সন্ধ্যা ভট্টাচার্য সাহিত্য প্রতিযোগিতা ২০২০ অষ্টম স্থান-সেই রাতে অয়ন রাহা বসন্ত ২০২০

সন্ধ্যা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা’২০১৯। অষ্টম স্থান

সেই রাতে

অয়ন রাহা

একটা তিন কোনা পাথরের উপর আসনপিঁড়ি হয়ে বসে ছিল বলরাম। দু’পাশ দিয়ে দুটো নদী এসে মিশেছে সামনে। ডানদিকের নদীটার জল সবুজ আর বাঁদিকেটার ধূসর। প্রবল বেগে দুই নদীর জল একে অপরের উপর আছড়ে পড়ছে। ধূসর নদীর জোর বেশি। তার প্রতাপে সবুজ নদীর জল কিছুটা কোণঠাসা। অবশ্য খানিক দূরে গিয়ে দিব্যি তারা মিলেমিশে এগিয়ে চলেছে। দু’পাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ঘন সবুজ পাহাড়। যেন পাহারাদার দৈত্য। যদিও উচ্চতায় এরা নেহাতই বামন। উত্তরমুখী পর্বতগুলো আরও অনেক উঁচু। এতটাই উঁচু যে মাথা ঢেকে যায় মেঘে।

মনখারাপ হলে এখানে চুপটি করে বসে থাকে বলরাম। মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। মা বলত, এই নদীরা দুই বোন। ভাগীরথী আর মন্দাকিনী। ওরা আসছে বরফে ঢাকা হিমালয় থেকে। মা আরও বলত, নদীরা নাকি কথা বলে। মা ওদের কথা শুনতে পেত। কিন্তু বলরাম কখনও শুনতে পায়নি। যদিও শোনার অনেক চেষ্টা করেছে। মায়ের কাছ থেকে যে শিখে নেবে সে উপায়ও আর নেই। বলরাম তখন অনেক ছোটো। এক প্রবল বর্ষায় মা জল আনতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। ছোট্ট বলরাম জেনেছিল, নদীরা মাকে ডেকে নিয়ে গেছে। তারপর থেকে বলরাম প্রায়ই নদীদের জিজ্ঞাসা করে তারা মাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে।

ঠাণ্ডা কুচি কুচি জলের ছিটে এসে পড়ছিল বলরামের চোখেমুখে। কনকনে হিমেল হাওয়া কাঁপুনি ধরাচ্ছিল পোশাক ভেদ করে। রাশি রাশি কালো মেঘ আকাশের নীল রংটাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছিল। বলরামের কিন্তু মনখারাপের চেয়েও দুশ্চিন্তা হচ্ছিল বেশি। কোথায় গেল রশি? তাহলে কি আর সে আর ফিরবে না? তাকেও কি নদীরা ডেকে নিয়ে গেল? নাকি পুলিশে যেটা বলছে সেটাই ঠিক? কান্নায় গলা বুজে আসছিল বলরামের।

“মা! মাগো! তুমিই বলো, আমি কী করব। রশিকে খুঁজতে যাব? কিন্তু কোথায়? নদীমায়েরা, তোমরা কি আজও চুপ করে থাকবে?” চিৎকার করে কথাগুলো জিজ্ঞাসা করছিল বলরাম। বিকট শব্দে কোথাও একটা বাজ পড়ল। শব্দের অনুরণন পাহাড়ে পাহাড়ে। নদীরা কি ওর কথার উত্তর দিল? শুনতে পেল না বলরাম।

রশি

দেবপ্রয়াগ। পঞ্চ প্রয়াগের অন্যতম। কোটি কোটি ভারতবাসীর কাছে মহা পুণ্যভূমি।

তেহরি গাড়োয়ালের এই ক্ষুদ্র জনপদের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি শ্রীনরনারায়ণ চতুর্বেদী। যেমন অগাধ সম্পত্তি, তেমনই রাজনৈতিক প্রভাব। সকলে তাঁকে সমীহ করে চলে। কানাঘুষো শোনা যায়, এবারে ভোটে দাঁড়াবার কথা আছে তাঁর।

