সিনেমা হল বৃহৎ আর মিষ্টির গল্প-ফার্দিনান্দ রুমেলা দাশ শরৎ ২০১৮

বৃহৎ আর মিষ্টির গপ্পো : ফার্দিনান্দ

আলোচনা করলেন রুমেলা দাশ

আকারে বৃহৎ। পেল্লায় চওড়া বুকের ছাতি। বাদামি চামড়ার জোরটাও মন্দ নয়। মনটা ততোধিক শিশু। চেহারার দাপুটেয়ানার ঘাটতি ঐ মনে। মনের খুশি রঙিন ফুলে, ফুলের সুবাসে। দুচোখ বন্ধ করে প্রাণ ভরে অক্সিজেনের সাথে সাথেই ফুলেল গন্ধটা মাতিয়ে দেয় ওর শরীর, মন উভয়কেই। থপ করে বসে পড়ে। এমনতর করেই কেটে যায় বেশ। গোল! গোল হয় সেখানেই। আশেপাশের আর পাঁচটা বিপুলাকার বলে- ” ভায়া তুমি যে একেবারেই আমাদের দলের নয়, ছেলেমানুষি হুটোপাটিটাই যেন তোমার মধ্যে বেশি। কৈ তুমি তো লড়াই করোনা আমাদের সাথে? শিং-এ শিং ঠেকিয়ে গুঁতোতেও তো আস না। যাও…..!” বলে সরিয়ে দেয় তাকে। বেচারা আর কী করে? মনের দুঃখে খুঁজতে থাকে তার প্রিয় জায়গা, প্রিয় গন্ধদের। কে? কার কথা বলছি?

তবে শোনো, তার নাম ‘ ফার্দিনান্দ’। ছোট্ট ষাঁড় শাবক। আমুদে চোখের বিপুল বৃহৎ চেহারার এর কীর্তিকলাপ-ই উপভোগ করলাম ১ ঘন্টা ৪৮ মিনিটে। মনখারাপ, খুশি, হটাৎ খুশি, জেদি অথচ সৎমনের উৎসাহ সংমিশ্রণে জমজমাটি গল্প।

ব্লু স্কাই স্টুডিও ” EPIC”, ” RIO”,

” ICE AGE”-র মতো এখানেও সেই মনমাতানো সাবলীল ছেলেমানুষিকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। ফার্দিনান্দ মুক্তি পেয়েছে ১৫ই ডিসেম্বর ২০১৭। Robert L Baird, Tim Federle, আর Brad Copeland- এর কাহিনী অবলম্বনে পরিচালক Carlos Saldanha এমন একটি গপ্পোই আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন।

ঘটনাক্রমে ফার্দিনান্দের সাথে আলাপ ও বন্ধুত্ব হয় এবড়ো খেবড়ো দাঁত, গুগলি চোখের ছাগল ‘লুপে’র ( কণ্ঠস্বর Kate McKinnon)। সে চেরা গলায় উপদেশও দেয় তাকে হরেক রকমের, কিভাবে লড়তে হয়! কিভাবে কলাকৌশলের মধ্যে দিয়ে প্রকৃত BULL হয়ে উঠতে হয়। ‘লুপ’ সেসবই বোঝায় তাকে। কিন্তু অবোধ ফার্দিনান্দ ততক্ষণে ‘নীনা’-র শোকে কাতর। বার বার মনে পড়ে রঙিন নরম জমির আশেপাশে ছোট্ট বালিকা নীনার সাথে কাটানো দিনকতক। ফার্দিনান্দের গলার শিশুসুলভ ( কণ্ঠস্বর সুপারস্টার John Cena) কথায় মনভালো হয়ে ওঠে বারবারই। মনে হয়, এমনই একটা শিশু আমরা সবাই লুকিয়ে রেখেছি নিজের মাঝে। একে একে এসে যুক্ত হয়, রুক্ষ স্বভাবের Valiente ( স্বর Bobby Cannavale ), চকচকে চামড়ার Bones ( স্বর Anthony Anderson), Guapo ( স্বর Peyton)! শুধু কি তাই! আরো আছে, দেখি তিন- তিনটে রঙিন সজারু জাতীয় প্রাণী ‘Una’ ( স্বর Gina Rodring) , ‘Dos’ ( স্বর Daveed Diggs), ‘Custro’-( স্বর Gahriel Iglesias)কেও। বোকা, অনেকটা মাথামোটা আচরণ হলেও ওরা কিন্তু ফার্দিনান্দ-কে বোঝে। মুক্ত হতে সাহায্যও করে। হাসিখুশি ছটফটে চেহারার ভায়োলেট রঙের সজারুগুলো যখন নাচে, গানে মেতে ওঠে তখন ফার্দিনান্দ অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে ওদেরই দিকে।

