সন্ধ্যা ভট্টাচার্য সাহিত্য প্রতিযোগিতা ২০১৯ প্রথম স্থান- রাজা, এক জাদুকরের গল্প ইমন চৌধুরী শীত ২০১৯

রাজা – এক জাদুকরের গল্প

ইমন চৌধুরী 

(১)

পালক একটা জন্মান্ধ কুকুরের নাম৷ পালকের চোখ ফোটেনি, যেখানে অক্ষিকোটর থাকার কথা ওর সেখানে সাদা লোম আছে, দেখে মনে হয় ওর দুটো চোখ একমুঠো সাদা পালক দিয়ে ঢাকা, তাই ওর নাম পালক। সাধারণত পালকরা বাঁচে না, থিদে তৃষ্ণা নিয়ে জন্মের পরে পরেই মারা যায়, জন্মানো মাত্র পালকের সামনেও এক যন্ত্রণাময় মৃত্যু এসে দাঁড়িয়েছিল।

পালক মরেনি শুধুমাত্র রাজার জন্যে। রাজা পালককে বাঁচিয়ে রেখেছে। প্রতিমুহূর্তে পালকের একজন সঙ্গী প্রয়োজন হয়, যে ওকে পথ চিনিয়ে দেবে, খাইয়ে দেবে, বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগাবে। রাজা পালকের সেই চিরদিনের সঙ্গী। রাজার মা লক্ষী আমাদের বাড়িতে কাজ করত৷

এসব সেই সময়কার কথা যখন আমি ইস্কুলে পড়ি, ক্লাস ফাইভ। রাজা আমার চেয়ে বছরখানেকের বড়ো।  রাজা বেড়ে উঠছিল নর্দমার পাশের টালির চালের বস্তীতে আর আমি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের মধ্যে। সেই বয়সে আমি এই দুই ঘরের মধ্যে মধ্যে তফাৎ বুঝতাম না, হয়ত সেজন্যেই রাজা আমার বন্ধু ছিল, প্রথম বন্ধু।।

তখন আমরা যে বাড়িটায় থাকতাম, সে বাড়িতে একটা বড়ো বাগান ছিল, বিকালে আমরা তিনজন অর্থাৎ আমি রাজা আর পালক ওই বাগানে খেলতাম। মনে পরে একটা বড়ো আমগাছ ছিল বাগানে, কলমের গাছ, আলফানসো, বাবা লাগিয়েছিল। সেই গাছের নিচু ডালে পা ঝুলিয়ে বসে কত কথায় ভাবতাম সেই দিনগুলোতে, সোনালী ভবিষ্যতের চিন্তায় মশগুল থাকতাম আমরা, জীবনে কত কী যে হওয়ার ইচ্ছে ছিল আমার… বড়ো হয়ে আমি পাইলট হব, কোনদিন ভাবতাম না বিজ্ঞানী অথবা ক্রিকেটার… আমার ইচ্ছেগুলো ঘণ্টায় ঘণ্টায় বদলে যেত।

তবে রাজা আমার মত ছিল না, ওর ইচ্ছে চিরদিনই নির্দিষ্ট, রাজা। জাদুকর হবে, মস্ত জাদুকর। রাজা জাদু জানত, সেই বয়সেই ও চোখের নিমেষে লাল জলকে নীল করে দিতে পারত, আমাকে চোখ বন্ধ করতে বলে মুহূর্তের মধ্যে পকেট থেকে বের করে আনত জ্যান্ত পায়রা। পালক পাশে বসে কান খাড়া করে আমাদের কথা শুনত। রাজা বলত, পালক সব বোঝে, বলত যেদিন ও প্রথম স্টেজে উঠে জাদু দেখাবে সেদিন মঞ্চে পালককে ও সঙ্গে করে নিয়ে যাবে।

এসব সময়ে আমার রাজাকে খুব দূরের কেউ বলে মনে হত, যেন আমি ভাগ্যের জোরে ওর সঙ্গ পেয়েছি, একদিন ও অনেক দূরে চলে যাবে, তখন আমি আর চেযেও রাজাকে ছুঁতে পারব না।