চতুর্বেদীজির একমাত্র মেয়ে প্রভাবতী। সবাই আদর করে ডাকে রশি। বয়স আট। মস্ত ডানপিটে। তার দস্যিপনায় অতিষ্ঠ বাড়ির লোক। তাকে সামলানোই দায়। আদরের বেটিয়ার সমস্ত দুষ্টুমির সস্নেহ প্রশ্রয়দাতা তার বাবা। রশির এই দুরন্তপনা হাসিমুখে মেনে নিয়েছে এ তল্লাটের লোকজনও। সে শুধুই তার বাবার প্রতিপত্তির জন্য নয়। রশির মুখখানা বড়োই মায়াময়। তার হাসিতে অতি বড়ো পাষাণও গলে যাবে। রশি এই পাহাড়ি জনপদে এক সদ্য ফোটা ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে উড়ে বেড়ায়। এক মহল্লা থেকে অন্য মহল্লা, সারাদিন ঘুরে বেড়ায় সঙ্গীসাথী নিয়ে। শুধু কি তাই? দলবল বেধে পাহাড়ে চড়ে। নদীর পাড় বরাবর চলে যায় বহুদূর। ভেসে আসা নুড়ি কুড়ায়।

রশির দিদিমা বলেন, রশির মাও নাকি ছোটোবেলায় এমন দুষ্টু ছিল। রশি অবশ্য মায়ের মুখটা ঠিক মনে করতে পারে না। ঠিক করে কথা বলতে শেখার আগেই মেঘের দেশে পাড়ি জমিয়েছেন রশির মা। জেঠিমা মাতৃস্নেহে বড়ো করে তুলছেন ছোট্ট মেয়েটাকে। বাড়িতে অর্থের প্রাচুর্য। আছে অনেক ঠাকুর-চাকর। এদের ভরসাতেই মেয়েকে ছেড়ে দিল্লিতে নিজের কারবার সামলাতে প্রায়ই চলে যেতে হয় চতুর্বেদীজিকে।

পাহাড়ি শ্মশান ও বাঙালিবাবু

জনপদ থেকে একটু দূরে নদীর পাড়ে এখানকার একমাত্র শ্মশান। পিছনে ঘন জঙ্গল ধাপে ধাপে উঠে গেছে পাহাড় হয়ে। বলরামের বাবা এই শ্মশানে ডোমের কাজ করে। খরস্রোতা নদীকে সাক্ষী রেখে কাঠের চিতা জ্বলে। উত্তুরে হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে ওঠে আগুনের শিখা। কত অচেনা মানুষজন আসে। কাজ ফুরালে আবার তারা চলেও যায়। বলরাম দূর থেকে সবাইকে দেখে। ওদের ভাঙা কুঁড়েতে কেউ আসে না কিছু পাহাড়ি শেয়াল-কুকুর ছাড়া।

দিনের বেশিরভাগ সময়টাই নেশায় চুর থাকে বলরামের বাবা। আপনভোলা ছেলেটার দিকে একফোঁটা নজর নেই তার। এ শহরের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ শৈশব বোধহয় বলরামেরই। কারণটা সে নিজেও জানে না। ওর সঙ্গে কেউ খেলে না। কথাও বলে না। বছর দশের ছেলেটার বন্ধু বলতে পাহাড়, জঙ্গল, নদী, পাথর। ওদের সঙ্গেই গল্পগুজব করে। সুখ-দুঃখের কথা বলে।

এহেন অভাগা বলরামকে ভালোবাসার জন্য একজন মানুষকে জুটিয়ে দিয়েছেন ভগবান। এ তল্লাটে একমাত্র সেই বলরামকে ভালোবাসে। ঈষৎ ভারিক্কি চেহারার সদাহাস্য সেই মানুষটিকে সবাই একডাকে চেনে বাঙালিবাবু নামে।