মূলত ফার্দিনান্দ আর তার গল্পটার ভিত লুকিয়ে বহু বছর পুরোনো আনুমানিক ৭১১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শুরু হওয়া স্পেনের  ষাঁড়ের লড়াই-এ ( Spanish Bullfighting)। এটি স্পেনের নাগরিকের কাছে খুবই মজাদার, জনপ্রিয় একটি খেলা। ষাঁড়ের লড়াই মূলত দুইধরণের- একটি স্টেডিয়ামের মত গোলাকার মাঠে হয়ে থাকে, দ্বিতীয়টি নির্দিষ্ট পাড়া বা মহল্লায় হয়। মার্চ থেকে অক্টোবরে অর্থাৎ গ্রীষ্ম এবং বসন্তকালে এই লড়াই আয়োজিত হয়। স্থানীয়রা ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এই লড়াই দেখতে আসে। প্রতিটি লড়াইয়ে মোট তিনজন Matador/ ম্যাটাডোর ( যে ব্যক্তি ষাঁড়কে পরাস্ত ও নিহত করে), প্রতিটা ম্যাটাডোরের তিনজন সহকারী ( স্প্যানিশ Banderilleros) থাকেন এবং ঘোড়ায় করে দুইজন ( স্প্যানিশ Picadores) থাকেন। এ লড়াইকে ঘিরে আরো অনেক অনেক রীতি, রেওয়াজ আছে। তবে সেসব জেনে কাজ নেই। ফার্দিনান্দ-ও ছোট থেকেই সেসব জেনে এসেছে। বুঝে এসেছে। তাইতো ছুটে পালাতে চেয়েছিল। মুক্তি চেয়েছিল। কিন্তু ওই যে পৃথিবীটা গোল। তাই আবারো কোন একদিন, কোন একসময় তাকে নামতে হয় লড়াইয়ের মাঝে। তারপর? তারপর কী করবে ফার্দিনান্দ? জানতে হলে দেখতে তো তোমাদের হবেই। আর যেটুকু ভালোলাগা, মনভালোকরা সেটুকু সারিসারি সাজিয়ে দিলাম ছোটদের জন্য-

১) ফুল, ফুলগাছ বড় ভালোবাসে সে। তাই ফুলগাছে জল দেওয়া ফার্দিনান্দের প্রিয় শখ। টলমল পায়ে সেই যে বালতি মুখে গাছের পরিচর্যা শুরু করেছিল ছোট্ট থেকে, বড় হয়েও কাঠের পাটাতনে জল নিয়ে দিব্বি জল দিয়ে বেড়ায় নীনার বাগান। অপূর্ব সেসমস্ত দৃশ্য।

২) বৃত্ত করে ঘিরে থাকা সাদা বা লাল পাপড়ি, আর মৌমাছি গুনগুন করে এসে বসেছে রেণুর ঠিক মাঝখানটিতেই। মুখ ডুবিয়ে মধু খাচ্ছে দেদার। হটাৎ করে ভোঁ গাড়ির ধুলোমাখা হাওয়া এসে উড়িয়ে নিয়ে যায় মধু মাখা মাছিটিকে। কি মিষ্টি আরামপ্রদ একটি ছবি। আর এর যোগসূত্রটা অবশ্যই জড়িয়ে ফার্দিনান্দের সঙ্গে। কখনো দেখি মৌমাছির হুলের গুঁতোয় ফার্দিনান্দ গগনবিদারী চিৎকার করে ওঠে। কখনো এক নাক দিয়ে শুঁয়োপোকা ঢুকে, ওপর নাক দিয়ে প্রজাপতি হয়ে পাখা মেলে।

