শীত স্পেশাল- আমার বাবা-আরো কিছু মুহূর্ত চুমকি চট্টোপাধ্যায় শীত ২০১৭

এই লেখাটির আগের পর্ব এই লিংকে

গত  মার্চ ২০১৭র বসন্তের জয়ঢাকে বাবার ( স্বর্গীয় দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) সম্পর্কে  মনের গভীরে গেঁথে যাওয়া কিছু কথা তোমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলাম। আমার স্মৃতি তেমন একটা ভালো নয়। তবুও দাগ কেটে যাওয়া মুহূর্তগুলোর আরও  কিছু কথা শোনাই তোমাদের।

বাবা আদ্যান্ত নাস্তিক হওয়া সত্বেও বাড়িতে কালীপুজো করাতে না কেন বলতেন না, তা আগেই বলেছি। যারা পড়নি তারা টুক করে সংখ্যাটি পড়ে নাও। এই কালীপুজো কেন শুরু হয়েছিল জানো? আমিই বা কেমনধারা প্রশ্ন করছি দেখ! তোমরা কী করে জানবে? আমি বলছি শোনো। আমারও শোনা এই ঘটনা।

বাবাদের অর্থনৈতিক অবস্থা তখন খুবই খারাপ। চালের ফুটো দিয়ে বাবা ঘরে শুয়ে চাঁদ দেখতেন। বর্ষার সময় ঘরের চতুর্দিক দিয়ে টুপটাপ জল পড়ত। সেসময় কোন এক রাতে বাবার মা, ( দীনেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মা  স্বর্গীয় হেমপ্রভা চট্টোপাধ্যায়) স্বপ্ন দেখলেন, পটুয়াতলায় একটিমাত্র শ্যমাকালী মূর্তি অবিক্রিত রয়েছে কারণ সেই মূর্তির একটি হাত চিড় খাওয়া। মাতৃমূর্তি যেন বলছেন, ‘ আমাকে নিয়ে গিয়ে পুজো কর।’

পরদিন ভোর হতেই হেমপ্রভাদেবী লোক পাঠালেন পটুয়াতলায়। সে গিয়ে দেখে, সত্যিই একটিমাত্র কালীমূর্তি হাতে চিড় খাওয়া বলে অবিক্রিত রয়ে গেছে। সেই মূর্তি এনে পুজো করা হয় চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে। সেটা ছিল ১৯৩৯ সাল। তারপর থেকে সেই পুজো চলছে।

আগেই বলেছি, বাবা ছিলেন ঘোরতর নাস্তিক। একেবারে ছেলেবেলা থেকে এমন কিন্তু ছিলেন না। ভালোরকম ঈশ্বর বিশ্বাস ছিল ওঁর। বড় হয়ে মার্ক্সবাদে যখন আকৃষ্ট হলেন, তখন থেকেই সমস্ত কিছু যুক্তি দিয়ে বিচার করার মনোভাব জন্মাল। আর যেহেতু উনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে কোন যুক্তিগ্রাহ্য তথ্য পাননি, তাই বিশ্বাস থেকে সরে হয়ে গেলেন নাস্তিক।

বাবার সঙ্গে আমার নানারকম কথা হত। অমন রাশভারি মানুষটির সঙ্গে কথা বলতে ভয় লাগত না একটুও। তা এই ভগবান আছেন কি নেই সে প্রসঙ্গে কথা হতে হতে আমি জিগ্যেস করলাম, ‘ আচ্ছা বাবা, রামকৃষ্ণদেব সম্পর্কে তোমার কী ধারণা? উনি তো ভবতারিণী মায়ের সঙ্গে রীতিমত কথা বলতেন, খাওয়াতেন!’