বাঙালিবাবুর আসল নাম স্বরূপ দত্ত। একটা ছোটো ধর্মশালা চালায় স্বরূপ। তিনকুলে কেউ নেই। অল্প বয়সে ঘর ছেড়েছিল স্বরূপ। বলা যায় কতকটা বাধ্য হয়েই। তারপর কীভাবে কোন রসায়নে এখানে চিরজীবনের মতো বাঁধা পড়ে গেল সে নিজেও জানে না। পুরনো অন্ধকার অতীত অনেকটাই ভুলতে পেরেছে এই দেবভূমির সান্নিধ্যে। এখানকার প্রকৃতি, সর্বোপরি মানুষের সরলতা মুগ্ধ করে স্বরূপকে। পাহাড়ি মানুষগুলোও আপন করে নিয়েছে তাকে।

মা মরা ছেলেটার প্রতি কোথায় একটা টান অনুভব করে স্বরূপ। হয়তো নিজের জীবনের সঙ্গে কোথাও মিল খুঁজে পায়। কত ঝড়ঝাপটা সে সয়েছে। ভালোমন্দ কত মানুষই না দেখেছে। কিন্তু শ্যামলা চেহারার টানা টানা চোখের ছেলেটাকে দেখে বড়ো মায়া জাগে। ওর সারল্য তীব্র আকর্ষণ করে স্বরূপকে। ওর ধর্মশালাতেই খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে বলরামের। নইলে তো দু’বেলা দু’মুঠো ভাতও জুটত না বাচ্চাটার। শুধু কি তাই? সন্ধ্যাবেলা নিয়ম করে বলরামকে পড়ায়ও স্বরূপ। গল্প বলে। রামায়ণ, পুরাণ। মুগ্ধ হয়ে শোনে বলরাম।

বলরামের মধ্যে এক আশ্চর্য প্রতিভা আবিষ্কার করেছে স্বরূপ। পাথর কুঁদে অপূর্ব সুন্দর মূর্তি বানাতে পারে এই ছেলে। এ যেন ঈশ্বরপ্রদত্ত। কারও কাছে শেখেনি সে। ব্যাপারটা ওর সহজাত। পঞ্চ প্রয়াগের পথে আনাগোনা লেগেই থাকে নানা পুণ্যার্থীর। আসে হাল ফ্যাশনের টুরিস্ট। স্বরূপের কথামতো নিজের হাতে গড়া মূর্তি নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে বলরাম। মাঝেমধ্যে কেউ দেখতে চায়। কিনতেও চায়। বলরাম কখনও মুখ ফুটে টাকা চায় না। অনেকে খুশি হয়ে ভালো দাম দিয়ে কিনে নেয়। ওদের অভাবী সংসারে এটুকুও অনেক।

বন্ধু প্রাপ্তি

শ্মশানঘাটের আশপাশটা দুপুরবেলা প্রায়ই বড়ো নির্জন থাকে। এমনই এক দুপুরে নদীর ধারে বসে ওর কুড়িয়ে পাওয়া ছেনিটা দিয়ে মূর্তি বানাচ্ছিল বলরাম। রশি কখন যে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে ও খেয়ালই করেনি। রশি অবাক হয়ে দেখছিল, ছেলেটা পাথর কেটে কেটে কী সুন্দর মূর্তি বানাচ্ছে।

“তুমি কে গো, এমন সুন্দর খেলনা বানাচ্ছ? আমাকে একটু শিখিয়ে দেবে?” বলল রশি।

ফুটফুটে ছোট্ট মেয়েটাকে দেখে অবাক হয়ে গেল বলরাম। একটু ঘাবড়েও গেল। বলল, “তুমি এখানে এসেছ কেন? এখানে তো কেউ আসে না। এখানে আসতে সবাই ভয় করে। তুমি একা একা চলে এলে?”

খিলখিল করে হেসে উঠল রশি। কিছু না বলে চলে গেল। পরদিন দুপুরে আবার এল সে। বলল, “আমাকে একটা খেলনা বানিয়ে দেবে?”

