সেই মেয়েরা হেনরিয়েটা ল্যাকস উমা ভট্টাচার্য শীত ২০১৭

সব লেখা একত্রে–উমা ভট্টাচার্য   

হেনরিয়েটা ল্যাকস

উমা ভট্টাচার্য

মাদার অফ ‘ইমমর্টাল হেলা সেল লাইন’।

নামটা শুনে খুবই আশ্চর্য হবার কথা। এ আবার কী নাম, ইমমর্টাল হেলা সেল লাইন? জিনিসটা কী? কীই বা হয় তা দিয়ে? চিকিৎসকরা বিশেষ করে অঙ্কোলজিস্ট অর্থাৎ, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ তারা অবশ্যই জানেন ‘হেলা সেল লাইন’-এর কথা। কিন্তু আমরা সকলেই তো আর জানি না। তাই এসো, জানি সেই ‘অমর মানবকোষ’ বিষয়ে, যে কোষের সাহায্যে দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগের চিকিৎসার ওষুধ তৈরি করা সম্ভব  হয়েছে। শুধু তাই নয়, পোলিও থেকে শুরু করে আরও অনেক ব্যাধির চিকিৎসার ওষুধ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে এই ‘হেলা’ কোষের সাহায্যে। পৃথিবীর আকর্ষণ শক্তির আওতার বাইরে মহাকাশে এই কোষ কেমন আচরণ করে, সেখানেও এই কোষ রিপ্রোডাকশন (জীববিজ্ঞানের ভাষায়) করতে অর্থাৎ, বংশবৃদ্ধি করতে পারে কি না তা দেখার জন্য আমেরিকার বিজ্ঞানীমহল থেকে এই মানবকোষ বা সেলকে মহাকাশেও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এই কোষ যাঁর দান তাঁর নামটি আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা নেই। ১৯৭০ সালের আগে (পাঁচজন ছাড়া) চিকিৎসা-বিজ্ঞানীদের কেউই জানতেন না তাঁর নামটি। তিনি ছিলেন এক দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা, হেনরিয়েটা ল্যাকস।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়। চিকিৎসা-বিজ্ঞানীরা নানা অসুখের ওষুধ আবিষ্কারের জন্য বিভিন্ন গবেষণাগারে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছেন। কালান্তক ব্যাধি ক্যান্সার মারাত্মক আকারে দেখা দিয়েছে। কিন্তু চিকিৎসার কোনও ওষুধ তখনও আবিষ্কার হয়নি। রোগ নির্ণয়ের বিশেষ কোনও অস্ত্রও চিকিৎসকদের হাতে নেই। সারভিক্যাল ক্যান্সার (তলপেটের ক্যান্সার) নিয়ে প্রচুর মেয়েরা আসছে; প্রচুর মেয়েদের মৃত্যু হচ্ছে বিনা চিকিৎসায়। সে সময় বছরে প্রায় ১৫০০০ মেয়েরা মারা যাচ্ছিলেন এই রোগে। ডাক্তাররা নিরুপায়। চিকিৎসা বলতে শুধু রেডিয়াম থেরাপি। কিছুকাল আগেই কুরি-দম্পতি রেডিয়াম আবিষ্কার করেছেন। সেটির প্রয়োগ শুরু হয়েছে নানা ক্ষেত্রে। ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে রেডিয়ামের প্রয়োগে বাড়তি কোষগুলি পুড়িয়ে  দেওয়া যাচ্ছে, কিন্তু রোগ নিরাময় করা যাচ্ছে না। কারণ, রেডিয়াম এক দু’মুখো তলোয়ারের মতো। ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করার সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ কোষদেরও নষ্ট করে দেয়, বিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে রোগীর দেহের সর্বত্র।

ক্যান্সার আক্রান্ত কোষের বিশেষত্ব সেগুলি অফুরান সংখ্যায় বেড়ে চলে। চিকিৎসা-বিজ্ঞানী গবেষকরা এই কোষবৃদ্ধির কারণ জানার চেষ্টা করছিলেন। কোষবৃদ্ধির কারণ না জানতে পারলে কোষের বৃদ্ধি রোধ করার উপায়ও বের করতে পারছেন না তাঁরা। অবিরাম চেষ্টা চলছিল মানবদেহ থেকে সংগৃহীত কোষগুলিকে গবেষণাগারের কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট পরিবেশের মধ্যে বিভাজিত করে কোষের বংশবৃদ্ধি করতে। কিন্তু বিভাজন তো দূরের কথা মানবদেহের বাইরে কোনও জীবকোষ বাঁচছিলই না। মানব-শরীর থেকে সংগ্রহ করার কিছু সময়ের মধ্যেই সেগুলির মৃত্যু হচ্ছিল। ইমমর্টাল বা অমর কোষের সন্ধানে বিজ্ঞানীরা হন্যে হয়ে পথ খুঁজছিলেন। এই সময়ে মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরের জন হপকিনস হাসপাতাল ছিল একাধারে শিক্ষাকেন্দ্র, নার্সিং ট্রেনিং কলেজ, চিকিৎসা ও গবেষণা কেন্দ্র। সেই হাসপাতালের একটি কোষ গবেষণা কেন্দ্রও ছিল। হাসপাতালে দাতব্য চিকিৎসার ব্যবস্থাও ছিল। রোগীদের কাছ থেকে পয়সা নেওয়া হত না, কিন্তু গবেষণার কাজে রোগীদের অজান্তে তাদেরকে গিনিপিগের মতো ব্যবহার করতে দ্বিধা করতেন না চিকিৎসকরা।