আমি রাজাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম, ডোরাকাটা জামা, কোমরে লাল দড়িতে মাদুলি বাঁধা, গায়ের রঙ চাপা, চ্যাপটা নাক। রাজা ট্যারা ছিল কিন্তু সারাদিন ওর সঙ্গে থাকতাম বলে আমি বুঝতে পারতাম ও কখন কোনদিকে চেয়ে আছে। মনে দুর্ভাবনা হত কেবল, একদিন রাজাকে আমি হারিয়ে ফেলব, সেই শৈশব থেকেই থেকেই আমার মধ্যে রাজাকে হারানোর ভয় ছিল।

কোনো জাদু শিক্ষক এসে রাজাকে জাদু শিখিয়ে যায়নি, ও লেখাপড়া জানত না, কোথা থেকে শিখত মায়ার খেলা কেউ জানে না। জিজ্ঞেস করলে রাজা পালককে দেখাত, ওকে নাকি সবকিছু পালক শিখিয়েছে।

আমি বিশ্বাস করতাম না রাজার কথা। আমার মনে হত রাজা বলতে চায় না, ওর শিক্ষারহস্য আমার কাছে গোপন রেখে দিতে চায়। আমি রাজাকে হিংসে করতাম, ভালোবাসতাম। আমগাছের তলায় রাজার প্রতিদিনের নিত্যনতুন জাদুর সাক্ষী থাকতাম আমি আর পালক, আর কেউ না। কেউ কখনো জানতেই পারেনি যে রাজা জাদু দেখায়, কেউ কখনো জানতে পারেনি হাসতে হাসতে কেমন সহজে রাজা সবুজ রুমাল থেকে সত্যি বিড়াল বের করে আনতে পারে।

রাজা আমার শৈশবের সুপারস্টার ছিল। মনে পড়ে বাড়ি যাওয়া আগে গম্ভীর মুখে রাজা বলত, “জানিস জীবনের চেয়ে বড়ো কোন জাদু নেই, আজকে যা জীবন কালকে তাই মৃত্যু, এই আছে এই নেই।”

খুব ছোটোবেলা রাজার বাবা মারা গিয়েছিল। মৃত্যুকে অত কাছ থেকে দেখেছিল বলেই বোধহয় ও এমন উপলব্ধি করতে পেরেছিল। আমার সুখী ঘরে জন্ম, আমি অত ভারী ভারী কথা বুঝতাম না। রাজার আশ্চর্য সব জাদু দেখে সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে সিঁড়িভাঙার অঙ্ক করতে বসে সাদাপাতার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতাম। মা ধমক দিলে আমি বোকার মত কেঁদে ফেলতাম। আমি বুদ্ধিমান নই, পড়াশোনাটা আমার তেমন আসে না কোনোদিন।  জীবনে আমি যত সুযোগ পেয়েছি তার কণামাত্র যদি রাজা পেত! জীবনের জাদু খেলায় পয়সার উল্টো পিঠে রাজার নাম লেখা ছিল। তাই রাজার কোনদিন ইস্কুলে যাওয়া হয়নি।

যত দিন যাচ্ছিল রাজার জাদুগুলো ততই বদলে যাচ্ছিল। দিনেদিনে ও এমন সব জাদু দেখাচ্ছিল যার সত্যিই কোন ব্যাখ্যা হয় না, যা আগে কেউ কখনো দেখায়নি। মাঝেমাঝে আমি ওকে ভয় পেতাম, মনে হত ও বুঝি মানুষ নয়! বৃষ্টির দুপুরে আমগাছের ডাল থেকে পিছল থেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম আমি। ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ছে। যন্ত্রণায় আমি কেঁদে ফেলেছি। পালকের অনুভূতি খুব প্ৰবল। ও আমার যন্ত্রণা বুঝতে পেরে আমার পায়ের কাছে এসে কুঁইকুই শব্দ করছে। তখন রাজা মুহূর্তে গাছ থেকে নেমে এসেছিল।