রশিকে বড়ো ভালো লেগে গেল বলরামের। এই প্রথম কেউ ওর কাছে কিছু চাইল। মন দিয়ে লেগে পড়ল রশির ইচ্ছাপূরণে। দিন তিনেকের মধ্যে বানিয়েই ফেলল রশির খেলনা।

পাথরের মূর্তিটা হাতে পেয়ে ঝলমল করে উঠল রশির মুখ। ওর বাড়িতে কত দামি দামি খেলনা, কিন্তু এমন একটাও নেই। বলরাম রশিকে বলল, এই মূর্তিটা প্রহ্লাদের। বাঙালিবাবুর কাছে বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদের গল্প শুনেছে বলরাম। ওর বড়ো প্রিয় সেই গল্প। রশিকেও বলল সেই গল্প। রশি মুগ্ধ হয়ে শুনল কীভাবে প্রহ্লাদের বাবা দুরাচারী রাজা হিরণ্যকশিপুকে বধ করেছিল শ্রীবিষ্ণুর নৃসিংহ অবতার।

দুপুরের দিকে বাড়ির সবাই যখন বিশ্রাম নিত, রশি প্রায়ই চুপিচুপি চলে আসতে লাগল শ্মশানে। রশির কত বন্ধু, অথচ বলরামের মতো কেউ গল্প বলতে পারে না। এমনকি বড়োরাও না। সবার থেকে আলাদা বলরাম। রশির মতো একজন বন্ধু পেয়ে খুব খুশি বলরামও।

ছোটোদের বন্ধুত্ব সামাজিক সমীকরণ মেনে চলে না। কিন্তু বড়োদের জগতের নিয়মটা অন্যরকম। বলরামের বাবা একদিন ওকে রশির সঙ্গে কথা বলতে দেখে চমকে গেল। ডোমের ঘরে কাউকে আসতে নেই। এর ফলাফল কেমন ভয়ংকর হতে পারে কল্পনা করেই বলরামকে প্রচণ্ড বকাবকি করল ওর বাবা। নিষেধ করল যাতে সে রশির সঙ্গে কোনওদিন কথা না বলে। রশি চলে গেল কাঁদতে কাঁদতে। বলরামকে ভয়ও দেখাল ওর বাবা ফের যদি রশির সঙ্গে কথা বলে তাহলে রশিকেও নদী নিয়ে চলে যাবে মায়ের মতো। সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষটার মনের গভীরে থাকা ভীতিটা দেখতে পেল না বলরাম। সে শুধুই দেখল বাবার চোখে ফুটে ওঠা তীব্র ঘৃণা। বলরামও ঠিক করল সে বাবার কথা শুনবে না।

পরেরদিন কিন্তু রশি এল না। সারা দুপুর অপেক্ষায় রইল বলরাম। শেষে ভাবল পরেরদিন আসবে।

কিন্তু পরদিনও এল না রশি। বলরামের তীব্র অভিমান হল বাবার উপর। ঠিক করল, রশির বাড়ি যাবে ওকে ডাকতে। কিন্তু রশির বাড়ি কোথায় সে তো কোনোদিন জিজ্ঞাসা করেনি। বলরাম জানে, একজনই পারে ওকে সাহায্য করতে। বাঙালিবাবু। তার কাছেই গেল বলরাম।

কোথায় গেল রশি?

বলরামের কাছে সব শুনে থম মেরে গেল স্বরূপ। বলরামকে বলল চুপচাপ ঘরে ফিরে যেতে। দু’দিন হল রশি নিখোঁজ। রশির বাবা দিল্লি থেকে ছুটে এসেছেন। এসেছে তাবড় তাবড় পুলিশ অফিসার। শহর তোলপাড় করে দিচ্ছে পুলিশ। হইচই চারদিক। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

পুলিশে বড়ো ভয় স্বরূপের। খুনের দায়ে অভিযুক্ত জেল পালানো আসামী সে। কেউ তার এই পরিচয় জানে না। স্বরূপ জানে, একবার পুলিশের হাতে পড়লে কী দশা হবে ছোটো ছেলেটার।