খুব সুন্দর করে স্মিত হাসি হাসলেন বাবা। কোন শব্দ নেই সে হাসির, শুধু ঠোঁট দুটো এক কলা চাঁদের মতো হল। বললেন, ‘ দেখো মা, যে মানুষ একাধিক মানুষকে আকর্ষণ করতে পারেন, তার কিছু ক্ষমতা যে আছে, সে কথা স্বীকার করতেই হবে। ওঁর  সারল্য, জীবনবোধ, মানুষের মন বুঝতে পারার ক্ষমতা ইত্যাদি বহু মানুষকে আকর্ষণ করত। তুমি এখুনি আমাকে জিগ্যেস করবে বিবেকানন্দর বিষয়ে, তাই তো? এ এক দীর্ঘ আলোচনার বিষয়। নিশ্চয়ই বলব তোমাকে।’

‘আর ওই যে মাকালীর সঙ্গে কথা বলা আর খাওয়ানোর কথা বলছিলে, তার উত্তরে বলি, অনেকদিন ধরে যদি তুমি একই অসত্য কথা বার বার বলে যাও, এক সময় তোমার মনে হবে সেই অসত্যটাই সত্যি। ধরো তোমার কুড়ি বছর বয়েস। কিন্তু বার বার যদি তুমি বলো যে তোমার বয়েস পনেরো, একদিন দেখবে তুমি বিশ্বাস করছ যে তোমার বয়েস পনেরো। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল হ্যালুসিনেশন! দৃষ্টিভ্রম! বলেই হেসে উঠলেন হাহা করে। সে হাসি এক কলা চাঁদের মতো নয়, পুরোপুরি পূর্ণিমার চাঁদ। উদাত্ত, প্রাণখোলা।

বাবা ঠিক যেমনটি বলেছিলেন, আমি তেমনটিই বললাম। কিন্তু নিজে না মানলেও, অন্যের বিশ্বাসে আঘাত দিতেন না কখনো। তোমরা কিন্তু নিজেদের বোধবুদ্ধি দিয়ে বিচার করে তবেই কোন কিছু বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করবে।

বদলের স্বপ্ন দেখতেন বাবাও। বলতেন, ‘ শিক্ষাই একমাত্র পারে ভালোর দিকে বদল আনতে। ভারতবর্ষের প্রতিটা মানুষকে ন্যূনতম শিক্ষা না দিলে এ দেশের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। শুধু সরকার নয়, প্রতিটি শিক্ষিত নাগরিকের উচিৎ গরিব, অশিক্ষিত  ছেলেমেয়েদের দায়িত্ব নেওয়া। তোমার মাকে আমি এব্যাপারে স্যালুট জানাই।’

একটু পরিষ্কার করে বলি। সাধনা চট্টোপাধ্যায় মানে, আমার শাশুড়িমায়ের ( এইভাবে মা বলতে খুব খারাপ লাগে। তোমাদের বোঝাতে বললাম। এবার থেকে মনে রেখ নামটা।) এতটাই লেখাপড়া করার ইচ্ছে ছিল যে বড় ছেলের (দিলীপ চট্টোপাধ্যায়)সঙ্গে পরীক্ষা দিয়ে উনি গ্র্যাজুয়েশন করেছিলেন। ক্লাস এইটে পড়ার সময় বিয়ে হওয়াতে লেখাপড়ায় সাময়িক বাধা পড়েছিল।

যৌথ পরিবারের বড় বউ হয়ে আসাতে কিছু দায়িত্ব পড়েছিল কাঁধে। যৌথ পরিবার মানে বোঝ তো? জয়েন্ট ফ্যামিলি যাকে বলে। সে জয়েন্ট যে সে জয়েন্ট নয়! দু বেলা প্রায় ৫০ টা পাত পড়ত। শুধু কি নিজেদের লোক! তুতোর তুতো, ওপার বাংলার যশোরের পাইকড়া গ্রামের লোক, সকলেই থাকত। যশোরের পাইকড়াতেই বাবাদের আদি বাসস্থান ছিল কিনা, তাই সেখানকার মানুষজনকে আত্মীয় বলেই ধরে নেওয়া হত। সে এক হুলুস্থুল কাণ্ড। প্রতিদিন উৎসব!