একদিন সেখানে ডাক্তার দেখাতে এলেন পাঁচটি সন্তানের মা, একত্রিশ বছর বয়সী এক কৃষ্ণাঙ্গ  মহিলা – হেনরিয়েটা ল্যাকস। সময়টা ১৯৫১ সাল। হেনরিয়েটা নিজেই বুঝতে পেরেছিলেন তার তলপেটে একটা বেশ বড়সড় টিউমার রয়েছে, যন্ত্রণা হয়। ভর্তি হওয়ার পর ডাক্তারের নির্দেশে নার্স তাঁকে নিয়ে গেল কৃষ্ণাঙ্গ রোগীদের জন্য নির্ধারিত কালার্ড ওয়ার্ডে। দরিদ্র শ্বেতাঙ্গদের থেকেও নিকৃষ্ট মনে করা হত কৃষ্ণাঙ্গ রোগীদের। জাতপাতের বৈষম্য দাতব্য চিকিৎসালয়েও ছিল। তাই কৃষ্ণাঙ্গ রোগীদের জন্য ছিল আলাদা বিভাগ। ভাগ্যের পরিহাসে সেই কৃষ্ণাঙ্গ রমণীই চিকিৎসা-বিজ্ঞানকে চিরঋণী করে গেলেন নিজের ‘সতত প্রজননশীল ব্যতিক্রমী দেহকোষ’ দান করে। যার থেকেই তৈরি হল ‘ইমমর্টাল সেল লাইন’ বা ‘অমর জীবকোষের এক ধারা’। সেই রমণীর জীবকোষ দেহের বাইরে গবেষণাগারে বেঁচে তো রইলই, আশ্চর্যজনকভাবে বংশবৃদ্ধি করতে লাগল; চিকিৎসা বিজ্ঞানকে হাজার বছর এগিয়ে নিয়ে গেল। বিজ্ঞানীরা এই কোষের নাম দিলেন ‘হেলা’ (HeLa-কোড নেম)। হেনরিয়েটার নাম আর পদবির প্রথম দুটি করে অক্ষর নিয়ে তৈরি এই কোষনাম তাঁকে অমর করে রাখল কোষ গবেষণার ইতিহাসে আর চিকিৎসা-বিজ্ঞানের দুনিয়ায়।

দুঃখের বিষয় যখন তাঁর শরীর থেকে তাঁর অজান্তে আর বিনা অনুমতিতে এই কোষ সংগ্রহ করা হয়েছিল তখন তাঁর জ্ঞান ছিল না। জ্ঞান থাকলেও স্বল্পশিক্ষিতা এই মেয়েটি ডাক্তারদের কেরামতি ধরতেও পারতেন না। অবশ্য সে সময় রোগীর দেহ থেকে গবেষণার জন্য নমুনা সংগ্রহ করতে হলে রোগী বা পরিবারের অনুমতি নেওয়ার কোনও রীতি বা আইন ছিল না। তাঁর দুস্থ, দরিদ্র পরিবারও জানতে পারেনি সেকথা বহুদিন। পায়নি কোনও ক্ষতিপূরণ। কিন্তু তাঁর সেই কোষের সাহায্যে চিকিৎসা-বিজ্ঞান অল্পদিনেই এগিয়ে গেছে বহুদূর। ব্যাপক হারে এই কোষ তৈরি হয়েছে ফ্যাক্টরিতে, কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে। কিন্তু সেসবের খোঁজ তিনি জানতে পারেননি। একরকম বিনা চিকিৎসায়, শুধুমাত্র রেডিয়াম থেরাপি আর এক্স-রে থেরাপি নিয়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কষ্ট পেতে পেতে চলে গেছেন জীবন থেকে বহুদূরে, পাঁচটি ছেলেমেয়েকে মাতৃহারা করে। চিকিৎসা শুরুর আট মাসের মাথায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু তাঁর দেহকোষ থেকে সৃষ্ট ‘হেলা’ অমর হয়ে রইল।