বাড়ি ফিরতেই বলরাম দেখল, বাবা ঘরের এক কোনায় বসে আছে। চোখেমুখে আতঙ্ক। রশির এখানে আসার কথা যেন কাউকে বলতে বাবা বারণ করল। পুলিশের ভয় দেখাল বলরামকে। বলল, ওদের ধরে নিয়ে গিয়ে মারবে পুলিশ।

দিনটা কেটে গেল। পুলিশ কিন্তু এল না। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বলরামের বাবা। কিন্তু বলরামের চোখে বাবা তখন আর নিজের জায়গায় নেই। বলরামের মনে হতে লাগল, বাবা কিছু লুকাচ্ছে। রশির হারিয়ে যাবার পিছনে হয়তো ওর বাবাই দায়ী। কিন্তু কাউকে বলতেও পারল এই সন্দেহের কথাটা। মনটা অসম্ভব ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল বলরামের।

ভোর হল। সারাদিন তিন কোনা পাথরটার উপর গিয়ে বসে থাকল। আর বারবার নদীর কাছে জানতে চাইল রশির কথা।

একসময় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। ভিজে চুপচুপ হয়ে বাড়ি ফিরে বলরাম দেখল পুলিশ এসেছে। বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। পুলিশ বলরামের কাছেও জানতে চাইল রশির খবর। বাবার বারণ না শুনে সবকথাই পুলিশকে বলল বলরাম। এমনকি বাবার বকাঝকার কথাও।

পুলিশ ধরে নিয়ে গেল বলরামের বাবাকে। আরও কিছু মানুষ লক-আপে ঢুকল। কিন্তু রশির খোঁজ কোথাও মিলল না।

হিমালয়ের পথে

বলরামের মা বলত, যার কেউ নেই, তার আছে ভগবান। রশির খোঁজ কেউ না জানুক, ভগবান তো জানেন। অনেক ভেবে শেষে বলরাম ঠিক করে ভগবানের কাছেই যাবে রশিকে ফিরিয়ে আনতে। ভগবান কোথায় থাকেন তা জানে না বলরাম। তবে এটুকু জানে, উত্তরের বরফঢাকা পাহাড়ে ভগবানের বাস।

কাউকে কিছু না বলে পরদিন সকালে হাঁটা লাগাল জঙ্গলের পথ দিয়ে। এলোমেলোভাবে হাঁটতে লাগল জঙ্গলের পথ ধরে। উঁচু উঁচু সব গাছ। মোটা মোটা গুঁড়ি। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ফালি ফালি রোদ্দুর নেমেছে। কত নাম-না-জানা পাখি ডাকছে। ভারি সুন্দর পরিবেশ। কিন্তু বলরামের সেদিকে মন ছিল না। তেষ্টায় গলা কাঠ। পাও আর যেন চলছে না। একটা গাছের নিচে বসে পড়ল বলরাম। প্রচণ্ড খিদেয় নাড়িভুঁড়ি জ্বলছে। ইস, যদি কিছু খাবার নিয়ে আসত। আফসোস হয় বলরামের।

হঠাৎ পিছন থেকে একটা হাত এগিয়ে এল ওর দিকে। হাতে মিঠাই। চমকে উঠল বলরাম। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, লাল জোব্বা পরা এক সাধু। ধবধবে ফর্সা। বলশালী চেহারা। গালভর্তি সাদা দাড়ি। মুখে মৃদু হাসি। আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন বলরামের। ঝোলা থেকে আরও মিঠাই আর ফল বের করলেন। গোগ্রাসে খেল বলরাম। সাধুকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কি জানেন ভগবানের কাছে পৌঁছানোর রাস্তা?”

