শীত স্পেশাল প্রাচীন অ্যাজটেক সভ্যতার কিছু কথা প্রতিম দাস শীত ২০১৭

প্রাচীন অ্যাজটেক সভ্যতার কিছু কথা

প্রতিম দাস

প্রাচীন অ্যাজটেক সভ্যতার মানুষদের কোনও স্থায়ী বাসস্থান ছিল না। যাযাবরদের মতো একস্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে হত তাদের। এই প্রাচীন অ্যাজটেকরা অনেক ধরনের ভগবানে বিশ্বাস করতেন। যেমন সূর্যের দেবতা, যিনি প্রত্যেকদিন সূর্যটাকে সাথে নিয়ে আসেন। কোনও কারণে তার মনখারাপ হলে তিনি এই কাজ করতে চান না আর এর ফলে  সব ফসল নষ্ট হয়ে যায়। অ্যাজটেকরা জীবনের অনেকটা সময় এইসব দেবতাদের সন্তষ্ট রাখার পেছনেই ব্যয় করতেন। খাদ্য যাতে ঠিকঠাক যোগাড় হয় তার জন্য দরকারমতো ভগবান সৃষ্টি করে নিতেন।

আর এইসব ভগবানদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য দরকার পড়ত পুরোহিতের। সাধারণ মানুষ প্রার্থনা করতেন। কিন্তু একমাত্র পুরোহিতদেরই নাকি ক্ষমতা ছিল ভগবানদের সন্তুষ্ট করার। এইসব পুরোহিতরা বলতেন, ভগবানদের সন্তুষ্ট রাখার একটাই উপায়, তা হল মানুষের বলিদান। তাদের গোষ্ঠীর কিছু অংশ খাবার সংগ্রহ করত। কিছু অংশ বানাত নানা জিনিসপত্র। আর শক্তিশালীদের নিয়ে বানানো হত হানাদারবাহিনী। যাদের প্রধান কাজ ছিল অন্য উপজাতি থেকে মানুষ ধরে আনা, যাদের পুরোহিতরা দেবতার জন্য বলি দিতে পারে। না হলে তো নিজের গোষ্ঠীর মানুষকেই বলি দিতে হবে।

ফলে বোঝাই যাচ্ছে, এই বিশেষ কারণে অ্যাজটেকরা অন্যান্য গোষ্ঠীদের কাছে জনপ্রিয় ছিল না মোটেই। এমনও দেখা যেত, এই অ্যাজটেক হানাদারদের হাত থেকে বাঁচার জন্য অন্য গোষ্ঠীর লোকেরা একত্র হয়েছে নিজেদের মধ্যের শত্রুতা ভুলে গিয়ে। দল বানিয়ে পাহারার ব্যবস্থা করেছে।

আর ঠিক এই কারণেই প্রায় ২০০ বছর ধরে প্রাচীন অ্যাজটেক উপজাতির মানুষদের কোনও স্থায়ী বাসস্থান গড়ে ওঠেনি। কেউ ওদের পছন্দ না করার কারণে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে।

প্রাচীন অ্যাজটেকদের একটা অতি প্রচলিত বিশ্বাস ছিল যা ওদের প্রধান উপকথার অংশ। যেখানে বলা হয়েছে অনেক অনেকদিন আগে সূর্যের আর যুদ্ধের দেবতা ওদের পুরোহিতদের সাথে দেখা করেছিলেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে একদিন একজন পুরোহিত একটি ঈগল দেখতে পাবেন যে বসে থাকবে একটি ক্যাকটাসগাছের ওপর। ধরে থাকবে একটি সাপকে। আর সেটাই হবে সংকেত, সময় হয়ে গেছে এবার অ্যাজটেকরা তাদের বাসভূমির সন্ধান পাবে। আর সেখানেই ওরা নিজেদের  নগরী গড়ে তুলবে। তার মধ্যে এটাও বলে ছিল যে অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও ওদের জীবন উদ্বেগহীনভাবে কাটবে এই নগরীতে। আর ওরা নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে নেওয়ার অনেকটা সময় পাবে।

