সিনেমা হল সার্জেন্ট স্টাবি: অ্যান আমেরিকান হিরো রুমেলা দাস বসন্ত ২০১৯

“একটি বন্ধুর গল্প”

ছবির নাম: সার্জেন্ট স্টাবি: অ্যান আমেরিকান হিরো

আলোচনা করলেনঃ রুমেলা দাস

ওরা আমাদের মতো করে গুছিয়ে কথা বলতে পারে না। আমাদের মতো ভালোমন্দ বোঝাতেও হয়তো তেমনটা পারে না। তাই ওদের অনেকে অবহেলায় এড়িয়ে যায়! পাশ কাটিয়ে চলে যায়! কখনো নাক কুঁচকে বড়রা ছোটদের বলেন, ওদের গায়ে হাত দিও না যেন, রোগ হবে, খুব সাবধান! আর যাদের ভাগ্য ভালো হয়, তারা একটু আধটু আদর পায়। ফ্যানের নীচে, নরম সোফায় গা এলিয়ে কাটাতে পারে দিনরাতের সময়গুলো! তবে গৃহকর্তা বেশিরভাগ সময়ই একটি গুরুদায়িত্ব তার কাঁধে চাপিয়ে দেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওদের দেওয়া হয় বিশেষ ট্রেনিংও।

আজ আমাদের গল্পটা অনেকটা সেরকমই। তবে ট্রেনিং কিংবা বিশেষ শিক্ষায় তাদের মধ্যে বোধ গড়ে উঠলেও, সাহায্যের সহজ সহজাত বোধটা তাদের যেন জন্মগত। চোখ মেলা, পায়ে পায়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে একটু আদর পেলেই সে আজীবন বন্ধুত্বের বিশ্বস্ত হাত মেলে ধরতে একটুও কুন্ঠিত বোধ করেনা। ঠিক একদমই তাই! ‘স্টাবি’ (Stubby)-র কথা শুনতে শুনতে, দেখতে দেখতে সেসব বাস্তবের রঙিন রামধনুকেই আরো একবার জানব!

রিচার্ড ল্যানি(Richard Lanni)-র নির্দেশনায় টানা ৮৫মিনিট ধরে, ‘ফান একাডেমি মিডিয়া গ্রূপ’ ( Fan Academy Media Group) আমাদের সকলের সামনে তুলে ধরেছেন একটি অতি বাস্তব ঘটনা। ডিসেম্বর ১১, ২০১৮ প্রকাশ পায় চলচ্চিত্র “স্টাবি, অ্যান আমেরিকান হিরো”। মাইক স্টকেই ( Mike Stokey) এবং রিচার্ড ল্যানি ( Richard Lanni) এ কাহিনীর চিত্ররূপ দিয়েছেন। লগ্যান লেরম্যান ( Logan Lerman) ‘রবার্ট’-এর কন্ঠস্বরে, জেরার্ড দেপার্দ্যু (Gerard Depardieu) ‘গ্যাস্টনে’র কন্ঠস্বরে এবং হেলেনা বনহ্যাম কার্টার ( Helena Bonham Carter) ভাষান্তর করেছেন। কেবল শিশুমনের অতলেই নয়, এ চলচ্চিত্রের একটুকরো অক্সিজেন ‘স্টাবি,’ পরিবারের সবারই মন জয় করে নিতে পারবে অক্লেশে এ-কথা জোরের সঙ্গেই বলা যায়।