অট্টহাস্য করে উঠলেন সাধু। বললেন, “বেটা, তুই কেন ভগবানের কাছে যেতে চাস? ভগবানের কাছে কেউ যেতে পারে না। তুই বাড়ি ফিরে যা।”

বলরাম সব খুলে বলল। সাধু বারবার বোঝালেন বলরামকে। কিন্তু বলরাম ঠিকই করে নিয়েছে সে আর ফিরবে না। শেষে ওর জেদ দেখে সাধু বললেন, “তাহলে তুই চল আমার সাথে। আমি তো পাহাড়ের উপরেই যাব। দেখ তুই খোঁজ পাস কি না ভগবানের।”

সাধু ভারি সুন্দর কথা বলেন। আর কী চমৎকার গানের গলা! মুগ্ধ বলরাম।

পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে একটা ভাঙা মন্দিরের সামনে উপস্থিত হল ওরা। সাধু বললেন, “আমরা এখন বিশ্রাম নেব।”

মন্দিরের ভেতর থেকে কালো পোশাকের আরও একজন বেঁটেখাটো লোক বেরিয়ে এল। বলরামের সঙ্গে থাকা সাধুকে গুরুজি বলে প্রণাম করল। বলরামের মনে হল এরা পূর্ব-পরিচিত। উনি বলরামকে দেখিয়ে বললেন, “ছোটেলাল, এই শিশু বড়ো ক্ষুধার্ত আর ক্লান্ত। ওর বিশ্রামের ব্যবস্থা করো।”

মন্দিরের পিছন দিকে একটা ছোটো ঘর ছিল। বলরামকে যত্ন করে ঘরটায় নিয়ে গেল ছোটেলাল। একটা কম্বল পাতা ছিল। এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে এল সে। সঙ্গে কিছু খাবার। খেতে-খেতেই চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে এল বলরামের।

যখন ঘুম ভাঙল প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বলরাম ঘরে কাউকে দেখতে পেল না। ঘর থেকে বেরিয়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল। মন্দিরটা কেমন পোড়োবাড়ির মতো দেখতে লাগছে। ভিতরে কোনও বিগ্রহ নেই। তবে দেখে মনে হচ্ছিল, কিছুদিন হল গাছপালা আগাছা সাফ করা হয়েছে। বলরামের মাথাটা ভার ভার লাগছিল। সারা শরীর জুড়ে ক্লান্ত অবসন্ন ভাব। হঠাৎ দূরে মেঝের এক কোনায় একটা ছোট্ট জিনিসে চোখটা আটকে গেল। কুড়িয়ে তুলতেই চমকে গেল বলরাম। এ তো সেই প্রহ্লাদ মূর্তি! রশিকে বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এটা এখানে এল কী করে? তাহলে কি রশি এখানেই…

একছুটে মন্দির থেকে বেরোতে যেতেই কেউ যেন ল্যাং মারল। হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল বলরাম। পেছন থেকে কেউ একটা কাপড় দিয়ে ওর নাকমুখ চেপে ধরল। একটা মিষ্টি গন্ধ। জিভ জড়িয়ে এল। চোখের পাতায় সম্মোহন।

সেই ভয়ানক রাত

বলরামের মাথায় কে যেন খুব মিহি করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। অন্ধকারে মুখটা দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু স্পর্শটা বড়ো চেনা। মা!

মা বলছে, “ভয় পাস নে, বাছা। আমি যা যা বলতাম সেগুলো মনে রাখিস।”

খুব ভালো লাগছিল বলরামের। “মা, তুমি ফিরে এসেছ! আর কোনোদিন আমাকে ছেড়ে যাবে না!”

হঠাৎ আরও একজনের গলার স্বর শুনতে পেল। কেউ মন্ত্র পড়ছে। একটা কটু গন্ধ ভেসে আসছে। বলরাম একটু অন্যমনস্ক হতেই মাথার উপর থেকে মার হাতটা সরে গেল। ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যেতে লাগল মায়ের অবয়ব। মা চলে যাচ্ছে। চিৎকার করে উঠল বলরাম, “যেও না, মা! মা, মাগো!”