বাল্টিমোরের জন হপকিনস হাসপাতালের চিকিৎসক টেলমেড তাঁকে পরীক্ষা করে বুঝতে পেরেছিলেন হেনরিয়েটার ক্যান্সারটি দুরারোগ্য (ম্যালিগন্যান্ট)। নিয়ম অনুযায়ী বায়োপসি হল। তারপর তিনি এসে হাসপাতালে ভর্তি হলেন চিকিৎসার জন্য।

তিনি যখন হাসপাতালে এসেছিলেন সেসময় চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী টেলমেডও ভাবছিলেন কীভাবে কৃত্রিম উপায়ে মানবকোষকে বাঁচিয়ে রাখা যায় ও বিভাজিত করা যায়। এই গবেষণার জন্য মানব জীবকোষের প্রয়োজন। তিনি প্রায় প্রতি রোগীকে পরীক্ষা করার সময় তার শরীর থেকেই ক্যান্সার আক্রান্ত কিছু টিস্যু সংগ্রহ করে নিতেন। হেনরিয়েটার টিউমারটি দেখে তাঁর একটু আলাদা ধরনের মনে হল। এখান থেকে টিস্যু সংগ্রহের চিন্তা তার মাথায় রইল।

সেই সময় হপকিনস হাসপাতালের ‘টিস্যু কালচার রিসার্চ’ বিভাগের প্রধান ছিলেন চিকিৎসক জর্জ গে আর স্ত্রী মার্গারেট গে। ১৯৪৩ সালে একদল বিজ্ঞানী ইঁদুরের টিস্যু নিয়ে গবেষণা করে কোষ বিভাজন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই থেকে জর্জ গে লেগেছিলেন মানবকোষ বিভাজনের জন্য পরীক্ষায়। চিকিৎসক টেলমেড আর চিকিৎসক গে, দু’জনের মধ্যে এক চুক্তি হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী টেলমেড তাঁকে রোগাক্রান্ত মানবকোষের যোগান দিতেন গবেষণার জন্য। টেলমেড যেভাবে রোগিণীদের কোষের নমুনা সংগ্রহ করতেন তা আজ অন্যায় মনে হলেও এছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না তখন। তিনি মেয়েদের ভালো করার ভাবনা থেকেই কোষ গবেষণার জন্য চিকিৎসক জর্জ গেকে মানব জীবকোষের নমুনা (স্যাম্পল) যোগান দিতেন।

১৯৫১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে বায়োপসি রিপোর্ট জানার পর হেনরিয়েটা প্রথামত একটি ফর্মে সই করে  তাঁর শরীরের প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের অনুমতি দিলেন। বাড়িতে কিছুই জানালেন না। হাসপাতালে তাঁর প্যাথলজি টেস্ট হবার দু’দিন পর থেকে শুরু হল রেডিয়াম থেরাপি। এই থেরাপির সাহায্য নিয়েও আগে বহু মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসকদের হাতে তখনও আর কোনও ওষুধ নেই। তখন পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের থেকে রেডিয়াম থেরাপিই নিরাপদ লাগত চিকিৎসকদের  কাছে। রোগিণী অপারেশন টেবিলেই না মরে গিয়ে হয়তো আরও কিছুদিন বেঁচে থাকবে, এই আশায় রেডিয়াম থেরাপি করতেন চিকিৎসকেরা। হেনরিয়েটার চিকিৎসা শুরু হল। রেডিয়ামপূর্ণ টিউব তাঁর শরীরের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে সেলাই করে দেবার সময় চিকিৎসক টেলমেড তাঁর টিউমার থেকে দুটি পাতলা টুকরো কেটে নিলেন। অজ্ঞান রোগিণী কিছুই জানলেন না, বুঝতেও পারলেন না। চিকিৎসক দেখলেন, সেই ক্যান্সার আক্রান্ত টিস্যুগুলি একটু যেন আলাদা ধরনের। সকলের অজান্তেই এক নাটকীয় অধ্যায়ের সূত্রপাত হল চিকিৎসা-বিজ্ঞানের ইতিহাসে।