“দেখি আমার দিকে তাকা…”

আমি কান্নাভেজা চোখে মাথা তুলে চাইতেই রাজা আমার ঠোঁট স্পর্শ করল। 

সেইদিনই প্রথম আমি বুঝতে পেরেছিলাম রাজা সত্যিই আর সাধারণ নেই। চিরকাল আমি যে আশঙ্কা করতাম সেই আশঙ্কা এবারে সত্যি হয়ে উঠছে! রাজা এখন ধীরে ধীরে দূরের নক্ষত্র হয়ে যাচ্ছে। এই আমগাছের ছোট্ট ছায়ার মধ্যে আমি আর ওকে ধরে রাখতে পারব না। এবারে ও এই গণ্ডী কেটে বেরিয়ে যাবে।

সেদিন আমরা তিনজন বৃষ্টির মধ্যে আমগাছের তলায় সন্ধে অবধি বসেছিলাম। বৃষ্টির জলের মধ্যে থেকে রাজা অশ্রুকে পৃথক করতে পারত। ও বুঝতে পেড়েছিল আমি কাঁদছি। আমাকে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলেছিল, “পাগল তুই, তোকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না দেখিস!”

কী করে যেন রাজা আমার মনের কথা ঠিক বুঝে যেত। জাদুকররা বোধহয় এরকম পারে। মনে পড়ে কোনো এক রবিবারের সকালে লুকোচুরি খেলার ফাঁকে রাজাকে বলেছিলাম “পালককে দুটো চোখ দে না রে রাজা!”

রাজা আমার কথা শুনে হেসে উঠেছিল, “ও চোখ চায় না যে!”

পালককে আদর করতে করতে রাজা ওকে জিজ্ঞেস করে, “কী রে পালক তুই চোখ চাস?”

পালক রাজার কথা শুনে লজ্জা পেয়েছিল। ওর কোলের ভিতর মুখ লুকিয়ে চুপটি করে বসে ছিল। পালকটা ওমনিই এক লাজুক আর ভীতু কুকুর। কোনোদিন ওকে চিৎকার করতে দেখিনি।

রাজা বলত পালক কথা বলতে পারে। যখন রাজা পালকের সঙ্গে একা থাকে তখন নাকি পালক ওর সঙ্গে গল্প করে।

“কী গল্প করিস তোরা রাজা?”
“একটা দ্বীপের গল্প।”
“দ্বীপ?”
“হ্যাঁ, একটা সবুজ দ্বীপ।”
“কী আছে ওই দ্বীপে?”
“বেশি কিছু নেই। একটা কুকুর আছে, আর একটা মানুষ।” 
“ব্যাস?”
“হ্যাঁ, আর কিছু নেই।”
আমার মন ভরে না। আমি যে আরও অনেক কিছুর প্রত্যাশা করেছিলাম! রাজা আমার মনের কথা বুঝতে পারে, “ওই একটা কুকুর আর একটা মানুষ কিন্তু সাধারণ নয়।”
“তবে?”
“ওরা উড়তে পারে।”
“উড়তে পারে?”
“হ্যাঁ, জানিস ওই দ্বীপে খিদে নেই, তাই ওই একটা মানুষ আর একটা কুকুরের কোন চিন্তাও নেই, সারাদিন সারারাত ওরা ইচ্ছে মত উড়ে বেড়ায়…”

আমাদের তিনজনের চোখের সামনে একটা সমান্তরাল বিশ্ব তৈরি হয়। এমন এক পৃথিবী যার নিয়মগুলো রাজা তৈরি করেছে।

খুব ঠাণ্ডা পড়েছিল সেবারে। আমার পক্স হয়েছিল বলে ঘরে বন্দী ছিলাম পনের দিন। প্রথম যেদিন বাইরে যাওয়ার অনুমতি পেলাম সেইদিনই রাজা আর পালক এসে আমাকে নিয়ে গেল সেই আমগাছটার কাছে।