চোখ খুলে গেল বলরামের। সামনে হোমের আগুন জ্বলছে। সেই সাধু বিকট শব্দ করে দুর্বোধ্য সব মন্ত্র পড়ছেন। মাঝেমাঝেই হোমের আগুনে কিছু গুঁড়ো ছুড়ে দিচ্ছেন। আগুনটা আরও দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে। দূরে সাধুর চ্যালাটা কতগুলো কাঠ টেনে আনছে।

বিশেষ নড়াচড়া করতে পারল না বলরাম। ওর হাত-পা শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। প্রচণ্ড ভয়ে চিৎকার করে উঠল বলরাম। সাধু একবার আড়চোখে তাকালেন, কিন্তু মন্ত্র পড়া বন্ধ করলেন না।

ছোটেলাল সামনে এসে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে লাগল। কপালে লাল রঙের কীসব লাগিয়েছে। বীভৎস লাগছে তার চেহারা। যেন আস্ত একটা রাক্ষস। বলরাম বুঝল, ভয়ানক কিছু একটা হতে চলেছে।

যজ্ঞ শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন সাধু। বলরামের নজরে এল, ছোটেলাল আরও একটা বাচ্চাকে টেনে টেনে নিয়ে আসছে। আলো-আঁধারিতে বলরাম স্পষ্ট বুঝল, ওটা রশি। চিৎকার করে রশিকে ডাকতে লাগল। কিন্তু রশি সাড়া দিল না। ওরা রশিকে ওই হাড়িকাঠটার উপর রাখল। মেয়েটা যেন একটা ঘোরের মধ্যে। কেমন নেতিয়ে আছে। মাঝে মাঝে নড়াচড়া করছে।

বলরাম চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। সাধু এবার এগিয়ে এলেন বলরামের দিকে। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ভয় পাস না, বেটা। আমি তন্ত্রসিদ্ধ মহা কাপালিক। তোদের দু’জনকে বলি দিয়ে আমি আমার পোষা ভূত বানিয়ে রাখব। দেখবি কত মজা।” অট্টহাস্য করতে লাগলেন সাধু। ভয়ে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এলে বলরামের।

বলরামের মনে পড়ল মায়ের কথা। মা বলেছিল ভয় না পেতে। কিন্তু ওর যে বড়ো ভয় লাগছে। কাঁদতে কাঁদতে বলরাম ভগবানকে ডাকতে লাগল।

এবার ছোটেলালের কাছে কিছু একটা চাইলেন সাধু। লোকটা এদিক ওদিক খুঁজতে লাগল। কিন্তু কিছুতেই খুঁজে পেল না। প্রচণ্ড রেগে চ্যালাকে বকাবকি করতে লাগলেন সাধু। ছোটেলাল সাধুকে বলল, হয়তো সে মন্দিরের ভেতরে জিনিসটা ফেলে এসেছে। এই বলে ছুটল মন্দিরের দিকে।

হঠাৎ ভেসে এল একটা কানফাটা আর্তনাদ। ছোটেলাল টলতে টলতে মুখ থুবড়ে পড়ল ওদের সামনে। মুখ দিয়ে সাদা গ্যাঁজলা বের হচ্ছে। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সোজা হয়ে গেল সারা শরীর। থেমে গেল কাঁপুনি। প্রবল রাগে সাধু কাকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে অভিশাপ দিতে লাগলেন। তারপর সাধু নিজেই গেলেন মন্দিরের দিকে।

ফিরলেন একটা বিশাল খাঁড়া নিয়ে। খাঁড়া নিয়ে সাধু বিচিত্র ভঙ্গীতে নাচতে লাগলেন। তারপর হুড়মুড় করে এগিয়ে গেলেন রশির দিকে।

আচমকা কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করল। ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির জলে যজ্ঞের আগুন নিভে গেল। সাধু হা হা করে বিকৃত স্বরে হাসতে লাগলেন। আর বলতে লাগলেন, “ওরে পিশাচের দল, তোরা আমাকে এভাবে থামাতে পারবি না। আমি আজ কার্যসিদ্ধি করবই। কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না। স্বয়ং ঈশ্বরও না।”