বিশ্বাস হোক বা না হোক একদিন সত্যি সত্যি এক পুরোহিত দেখতে পেল একটা ঈগল একটা ক্যাকটাসগাছের ওপর মুখে একটা সাপ ধরে বসে আছে। পুরোহিতের নিজেরও বিশ্বাস হচ্ছিল না। একছুটে সে ফিরে এল দলের কাছে ভ্রাম্যমান আস্তানায়। জানাল কী দেখেছে। এ ঘটনা ঘটেছিল মেক্সিকোর উপত্যকা অঞ্চলে। টেক্সকোকো লেকের জলাভূমি এলাকায়।

উপকথা অনুসারে অ্যাজটেকরা সবাই ছুটে গিয়েছিল ব্যাপারটা দেখার জন্য। এরকম আশ্চর্য ঘটনা নিজের চোখে দেখার লোভকেই বা সামলাতে পারে। সবাই ওখানে পৌঁছতেই ক্যাকটাসটা বদলে গেল একটা দ্বীপে। আর সেই দ্বীপেই বসবাস শুরু করল ভ্রাম্যমান প্রাচীন অ্যাজটেক উপজাতির দল। দ্বীপটার নাম দিল টেনছটিটলান বা “দ্য প্লেস অফ প্রিকলি পিয়ার ক্যাকটাস”।

উপকথার জাদুর এই টেনছটিটলান দ্বীপে বসবাস শুরু করার পর ওরা ওদের চিরন্তন হানাদারি করা বন্ধ করল। কিন্তু ভগবানকে তো প্রাপ্য বলি দিতে হবেই। সেটা বন্ধ হল না। ধরে আনা মানুষের বদলে ওরা নিজেদের গোষ্ঠীর লোকজনকেই বলি দেওয়া শুরু করল। আর এটাই নাকি করতে বলেছিল ওদের দেবতারা। (যদিও উপকথা অনুসারে নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করার জন্য যুদ্ধে গিয়ে লোকক্ষয় করা আটকানোর কথাই আসলে বলতে চেয়েছিলেন দেবতারা।)

এরপর কেটে গেল বেশ কিছু সময়। বলি দিতে দিতে কমে যাচ্ছে উপজাতির জনসংখ্যা। এটা উপলব্ধি করে অ্যাজটেকদের রাজা তার একজন দূতকে পাঠালেন কাছের এক উপজাতির কাছে। আমন্ত্রণ জানালেন তাদের প্রধানের মেয়েকে টেনছটিটলান দ্বীপের রাজধানীতে আসার জন্য। দেখা করার জন্য ওর ছেলের সাথে। আমন্ত্রণ মেনে নিয়ে সেই উপজাতির রাজকন্যা এলেন অ্যাজটেক রাজধানীতে। দেখা করলেন অ্যাজটেক রাজপুত্রের সাথে। একটা দারুণ ভোজসভা হল। আর সেই অনুষ্ঠানের শেষে রাজকন্যা নিজেই বিয়ের প্রস্তাব দিলেন রাজপুত্রকে।

বেশ কিছুদিন কেটে গেল তারপর। খবর পাঠানো হল রাজকন্যার বাবার কাছে যে সে অ্যাজটেক রাজপুত্রকে বিয়ে করতে চায়। এটা জানতে পেরে মেয়েটির পিতা এলেন টেনছটিটলান দ্বীপে আজটেক রাজধানীতে। উদ্দেশ্য বিবাহ উপলক্ষে মেয়েকে কী কী দেবেন সেসব নিয়ে একটা আলোচনা করা। আর সেখানেই জানতে পারলেন তার মেয়ের সাথে যেসব দাসদাসীরা এসেছিল তাদের বলি দিয়ে দেওয়া হয়েছে অ্যাজটেক দেবতাদের উদ্দেশে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে আর একটু হলে মেয়েটির বাবাকেও বলি দিয়ে দিত অ্যাজটেকদের রাজা। কিন্তু সাথে একদল সশস্ত্র দেহরক্ষী থাকায় ওখান থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে সমর্থ হলেন কন্যাটির পিতা। পরের দিনই অ্যাজটেকদের একেবারে শেষ করে দেওয়ার জন্য আশপাশ থেকে সেনা সংগ্রহ করে এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করলেন।