যথাচুক্তি টেলমেড সেগুলি পাঠিয়ে দিলেন কোষবিজ্ঞানী গবেষক জর্জ গের গবেষণাগারে। তিনি সাদরে গ্রহণ করলেন সে  দুটিকে। তিনি, তাঁর স্ত্রী ও গবেষণাগারের সহকারী মারী কুবিয়েক সকলেরই ভয় ছিল যে এগুলিও হয়তো বাঁচবে না। তাঁরা গবেষণাগারের পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর দিলেন। গে-দম্পতির সবসময় ভাবনাচিন্তা ছিল কোন মাধ্যমের মধ্যে রাখলে, কোন পুষ্টিকর পদার্থ দিলে মানবদেহকোষগুলিকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে। মানবদেহের বাইরে সেগুলিকে বাঁচিয়ে রাখা ও সেগুলিকে বিভাজিত করে বংশবৃদ্ধি করানো ছিল তাঁদের কাছে এক চ্যালেঞ্জ। গবেষণাগারে কোষেদের বংশবৃদ্ধি করতে হলে তাদের পুষ্টির জন্য কী খাওয়ানো যায়, সেই মাধ্যমের অনুসন্ধান করছিলেন তাঁরা। তদুপরি ভয় ছিল ব্যকটিরিয়া সংক্রমণের। সংগৃহীত কোষগুলির সুরক্ষণের ভার ছিল মারী কুবিয়েকের ওপর। প্রথমে তিনিও এগুলির ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। পুরনো অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর মনে হত এগুলিও হয়তো বাঁচবে না।

এদিকে রেডিয়াম থেরাপির প্রথম ডোজের পর চিকিৎসকরা তাঁকে নানাভাবে পরীক্ষা করে বললেন যে তাঁর অবস্থা অনেকটা ভালো, দু’দিনের মধ্যেই তিনি বাড়ি যেতে পারবেন। তবে আড়াই সপ্তাহ বাদে আবার তাঁকে দ্বিতীয় ডোজটি নিতে আসতে হবে হাসপাতালে। দু’দিন পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হল।

এদিকে মারী কুবিয়েক প্রতিদিন সকালে উঠে  দেখতেন যে একেকটি কোষ দ্বিগুণ আকারের হয়ে গেছে। অর্থাৎ, সেগুলি বিভাজিত হবে। সকলের আশঙ্কাকে দূর করে সেই কোষ অমরত্ব লাভ করল। বেঁচে তো রইলই, আর অভাবনীয় দ্রুতগতিতে সেই কোষ বংশবৃদ্ধি করতে লাগল। মারী কুবিয়েক অসাধারণ জীবনীশক্তির অধিকারী সেই কোষের নাম দিলেন ‘হেলা কোষ’, সেই সাধারণ মহিলা হেনরিয়েটার ল্যাকসের নাম আর পদবির প্রথম দুটি করে অক্ষর নিয়ে কোড নাম। চিকিৎসক গে আনন্দে বলে বেড়াতে লাগলেন ‘আমার গবেষণাগারে আমি অমর জীবকোষ সৃষ্টি করতে পেরেছি – নাম তার ‘হেলা’। কেউ তখনও প্রশ্ন  করেনি এই কোড নামের অর্থ কী? সকলেই খুশি এই ভেবে যে গবেষণাগারে মানবকোষ তো তৈরি করা গেছে, এবার তাহলে  এগিয়ে যাবে ক্যান্সারের চিকিৎসা। তখনও কেউ ভাবেননি যে আরও নানা রোগের অষুধ তৈরি করা যাবে এই কোষের সাহায্যে। তাঁর সহকর্মীরা তার কাছে ক্যান্সার কোষের নমুনা (স্যাম্পেল) চাইলেন। তিনি দিতে রাজি হলেন। বিভিন্ন গবেষণাগারে বিপুল সংখ্যায় বাড়তে লাগল সেই ‘হেলা’ কোষ।

তাঁর রেডিয়াম থেরাপি শুরু হবার ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত কেউ জানত না তাঁর রোগটির কথা। সে সময়ের বাল্টিমোরের সমাজে মেয়েদের এই রোগটি ঘৃণ্য বলে গণ্য ছিল। তিনি এই রোগের কথা তাই কাউকে জানাননি। দ্বিতীয় দফার রেডিয়াম থেরাপির পর তাঁর এক্স-রে থেরাপি শুরু হল। তখন একমাস ধরে প্রতিদিন তাঁকে হাসপাতালে আসতে বলা হল। দূর থেকে প্রতিদিন হাসপাতালে আসার ধকল নেবার শক্তি ছিল না তাঁর। সেটা সম্ভবও ছিল না। হাসপাতালের কাছাকাছি তাঁর এক জ্ঞাতিবোন মার্গারেটের বাড়িতে রইলেন তিনি। এই মার্গারেটও তাঁর সাথে দাদুর খামারবাড়িতেই থাকত। তখনও হাসিখুশি হেনরিয়েটা বাচ্চাদের নিয়ে আনন্দ করেছেন রোগযন্ত্রণা ভুলে। তাদের আনন্দে রাখার জন্য নিয়ে কাছের মেলায় গেছেন, নাগরদোলায় চড়েছেন। এই নাগরদোলাতে বসেই জ্ঞাতিবোন মার্গারেট আর সেডির কাছে প্রথম প্রকাশ করলেন নিজের অসুখের কথা। বোনেদের চিন্তা করতে দেখে বললেন, ভাবনার কিছু নেই, তাঁর শরীর এখন ভালোই আছে।

