লঙ্গোটি পরে গায়ে মাথায় বরফ ঘষে ঘষে স্নান করত। রোগা গায়ে বরফ ঘষে ঘষে গায়ের রং কালো যা ওখানে দেখা যায় না। তার নাকি বয়স ৮০। 

গরমের সময়ে  দুপুরবেলায় বাইরে যাওয়া আটকানোর জন্যে আমাদের নিয়ে বসতেন দরজার ভেতরে, যেখানে একটু ছায়া আছে। মাটি দিয়ে ছোট ছোট পাহাড় ,নদী ,নদীর সেতু এবং ছোট ছোট পুতুল করতেন ও করাতেন। আমার বড় ভাই খুব সুন্দর মডেল বানাত। দাদা শুধু দুষ্টুমি করত। পরে অবশ্য সেও বানাত।

যে মেয়েরা ঘরের কাজ করতে আসত তারা ঢোলা জামা কাপড় পরত। আমার যতদূর মনে আছে বেশির ভাগ সময়ে পরনে কালো রঙের ঢোলা সালোয়ার কামিজ, গলায় মাথায় পুঁতির গহনা, মাথায়  চুলের অনেকগুলো বিনুনি। কোমরে একটা ড্যাগার। পায়ে ঘাসের জুতো।

এত সবের মধ্যে পড়তে বসতে হত মায়ের কাছে । বর্ণপরিচয়  ফার্স্ট বুক, অঙ্ক । 

একদিন বেলাতে আমরা খেলা করছি এমন সময় ঘরের ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ। আমি একটা প্রজাপতির পেছনে ছুটছি আর দাদা (তখন দাদার বদলে নাম ধরেই ডাকতাম) গাড়িটা খুঁটিয়ে দেখছে। ঠিক সেইসময়ে কেউ গাড়ির হর্ন বাজিয়ে দিল। শাঁখের বদলে গাড়ির হর্ন।    আগমন হোল আমাদের বোন স্বপ্না লাহিডী় বা চিনার লাহিডী়র।

কিছুকাল বাদে একসময় অবশেষে সময় এল পারাচিনার ছেড়ে যাবার। একদিকে রুক্ষ পাহাড় আর একদিকে গভীর খাদ, মাঝখান দিয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল থাল দুর্গের দিকে। 

এবারে থালের এক অভিজ্ঞতা বলি।এক রাতে ঘুমিয়ে আছি,  হঠাৎ বাপি আমাদের টেনে তুলে গাড়িতে  বসিয়ে নিয়ে চললেন। পৌঁছলাম এক খোলা মাঠে। সেখানে এক সমাবেশ। আমরা নেমে দাঁডা়লাম। লোকেরা গোল হয়ে দাঁডা়ল। তারপরে নাচ শুরু হল। যার নাম খডক নাচ।. দুজন করে নাচছে, বারে বারে একজন করে চলে যাচ্ছে আর একজন যোগ দিচ্ছে। এক পায়ে পাক দিয়ে  মাথা ঝাঁকিয়ে দু’হাতের আঙুলে তুড়ি দিয়ে দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নাচছে। বাপিকেও ওরা টেনে নিয়ে গেল। বাপিও নেমে পড়লেন,  সমান তালে নাচতে থাকলেন। বাপি ছাডা় সবাইকার বাবরি চুল। দেখার মত দৃশ্য । তখন অবাক হয়ে দেখেছি আর আজ সে দৃশ্য যখন মনের পর্দায় দেখি অভিভুত হই।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আর একটি নাম ও চেহারা সামনে এসে দাঁড়াল। আবছায়া নয়। পরিষ্কার। দর্শন সিং । বোধহয় প্রথম যৌবনে পা রেখেছে। আর পাঁচটা পাঠানের মতই চেহারা, শুধু অতটা লম্বা আর চোখা বা sharp নয় । সীমান্তের হিন্দু। পাঠানি বেশ । আমাদের বাড়িতে কাজ করতে এসে প্রায় সদস‌্য হয়ে গেল। তার কাজ ছিল বন্দুক, ছোরা আর ঘরের যে সামান্য সাজানোর জিনিস ছিল সেগুলো পরিষ্কার করা। আমরা ভাইবোনেরা তাকে ঘিরে বসে দেখতাম, বিশেষ করে বন্দুক পরিষ্কার করার সময়। সেই সময়ে আমাদের কাকু, স্কুলের ছাত্র, ছুটি কাটাতে এসেছিল। সে ও ‘য়ে খ’ ‘স্তড়ে মশে’ বলে ওকে হাসাত । আমার বোন চিনারকে সে বড় ভালোবাসত। সময় পেলেই ওকে কোলে নিয়ে ঘুরত আর আমাদের সঙ্গে খেলা করত‌।

একবার আমরা কাশ্মীর বেড়াতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে দর্শন সিঙ্ ছিল। থাল থেকে বাইরোড নর্থোয়েস্ট ফ্রন্টিয়ারের মারি হিল স্টেশনহয়ে। কাশ্মীরে পৃথিবীর মাটিতে চিনারের প্রথম চলা। ওই দর্শন সিং ই দেখে ও সবাইকে দেখায়।

তারপর আমাদের ঠাঁইব‍দল আর দর্শন সিং-এর নিজের দেশে ফিরে যাওয়া। বহুদিন প‍র, আমরা তখন দেরাদুনবাসী, রাস্তা দিয়ে একজন শিশি‌ বোতলওয়ালা যাচ্ছিল। সে এল এবং ঘরে ঢুকে আমার বাবাকে দেখেই বলে উঠল, ‘অরে সাব!’ একই সঙ্গে বাবাও বলে উঠেছেন,  ‘অরে দর্শন সিং!’

দর্শন সিং-এর রোদে পোড়া তামাটে চেহারায় তখন বয়সের ছাপও পড়েছে। পিঠের ওপর মস্ত ঝোলা। পরণে আগের মতোই ঢোলা সালোয়ার কুর্তা, শুধু মাথায় পাগড়ি নেই। সবার কথা নাম ধরে শুধোল। দুজনে মিলে কত কথা। তারপরে এক সময়ে বেরিয়ে জনস্রোতে মিলিয়ে গেল শিশি বোতলের খোঁজে । দেশ বিভাগের আরও একজন শিকার।

ফটোগ্রাফ সৌজন্যঃ শ্রীমতী দীপালি দেবনাথ ও শ্রীমতি স্বপ্না লাহিড়ী।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s