এখানে কাজে লাগল অ্যাজটেকদের দেবতাদের দেওয়া পরামর্শ। বলাই ছিল যুদ্ধ না করে, লোকক্ষয় না করে শক্তি সঞ্চয় করার জন্য। সময়ের সাথে সাথে এখন দলের তরুণরাও পরিণত হয়েছে সমর্থ যোদ্ধায়। বানিয়ে রেখেছে অনেক অস্ত্রশস্ত্র। যে কারণে এই যুদ্ধে জিতে গেল অ্যাজটেকরাই। এর ফলে ওদের সংগ্রহে এল অনেক অনেক ধনসম্পদ, খাবার এবং পোশাক। আর সাথে আথেই দেবতাদের উদ্দেশে বলি দেওয়ার জন্য অনেক মানুষ। এতে দেবতাদের ওপর ওদের বিশ্বাস আরও বেড়ে গেল। এরপর থেকে ওরা আবার শুরু করল যুদ্ধ অভিযান। আর লুটে আনা সম্পদ দিয়ে আরও ভালো করে গড়ে তুলতে থাকল নিজেদের স্থায়ী বাসস্থান টেনছটিটলান দ্বীপটাকে।

আজ যেখানে মেক্সিকো শহর সেখানেই ১৫০০ সালের প্রথমদিকে ছিল টেনছটিটলান নগরী, অ্যাজটেক সভ্যতার রাজধানী। বাস করত প্রায় তিন লক্ষ মানুষ। প্রাচীন বর্ণনা অনুসারে টেনছটিটলান ছিল এক অদ্ভুত সুন্দর নগর। ঝকমকে মন্দির, খোলামেলা বাজার এবং অসংখ্য বিপণীর সমাহার। আর সেইসব বিপণীতে পাওয়া যেত নানারকম জিনিসপত্র। সেখানে নাকি ছিল আজকের মতো রেস্টুরেন্ট। অর্থের বিনিময়ে সেখানে পাওয়া যেত সাজানো আসনে বসে সুস্বাদু খাবার আস্বাদনের সুযোগ। টাটকা খাদ্য, পানীয় বিক্রির দিকেই বিশেষ নজর দেওয়া হত। চিকিৎসার বিশেষ ব্যবস্থার সাথে সাথেই ছিল কেশবিন্যাস করার অতি বিশেষ আয়োজন। পাওয়া যেত প্রসাধনের নানান সামগ্রী এবং এমব্রয়ডারি করা পোশাক। শিল্পীদের বিশেষ সম্মান ছিল অ্যাজটেক সভ্যতায়। দেবতার প্রতি বিশ্বাসের থেকে হওয়া নৃশংসতার দিকটা বাদ দিলে অ্যাজটেক সভ্যতা ছিল এক বর্ণময় শিল্পসংস্কৃতির পীঠস্থান বিশেষ।

উপকথা অনুসারে, এই অ্যাজটেক নগরী গড়ে উঠেছিল জলাভূমির ওপর। যে কারণে সেই সময়ে ওখানকার বাড়িঘরের স্থায়িত্ব খুব বেশি হত না বলেই জানা গেছে। আজও সেই ঐতিহ্য নাকি বর্তমান। এখনও মেক্সিকোর জমি সেই অর্থে শক্ত নয়। অবশ্য প্রযুক্তির সহায়তায় এ সমস্যার সমাধান বর্তমানের অধিবাসীরা করে ফেলছেন অনেক পরিমাণে।

[তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট]

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s