এক্স-রে থেরাপি শেষ হবার পর বাড়ি ফিরে গেলেন হেনরিয়েটা। স্বাস্থ্যের ক্রমাগত অবনতি হতে লাগল। দেহের রং, গায়ের চামড়া তেজস্ক্রিয় রেডিয়ামের প্রভাবে কালো হয়ে যেতে লাগল। হাত পায়ের নখগুলিও বিবর্ণ হয়ে গেল। অভাবের সংসারে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন হেনরিয়েটা। ১৯৫১ সালের ৪ঠা অক্টোবর তাঁর নশ্বর দেহের মৃত্যু হল। অন্যদিকে তাঁরই অমর দেহকোষ ‘হেলা’ বেঁচে রইল বিভিন্ন গবেষণাগারে। বিপুল সংখ্যায় চাষ হতে লাগল সেই কোষের। তাঁরই এক একটি দেহকোষ প্রতি চব্বিশ ঘন্টায় দ্বিগুণ হারে বাড়তে লাগল, যা মানুষের কল্যাণের কাজে লাগাতে লাগলেন বিজ্ঞানী আর চিকিৎসকেরা। এ সময় হপকিনস হাসপাতালের কেউ তাঁর খোঁজও করেনি। অথচ তাঁরা তো জানতেন তাঁর অবদানের  কথা। কোনও কৃতজ্ঞতাও জানায়নি কোনও চিকিৎসক বা সংস্থা। আট মাস রোগের যন্ত্রণা ভোগ করার পর আধুনিক যুগের এই দধিচী নিজের তনুত্যাগ করলেন। মানবকল্যাণের জন্য বিজ্ঞানীদের হাতে তুলে দিয়ে গেলেন ক্যান্সারসহ নানা মারণ রোগ নিরাময়ের ওষুধ আবিষ্কারের অস্ত্র ‘অমর হেলা কোষ’- এক অমর কোষ ধারা (সেল লাইন)। চিকিৎসা-বিজ্ঞানে যুগান্তর এল।

একটি বৈজ্ঞানিক পত্রিকার সমীক্ষা থেকে জানা গেছে যে আজ পর্যন্ত যত ‘হেলা’ কোষ তৈরি হয়েছে, ওজন করলে তার ওজন দাঁড়াবে পঞ্চাশ লক্ষ মেট্রিক টনেরও বেশি। সেগুলিকে জুড়লে এত দীর্ঘ হবে যে তা দিয়ে পৃথিবীকে তিনবার ঘিরে ফেলা যাবে। এই অমর কোষ বায়োকেমিস্ট্রি, সেল বায়োলজি, বায়োটেকনোলজি সবক্ষেত্রেই গবেষণার এক বিশেষ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এই কোষের বংশবৃদ্ধি অর্থাৎ ব্যাপক হারে চাষের জন্য ফ্যাক্টরি তৈরি হয়েছে। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত সেগুলিতে ব্যাপকহারে ‘হেলা’ কোষ তৈরি হয়েছে পোলিওর ওষুধ আবিষ্কারের গবেষণার জন্য। ১৯৫২ সালেই আবিষ্কৃত হয়েছে পোলিও ভ্যাকসিন। এছাড়া এই অমর ‘হেলা’ কোষ ব্যবহার করে হারপিস, লিউকেমিয়া, এইডস, হিমোফিলিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা এমনকি পারকিনসন্স ডিজিসেরও ওষুধ আবিষ্কার করেছেন গবেষকরা।

তাঁর মৃত্যুর পর ভার্জিনিয়ার ক্লোভে, যেখানে তাঁর স্বামীর পরিবারের শ্বেতাঙ্গ পূর্বপুরুষ জমিদার আর দাসমালিকদের বাস ছিল, সেখানে তাঁদের পারিবারিক সমাধিস্থল ছিল, তার কাছেই কোনওরকমে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছিল। তখন তাঁর সমাধিস্থলটি চিহ্নিত করার জন্য একটি সমাধিফলকও বসাতে পারেনি তাঁর পরিবার। পরবর্তীকালে তাঁর নাতিনাতনিরা সে স্থানটি চিহ্নিত করে সেখানে একটি সমাধিফলক লাগিয়েছে। সেটি দেখতে একটি বইয়ের আকারের। সেই সমাধিলিপিতে তারা লিখেছে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা।