সেই ছিল আমার সঙ্গে রাজার শেষ দেখা। সেইদিন রাজা আমাকে একটা নতুন জাদু দেখিয়েছিল। জাদু নয়, মায়া। রাজা আমগাছের সবচেয়ে উঁচু ডালটা থেকে দুই হাত প্রসারিত করে লাফ দিয়েছিল। আমি বিস্ময়ে অভিভুত হয়ে দেখছিলাম ওকে। রাজা পড়ে গেল না। বরং শূন্যে ভাসমান হয়ে রইল। সেই প্রথম এবং শেষবারের মত আমি রাজকে উড়তে দেখেছিলাম।

রাজা আমাকে দিয়ে শপথ করিয়ে নিয়েছিল এসব কথা আমি কাউকে কখনো বলব না। বলিনি। আমি মায়ের নামে দিব্বি কেটেছিলাম। তখন আমাদের কাছে শপথ মানেই ছিল দিব্বি কাটা।

আজ ভাবি কেন রাজা নিজেকে আড়ালে রাখতে চেয়েছিল? হয়ত ওর ইচ্ছে ছিল হঠাৎ একদিন পৃথিবীর সামনে আত্মপ্রকাশ করে সকলকে চমকে দেওয়ার। 

***

লক্ষী টানা সাতদিন কাজ করতে আসেনি। সাতদিনের টাকা ওর মাইনে থেকে কেটে নেওয়া হবে, কিন্তু ও তো এমনটা করে না কখনো! কোথায় গেছে, কী হয়েছে, কেউ জানে না।

রবিবার সকালে আমি আর বাবা গাড়ি করে ওদের বস্তিতে গেলাম। বাবা এদিকে আগে কখনো আসেনি। বরং আমি রাজার সঙ্গে ওদের বাড়িতে এসেছি কয়েকবার, আজ আমিই বাবার পথপ্রদর্শক। একটা ধ্বংসস্থূপ। ভেঙে পড়া টালির চাল, কিছু টিনের পাত্র, প্লাস্টিকের মগ, ভাঙা মাটির কলসি, ছেঁড়া শাড়ি। একটু দূরে ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে, একটা ঘরও আস্ত নেই। রাস্তার পাশে দুটো বুলডোজার চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

রাজাদের বাড়িটা আমি চিনতাম। সামনে গিয়ে বাঁদিকে ঘুরলেই ওদের বাড়ি। বাবাকে ছেড়ে আমি একাই যাই সে দিকে।

একটা ছেঁড়া মাদুর আর একটা বালিশ পড়ে আছে। ফেটে যাওয়া বালিশটা থেকে স্যাঁতস্যাঁতে কালচে তুলো বেরিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে আছে। একটু দূরে একটা ছেঁড়া সবুজ কাপড়। রাজা ম্যাজিক দেখানোর সময় ওই কাপড়টা ব্যবহার করত। ওই সবুজ কাপড়ের আড়াল থেকেই পায়রা উড়ে আসত।

কিছু না ভেবেই ধ্বংসস্তুপের মধ্যে থেকে আমি কাপড়টা তুলে নিয়েছিলাম। আমি ভয় পেয়েছিলাম। বাবার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেছিলাম। রাজা কোথায়? ওরা কি সবাই জেনে গেছে রাজা সাধারন নয়? তাই কি সব জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে? ওরা কারা?