‘স্টাবি’-র কথা জানতে গেলে আমাদের একটু পিছন ফিরে তাকাতেই হয়! ও যে, কোনো গল্পকারের কল্পিক চরিত্র নয়। স্টাবি আদপেই ‘সার্জেন্ট স্টাবি’। চলচ্চিত্রের দৃশ্যপটে ফুটে ওঠা প্রথম দৃশ্য ১৯১৭ সালের পটভূমিকায় স্পষ্ট। যথার্থ! প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বেশি সম্মানিত এবং ইউ এস আমেরিকান মিলিটারির পদক সজ্জিত কুকুর এই চারপেয়েই! না না অবাক হওয়ার কিছুই নেই। ওই যে একটু আগে বলেছিলাম একটু আদর! একটু সান্নিধ্য ওদের আজীবন বন্ধু করে নিতে পারে। ঠিক তেমনভাবেই কোনো এক বন্ধু সৈনিক পিঠে, গলায় হাত দিয়ে উষ্ণ আদরে ওকে কাছে টেনে নিয়েছিল! তারপর? ‘স্টাবি’ ক্ষণমাত্র তাকে ছেড়ে থাকতে পারেনি। পেরেছিল নিজের জীবন পর্যন্ত বিপন্ন করতে! রাস্তায় অবহেলিত, লাঞ্ছিত হয়ে একদিন যে মানুষ তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, তারাই একদিন পরম বন্ধু হয়ে যুদ্ধের ময়দানে একমাত্র চারপেয়ে হিসাবে প্রথম ‘সার্জেন্ট’ উপাধি দিয়েছিল ‘স্টাবি’কেই। বোস্টন টেরিয়ার ১০২তম পদাতিক, ২৬তম ইয়াংকি ডিভিশনে ‘স্টাবি’ প্রথমদিকে মাস্কট হিসাবে অংশ নিলেও যুদ্ধ শেষে একটি পুরোদস্তুর যোদ্ধা হিসাবে আজও স্মরণীয় হয়ে আছে সে। কোনোভাবেই নিজের বন্ধুকে একা যুদ্ধক্ষেত্রে ছাড়েনি ‘স্টাবি’, লুকিয়ে যোদ্ধা সৈনিক নিয়ে রওনা হওয়া জাহাজে উঠে পাড়ি দেয় সেও। তারপর বিবিধ ঘটনা পরম্পরায় তাকে যুদ্ধের সম্মুখ সমরে নিয়ে আসা হয়েছিল ও ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীনও হতে হয়েছিল তাকে। কী সেই বিপদ? কীকরে ‘স্টাবি’ সেসব থেকে নিজেকে রক্ষা করবে? আর কীকরেই বা পরবর্তীকালে তার সহযোদ্ধাদের গ্যাস আক্রমণের পূর্বাভাস দিয়ে সাহায্য করবে তা জানতে অবশ্যই চলচ্চিত্রটি দেখতে হবে। দেখতে পাওয়া যায় ‘স্টাবি’ শুধু একটি কুকুর নয়, প্রাণীসত্ত্বার অদ্ভূত প্রতিমূর্তি। দেখতে পাওয়া যাবে আহত যোদ্ধাদের সে নিজের প্রাণের থেকেও প্রিয় মনে করে রুদ্ধশ্বাস গতিতে সঙ্কট পরিস্থিতি থেকে খুঁজে বের করার সঙ্গে সঙ্গে গুপ্তচর, ঠক মানুষকেও কীভাবে যেন চিনতে পারত, কাঁটাতারের সীমানা থেকে তার সন্দিগ্ধ চোখ অন্বেষণ করে আনত সে-সবই।

কয়েনের উল্টোপিঠের মত দেখতে পাওয়া যায় চলচ্চিত্রের আরো কতকগুলো বিষয়, যা উপেক্ষা করা যায়না। বিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধবিগ্রহ কতটা আধুনিক এবং প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে কতটা উন্নত হতে যাচ্ছে তার প্রথম সাক্ষী বলা যেতে পারে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে। কিন্তু পিছনের দিকে তাকালে বিভিন্ন সময়ের যুদ্ধবিগ্রহের ইতিহাসের দিকে আমরা কিছুটা ভিন্নচিত্রও দেখতে পাই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের সরঞ্জাম এবং অস্ত্রশস্ত্রের উন্নতির রেখা যতই ঊর্ধগামী হোক না কেন, যুদ্ধ মানেই সবসময় মনুষ্য শক্তির উপর নির্ভরতা চলে আসে। ট্যাঙ্ক, মেশিনগান, পারমাণবিক বোমা যতই থাকুক না কেন, প্রতিটা যুদ্ধের সঙ্গে মিশে থাকে হাজারো মানুষের আত্মাহুতি, শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা। চরম প্রতিকূলতার মাঝে যারা লড়াই করে, প্রাণ দেয়! কীকরে যেন এদের সঙ্গেই অদৃশ্যভাবে এক হয়ে ওঠে ‘স্টাবি’! ইতিহাস বলে, বিভিন্ন রেজিমেন্ট এবং সেনাবাহিনীর ভীতি দূর করতে সাহসিকতা বজায় রাখতে প্রায়ই জীবজন্তুকে সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হত। ফ্রন্ট লাইনে বার্তা বহনের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরদের ব্যবহার করা হত। বিশেষ করে জার্মান বাহিনীতে। ব্রিটিশ সেনা বাহিনীতেও তেমনই! যুদ্ধ, হিংসা, বিবাদ, কামান, প্রাণহানি কেমন যেন ধূসর ছবিগুলো চোখের সামনে মেলে ধরে, মন খারাপ করায়, কিন্তু পরমুহূর্তেই যখন দেখি সেই ধূসরের বিষাক্ত গ্যাস সরিয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে এগিয়ে আসে একটি প্রাণের অবয়ব! যে নতুন করে আশা জাগায়! যে নতুন করে গল্পের জাল বোনে। যে নতুন করে নিঃশব্দে বলে যায় বন্ধুত্বের নতুন সংজ্ঞা। তখন ‘স্টাবি’কে, কেবল একটি চারপেয়ে নয়, একটি স্বার্থক চরিত্র হিসাবে ভাবতে ইচ্ছে করে।

আর আমাদের মনে সত্যি সত্যি কিছু ঘৃণা যদি এখনো লুকিয়ে থাকে ওদের নিয়ে, তাহলে একবার দেখতেই হবে ‘সার্জেন্ট স্টাবি, অ্যান আমেরিকান হিরো’! কে বলতে পারে, একদিন আমাদের চারপাশের অন্য কোনো ‘স্টাবি’-ই হয়তো আমাদের নতুন কোনো অধ্যায় শিখিয়ে যাবে! ‘ঘৃণা নয়, ভালোবাসাই হয়তো…’ সে অধ্যায়ের আরেক নাম!

জয়ঢাকের সিনেমা হল

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s