তাঁর মৃত্যুর প্রায় পঁচিশ বছর পার হয়ে গেল, হপকিনস হাসপাতালের গবেষকরা ছাড়া কোনও দেশের কোনও বিজ্ঞানী জানতে পারেননি এই ‘হেলা’ জীবকোষের দাতার নাম। কোড নামেই পরিচয় ছিল তাঁর অমর দেহকোষের। কোনও সংবাদসংস্থা একবার জানতে চেয়েছিল। তখন তাদের বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। কেউ বলেছিল কোষদাতার নামটি ছিল হেলেন লারা, কেউ কেউ বলেছিল তার নাম হেলেন লারসেন। আসলে কৃষ্ণাঙ্গ এই রমণীর নাম বলতে দ্বিধা ছিল শ্বেতাঙ্গ বিজ্ঞানীদের।

সময়ের কাজ সময়ই করে। প্রায় পঁচিশ বছর পর, ১৯৭৪ সালে একজন বিশেষজ্ঞ কোষ গবেষক ওয়াল্টার নেলসন আবিষ্কার করলেন যে প্রচণ্ড শক্তিধর অসাধারণ এই হেলা সেল অন্যধরনের জীবকোষকে সংক্রামিত করার ক্ষমতা রাখে। কারণ, এই কোষ বাতাসের ধুলিকণার সাথে ভেসে বেড়াতে পারে, হাতের পাতায় মিশে থাকতে পারে এবং সেটাই হয়েছে। অনেক কোষ ‘হেলা’ দ্বারা সংক্রামিত হয়েছে। বিতর্কের ঝড় উঠল। একদল গবেষক ‘হেলা’ কোষের আসল দাতার খোঁজ করতে লাগলেন, কেননা সংক্রামিত কোষগুলি থেকে ‘হেলা’ কোষকে আলাদা করে চেনা দরকার। তা করতে হলে আসল কোষদাতার বা তার পরিবারের কারও ডিএনএ নিয়ে জিন ম্যাপিং করতে হবে। না হলে সংক্রামিত কোষের জন্য বহুমূল্যের কোষ গবেষণার পরিশ্রম ব্যর্থ হবে।

খোঁজ করতে করতে হেনরিয়েটার স্বামী আর ছেলেমেয়েদের খোঁজ মিলল। হেনরিয়েটার স্বামী একদিন একটা ফোন পেলেন। কেউ একজন বললেন যে, ‘আপনার স্ত্রী আমাদের ল্যাবরেটরিতে বেঁচে আছে তাঁর দেহকোষের মধ্যে। আমরা আজ পঁচিশ বছর তাঁর ক্যান্সার আক্রান্ত কোষ নিয়ে গবেষণা করছি। এখন আপনার সন্তানদের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে দেখতে চাই যে তাদের মধ্যেও এই রোগ আছে কি না। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’

এবারও প্রতারিত হতে যাচ্ছিলেন তারা। তৃতীয় শ্রেণীর সমতুল্য লেখাপড়া জানা এক তামাক শ্রমিক ডে ল্যাকস এসবের কিছুই বুঝতে পারলেন না। হেনরিয়েটার ছেলেমেয়েরা তখন বড়ো। ছেলে আর্থিক কোনও লেনদেন নেই বুঝে আগ্রহ দেখাল না। মেয়ে ডেবোরা ল্যাকস, যে ছিল মায়ের ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী, মায়ের জন্য তার মনটা সবসময় হাহাকার করত। মা মারা যাওয়ার সময় যে ছিল দু’বছরের শিশুমাত্র। মার কথা জানার সে কত চেষ্টা করেছে। কেউ তাকে মায়ের ব্যাপারে কিছু বলেনি। সে এই খবর শুনে মাকে তাঁর জীবকোষের মধ্যে দিয়েই দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল। এই সময়েই আরেক বিজ্ঞান-পত্রিকার সাংবাদিক রেবেকা স্ক্লুট, তিনিও ডেবোরার খোঁজ করছিলেন। তিনি প্রায় দশ বছর ধরে ‘হেলা কোষ’-এর দাতার ব্যাপারে অনুসন্ধান করছিলেন আর তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। অনেক চেষ্টার পর তিনি ডেবোরা ও তার পরিবারের খোঁজ পেলেন। তাঁরই চেষ্টা আর অনুসন্ধানের ফলে সামনে এল হেনরিয়েটা ল্যাকসের নাম, যিনি ছিলেন ‘অমর হেলা কোষ’-এর জননী। পরিবারটি আবার প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পেল। হেনরিয়েটা ল্যাকসকে নিয়ে রেবেকার বইটি প্রকাশিত হল ২০১০ সালে। সব তথ্য প্রকশিত হল। উঠে এল তখনকার চিকিৎসার অবস্থা, দরিদ্র তামাক শ্রমিকদের জীবনের নানা দিক, সর্বোপরি হেনরিয়েটার আবাল্যের ইতিহাস আর চিকিৎসা-বিজ্ঞানে তাঁর অমর অবদানের কথা।