একটু দূরে দুটো মানুষ শূন্যদৃষ্টিতে আমাদের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। পরনে লুঙ্গী, খালি গা, কঙ্কালসার চেহারা। যারা সুখী তারা ওদের দিকে চোখে চোখ রেখে তাকাতে পারে না। আমার বাবা ভয় পেয়েছিল। ওরা নিজে থেকেই আমাদের দিকে এগিয়ে এসেছিল। আমি ওদের চিনি না। কিন্তু ওরা আমাকে চেনে। এই গলিতে ওরা আমাকে রাজার সঙ্গে আগেও দেখেছে। ওরাই বলেছিল, এই বেআইনি বস্তি গুঁড়িয়ে দিয়েছে নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধি। এখন এ জমিতে বহুতল আবাসন তৈরি হবে।

ফিরতি পথে আমার বাবা পার্শ্ববর্তী আর এক বস্তি থেকে অন্য এক লক্ষ্মীর সঙ্গে দরদাম করে নিয়েছিল। দেখা গিয়েছিল নতুন লক্ষ্মীর দাম পুরনো লক্ষ্মীর চেয়ে মাসে একশ টাকা কম। সাশ্রয়ের খবরে মা খুশি হয়েছিল।

এই ঘটনার প্রায় একমাস পরে রাত্রে ডিনার টেবিলে বাবা মাকে বলে, “একটা ফ্ল্যাট কিনবে নাকি?”

বাবা জানত মায়ের একটা ফ্ল্যাটবাড়ির খুব শখ। তারপর দুটো বছর কেটে গেছে। আমরা বাড়িবাগান বিক্রি করে ফ্ল্যাটে উঠে এসেছি। আমাদের ফ্ল্যাট চোদ্দতলা। যেখানে আমাদের গ্যারাজ, সেইখানেই ছিল রাজাদের চালাঘর। সেদিনের পর গত দু’বছরে আমি আর কখনো রাজাকে দেখতে পাইনি, আমার মনে হয় ও হয়ত সেই দ্বীপটার সন্ধান পেয়ে গেছে, রাজা আর পালক চলে গেছে সেখানে। আমাকে নিয়ে যায়নি রাজা, এই খিদে তৃষ্ণার পৃথিবীতে আমাকে একলা ফেলে রেখে গেছে।

এখন আমার আর অফুরন্ত অবকাশ নেই, তবু ছুটির দিনে কখনো সখনো আমি আমাদের পুরনো বাড়িটার দিকে যায়, বাড়ির নতুন মালিক আলফানসো গাছটা কেটে ফেলেছে, ওখানে এখন ফুলের বাগান, শীতকালে চন্দ্রমল্লিকা আর ডালিয়া ফুটে থাকে।  রাজা নেই। আমার পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। 

(৩)

ইস্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে আমি কলেজে এসেছি। আমার জীবন থেকে জাদু হারিয়ে গেছে। জীবনটা শুকিয়ে যাচ্ছে। আমি রাজাকে ভুলতে পারিনি। দৈনন্দিন একঘেয়ে জীবনের মধ্যে রাজা আর পালক আমার কাছে একটা সবুজ দ্বীপ হয়ে রয়ে গেছে, যে দ্বীপে আমি কখনো পৌঁছাতে পারব না।

আমার সেই বিকালটার কথা খুব মনে পড়ে, রাজা যেদিন আম গাছ থেকে লাফ দিয়ে মাটি থেকে অনেক উপরে শূন্যে ভেসে ছিল, ভাসতে ভাসতে নীচে নেমে এসেছিল। সেসব কথা আজ আর কেউ বিশ্বাস করবে না। আমার নিজেরও অবিশ্বাস্য লাগে। রাজা কি মানুষকে সম্মোহন করতে পারত?

স্কুলে থেকে কলেজ, এই দীর্ঘ জীবনপথে আমার আর কোন বন্ধু হয়নি। রাজা আমার প্রথম বন্ধু ছিল, রাজাই শেষ বন্ধু। আমি এখন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। কলেজে আমি শেষ বেঞ্চিতে একা বসে থাকি। সেমেস্টারে টেনেটুনে পাশ করি। আমি বুঝি, আমি হেরে যাচ্ছি। তবু আমি চোখ বন্ধ করে থাকতেই ভালোবাসি। আমার পালকের কথা মনে পড়ে। বোধহয় পালকের মতই আমিও রাজার উপর নির্ভর করে জীবন বৈতরণী পার হতে চেযেছিলাম।