৩) ফার্দিনান্দ আর নীনা গল্পের প্রধান ও মূল চরিত্র। আদরে, আবদারে দুজন যেন হরিহর আত্মা। শয়নে, স্বপনে, জাগরণে দুজন, দুজনকে কাছছাড়া করেনা। অথচ দুজনের আকার দেখলে মজা লাগে বেশ। পালিত আর পালকের সম্পর্কের গভীরতা বোঝায় সহজেই। ফার্দিনান্দের সাথে সাথেই নীনার পালিত কুকুরছানা ‘Paco’, ‘Jorge’ (মোরগ), ‘Maria’ ( মুরগি)-র বন্ধুত্ব কিশোরবেলার অনেক খুনসুটি মনে করায়।

৪) বাবা মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্কের একটি নিগূঢ় দৃষ্টিপাত দেখা যায় ফার্দিনান্দ ও তার পিতার আলাপচারিতায়। যেমনটা নীনা তার বাবাকে নিয়ে দিন কাটায় তেমনি। একই সরলরেখায় সম্পর্কের এ-পিঠ ও-পিঠ মানুষ ও পালিতে।

৫) অতিপ্রাচীন ষাঁড়ের লড়াইয়ের পাশাপাশি স্পেনের ‘ ফেরিয়া দে জুলিয়ো’ অর্থাৎ ভেলেনসিয়ার মেলার শেষ পর্বে ফুলের উৎসবটি কি সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। গোটা শহর ভরে ওঠে রংবেরঙের ফুলে, সেজে ওঠে আমাদের মন। ফার্দিনান্দেরও।

৬) সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত নীনা-র ফার্মে একটি অতিকায় গাছের নিচে বসে, অবাক চোখে ফার্দিনান্দের সূর্যকে দেখা যেন বাঁধানো ফ্রেমের মত।

৭) সঙ্গী সাথী নিয়ে ফার্দিনান্দের ট্রেনে চেপে পালানো। লোকালয়ে এমন মজাদার বিচিত্র অভিজ্ঞতা খুব কমই চোখে পরে।

৮) গানে, গল্পে পরিপূর্ণ গোটা সিনেমাটি। মোট ৬টি গান থাকলেও “Home” গানের সুর ও কথা Nick Jonas- গলায় অনবদ্য।

৯) সবশেষে, মাদ্রিদ ফিনালে। তবে এটার কথা আমি বিশদে বলছিনা। তাহলে ফার্দিনান্দ দেখার মজাটাই আর থাকবেনা। শুধু বলছি এতে আছে ফার্দিনান্দ আর লড়াইয়ের মুখ্য চরিত্র ‘Primero’।

দর্শকের গ্যালারিতে অবশেষে আসবে প্রিয় নীনা ও তার বাবা। আসবে ফার্দিনান্দের ছোটবেলার বন্ধুরা। কি ঘটছে, কিভাবে ঘটছে জানতে হলে, দেখতেই হবে ফার্দিনান্দ।

এই এক গুচ্ছ ভালোর জন্য ২০১৮ অস্কারের জন্য অবশ্যম্ভাবী রূপে মনোনীত হয়েছে ফার্দিনান্দ ও তার আশেপাশের মিষ্টিদুষ্টু চরিত্ররা। সুতরাং আর দেরি না করে চটপট বসে পড় ফার্দিনান্দ দেখতে। হলফ করে বলতে পারি ফুলপ্রিয় সকলের ভালোই লাগবে এমন একটি মনপ্রিয় গল্প।

জয়ঢাকের সিনেমা হল

Advertisements

6 Responses to সিনেমা হল বৃহৎ আর মিষ্টির গল্প-ফার্দিনান্দ রুমেলা দাশ শরৎ ২০১৮

  1. saptastar says:

    খুব প্রিয় ছবি আর তেমনই সুন্দর রিভিউ। ছোটবেলায় আনন্দমেলার একটি পুজোসংখ্যাতে গুংগা বলে এক ফুল প্রিয় ষাঁড় এর গল্প পড়েছিলাম অনুবাদ কমিক্স এ। ওয়াল্ট ডিজনির মূল গল্প ছিল সম্ভবত। সেও অনেকটা ফার্দিনান্দ এর মতই ছিল।

    Like

  2. Sudeep says:

    এটা আমার দেখা হয়নি.. এবার দেখে ফেলবো

    Like

  3. Avinandan Chakraborty says:

    বাহ্ খুব ভালো 😊

    Like

  4. Rumela Das says:

    ধন্যবাদ

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s