তারপর থেকে হেনরিয়েটার সম্মানের ঘাটতি রইল না। বিজ্ঞানীদের কাছে তিনি হলেন মাদার অফ ইমমর্টাল হেলা সেল লাইন। ১৯৯৬ সালে ‘মোরহাউস স্কুল অফ মেডিসিন’-এ অনুষ্ঠিত হল বিশ্বে্র প্রথম বাৎসরিক ‘হেলা ওমেন’স হেলথ কনফারেন্স’। চিকিৎসা গবেষণায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতির সঙ্গে আফ্রিকান আমেরিকানদের অবদানকেও সেই অনুষ্ঠানে সম্মান জানানো হয়। আটলান্টার মেয়র ১৯৯৬ সালের প্রথম কনফারেন্সের দিনটি, অর্থাৎ ১১ই অক্টোবরকে ‘হেনরিয়েটা ল্যাকস ডে’ বলে ঘোষণা করলেন। ২০১১ সালে বাল্টিমোরের ‘মর্গান স্টেট ইউনিভারসিটি’ তাঁর অনন্য অবদানের জন্য তাঁকে ‘মরণোত্তর সান্মানিক ডক্টরেট ইন পাবলিক সার্ভিস’ ডিগ্রি প্রদান করলেন। ২০১১ সালেই ভ্যাঙ্কুবারের ‘দি এভারগ্রীন স্কুল পরিচালন সমিতি’ তাদের স্কুলের নাম পাল্টে নতুন নাম রাখলেন ‘হেনরিয়েটা ল্যাকস হেলথ অ্যান্ড বায়োসায়েন্স হাই স্কুল’। নজর দিলেন জীববিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারের দিকে। ভার্জিনিয়ার ক্লোভে, যে টার্নার স্টেশন এলাকায় তাঁরা একসময় বাস করতেন এখনও সেখানে চিকিৎসা বিজ্ঞানে হেনরিয়েটা ল্যাকসের অবদান স্মরণ করে অনুষ্ঠান পালিত হয়। ২০১৪ সালে হেনরিয়েটা ল্যাকস পেয়েছেন (মরণোত্তর) ‘মেরিল্যান্ড হল অফ ফেম’। সর্বোপরি ২০১৭ সালে মহাকাশের প্রধান অ্যাস্টরয়েড বেল্টে একটি ক্ষুদ্র গ্রহাণুর নাম রাখা হয়েছে তাঁর নামে – ‘৩৫৯৪২৬ ল্যাকস’। আগে সেটির নাম ছিল ‘২০১০এলএ৭১’।

আশৈশব কষ্টের মধ্যে দিয়ে কেটেছে তাঁর জীবন। ভার্জিনিয়ার এক গ্রাম রোয়াঙ্কোতে ১লা আগস্ট ১৯২০ সালে জন্মেছিলেন হেনরিয়েটা। তখন নাম রাখা হয়েছিল লরেটা প্লিজেন্ট। ডাকনাম ছিল হেনি। চার বছর বয়সে মা এলিজাকে হারালেন। দশটি ছেলেমেয়েকে নিয়ে তামাকচাষি বাবা জনি প্লিজেন্ট খুবই বিপদে পড়লেন। ছেলেমেয়েদের নিয়ে গ্রাম থেকে চলে এলেন ভার্জিনিয়ার ক্লোভে। সেখানে অনেক আত্মীয়স্বজন ছিল তাঁর। সব পরিবারের মধ্যে ভাগ করে দিলেন ছেলেমেয়েদের। চার বছরের হেনির ঠাঁই হল তাঁর মায়ের দিকের এক দাদু টমি ল্যাকসের খামার বাড়িতে। টমি ল্যাকস থাকতেন তাঁর এক জ্ঞাতি-দাদা ডে ল্যাকসের সাথে।

টমি ল্যাকসের বাবা ছিলেন এক শ্বেতাঙ্গ জমিদার আর বিরাট ফার্মের মালিক। তামাক চাষের ক্ষেতে কাজ করার জন্য  তাঁর অনেক কৃষ্ণাঙ্গ দাস ছিল। তাদের জন্য ছিল একটি দোতলা কাঠের বাড়ি। এখন আর দাদুর বাবাও বেঁচে ছিল না আর দাসরাও ছিল না। দাসপ্রথা উঠে গিয়েছিল তখন। দাদুর কাছে এসে হেনি আর তার মতো আরও অনেক ছেলেমেয়েরা সেই বাড়িতে একসঙ্গে থাকত। যাদের সঙ্গে তাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল এমন অনেক দুস্থ পরিবার নিজেদের ছেলেমেয়েদের দুটো খেয়ে বাঁচার জন্য এই খামার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। এই ছেলেমেয়েদের মধ্যে ডেভিড ডে ল্যাকস নামে একটি ছেলেও ছিল। পরে এর সাথেই হেনির বিয়ে হয়েছিল।