যাঁর লেখাপড়ার খিদে আছে, সে খিদে আজ হোক, কাল হোক মাথা চাড়া দেবেই। একটু একটু করে এগিয়ে মা শেষ অবধি স্নাতক হলেন। বাড়িতে মাকে কাজে সাহায্য করতেন ননীবালা দাস নামে এক মাঝবয়েসী মহিলা। আমরা ডাকতাম ননীদি। প্রতিদিন সন্ধেবেলা মা ননীদিকে নিয়ে বসতেন পড়াতে। একটা স্লেট আর চক কিনে দেওয়া হয়েছিল। খুব ধৈর্য ধরে পড়িয়ে বছর খানেকের মধ্যে মা ননীদিকে স্বাক্ষর করে তুললেন। যেদিন ননীদি সই করে টাকা তুলেছিল, কেঁদে ফেলেছিল। কারণ তার আগে তো আঙুলের টিপছাপ দিয়ে সব কাজ চলত। ননীদির আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছিল অনেকটাই।

বাবার কী আনন্দ! বলেছিলেন, ‘ ননী, আর কেউ তোমাকে ঠকাতে পারবে না। তোমার মা ( ননীদি মাকে মা বলেই ডাকত) স্যালুট জানাবার মতো কাজ করেছেন।’

পড়াশোনার কথা যখন চলছে তখন আমার নিজের পড়ার প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলি। খুবই ছোট্ট একটা মুহূর্ত, কিন্তু আমাকে ছুঁয়ে গেছিল বলেই সযত্নে ধরে রেখেছি মনের জাদুঘরে। আমার বিয়ের চার-পাঁচ মাস বাদেই ছিল প্রথম সেমিস্টার। এমএসসি পড়ছি তখন। পরীক্ষার আর বারো চোদ্দ দিন বাকি। আমার তো কিছুই পড়া হয়নি। কলেজ থেকে বাড়ি ফিরেই কোনরকমে নাকে মুখে গুঁজে বসে যেতাম পড়তে। আর ছুটির দিনে তো ভোর থেকে টানা পড়তাম। শুধু স্নান খাওয়ার সময়টুকু উঠতাম। যদি টপকে যাই তাহলে শ্বশুরবাড়িতে মান সম্মান সব যাবে। অতএব প্রাণপন লড়াই করছি।

একদিন মন দিয়ে পড়ছি। তখন বিকেল। বাবা কখন এসে পেছনে দাঁড়িয়েছেন, বুঝতে পারিনি। মাথায় আলতো হাতের ছোঁয়াতে চমকে উঠে পেছন ফিরে দেখি, বাবা! আমাকে বললেন, ‘ যাও মা,  ছাদে একটা চক্কর দিয়ে এসো। একভাবে পড়ছ দেখছি। ফ্রেশ এয়ারে ঘুরে আসলে নতুন এনার্জি পাবে, আরও ভালো মন বসবে। হাত-পা গুলোও ছাড়বে। পরিশ্রম করছ, ভালো ফল পাবে। চিন্তা নেই।’ সেদিনও চোখে জল এসেছিল, এখনও এল।

কত ছোট ছোট মুহূর্ত মনে পড়ছে, গুছিয়ে বলতে পারছিনা ঠিক। যেমন এখুনি মনে পড়ল দু চারটে সোজাসাপ্টা কথা যা আমার কাছে অমূল্য। নতুন বউ হয়ে এসেছি। মা বললেন, ‘বাড়ির যারা বড় পুরুষমানুষ, তাদের সামনে একটু ঘোমটা দিও। নতুন বউ তো!  পরে আর দিতে হবে না।’

মায়ের কথামতো ঘোমটা দিয়ে বাবার সামনে গেছি। বাবা তাকিয়ে বললেন, ‘ এ কী! ঘোমটা দিয়েছ কেন?’ পেছনে মা ছিলেন। বললেন, ‘ নতুন বউ,  ঘোমটা…’