আজকাল কেউ আমার সঙ্গে কথা বলতে এলে আমি কেমন কুঁকড়ে যাই। লজ্জা? নাকি ভয়? রাতের অন্ধকারে আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। এত উঁচুতে কোন শব্দ আসে না। শুধু আলো আসে। সারা শহর জুড়ে বিন্দুবিন্দু আলো। তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে আমার মনে হয় ওই আকাশেই হয়ত আবার কোনদিন রাজাকে দেখতে পাব। রাজা আর পালক চোদ্দতলায় আমার এই জানালার সামনে আসবে। রাজা আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলবে, “পাগল তুই, তোকে ছেড়ে আমি কোথাও কখনো যাবো না…”

বেশ বুঝতে পারি রাজা আর পালকের হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া আমার জীবনটাকে চিরদিনের জন্যে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে পড়াকালীন আমার একটা মেয়েকে ভালো লেগেছিল। ইপ্সিতা, আমার ব্যাচমেট, ইলেক্ট্রিক্যাল। সারারাত জেগে একটা তিনপাতা চিঠি লিখেছিলাম, ওর বাড়ি যাওয়ার পথে শিমুল গাছের তলায় দাঁড়িয়েছিলাম। এর আগে আমি কথনো মেয়েদের সঙ্গে এমন করে একা একা কথা বলিনি। ইপ্সিতা ওর আরও দুই বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরছিল।

‘ইপ্সিতা…”

ও এগিয়ে আসে। 

কোনোদিনই আমি বেশি কথা বলতে পারিনা, পকেট থেকে রঙিন কাগজ বের করে ওর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলাম, ইপ্সিতা সেই মুহূর্তে হেসে ফেলেছিল। ওর এমন প্রেমপত্রে অভ্যেস ছিল। আমি শিমুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে দেখতে থাকি, রাস্তায় ইপ্সিতা ওর বন্ধুদের সঙ্গে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে, তিনজনে একসঙ্গে চিৎকার করে আমার চিঠি পড়ছে।

পরের দিন আমাদের ক্লাসরুমের দেওয়ালে আমার চিঠির জেরক্স আটকানো ছিল। সেই থেকেই আমি কলেজে পরিচিত মুখ। আড্ডার জটলা থেকে কলেজের ছেলেমেয়েরা আমাকে প্রেমপত্র বলে ডাকে। রাজা নেই, রাজা থাকলে আমি ওদের জবাব দিতে পারতাম। 

আমি খুব করে একটা চাকরি চেয়েছিলাম। কোন নতুন শহরে নতুন মানুষদের মাঝে একটা নতুন শুরুর প্রয়োজন ছিল আমার, যেখানে আমার কোন অতীত থাকবে না। কলেজের ফোর্থ ইয়ারে খুব পড়াশুনাও করেছিলাম চাকরির জন্যে, হয়নি। যেদিন ক্যাম্পাসিং-এর শেষ ইন্টারভিউতে বিফল হয়ে কলেজ থেকে ফিরছিলাম, সেদিনই ইপ্সিতার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ইপ্সিতা তিনটে চাকরি পেয়েছিল। তিনটে অফার লেটার রিজেক্ট করে ইপ্সিতা নেদারল্যান্ড যাচ্ছে এমএস করতে। আমি জানি এসব খবর, গোটা কলেজ জানে। ইপ্সিতাকে দেখলেই আমি মাথা নামিয়ে নি। সেই চিঠি দেওয়ার দিন থেকেই ওর দিকে তাকাতে লজ্জা করে আমার।

ইপ্সিতা আজ নিজে থেকেই আমার সঙ্গে কথা বলে, “কী রে এবারেও হল না?”