দাদু তাঁর পৈতৃক সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তামাকের কারবার ছিল তাঁর। সকাল হতেই সকালের খাবার খেয়ে সব ছেলেমেয়েরা বাড়ির কাজে লেগে যেত, আর অনেকে যেত দাদুর সাথে তামাক ক্ষেতে কাজ করতে। দুপুরে বাড়ি ফিরে গৃহপালিত গরু-ছাগলের দেখভালও ছেলেমেয়েরাই করত। পড়াশোনার বালাই ছিল না। তবুও নিজে নিজেই প্রায় ক্লাস সেভেন লেভেলের মতো পড়াশোনা করেছিল হেনি। মাঝে মাঝে তারা দাদুর সঙ্গে তামাক বিক্রি করতে বাজারেও যেত। সেদিন হত ছেলেমেয়েদের খুব আনন্দের দিন। বাবামায়ের স্নেহ-ভালবাসা আর সান্নিধ্য বঞ্চিত ছেলেমেয়েগুলোর নিস্তরঙ্গ জীবনে বাজারে যাওয়ার দিনটা ছিল বিশেষ দিন। কত কিছু দেখতে পেত তারা। মাঝে মাঝে দাদু কিছু বকশিশও দিত তাদের। সেদিন ফেরার সময় তারা কিনে আনত চীজ, লজেন্স জাতীয় কিছু। যারা সেদিন যেতে পেত না তাদের সেসব জিনিস এনে ভাগ করে দিত অন্যরা।

ডেভিড ডে ল্যাকসের সঙ্গে কুড়ি বছর বয়সে বিয়ে হল তাঁর। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল। যুদ্ধের প্রয়োজনে স্টীল-শিল্পের বাজার রমরমা। কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকরাই প্রধানত কাজ করত সেখানে। তাদের তখন দুটি সন্তান। খুবই ছোটো। তামাক ক্ষেতে কাজ করে ডে ল্যাকস। অভাব মেটে না। যুদ্ধের বাজারে হেনরিয়েটার দুই জ্ঞাতিভাই ক্লিফ আর ফ্রেড কাজ করত টার্নার স্টেশনের কাছে বেথেলহেম স্টীল প্ল্যান্টে। বাল্টিমোর থেকে বিশ মাইল দূরে ছিল টার্নার স্টেশন, যেখানে প্রধানত স্টীল কারখানার কর্মীদের বাস ছিল। ক্লিফ আর ফ্রেড হেনরিয়েটাদের তাদের কাছে এসে থাকতে বললেন যাতে ডে ল্যাকস কাজ করতে পারে স্টীল কারখানায়, তাদের আর্থিক অবস্থা কিছুটা ভালো হয়। সেই ডাকে তারা চলে এলেন টার্নার স্টেশন এলাকায়। ডে বেথেলহেম স্টীল-প্ল্যান্টে একটা কাজও পেয়ে গেলেন। সারাদিন প্রচন্ড পরিশ্রম করতে হত হেনরিয়েটাকে। অদম্য শক্তির অধিকারী ছিলেন হেনরিয়েটা। অত্যন্ত বিনয়ী আর স্নেহময়ী ছিলেন। শত অভাবের মধ্যেও হাসি-মজা করতে খুবই ভালোবাসতেন।

ইতিমধ্যে হেনরিয়েটার এক জ্ঞাতিভাই গ্যারেটের সেনাদলে যোগ দেবার ডাক এল। সে চলে যাবার সময় তার জমানো কিছু টাকা দিয়ে গেল হেনরিয়েটার স্বামীকে। তাই দিয়ে ডে ল্যাকস টার্নার স্টেশনের কাছেই একটা ছোট্ট বাড়ি কিনলেন। জায়গাটা তখন ছিল বাল্টিমোরের এলাকার মধ্যে। সেখানে ছিল কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের মানুষদের বাস। এখানেই জন্মালো হেনরিয়েটার আরও তিনটি ছেলেমেয়ে। ছোটোটির জন্মের সময়ই ধরা পড়ল হেনরিয়েটার অসুখটা। তারপরের ইতিহাস শেষ হয়ে গেল ১৯৫১ সালের ৪ঠা অক্টোবর ৩১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে।

তাঁর সমাধিফলকের ওপর সমাধিলিপিতে যা লেখা আছে, তার শেষ চারটি লাইন হল—

‘হেয়ার লাইস হেনরিয়েটা (হে লা), হার  ইমমর্টাল সেল / উইল কন্টিনিউ টু হেল্প ম্যানকাইন্ড / ফরএভার’।

সেই মেয়েরা–আগের পর্বগুলো

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s