কথা শেষ করতে দিলেন না বাবা। জোরে বলে উঠলেন, ‘ধুত্তোর নিকুচি করেছে নতুন বউ! ও আমাদের মেয়ে। খোল ঘোমটা। আর কখনো দেবে না ওসব।’

          পড়া প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল আর এক পড়ার কথা। সেই পড়া হল খবরেরে কাগজ পড়া। বাড়িতে অন্যান্য কাগজের সঙ্গে গণশক্তি আসত। এখনও আসে। বাবার সব থেকে প্রিয় কাগজ ছিল গণশক্তি। খুঁটিয়ে পড়তেন। আমি সে সময় পড়াশোনা করার ফলে কাগজ পড়ার তেমন ফুরসত পেতাম না। যেটুকু পড়তাম, সেটা গণশক্তি নয়। বাবা লক্ষ করেছিলেন।

একদিন বললেন, ‘ আচ্ছা মা, তুমি গণশক্তি পড় না কেন? ওতে সব সঠিক খবর থাকে।’

অসীম সাহস ভর করল আমাকে। বলে দিলাম, ‘যে কাগজ শুধু একটা রাজনৈতিক দলের সব কাজ ভালো বলে প্রচার করে, আর অন্যদের সবই খারাপ, সে কাগজ আমি পড়ি না।’

এ কথা বলার পরই মনে হয়, সব্বোনাশ! কী বললাম! ভাবতে ভাবতেই হো হো হাসিতে ভরে যায় ঘর। বাবা হাসছেন।

একটা মজার ঘটনা বলে আপাতত শেষ করছি। একদিন একজন ভদ্রলোক বাড়িতে এসেছেন। বাবা কথা বলছেন তাঁর সঙ্গে। আমাকে ডাকলেন। বললেন,  ‘ও হচ্ছে আমার সম্পর্কিত ভাই। ওকে আমরা ঘ্যাদন বলে ডাকি। ও কিছু কবিতা লিখেছে, তুমি সময় করে একটু পড়ে দেখো।’

ঘ্যাদনকাকা বললেন, ‘ বড়দা, আমি দু একটু শোনাই আপনাকে? ‘

বাবা সম্মতি দিলেন।

পাঁচালির সুরে ঘ্যাদনকাকা পাঠ করতে শুরু করলেন ওঁর লেখা কবিতা। মিনিট দুয়েক পাঠের পর বাবা বললেন, ‘ হয়েছে, বুঝেছি। তুই দিয়ে যা। চুমকি দেখে নেবে’খন।’

আমি লক্ষ করলাম বাবার কান লাল হয়ে উঠেছে। বুঝলাম বাবা খুব কষ্ট করে হাসি চেপেছেন। আমার অবস্থা তো বাদই দাও। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

ঘ্যাদনকাকা চলে গেলে পরে বাবা বললেন, ‘শোন মা, ফেলে দাও এই সব জঞ্জাল। নিজেও সময় নষ্ট করে, অন্যেরও সময় নষ্ট করে এরা। আক্কেল আর হল না জীবনে।’

আমি তো হো হো করে হেসে উঠেছি। বাবাও যোগ দিলেন তাতে।

হাসি দিয়ে শেষ করি, কী বলো? আবার শোনাব বাবার কথা কোন এক সময়। সবাই ভালো থাকো।

টাইটেল গ্রাফিক্‌স্ঃ ইন্দ্রশেখর

চিত্রসৌজন্যঃ লেখক

এই লেখকের আরো লেখা  শুদ্ধ ভক্তের ঘড়ি  শরৎ ২০১৬ভগবানের বেটা বেটি, শরৎ ২০১৭

Advertisements

2 Responses to শীত স্পেশাল- আমার বাবা-আরো কিছু মুহূর্ত চুমকি চট্টোপাধ্যায় শীত ২০১৭

  1. Puspen Mondal says:

    খুব ভালো লাগল দিদি।

    Like

  2. saptastar says:

    জীবন্ত বর্ণনা বরাবরের মতই। ছবির মত স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে এভাবেই সেই মানুষটির ব্যক্তিত্ব।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s