সে কী ভয়ানক গলা! শিউরে উঠল বলরাম। খাঁড়াটা বাঁই বাঁই করে মাথার উপর ঘোরাতে লাগলেন সাধু। বৃষ্টির জল পড়েই হয়তো, নড়ে উঠল রশি। সাধুর উগ্র রূপ দেখে চিৎকার করে কেঁদে উঠল।

রশির পাশে খাঁড়াটা তুলে দাঁড়িয়ে আছেন সাধু। এবার আর বাঁচার উপায় নেই।

“রশিকে বাঁচিয়ে দাও হে ঠাকুর!” বিড়বিড় করতে লাগল বলরাম।

মুহূর্তের মধ্যে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। তুমুল ঝোড়ো হাওয়া বইতে লাগল। মুহুর্মুহু বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আকাশ ভেদ করে নেমে এল তীব্র এক আলো। সে কী উজ্জ্বল আলো, চোখ ধাঁধিয়ে গেল বলরামের। সেই আলোয় এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখল বলরাম। ওদের সামনে দাঁড়িয়ে এক বিশাল দিব্য মূর্তি। মাথাটা সিংহের। শরীরটা মানুষের। দশখানা হাত। তাতে নানা অস্ত্রশস্ত্র। মায়াবী এক আলোকদ্যুতি সেই দিব্য চেহারা ঘিরে। দিব্যপুরুষ একটা হাত তুলতেই আলোটা পাক খেতে খেতে নেমে এল খাঁড়ার উপর। একটা তীব্র ঝলকানি। তারপর সব অন্ধকার। অপার নৈঃশব্দ্য।

খানিক বাদে বৃষ্টি থেমে গেল। দূরে কোথাও বিদ্যুৎ-চমক হচ্ছিল ঘন ঘন। বলরাম দেখল, লুটিয়ে পড়ে রয়েছে সাধুর নিথর দেহ। রশি টলমল পায়ে এগিয়ে এল বলরামের দিকে। অনেক চেষ্টা করে বাঁধনও খুলল বলরামের। হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল দু’জনে।

পরদিন দুপুরে ক্লান্ত অবসন্ন দুটি শিশু ফিরল ঘরে। সারা শহর জুড়ে হইচই। রশি চতুর্বেদীজিকে সবিস্তারে জানাল বলরাম কীভাবে ওকে বাঁচিয়েছে। পুলিশ বলরামেরর বাবাকে ছেড়ে দিল। চতুর্বেদীজি বলরামকে অনেক উপহার দিলেন। শুধু তাই নয়, চতুর্বেদীজি বলরামের পড়ার ব্যবস্থা করে দিলেন সরকারি স্কুলে। যাবতীয় খরচাপাতির দায়িত্বও তিনিই নিলেন। এরপর রশিকে নিয়ে চতুর্বেদীজি চলে গেলেন দিল্লি।

সবকিছু আগের মতোই চলতে লাগল। পুলিশের খাতায় লেখা রইল, সাপের কামড় আর বজ্রাঘাতের কারণে অপঘাতে মারা গেছে দুই ভণ্ড সাধু। কিন্তু বলরামের মনের খাতায় চিরদিনের জন্য আঁকা হয়ে গেল এক রহস্যময় প্রশ্নচিহ্ন। সে রাতে কাকে দেখেছিল বলরাম? সত্যিই কি সেই সিংহরূপী দিব্যপুরুষ নেমে এসেছিলেন আকাশ ফুঁড়ে? নাকি পুরোটাই মনের ভুল! উত্তর আজও খুঁজে যাচ্ছে বলরাম।

অলঙ্করণঃ স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

শ্রী অয়ন রাহার কলম অত্যন্ত শক্তিশালী। ২০১৭তে জয়ঢাকের গল্প প্রতিযগিতাতেও উল্লেখযোগ্য একটি গল্প লিখে তিনি নিজের কলমের প্রতি সুবিচার করেছিলেন জয়ঢাকের পাতায়। সে গল্পের লিঙ্ক এখানে রইল । অ্যাথেনিকার আগন্তুক

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s