পৃথিবীতে কেউ কেউ এত নিষ্ঠুর কেন হয় ঠাকুর? কেন কিছু মানুষ অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়? মা বাবা অনেক বছর আগেই আমাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছে, আমার ব্যর্থতা ওদের আর নতুন করে অবাক করে না। কোন সুদূর শৈশবে গাছ থেকে পড়ে আমার ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরিয়েছিল। রাজা হাতের ছোঁয়ায় আমার রক্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। বৃষ্টির জলের মধ্যে আমার ওই একমাত্র অশ্রুকে আলাদা করে চিনে নিয়েছিল। তারপর থেকেই আমি একা, নিঃসঙ্গ।

“আমি ভালো নেই…” আমার এটুকুই বলার ছিল। কেউ নেই। আমার এসব প্রলাপ শোনার মত একটা মানুষও নেই এই বিশাল পৃথিবীতে। গভীর রাত এখন, আজও বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ জুড়ে কালো মেঘ। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ছোটোবেলা মা বিদ্যুতকে বলত ইন্দ্রের বজ্র। আজ আমি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছি। হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁয়ে দেখছি। এই বারান্দা থেকে দেখা যায় আমাদের হাউসিং। ক্যাম্পাসের গেটটা, অঝোর বৃষ্টির ধারা গেটের হলুদ আলোটাকে ঝাপসা করে দিয়েছে। ওই গেটের পাশে একটা বড়ো নিম গাছ আছে। ওই গাছের গোড়াতে পালক জন্মেছিল।

আমি বারান্দার গ্রিলের উপর উঠে দাঁড়াই। দুহাত ছড়িয়ে দি। অনেক বছর আগে আমগাছটার সবচেয়ে উঁচু ডালে উঠে রাজা এমনটাই করেছিল। আমি আকাশের দিকে মুখ করে চোখ বন্ধ করি। আমার চোখের পাতায় বৃষ্টির জল পড়ছে, জলের সঙ্গে আমার অশ্রু মিশে যাচ্ছে…

এক, দুই, তিন… তলিয়ে যাচ্ছি, সীমাহীন অন্ধকারে মিশে যাচ্ছি আমি। দ্রুত শেষ হচ্ছে মুহূর্ত…

…শেষ হয় না, শেষের ঠিক আগের মুহূর্তে আমি স্থির হয়ে যাই, মাটির কাছাকাছি এসেও আমার শরীর মাটি ছোঁয় না। কানের কাছে একটা অতিপরিচিত স্বর হঠাৎ ডেকে বলে, “তোকে ছেড়ে আমি কখনো কোথাও যাব না…”

তারপর আমরা ভাসতে থাকি৷ আমরা তিনজন, আমি রাজা আর পালক। আমি রাজাকে জড়িয়ে ধরে আছি। অবাক হয়ে দেখছি রাজার বয়স বাড়েনি, পালকও ঠিক আগের মতন আছে। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে আমরা আকাশপথে পেরিয়ে যাই আমাদের আবাসন, চেনা গলি। ওই তো দেখা যাচ্ছে হাওড়া ব্রিজ!

ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করি, “কোথায় যাচ্ছি আমরা রাজা?”

শহর ঘুমিয়ে পড়েছে, গঙ্গার কালো জলের উপর একটা নৌকা ভাসছে, মাঝি দাঁড় বাইছে। কী একটা গান গাইছে ও। ওর গানের কথাগুলো বৃষ্টির আওয়াজে মিশে অস্পষ্ট হয়ে গেছে। শুধু সুরটা ভেসে আছে।

আমরা ওর নৌকায় গিয়ে বসি। অনেক বছর পরে আমরা তিনজন মুখোমুখি।

“রাজা তুই কোথায় ছিলি এতদিন?”
“তুই জানিসই তো…”
“কোথায়? সেই সবুজদ্বীপে?”
“হ্যাঁ… সবুজদ্বীপ…” 
“আমাকে নিয়ে গেলি না কেন? আমি যে এত বছর ধরে অপেক্ষা করছি…”
রাজা কিছু বলে না, হঠাৎ গম্ভীর হয়ে পালককে বুকে তুলে নিয়ে আদর করতে থাকে। আমি আবার জিজ্ঞেস করি,  “কী রে? বল কেন নিয়ে গেলি না?”
তখন খুব জোরে বিদ্যুৎ চমকায়। পালক রাজাকে আঁকড়ে ধরে।
“তুই কী করে যাবি ওখানে?”
“তুই যেতে পারলে আমি পারবো না কেন?”
“তুই যে ভালো আছিস! কষ্ট না পেলে সবুজদ্বীপে যাওয়া যায় না।”
“আমি ভালো আছি? কতটা কষ্ট পেলে তবে যাওয়া যায় রাজা তর সবুজদ্বীপে?”
রাজা হাসে। উত্তর দেয় না। আমার কান্না পাচ্ছিল। পালক আমার কোলে এসে আমাকে আদর করে।
“কোথায় যাচ্ছে এই নৌকা রাজা?”
“কোথাও যাবে না। ভাড়ার নৌকা। বৃষ্টির রাতে তোকে অন্ধকারে গঙ্গায় ঘোরাবো বলে ভাড়া করেছি।”
“আমি কি বেঁচে আছি রাজা?”

রাজা হাসে, পালক হাসে, নৌকার মাঝিও হেসে ওঠে। রাজা আমার কানের কাছে মুখ এনে বলে, “শুধু তুইই বেঁচে আছিস। বেঁচে থেকে কী সুখ তা তুই জানিস না রে! যদি তোকে বোঝাতে পারতাম কখনো…” 

ভোররাতে রাজা আর পালক আমাকে নামিয়ে দিয়ে যায় আমার চোদ্দতলার বারান্দায়। আমি ওদের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখি, পুরনো বইয়ের তাক থেকে বের করে আনি রাজার হারিয়ে ফেলা সবুজ রুমাল। রাজা সে রুমালের গন্ধ শোঁকে। ওর জীবনের কথা মনে পড়ে। আমাকে সে ওই রুমাল ফেরত দিয়ে যায়, বলে একদিন ও নিজের রুমাল ফিরিয়ে নেবে, কিন্তু আজ নয়। সে অন্যদিন। যেদিন আমার সময় হবে, ওই মাঝির সঙ্গে নৌকা করে রাজার দ্বীপে যাওয়ার। সেদিন এই রুমাল দেখে রাজা ঠিক আমাকে চিনে নেবে।

রাজা আর পালক আমাকে বিদায় জানিয়ে চলে যায়। আমি বাঁচতে থাকি… এক দীর্ঘ জীবন পড়ে আছে আমার সামনে। যেখানে আমার ব্যর্থতা নেই, সাফল্য নেই, শুধু পড়ে আছে অনন্ত আনন্দের জীবন। আমি সুখে আছি। জীবন বড়ো সুখের। আমাকে আমার রাজা বলে গেছে। আর কোন দুঃখ নেই আমার। থাকতেই পারে না। 

আমি নতুন করে জাদুতে বিশ্বাস করতে শুরু করি। ভোরের আলো ফুটছে এখন। রাজা এতক্ষণে নিশ্চয় ওর সবুজ দ্বীপে ফিরে গেছে। ভেসে বেড়াচ্ছে ওখানে রাজা আর পালক। একদিন আমিও যাবো সেই দ্বীপে। আজ নয়, অন্য কোন দিন।

বৃষ্টি থেমে গেছে, আকাশে আজ এতটুকু মেঘ নেই। বারান্দা থেকে উঠে এসে আমি খাতা পেন নিয়ে বসি, একটা গল্প লিখতে হবে আমায়, রাজার গল্প। শুধু রাজা নয়, রাজা পালক আর আমার গল্প। 

অলঙ্করণঃ স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

2 Responses to সন্ধ্যা ভট্টাচার্য সাহিত্য প্রতিযোগিতা ২০১৯ প্রথম স্থান- রাজা, এক জাদুকরের গল্প ইমন চৌধুরী শীত ২০১৯

  1. Manisha বলেছেন:

    Such a great news.. Congratulations ❤️

    Like

  2. রুমেলা দাস বলেছেন:

    খুব সুন্দর

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s